৮
সুদীপ্তরা যখন বাইরে বেরিয়ে এল তখন ভোরের আলো ফুটেছে। তারা দেখল ততক্ষণে হেলিকপ্টারের কাছে পৌঁছে গেছেন গুরুমূর্তি। তার বেশ কিছুটা তফাতে ধাবমান সেই লোমশ মানুষ। কপ্টারে পাইলট বসে ছিল। সে পরিস্থিতি বুঝে মাথার ওপরের পাখা ঘোরাতে শুরু করে দিয়েছে। সুদীপ্তরা তিনজনও ছুটল সে-দিকে। সেই লোমশ মানুষও গুরুমূর্তির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছিল। কিন্তু গুরুমূর্তিকে সে ধরার আগেই তিনি লাফ দিয়ে কপ্টারে উঠে বসলেন। সঙ্গে-সঙ্গে গোঁ-গোঁ শব্দে মাটি ছাড়ল আকাশযানটা। বাতাসের ঝাপটা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। টলমল করে উঠল সুদীপ্তদের পা। ভয় পেয়ে বা উত্তেজিত হয়ে গাছগুলোর মাথায় লাফালাফি শুরু করল ওরাংওটাং-এর দল। সুদীপ্তদের মাথায় মাত্র কয়েক হাত ওপর দিয়ে জঙ্গলের দিকে এগোল কপ্টারটা। তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় মুহূর্তের জন্য সুদীপ্ত দেখতে পেল গুরুমূর্তির মুখ। সে হাসছে নিচের দিকে তাকিয়ে।
জমি ছেড়ে জঙ্গলের প্রান্তসীমার গাছগুলোর মাথার ওপর দিয়ে ওপর দিকে উঠে যাচ্ছিল কপ্টারটা। হঠাৎ দুর্বোধ্য ভাষায় কী-একটা চিৎকার করে উঠল সেই লোমশ মানুষ। আর এরপরই একটা বিস্ময়কর কাণ্ড হল। কপ্টারটা গাছগুলোর মাথা প্রায় ছুঁয়ে ওপরে উঠে যেতেই মুহূর্তে একটা ওরাংওটাং লাফ দিল কপ্টারটাকে লক্ষ্য করে। কপ্টারের নিচে ‘স্কি’ করার মতো ল্যান্ডিং-এর জায়গাটা ধরে ফেলল ওরাংওটাংটা। একটু ঝাঁকুনি খেল কপ্টারটা। কিন্তু ওরাংওটাংটাকে নিয়েই কপ্টারটা জঙ্গলের ওপর দিয়ে উঠতে লাগল আকাশের দিকে। কিছুটা ওপরে ওঠার পরই খসে পড়ল প্রাণীটা। আর ভারমুক্ত হয়ে কপ্টারটা হঠাৎই যেন ছিটকে আকাশের আরও ওপরে উঠে গেল। তারপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মাথার ওপর একটা ডিগবাজি খেয়ে তিরের মতো নিচে নেমে এসে হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে দূরের জঙ্গলে। বিস্ফোরণের একটা শব্দও যেন ভেসে এল সুদীপ্তদের কানে। এ-দৃশ্যের আকস্মিকতায় কিছুটা হতচকিত হয়ে গেছিল সুদীপ্তরা। আকাশের দিক থেকে মাটির দিকে চোখ ফেরাতেই সুদীপ্তরা দেখতে পেল বাড়িটার চৌহদ্দি ছেড়ে সেই লোমশ মানুষ অদৃশ্য হয়ে গেল বনের ভিতর। ইতিমধ্যে রাবণ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বাঁ-কাঁধ থেকে রক্তের ধারা নেমেছে তার। পিস্তলের বুলেট বিঁধে আছে কাঁধে। তাই দেখে হেরম্যান সুদীপ্ত আর ফিলিপের উদ্দেশে বললেন, ‘ওর কাছে একজন থাক, ওর শুশ্রূষার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো ডাক্তার থাকলে নিয়ে যেতে হবে। আর একজন আমার সঙ্গে চল। লোমশ মানুষটা তো জঙ্গলে ঢুকল, তাকে খুঁজে বার করতে হবে।’
হেরম্যানের কথা শুনে রাবণ বলে উঠল, ‘আমিও যাব তোমাদের সঙ্গে। হেলিকপ্টারটা ভেঙে পড়েছে ঠিকই কিন্তু শয়তানটার পরিণতি আমার নিজের চোখে দেখা দরকার। ও দু-দুবার আমাকে মারতে গেছিল, কিন্তু পারল না।’
হেরম্যান বললেন, ‘কিন্তু গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তুমি সঙ্গে যাবে কীভাবে?’
