১৯৪৪, এপ্রিল – প্যালিএন্টোলজিস্ট ড্যানীবাবু, মিশরীয় মমি আর জাদুঘরের নিশি

১৯৪৪, এপ্রিল – প্যালিএন্টোলজিস্ট ড্যানীবাবু, মিশরীয় মমি আর জাদুঘরের নিশি

এভাবেই কখন যে বছর ঘুরে যায় কে জানে। এর মাঝে প্রায় প্রতিমাসেই রজনী দেখা করেছে সুবিমলের সঙ্গে। শেষমেশ একদিন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল। ফ্রেডরিক সায়েবের অফিসে সুবিমলের ফোন এল রজনীর নামে। পরেরদিন যেন সে অবশ্যই দেখা করে তার সাথে। তাই পরেরদিন ফ্রেডরিক সায়েবের অফিস থেকে হাফ-ছুটি নিয়ে সে সোজা গিয়ে দেখা করল সুবিমলের সঙ্গে। সুবিমল তাকে নিজের টেবিলে নিয়ে গিয়ে সামনের চেয়ারে বসিয়ে একগাল হেসে বললে— ‘তোর দিল্লি কা লাড্ডুর ব্যবস্থা হয়ে গেছে রে। ডেসপ্যাচের খাতায় অফিসিয়ালি লেখা হয়ে গেছে কিন্তু আমিই ডাকে পাঠাতে দিইনি পাছে তোর লাড্ডু রাস্তায় হারিয়ে যায় বা দেরি হয়ে যায়।’ তারপর নিজের ড্রয়ার থেকে একটা ব্রাউন রঙের লম্বা খাম বের করে রজনীর হাতে দেয়। রজনী খামটা খুলতেই বেরিয়ে আসে জাদুঘরের লেটারহেডে লেখা একটা চিঠি। তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। প্রথমে যেন তার বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। সুবিমলের দিকে তাকাতেই সে হেসে বললে— ‘ভালো করে পড়ে দেখ, মাস গেলে যা পাবি তাতে তোর ছেলেপুলেদের আর তোর লাড্ডুকে ভালোভাবে রাখতে পারবি কি না।’

ভালো করে চিঠিটা পড়ে দেখে রজনী। ফ্রেডরিক সায়েবের অফিসে সে এখন যা পায় তার প্রায় ডবল তার স্টার্টিং স্যালারি। এ ছাড়া প্রতিবছর ইনক্রিমেন্টও আছে। সাতদিনের মধ্যে জয়েন করতে হবে। খুব খুশি হয় সে।

মুখ দেখে তার মনের ভাব ভালোই বুঝতে পারে সুবিমল। বলে— ‘প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে আমায় ট্রিট না দিলে দেখবি মজা। তবে প্রথম ছ-মাস কিন্তু কামাই করা চলবে না ব্রাদার, ওটা প্রোবেশন পিরিয়ড। তাই বলি কী তুই বরং কলকাতায় একটা ঘরভাড়া নিয়ে থাক। রাস্তাঘাটে যা গণ্ডগোল হয় মাঝে মাঝে, কোনোদিন হয়তো দেখলি তুই চাঁপাডাঙা থেকে আসতেই পারলি না। তখন কিন্তু অ্যাটেনডেন্স খাতায় লাল ঢ্যাঁড়া পড়ে যাবে।’

—‘কিন্তু এই কলকাতার কোনো ভদ্রপাড়ায় একটু সস্তায় ঘর ভাড়া পাওয়া যায় কি না তা তো ঠিক জানি না।’

—‘সে তুই বললে আমি লোক লাগিয়ে কাছাকাছি অঞ্চলেই তোর থাকার একটা বন্দোবস্ত করে দিতে পারব বলে মনে হয়। বড়োজোর হপ্তাখানেক সময় লাগবে।’ তারপর একটুখানি কী যেন ভেবে সুবিমল বললে— ‘আচ্ছা, বউবাজার এলাকায় আমার এক আপন মেসোমশাই আর মাসিমা থাকে। দুই বুড়ো-বুড়ির সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয় বলে একতলাতেই থাকে। ওপরে খান চারেক ঘর আর বাথরুম আছে জানি। সব তালাবন্ধ পড়ে থাকে। দুই মেয়েই বিয়ে হয়ে চলে গেছে বিদেশে। তারা কখনো সখনো এদেশে এলে থাকে সেইসব ঘরে।… এই, এই, এই যে বাবা মুক্তো, বলি দু-কাপ চা দিয়ে যাও না এখানে।’ শেষ কথাটা ক্যান্টিন-বয় মুক্তোরামকে বলা।

