কালোটিয়ার দ্বীপে – ২

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মার্লিন ফিরে এল। বই রেখে ধ্রুব মার্লিনের সাথে গিয়ে ঢুকল জলি রজার্স রুমে। সারা দেওয়ালে নানা ধরনের কালো পতাকা বোর্ড পিন দিয়ে আটকানো আছে। তবে সবই আকৃতিতে ছোট রেপ্লিকা। জাহাজের মাস্তুলে ওড়ার মতো নয়। শুধু একটাই প্রমাণ মাপের পতাকা আছে। সেটা ঘরের শেষ মাথায় কাঠের ফ্রেমে কাচের আবরণের ভিতরে আছে। ঘরে ঢুকে মার্লিন বলল, ‘আপনাকে আগেই বলেছি যে ‘জলি রজার ভয় দেখাবার জন্য ব্যবহৃত হত। মাঝ সমুদ্রে কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনের দুরবিনে ‘জলি রজার’ দেখা দিলেই সে বুঝত মৃত্যু আসন্ন। এখানে এ ধরনের কিছু পতাকা আপনি দেখবেন। সব পতাকাতেই কঙ্কালের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় যে ‘জলদস্যু’ আর ‘মৃত্যু-এ শব্দ দুটি সমার্থক।’

প্রথম যে পতাকার সামনে তারা দাঁড়াল সেটা সমুদ্রের ইতিহাসে ভয় জাগানো এক নাম বার্থোলমিউ রবার্টসের। পতাকায় দেখা যাচ্ছে বার্থোলমিউর হাতে পানপাত্র তুলে দিচ্ছে এক নরকঙ্কাল। এরপর ব্ল্যাক রিয়ার্ডের পতাকাতে বর্শা আর টাকার থলি হাতে দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কাল। আর ক্যাপ্টেন ইংলন্ডের জলি রজারের চিহ্ন তো সারা পৃথিবীব্যাপী আজ বিপদচিহ্ন হিসাবে পরিচিত। নর করোটির নিচে আড়াআড়ি ভাবে দুটো হাড়। সে পতাকাও দেখতে পেল ধ্রুব। সব শেষে তারা এসে দাঁড়াল সেই বিরাট পতাকার সামনে। কালো পতাকার মধ্যে আঁকা আছে একটা করোটি। আর তার মাথায় বসে আছে একটা টিয়াপাখি, সেই কালোটিয়া!

মার্লিন বলল, ‘এই পতাকাটা কিন্তু সত্যিই একসময় ব্ল্যাক প্যারোটের মাস্তুলে উড়ত। আসল পতাকা এটা। ছবির চিহ্ন ছিল ব্ল্যাক প্যারোটের প্রতীক। ওঁর সিন্দুকেও এই চিহ্ন আছে। ওর পোষা কালো টিয়াপাখির জন্যই ওঁর নাম হয়েছিল ‘ব্ল্যাক প্যারোট।’

ধ্রুব জানতে চাইল, ‘ব্ল্যাক প্যারোটের এসব আসল জিনিস কীভাবে সংগ্রহ হল?’ মার্লিন বলল, ‘এসব ক্যাপ্টেনের জিনিস। সম্ভবত পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। বিশদ জানা নেই।’

তারপর হেসে বলল, ‘আমাদের মিউজিয়াম দেখা শেষ হল। আশাকরি আপনার ভালো লেগেছে। একটা কথা আছে, আপনিও নাবিক শুনে ক্যাপ্টেন আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান। তিনি ওপরে অপেক্ষা করছেন।’

মিউজিয়াম দেখা শেষ করে ধ্রুব মার্লিনের সাথে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বলল, ‘আপনি কিন্তু বেশ বলেন, কোনো পোর্ট মিউজিয়ামে চাকরি করতে পারেন।

মার্লিন একটু বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘চাকরির জন্য তো সার্টিফিকেট লাগে। আমার কোনো সার্টিফিকেট নেই। কাগজ কলমে আমি এ জাহাজের খালাসি। তার বেশি কিছু নই। ধ্রুব তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ‘দেখবেন, নিশ্চয়ই একদিন আপনার ভাগ্য ফিরবে।’

উঠতে উঠতে থমকে দাঁড়িয়ে মার্লিন বলল, ‘ভাগ্য ফেরাতেই তো চাই। আমার ঠাকুর্দা পারেননি, বাবাও পারেননি, কিন্তু…কিন্তু…।’ কথা শেষ না করে ওপরে উঠতে লাগল সে।

