৪
তিনদিন জাহাজে কেটে গেল ধ্রুবর। বৈচিত্র্যহীন ক’টা দিন। চারপাশে শুধু ভারত মহাসাগরের অসীম জলরাশি। ডাঙার কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। মাঝে মাঝে শুধু দূর দিয়ে দু-একটা জাহাজ ভেসে যায়। কখনো ফ্রান্সিস ড্রেককে তারা দেখতে পেয়ে ওয়্যারলেসে তার সম্বন্ধে মামুলি কিছু খবর জানতে চায়, তার জবাব দেয় ধ্রুব। রেডিও রুমে কাজ বলতে শুধু এটুকুই। তবে এ ক’দিনে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের ম্যাঙ্গকি বলে সেই বন্ধুর বেশ কয়েকবার কল এসেছিল। লোকটার ফ্যাসফ্যাসে গলা। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলে। যতবার তার কল এসেছে। ক্যাপ্টেনকে খবর দিতেই ব্যস্ত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছেন তিনি। তবে তাদের কী কথাবার্তা হয় ধ্রুবর জানা নেই। ধ্রুবকে এ সময় রেডিও রুমের বাইরে থাকতে হয়। এটা ক্যাপ্টেনের অনুরোধ।
সারাদিন রেডিও রুমে কাটায় ধ্রুব। দিনের বেলা সমুদ্রের দিকে তাকানো যায় না। চোখ ঝলসে যায়। এ সময় হাল-সারেঙ, আর মাস্তলের ওপর একজন ছাড়া, ডেকে কোনো লোক থাকে না। প্রচণ্ড গরম। ধ্রুব বিয়ার্ডের অনুমতি নিয়ে একটা মোটা বই এনেছে লাইব্রেরি থেকে। জলদস্যু ফ্রান্সিস ড্রেকের জীবন কাহিনি। রেডিও রুমে দিনেরবেলা এ ক’দিন বইটা পড়ে সময় কাটিয়েছে সে। বিকেলবেলা সূর্য ডোবার সময় হলে অবশ্য পরিবেশ বদলে যায়। মৃদু-মন্দ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। নাবিকরা একজন-একজন করে খোল থেকে উঠে এসে ডেকে দাঁড়ায়। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে। তবে তারা ধ্রুবর সাথে কেউই বিশেষ কথা বলে না একমাত্র মার্লিন ছাড়া। সেও এ সময় ডেকে উঠে আসে। ধ্রুব তার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে। ইতিমধ্যে মার্লিনের সঙ্গে ধ্রুবর বেশ ভাব হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্ক আপনি থেকে তুমিতে পৌঁছেছে। পদমর্যাদায় ওপরে বলে প্রথমে ধ্রুবকে তুমি ডাকতে ইতস্তত করছিল মার্লিন। ধ্রুবর ধমকের পরে সেটা ঠিক হয়ে গেছে। একান্ত আলোচনায় সে এখন ধ্রুবকে তুমিই বলে ডাকে।
আসলে এ জাহাজে ধ্রুবর কথা বলার লোক বলতে তো একমাত্র মার্লিনই। সে নানারকম গল্প বলতে পারে। অবশ্য সে সবই জলদস্যু অথবা নাবিকদের গল্প। জলদস্যুদের লড়াইয়ের গল্প। নির্জন দ্বীপে ফেলে আসা অসহায় নাবিকদের গল্প, সমুদ্র তুফানের সঙ্গে পাঞ্জা কষার গল্প, আরও কত কিছু। সমুদ্র সম্বন্ধেও অনেক জ্ঞান তার। সে এর আগে কখনো সমুদ্রযাত্রা না করলেও নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে অতলান্তিকের কোথায় কত গভীরতা, প্রশান্ত মহাসাগরে কোথায় ডুবোপাহাড় অথবা আইসবার্গ আছে। বলতে পারে, কোন্ ঋতুতে কোন্ সাগরে টাইফুন বা টর্নেডো হয়। সবকিছু সে বলে ঝানু নাবিকের মতো। ধ্রুবর প্রাথমিকভাবে একটু সন্দেহ ছিল তার কথায়। ধ্রুবর নিজের সংগ্রহে কয়েকটা বই আছে। সমুদ্র সংক্রান্ত বই। ধ্রুব মিলিয়ে দেখেছে মার্লিনের কথা বর্ণে বর্ণে সত্যি। বই পড়ে সমুদ্র সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রভূত তথ্য সংগ্রহ করেছে ছেলেটা। আর তার সঙ্গে রয়েছে তার গল্প বলার আশ্চর্য ক্ষমতা। এ দুই কারণে মার্লিনের প্রতি অনুর হয়ে উঠেছে ধ্রুব।