রাবণ বলল, ‘পারব। শুধু বাড়ির ভিতর ঢুকে একটা ছুরি আর ব্যান্ডেজ বাঁধার কাপড় আন। তাড়াতাড়ি কর, দেরি হয়ে গেলে তোমরা হয়তো আর লোমশ মানুষকে খুঁজে পাবে না।’
কথাটা শুনে ফিলিপ ছুটল বাড়ির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে একটা ধারালো সরু ছুরি আর কাপড় নিয়ে হাজির হল। আমানুষিক ক্ষমতা, সাহস আর সহ্যশক্তি বটে রাবণের। ডান হাতে ছুরিটা ধরে মুহূর্তখানেক সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে ছুরির ছুঁচলো ফলাটা ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে একটা চাড় দিল। ফোয়ারার মতো রক্ত বেরিয়ে এল তার কাঁধ থেকে, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে বুলেটটা ঠিকরে বেরিয়ে মাটিতে পড়ল। একটা হাসি ফুটে উঠল রাবণের মুখে। সে বলল, ‘ব্যান্ডেজ বাঁধো।’
দ্রুত সে-কাজ শুরু করল সুদীপ্ত আর ফিলিপ। ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেলে রাবণ বলল, ‘চলো, এবার যাওয়া যাক।’ সুদীপ্তরা রওনা হল রবার বনের দিকে।
জঙ্গলের ভিতর বেশ কিছুটা এগোবার পর গাছের ফাঁক দিয়ে বেশ অনেকটা দূরে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী চোখে পড়ল সুদীপ্তদের। হেলিকপ্টারটা ওখানেই ভেঙে পড়েছে অনুমান করে সুদীপ্তরা এগোল সে-দিকেই। বেশ অনেকটা সময়ই লাগল সে-জায়গাতে পৌঁছতে। যাবার পথে রাবণ বলল, ‘এবার বলি, মাসখানেক আগে এক রাতে আমি কিন্তু একসঙ্গে দেখেছিলাম লোমশ মানুষ আর গুরুমূর্তিকে। ব্যাপারটা আমি দেখে ফেলেছি আন্দাজ করে পরদিন গুরুমূর্তি আড়াল থেকে গুলি চালিয়েছিল আমাকে লক্ষ্য করে। আর পরশু রাতে আমি গোডাউনের মধ্যে গুরুমূর্তি আর লোমশ মানুষকে ঢুকতে দেখেছিলাম। কথাগুলো আগে বললে তা হয়তো তোমরা বিশ্বাস করতে না।’
সুদীপ্ত বলল, ‘কিন্তু লোমশ মানুষটা কে? গুরুমূর্তির সঙ্গে ওর কীসের সম্পর্ক ছিল?’
হেরম্যান বললেন, ‘সেটা জানার জন্যই লোকটাকে খুঁজে বের করা দরকার। লোমশ হলেও ও যে একজন মানুষ সে ব্যাপারে তো আর কোনো সন্দেহ নেই।’
হেলিকপ্টারটা যেখানে পড়েছে সে-জায়গাতে পৌঁছল সুদীপ্তরা। বেশ বড়-বড় গাছ আছে এখানে। তারই একটা গাছের ওপর প্রথমে পড়ে, গাছটার ডালপালা ভেঙে নিয়ে মাটিতে আছড়ে আগুন ধরে গেছিল কপ্টারটাতে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কপ্টারের নানা যন্ত্রাংশ। আর অর্ধদগ্ধ কপ্টার থেকে বাইরে ঝুলছে একটা পোড়া দেহ। তবে সেটা গুরুমূর্তির নয়, হতভাগ্য পাইলটের দেহ। আশেপাশের গাছগুলোর মাথায় বেশ কিছু ওরাংওটাংও চোখে পড়ল তাদের।
হঠাৎ উলটোদিকে তাকিয়ে ফিলিপ বলে উঠলেন, ‘ওই তো সেই লোমশ মানুষটা ওখানে দাঁড়িয়ে!’
