৯
বেশ কিছুক্ষণ মাটিতে মরার মতো চুপচাপ শুয়ে রইল দীপাঞ্জন। এক সময় যখন সে বুঝতে পারল যে লোকগুলো সব চলে গেছে তখন ধীরে-ধীরে চোখ মেলল সে। দরজার দিকে তাকিয়ে সে দেখল তার পাল্লাটা বন্ধ। বৃদ্ধ স্যামসন ছাড়া ঘরে আর কোনো লোক নেই। স্যামসনও মাটিতে মরার মতোই পড়ে আছেন। সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে আছেন তিনি। আশপাশে কেউ নেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর শরীরটাকে মোচড় দিয়ে কোনোরকমে উঠে বসল দীপাঞ্জন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই তার। পা-দুটো এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যে উঠে দাঁড়ানো অসম্ভব। হাতঘড়িটা দেখে দীপাঞ্জন বুঝতে পারল এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাইরে অন্ধকার নেমেছে। জুয়ান নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বসে-বসে সে ভাবতে লাগল কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় এই বন্দিদশা থেকে? সময় এগিয়ে চলল। হঠাৎ ঘরের বাইরে কাদের যেন পায়ের শব্দ কানে এল। সঙ্গে-সঙ্গে দীপাঞ্জন আগের মতো শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই দীপাঞ্জন বুঝতে পারল বেশ কয়েকজন ঘরে ঢুকেছে
‘দেখো ওদের জ্ঞান ফিরেছে কিনা?’—কণ্ঠস্বর শুনে লোকটাকে চিনতে পারল দীপাঞ্জন। সেই বেঁটে লোকটার গলা। আবার ফিরে এসেছে তারা।
নির্দেশ পাবার পর একটা পায়ের শব্দ এসে দীপাঞ্জনের সামনে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর একটা জোরালো লাথি এসে লাগল দীপাঞ্জনের কোমরে। সে আঘাতে দীপাঞ্জন এক পাশ থেকে অন্য পাশে কাত হয়ে গেল। কিন্তু সেই প্রচণ্ড আঘাতেও দীপাঞ্জন আগের মতোই কোনো শব্দ করল না বা চোখ খুলল না। দ্বিতীয় আঘাতটার জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল সে। কিন্তু পায়ের শব্দটা কিছুটা সরে গেল, তারপর ধুপ্ করে একটা শব্দ হল। তারপর একটা কণ্ঠস্বর বলল, ‘এ দুজন এখনও অজ্ঞান হয়ে আছে। এত জোরে লাথি কষালাম, জেগে থাকলে অন্তত একটা শব্দ করত।’
বামন লোকটার গলা আবার শোনা গেল, ‘এদের ব্যবস্থা ওপর থেকে ফিরে এসে করব। ওয়াহুয়া তুমি সুড়ঙ্গের মধ্যে পাহারাতে থাক। আমি মোচেকে নিয়ে ওপরে যাচ্ছি। বাক্স চলে এসেছে, অন্ধকারও নেমেছে। লোকগুলোকে বাক্সে পোরার ব্যবস্থা করি। এই ইন্ডিয়ানটাকে নিয়ে আমার ভাবার তেমন কিছু নেই। কিন্তু স্যামসন যদি জাগে তবে তার থেকে খবরটা বার করার একটা শেষ চেষ্টা করব। স্যামসন যদি কবরের অবস্থানটা সত্যি আমাদের বলে দেয় তবে কবরটা খুঁড়তে হবে। আর সে কাজে কোনোরকম বিঘ্ন যাতে না-ঘটে, আমরা যাতে নিরাপদে এ তল্লাট ছাড়তে পারি তার জন্য এই লোকগুলোকে বাক্সবন্দি করা প্রয়োজন। আমি ভেবে নিয়েছি, কবরের খোঁজ পাই না-পাই ওই লোকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যাব। কালো মানুষগুলোকে ছেড়ে দেব আফ্রিকার কোনো দুর্গম অঞ্চলে সিংহের খাবার হবার জন্য, আর সাদা মানুষদের আমার বানানো চিড়িয়াখানাতে পুরব।’
ওয়াহুয়া বলে লোকটা জবাব দিল, ‘আচ্ছা, আমি তবে সুড়ঙ্গের মধ্যেই রইলাম।’
পদশব্দগুলো এরপর মিলিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজার পাল্লা টেনে দেবার শব্দ কানে এল দীপাঞ্জনের।
