১৯৪৪, জুলাই – মান্দালয়ের ব্যবসায়ী, জাপানি সেনা আর দিসপুরের টেলিগ্রাম
সাতসকালেই লিন আঙ আর জিং থ্যান দশটা খচ্চরের পিঠে বাঁধছে বস্তাগুলো। প্রতিটা খচ্চরের পিঠে চারটে করে বস্তা। তার কোনোটায় পোস্তদানা, কোনোটায় পথের রসদ, কোনোটায় কাঠের তৈরি সুন্দর কারুকাজ করা কাঠের মূর্তি আবার কোনোটায় বা সাবান। সঙ্গে জ্বালানি কাঠও আছে। বস্তাগুলো সব ওয়াটারপ্রুফ কাপড়ের তৈরি, কেন না এই পাহাড়ি পথে প্রায়ই বৃষ্টি হয়।
তারা ব্যবসায়ী। মালপত্র নিয়ে যাবে সেই সুদূর আসামের দিসপুরে। পাহাড়ের চড়াই-উতরাইয়ের শর্টকাট পথে গেলে হাতে অন্তত দুটো দিন বাঁচবে আর তাই গাড়ির ব্যবস্থা না করে এই খচ্চরের ব্যবস্থা। এই প্রাণীগুলো পাহাড়ি পথে দারুণ চলতে পারে। তা ছাড়া বৃষ্টি বা ঠান্ডাও এদের কাবু করতে পারে না।
এখান থেকে মানেওয়া দু-দিন আর সেখান থেকে তড়িঘড়ি চললেও কালেওয়া পৌঁছতে আরও দু-দিন। পথে পড়বে ইরাবতী নদী। সেখানে গাদা-বোটে তুলতে হবে খচ্চর সমেত মালপত্র। এইভাবে পাঁচ-ছটা বোট ভরতি হলে তবেই যাত্রীবাহী স্টিমারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে বোটগুলো। নদী পারাপার, মালপত্র নামানো, এসব করতে মোটামুটি সাত-আট ঘণ্টা লাগে।
সকালের স্টিমারে জুতে দিতে পারলে তারা দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাবে ওপারে। কিন্তু সময়ের অঙ্ক সবসময় নাও মিলতে পারে। নদীর ধারে জাপানি সেনা আর তারপরে ব্রিটিশ সেনার দল তাদের আটকাতে পারে। মালপত্র খুলে দেখতে পারে যে কোনো অস্ত্রশস্ত্র পাচার হচ্ছে কি না। যুদ্ধের বাজার যে। তাই সেনারা সদাসতর্ক। তার ওপরে আছে বোমারু বিমানের ভয়। তারা কখন কোথায় যে ভীমরুলের ঝাঁকের মতো উড়ে এসে বোমা ফেলে যাবে কে জানে।
তা এত বিপত্তি পেরিয়েও প্রথমে পৌঁছতে হবে ইম্ফলে। তারপরে আবার দীর্ঘ পথচলা, যতক্ষণ না তারা দিসপুরের বড়ো বাজারে পৌঁছোয়। নির্বিঘ্নে সেখানে পৌঁছতে পারলে তবেই দুটো পয়সার মুখ দেখবে। তাই ভোররাতে উঠে খচ্চরগুলোকে দানাপানি খাইয়ে দিয়েছে। এবার খানিকটা মোহিঙ্গা, শুয়োরের মাংস আর চা খেয়ে নিয়ে রওয়ানা দিলেই হয়।
জিং থ্যান তার লাল রেশমি দড়িতে বাঁধা ওহবোটা ঝুলিয়ে নিয়েছে কাঁধে। এই বাঁশিটা ভালোই বাজায় সে। রাখালরা যেমন গোরুর পালের পেছনে বাঁশি বাজাতে বাজাতে যায়, তেমনি জিং থ্যানও চলে খচ্চরের সারির পেছনে ওহবো বাজাতে বাজাতে। এই বাঁশির সুরে যেমন পথচলার কষ্ট লাঘব হয়, তেমনি দু-পাশের বনের মাংসাশি প্রাণীরাও পথ ছেড়ে দেয় তাদের চেয়েও বহুগুণে হিংস্র এক প্রাণীকে।
মানেওয়া থেকে কালেওয়া পৌঁছবার ঠিক মাইলখানেক আগে সন্ধের মুখোমুখি নামল বৃষ্টি। দুই ব্যবসায়ী চটপট দা দিয়ে বাঁশ কেটে একটা একদিকে ঢালু মাচার মতো বানাল। তার ওপরে আর ছাউনির নীচের মেঝেতে বিছিয়ে দিল বুনো গাছের ডাল। তারপর ওই ছাউনির নীচে আগুন জ্বালিয়ে সঙ্গে আনা শুকনো শুয়োরের মাংস পুড়িয়ে নিল তাতে। মগে করে বানাল চা।