ফিলিপের দৃষ্টি অনুসরণ করে সুদীপ্তরা দেখতে পেল কিছুটা তফাতে গাছে ঘেরা ফাঁকা একটা ছোট জমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোমশ মানুষ। সে-ও সম্ভবত সুদীপ্তদের দেখতে পেল। সুদীপ্তরা এগোতে যাচ্ছিল তার দিকে, কিন্তু লোমশ মানুষটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তার কাছেই একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বীভৎস এক মূর্তি। সর্বাঙ্গ তার পুড়ে ঝলসে কালো হয়ে গেছে, ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে পোশাক, তবে তার হাতে সেই পিস্তলটা . তখনও ধরা। গাছের আড়াল থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে পিস্তল উঁচিয়ে সে লোমশ মানুষের
উদ্দেশে বলল, ‘আমি তো যাচ্ছি, চল, এবার তোকে সত্যিই সঙ্গে নিয়ে যাব।’
আকস্মিক গুরুমূর্তির এ-হেন আবির্ভাবে যেন একটু থতমত খেয়ে গেল সেই লোমশ মানুষ কিন্তু এর পরমুহূর্তেই গাছের মাথা থেকে লাফিয়ে নামল সেই পালের গোদা বিশালদেহী ওরাংওটাংটা। গুরুমূর্তির বন্দুকের নলের সামনে লোমশ মানুষকে আগলে বুক পেতে দাঁড়াল প্রাণীটা। কিন্তু গুরুমূর্তি থামলেন না। তিনি গুলি চালিয়ে দিলেন। বিকট একটা আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ল গুলিবিদ্ধ প্রাণীটা। গুরুমূর্তি এরপর গুলি ছুঁড়তে গেলেন অরক্ষিত লোমশ মানুষকে লক্ষ্য করে। কিন্তু ট্রিগার টানার ‘খট্’ শব্দ হল শুধু, গুলি বেরোল না। গুলি শেষ।
আর এরপরই এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যর সূচনা হল যা সুদীপ্ত বা হেরম্যান কেউই এর আগে এতগুলো অভিযানেও প্রত্যক্ষ করেনি। গাছের ওপর থেকে গুরুমূর্তির ওপর ঝাঁপাতে শুরু করল ওরাংওটাংগুলো। একটা-দুটো-পাঁচটা-দশটা…গুরুমূর্তি মাটিতে পড়ে গেলেন। আর তাকে আঁচড়েকামড়ে ফালা ফালা করতে লাগল ওরাংওটাং-এর দল। নিষ্প্রাণ হয়ে গেল গুরুমূর্তির দেহ। কিন্তু তাতেও প্রাণীগুলোর আক্রোশ মিটল না। গুরুমূর্তির ছিন্নভিন্ন দেহটার পা ধরে টেনে নিয়ে কয়েকটা ওরাংওটাং একটা গাছে উঠতে শুরু করল। গাছটার মাথায় প্রথমে দেহটাকে নিয়ে উঠল তারা। তারপর হাত পা ধরে মৃতদেহটাকে দুলিয়ে ছুড়ে দিল অন্য গাছের মাথায়। সেখানে আটকে গেল দেহটা। তারপর দেহটা নিয়ে অন্য একটা গাছের মাথায় ছুড়ে দেওয়া হল। এভাবে এক গাছ থেকে আর এক গাছের মাথায় ওরাংওটাংগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে গুরুমূর্তির দেহ নিয়ে ছোড়াছুড়ি করতে লাগল। বীভৎস এক দৃশ্য! তারপর একসময় সে দেহটা বিরাট একটা গাছের মগডালে উঠিয়ে নিয়ে সেখান থেকে নিচে ছুড়ে ফেলল। মাটিতে শব্দ তুলে আছড়ে পড়ল গুরুমূর্তির ছিন্নভিন্ন দলা পাকানো দেহটা। একসঙ্গে বিকট বিজয় উল্লাস করে উঠল ওরাংওটাংগুলো। তারপর গাছ বেয়ে দ্রুত নিচে নামতে লাগল।
কখন যেন পায়ে-পায়ে নিজেদের অজান্তেই ফাঁকা জমিটার মধ্যে পৌঁছে গেছিল সুদীপ্তরা। তাদের কয়েক হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোমশ মানুষ। সুদীপ্তরা এই প্রথম দিনের আলোতে ভালো করে দেখল তাকে। মানুষেরই অবয়ব, কিন্তু তার মুখ, সারা দেহ লম্বা লম্বা লোমে ঢাকা ঠিক শিম্পাঞ্জি বা ওরাংওটাংদের মতোই। লোকটার কিছুটা তফাতে পড়ে আছে গুলিবিদ্ধ ওরাংওটাং-এর দেহটা।
