১৯৬৪ – রজনীর উপলব্ধি
নিয়তি বড়োই অদ্ভুত। সে কখন কাকে নিয়ে কীভাবে খেলবে তা কেউই আগেভাগে জানতে পারে না। সে কখনো দেয় রিক্ত, নিঃস্ব করে, আবার কখনো দেয় অপ্রত্যাশিত, অযাচিত ভাবে ভরিয়ে। প্রকৃতির খেয়ালখুশির খেলার মতোই সেও খেলে চলে মানুষের জীবনকে নিয়ে। আর ঠিক তেমন খেলাই সে খেলল কানাইকে নিয়ে। নিয়তি তার প্রিয় দাদুকে যেমন কেড়ে নিল তার কাছ থেকে, তেমনই তাকে দিলেও অন্য অনেককিছু।
মাসিমার দুই মেয়ে মেসোমশাইয়ের পারলৌকিক কাজের জন্যে মাসখানেকের ছুটি নিয়ে সপরিবারে উড়ে এসেছিল। শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে গেলে তারা লেগে পড়ল মেসোমশইয়ের নামে রাখা বাড়িটা নিয়ে। না, না, এই সম্পত্তির ওপরে তাদের কোনো লোভ ছিল না। সুবিমল আর মাসিমার উপস্থিতিতেই তারা ঠিক করলে যে, এই বাড়ির দেখাশোনা করা মাসিমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া কেষ্টদা, রজনী আর কানাই ছাড়া এই বাড়িতে মাসিমার অবলম্বনই বা কোথায়? তাই মাসিমার কথামতোই দুই মেয়ে আর জামাই রজনীকে প্রস্তাব দিল বাড়িটা কিনে নেওয়ার জন্যে। একেবারে জলের দরেই বলতে হবে। তবে রজনী বিষয়-সম্পদে নিজেকে জড়াতে রাজি নয়। তাই সেও প্রস্তাব দিয়েছিল যে বাড়িটা মাসিমার নাতি কানাইয়ের নামে করে দেওয়া হোক আর সেইসঙ্গে সে একটা শর্তও জুড়ে দিয়েছিল যে— আমৃত্যু মাসিমা বাড়িটা ভোগ করবেন আর তাঁর অবর্তমানে কানাই হবে বাড়ির মালিক। যদিও টাকাটা রজনীই দিয়েছিল, তবু কানাই এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাতেই চায়নি। সে এইসব ব্যাপারে নিস্পৃহ।
এইভাবে কানাইয়ের নিয়তি খেলল তার প্রথম খেলা। আর দ্বিতীয় খেলা? মেসোমশাই মারা যাবার মাস সাতেকের মধ্যেই তার ভাগ্যে জুটে গেল বেঙ্গল কেমিক্যালসে একটা কেমিস্টের চাকরি। এই চাকরিটা পাওয়াতে সে, মাসিমা আর কেষ্টদা যেমন খুশি হয়েছিল, তেমনই খুশি হয়েছিল রজনীও। যাক, কানাই এবারে তাহলে স্বনির্ভর হল।
প্রথম মাসের মাইনে পাবার পরে রজনীর কথামতো দিদার অনুমতি নিয়ে সে তার কলেজের বন্ধুদের ডেকে একটা রবিবারে মাংস-ভাত খাইয়ে তার বকেয়া ট্রিটটা দিয়েছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন। এদিকে মাসিমার নিঃসঙ্গতা কাটবে বলে রজনীর কথামতো কানাই তার মা-বাবাকে গ্রাম থেকে এনে এখানে রাখবে বলে অনুমতি চেয়ে নিয়েছে।
তবে কানাই প্রতিবার তার সঙ্গী না হলেও প্রতিটা শনি-রবিবার গ্রামে কাটায় রজনী। কিন্তু তার আখড়ায় ছেলের সংখ্যা আজকাল বড়োই কমে গেছে। মাত্র চার-পাঁচজন আসে। আর বাকিরা কেউ মাঠে কাজ করে, কেউবা ছোটোখাটো দোকান খুলে বসেছে দুটো ডাল-ভাতের তাড়নায়। ওদের জন্যে কষ্ট হয় রজনীর। কিন্তু কি-ই বা করবে সে? তারও তো সীমাবদ্ধতা আছে। যাইহোক, এর মধ্যে একটা খুশির খবরও আছে। তার গ্রামের স্কুলটা এখন সরকারি সাহায্য পায়।
