২৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৪ – কলকাতায় কানাই, ভিক্টোরিয়ার হাওয়া-মোরগ আর ক্যাথিড্রালে চোখের জল
হাওড়া স্টেশন থেকে বেরোতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায় কানাইয়ের। উরিবাব্বা! ওটা কী? গায়ে আবার লম্বা লম্বা দড়ি বেঁধে পটোলের মতো বেলুন ওড়ানো।
রজনী বলে— ‘ওই দেখ হাওড়ার ব্রিজ। এতদিন বইয়ে ছবিতে দেখেছিস। এখন ওটার ওপর দিয়েই যাব আমরা।’
—‘কিন্তু স্যার, হাওড়া ব্রিজে বেলুন উড়িয়েছে কেন?’
—‘সাধে কী আর উড়িয়েছে। জাপানি এরোপ্লেন যাতে ব্রিজে বোমা ফেলতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা। প্লেনগুলো গোঁত্তা খেয়ে বোমা ফেলতে এলেই ওই বেলুনে জড়িয়ে টুপ করে গঙ্গায় গিয়ে পড়বে।’
—‘বেশ হবে। বোমা ফেলতে আসা না?’
একহাতে কানাইয়ের ছোটো সুটকেস আর অন্যহাতে কানাইয়ের একটা হাত ধরে রজনী এগিয়ে চলে ট্রাম টার্মিনাসের কাছে। একটা ট্রামে উঠে জানলার ধারে কানাইকে বসিয়ে তার পাশে বসে রজনী। হেসে বলে— ‘তোকে বলেছিলাম না যে ট্রামে চড়াবো। তা চড়ালাম তো?’ কানাই হাসে।
ট্রাম চলতে শুরু করল আর গ্রামের চঞ্চল ছেলেটার কৌতূহলী দৃষ্টি ট্রামের জানলা দিয়ে আবিষ্কার করতে শুরু করল শহরটাকে। এই শহর তার কাছে একেবারে নতুন। তার জন্যে মহা বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে শহরটার পরতে পরতে। মুগ্ধতার আবেশ তার চোখের প্রতিটা পলকে। এদিকে ওদিকে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে সে অপার আনন্দে। রজনীর ভারি ভালো লাগছে কানাইয়ের এই বিস্মিত ভালোলাগা।
ট্রামটা ব্রিজে উঠে পড়েছে। গঙ্গার ওপরে মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে সেটা। নদীতে কত রকমের জলযান। নৌকো, স্টিমার, গাদাবোট। তারই একটা দেখিয়ে কানাই রজনীকে বলে— ‘দেখ স্যার, জাহাজ। ওই যে ওইটা।’ আঙুল দিয়ে দেখায় যেটা, সেটা একটা ফেরি স্টিমার। দু-পাশে বড়ো বড়ো গোল দুটো পাখা ঘুরিয়ে জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।
রজনী বলল— ‘ওটা জাহাজ নয়, স্টিমার। লোক পারাপার করে। আর ওই যে দেখছিস দূরে, তোর ডানদিকে, বড়ো বড়ো কালো কালো। ওগুলোই হচ্ছে জাহাজ। কুশায়ায় ঢেকে আছে বলে ঠিক বুঝতে পারছিস না।’
—‘আমাকে জাহাজ দেখাবে?’
—‘দেখাব, দেখাব, নিশ্চয়ই দেখাব। একদিন তোকে নিয়ে যাব গঙ্গার ধারে। তখন বুঝতে পারবি ওগুলো কত্তো বড়ো।’
খুশিতে ডগোমগো কানাই বলে— ‘স্যার, এখন আমরা কোথায় যাব?’
—‘বউবাজারে। যেখানে আমি থাকি।’
—‘ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে দেবে কিন্তু। সঙ্গে নিয়ে রাখব। মা বলেছে ঠিকানা বলতে না পারলে কলকাতায় লোকে হারিয়ে যায়।’
—‘ঠিক আছে দেব। তবে তোর মা ঠিকই বলেছে রে কানাই, কলকাতায় এলে লোকে হারিয়েই যায়। কে, কখন, কোথায় হারিয়ে যায় তা সে নিজেও জানতে পারে না।’ হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে রজনী।
তার স্যারের শেষের কথাটা ঠিক বুঝতে পারে না কানাই।
.