তারপরে রজনীকে বলে— ‘হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম… ও হ্যাঁ, মেসোমশাইয়ের বাড়ি। তা মেসোকে বলে ওই দোতলায় তোকে যদি একটা ঘর আর বাথরুমের ব্যবস্থা করে দিই, তাহলে তোর কি খুব অসুবিধে হবে? ওখান থেকে তুই কিন্তু হেঁটেও অফিসে চলে আসতে পারবি।’

—‘হ্যাঁ, কিন্তু কলকাতা শহরের বাড়িভাড়ার আন্দাজ তো নেই আমার।’

—‘আরে মেসো একসময়ে কাস্টমসে কাজ করত। ভালোই কামিয়েছে এককালে। নাম পরিতোষ মিত্তির। তবে এমনিতে মানুষ ভালো। পয়সার খাঁই নেই। বাড়িতে একজন মাঝবয়সি চাকর আছে। কিন্তু তাকে দিয়ে কি আর সব কাজ হয়। সেজন্যেই ক-দিন আগে আমার কাছে দুঃখ করছিল যে মেয়েরা বিদেশে সেটেলড। তাই বাড়িতে একজন বিশ্বাসী, সমর্থ পুরুষমানুষ থাকলে ভালো হত। সে আপদে বিপদে ডাক্তার ডাকতে কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারত। তাই মনে হয়, আমি বললে তোর সেখানে একটা ঠাঁই হয়ে গেলেও হতে পারে। এখন তুই রাজি থাকিস তো বল। আমি তাহলে কথা বলে দেখি।’

রজনী একটু চুপ করে ছিল। আসলে সে ভাবছিল যে কলকাতায় থাকলে এখন থেকে শনিবারেই শুধু গ্রামে যেতে পারবে আর রবিবারেই শুধু ছেলেদের ট্রেনিং দিতে পারবে। কিন্তু কী আর করা যাবে। ছেলেদের ভালো রাখতে গেলে পয়সাটাও তো দরকার। তাই সুরেশ কাকাকে দিয়েই শনিবারটা ম্যানেজ করাতে হবে।

মুক্তোরাম টেবিলে দু-কাপ চা দিয়ে গেল। তাকে সুবিমল বললে— ‘এই যে বাবা মুক্তো, দেখে রাখো এই বাবুকে। নতুন জয়েন করছে। সোমবার থেকে ড্যানী সায়েবের অফিসে বসবে।’

মুক্তোরাম হাতজোড় করে রজনীকে বললে— ‘নোমোস্কার স্যার। আমি একানকার ক্যান্টিনে কাজ করি। নাম মুক্তোরাম বণিক।’

—‘নমস্কার।’

সুবিমল বললে— ‘আচ্ছা মুক্তো, এখন এসো। আমরা একটু কাজের কথা বলছিলাম।’

—‘আজ্ঞে স্যার।’ বলে মুক্তো চলে গেল।

—‘মুক্তো ভারি মজার মানুষ। পরে আলাপ হলে বুঝতে পারবি। তা হ্যাঁ, এবারে বল, বউবাজারে থাকতে তুই কি রাজি?’

—‘সেটা হলে তো ভালোই হয়।’

—‘তাহলে চল। চা টা খেয়ে নিয়ে সায়েবকে বলে বেরিয়ে পড়ি। বেলা থাকতে থাকতে কাজ শেষ করে নেওয়াই ভালো।’

.

একটা ট্যাক্সি ধরে বউবাজারের দিকে যেতে যেতে রজনী সুবিমলকে বললে—‘হ্যাঁরে, ড্যানী সায়েবের পুরো নাম কী? উনি বাংলা ভাষা জানেন?’