এদিকে দেখতে দেখতে কুড়িটা বছর হয়ে গেল তার মিউজিয়মের চাকরি। স্বাধীনতার পরের বছরেই রিটায়ার করেছেন ড্যানীবাবু। তবে যাবার আগে রজনীকে দিয়ে গেছেন অটোগ্রাফ করা ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের সেই ভল্যুমটা, যেটাতে তাঁর ফসিল নিয়ে লেখাটা পাবলিশ হয়েছিল। রজনীর ভাবতেও ভালো লাগে যে সে ড্যানীবাবুর ওই লেখাটা টাইপ করে দিয়েছিল।
ড্যানীবাবু যাবার পরে তাঁর জায়গাটা এখনও ফাঁকাই পড়ে আছে। সরকারি দপ্তরের যা দস্তুর। সেখানে কাউকে আদৌ নেওয়া হবে কিনা সন্দেহ, যদিও খাতায়-কলমে পদটার বিলুপ্তি ঘটেনি। তাই মিউজিয়মের সেই ফাঁকা ঘরে রজনীর সঙ্গী এখন নতুন ডিরেক্টর সায়েবের দেওয়া যৎসামান্য কাজ আর মুক্তোরামের বকবকানি মেশানো চা। বাকি সময়টা সে এঘরে ওঘরে ঘুরে বেড়ায়। আড্ডা মারে। কিন্তু এইভাবে সময় কাটাতে ভালো লাগে না তার ।
সত্যি বলতে কী, সুরেশ কাকা মারা যাবার পর থেকেই মনে মনে সে বড়ো একা হয়ে গিয়েছিল। তাই তখন সে কানাইকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল। ভেবেছিল কানাইকে সে তার অধীত বিদ্যার সবটুকু দিয়ে যাবে; রজনীর পরে সেইই হবে নিশিকান্ত রায়ের ঘরাণার প্রতিনিধি। কিন্তু রজনী এখন বোঝে যে— সব পাত্রে জল রাখা যায়, কিন্তু ঘি রাখা যায় না। এটাই তার একটা আফশোষ।
ধ্যুৎ, সন্তানসম কানাইকে নিয়ে এসব কী ভাবছে সে? নিশিকান্ত রায়ের ঘরাণা যে তাকে বয়ে নিয়ে যেতেই হবে, এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি। অন্য কোনো ক্ষেত্রেও তো কানাই সার্থক হতে পারে, সেরা হতে পারে। তবে?
আরও একটা আফশোষ আজও তাকে কুরে কুরে খায়। সে যখন চোখে অপত্য স্নেহের ঠুলি পরে একের পর এক খুন করেছিল, তখন সে পেয়েছিল শুধুই যন্ত্রণা। আজও একা থাকলেই নরহত্যার সেই কষ্ট তাকে ব্যথিত করে; তাকে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। এই বয়সে এসে তার মনে হয়— এতটাই কি দরকার ছিল ওই বিষ্টুচরণ আর দিনেশকে শেষ করার? তবু সে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চায় এই ভেবে যে; পরিস্থিতি তাকে ওই খুনগুলো করতে বাধ্য করেছিল। অথচ সেইই যখন গান্ধীজিকে জনতার আঘাত থেকে বাঁচিয়েছিল, তখন শরীর আধলা ইঁটের আঘাত পেলেও তার মন তৃপ্তিতে ভরে গিয়েছিল। সত্যিই, কী অদ্ভুত মানুষের মন আর কী অদ্ভুত নিয়তির খেলা।
কিন্তু এতকিছু সত্বেও সে আজও অতৃপ্ত। নিশিকান্ত রায়ের ঘরাণা চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে একটা যোগ্য আধার চাই। কিন্তু কোথায় পাবে সে এমন কাউকে যে ওই ঘরাণা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে?
অন্ধকার ঘরে একলা শুয়ে শুয়ে এইসব কথাই ভাবছিল রজনী।
—‘স্যার,… আসব স্যার?’ কানাইয়ের গলা।
—‘আয়। আলোটা জ্বালিয়ে দে।…বোস।’
আলো জ্বালিয়ে কানাই চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে। বিছানায় উঠে বসে রজনী বলে— ‘কিছু বলবি?’