বউবাজারের বাড়িতে পৌঁছে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেয় কেষ্টদা। ভেতর থেকে সুবিমলের মেসো পরিতোষ মিত্রের গলা শোনা যায়— ‘কে রে কেষ্ট?’
—‘আমাদের রজনীদা গো। যে ছেলেটাকে আনবে বলেচিল তাকে সঙ্গে নে এসেচে।’
—‘ও তাই নাকি? তা আমি আসছি। তুই ওদের ঘরটা পরিষ্কার করে রেখেছিস তো?’
—‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তা আর বলতে।’
—‘আচ্ছা। তাহলে ওদের মালপত্রগুলো ওপরে নিয়ে গিয়ে রাখ।’ বলতে বলতেই বেরিয়ে আসেন মিত্তিরমশাই। কেষ্টদা সদর দরজা বন্ধ করে মালপত্র নিয়ে ওপরে উঠে যায়। সেইফাঁকে এসে দাঁড়িয়েছেন সুবিমলের মাসিমাও।
রজনী তাঁদের দু-জনকে প্রণাম করে। তার দেখাদেখি কানাইও।
মাসিমা কানাইয়ের নিষ্পাপ মুখটা দেখে তার গালটা টিপে আদর করে বলেন—‘রজনী, তাহলে এই হল গিয়ে তোমার সাধের কানাই?’ তারপর কানাইকে বলেন—‘তা বাপু কানাই, আমরা হলাম গিয়ে তোমার দাদু আর দিদা।’
কানাই অমলিন হাসে। সে ভাবতেও পারেনি যে কলকাতায় তার দেখা হওয়া প্রথম মানুষগুলো তাকে এতটা আপন করে নেবে।
—‘তা কানুবাবু, শুনেছি তোমার কাকু নাকি তোমায় হিন্দু স্কুলে ভরতি করে দেবে?’
—‘কাকু নয়গো ঠাম্মি, ও তো আমার স্যার।’
—‘ও আচ্ছা। তা কানুবাবু তুমি কি জানো যে মা বাবার পরেই স্যারকে মান্য করতে হয়?’
কানাই ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায়।
পরিতোষ মিত্তির বলেন— ‘এবার ওদের ছাড় দাও গো সুনয়না। অনেকটা পথ এসেছে। ক্লান্ত ওরা। একটু বিশ্রাম করতে দাও। আর হ্যাঁ, কেষ্টকে বল ওদের জলখাবার দিতে। জয়নগরের মোয়া এনে রেখেছি।’ কেষ্টদা ততক্ষণে মালপত্র ওপরে রজনীর ঘরে রেখে নীচে নেমে এসেছে।
মিত্তির মশাই তাকে বললেন— ‘কেষ্ট আজ ওদের দুপুরের খাওয়াটা একটু তাড়াতাড়িই দিস। একে শীতের বেলা। তারপর রজনী হয়তো ওকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতেও পারে। এরপরে স্কুলে ভরতি হয়ে গেলে আর হয়তো সময় পাবে না।’
—‘হ্যাঁ মেসোমশাই, ভাবছিলাম আজ ওকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর ক্যাথিড্রাল দেখিয়ে নিয়ে আসব। আর যদি সময় হয়, সেইসঙ্গে পার্ক স্ট্রিটটাও।’
—‘বেশ, বেশ, সেই ভালো। আচ্ছা এবারে তোমরা ওপরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করে নাও।’
.
তিনটে নাগাদ একটা ছ্যাকরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রজনী আর কানাই। কানাইয়ের কাছে তো কলকাতার চারপাশেই বিস্ময়। একএকটা কিছু দেখে আর প্রশ্ন করে তার স্যারকে। রজনী একটুও বিরক্ত হয় না তাতে। সে জানে অজানা, অদেখা সব জিনিসেই কৌতূহল থাকে মানুষের— বিশেষ করে শিশু আর কিশোর বয়সে। তাই সে খুশিমনেই কানাইয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে।
ধর্মতলার কাছাকাছি আসতেই কানাইয়ের নজরে পড়ে একটা লম্বা থাম মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সে রজনীকে জিজ্ঞেস করে— ‘স্যার, ওই লম্বা থামটা কী গো?’