প্রথম কোনো ঘরে আধুনিক উপকরণ, আসবাবপত্র দেখতে পেল ধ্রুব। একটা কম্পিউটারও ডেকের একপাশে গোটাকয়েক ঘর। তারই একটাতে মার্লিন ধ্রুবকে নিয়ে ঢুকল। এই

ঘরে আছে। বৈদ্যুতিক বাতিরও ব্যবস্থা আছে। কাচের জানলার সামনে ধ্রুবদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন একজন লোক। তারা ঘরে ঢুকতেই তিনি ফিরে দাঁড়ালেন। তার পরনেও সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর পোশাক। কিন্তু তা বেশ ঝকঝকে, এবং নিখুঁত ইস্ত্রি করা। মাথায় নীলরঙের ভেলভেটের ত্রিকোণ ভাঁজের টুপি, ঠিক সে যুগের ক্যাপ্টেনরা যেমন পরত। লাল মুখের লোকটার চেহারার বৈশিষ্ট্য হল, ভুরু, গোঁফ সব একদম ধবধবে সাদা, পনিটেল বাঁধা চুলের রংও তাই। লোকটা মধ্যবয়সি। লোকটা যেন কয়েক মুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে নিল ধ্রুবকে। তারপর দু কদম এগিয়ে ধ্রুবর সঙ্গে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড। এ জাহাজের মালিক।’

করমর্দন করল ধ্রুব। তার হাত স্পর্শ করে সে বুঝতে পারল সে হাতে বেশ শক্তি ধরে। বিয়ার্ডের দাঁড়াবার ভঙ্গি একটু কুঁজো ধরনের হলেও সে বেশ লম্বা এবং শক্তপোক্ত চেহারার মালিক।

করমর্দন করার সময় ক্যাপ্টেন ধ্রুবকে বললেন, ‘মার্লিনের মুখে আপনার কথা শুনলান। একটা বিশেষ কারণে আমি আপনাকে ডাকলাম।’

‘কী কারণ?’ একটু অবাক হল ধ্রুব।

সামান্য একটু চুপ করে থেকে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, ‘আমাদের একজন ওয়ারলেস রেডিও অপারেটরের বিশেষ প্রয়োজন। আপনি যদি আমাদের জাহাজে কাজটা নেন তাহলে আমি উপকৃত হই। পারিশ্রমিক নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। দিনপিছু পঞ্চাশ ডলার আমি দেব আপনাকে। যা আপনাকে কোনো জাহাজ কোম্পানি দেবে না।’

বিস্মিত ধ্রুব ক্যাপ্টেনের প্রস্তাব শুনে বলল, ‘কিন্তু, আমি তো একটা জাহাজের কাজ নিয়ে এসেছি। তা আপনাদের ওয়ারলেস অপারেটার কোথায় গেলেন?’

ক্যাপ্টেন বললেন, ‘আমাদের ছোট জাহাজে একজনই অপারেটর ছিল। কিছুদিন ধরেই বাড়ির জন্য মন খারাপ হচ্ছিল। গত চারদিন ধরে সে নিখোঁজ। আমার ধারণা আমাদের না জানিয়ে অন্য কোনো জাহাজ ধরে দেশের দিকে রওনা হয়েছে। তার নিখোঁজের দিন দুটো জাহাজ এডেন থেকে ইংল্যান্ডের দিকে যাত্রা করেছে। এদের মধ্যে যাত্রীবাহী জাহাজও আছে। সম্ভবত এর কোনোটাতে সে উঠে বসেছে। জাহাজ থেকে নাবিক পালাবার ঘটনা যেমন বহু যুগ ধরে ঘটে আসছে এও তেমনি ব্যাপার।’

ধ্রুব জানতে চাইল, ‘ব্যাপারটা আপনি পোর্ট অথরিটি-হারবার মাস্টারকে জানিয়েছেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘পোর্ট পুলিশ, হারবার মাস্টার সবাইকে জানিয়েছি। ব্যাপারটা জানাতে গিয়েই আসল বিপত্তিটা ঘটল। হারবার মাস্টার সাফ বলে দিলেন ওয়ারলেস অপারেটর না থাকলে কোনো জাহাজকেই জাহাজঘাটা ছাড়ার অনুমতি দেবেন না তিনি। বিশেষত সোমালিয়ার ওদিকে তো একদমই নয়। নিশ্চয়ই জানেন যে ওদিকে জলদস্যুদের খুব উৎপাত। আমাদের মতো সাজানো জলদস্যু বা পারকাসনওয়ালা প্রাচীন জলদস্যু নয় তারা। আধুনিক জলদস্যু। তাদের হাতে থাকে পারকাসনের বদলে মেশিনগান। আদ্যিকালের জলদস্যুদের হাত কামানের বদলে কাঁধে রকেট লঞ্চার। ‘ধাও’ নামের এক লম্বা নৌকাতে সোমালিয়ার ৬৫৯ মাইল দীর্ঘ উপকূল বরাবর দাপিয়ে বেড়ায় তারা। প্রায়শ‍ই জাহাজ হাইজ্যাক করে। জাহাজের নিরাপত্তার কারণেই ওদিকের সব জাহাজে রেডিও অপারেটরের উপস্থিতি প্রয়োজনও বাধ্যতামূলক। আমরা যাচ্ছি মোগাদিসুতেই।’