সুবিমল একটু আশ্চর্য হয়ে বললে— ‘বাংলা জানেন মানে? আরে উনি পুরোদস্তুর বাঙালি। নাম দীনেন্দ্রনাথ সোম। অবশ্য তুইই বা জানবি কী করে? তা আমাদের ডিরেক্টর সায়েবের উচ্চারণে উনি বনে গেছেন ড্যানী সায়েব। তবে ব্রাহ্ম। আর ওনাদের সোসাইটির ওপরমহলেও ভালোই যোগাযোগ আছে।’

—‘তা ওনার কাজটা কী?’

—‘উনি মিউজিয়মের প্যালিএন্টোলজিস্ট।’

এই শব্দটা রজনী আগে শোনেনি। তাই সে বললে— ‘প্যালিএন্টোলজিস্ট? তা সেটা আবার কী পোস্ট?’

—‘আরে, যারা ফসিল নিয়ে গবেষণা করে, তার সালতামামির হিসেব করে রেকর্ডে লিখে রাখে তাদের বলা হয় প্যালিএন্টোলজিস্ট।’

—‘তা সেখানে আমার কাজটা কী?’

—‘দেখ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার অনুযায়ী তোর ডেজিগনেশন টাইপিস্ট কাম ক্লার্ক হলেও সেখানে তোর কাজ হবে ড্যানীবাবুকে ল্যাবে তাঁর কাজে সাহায্য করা। আর উনি ফসিল স্টাডি করে যা যা লিখে দেবেন সেগুলোকে টাইপ করে ওনাকে আর ডিরেক্টর সায়েবকে দিয়ে সই করিয়ে রেকর্ডবুকে ঠিকঠাক রাখা।’

—‘বাঃ, মনে হচ্ছে বেশ ইন্টারেস্টিং কাজ।’

—‘হ্যাঁ, তা বলতে পারিস। তবে খাটুনি নেই তেমন আর ড্যানীবাবু হলেন এক কাজপাগল ভালোমানুষ। আর ওনাকে একটু তোয়াজ করে চলতে পারলে হয়তো ভারতের অনেক জায়গাই তোর ঘোরা হয়ে যাবে সরকারের পয়সায়।’

—‘তাহলে তো ওনাকে মাঝে মধ্যেই বাইরে যেতে হয়, না?’

—‘হ্যাঁ, তা মাঝে মধ্যে যেতে হয়। উনি অন্য শহরের কোনো সেমিনারে গেলে তখন এখানে তোর কোনো কাজ নেই। অফিসে আসবি-যাবি, চা খাবি, এর ওর টেবিলে গিয়ে গ্যাঁজাবি আর মওকা বুঝে টুক করে কেটে পড়বি। ওনার ডিপার্টমেন্টে স্বয়ং ডিরেক্টর সায়েবও খুব একটা মাথা গলান না। তবে অন্য কোথাও নতুন কোনো ফসিল পাওয়া গেলে তখন ওনার দলবলের সাথে তোকেও যেতে হবে। তখন কিন্তু দিন-রাত্তিরের তফাৎ থাকবে না। খালি কাজ আর কাজ।’

—‘বাঃ, বেশ ভালোই তো।’

ততক্ষণে গাড়ি বউবাজারে পৌঁছে গেছে।

সুবিমলের মেসো পরিতোষ মিত্র আর মাসিমা সুনয়না দেবী ভালোই মানুষ। হাবভাব দেখে মনে হল যে রজনীকে তঁদের ভালোই লেগেছে। ওঁদের কাজের লোক কেষ্টদা তালা খুলে দেখিয়ে দিল ঘর আর বাথরুম। ছাদের সিঁড়ির ঠিক পাশেই ঘরটা। রজনীর বেশ ভালোই লাগল ঘর আর পাড়ার পরিবেশও। বাড়ির সামনে দিয়েই চলে গেছে চওড়া রাস্তা আর ভাড়াও ন্যায্য। মাসিক পাঁচ টাকা। নতুন চাকরির দৌলতে সেটা দিতে রজনীর অসুবিধে হওয়ারই কথা নয়। তবু, অগ্রিম ভাড়া হিসেবে রজনী টাকাটা দিয়েই দিল। পরিতোষ বাবুও একটা নোটবুকে রজনীর নামে তা টুকে রাখলেন। ঘরের চাবিটাও ভদ্রলোক তুলে দিলেন রজনীর হাতে। সে ইচ্ছে হলে কাল থেকেই এসে থাকতে পারবে। তাকে ভাড়াটে হিসেবে পেয়ে কিছুটা যেন নিশ্চিন্ত মনে হল তাঁদের।