সময় এগিয়ে চলল। চোখ বন্ধ অবস্থায় দীপাঞ্জন কান খাড়া করে বেশ অনেকক্ষণ ধরে শোনার চেষ্টা করল, ঘর বা ঘরের বাইরের সুড়ঙ্গ থেকে কোনো শব্দ আসছে কি না? তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। না, ঘরে কেউ নেই। বুড়ো স্যামসনও আগের মতোই নিথর। ওয়াহুয়া নামের সেই রেড ইন্ডিয়ান-সাজা লোকটা হয়তো বা ঠিক দরজার বাইরেই বসে আছে, কিন্তু তার কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দীপাঞ্জন ভাবতে লাগল, কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় এই ভয়ঙ্কর লোকগুলোর কবল থেকে? তার হাত-পা দুটোই বাঁধা। দীপাঞ্জন যে পালাবে অথবা লড়াই করবে ও লোকগুলোর সঙ্গে সে উপায়ও নেই। তবে কি নিতান্ত অসহায়ভাবে এ লোকগুলোর হাতে মরতে হবে? শেষ লড়াই একটা দেওয়া যাবে না?—এ কথাগুলো ভাবতে-ভাবতে শুয়ে থাকা অবস্থায় দু-পাশে উত্তেজিতভাবে মাথা ফেরাতে লাগল দীপাঞ্জন। হঠাৎ একটা জিনিস নজরে পড়ল তার। মশালটা নিভু-নিভু হয়ে এসেছে। আর মশাল থেকে একটুকরো কাপড় খসে পড়েছে মাটিতে। আর সেই কাপড়ের টুকরোটা পুড়ে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবার আগে ধিকি ধিকি জ্বলছে। সেই জ্বলন্ত কাপড়ের টুকরোটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎই একটা ভাবনা খেলে গেল দীপাঞ্জনের মাথায়। সে গড়িয়ে-গড়িয়ে এগিয়ে গেল দেওয়ালের গায়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গাটার কাছে, তারপর অতি কষ্টে উঠে বসল। ন্যাকড়ার আগুন প্রায় নিভে এসেছে তখন। দীপাঞ্জন এরপর তার দু-হাতের দড়ি-বাঁধা অংশটা সেই ন্যাকড়াটার ওপর রেখে ফুঁ দিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে আগুন আবার জীবন্ত হতে শুরু করল। কী অসহ্য তাপ দীপাঞ্জনের হাত দুটো যেন ঝলসে যাচ্ছে। কিন্তু এ ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় নেই। আর এরপরই দীপাঞ্জন যা চাইছিল তাই হল। দীপাঞ্জনের হাতে বাঁধা নাইলনের দড়িতে আগুন ধরে গেল, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে এক অসহনীয় যন্ত্রণাও দাঁতে দাঁত চেপে দীপাঞ্জন সহ্য করতে লাগল। এক সময় যেন মাংসপোড়া গন্ধও তার নাকে এসে লাগল। চামড়া পুড়তে শুরু করেছে নাকি? আর সহ্য করতে পারছে না দীপাঞ্জন। সে চাপ দিতে শুরু করল দড়িটার ওপর। কয়েকবার চেষ্টা করার পর অগ্নিদগ্ধ দড়িটা পট করে ছিঁড়ে গেল। এখন আর হাতের অবস্থা দেখার মতো পরিস্থিতি নেই দীপাঞ্জনের। হাতের বাঁধন খসে যাবার পরই দীপাঞ্জন পায়ের বাঁধন খুলে ফেলল। মুক্ত হয়ে গেল সে।
যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। সেই রেড ইন্ডিয়ান সাজা লোকটা হয়তো ঘরে ঢুকতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। স্যামসনকে যদি মুক্ত করা যায়, তার জ্ঞান ফেরানো যায়, তবে হয়তো তাকে নিয়ে অন্য কোনো পথে পালানো যেতে পারে। নিশ্চয়ই এ সুড়ঙ্গের গলিঘুঁজি জানা আছে তার। দীপাঞ্জন এই ভেবে স্যামসনের কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসে তার হাত-পা-এর বাঁধন খুলে ফেলল। দীপাঞ্জনের হাতের স্পর্শে সম্ভবত জ্ঞান ফিরে এল স্যামসনের। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মশালটা নিভে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল ঘর। আর এর ফলেই গন্ডগোলটা হল। স্যামসন, দীপাঞ্জনকে চিনতে না-পেরে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘মেরো না, মেরো না, দোহাই আমাকে মেরো না। আর এর পরই দীপাঞ্জনের মনে হল যে, সুড়ঙ্গ বেয়ে দূর থেকে একটা পায়ের শব্দ যেন ছুটে আসছে। দীপাঞ্জন বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে উঠে দরজার দিকে এগোল। একদম দরজার কাছে এগিয়ে এসেছে শব্দটা। দরজার একপাশে সরে দাঁড়াল দীপাঞ্জন। পাল্লা খুলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল রেড ইন্ডিয়ান সাজা লোকটা। অন্ধকার ঘরে ঢুকে চোখে কিছু দেখতে না পেয়ে থমকে গেল ওয়াহুয়া। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাল দীপাঞ্জন। আন্দাজ মতো লোকটার শরীর লক্ষ্য করে অন্ধকারে পিছন থেকে লাথি মারল দীপাঞ্জন। আর আচমকা সেই লাথির আঘাতে চিৎকার করে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল লোকটা। আর এই সুযোগে দীপাঞ্জন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। যেদিক দিয়ে সে ভিতরে ঢুকেছে সেদিকে এগোলে তার ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে তা মনে করে বিপরীত দিকে ছুটল দীপাঞ্জন। কোনোরকমে অন্ধকার সুড়ঙ্গ হাতড়ে ছোটার চেষ্টা করতে লাগল সে। আর এরপরই সে পিছনে পায়ের শব্দ শুনে বুঝতে পারল ওয়াহুয়াও ঘর থেকে বেরিয়ে তার পিছনে ছুটতে শুরু করেছে।
এগোতে-এগোতে এরপর হঠাৎই মাটিতে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে গেল দীপাঞ্জন। সামনে একটা সিঁড়ি। দীপাঞ্জন মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উঠতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। বেশ কিছুটা ওপরে ওঠার পর আবছা একটা আলো দেখতে পেল সে। রেড ইন্ডিয়ানের পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে মুখে। দীপাঞ্জন এবার দ্রুত এগোতে লাগল আলোক রেখা লক্ষ করে। সিঁড়ির মাথায় উঠে এল সে। সামনে একটা লোহার গরাদ। আর তার সঙ্গেই একটা পাতায় ছাওয়া ভেঙে পড়া কাঠের ঘর। বাইরের আলো সেই ঘরের মধ্যে এসে গরাদের দরজাতে পড়েছে। পুরানো গরাদের শিকগুলো জং ধরে খসে ফাঁক হয়ে গেছে। সেই শিক গলে দীপাঞ্জন প্রথমে ভাঙা ঘরটার ভিতর প্রবেশ করল, তারপর খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়াল। আরে সে যে এসে দাঁড়িয়েছে পরিখা ঘেরা জমিটার মাঝে, যেখানে বাস করত ইরিগেটরা! সুড়ঙ্গটা আসলে এদিকে এসে উপরে উঠে শেষ হয়েছে ইরিগেটদের ঘরের ভিতরে। সম্ভবত ও পথেই ইরিগেটদের এনে ছাড়া হত এই পরিখা-ঘেরা জায়গার ভিতরে।
ওয়াহুয়া নিশ্চয়ই এখনই ওপরে উঠে আসবে। তখন একমাত্র উপায় ছুটে গিয়ে পরিখাটা সাঁতরে পেরিয়ে ছোট প্রাচীরটার খাঁজ বেয়ে ওপরে ওঠা। জুয়ানরা নিশ্চয়ই প্রাচীরের ওপাশে কাছাকাছিই আছেন। দীপাঞ্জন সামনের ফাঁকা জমিটা পেরিয়ে ছুটল পরিখার দিকে। সে পরিখার কাছে পৌঁছে জলে নামার আগে শেষবারের জন্য পিছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল সুড়ঙ্গ দিয়ে ওপরে উঠে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে সেই ছদ্ম রেড ইন্ডিয়ান। তার হাতে ধরা বর্শার ফলাটা চাঁদের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে। চারপাশে তাকিয়ে দীপাঞ্জনকে খোঁজার চেষ্টা করছে সে। দীপাঞ্জন আর দেরি না-করে শ্যাওলা-ঘেরা পরিখাতে নেমে পড়ল। পরিখাটা বেশি গভীর নয়। দীপাঞ্জনের গলা পর্যন্ত ডুবল জলে। কিন্তু সে সাঁতরে প্রাচীরের দিকে এগোল না। প্রাচীর বেয়ে উঠতে গেলে নিশ্চয়ই চাঁদের