সেদিন বিকেলে রেডিও রুমে বসে ছিল ধ্রুব। প্রায় পাঁচটা বাজে। তার ডিউটি শেষ হতে চলেছে। বাইরে সূর্যের তেজও কমে এসেছে। মান্নারা ডেকে উঠে আসতে শুরু করবে এবার। মার্লিনও উঠে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। ডেকে এককোণে রেলিং-এর ধারে চেয়ার পেতে গল্প করতে বসবে তারা দুজন। সে গল্প চলবে যতক্ষণ না চান উঠা শুরু করে। তারপর আর বলা যায় না। দিনে যেমন গরম, ঠিক তেমনই অন্ধকার নামলেই ভেজা বাতাস কাঁপন ধরিয়ে দেয় শরীরে।
ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁতে চলেছে। ধ্রুব ডেকে বেরোতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের সেই বন্ধুর গলা ভেসে এল যন্ত্রে। লোকটা ক্যালক্যাসে গলায় বলল, পনেরো মিনিট বাদে সে আবার যোগাযোগ করবে। বিয়ার্ড যেন সে সময় রেডিও কাম থাকেন। ধ্রুব যেন তাঁকে খবরটা দেয়।
ধ্রুবর এ দিনের মতো কাজ শেষ। রেডিও রুম থেকে বেরিয়ে ক্যাপ্টেনকে টা দিতে কেবিনে ঢুকল সে। বিয়ার্ড একটা টেবিলে ম্যাপ বিছিয়ে তার ওপর কাঁটা-কম্পানে কী একটা মাপ-জোক করছিলেন। ধ্রুব তাকে খবরটা দিল। তিনি বললেন, বাচ্ছি। তারপর ধ্রুব যখন তার কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে, ঠিক তখন বিন্নার্ড তাকে বললেন, ‘মার্লিনের সঙ্গে তো আপনার বেশ কথাবার্তা হয় দেখছি!’
ধ্রুব জবাব দিল, ‘আসলে, জাহাজে কথাবার্তা বলার তেমন লোক নেই তো, আপনিও ব্যস্ত থাকেন। ও নানারকম গল্প বলে, সেসব শুনি।’
বিয়ার্ড বললেন, ‘তা, ও আমার ব্যাপারে বা এ জাহাজের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলে না?’
ধ্রুব জবাব দিল, ‘না, তেমন কিছু বলেনি, কেন?’
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আসলে, নাবিকরা অনেক সময় আড়ালে ক্যাপ্টেনকে গালমন্দ করে। অন্য নাবিকদের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে ক্ষেপায়। তাই ক্যাপ্টেন হিসাবে আমাকে সবার খবর রাখতে হয়। ঠিক আছে, আপনি এখন বান।
ক্যাপ্টেনের ঘর থেকে বেরিয়ে ধ্রুব যখন ডেকে তাদের বসার জায়গাতে এল, ততক্ষণে মার্লিন এসে গেছে। তার কাঁধে বসা পাখিটাকে বাদাম খাওয়াচ্ছিল। পাখিটা একদিনে ধ্রুবর নাম জেনে গেছে। সে তাকে দেখে বলল, ‘ডুবো ডুবো’ তারপর ‘ক্যাপ্টেনের মুন্ডু কাট, মুণ্ডু কাট’ বলে উড়ে গেল অন্যদিকে।
ধ্রুব চেয়ারে বসে পাখিটার শেষ কথা শুনে হেসে ফেলে বলল, ‘পাখিটার জন্য ক্যাপ্টেন তোমাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে না দেয়! আমি ক্যাপ্টেনের ঘরে গেছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন তুমি ওঁর সম্বন্ধে আমাকে কিছু বলেছ কিনা? হয়তো ঐ মুন্ডুট কথাটার ব্যাপারে ও তোমাকে সন্দেহ করছে!’
মার্লিন ক্যাপ্টেনের ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘ও যে আমাকে সন্দেহ করে তা জানি। আর সম্ভবত তোমাকেও নজরে রেখেছে।
ধ্রুব আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘কেন? ভর সন্দেহ উদ্রেক করার মতো কোনো কাজ তো আমি করিনি!’