বাইরে বেরিয়ে সুবিমল বললে— ‘তাহলে দ্যাখ, সব ব্যবস্থাই হয়ে গেল একদিনেই। একেই বলে কপাল। আর তোর কপালটা বেশ ভালোই বলতে হবে।’

—‘হ্যাঁ, তা ঠিকই বলেছিস। একই দিনে চাকরি আর মাথা গোঁজার ঠাঁই, দুটোই হয়ে গেল।’

—‘ওরে, কার কখন ভালো সময় আসবে তা কি কেউ আগেভাগে বলতে পারে? সময় আমাদের চালায় আর আমরাও তার সাথে তাল মিলিয়ে চলি। যাকগে, অনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম তোকে। এখন বাড়ি যাই।’ একটা সিগারেট ধরায় সুবিমল।

—‘হ্যাঁরে, গাড়ি নিবি না?’

—‘ধ্যুস। সামনেই তো শিয়ালদা। এইটুকু রাস্তা হেঁটেই মেরে দেব। আচ্ছা চলি। এবার থেকে রোজই তো দেখা হবে। উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক।’

—‘সেম টু ইউ, ব্রাদার।’

সুবিমল এগিয়ে গেল শিয়ালদার দিকে। আর রজনী পা বাড়াল ওয়েলিংটন স্ট্রিটের দিকে। সেখানে পুরোনো জিনিস বিক্রির অনেক কটা দোকান আছে। ওখানে একবার ঢুঁ মারা দরকার।

.

জাদুঘরের কাজটা ভালোই লাগছে রজনীর। ড্যানীবাবু মানে দীনেন্দ্রনাথ সোম সত্যিই একজন সুভদ্র, কাজপাগল মানুষ। প্রথমদিনে উনি রজনীকান্তকে বললেন—‘আগে কোনোদিন মিউজিয়মে এসেছেন?’

—‘আজ্ঞে না স্যার। ডালহৌসি পাড়ায় কাজ করেছি অথচ এখানে আসার সময় হয়নি। তবে বাইরে থেকে দেখেছি।’

—‘তা আগে যখন এখানে আসতেই পারেননি, তখন বরং আজ ভালো করে ঘুরে দেখে নিন সব। কিছু গ্যালারি যদি বাকি থেকে যায়, তাহলে অন্যদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে দেখে নেবেন। আর হ্যাঁ, দুটোর সময় ক্যান্টিনে লাঞ্চ করে এসে দু-চারটে চিঠি একটু টাইপ করে দেবেন।’

—‘স্যার, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।’

—‘হ্যাঁ, বলুন না।’

—‘স্যার, আপনি আমাকে ‘‘আপনি’’ ‘‘আজ্ঞে’’ না করে যদি নাম ধরে ডাকেন…’

—‘ও, এই কথা? আচ্ছা ঠিক আছে যান…ইয়ে, মানে যাও। ঘুরে এসো।’

বিশাল বিশাল বারান্দা। ইয়া মোটা দেওয়াল। উঁচু কড়ি বরগার ছাদ। এখানে কেমন যেন নিজেকে খুব ছোট্টো লাগে। মনে হয় যেন কোনো রাজপ্রাসাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক নগণ্য মানুষ। চারিদিকে এক এক তলায় এক একটা বিষয়ের ওপরে গ্যালারি আর তার একদম নীচে, মাঝখানে ঘাসে ঢাকা সবুজ লন। তার রূপ খুলেছে বোগেনভেলিয়া, লাল মুসন্ডা আর ফারকেরিয়ার পাতায়। আজ দর্শক বেশ কমই বোধ হয়। আর হবে নাই বা কেন? একে আজ ছুটি ছাটার দিন নয়। তার ওপরে আছে মন্বন্তর, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস আর জাপানি বোমার ভয়। লোকে নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেরোচ্ছেই না।

