কালোটিয়ার দ্বীপে – ৬

বিকেলবেলা নির্দিষ্ট সময় ডেকে বেরিয়ে এল ধ্রুব। কিন্তু মার্লিন কই? পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল মার্লিনের লাইব্রেরি রুমে অপেক্ষা করে থাকার কথা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল ধ্রুব, কিন্তু সে দেখল মার্লিন ওপরের দিকে আসছে। ধ্রুবকে দেখে সে বলল, ‘লাইব্রেরি রুমে বসে দরজা বন্ধ করলে কেউ সন্দেহ করতে পারে। তার চেয়ে বরং কেবিনে চলো তোমার। কেউ জিজ্ঞেস করল বলবে যে রোলিং-এ পা ব্যথা হয়েছে তোমার, আমাকে ঘরে ডেকে গা হাত-পা টেপাচ্ছিলে। জাহাজের অধস্তন নাবিকদের অনেক সময় এ কাজ করতে হয়।’

মার্লিনের কথামতো তাকে নিজের কেবিনে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে মুখোমুখি বসল দুজন।

মার্লিন প্রথমে বলল, ‘আজকের ঘটনাটা বেশ রোমাঞ্চকর তাই না? কিন্তু, ওরা হঠাৎ এভাবে তল্লাশি শুরু করল কেন? নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ঘটেছে সমুদ্রে।

ধ্রুব জবাব দিল, ‘হ্যাঁ। ওই অ্যাডমিরালের ছেলেকে অপহরণ করেছে সোমালি জলদস্যুরা। তারই খোঁজ চলছে।’

এরপর ধ্রুব এ ব্যাপারে প্রথম সেই ওয়ারলেসে মেসেজ আসা থেকে শুরু করে অ্যাডমিরালের সঙ্গে ধ্রুবর কথাবার্তা সবকিছু বলল মার্লিনকে।

মার্লিন শুনে বলল, ‘অ্যাডমিরালের সঙ্গে তোমার কথাবার্তা ক্যাপ্টেনকে বলার দরকার নেই। ওর আচরণ আমার বেশ সন্দেহজনক লেগেছে!’

‘কী রকম?’

মার্লিন বলল, ‘আমার ধারণা ওই জাহাজটা যে জলদস্যুর জাহাজ নয়, ডেস্ট্রয়ার বা অন্য ওই ধরনের কিছু তা বুঝতে পেরেছিল বিয়ার্ড। যে কোনো কারণেই হোক ওদের মুখোমুখি হতে চাইছিল না। আশ্চর্য ব্যাপার হল যে সোমালিয়ার জলসীমার দিকে জাহাজ নিয়ে পালাচ্ছিল কেন? সাধারণত জলদস্যুরা মাঝদরিয়া থেকে জাহাজ টেনে সোমালিয়ার জলসীমাতে নিয়ে যায়। যাতে অন্য দেশের জাহাজ পিছু নিলেও কিছু না করতে পারে। কারণ, ওই জলসীমা বিনা অনুমতিতে অন্য কোনো দেশের জাহাজ অতিক্রম করতে পারে না। সোমালি জলসীমায় ঢুকে গেলে জলদস্যুরা নিরাপদ। বিয়ার্ড যদি ডেস্ট্রয়ারকে জলদস্যুদের জাহাজ ভেবে থাকে, তাহলে তো তার উল্টোদিকে যাবার কথা। জলদস্যুরা যেদিকে জাহাজ তাড়িয়ে নিয়ে যায়, বিয়ার্ড সে দিকেই পালাচ্ছিল কেন?’

ধ্রুব বলল, ‘আমারও যেন কেমন মনে হচ্ছে এখন। আজ ভোরে ক্যাপ্টেনের ম্যাঙ্গকি বলে সেই বন্ধুর জরুরি ডাক এসেছিল। বিয়ার্ড যখন কথা বলছিলেন তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখ থেকে দুটো শব্দ শুনেছি। ‘হাইজ্যাক’আর ‘ডেস্ট্রয়ার’! আমার ধারণা ওই ম্যাঙ্গকি বলে লোকটার সাথে কোনো গোপন কথা আলোচনা করেন ক্যাপ্টেন। তার ডাক এলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন। আমাকে সে সময় রেডিও রুমে থাকতে দেন না তিনি।’