মার্লিন বলল, ‘আমি দুদিন খেয়াল করেছি আমার তোমার কথা বলার সময় তোমার পিছনে একটু দুরে ওই যে পিপেটা রাখা আছে তার ওপরে এসে মেট ফক্স বসেছিল। ভাবটা এমন ও যেন পিপের ওপর বসে সমুদ্র দেখছে। আসলে ও আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছিল। এ জাহাজে আমি তুমি ছাড়া সবাই ক্যাপ্টেনের নিজস্ব লোক বলতে যা বোঝায় তাই। আমাকে আর তোমাকেই শুধু বাইরে থেকে নেওয়া হয়েছে। জাহাজের অন্য নাবিকরাও আমার সাথে বিশেষ কথা বলে না। যেন কথা বললেই কোনো একটা ব্যাপার ফাঁস হয়ে যেতে পারে। সম্ভবত বিয়ার্ডের এ ব্যাপারে ওদের ওপর কোনো নিষেধ আছে।’
এ ব্যাপারটা শুনে মার্লিনের মুখে শোনা, আরও একটা নিষেধের ব্যাপার ধ্রুবর মনে পড়ে গেল। সে বলল, ‘ফাঁস হয়ে যাওয়ার মতো কোনো গোপন ব্যাপার জাহাজে আছে নাকি? তুমি যে সেদিন বলছিলে যে ব্ল্যাক প্যারটের সিন্দুক যে ঘরে আছে, সে ঘর সম্পর্কে আলোচনা করা ক্যাপ্টেনের নিষেধ। তার কী কারণ?’
উত্তর দেবার আগে মার্লিন একবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘বিশ্বাস করে কথাটা বলছি, ক্যাপ্টেনের কানে গেলে আমাকে জাহাজ থেকে ফেলে দেবে। ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথ বন্দর থেকে আটলান্টিক হয়ে কেপ অব গুড হোপ ছুঁয়ে আমরা এদিকে এসেছিলাম। পথে থেমেছিলাম, মাদ্রিদ, ডাকার, কেপটাউন, পোর্ট এলিজাবেথ, মোম্বাসা, তারপর মোগাদিসু হয়ে এডেন। সেনেগালের ডাকার বন্দর থেকে একটা আফ্রিকান ছেলেকে কেবিন বয়ের কাজে নিয়েছিলেন বিয়ার্ড। বেশ হাসিখুশি বছর কুড়ির ছেলে। নাম ছিল জন। একদিন এরকমই এক বিকালে মাল্লাদের সঙ্গে গল্প করার সময় সে বলে ফেলেছিল, ‘সিন্দুক ঘরে যে লোকটার ছবি রাখা আছে সেটা কী কুৎসিত! ঠিক যেন সাক্ষাৎ শয়তান। আমি হলে ও ছবি জলে ফেলে দিতাম।’ বেশ উচ্চস্বরেই হেসে হেসে কথাগুলো বলছিল ছেলেটা। বিয়ার্ড কখন ডেকে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল হয়নি কারও। কথাটা কানে যেতেই ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ছুটে এসে এমন লাথি কষালেন ছেলেটাকে যে ডেকে পড়ে কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল সে। ক্যাপ্টেন তারপর পিস্তল বার করে বললেন, যে ওকে তুলবে তাকে তিনি গুলি করে মারবেন! আর ও ঘর নিয়ে যে অলোচনা করবে তাকে জলে ফেলে দেবেন তিনি। পরদিন আর দেখা গেল না সেই হতভাগ্য ছেলেটাকে। জিজ্ঞেস করতে ফক্স হেসে বলল, রাতে নাকি তাকে অন্য জাহাজে তুলে তার নিজের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ ছেলেটার ওই অবস্থা দেখে সে রাত খোলের মধ্যে জেগেই কাটিয়েছিলাম আমি। হলফ করে বলতে পারি সে রাতে কোনো জাহাজ আমাদের গায়ে ভেড়েনি। তাহলে টের পেতাম।’
‘ছেলেটার কী হল?’
আমার ধারণা, ক্যাপ্টেনের লাথি খেয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছিল ছেলেটা। তারপর যা হয় তাই, ওকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল জলে। পরদিন দুটো হোয়াইট শার্ককে জাহাজের পিছু পিছু অনেক দূর পর্যন্ত আসতে দেখেছিলাম। জাহাজ থেকে ওরা কোনো খাবার পেলে, তার লোভে ওরকম পিছু নেয়।’
মার্লিনের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই তারা দেখল, ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। তবে তিনি ডেকে দাঁড়ালেন না। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে রেডিও রুমে গিয়ে ঢুকলেন। ধ্রুব খেয়াল করেছে ম্যাঙ্গকি বলে লোকটার কল এলে বেশ অনেকক্ষণ ধরে তার সঙ্গে কথা বলেন ক্যাপ্টেন। অনেক সময় তা ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়।
ডেকে ইতিমধ্যে দু-একজন করে আসতে শুরু করেছে। ক্যাপ্টেন রেডিও রুমে ঢুকে যাবার পর ধ্রুব চাপাস্বরে জানতে চাইল, ‘ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ছেলেটার কথা শুনে ওরকম মাথা গরম করে ফেলেছিলেন কেন? শুনেছি দীর্ঘদিন জলে ভেসে থাকলে কারও কারও সাময়িক মাথার গন্ডগোল হয়। সে রকম ব্যাপার কি?’