—‘ওটার নাম অক্টারলোনি মনুমেন্ট।’
—‘ও এটাই মনুমেন্ট। কিন্তু ওটা তৈরি করল কী করে বল তো?’
—‘তা তো আমি বলতে পারব না বাপু। তবে খোঁজখবর করে জানতে হবে।’
এমন সময় খুবই নীচু দিয়ে উড়ে যায় একটা বোমারু বিমান। কী বিকট আওয়াজ তার। গ্রামে থাকতে কানাই উড়োজাহাজ দেখেছে। অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যেত সেগুলো। উড়োজাহাজ দেখলেই তারা বন্ধুরা মিলে দু-হাত তুলে চেঁচাত, কলাপাতা নাড়াত। ভাবত বুঝি বা যে লোকটা চালাচ্ছে, সে তাদের দেখতে পাবে। কিন্তু এত নীচু দিয়ে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজ সে আগে কখনো দেখেনি। তাই চলন্ত গাড়িতেই দাঁড়িয়ে উঠে সেটার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে চিৎকার করে সে। কিন্তু উড়োজাহাজটা তাকে পাত্তা না দিয়েই উড়ে চলে যায়। তার রকমসকম দেখে রজনী মিটিমিটি হাসে। মনে মনে ভাবে— কানাইয়ের এই সরলতাকে কখনোই কুটিল হতে দেবে না সে। একসময় সে নিজেও তো এইরকমই সরল ছিল; কিন্তু সময় আর পারিপার্শ্বিকতা তার জীবনকে আজ জটিল করে তুলেছে। হয়তো এইরকমই হয় সবার।
গাড়ি এসে থামে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উত্তর দিকের গেটের সামনে। সেখান থেকে বাদামভাজা কিনে নিয়ে খেতে খেতে তারা পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। গেটের দু-দিকে দুটো সিংহ থাবা পেতে বসে। আরও খানিক এগিয়ে গেলেই একটা সিঁড়িওয়ালা বেদির ওপরে ধাতুর গড়া এক মহিলার মূর্তি। তবে সিংহাসনে বসা।
কানাই জিজ্ঞেস করে— ‘এটা কে গো স্যার?’
—‘ইনি হলেন রানি ভিক্টোরিয়া।’
—‘ও, বুঝেছি, ইংল্যান্ডের রানি। বইতে পড়েছি।’
—‘হ্যাঁ, এনারই রাজত্বের মধ্যে পড়ি আমরাও। আমরা ব্রিটিশদের কাছে পরাধীন। তাই আমরা চাইছি স্বাধীনতা।’
—‘স্বাধীনতা কী স্যার?’
—‘সেটা তুই বড়ো হলে হয়তো বুঝবি। তবে আমিও ঠিক জানি না স্বাধীনতা আসলে কী?’
—‘তাইজন্যেই বুঝি যুদ্ধ হচ্ছে?’
—‘না, এই যুদ্ধটা শুধু আমাদের স্বাধীনতার জন্যে নয়। এই যুদ্ধটা হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এটা বিশ্বযুদ্ধ।’
—‘তা যুদ্ধ হচ্ছে কেন?’
—‘দেশে দেশে শত্রুতা আছে বলে।’
কানাই চুপ করে যায়। এইসব ব্যাপার স্যাপার তার মাথায় ঢোকে না। তাই বাদামভাজা খেতে খেতে তারা এগিয়ে চলে। সামনে এবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। তার খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তারা।
বাদাম খেতে গিয়েও থমকে যায় কানাই। বলে— ‘স্যার, বইতে লিখেছে যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নাকি শ্বেতপাথরের তৈরি। কিন্তু এ তো দেখছি কালো পাথরের।’
—‘বইতে ঠিকই লিখেছে। আসলে এটা সাদা পাথরেরই তৈরি। কিন্তু রাত্তিরে যাতে শত্রুদের এরোপ্লেন এটাকে দেখতে না পায়, সেইজন্যেই কালো রং করা হয়েছে। সাদা থাকলে তো বোমা ফেলে দেবে, না। তাই শত্রুদের ধোঁকা দিতে কালো রং মাখাতে হয়েছে, বুঝলি?’