মার্লিন বলল, ‘পাছে তুমি ভয় পাও এই ভেবে আমি তোমাকে বলিনি, তোমার আগের রেডিও অপারেটরের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা কিন্তু বেশ সন্দেহজনক। যে রাতে সে নিখোঁজ হল, সেদিন বিকালেও আমি ওর সঙ্গে গল্প করেছি। বেশ হাসিখুশি ছিল লোকটা। তাহলে লোকটা কি ওয়ারলেসে এমন কোনো খবর শুনে ফেলেছিল। যাতে ভয় পেয়ে সে জাহাজ ছেড়ে পালাল? নাকি কোনো গোপন খবর জেনে যাওয়াতে বিয়ার্ডই তাকে…!’ মার্লিন কথাটা আর শেষ করল না।

ধ্রুব তার বক্তব্য ধরতে পেরে প্রথমে চমকে উঠল। তার পর মৃদু হেসে বলল, ‘কিন্তু ক্যাপ্টেনের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়ে তুমিই তো আমাকে এ চাকরিতে বহাল করালে।’

মার্লিন বলল, ‘বিশ্বাস করো, বিয়ার্ডের তোমাকে চাকরিতে বহাল করার অভিসন্ধি আমার জানা ছিল না। কাজটা ও আমার অগোচরে মেট ফক্সের সঙ্গে পরামর্শ করে করেছে। যে কারণে বিয়ার্ড যখন তোমাকে কাজের প্রস্তাব দিচ্ছিল তখন আগাগোড়া আমি চুপচাপই ছিলাম। তোমাকে মিউজিয়াম দেখাবার সময় ক্যাপ্টেন আমাকে অন্য প্রয়োজনে ওপরে ডেকে ছিল। কথা প্রসঙ্গে আমি কাকে মিউজিয়াম দেখাচ্ছি সে জানতে চাওয়ায় আমি তোমার পরিচয় দিয়েছিলাম মাত্র। ওর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার কোনো হাত ছিল না।’

এরপর একটু চুপ করে থেকে মার্লিন আবার তার কথার খেই ধরে বলল, ‘তবুও কিছুটা দায় আমাকে অবশ্যই নিতে হবে। তোমার পরিচয়টা তো আমিই বিয়ার্ডকে দিয়েছিলাম। এখন যদি তোমার কোনো ক্ষতি হয়….।’ মার্লিনের কণ্ঠস্বরে যেন একটা অপরাধবোধ ফুটে উঠল। বিষণ্ণ হয়ে উঠল তার মুখ।

সেটা কাটাবার জন্য ধ্রুব হেসে তার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘আমি জানি এ ব্যাপারে তোমার কোনো হাত নেই। ঘটনাচক্রে সব হয়েছে। আর কোনো বিপদ হলে তোমার মতো বন্ধু তো আছেই। তবে এতক্ষণ যে আলোচনা হল তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তোমার কিন্তু আমাকে আজ অন্য ব্যাপার জানাবার ছিল। তা হল, ব্ল্যাক প্যারোটের সিন্দুক দেখে কেন তুমি আকৃষ্ট হয়ে এ জাহাজে কাজ নিয়েছিলে?’

এবার একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল মার্লিনের মুখ। দরজার কাছে উঠে গিয়ে সেটা সত্যিই বন্ধ আছে কিনা তা ভালো করে একবার পরখ করে নিল সে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করল দরজার বাইরে কারও শব্দ শোনা যায় কিনা? তারপর কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে এসে ধ্রুবর মুখোমুখি বসে বলল, ‘একটা বাতি জ্বালাও। পোর্টহোলের আলো কমে আসছে। তার কথামতো টেবিলে রাখা তেলের বাতিটা ধ্রুব জ্বেলে দিল।

মার্লিন প্রথমে একটু চুপ করে থেকে ধ্রুবর চোখের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল, ‘তুমি গুপ্তধনের গল্পে বিশ্বাস করো?

ধ্রুব মৃদু হেসে বলল, ‘গল্পের বইতে এসব কাহিনি পড়েছি। কিন্তু রক্তমাংসের কোনো মানুষ পেয়েছে বলে জানা নেই।’

মার্লিন বলল, ‘আমি কিন্তু করি। তোমাকে এর আগে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুটো

জিনিসের কথা বলেছিলাম। রক্তে সমুদ্রের আহ্বান আর ওই ম্যাকাও পাখি। এবার আমি তোমাকে তৃতীয় জিনিসটা দেখাব।’ এই বলে মার্লিন তার টুপিটা প্রথমে খুলল। ধ্রুব দেখল মার্লিনের টুপির নিচে মাথার চাঁদির ওপর কালো রঙের একটা খাপ বসানো। কী ওটা? হেলমেট নাকি? মার্লিন এরপর বাটির মতো খাপটা মাথা থেকে খুলে ধ্রুবর দিকে এগিয়ে দিল।

ধ্রুব জিনিসটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল। খুব শক্ত সেটা। কিন্তু হালকা জিনিস। সে বলল, ‘এটা কী?’

মার্লিন জবাব দিল, ‘এটা একটা তিনশো বছরের প্রাচীন কচ্ছপের খোল।’

‘কচ্ছপের খোল!’

মার্লিন বলল, ‘হ্যাঁ, এটাও আমার ঠাকুরদা পেয়েছিলেন সেই বুড়ো জাহাজির কাছ থেকে। তারপর প্রথমে আমার ঠাকুরদা, তারপর আমার বাবা এর সাহায্যে ভাগ্য ফেরার আশায় সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন ভারত মহাসাগরে। তাঁরাও ঠিক আমার মতো টুপির নিচে মাথায় পরে বেরোতেন এটা। তুমি জিনিসটা এবার আলোর সামনে ভালো করে দেখো।’

ধ্রুব তার কথা মতো আলোর সামনে ধরতেই দেখতে পেল খোলের ওপর খোদাই করা আছে নানা রেখাচিত্র। মার্লিন এরপর খোলের ওপর তর্জনী দিয়ে দেখাতে দেখাতে বলল, ‘এটা আসলে একটা মানচিত্র। এই দেখো এটা হল আফ্রিকা উপকূল, এই হল এশিয়ার প্রান্ত ভাগ, আর এই হল আফ্রিকা উপকূলের বিপরীতে ভারত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত মাদাগাস্কার…।’ মার্লিনের কথা শুনে মানচিত্রতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে লাগল চোখের সামনে। আর এই দেখো মাদাগাস্কারের উত্তরে ভারত মহাসাগরের মধ্যে বসে আছে একটা পাখি। কালোটিয়া —ব্ল্যাক প্যারোটের প্রতীক। জায়গাটাতে একটা ক্রসচিহ্নও দেওয়া আছে। জায়গাটার পাশে ল্যাটিচিউড-লঙ্গিচিউড ও সম্ভবত লেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে যে ম্যাপটা এঁকেছিল, অথবা কেউ গোপনীয়তার জন্য জায়গাটা ঘসে নষ্ট করে দেয়। আমার ঠাকুরদা সেইবুড়ো জাহাজির কাছ থেকে এটা এ অবস্থাতেই পেয়েছিলেন। এবার তুমি খোলের ভিতরটা দেখো। নিজেই পড়তে পারবে—‘ মার্লিন এরপর বলল।

ধ্রুব এবার খোলের ভিতরটা আলোর কাছে মেলে ধরে দেখল। খুদে খুদে লেখাগুলো প্রথমে বুঝতে অসুবিধা হলেও শেষপর্যন্ত পড়তে পারল সে। কালোটিয়ার একটা ছবি। —জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের চিহ্ন, তারপর লেখা, ‘গচ্ছিত রাখলাম—।’ আর তার নিচে এরকম সংক্ষিপ্ত একটা তালিকা-

ক্যাপ্টেন প্যারোট—ওশান হার্ট
সি উলফ—কিং অব মাদাগাস্কার
ফায়র থমসন—সি কুইন
অক্টোপাস মূর—ফেয়ার
লেডি শ্রাঙ্কেন হেড—বিউটি টিয়ার্স
ওয়ান লেগ ব্ল্যাক ডগ—কুইন অব জঞ্জিবার
পারকাসন ম্যাঙ্গকি — সি হর্স
হোয়াইট শার্ক—টিয়ার্স অব দি স্কাই।

এর নিচে লেখা আছে—‘হারপুন হাডসনের প্রাপ্য হিসাবে বাকিটা তার বিধবা পত্নীকে আমস্টেলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

লেখাটা পড়ে ধ্রুব বলল, ‘এটা কীসের তালিকা? এর মধ্যে ম্যাঙ্গিক বলে একটা নামও আছে দেখছি।’