আলোতে লোকটা তাকে দেখে ফেলবে। তারপর ছুটে এসে বর্শাবিদ্ধ করে ফেলবে তাকে। কাজেই পরিখার গা ঘেঁষে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু লোকটা মনে হয় অনুমান করল যে দীপাঞ্জন পরিখাতেই নেমেছে। সে ছুটে এসে দীপাঞ্জন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে জলের মধ্যে, তার হাত কুড়ি তফাতে পরিখার পাড়ে এসে দাঁড়াল। পরিখার দেওয়াল ঘেঁষে দীপাঞ্জন যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে চাঁদের আলো ঢুকছে না। রেড ইন্ডিয়ানের পোশাক পরা লোকটা পরিখার দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল জলতল কোথাও নড়ছে কিনা? কোথায় লুকিয়ে আছে দীপাঞ্জন
দীপাঞ্জন না-নড়লেও হঠাৎই কিছুটা তফাতে নড়ে উঠল জলতল। আর সেটা দেখামাত্রই সে জায়গাতে দীপাঞ্জন আছে ভেবে সঙ্গে-সঙ্গে পরিখাতে নেমে পড়ল লোকটা। তারপর বর্ণাটা উঁচিয়ে ধরে দীপাঞ্জনের বিপরীত দিকে এগোতে লাগল যেখানে জল নড়ে উঠেছিল সে জায়গার দিকে। জায়গাটার কাছাকাছি পৌঁছে ওয়াহুয়া থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘জল থেকে বেরিয়ে আয় নইলে বর্শা দিয়ে গাঁথব তোকে।’ সেখান থেকে কোনো জবাব এল না, শুধু সে জায়গার জলটা যেন একটু নড়ে উঠল। তাই দেখে ওয়াহুয়া বলে উঠল, তুই বেরোবি না? এবার তোর ভেসে ওঠার ব্যবস্থা করছি।’—এই বলে সত্যি সে বর্শাটা ছুড়ে মারল জায়গাটা লক্ষ্য করে। আর সত্যিই যেন বর্শাটা জলতলের ঠিক নিচে কিছুর সঙ্গে গেঁথে গেল! বর্শা-দণ্ডটা জেগে রইল জলতলের ওপর। ওয়াহুয়া তাকিয়ে রইল সেদিকে। আর কিছুটা তফাত থেকে দীপাঞ্জনও। মুহূর্ত খানেকের মধ্যেই দীপাঞ্জনের যেন মনে হল যে, জলের ওপর জেগে থাকা বর্শাদণ্ডটা যেন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওয়াহুয়ার দিকে। আর এরপরই ওয়াহুয়া হঠাৎই যেন পিছু ফিরে দ্রুত এগোতে লাগল পরিখা ছেড়ে পাড়ে ওঠার জন্য। চাঁদের আলোতে তার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট জেগে উঠেছে আতঙ্কের ভাব। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। পাড়ে ওঠার আগেই কে যেন পিছন থেকে ধরে ফেলল তাকে। আকাশ কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে উঠল ওয়াহুয়া। প্রচণ্ড এক ঝটাপটি শুরু হল জলের মধ্যে। কে যেন তাকে জলের মধ্যে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে, আর তার কবল থেকে মুক্ত হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওয়াহুয়া। আকাশে চাঁদের দিকে ছিটকে উঠছে জল। আর সেই জলের সঙ্গেই মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে লাফিয়ে ওঠা জিনিস দেখতে পেল দীপাঞ্জন। আর তারপরই সে নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য দ্রুত সাঁতরাতে শুরু করল দেওয়ালটার দিকে। তার গায়ে পৌঁছে দ্রুত পাথরের খাঁজ বেয়ে দেওয়ালের গায়ে উঠতে লাগল। দেওয়ালের মাথায় পৌঁছে সেটা ধরে সে যখন দেওয়ালটা টপকাতে যাচ্ছে ঠিক তখন তার ঝুলন্ত পায়ের ঠিক নীচেই খটাস করে একটা শব্দ হল। দীপাঞ্জন তাকিয়ে দেখল বিশাল একটা চোয়াল ধীরে-ধীরে ডুবে যাচ্ছে জলের ভিতর। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চোয়ালের বাইরে বেরিয়ে আসা দাঁতগুলো আর জলের বাইরে জেগে থাকা হিংস্র চোখ দুটো। জল থেকে মাথা তুলে প্রাণীটা চেষ্টা করছিল দীপাঞ্জনের ঝুলন্ত পা দুটো কামড়ে ধরার। কিন্তু এক চুলের জন্য ফসকে গেছে তার কামড়। এই খটাস করে শব্দটা প্রাণীটার চোয়াল বন্ধ করার শব্দ! আরও একটা কুমির! কুমির ছেড়ে রাখা আছে পরিখার মধ্যে। আজও প্রাণীগুলো অথবা তার বংশধররা পাহারা দিচ্ছে পরিখা। এ জন্যই ইরিগেটরা পরিখাতে নামত না।