—‘স্যার সেনেদের পোড়োবাড়িতেও মনে হয় উড়োজাহাজ থেকেই বোমা ফেলা হয়েছিল। ওটারও কিন্তু রং ছিল সাদা। যুদ্ধের সময়েও কালো রং করেনি যে।’
মুখে বাদাম তুলতে গিয়েও একটু থমকে যায় রজনী। তারপর বলে—‘হবে হয়তো।’ তারপরেই সে তার অস্বস্তিকর অবস্থাটা কাটানোর জন্যে বলে— ‘জানিস কানাই, মাথার ওপরে ওই যে পরিটা দেখছিস, ওটা না হাওয়ার সাথে সাথে ঘোরে। যেদিক থেকে হাওয়া বয়, হাওয়ার ধাক্কায় পরির মুখও সেদিকে ঘুরে যায়।’
হাতের খালি ঠোঙাটা ফেলে দিয়ে কানাই হো-হো করে হেসে উঠে বলে— ‘বুঝেছি স্যার, ওটা হাওয়া-মোরগ।’
রেসকোর্সের দিকে হেলে পড়েছে সূর্য। একটু পরেই সন্ধে হয়ে যাবে। এটাই উপযুক্ত সময় ক্যাথিড্রালে যাওয়ার। তাই কানাইকে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে রজনী পৌঁছে যায় সেখানে। গেটে ঢুকতে ঢুকতে কানাই জিজ্ঞেস করে— ‘এটা কি গির্জা স্যার?’
—‘হ্যাঁ, তা বলতে পারিস।’
পায়ে পায়ে খানিক এগোতেই ডানদিকের ছোট্ট লনে নানান রকমের বড়ো বড়ো পুতুল সাজানো। সাজানো দেখে কানাইয়ের মনে হচ্ছে যে এর পেছনে মনে হয় কোনো গল্প আছে। লনের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে সে রজনীকে বলে— ‘এই বড়ো বড়ো পুতুলগুলো দিয়ে সাজানো হয়েছে কেন গো?’
—‘এইগুলো দিয়ে যিশুখ্রিস্টের জন্মের গল্প বলা হয়েছে। ওই দেখ বেথলেহেমের আস্তাবলে মায়ের কোলে ছোট্ট যিশু। পাশে বাবা জোসেফ দাঁড়িয়ে।’
—‘আর ওই তিনজন লোক? ওরা ওপরের দিকে তাকিয়ে কেন?’
—‘ওনারা হলেন পারস্য দেশের তিনজন জ্ঞানী মানুষ। ওঁদের ম্যাজাই বলা হয়। যিশুর জন্ম হলে ওঁরা আকাশে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল তারা দেখতে পান। সেই তারাকে অনুসরণ করে ওনারা পৌঁছে যান বেথলেহেমের সেই আস্তাবলে যেখানে যিশুর জন্ম হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে নানা দামি দামি উপহার দিয়ে তাঁরা হাঁটু গেড়ে বসে স্বাগত জানান মহান পুরুষ যিশুখ্রিস্টকে।’
এই গল্প আগে শোনেনি কানাই। স্যারের মুখে শুনে তার বড়ো ভালো লাগতে থাকে যিশুকে; আর সেইসঙ্গে একটা কষ্টও। এই মানুষটাকেই পরে ক্রুশকাঠে গেঁথে মারা হয়েছিল।
—‘চ, ভেতরে গিয়ে দেখি। আমিও আগে আসিনি। তোর জন্যেই এখানে আসা হল।’
দু-জনে গিয়ে ভেতরে ঢোকে। কোনো বিজলিবাতি নেই। চারিদিকে শুধুই মোমবাতির আলো। সেই আলোয় দেওয়ালের ওপরে লাগানো কাঁচে আঁকা রঙিন ছবি আর ফুলপাতার নকশা জ্বলজ্বল করছে। উঁচু সিলিং আর খিলান। নীচে মাঝখানে সরু পথ সোজা চলে গেছে দূরে বেদির দিকে। সেই পথের দু-ধারে সারি সারি কাঠের বেঞ্চ পাতা। বেদির পেছনে কাঁচের গায়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর রঙিন ছবি। বেদির ওপরে ব্রোঞ্জের মোমদানিতে জ্বলছে অনেক মোটা মোটা লম্বা মোমবাতি। আর ধূপের গন্ধের সাথে মিশে চারপাশে ছড়িয়ে আছে এক সুন্দর স্নিগ্ধ নীরবতা।
বিস্মিত রজনী আর তার শিষ্য কানাই। ভেতরে ঢুকতেই মনটা তাদের ভরে গেল শ্রদ্ধা মেশানো মুগ্ধতায়।
—‘এই বেঞ্চে বসে সবাই প্রার্থনা করে। আজ রাতে বারোটার সময়ে এখানে বিশেষ প্রার্থনাসভা বসবে। যিশুর জন্মদিন পালন করা হবে। তাঁর নামগান হবে। বাইবেল পড়ে শোনানো হবে। বুঝলি?’