একের পর এক গ্যালারি ঘুরে দেখছে রজনী। আর যত দেখছে ততোই অবাক হয়ে যাচ্ছে। এত সম্পদ বোধ হয় কোনো রাজাধিরাজের কাছেও থাকা সম্ভব নয়। না না, সোনাদানা বা মণিমাণিক্যের চাকচিক্য নয়, এখানে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ, যার দাম টাকায় মাপা সম্ভব নয়। হাজার হাজার, এমনকী লক্ষ লক্ষ বছরের পুরোনো জিনিস।

নাঃ, একদিনে সব দেখা কোনোমতেই সম্ভব নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় সুযোগ বের করে ধীরে ধীরে খুঁটিয়ে দেখতে হবে সব। সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। তাকে তো এখানে চাকরি করতে আসতেই হবে। তবে আজ তার ইচ্ছে হচ্ছে জাদুঘরের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ মমি দেখার। খুঁজে পেতে দেখল যে একটা ঘরের মাথায় লেখা ‘ইজিপ্সিয়ান গ্যালারি’। মমি তো মিশর দেশের জিনিস। তাহলে এখানেই হবে সেটা। কাঁচের দরজা খুলে ঢুকতেই সে বুঝল যে এটা অন্য কোনো গ্যালারির মতো বিশাল নয়, বরং এটাকে একটা বড়োসড়ো ঘরই বলা যেতে পারে।

মাঝখানে একটা টেবিল সমান উঁচু জায়গায় রাখা একটা কাঁচের বাক্স। তার ঠিক ওপরেই ঝুলছে একটা বাল্ব আর দেওয়ালের তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা মিশরের নানান ছোটো ছোটো মূর্তি। একটা দেওয়ালের গায়ে একটা পিরামিডের ছবি সাঁটানো। তার নীচে অনেক কিছু ইংরাজিতে লেখা। পড়তে হবে সেটা। আজ এই ঘরটাই খুঁটিয়ে দেখবে ভালো করে। তবে সবচেয়ে আগে দেখবে মিশরীয় মমি।

কাঁচের বাক্সের ওপরে ঝুঁকে পড়ে সে। বাক্সের ভেতরে একটা কফিনের মধ্যে সারা গায়ে মরচে রঙা কাপড় জড়ানো একটা শুকনো মানুষের শরীর। মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে। তাই ওই মানুষটার মুখের আদলে তৈরি একটা মুখোশ মমির বুকের ওপরে রাখা। সত্যি, কী আশ্চর্য জিনিস। কী করে মিশরীয়রা এইভাবে মমি তৈরি করত? মমির পাশে একটা দেওয়ালে মমি-বৃত্তান্ত লেখা। যত পড়ে ততোই অবাক হয় রজনী। এই মমিটা নাকি চার হাজার বছরের পুরোনো। আঠারোশো বিরাশি সালে এটা জাহাজে করে আনা হয় কলকাতায়। তারপরে বোম্বে থেকে এর সংস্কার করে আনিয়ে রাখা হয় এই মিউজিয়মে।

সেকালে যারা কোনো শবদেহকে মমি বানাত, তারা ওই শবের নাক বা মুখ দিয়ে শরীরের ভেতরের পচনশীল অংশগুলোকে বের করে আনত। তারপরে নানান রাসায়নিকের প্রয়োগ করে পরতে পরতে কাপড় জড়িয়ে তৈরি করত মমি। সত্যি কী বিচিত্র!

এরপরে রজনী এগিয়ে গেল দেওয়ালের তাকে রাখা একটা পাথরের মূর্তির দিকে; যার শরীরটা সিংহের আর মাথাটা মানুষের মতো। সে জানে এর নাম স্ফিংক্স। পাশের লেখা থেকে সে জানতে পারে যে গ্রিক পুরাণকথা বা নাটকে স্ফিংক্সের উল্লেখ থাকলেও তার রূপ ছিল অন্যরকম। আর মিশরীয় পুরাণকথায় যে স্ফিংক্সের উল্লেখ পাওয়া যায় তার চেহারা এইরকম।

সত্যি, পৃথিবীতে যে কত অদেখা, অজানা বিস্ময়কর জিনিস আছে তার ইয়ত্তা নেই। এখানে চাকরি পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতে থাকে সে। সেইসঙ্গে তার মনে হয়— একদিন তার গ্রামের ছেলেদের এনে দেখাতে হবে এই মিউজিয়ম। পুলিনকে সে আনতে পারবে কি না সন্দেহ আছে, তবে কানাইকে আর বাকিদের এটা দেখাতেই হবে। তবে তার আগে প্রথম মাসের মাইনেটা হোক।