ধ্রুব বলল, ‘সবই তো বুঝলাম। আপনার বেতনও লোভনীয়। কিন্তু আমি তো একটা জাহাজে কাজ করছি।

ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, ‘দেখুন, মার্লিনের মুখে যা শুনলাম, তাতে আপনাদের জাহাজ এখানে বেশ কিছুদিন থেকে মোগাদিসু যাবে। আমরাও যাব সেখানেই। অপারেটর পেলে আগামীকালই রওনা হব। আমার এ জাহাজ কিন্তু শুধু দাঁড় বা পালে চলে না। ইঞ্জিনও আছে। ইঞ্জিনের সাহায্যে এ জাহাজ বেশ দ্রুত চলে। মেগাদিসুতে আমার একদিনের কাজ তারপর আমরা আবার এডেনের দিকে আসব। আপনি সেখানে গিয়ে আপনার জাহাজ পৌঁছবার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন। ও বন্দরে আমার চেনাজানা আছে। বদলি অপারেটর জুটিয়ে নেব আমি। আবার আপনি আমাদের সাথে এ দিকেও যাত্রা করতে পারেন। আপনার জাহাজ ছেড়ে গেলে, পথে সে জাহাজে আপনাকে তুলে দেব। আবার এমনও হতে পারে আপনার ‘শ্রীগণেশ’ এডেন ছাড়ার আগেই এখানে পৌঁছে গেলেন আপনি।’—একটানা কথা বলে ধ্রুবের উত্তরের প্রত্যাশায় তার দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড।

ধ্রুব বলল, ‘কিন্তু আমার জাহাজের ক্যাপ্টেন আমাকে ছাড়তে রাজি হবেন কেন? বিয়ার্ড বললেন, ‘আপনি রাজি থাকলে সে ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। আমি যাব তাকে রাজি করাতে। মাত্র কয়েকদিনের তো মামলা। জাহাজ তো আপনার এখানে বেশ কিছুদিন দাঁড়াবে। আসলে সেই অবসর সময় আপনি আমার জাহাজে কাজ করছেন। তাছাড়া আপনার ক্যাপ্টেন রাজি হলে তিনি অন্যভাবে উপকৃত হবেন, আর আপনারও আরও একটা উপকার হবে। তবে সেটা নিছক এই কাজ সংক্রান্ত নয়। তার চেয়েও বড়।

‘কী উপকার?’

বিয়ার্ড স্মিত হেসে জবাব দিলেন, ‘ক্যাপ্টেনেরটা তাকেই বলব, আপনারটাই বলি, —একটা সার্টিফিকেট। সহকারী রেডিও অপারেটরের নয়, পুরোদস্তুর রেডিও অপারেটরের সার্টিফিকেট। যে সার্টিফিকেট পেতে সাধারণ ভাবে আপনার আরও দশটা বছর সময় লাগবে। আর, জানেন তো আমাদের এ লাইনে ব্রিটিশ আর পোর্তুগিজ জাহাজের সার্টিফিকেটের মর্যাদাই আলাদা। কারণ, এ দুটি দেশ হল নৌ অভিযানের আদিপুরুষ। ক্যাপ্টেনের এ কথাগুলো শুনে ধ্রুব এবার ব্যাপারটা সম্পর্কে বেশ উৎসাহিত হল। ও সার্টিফিকেটের গুরুত্ব তার অজানা নয়। ওটা হাতে থাকলে চাকরি পাবার সত্যিই অনেক সুবিধা। মাসখানেক পরই তো দেশে ফিরতে হবে তাকে। ‘শ্রীগণেশের’ সাথে তার চুক্তি দেশের মাটি ছোঁয়া পর্যন্ত। তারপর নতুন জাহাজে চাকরি নিতে পুরোদস্তুর অপারেটরের সার্টিফিকেটটা কাজে আসবে।

কিছুক্ষণ ভাবার পর ধ্রুব শেষপর্যন্ত বলল, ‘ঠিক আছে। আমার ক্যাপ্টেন অনুমতি দিলে আমি আপনার সাথে যেতে রাজি আছি।’

ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, ‘ধন্যবাদ। জানেন তো নতুন পথে ঝাঁপ দিতে না পারলে নাবিক হওয়া যায় না। আপনার মধ্যে নাবিক হবার গুণ আছে।’

.