অন্য ওরাংওটাংগুলো গাছ থেকে নেমেই বৃত্তাকার একটা বলয় রচনা করল সুদীপ্তদের আর লোমশ মানুষকে ঘিরে। চোখমুখে হিংস্রতা ফুটে আছে। কারও-কারও হাতেমুখে লেগে আছে গুরুমূর্তির রক্ত। যেন সুদীপ্তদের ছিঁড়ে ফেলার জন্য তাদের ওপর তখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে প্রাণীগুলো।
প্রাণীগুলোর দিকে প্রথমে তাকিয়ে ঠিক ওরাংওটাংদের মতোই অদ্ভুত শব্দ করে কী যেন বলল সেই লোমশ মানুষ। তার কথা শুনে সুদীপ্তদের আক্রমণ করতে গিয়েও যেন থেমে গেল প্রাণীগুলো। তারা এগোল মাটিতে পড়ে থাকা প্রাণীটার দিকে।
এরপর সেই লোমশ মানুষ সুদীপ্তর উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘তোমরা কারা? তোমরা কি আমাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছ?’
হেরম্যান জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এ-কথা ঠিকই আমরা রবারের বনের লোমশ মানুষকে খুঁজতে এসেছিলাম। কারণ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আশ্চর্য প্রাণীদের খুঁজে বেড়াই। কিন্তু তোমাকে ধরতে আসিনি। আর এখন ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, কারণ তোমার গায়ে লোম থাকলেও তুমিতো আসলে একজন মানুষ।’
লোমশ মানুষ বলল, ‘ডাক্তার আমাকে বলেছিল যে তোমরা আমাকে ধরতে অথবা মারতে এসেছ তাই তোমাদের কাল আমি গর্তে ফেলেছিলাম যাতে ডাক্তারের সঙ্গে নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারি। এখন বুঝতে পারছি শয়তানটা কৌশলে আমাকে দিয়ে তোমাদের মারতে চেয়েছিল।’
এরপর একটু থেমে সে জানতে চাইল, ‘তোমরা আমার পিছু ধাওয়া করে এলে কেন?’
সুদীপ্ত বলল, ‘এলাম আসল ব্যাপারটা জানতে। তুমি কে? কোথা থেকে এখানে এলে? তুমি এমন লোমওয়ালা মানুষ হলে কী করে, এসব জানার জন্য। কৌতূহল বলতে পার। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আমাদের নেই। থাকলে তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে রাবণ নিশ্চই গুলি খেত না।’
সুদীপ্তর কথা শুনে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল লোমশ মানুষ। ইতিমধ্যে সুদীপ্তর চারপাশ থেকে সরে গিয়ে মৃত ওরাংওটাংটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ওরাংওটাংগুলো। দলপতির মৃতদেহ ঘিরে মাথা নিচু করে ঠিক মানুষের মতোই যেন চাপা করুণ স্বরে বিলাপ করতে শুরু করেছে।’
কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে লোমশ মানুষ বলল, ‘শোন তবে। কথাগুলো তোমাদের জানিয়ে দিয়ে যাই।’