বেশ একটা বিস্ময় আর ভালোলাগার ঘোরের মধ্যে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সে। আপনমনে হাঁটতে থাকে বারান্দা ধরে।

হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে বলে ওঠে— ‘আরে স্যার, আপনি একানে? সেই ককোন থেকে চা দেব বলে ঘুরচি। জিজ্ঞেস করতে ড্যানীবাবু বললেন যে আপনি নাকি গ্যালারি দেকতে বেরিয়েচেন। তা ভালোই করেচেন। কিন্তু আমি তো আপনাকে এদিক-ওদিক খুঁজে বেড়াচ্চি। তা স্যার, আপনি আপনার টেবিলে গিয়ে বসুন, আমি চা নিয়ে আসচি।’

ওঃ সত্যি, মুক্তোরাম একটা মুক্তোই বটে। চায়ের জন্যে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে মিউজিয়মে। সে তাই ঘরে গিয়ে বসে তার টেবিলে। কিন্তু ঘরে তো কেউ নেই? ড্যানীবাবু গেলেন কোথায়?

একটু পরেই ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে আসে মুক্তোরাম। সে মুক্তোকে জিজ্ঞেস করে—‘স্যার গেলেন কোথায় জানো?’ মুক্তো বলে— ‘কোথায় আর, হয় ফোসিল গ্যালারি নয়তো ল্যাবেটরিতে হবে।’ তারপরে এদিক ওদিক দেখে ফ্লাস্ক থেকে কাঁচের কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে— ‘পোথোম দিন। তাই আপনাকে ভয় দেকাতে চাই না স্যার। তবে এই বাড়িতে অনেক রহস্য গল্প আচে।… নিন স্যার, চা খান।’

প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও কৌতূহলী হয় রজনী। সত্যিই বাড়িটাকে দেখলে, তার গ্যালারি দেখলে বেশ রহস্যময় লাগে এই বাড়িটাকে। সে বলে— ‘রহস্য? কীসের রহস্য?’

—না স্যার, পোথোম দিনেই রহস্যের কতা শোনালে হয়তো আপনি ভয়ে চাকরিটাই ছেড়ে দেবেন। তাই আগে ক-দিন ধাতস্ত হয়ে নিন, তারপরে না হয় শোনাব একদিন।’

কৌতূহলী হয় রজনী। শুনতে ইচ্ছে হয় মুক্তোরামের রহস্য গল্প। আবার সেইসঙ্গে মনে হয়, রেকমেন্ডেশনের জোরে সে চাকরিতে ঢুকেছে বলেই হয়তো মুক্তোরাম তাকে ভয় দেখিয়ে চাকরিটা ছাড়াতে চায়। হয়তো তার কোনো ক্যান্ডিডেট ছিল এই পোস্টটার জন্যে যে বঞ্চিত হয়েছে। যাইহোক, সে মুক্তোকে বলে— ‘আহা, বলোই না শুনি। অত সহজে ভয় পাই না আমি। নাও বল।’

মুক্তো এবার গলা নামিয়ে বলে— ‘এ বাড়িতে ভূত আচে স্যার। রাত্তির বেলা বেরোয়।’

—‘তাই নাকি? তা তুমি দেখেছ?’

—‘না স্যার, আমি দেকিনি। তবে আমার ভাগ্নে দেকেচে।’

—‘তা সে কোথায়? ডাকোই না তাকে। সেইই তো ভালো করে বলতে পারবে ভূতের কথা।’

—‘ভাগ্নে স্যার একানের ক্যান্টিনের ক্যাজুয়াল ছিল। এখন একানকার চাকরি ছেড়ে অন্য কম্পানিতে পার্মেন্ট চাকরি পেয়ে চলে গ্যাচে। নইলে সেইই আপনাকে সব বলতো।’

—‘তা মুক্তো, তুমি তো ভূতের কথা শুনেছ তার কাছ থেকে। কেমন দেখতে সেটা? আর কী করে সে রাত্তিরে?’