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জাহাজ থেকে নিজের জাহাজে ফেরার জন্য ধ্রুব রওনা হল। সঙ্গে

তিনজন লোক। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড, মার্লিন, আর তৃতীয়জন হল, মিস্টার ফক্স। ফ্রান্সিস ড্রেক’ জাহাজের মেট। অর্থাৎ পদমর্যাদায় ক্যাপ্টেনের পরই সে জাহাজে তাঁর স্থান। ধ্রুব যখন নিজের জাহাজে পৌঁছল তখন সূর্য ডুবতে চলেছে। শেষ বিকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সার সার নোঙর ফেলা জাহাজের মাস্তুলে। মাথার ওপর ওড়াওড়ি করছে গাংচিলের দল। বন্দরের কোলাহল-ব্যস্ততাও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।

ধ্রুব জাহাজে উঠে সবাইকে নিয়ে সোজা এগোল ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে। ক্যাপ্টেন রাজন দক্ষিণ ভারতীয়। বেশ সভ্য-ভদ্র লোক। ধ্রুবর সঙ্গে এরকম উদ্ভট পোশাকের লোক দেখে প্রথমে চমকে গেছিলেন তিনি। ধ্রুব তাঁদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেবার পর ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের তরফে কথা শুরু হল। ক্যাপ্টেনকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতে লাগল বিয়ার্ড আর ফক্স। মার্লিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে।

রাজন ডেকে পাঠালেন চিফ রেডিও অপারেটরকে। ডি’সুজা বলে সে লোকটা বেশ বৈষয়িক। সে বলল যে ধ্রুবকে ছেড়ে দিতে তার কোনো আপত্তি নেই। প্রয়োজনবোধে ‘শ্রীগণেশের’ মোগাদিসু বন্দর পর্যন্ত যাবার কাজটা সে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু ওই ক’টা দিনের জন্য ধ্রুবর যা প্রাপ্য হয় সেটা বাড়তি তাকে দিতে হবে।

কথাটা শোনার সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, প্রয়োজনবোধে তিনিই সেটা দেবেন।

সব কথা শোনার পরও কিন্তু কিন্তু করতে লাগলেন ক্যাপ্টেন রাজন। বিয়ার্ড এবার ধ্রুবকে না বলা ক্যাপ্টেনের লাভের কথাটা অস্ত্র হিসাবে প্রয়োগ করলেন। তিনি বললেন, ‘মোগাদিসুতে শেষ কবে গেছিলেন আপনি?

ক্যাপ্টেন রাজন বললেন, ‘তিনবছর আগে।’

ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, ‘আমি ঘুরে এসেছি তিনমাস আগে। ওদিকে যখন যাচ্ছেন তখন নিশ্চয়ই ওদিকের হালহকিকতের খবর রাখেন আপনি। তবুও আমার দেখে আসা সাম্প্রতিক অবস্থাটা বলি। এ তিন বছরে ওখানের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত তিনবছরে সোমালিয়া বন্দরে হাইজ্যাকিং-এর অন্তত ১০০টা ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা ভারতীয় জাহাজও ছিল, জানেন নিশ্চয়। সেখানে সে অর্থে কোনো সার্বভৌম সরকার নেই। তিনজন গোষ্ঠীপতি নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি করে দেশটা চালায়। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছাড়া জাহাজ হাইজ্যাকিং-এর ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। জলদস্যু দমনের জন্য কোনো নৌবাহিনীও নেই সেখানে। চূড়ান্ত এক অরাজক ব্যাপার! সার্বভৌম সরকার না থাকলেও অন্য কোনো দেশের রণতরী তাদের জলসীমায় ঢোকে না। বিদেশি জাহাজ হাইজ্যাকিং বলা যেতে পারে ওখানে একটা শিল্প হয়ে উঠেছে। তাদের জলসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে জাহাজ আমি দেখে এসেছি যাদের হাইজ্যাক করা হয়েছে। মুক্তিপণের জন্য জলদস্যুরা খবর পাঠিয়েছে তাদের দেশে। কবে তা আসবে নাবিকদের তা জানা নেই। হয়তো দেখবেন এখনো তারা দাঁড়িয়ে আছে সোমালিয়ার দরিয়াতে। ঈশ্বর না করুন এ পরিস্থিতির সামনে না আপনাদের মুখোমুখি হতে হয়। আমার ছোট জাহাজ। কয়েকটা মেকি আর পুরানো জিনিস ছাড়া কিছু নেই। কিন্তু আপনার তো খোল ভর্তি কয়েক কোটি টাকার মাল, নাবিকও অনেক। হাইজ্যাকিং-এর জন্য ওদের কাছে আপনাদের জাহাজ একদম লোভনীয়।’