লোমশ মানুষ কথা শুরু করল, ‘আমি এমন লোমশ ছিলাম না। স্বাভাবিক একজন মানুষ ছিলাম। বলা যেতে পারে সুপুরুষই ছিলাম আর আমার সঙ্গিনী হান্নাও ছিল রূপসী কুয়ালালামপুরে এক রেস্তোরাঁয় আমরা টুরিস্টদের জন্য নৃত্য-গীত পরিবেশন করতাম। অনেকক্ষেত্রে হাতে-গায়ে-মুখে রঙ মাখতে হত আমাদের। আর তার থেকেই মনে হয় প্রথম বিপদের সূচনা হয়েছিল। কোনো একটা রঙে হয়তো কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো ছিল। তার ফলে আমাদের সারা শরীরে ঘা ফুটে উঠল। ঠিক এই সময় খবরের কাগজে ডাক্তার গুরুমূর্তির একটা বিজ্ঞাপন দেখি। তাতে লেখা ছিল তিনি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, কসমেটিক সার্জেন ইত্যাদি-ইত্যাদি আরও অনেককিছু। বিজ্ঞাপনটা দেখে আমি আর হান্না ছুটলাম তাঁর কাছে। তিনি আমাদের পরীক্ষা করে বললেন, তিনি এই চর্মরোগ সারিয়ে দেবেন। শুধু তা-ই নয়, আমাদের তিনি আরও সুন্দর করে দিতে পারেন কিছু হরমোহন চিকিৎসার মাধ্যমে। প্রথম অবস্থায় আমাদের চর্মরোগের চিকিৎসা শুরু করলেন তিনি এবং তা সেরেও গেল। ডাক্তারের প্রতি আমাদের বিশ্বাস জন্মাল। তার ফলে একটা সম্পর্কও গড়ে উঠল। এরপর তিনি সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হরমোহন চিকিৎসার কথা বললেন। আমরাও রাজি হলাম। কারণ, আমাদের পেশায় সৌন্দর্যের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিকিৎসা শুরু হল। ডাক্তার আমাদের বেশ কিছু হরমোহন ইঞ্জেকশন দিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। সেই ইঞ্জেকশনের প্রভাবে আমাদের শরীরে লোম গজাতে শুরু করল। প্রাথমিক অবস্থায় ডাক্তার বলল যে এ ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। দেহে হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের প্রভাবে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক হল না কিছুই। লোম বেড়েই চলল। ডাক্তার চিকিৎসার জন্য আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলল। কিন্তু তাতে সুবিধা হল না কিছুই। আমাদের আরও কিছু ইঞ্জেকশন দিল ঠিকই, কিন্তু লোম বেড়েই চলল। বনমানুষ, ওরাংওটাং শিম্পাঞ্জির মতো বড়-বড় লোম। সারা শরীর ঢেকে যেতে লাগল লোমে। আমাদের রেস্তোরাঁর কাজ বন্ধ হল। দিনেরবেলা বাইরে বেরোনোও বন্ধ হল। একদিন রাতে বাইরে বেরিয়ে আমরা একজন বাস ড্রাইভারের চোখে পড়ে গেলাম। তাই নিয়ে কাগজে লেখালিখি হল। এমনিতেই লোমশ মানুষের প্রবাদ প্রচলিত আছে এই মালয়দেশে। ঘটনাতে প্রমাদ গুনলেন ডাক্তার গুরুমূর্তি। হয়তো-বা এমনও হতে পারে যে তিনি ভয় পেয়ে ছিলেন এ-জন্য যে পাছে আমরা তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানাই বা আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করি। তিনি আমাদের বললেন যে এ-রোগ সারতে কিছুটা সময় লাগবে আর আমাদের কুয়ালালামপুরে থাকা সমীচীন নয়। ব্যাপারটা জানাজানি হলে ভবিষ্যতে আমাদের কাজের ক্ষতি হতে পারে। কাজেই তিনি আমাদের অন্যস্থানে নিয়ে যাবেন। শহরের থেকে দূরে কোনো নির্জন জায়গাতে। যেখানে তিনি আমাদের সুস্থ করে তুলে তারপর আবার ফিরিয়ে দেবেন। আমরা সে সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কাজেই আমরা রাজি হয়ে গেলাম তাঁর প্রস্তাবে। সে আমাদের নিয়ে এল এখানে…।’