ঘরের চারপাশ আরেকবার দেখে নিয়ে মুক্তোরাম বলে— ‘তাইলে বলি শুনুন।’

জমিয়ে গল্প শোনার জন্যে রজনী ইশারায় মুক্তোরামকে তার টেবিলের মুখোমুখি চেয়ারটা দেখিয়ে দেয়। ফ্লাস্কটা একপাশে সরিয়ে রেখে চেয়ারে বসে মুক্তোরাম টেবিলের ওপরে বেশ খানিকটা ঝুঁকে আসে।

রজনী চায়ে চুমুক দিলে পরে সে বলতে শুরু করে— ‘আমি আর ভাগ্নে তকোন একতলার ক্যান্টিনের মেজেতে পাশাপাশি দুটো ঘরে বিচানা পেতে শুতুম। তা একদিন নাকি সে হটাৎ বাতরুমে যেতে গিয়ে একতলার বারান্দা ধরে আমারই মতো এইরকম খাঁকি ডেরেস পরা একজনকে চ্যালাকাট হাতে হেঁটে যেতে দেকে। তাই দেখে ভাগ্নে তকোন ‘এ্যাই কে রে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। কিন্তু ভূতটা নাকি তার কতায় পাত্তা না দিয়ে ডিরেক্টর সায়েবের চেম্বারের সামনে গিয়ে তার দরজায় চ্যালাকাট দিয়ে দমাদ্দম পেটাতে শুরু করে। কিন্তু দরজা তো তালাবন্দ। খুলবে কী করে? আর কার এমন সাহস আচে যে তাকে আটকাবে? তবু ভূত ওই সায়েবের দরজায় দমাদ্দম করে কাটের বাড়ি আর লাথি মেরেই চলেচে আর গোঁ গোঁ করে অদ্ভুত একটা শব্দ করে চলেচে মুক থেকে।’ রজনী তারিয়ে তারিয়ে চায়ে চুমুক মারতে থাকে।

—‘তাই না দেখে আমার ভাগ্নে দৌড়ে বাতরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্দ করে দেয়। ও নাকি ওখানে আদঘণ্টার মতো নিজেকে আটকে রেখেচিল ভূতের হাত থেকে বাঁচতে। তারপর ভূতের দাপাদাপি থামলে সে কোনোরকমে বেইরে ঘরে এসে দেকে যে ভূতটার চ্যালাকাটটা তার বিচানার মশারির পাশে পড়ে আচে। ও যদি বিচানায় থাকত স্যার, তাইলে হয়তো সেদিন চ্যালাকাটের বাড়ি খেয়ে ভূতের হাতে ওর বেঘোরে পরানটা যেত। তাই বাকি রাত্তিরটা সে বিচানাপত্তর তুলে নিয়ে এসে আমার ঘরে শোয়। আমি এসবের কিচুই জানতুম না। ভাগ্নেই পরেরদিন সকালে এইসব কতা আমাকে বলে।’

—‘তারপর?’

—‘তারপরে আর কী। পরের দিনই ও ঠাঁই বদল করে। সারাদিন এখানে কাজকম্ম করত আর রাত্তিরে খাওয়া দাওয়া সেরেই পাশের আট কলেজে ওর বন্দুর কাচে শুতে চলে যেত।’

মুক্তোরাম একটু থামলে রজনী আবার চায়ে চুমুক দিয়ে বললে— ‘তা এটা কি রোজই ঘটে?’

—‘রোজ না হলেও, মাসে দু-একবার ঘটে বলেই তো মনে হয়।’

—‘কী করে বুঝলে?’

—‘আজ্ঞে স্যার। সকালে উটে কোনো কোনো দিন দেকতে পাই, কোনো কোনো দরজায় চ্যালাকাটের নতুন নতুন বাড়ির দাগ। দরজার বার্নিশ চটে গেচে। সেই নিয়ে ডিরেক্টর সায়েব চটে গিয়ে তো একবার সব দরজায় নতুন করে পালিশ করালে। কিন্তু আবার যে কে সেই। আবার সব দরজায় চ্যালাকাটের বাড়ির দাগ।’

—‘তা ডিরেক্টর সায়েব আর কিছু করেননি?’