এই বলে সম্ভবত ক্যাপ্টেন রাজনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন বিয়ার্ড। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আর এ ব্যাপারে আপনাকে আমি কী সাহায্য করতে পারি তা বলি। ওখানে আমার পরিচিত হোবিও নামের একজন বেশ প্রভাবশালী লোক আছে। সে লোক একসময় একটা জলদস্যু দল চালাত। এখন একটা সোনার খনি কিনে ব্যবসা করছে। টাকাকড়ির জোরে সে এক গোষ্ঠীপতির কাছের মানুষ। আবার পূর্বতন পেশার সূত্রে হাইজ্যাকারদের সাথেও তার পরিচয় আছে। তারা তাকে বেশ সমীহ করে। বন্দর এলাকাতেই ওর বাড়ি। আমাকেও বেশ শ্রদ্ধা করে। আমার ঠাকুরদার জাহাজে কাজ করত ওর ঠাকুর্দা। একটা পারিবারিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে। আমি ওর নামে আপনাকে একটা চিঠি দিয়ে দেব। আপনার জাহাজের নিরাপত্তার ব্যাপারটা সে দেখবে। নিশ্চিন্তে ক’টা দিন ইচ্ছা কাটাবেন মোগাদিসুতে। আর আপনার লোক তো আমার সঙ্গে রইলই। ওঁর সঙ্গে আমি আগাম পরিচয় করিয়ে দেব হোবিওর। আপনার সুবিধা হবে তাতে। চাইলে, আপনার জাহাজ থেকে এখনই আমি হোবিওকে তার করতে পারি।

এবার কিন্তু ধন্দে পড়ে গেলেন ক্যাপ্টেন রাজন। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড যা বলেছেন মোগাদিসু বন্দর সম্পর্কে তা যে সত্য সে খবর রাখেন ক্যাপ্টেন রাজন। নেহাতই কোম্পানির চাকরি বজায় রাখার জন্যই জাহাজ নিয়ে সোমালিয়াতে যায় নাবিকরা। এ জাহাজও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিমুহূর্তে সেখানে হাইজ্যাকিংয়ের আশঙ্কা থাকে। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের লোক যদি সেখানে সত্যি নিরাপত্তা দিতে পারে সেটা বিরাট ব্যাপার!

আরও বেশ কিছুক্ষণ দুই ক্যাপ্টেনের কথা বলার পর ধ্রুবকে ছাড়তে রাজি হয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন রাজন। অবশ্য শর্ত মোতাবেক মোগাদিসু বন্দরে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের পরিচিত হোবিও নামের লোকটার উদ্দেশে একটা চিঠিও লিখিয়ে নিলেন রাজন। জাহাজের ওয়ারলেস ফোনেও বিয়ার্ড লোকটার সঙ্গে ক্যাপ্টেন রাজনের কথা বলিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাইন পাওয়া গেল না। ওদিকের পরিষেবা ব্যবস্থা এখনো ততটা নাকি উন্নত নয়। তবে মোগাদিসুতে নেমেই লোকটার সঙ্গে ধ্রুব পরিচয় করিয়ে দেবেন এ প্রতিশ্রুতি বিয়ার্ড ক্যাপ্টেন রাজনকে দিলেন। কথা হল, তারপর ধ্রুব পুরো পরিস্থিতি জানিয়ে দেবে ক্যাপ্টেন রাজনকে।

কাগজপত্র সইসাবুদ সব জাহাজে বসেই হয়ে গেল। নতুন মালিক ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের জাহাজে ওয়ারলেস রেডিও অপারেটরের কাজে কাগজেকলমে সেই মুহূর্তেই যোগদান করল ধ্রুব।

ফক্স আর মার্লিনকে নিয়ে জাহাজ থেকে নামার আগে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ধ্রুবকে বলে গেলেন ভোর চারটাতে তাঁর লোক নৌকা নিয়ে জেটির নির্দিষ্টস্থানে অপেক্ষা করবে তাকে জাহাজে নিয়ে যাবার জন্য।