এ-পর্যন্ত বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল লোমশ মানুষ। তারপর আবার বিষণ্ণভাবে বলতে শুরু করল, ‘এখানে এসে আমাদের প্রথম আশ্রয়স্থল হল এই পরিত্যক্ত গোডাউনটা। কিন্তু অসম্ভব দমবন্ধ করা পরিবেশ ওই বদ্ধ জায়গাটাতে। রাত হলে আমরা গোডাউন ছেড়ে এই বনে ঢুকতাম। কোনো কোনো সময় বনেই থেকে যেতাম দিনের বেলাতেও। ততদিনে আমাদের সারাদেহ ঢেকে গেছে গভীর লোমে। প্রায় তখন লোমশ মানুষ হয়ে গেছি আমরা। ডাক্তার বলেছিল আমরা ঠিক হয়ে যাব, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। এই বনেই একদিন ঘটনাচক্রে এই ওরাংওটাং দলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল আমাদের। যে কুয়ো বা গর্তে তোমরা পড়ে গেছিলে সেই গর্তেই ওদের একটা বাচ্চা পড়ে গেছিল। আমরা দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। সে ঘটনা আর আমাদের দু’জনের গায়ে তাদেরই মতো বড়-বড় লোমের জন্য তাদের সমগোত্রীয় ভেবেই হয়তো আমাদের বন্ধু ভেবে নিল তারা। আমরা একই সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। তাদের ভাষা, আচার-ব্যবহারও কিছুটা শিখলাম, আর তাদেরও কিছু শেখালাম মানুষের আচার-আচরণ। এ-ভাবে ক’টা বছর কেটে গেল। ডাক্তার আমাদের খালি বলতে লাগল যে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই হল না। গোলযোগ বাড়ল মাস-তিনেক আগে। ওরাংওটাং দলটার সঙ্গে আমরা থাকতে শুরু করেছিলাম, কুয়োটার ওপারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে। তোমরা সে-বনে যাওনি। কোনো ট্যাপাররাও ওদিকে যায় না। কিন্তু মাস তিনেক আগে বন ছেড়ে ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে বেশ কয়েকজন লোক আমাদের দেখে ফেলল। বন্ধ হয়ে গেল বাগানের কাজ। কারণ মালয়ের লোমশ মানুষের গল্পটা এদেশে কয়েকশো বছর ধরে প্রচলিত। যদিও কয়েক বছর আমি এ-বনে থাকলেও তার দেখা পাইনি। জীবনের বড় দুর্যোগটা নেমে এল মাস দেড়েক আগে। একটা লেপার্ডের কবল থেকে একটা ওরাংওটাংকে বাঁচাতে গিয়ে লেপার্ডটার থাবার আঘাতে মৃত্যু ঘটল হান্নার। মানুষ হিসাবে একা হয়ে গেলাম আমি। আবার আমি চেপে ধরলাম ডাক্তার গুরুমূর্তিকে। কখনও তাঁকে ভয় দেখিয়ে, কখনও-বা তাঁকে কাতর অনুরোধ করে বললাম যে আমাকে সভ্য জগতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুলতে। পরশু রাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল ওই গোডাউনে। ডাক্তার আমাকে বললেন যে গতরাতে আবার যেতে। তিনি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগে আমাকে তোমাদের জন্য একটা বন্দোবস্ত করতে হবে। কারণ তোমরা নাকি আমাকে ধরতে বা মারতে এসেছ। সেদিন শেষরাতে আমি তোমাদের ঘরে উঁকি দিয়েছিলাম। আর ভোরের আলো ফোটার পর আড়াল থেকে ওরাংওটাংগুলোকে নিয়ে অনুসরণ করলাম। তোমাদের গর্তের ফাঁদে ফেলে আমি হেলিকপ্টারটা দেখে ওরাংওটাংদের নিয়ে চলে গেলাম ডাক্তারের কাছে, সেই গোডাউনে। তারপরের ব্যাপার সবই তোমরা দেখেছ। কীভাবে শয়তানটা মারতে চাইল আমাকে।’ কথা শেষ করল লোমশ মানুষ। সুদীপ্তর যেন মনে হল লোমশ মানুষের চোখের কোনটা চিকচিক করছে। মাথা নিচু করল সে। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। হেরম্যান তারপর বললেন, ‘এমন একটা সন্দেহ আমারও হয়েছিল চিনা মেয়েটার কথা শুনে। সে বলেছিল তার দেখা লোমশ মানুষের পরনে একখণ্ড কাপড় ছিল। সভ্য মানুষ ছাড়া কেউ তো লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করবে না।’