মার্লিন বলল, জাহাজের অনেকেই অবাক হয়েছিল এ ঘটনায়। তবে, আমি কিন্তু ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরেছি।’
‘কী ব্যাপার?’
মার্লিন গলা খাদে নামিয়ে বলল, আশাকরি তুমি ব্যাপারটা গোপন রাখবে। তোমাকে বিশ্বাস করছি বলে বলব। কিন্তু ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার জন্য তোমাকে একবার সেই সিন্দুক ঘরে যেতে হবে। বিয়ার্ড এখন রেডিও ঘর ছেড়ে চট করে বেরোবে না, আর মেট ফক্সকেও দেখলাম তার ঘরে ঘুমোচ্ছে। নাবিকরাও সব ডেকে থাকবে এখন। চলো এখন ও ঘরে যাই। এটাই সঠিক সময়, চট করে কেউ খেয়াল করবে না :
ধ্রুব রাজি হয়ে গেল। পাছে কেউ সন্দেহ করে তাই আগে উঠে নিচে নামল মার্লিন। তার একটু পরে ধ্রুব।
খোলের একদম নিচে এমনিতেই বেশ অন্ধকার। দু-একটা পোর্টহোলের ফাঁক গলে আলো আসে শুধু। সেই ঘরের ভিতর আগেই ঢুকে গেছিল মার্লিন। ধ্রুব ঘরে ঢুকে দেখল একটা বাতি নিয়ে সে ব্ল্যাক প্যারটের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে। ধ্রুব তার পাশে দাঁড়িয়ে ছবিটার দিকে তাকাল। সত্যি কী হিংস্র সেই মুখ! তার চোখ দুটো যেন শ্বাপদের মতো জ্বলছে। বেশিক্ষণ সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে অস্বস্তি হয়। মার্লিন চাপাস্বরে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছ?’
ধ্রুব বলল, ‘না।’
মার্লিন বাতিটা ধ্রুবর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা ছবির মুখের সামনে তুলে ধরো।’
কাজটা করল ধ্রুব। আলোকিত হয়ে উঠল বীভৎস সেই মুখটা। মার্লিন এবার মুখের ওপর তার হাতের আঙুলগুলো প্রজাপতির মতো মেলে ঢেকে দিল তার দাড়িটা। তারপর বলল, ‘এবার বুঝতে পারছ?’
কয়েক মুহূর্ত ছবির দিকে তাকিয়েই ধ্রুব বলে উঠল, ‘আশ্চর্য!’
মার্লিন বলল, ‘হ্যাঁ, দাড়ি বাদ দিলে ক্যাপ্টেনের চেহারা হুবহু ব্ল্যাক প্যারোটের মতো, অর্থাৎ এই ছবির মানুষটা ছিলেন ক্যাপ্টেনের পূর্বপুরুষ। এরই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে ক্যাপ্টেনের ধমনীতে। ব্যাপারটা যাতে কেউ চট করে ধরতে না পারে তাই ক্যাপ্টেন দাড়ি রাখেননি। দাড়ি না রাখলেও ‘বিয়ার্ড’ নামটা কিন্তু তিনি বহন করেন। তার পূর্বপুরুষ ব্ল্যাক প্যারোটকে তার সাদা দাড়ির জন্য কেউ কেউ ‘হোয়াইট বিয়ার্ড’ নামেও ডাকত। এবার নিশ্চয়ই বুঝেছ কেন ক্ষেপে গেছিল ক্যাপ্টেন। পূর্বপুরুষের ছবি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য সে সহ্য করতে পারেনি।’
এরপর সে বলল, ‘জানো মিটর, ক্যাপ্টেন এ ঘরে একলা এই ছবি আর সিন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনে কী বিড়বিড় করে। অনেকসময় ঘণ্টার পর ঘন্টা সে দাঁড়িয়ে থাকে এ ছবির সামনে। আমি দরজার ফুটো দিয়ে দেখেছি।’