—‘স্যার, তোমার কী হয়েছে বল তো? কিছুদিন ধরেই দেখছি যে, সকালে প্র্যাকটিসের সময় ছাড়া তুমি তো একা একাই থাক। কারোর সঙ্গে তেমন একটা কথাও বল না। কী হয়েছ স্যার তোমার? আমি কি কোনো দোষ করেছি?’
ম্লান হেসে রজনী বলে— ‘কিছু হয়নি রে। কিচ্ছু হয়নি। আর তুই তো কোনো অন্যায় করিসনি।’ দুটো বালিশ পিঠের নীচে গুঁজে উঠে বসে সে।
—‘না স্যার। তুমি আমার কাছে গোপন করে যাচ্ছ। আমার তো মনে হচ্ছে যে তুমি মনের দিক দিয়ে খুব ক্লান্ত। তাই না স্যার?’
রজনী বুঝতে পারে কানাই তার ঠিক জায়গাটাই ধরে ফেলেছে। তাই আর চেপে গিয়ে লাভ নেই। সত্যি কথাটা বলে ফেলাই ভালো। তাই বলে— ‘হ্যাঁরে কানাই, তুই ঠিকই বলেছিস। সত্যি রে এত বছর ধরে লড়তে লড়তে এখন আমি একটু ক্লান্তই হয়ে পড়েছি। তবে তুই চাকরি পেয়ে যেতে খুব শান্তি পেয়েছি আমি, জানিস। কিন্তু এখনও যে একটা লড়াই চলছেই আমার ভেতরে।’
—‘কীসের লড়াই? এই তো আমরা সবাই তোমার সাথে রয়েছি। তোমার যা কিছু সমস্যা তুমি আমাদের বলতে পার। আর অন্যদের যদি বলতে নাও পার, তবে শুধু আমাকে বল। আমি কাউকে বলব না।’
—‘না রে কানাই, আমার সে লড়াই যে আমার নিজের মনের সঙ্গে। তাই তার সমাধান তো আমাকেই করতে হবে। অন্য কেউ তার সমাধান করতে পারবে না রে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজনী। তারপর একটু থেমে আবার বলে— ‘জানিস কানাই, আমি একটা পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু পাচ্ছি না।’ মাথার ব্যাকব্রাশ করা ঘাড়ছোঁয়া কাঁচাপাকা চুলে হাত বোলাতে থাকে রজনী।
কানাই তার স্যারের এই জটিল কথার তল খুঁজে পায় না। কীসের পাত্র খুঁজছে স্যার? নাকি কোনো মানুষকে? কিন্তু কীসের জন্যে? এতদিন তাকে দেখছে কানাই কাছ থেকে, তবুও তার যেন মনে হয় কোথাও একটা রহস্য লুকিয়ে আছে তার স্যারের মধ্যে, যেটা তার কাছে আজও অধরা। তাই খানিক চুপ করে থেকে সে বলে— ‘স্যার তুমি তো সারাটা জীবন শুধু লড়াই করেই কাটালে। এবার না হয় একটু বিশ্রাম নাও। অফিস থেকে প্রয়োজন ছাড়া ছুটি তো তোমায় কখনো নিতে দেখিনি। তাই এবার বরং কিছুদিনের জন্যে ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে এসো। এবারে নিজের জন্যে ছুটি নাও তুমি। আমি তো আছি আর যদিও বয়স হয়েছে, তবুও কেষ্টদাও তো সঙ্গে আছে। আমরা ঠিক সামলে নিতে পারব। তুমি যাও স্যার। ক-দিন বাইরে কোথাও ঘুরে এসো। তাতে তোমার মনের ক্লান্তিটা কাটবে।’
নিজের কাঁচাপাকা ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে হাত বুলিয়ে রজনী বলে— ‘কথাটা বোধ হয় তুই ঠিকই বলেছিস কানাই। ভাবছি দিন পনেরো কোথাও ঘুরে আসি। একটু হালকা হওয়ার দরকার।’
—‘সেটাই বেটার স্যার।’