লোমশ মানুষ বিষণ্ণভাবে বলল, ‘আমি একদিন সভ্য মানুষ ছিলাম এখন আর নেই। থাকতেও চাই না।’ এ-কথাগুলো বলে সে এগিয়ে গেল সেই যেখানে ওরাংওটাংটার মৃতদেহ পড়ে আছে সেখানে। সুদীপ্তরাও এগিয়ে গেল সেদিকে। দেহটাকে ঘিরে ছিল ওরাংওটাং-এর দল। সবাই তখন গাছ ছেড়ে জমায়েত হয়েছে সেখানে। পুরুষ-নারী-শিশু নানাবয়সি ওরাংওটাং। লোমশ মানুষ আর সুদীপ্তদের পথ করে দিল তারা দেহটার কাছে যাবার জন্য। দেহটার মাথার কাছে হাঁটু মুড়ে বসল লৈামশ মানুষ। তারপর পরম মমতায় মৃত প্রাণীটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। চারপাশে অদ্ভুত শব্দ করে কেঁদে চলেছে ওরাংওটাং-এর দল। সুদীপ্ত এবার স্পষ্ট দেখতে পেল জলের ধারা নামছে লোমশ মানুষের চোখ বেয়ে।
হেরম্যান একসময় তার উদ্দেশে বললেন, ‘উঠে পড়। আমরা তোমাকে সঙ্গে নিয়ে শহরে যাব। তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। হয়তো তুমি ঠিক হয়ে যাবে। চল এবার।’
লোমশ মানুষ উঠে দাঁড়াল ঠিকই। তারপর বলল, ‘না, আমি আর ফিরব না। যদি আমি ঠিক না হই? সারাজীবন মানুষের অনুকম্পা বিদ্রূপ নিয়ে জীবন কাটাতে হবে আমাকে। তাছাড়া আজ বুঝতে পারছি যে মানুষের চেয়ে ওই ওরাংওটাংরা ঢের ভালো। দেখছ, ওরা সঙ্গীর মৃত্যুতে কেমন কাঁদছে? কেমনভাবে আমার জীবন বাঁচাতে প্রাণ দিল এই প্রাণীটা? মানুষ ভালোবাসা জানে না। এরা জানে। বাকি জীবনটা এদের সঙ্গেই কাটাব আমি। তোমরা ফিরে যাও। আমি যাব না।’
সুদীপ্ত বলল, ‘তুমি একবার ভেবে দেখ ব্যাপারটা।’
লোমশ মানুষ বেশ দৃঢ়স্বরে বলল, ‘বললাম তো আমি যাব না। তোমাদের মানুষদের থেকে এই ওরাংওটাংরা অনেক ভালো।’
হেরম্যান এবার তাকে শেষ প্রশ্ন করলেন ‘তোমার নাম কী?’
লোমশ মানুষ জবাব দিল, ‘নাম তো সভ্য পৃথিবীর মানুষদের প্রয়োজন। আমার আর কোনো নামের প্রয়োজন নেই। ধরে নাও আমার নাম ‘মালয়ের লোমশ মানুষ’। বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল লোমশ মানুষের মুখে। ওরাংওটাং-এর দল এরপর তাদের দলপতির মৃতদেহটা তুলে নিয়ে এগোল জঙ্গলের গভীরে। লোমশ মানুষ সুদীপ্তদের উদ্দেশে বলল, ‘তোমরা সবাই ভালো থেকো। ঈশ্বর যেন কোনোদিন আমাকে নিয়ে যেমন পরিহাস করলেন তেমন না করেন তোমাদের সঙ্গে।’ এই বলে সে অনুসরণ করল শববাহী ওরাংওটাং-এর দলটাকে। স্থাণুর মতো নির্বাকভাবে দাঁড়িয়ে রইল সুদীপ্তরা। জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ওরাংওটাং-এর দলটা। তাদের পিছন-পিছন চোখের আড়ালে যাবার আগে পরনের কৌপিনের মতো বস্ত্রখণ্ডটা ছুড়ে ফেলল লোমশ মানুষ। যেন সভ্যতার সঙ্গে শেষ সম্পর্কটাও ছিন্ন করল সে ওই বস্ত্রখণ্ড খুলে ফেলে। তারপর মালয়ের রবার বনের গভীর থেকে আরও গভীরে সুদীপ্ত-হেরম্যানের, সারা পৃথিবীর চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল হতভাগ্য অভিশপ্ত এক মানুষ। মালয়ের লোমশ মানুষ।