—‘কি আর করবে বলুন। সিকিউরিটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করেচিলেন। তা ওই মিশিরজি বলেচিল যে সে নাকি মাজে মোদ্দে দু-একদিন ডাণ্ডা পেটানোর শব্দ শুনেচে। কিন্তু ভেতরে টওল দেবার সময় সে কোনোদিন কিচ্চু দেখতে পায়নি। সে ভেবেচে যে বাইরে তো একটা পাগল রোজই শুয়ে থাকে। সেইই হয়তো শব্দ করেচে।’

—‘কিন্তু ঘটনাটা তো ভেতরে ঘটে। মিশিরজি কি তাহলে ডিরেক্টর সায়েবকে মিথ্যে বলেছিল?’

—‘তা আর বলতে। ও ব্যাটা ভাংখোর। রাত্তিরে সব গ্যালারিতে তালা লাগানোর পরে বেটা ভাং চড়ায়। তারপরে ক্যান্টিনে খাওয়া সেরেই মেন গেটের একপাশে একটা আড়ালে খাটিয়া পেতে তার চারপায়ে রড গুঁজে তাতে মশারি খাটিয়ে নাক ডেকে ঘুম লাগায়। এদিকে সব চাবি থাকে তার বালিশের তলায়। তখন, কী বলব স্যার, ওর গায়ের ওপর দিয়ে মোষ দৌড়লেও ঘুম ভাঙবে না। এমনই কাল ঘুম তার।’

—‘আচ্ছা মুক্তোরাম, ভূত তোমায় কখনো চ্যালাকাঠ দিয়ে মারতে আসেনি?’

মুক্তোরাম চোখ বড়ো বড়ো করে বললে— ‘আসেনি আবার। বেশ কয়েকবার সে আমার বিচানার কাছে এসেচিল তা বুঝতে পেরেচি। তবে মশারি খাটানো চিল বলে বোধ হয় পরাণে মাত্তে পারেনি।’

—‘তা সে যে তোমায় মারতে এসেছিল, সেটা কী করে বুঝলে? তুমি কি জেগে ছিলে নাকি?’

—‘না স্যার। ঘুমোলে তো আমি একেবারে মড়া। তবে মাজে মোদ্দে সকালবেলা ঘুম ভাঙলে দেকি যে আমার বিচানার পাশে উনুন ধরানোর চ্যালাকাট পড়ে আচে।’

—‘তা সেটা কি এখনও হয়?’

—‘হয় স্যার। এইই তো হপ্তা তিনেক আগেই হয়েচিল। সেইজন্যেই তো বলচি যে এই বাড়িতে ভূত আচে স্যার।’

মুক্তোরামের গল্প শুনতে গিয়ে বাকি চা টাই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। তাই প্লেটটাকে দূরে ঠেলে রেখে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে রজনী বললে— ‘দিনের বেলা সে ভূত নিশ্চয়ই বেরোয় না। আর যা বুঝলাম, তাতে মনে হল ওই ভূত থেকে তোমার কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। থাকলে এতদিনে তোমার বেঁচে থাকাই দায় হত। তাই না মুক্তোরাম?’

—‘তা আপনি বোদয় ঠিকই বলেচেন। যদি আমাকে মারারই হত, তবে কবেই ওই চ্যালাকাটের বাড়িতে আমার মাথা চৌচির করে দিত। মশারি টশারি কিচ্চুটি মানত না। তবে ওই ব্যাটা মিশিরজি কোনদিন না মরে ভূতের হাতে।’

—‘সেটা তার কপালে থাকলে হবে। কি আর করা যাবে। তা এবারে তাহলে এসো তুমি। আমার কিছু কাজ আছে।’ বলে সকালে কেনা খবরের কাগজটা ব্যাগ থেকে বের করে রজনী।

—‘হ্যাঁ স্যার’ বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেসিনে কাপ-প্লেট ধুয়ে কাবার্ডে রেখে ফ্লাস্কটা নিয়ে বেরিয়ে যায় মুক্তোরাম আর রজনীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটা শব্দ ‘সমন্যামবুলিজম্’(অর্থাৎ স্লিপ-ওয়াকিং)। তারপর নিজেকেই সে প্রশ্ন করে— আচ্ছা, একেই কি সাদা বাংলায় বলে ‘নিশির ডাক’? নাকি সেটা অন্য কিছু?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *