কূর্মদেবতার কামড় – ৬

রাত কেটে গেল। পাহাড়ের মাথায় ধীরে ধীরে উদিত হলেন সূর্যদেব। তার আলো ছড়িয়ে পড়ল কুরু হ্রদের জলে। ভোর হল হ্রদের ধারে সেই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদের বুকে। এদিন আর সুদীপ্তদের বাইরে বেরোবার ব্যাপার নেই। মঙ নিষেধ করে গেছে বাইরে বেরোতে। জানলা-দরজা খুলে ঘরের মধ্যেই বসে রইল সুদীপ্তরা। তবে এদিন সকাল হতেই গ্রামের লোকদের মধ্যে নানা কর্মচঞ্চলতা চোখে পড়ল। অনেকেই নানা জিনিসপত্র নিয়ে লেকের ধারে যাচ্ছে। যেখানে তারা যাচ্ছে সে জায়গা অবশ্য সুদীপ্তদের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে না। তবে একটা জিনিস তারা খেয়াল করল যে এদিন কোনো নৌকা বা জেলে ডিঙি জলে নামেনি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন লোক কাপড়ের পাতাকা টাঙাতে শুরু করল গ্রামের বাড়িগুলোর মাথায়। লাল রঙের পতাকা। তাতে সোনালি রঙের কচ্ছপের দেবতা কিম কুঈয়ের প্রতিকৃতি আঁকা। উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ঘরে বসে এসব দেখতে দেখতেই সকালটা কেটে গেল। সময় যত কাটতে লাগল ততই ভিতরে ভিতরে উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগল সুদীপ্ত আর হেরম্যানের। কচ্ছপ দেবতার দেখা মিলবে তো? বেলা বারোটা নাগাদ গ্রামের মেয়ে-পুরুষদের নানা রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে মন্দিরের দিকে যেতে দেখল সুদীপ্তরা। মন্দিরের মাথায় পত পত করে উড়ছে দেবতা কিম কুঈ-এর পতাকা। একসময় মন্দিরের দিক থেকে ভেসে আসতে লাগল ঝাঁঝর আর অনেকটা ডুগডুগি ধরনের চামড়ার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। কচ্ছপ দেবতার পুজো শুরু হয়েছে মন্দিরে। দীর্ঘক্ষণ ধরে সে শব্দ কানে এল সুদীপ্তদের। তারপর সে শব্দ থামল। পুজো সেরে নিজেদের ঘরে ফিরে এল গ্রামের লোকেরা। শুরু হল নিস্তব্ধ দুপুর। সুদীপ্তরা দুপুরে খাওয়া সেরে নেবার পর হেরম্যান বললেন, ‘চলো এবার ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। কচ্ছপ দেবতাকে দর্শনের জন্য সম্ভবত রাত জাগতে হবে আমাদের। এখন ঘুমিয়ে নিলে রাতে চাঙ্গা থাকা যাবে তার ওপর আমাদের উৎকণ্ঠাও কাটবে।’ শুয়ে পড়ল সকলে।

নানা ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন দেখার পর অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল সুদীপ্ত। কচ্ছপ মন্দিরে পুরোহিত দং-পেঙ-এর সঙ্গে চাঁদনি রাতে লেকের জলে ক্যানোতে চেপে ভেসে চলেছে তারা। পুরোহিত দেবতা দর্শনে নিয়ে চলেছে তাদের। বেশ অনেকটা ভেসে চলার পর এক জায়গায় ক্যানো থাকাল পেঙ। সুদীপ্তদের সে বলল, ‘এখানেই থাকে আমাদের দেবতা। আমি জলে নেমে তাকে ডেকে আনি।’—এই বলে সে ঝাপ দিল কালো জলে। তার জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল সুদীপ্তরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার জলের থেকে ভুস্ করে মাথা তুলল কর্ম দেবতার পুরোহিত। সুদীপ্তদের উদ্দেশে সে বলল, ‘দেবতা এখনই আসছেন। আমাকে নৌকায় টেনে তোল।’

জলের দিকে হাত বাড়াল সুদীপ্ত। দং-পেঙ তার হাত ধরার বদলে হঠাৎই কামড়ে ধরল সুদীপ্তর কবজিটা। আর এর পরই তার বিশাল পিঠটা ভেসে উঠল জলে। আরে দং-পেঙ কই, সুদীপ্তর হাত কামড়ে ধরেছে এক বিরাট কচ্ছপ। নৌকা থেকে সে টেনে সুদীপ্তকে জলে নামাতে চাচ্ছে! জলেই পড়ে যাচ্ছিল সুদীপ্ত। কিন্তু হেরম্যান আর ডেং-ফু তাকে জাপটে ধরল। টানাটনি শুরু হল দু-পক্ষের মধ্যে। ছোট্ট কালো নৌকাটা প্রবল দুলতে লাগল। এই বুঝি বা নৌকাটা উলটে যাবে। অসীম শক্তিতে সুদীপ্তর হাত কামড়ে ধরে তাকে জলের গভীরে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে দানব কচ্ছপটা। তার কামড় থেকে কিছুতেই হাত ছাড়াতে পারছে না সুদীপ্ত। ইতিমধ্যে কচ্ছপ দেবতার অনুচররাও তার চারপাশে ভিড় করেছে! ছোট-বড় নানা আকারের কচ্ছপ। জলের ওপর মুখ তুলে হাঁ করছে তারা। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের তীক্ষ্ণ হিংস্র দাঁতের পাটি। সুদীপ্তদের নৌকাটা উলটে যাবার জন্য তারা যেন প্রতীক্ষা করছে। নৌকার চারদিক থেকে ছুটে আসছে আরও আরও কচ্ছপের দল! আর যেন শেষরক্ষা হল না। হ্যাঁচকা টান দিতে শুরু করেছে ভয়ংকর কুর্ম দেবতা। নৌকাটা উলটে গেল বলে! সুদীপ্ত চিৎকার করতে যাচ্ছিল। ঠিক এই সময় হেরম্যানের ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল তার। হেরম্যান জানলার বাইরেটা দেখিয়ে একটু উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘ওই দ্যাখো, ওই দ্যাখো।’

ধড়মড় করে উঠে বসে জানলার বাইরে তাকাল সুদীপ্ত। বিকাল হয়ে গেছে। সুদীপ্ত দেখতে পেল চারজন গ্রামবাসীকে। তাদের হাতে বর্শা, বুকে বাঁধা কচ্ছপের খোলের বর্ম। লেকের বাঁকের জঙ্গলের দিক থেকে তারা ধরে আনছে সেই বাচ্চা ছেলেটাকে—ওয়াং-কে। ধরা পড়ে গেছে সে। ছেলেটা হাড় ছাড়াবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কচ্ছপের কামড়ের মতোই দু’পাশ থেকে দুজন শক্ত করে চেপে রেখেছে তার হাত। ব্যাপারটা দেখতে লাগল সুদীপ্ত। ছেলেটাকে নিয়ে এসে লেকের দিক থেকে সুদীপ্তদের ঘরের পাশ দিয়ে মন্দিরের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকগুলো। তারা চলে যাবার পর সুদীপ্ত বলল, ‘ছেলেটাকে নিয়ে ওরা কী করবে মনে হয়?’

হেরম্যান বললেন, ‘হয়তো কিছু শাস্তি দেবে আর কিছুদিন ঘরে আটকে রাখবে বলে আমার ধারণা। যাতে ও আর পালাতে না পারে সে ব্যবস্থা করবে।’—এ কথা বলে হেরম্যান বললেন, ‘চলো, এবার তৈরি হয়ে নাও। আমাদের তো লোকেরা ডাকতে আসবে এবার। বেলা পড়ে আসছে।’

তৈরি হয়ে নিল সুদীপ্তরা। যা কিছু টুকিটাকি জিনিস ছিল তা ব্যাগে পুরে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন লোক ডাকতে এল তাদের। রঙ-বেরঙের পোশাকে সেজে এসেছে তারা। দুজনের হাতেই বর্শা। আর বুকে বর্মের মতো করে বাঁধা কচ্ছপের খোল। উজ্জ্বল সোনালি রঙ করা সেই খোলগুলোতে। সুদীপ্তরা রুকস্যাক পিঠে নিয়ে চলল উৎসব-স্থলের দিকে। যেতে যেতে ডং-ফু তাদের উদ্দেশে বলল, ‘তোমাদের দেবতা সত্যি দর্শন দেবেন তো?’

সঙ্গে সঙ্গে সে দুজনের মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘দেবেন, দেবেন, নিশ্চয়ই দেবেন। তিনি যাতে দর্শন দেন সে জন্য সারাদিন সারা গ্রামের লোক পূজা দিয়েছে মন্দিরে। তিনি দর্শন না দিলে ভয়ংকর কাণ্ড হবে।’

সুদীপ্ত বলল, ‘কী হবে?’

অপরজন ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘হ্রদের জল শুকিয়ে যাবে। গ্রামে মড়ক লাগবে। বহু বছর আগে এমন একবার ঘটেছিল। তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দিলেন না। কিছুদিনের মধ্যেই হ্রদের জল শুকিয়ে গেল। এই হ্রদই আমাদের সব। সেবার না খেতে পেয়ে আর কলেরায় গ্রাম প্রায় উজাড় হতে বসেছিল। দেবতা দর্শন দেবেন না—এ কথা মুখে এনো না।’

তাদের কথা শুনে সুদীপ্তরা বুঝতে পারল যে এ গ্রামের লোকদের এই উৎসবের সঙ্গে নানা সংস্কার বা কুসংস্কার জড়িয়ে আছে।

সুদীপ্তরা পৌঁছে গেল আসল জায়গায়। হ্রদের পাড়ে একটা জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। পাড় থেকে সে জায়গা চালু হয়ে নেমে গেছে জলের দিকে। টুলের মতো বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে সে জায়গাতে। বেশ কিছু পূজার উপাচার, ফুল-মালা, কাপড় ঢাকা পাত্রও এনে রাখা হয়েছে সেখানে। অদ্ভুত সাজে সেজে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু লোক। কচ্ছপ সেজেছে তারা। মাথা-মুখ থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত প্রায় উলঙ্গ শরীরের সর্বত্রই রং-মাখা। বুক-পেটের দিকে কচ্ছপের মতোই হলদেটে-সাদা রং। আর দেহের পিছনের অংশে কালচে-সবুজ রং। লোকগুলোর প্রত্যেকের পিঠেই কচ্ছপের খোল বাঁধা। আর হাতে ধরা আছে একটা করে ছোট কচ্ছপের খোল আর এক টুকরো কাঠ। প্রধান পুরোহিত দং-পেঙও আছে সেখানে। তার পিঠে নয়, বুকে বাঁধা আছে সোনার পাত বসানো একটা কচ্ছপের খোল। পুরোহিতের গলা-হাত ইত্যাদিও স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত। গম্ভীর মুখে সে ব্যবস্থাপনার তদ্বির করছে। আরও বেশ কিছু গ্রামবাসী রয়েছে সেখানে। তারা বর্শাধারী, পরনে রংচঙে পোশাক। ভিড়ের মধ্যে থেকে কূর্ম দেবতার পুরোহিত দেখতে পেলেন সুদীপ্তদের। যারা সুদীপ্তদের নিয়ে এসেছিল তাদের উদ্দেশে সে কী যেন বলল, সুদীপ্তদের সে জায়গার একদম কাছে যেতে দেওয়া হল না। জায়গাটার বেশ কিছুটা তফাতে পাড়ের ওপরের দিকে একটা শোয়ানো গাছের গুঁড়ির ওপর তাদের বসানো হল।

পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। পুরোহিত দং-পেঙ আর কচ্ছপের মতো সাজা লোকগুলো ছাড়া অন্য গ্রামবাসীরা জলের ধার থেকে উঠে এসে সুদীপ্তদের ঘিরে বসল। জলের ধারে পুরোহিতকে মাঝখানে রেখে সার বেঁধে দাঁড়াল কচ্ছপ মানুষরা। অন্ধকার নামতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে জলের দিকে তাকিয়ে উদ্ভট সুরে একসঙ্গে কী যেন বলতে লাগল তারা। কচ্ছপ দেবতার আবাহন মন্ত্র বা সংগীত হবে। ক্রমশ কালো হয়ে উঠতে লাগল লেকের জল। একসময় কালো চাদরের পর্দার আড়ালে ঢেকে গেল সবকিছু। সুদীপ্তদের কানে শুধু আসতে লাগল কচ্ছপ দেবতার আবাহন সংগীত!

সংগীত। একবার তা চড়া হচ্ছে, আবার পরমুহূর্তে খাদে নেমে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক আবাহন তারপর ধীরে ধীরে একসময় অন্ধকারের পর্দা সরে যেতে লাগল। চাঁদ উঠতে শুরু করল। তার আলো খেলতে শুরু করল লেকের জলে।

সবকিছু স্পষ্ট হবার পর হঠাৎই উচ্চাঙ্গে উঠে থেমে গেল সেই আবাহন ধ্বনি। সার ভেঙে লোকগুলো একে একে গিয়ে উঠে বসল অর্ধবৃত্তাকারে সাজিয়ে রাখা কাঠের গুড়িগুলোর ওপর। পিছন থেকে তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা এক একজন যেন এক একটা কচ্ছপ! পুরোহিত মাটিতে রাখা পুজার উপাচারের মধ্যে থেকে একটা থালা তুলে নিল। তার মধ্যে রাখা আছে বলের মতো একটা কিছু। দূর থেকে দেখে সুদীপ্তদের অনুমান হল সেটা কোনো খাবারের মণ্ড হবে। যা দেওয়া হবে দেবতা কিম কুঈকে। থালাটা হাতে নিয়ে পুরোহিত ধীরে ধীরে জলে নেমে গিয়ে কোমর জলে দাঁড়ালেন। থালাটা জলের দিকে তুলে ধরলেন নিবেদনের ভঙ্গিতে। আর কচ্ছপ মানুষগুলো তাদের হাতে ধরা ছোট কচ্ছপের খোলগুলোর ওপর কাঠ দিয়ে আঘাত করে এক অদ্ভুত ট্যাপ, ট্যাপ’ ছন্দোবদ্ধ বাজনা বাজাতে শুরু করল ধীরে ধীরে। তবে কি মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সুদীপ্তরা দমবন্ধ করে চেয়ে রইল পুরোহিত যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে।

চাঁদ ক্রমশ মাথার ওপর উঠতে শুরু করল। একইভাবে পাথরের মূর্তির মতো জলে দাঁড়িয়ে আছে পুরোহিত দং-পেঙ। বাদ্যকাররা খোলা বাজিয়ে চলেছে—ট্যাপট্যাপ-ট্যাপট্যাপ! এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সুদীপ্তদের চারপাশের লোকজনও নিশ্চুপভাবে তাকিয়ে জলের দিকে। দেবতা কিম কুঈ-এর দর্শনের প্রতীক্ষায়। সময় এগোতেই থাকল।

এভাবে ঘণ্টা তিনেক সময় কেটে গেল একসময়। চাঁদ ঠিক মাথার ওপর উঠল। কিন্তু কচ্ছপ দেবতার দেখা নেই। হ্রদের জল শান্ত। কাছে বা দূরে জলে কোথাও আলোড়ন দেখা যাচ্ছে না। রাত বাড়তে লাগল। সুদীপ্তরা বুঝতে পারল যে তাদের চারপাশের লোকগুলো যেন কেমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। উৎকণ্ঠা ফুটে উঠতে শুরু করেছে তাদের মুখে। তবে কি কচ্ছপ দেবতা আসবেন না? বাজনারও যেন তাল কাটতে শুরু করল একসময়। তারপর একসময় সুদীপ্তরা দেখল কিছুটা হতাশভাবে জল ছেড়ে উঠে আসছে দং-পেঙ। হতাশা নামছে সুদীপ্তদের মনেও। তবে কি দেখা হল না তাকে? জল ছেড়ে উপরে উঠে পুরোহিত তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘মন্দির থেকে দেবতার তরবারিটা নিয়ে এসো। হয়তো সে তরবারি তিনি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। সেটা তাঁকে উৎসর্গ না করলে তিনি আসবেন না।’ তাঁর কথাটা সুদীপ্তদের তর্জমা করে দিল ডেং-ফু।