মার্লিন এরপর বলল, ‘বইতে ব্ল্যাক প্যারোটের সম্বন্ধে কতটুকু পড়েছি তাতে প্রচণ্ড হিংস্র ছিল এ লোকটা। পোর্তুগিজ সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে ওর ডান হাত তলোয়ারের কোপে বাদ গেছিল তারপর সেটা পুষিয়ে নেবার জন্য ও এই মারাত্মক হুকসুদ্ধ খাপ পরত। এই হুকের সাহায্যে সে জাহাজের দড়ি বেয়ে তরতর করে মাস্তুলে উঠে যেত, তবে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহার। লড়াই করার সময় এই হুক বুকে বিঁধিয়ে জ্যান্ত মানুষের হৃৎপিণ্ড বাইরে বার করে আনত সে। ও সময় জাহাজিদের মধ্যে একটা চালু প্রবাদ ছিল যে, ‘সমুদ্র তুফানকে রোখা যায়, পারকাসনের গুলি বা দামাস্কাস তলোয়ারকে ঠেকানো যায়, কিন্তু ব্ল্যাক প্যারোটের হাতকে শয়তানও ভয় করে।’
ধ্রুব সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু দেখো এত খুন-খারাবি করে শেষপর্যন্ত কী হল! এ সিন্দুকের সম্পদ কিছুই ভোগ করতে পারল না। শয়তানদের শেষ পরিণতি কিন্তু এইরকমই হয়।
মার্কিন সিন্দুকের ডালাটা খুলল। সেই কালো পালকটা ছাড়া ভিতরে কিছু নেই। সিন্দুকটার দিকে চোখ রেখে মার্লিন এরপর কেমন যেন অদ্ভুত স্বরে বলল, ‘হয়তো এর ভিতরের জিনিসগুলো কোনো দিন খুঁজে পেলে ভালো কাজে লাগবে। যেন, এ সিন্দুকটা আমাকে খুব আকর্ষণ করে। বলতে গেলে এ সিন্দুক আর ছবিটা দেখেই এ জাহাজে চাকরি নিই আমি।’
ধ্রুব বলল, ‘তার মানে?’
মার্লিন তার হাত ধরে বলল, ‘তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছি। সব কথা বলব তোমাকে। তবে এখন নয়, কেউ চলে আসতে পারে। কাল বিকাল পাঁচটায় পাশের লাইব্রেরিতে এসো। আমি ও ঘরে থাকব।’
ঘর ছেড়ে এরপর বেরিয়ে এল দুজনে। ডেকে না উঠে মার্লিন চলে গেল তার ফোকসালে। আর ধ্রুব ওপরে উঠে তার কেবিনে গিয়ে ঢুকল। কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে খবর দিল, ‘ক্যাপ্টেন আপনাকে তার কেবিনে তলব করেছেন।’
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ধ্রুব পৌঁছে গেল ক্যাপ্টেনের কেবিনে। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড তাকে প্রথমে বললেন, ‘মার্লিন বা আপনি, কাউকে ডেকে পেলাম না, দুজনে নিচে গল্প করছিলেন নাকি?’
ধ্রুব কায়দা করে জবাব দিল, ‘আমি আমার কেবিনে এখন একলাই ছিলাম।’
বিয়ার্ড বললেন, ‘ও। আপনাকে কেন ডেকেছি সেটা এবার বলি। অনেকটা পথ আমরা মোগাদিসুর দিকে এসেছি। কাল সকালের মধ্যে আমরা আরও অনেকটা পথ পৌঁছে যাব। বলতে গেলে আমরা কাল যেখানে পৌঁছব সেখান থেকেই জলদস্যুদের আনাগোনা শুরু। যদিও মোগাদিসু আরও ক’দিনের পথ, তবে সোমালিয়া উপকূল আমাদের খুব কাছে। উপকূলকে ডানে রেখে সোমালিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে দিয়ে যাব আমরা। এ পথে কোনো সময় কোনো জাহাজ যদি আমাদের সম্বন্ধে জানতে চায় তাহলে বলবেন, জাহাজ ড্রাই ডকে যাচ্ছে মেরামতির জন্য। আর কেউ যদি জাহাজ থামাবার জন্য খবর পাঠায়, এমনকী কোনো ডুবন্ত জাহাজও যদি ‘এস.ও.এস’ পাঠায় তার কোনো উত্তর দেবার দরকার নেই। বন্দরে পৌঁছতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত। কিন্তু মাঝপথে জাহাজ থামবে না। সোনালিয়া দস্যুরা অনেকসময় নানারকম ফাঁদ পাতে। এ কথাগুলোই আপনাকে বলার জন্য ডেকেছিলাম। আপনি এবার যেতে পারেন।’
ক্যাপ্টেনের কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে ফিরে এল ধ্রুব।