একেই যুদ্ধের বাজার তার ওপরে গভীর রাতের প্রার্থনার এখনও অনেক দেরি। তাই লোকসমাগম তেমন নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাঁচ-সাতজন। রজনী কানাইকে নিয়ে এগিয়ে যায় একেবারে সামনে। একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে তারা দু-জনে। সামনে হাইবেঞ্চের মতো টেবিল। প্রতিটা বসার জায়গায় একটা করে ছোটো ছোটো বই রাখা। রজনী বলল— ‘ওগুলো বাইবেল।’ কানাই একটার পাতা উলটে-পালটে দেখে। ইংরাজিতে লেখা কীসব। বুঝতে পারে না সে।
বসার বেঞ্চের সামনে খুব নীচু গদিমোড়া পাদানীর মতো রাখা। ড্যানীবাবুর কাছে রজনী শুনেছে যে, ওগুলোর ওপরে নাকি হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতে হয়। তারা দু-জনে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে সেই শান্তিময় দেবগৃহে। কানাইয়ের মতো চঞ্চল ছেলেও চুপটি করে বসে আছে আজ যিশুর সামনে।
কতক্ষণ তারা যে সেইভাবে বসেছিল খেয়ালই নেই। একটু পরে কানাই তার স্যারের দিকে তাকাতেই দেখে যে তার স্যার চোখবুজে বসে আর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা।
সে প্রায় ফিসফিসানির মতো করে ডাকে— ‘স্যার’।
চোখ খোলে রজনী। জামার হাতা দিয়ে চোখ মোছে।
কানাই বলে— ‘তুমি কাঁদছিলে স্যার?’
ঈষৎ বিব্রত রজনী ম্লান হেসে বলে— ‘না রে। মনের কষ্ট আর পাপ ধুচ্ছিলাম।’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক ঠেলে। কানাইও বুঝতে পারে না তার স্যারের কথা।
—‘নে চ। এবারে বাড়ি ফিরতে হবে। কাল বরং তোকে পার্ক স্ট্রিটে নিয়ে যাব। সেখানে দেদার মজা।’
বেঞ্চের সারির মাঝের সরুপথ ধরে তারা ফিরতে থাকে। রজনীর পেছনে যেতে যেতে কানাই ভাবে— তার এই স্যারকে তো সে আগে কখনো দেখেনি। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে তার স্যারের। তাই তারও মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে যায়। ভারী মন নিয়েই সে নিঃশব্দে রজনীর পিছুপিছু চলতে থাকে।
তারা বাইরে আসতেই ক্যাথিড্রালের মাথার ওপর দিয়ে অন্ধকার আকাশের স্তব্ধতা ফুঁড়ে উড়ে যায় একটা যুদ্ধবিমান। তার গায়ে জ্বলছে লাল আর সবুজ আলো।
যুদ্ধ চলছে যে। যুদ্ধ চলছে ভেতরে, বাইরে। সর্বত্র…।