তাঁর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দুজন লোক ছুটল মন্দিরের দিকে। উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে চারপাশের জনতা। আশঙ্কা, ভয় ফুটে উঠেছে তাদের মুখে। দেবতা দর্শন না দিলে যে হ্রদের জল শুকিয়ে যাবে। মহামারী হবে।

লোকগুলোর সেই ছুরি বা তলোয়ার নিয়ে ফিরে আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই যারা তরবারি আনতে গেছিল তারা ছুটতে ছুটতে ফিরে এল। তারা যা বলল, তাতে আঁতকে উঠল পুরোহিতসহ সবাই। ফুলমালা চাপা দেওয়া ছুরিটা নাকি মন্দিরে নেই! সেটা পাওয়া যাচ্ছে না!

তবে কী হবে? ভয়ার্ত চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হল জনতার মধ্যে। পুরোহিত আর তার সঙ্গীরাও উঠে এল জলের ধার থেকে। হঠাৎ একজন বলে উঠল, ‘এ নিশ্চয় ওয়াং-এর কীর্তি। ও মানুষ নয়, ও জলের প্রেত। ওকে আটক করা হয়েছে বলে ও মন্ত্রবলে অদৃশ্য করেছে দেবতার ছুরি।’

অন্য একজন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, ছেলেটা মানুষ নয়, প্রেত। নইলে কেউ জলের নীচে ওভাবে থাকতে পারে?’

আর তারপরই যেন আতঙ্কে কেমন হিংস্র-উন্মত্ত হয়ে উঠল জনতা। একজন বলল, ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসতে চলেছে, লেকের জল শুকিয়ে যাবে এবার। ছেলেটা আমাদের এত বড় ক্ষতি করল! ওকে মন্দিরের কচ্ছপ চৌবাচ্চায় চুবিয়ে মারতে হবে।’ পুরোহিত দং-পেঙ এবার হিংস্রভাবে বলে উঠল, ‘ও জলের প্রেত। জলে চোবালে ওর কিছু হবে না। ওকে পুড়িয়ে মারতে হবে।’

হিংস্র জনতা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘পুড়িয়ে মারো, পুড়িয়ে মারো!’ তারপর তারা ছুটতে শুরু করল কচ্ছপ দেবতার মন্দিরের দিকে।

পুরো ঘটনাটার প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে হেরম্যান বলে উঠলেন, ‘আমাদের দেবতা দেখা হোক বা না হোক বাচ্চা ছেলেটাকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে। ছুরিটা সম্ভবত মঙ-ই নিয়েছে। হয়তো বা পুরোহিত ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিজের ছেলেটাকে বাঁচাবার জন্য বাচ্চাটার প্রাণ নিতে যাচ্ছে।’ কথাগুলো বলে হেরম্যান ছুটলেন মন্দিরের দিকে ধাবমান লোকগুলোর পিছনে। পিঠে রুকস্যাক ফেলে সুদীপ্ত আর ডেং-ফুও দ্রুত অনুসরণ করল তাঁকে।

লোকগুলো পুরোহিত সমেত সুদীপ্তদের মিনিটখানেক আগেই মন্দিরে প্রবেশ করেছিল। সুদীপ্তরা যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছল তখন মন্দিরসংলগ্ন চৌবাচ্চার ধারগুলো মশালের আলোতে আলোকিত। মন্দিরের থামগুলোর গায়ে মশাল জ্বালানো হয়েছে। কাঠের সাঁকোটা পেরিয়ে মন্দিরের প্রবেশমুখে পৌঁছল সুদীপ্তরা। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে কচ্ছপ মানুষরা। তারা তাকিয়ে আছে মন্দিরের ভিতর দিয়ে। হিংস্র ভাব ফুটে উঠেছে তাদের চোখে। সুদীপ্তদের উপস্থিতি প্রথমে গ্রাহ্যই করল না তারা।

আর এরপরই মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল পুরোহিত দং-পেঙ, তার ছেলে মঙ আর একজন—সেই বাচ্চা ছেলেটা। মঙ শক্ত করে ধরে রেখেছে ওয়াং-এর হাতটা। কাঁপছে বাচ্চাটা। মঙ-এর তত্ত্বাবধানেই রেখে যাওয়া হয়েছিল ওয়াংকে। তাকে বাইরে আনার পর সর্বসমক্ষে কর্তব্য সম্পাদনের অছিলায় পুরোহিত দং-পেঙ জিগ্যেস করল—‘বল দেবতার তরবারিটা কোথায়?’

বাচ্চা ছেলেটা ভয়ার্ত ভাবে বলে উঠল, ‘সত্যি বলছি। আমি তরবারি নিইনি।’  মঙ এবার ছেলেটার মাথা সজোরে একটা স্তম্ভর মাথায় ঠুকে দিয়ে বলল, ‘তুই জানিস কোথায় সেই তরবারি। বল? বল?’

ওয়াং আবার ভয়ার্ত কন্ঠে আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘আমি জানি না, আমি জানি না।

ডেং-ফুর মাধ্যমে সুদীপ্ত এবার বলে উঠল, ‘তোমরা এই বাচ্চা ছেলেটাকে এমনভাবে মারছ কেন? ও তো বলছে তরবারি ও নেয়নি।’

কচ্ছপ দেবতার পুরোহিত এবার বলে উঠল, ‘তোমরা বিদেশি। আমাদের ব্যাপারে নাক গলিও না তোমরা। এখনই তোমরা এ মন্দির ছেড়ে চলে যাও। গ্রাম ত্যাগ করো। তোমাদের থাকতে দেওয়াই আমার ভুল হয়েছে।’

সমবেত কচ্ছপ দেবতার উপাসকরা এবার চিৎকার করে বলে উঠল, ‘মন্দির থেকে

নিয়ে চল ছেলেটাকে। ওকে এখনই পুড়িয়ে মারব গ্রামের মাঝখানে।’

হেরম্যান এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন, ‘ছুরি বা তরবারিটা এই বাচ্চা ছেলেটা নেয়নি। ওটা গতকাল দুপুরে মঙ আমাদের কাছে বিক্রি করতে নিয়ে গেছিল। আমরা জিনিসটা কিনতে রাজি হইনি।’

এই আশ্চর্যজনক কথা শুনে হঠাৎ থেমে গেল কচ্ছপ দেবতার উপাসকরা। মঙও কেমন হতভম্ব হয়ে গেল। আর এরপরই মঙ-এর উদ্দেশে আসল বোমাটা ফাটাল ডেং-ফু। সে সবাইকে চমকে দিয়ে বলে উঠল, ‘তোমাকে এবার আমি চিনতে পেরেছি মঙ। তোমার নামে হুলিয়া বেরিয়েছে শহরে। হ্যানয় শহরের ল্যাম্পপোস্টে তোমার ছবি আঁকা পোস্টার সাঁটা হয়েছে! মাঝরাতে হ্যানয় শহরে ডাকাতি করতে গিয়ে এক পুলিশকর্মীকে গুলি করে এখানে পালিয়ে এসেছ তুমি। তোমার শাগরেদরা ধরা পড়লেও তুমি পালিয়েছ!’

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যেন হাঁ হয়ে গেল মঙ-এর মুখটা। কয়েক মুহূর্তের জন্য ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল সে। আর হঠাৎই সে সুযোগটা কাজে লাগাল ছেলেটা। হঠাৎ সে কামড় বসিয়ে দিল মঙ-এর হাতে। হাত খসে গেল মঙের। আর সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চাটা দুজন কচ্ছপ মানুষের ফাঁক গলে ঝাঁপ দিল পরিখার জলে। কচ্ছপ মানুষরা এবার দৌড়াল সাঁকোর দিকে যাতে বাচ্চাটাকে ধরা যায়। কিন্তু তারা ওপারে পৌঁছবার আগেই পরিখাটা অসম্ভব দ্রুতগতিতে সাঁতরে পার হল বাচ্চাটা। তারপর জল ছেড়ে উঠে তিরগতিতে ছুটল পালাবার জন্য। সাঁকো পেরিয়ে দু-তিনজন কচ্ছপ মানুষ পিছু ধাওয়া করল ওয়াং-এর। অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা।

পুরো ব্যাপারটা ঘটতে সম্ভবত দশ সেকেন্ড সময় লাগল। আর মঙও তার আসল রূপ ফিরে পেল। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘নিজেদের বাঁচাবার জন্য মিথ্যা বলছে এ বিদেশিরা। ওয়াং ওদেরকে ছুরিটা দিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় আমি দূর থেকে দেখেছি ওয়াং-এর সঙ্গে হ্রদের পাড়ে জঙ্গলের ধারে কথা বলছিল বিদেশিরা। আরও দেখেছি হ্রদের পাড় থেকে ফেরার পর বাইরের ছাদে খড়ের ভিতর কী যেন একটা লুকিয়ে রাখল এই বিদেশিরা। সম্ভবত দেবতার সেই তরবারি হবে হয়তো। জিনিসটা মনে হয় এখনও সেখানেই আছে। এ লোকগুলো যেন পালাতে না পারে। দেবতার ছুরি চুরি করতেই এরা এখানে এসেছে।’

হেরম্যান ডেং-ফুর মাধ্যমে কথাটা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, ‘মঙ মিথ্যা বলছে। আমরা ও ছুরি বা তরবারি নিইনি।’ কিন্তু মঙের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বর্শাধারী কয়েকজন কচ্ছপ মানুষ ঘিরে ধরল সুদীপ্তদের। আর কয়েকজন লোক সাঁকো পেরিয়ে ছুটল সেই ঘরের দিকে যেখানে ছিল সুদীপ্তরা। মশালের আলোতে ঝিলিক দেওয়া একঝাঁক বর্শার চক্রব্যূহতে দাঁড়িয়ে রইল সুদীপ্তরা তিনজন।

কিছু সময়ের মধ্যেই ফিরে এল যারা সেই ঘরের দিকে গেছিল তারা। আর তাদের সঙ্গে যারা ওয়াং-এর পিছু ধাওয়া করেছিল তারাও। ওয়াংকে ধরা যায়নি, সে ঝাঁপ দিয়েছে লেকের জলে। কিন্তু মঙ-এর কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। বড় আকারের ছুরিটা বা দেবতা কিম কুঈ-এর তরবারি খুঁজে পাওয়া গেছে সুদীপ্তদের ঘরের চাল থেকেই। ছুরিটা লোকগুলো তুলে দিল পুরোহিতের হাতেই। সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে ধূর্ত শ্বাপদের হাসি ফুটে উঠল মঙ-এর মুখে। হেরম্যান বলে উঠলেন, ‘আমরা এ ছুরি লুকাইনি। মঙই আমাদের ফাসাবার জন্য ছুরিটা খড়ের আড়ালে লুকিয়েছিল।’

কিন্তু হেরম্যানের কথায় কর্ণপাত করল না কেউ। মঙ বলে উঠল, ‘এই চোরদের শাস্তি দিতে হবে।’

কচ্ছপ দেবতার উপাসকরা বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি দিতে হবে। এদের পাপেই হয়তো দেখা দিচ্ছেন না দেবতা। হ্রদের জল শুকিয়ে যাবে, মহামারী নেমে আসবে দেবতার অভিশাপে।

কিন্তু, কী শাস্তি? কী শাস্তি?

কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য শাস্তির বিধান আর তাদের আগামী কর্মপন্থা ঠিক করে দিল কর্ম দেবতার মন্দিরের পুরোহিত আর মঙ। সূর্যোদয় হলে সুদীপ্তদের নামিয়ে দেওয়া হবে কচ্ছপ পরিখায়। তারপর দেবতার তরবারি নিয়ে সবাই যাবে হ্রদের ধারে। দিন-রাত ধরে চলবে দেবতা কিম কুঈ-এর আবাহন। যতক্ষণ, যতদিন তিনি দেখা না দেন। তিনি দেখা না দিলে যে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটবে! কচ্ছপ দেবতার উপাসকরা সুদীপ্তদের কোনো কথাই শুনল না। তাদের ঘেরাটোপে বাকি রাত আটকে রইল সুদীপ্তরা।