খানিকপরে খাওয়া দাওয়া সেরে আগুনের তাতে জামাকাপড় শুকিয়ে পাতার বিছানায় শুয়ে পড়ল লিন আঙ আর পাশে বসে জিং থ্যান বাজাতে শুরু করল তার ওহবো। আজ একটা নতুন সুর এসেছে তার মনে। সেটাই সে বাজাচ্ছে অপূর্ব দক্ষতায় আর সেই সুর বৃষ্টিজলের সুরের সাথে মিশে ছড়িয়ে যাচ্ছে বনে আর পাহাড়ে। তারপর হারিয়ে যাচ্ছে দূরের ওই অন্ধকারে।
এইভাবেই পথ চলেছে দুই ব্যবসায়ী। মোটামুটি নির্বিঘ্নেই। কিন্তু বিপত্তিটা এল ইরাবতীর ঘাটে পৌঁছে। তাদের মালপত্র যে স্টিমারের সঙ্গে বাঁধা হয়েছে তাতে জাপানি সেনা ভরতি। তারাও ওপারে যাবে। আঙ আর থ্যানের মনে ভয়— এই বুঝি ওপারে নেমে তাদের মালপত্রের তল্লাশি শুরু করে দেবে জাপানি সেনারা। আর ওরা তল্লাশির নামে যা করে, তাকে অত্যাচারই বলা যায়। লণ্ডভণ্ড করে দেয় মালপত্র, ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় সব। কোনো পলকা জিনিস থাকলে তা ভেঙে যায়। তখন লোকসান। কিন্তু সেসব থোড়াই কেয়ার করে তারা।
ওপারে পৌঁছে নামতে শুরু করল সেনারা। ততক্ষণে আঙ আর থ্যানের খচ্চর ভরতি গাদা-বোটটাও ভিড়েছে পাড়ে। সেনারা নেমে সারি বেঁধে চলতে শুরু করতেই তাদের সঙ্গে খানিকটা তফাৎ রেখে চলতে শুরু করল আঙ আর থ্যান তাদের খচ্চরবাহিনী নিয়ে। তবে এর ফলে তাদের সুবিধেই হল। নদীর ঘাটে তল্লাশি চালায় যে সেনারা তারা বন্দুক তুলে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত এই নতুন আসা সেনার দলটাকে। ফলে আঙ আর থ্যান বিনা বাধায় পেরিয়ে গেল ইরাবতীর চেকপোস্টটা।
সেনার দলটা হনহনিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছে এই দুই বর্মী ব্যবসায়ীর খচ্চরবাহিনী। বেশ কয়েকঘণ্টা চলার পরে একটা জায়গা এল। নাম উখরুল। তার উত্তরমুখী রাস্তাটা চলে গেছে কোহিমার দিকে আর দক্ষিণমুখী পথটা ইম্ফলের দিকে। সেনারা উত্তরমুখী পথটা ধরলে আর আঙ ও থ্যান ধরল ইম্ফলের রাস্তা। কোহিমা দিয়ে গেলে একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছোনো যেত বটে; তবে সেখানে বড্ডো সেনাদের জ্বালাতন। তা ছাড়া দক্ষিণমুখী পথে আর একদিন একটু পা চালিয়ে হাঁটলেই তারা ঢুকে পড়বে আসাম প্রদেশে। দিসপুরে পৌঁছোনোর জন্যে এটা একটু ঘুরপথ হলেও এইপথে চেকপোস্টের সংখ্যা কম। আর যেগুলোও বা আছে, তাদের রামের পাঁইট কিংবা সিগারেটের প্যাকেট দিলেই ছেড়ে দেয় তারা।
এইভাবে খানিকটা চলার পরেই থামল তারা। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। তাই খচ্চরদের বেঁধে রেখে তাদের দানাপানি দিল। তারপরে পথের পাশে একটা পাথরের ছোটো গুহামতো দেখে সেখানেই আশ্রয় নিল রাতের মতো। সামনে জ্বালিয়ে রাখল আগুন, একটু ওমের জন্যে।
চলতে চলতে অবশেষে একদিন দিসপুর এল। বড়ো এলাকা। অনেক লোকজন আর দোকানপাট। এখানে লিন আঙ আর জিং থ্যানের বাঁধা খদ্দেররা আছে। তাই তারা আশ্রয় নিল একটা সরাইখানায়। তার সামনে খোলা জমি আছে খানিকটা। সেখানেই খচ্চরদের বেঁধে রেখে, তাদের দানাপানি দিয়ে লিন আঙ বেরল খদ্দেরদের সঙ্গে দেখা করে তাদের উপস্থিতির কথা জানান দিতে। সে অল্পসল্প হিন্দি আর ইংরাজি জানে, তাই খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধে হয় না তার। দেখা সাক্ষাৎ সেরে সে টেলিগ্রাফ অফিস থেকে দুটো টেলিগ্রাম করল। একটা রেঙ্গুনে আর একটা কলকাতায়।