দীপাঞ্জন তাকিয়ে রইল জলের দিকে। আর কয়েক মুহূর্ত জলের মধ্যে থাকলে তার যে কী অবস্থা হত তা ভেবে শিউরে উঠল দীপাঞ্জন। জলের মধ্যে ঝটাপটিটা থেমে গেল। শেষ হয়ে গেছে লোকটা। এবার ধীরে সুস্থে তার মাংস ছিঁড়ে খাবে কুমিরগুলো। শুধু জলের ওপর জেগে রইল প্রথম কুমিরটার পিঠে গাঁথা বর্শাদণ্ডের ফুট চারেক অংশ। জলের মধ্যে নড়তে লাগল সেটা। দীপাঞ্জন এর পর আর সেখানে না-দাঁড়িয়ে এগোতে যাচ্ছিল সামনের দিকে। কিন্তু দূর থেকে একজনকে চাঁদের আলোতে সেদিকে ছুটে আসতে দেখল দীপাঞ্জন। ইরিগেটের পোশাক পরা মোচে নামের সেই লোকটা। দীপাঞ্জনকে দেখতে পেয়ে গেছে সে। লোকটার হাতে ঝিলিক দিচ্ছে খড়্গটা। এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপাঞ্জন। প্রাচীরের এপাশে খাঁড়া হাতে ছুটে আসা মোচে আর ওপাশে প্রাচীরের নীচে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে হিংস্র কুমির। এবার কোন দিকে যাবে দীপাঞ্জন? পালাবার কোনো উপায় না-দেখে লাফ দিয়ে আবার প্রাচীরের উপর উঠে পড়ল দীপাঞ্জন। সরু প্রাচীর। পা রাখার শুধু জায়গা আছে তার মাথায়। প্রাচীরের কাছে এসে উপস্থিত হল মোচে। তারপর দীপাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার তোর মাথা নেব।’ এই বলে সেও লাফিয়ে উঠল প্রাচীরের ওপর। দুজনের মধ্যে হাত দশেকের ব্যবধান। খাঁড়াটা উঁচিয়ে ধরে সে এগোতে থাকল দীপাঞ্জনের দিকে। এবার পিছোতে শুরু করল দীপাঞ্জন। জলের মধ্যে পড়লেই তার মৃত্যু নিশ্চিত, আর মাটিতে না নামলে নির্ঘাত খড়্গগর আঘাত হানবে লোকটা। দীপাঞ্জন পিছু হটলেও দু-জনের মধ্যে ব্যবধান কমে আসতে লাগল। মোচে যে গতিতে এগোচ্ছে . সে গতিতে পিছু হটা সম্ভব নয় দীপাঞ্জনের। ব্যবধান ক্রমশ কমছে। দশ হাত থেকে আট হাত, সাত হাত, ছ-হাত, পাঁচ হাত…! এবার দীপাঞ্জন মোচের খড়গর নাগালে চলে আসবে। ব্যবধান কমে এল তিন হাতে। এক সময় ইরিগেটের পূর্বপুরুষরা নরমুণ্ড শিকার করত। মোচের ধমনীতে প্রবাহিত সেই আদিম রক্ত যেন জেগে উঠেছে। চাঁদের আলোতে এক ভয়ঙ্কর জান্তব অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তার মুখে, ঝিলিক দিচ্ছে তার হাতের অস্ত্র। মোচে একদম দীপাঞ্জনের সামনে চলে এল। তারপর হিংস্র হেসে সাপের মতো হিসহিস করে বলে উঠল, ‘নীচে দাঁড়িয়েই এক কোপে তোর দেহ কোমর থেকে দু-টুকরো করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু আমরা শুধু মাথা কাটি।’—এই বলে সে খড়্গগটা মাথার ওপর তুলল দীপাঞ্জনের মুন্ডু কাটার জন্য। দীপাঞ্জন বাঁচার একটা শেষ চেষ্টা করার জন্য লাফ দিল মাটির দিকে। মোচেও তার খড়্গটা চালাল তাকে লক্ষ্য করে। মোচের খড়্গটা দীপাঞ্জনের মাথার ওপরে এক গোছা চুল বাতাসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু আঘাতটা ঠিক জায়গাতে না-লাগাতে সরু প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘাতক টাল সামলাতে পারল না। সে পা ফসকে পড়ে গেল পরিখার ভিতর। মোচের ভাগ্যে কী হল তা দেখার জন্য দীপাঞ্জন আর পরিখার দিকে উঁকি দিল না। সে ছুটতে শুরু করল সামনের দিকে।