মার্লিন বলল, ‘তালিকার বাঁদিকে আর নিচে ক্যাপ্টেন প্যারোট ছাড়া অন্য যে নামগুলো আছে, তারা সবাই ছিল ব্ল্যাক প্যারোটের দুর্ধর্য সহচর। তবে ডানপাশেরগুলো কীসের নান তা আমার জানা নেই। আর হতে পারে যে বিয়ার্ডের ওই বন্ধু ম্যাঙ্গকির কোনো পূর্বপুরুষ ছিল পারকাসন ম্যাঙ্গকি। এটা একটা পদবি।’

এরপর একটু থেমে মার্লিন বলল, ‘এবার নিশ্চয়ই কিছুটা অনুমান করতে পারছ কেন আমি চাকরিটা নিই! বিয়ার্ডের সাথে ব্ল্যাক প্যারোটের ছবির সাদৃশ্য ধরতে পেরেছিলাম আমি। ছবিটা আমাকে বিয়ার্ডের পরিচয় জানতে সাহায্য করেছিল। যার গুপ্তধনের সংকেত আমার হাতে আছে, তাঁর উত্তরপুরুষ যখন জাহাজটার ক্যাপ্টেন এবং জাহাজটা যখন ভারত মহাসাগরের দিকেই যাচ্ছে তখন এমনও হতে পারে যে বিয়ার্ড সেই গুপ্তধনের খোঁজেই যাচ্ছেন? এ কথাটা আমার সে সময় মনে হয়েছিল।’

ধ্রুব বলল, ‘বুঝলাম। তা তোমার কী ধারণা, বিয়ার্ড তার পূর্বপুরুষের খালি সিন্দুকভর্তি করে ঘরে ফেরার জন্যই বেরিয়েছেন?’

মার্লিন জবাব দিল, ‘বিয়ার্ড যে মিউজিয়ামের ব্যবসা করার জন্য বেরোননি সেটা নিশ্চিত। টিকিট বিক্রিতে যে আয় হয়, জাহাজের খরচ তার হাজার গুণ। এত ক্ষতি সে সইবে কেন। আমার ধারণা তার উদ্দেশ্য অন্য। মিউজিয়ামের ব্যাপারটা ক্যামোফ্লাজ। যাতে কেউ সন্দেহ না করে।

ধ্রুব কচ্ছপের খোলটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘তোমার পাখিটার ছড়াটাও কিন্তু অদ্ভুত, ‘পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল।’ এ খোলটা দেখে আমার কথাটা মনে পড়ে গেল! কিন্তু কচ্ছপ যত বড়ই হোক, সিন্দুক বা তার ভিতরের অত কিছু তার খোলে থাকা সম্ভব নয়। নাকি তার ইঙ্গিত এই খোলটার দিকে?’

মার্লিন জবাব দিল, ‘তাও হতে পারে। পাখিটাও ছিল সেই বুড়ো জাহাজির। তাঁর সম্বন্ধে যতটুকু শুনেছি সেটা বলি। বহু বছর আগের কথা, ঠাকুরদার তখন যুবা বয়স। সে সময় তার জাহাজ নোঙর করেছিল এডেনে। একদিন বন্দরে তার কানে এল এক বৃদ্ধ ব্রিটিশ নাবিক নাকি জাহাজঘাটার সরাইখানায় অন্ধ অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে। দেশের লোক অচেনা হলেও বিদেশে তাকেই পরমাত্মীয় বলে মনে হয়। ঠাকুরদা খবরটা শুনে ছুটলেন সেই সরাইখানায়। দেখলেন সরাইখানার নোংরা ঘরে শুয়ে আছে এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ। তার সঙ্গী বলতে ওই পাখিটা। মাদাগাস্কার থেকে আগত কোনো এক জাহাজ নাকি তাকে সরাইতে ফেলে পালিয়েছে। লোকটার সারা দেহে ক্ষতচিহ্ন। যেন কেউ ব্লেড দিয়ে তাকে চিরেছে, চোখের দুটো মণি যেন কেউ খুবলে নিয়েছে। এ অবস্থাতেই নাকি তাকে নৌকায় মাদাগাস্কার উপকূলে ভাসতে দেখেছিল উদ্ধারকারী সেই জাহাজ। খোলটা সম্পত্তির মতো বুকে আঁকড়ে শুয়ে থাকা বৃদ্ধর তখন প্রাণবায়ু বেরোয় বেরোয় করছে। ঠাকুরদার কাছে একটা বাইবেল ছিল। তার শেষ অবস্থা দেখে ঠাকুরদা সেটা তার কানের কাছে পড়তে লাগলেন। পাঠ শেষ হলে সেই বৃদ্ধ হঠাৎই নড়ে উঠে খোলটা দিয়ে বললেন ‘আমার আত্মাকে তুমি মুক্তি দিলে। তাই তোমাকে এটা আর আমার পাখিটা দিয়ে যাচ্ছি। এর চিহ্ন দেওয়া জায়গাতে লুকানো রয়েছে জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের গুপ্তধন।’

ঠাকুরদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে জায়গা কোথায়?’

বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘যেখাতে তারা আছে…। তাদের হেফাজতে আছে সেই গুপ্তধন…তবে রাত সেখানে বড়ই ভয়ঙ্কর…।’

‘তারা কারা তা অবশ্য আর জানতে পারেননি ঠাকুরদা। এরপরই বৃদ্ধর মুখে যেন প্রচণ্ড আতঙ্ক ফুটে উঠে শ্বাস থেমে যায়।’

সব শুনে ধ্রুব জানতে চাইল, ‘সে জায়গা কোথায় বলে তোমার ধারণা?’

মার্লিন বলল, ‘খোলের ম্যাপে চিহ্ন দেওয়া জায়গাটা হল সেসেল্জ দ্বীপপুঞ্জ।’ মাৰ্লিন এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজায় টোকা দেবার শব্দ শুনে মার্লিন তাড়াতাড়ি কচ্ছপের খোলটা মাথায় দিয়ে টুপিটা পরে নিল। দরজা খুলে ধ্রুব দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেট ফক্স। সে প্রথমে ধ্রুবকে দেখে বলল, ‘ক্যাপ্টেন আপনাকে ডাকছেন।’ তারপর মার্লিনকে দেখে বলল, ‘ও, তুমিও এ ঘরে।’

মার্লিন জবাব দিল, ‘রোলিং-এ রেডিও সাহেবের গা ব্যথা হয়েছে। টিপে দিচ্ছিলাম। দুটো টাকা আয় হবে তাতে।’

মেট শুনে মৃদু হাসল। ধ্রুবর মনে হল কথাটা সম্ভবত তার বিশ্বাস হয়নি। মার্লিন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ধ্রুব ফক্সের সঙ্গে উপস্থিত হল ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের ঘরে। বিয়ার্ড তাকে বললেন, ‘একটা বিশেষ কারণে আপনাকে ডেকেছি। দেখলেন তো আজ ডেস্ট্রয়ারটা কী হ্যাঙ্গাম করল। আমরা যত মোগাদিসু বন্দরের দিকে এগোব তত এসব হ্যাঙ্গাম বাড়বে। এ দিকের হাল হকিকত তো আপনার জানা নেই। রেডিও ম্যাসেজে কখন কী বলতে হবে তা আপনি বুঝতে পারবেন না। আমি ভাবছি কাল থেকে রেডিও রুম মেট ফক্সই সামলাক। তবে চিন্তা নেই, কাগজ কলমে আপনিই রেডিও অফিসার থাকবেন। সে হিসাবে যা প্রাপ্য তাই পাবেন।’

ধ্রুব শুনে অবাক হয়ে বলল, ‘তাহলে কী কাজ করব আমি?’

বিয়ার্ড একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আপনি তো শিক্ষিত মানুষ, পরিবর্তে আপনাকে একটা কাজ দেব আমি। আমার লাইব্রেরিতে অনেক বই আছে নিশ্চয়ই দেখেছেন? ওর একটা ক্যাটালগ তৈরি করুন আপনি। কাজটা করতে দিন দুই লাগবে আপনার আর তার পর তো আমরা মোগাদিসুতে পৌঁছে যাব।’

জাহাজে ক্যাপ্টেনের আদেশই শেষ কথা। ব্যাপারটা তাই মেনে নিল ধ্রুব। রাতে একবার এক মিনিটের জন্য ধ্রুবর কেবিনে এল মার্লিন। ধ্রুবর কাজ বদল হয়েছে শুনে সে বলল, ‘ব্যাপারটা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। বিয়ার্ড ডেকে ছিল। আমাকে ডেক সারেঙের সহকারী হিসেবে কাজ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আমি ওপরে, তুমি নিচে। আমার ধারণা, আমাদের মেলামেশা ওরা সন্দেহের চোখে দেখছে, তাই এ ব্যবস্থা করল। চোখ কান খোলা রেখো মনে হয় ভিতরে ভিতরে কোনো ঘটনা ঘটতে চলেছে।’