মালয় বনের আতঙ্ক – ৩

বেলা দশটাতেই ঘর ছেড়ে বাড়ির বাইরে বেরোল সুদীপ্তরা। যে গাড়িতে তারা এসেছিল সেই গাড়িতেই তাদের আর দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে কুলি বস্তির দিকে রওনা হলেন গুরুমূর্তি। সতর্কতার কারণেই এবার কাঁধে একটা বন্দুক নিয়েছেন তিনি। বাড়ির কম্পাউন্ড ছেড়ে প্রথমে বনপথে প্রবেশ করল গাড়ি। গুরুমূর্তি বললেন, ‘কুলি বস্তিতে আমাদের একটা ঘর আছে সেখানেই ওই লোকগুলোকে আসার জন্য খবর পাঠিয়েছি। তবে ওই কুলি সর্দারটার ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকবেন। ওর কাছেও একটা বন্দুক আছে। সেটা বাগানেরই বন্দুক। কায়দা করে সেটা নিয়ে নিতে পারলে ভালো হয়।’

রবার বন গভীর থেকে আরও গভীরে চলে গেছে। বিরাট বিরাট কালচে-সবুজ পাতাগুলোর জন্য বনের ভিতর বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। ঘেঁষাঘেঁষি-ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। গুরুমূর্তি সুদীপ্তদের বললেন, ‘এটা প্ল্যান্টেড রবার ফরেস্ট নয়। প্রাকৃতিক বন। তাই গাছগুলো যে যার মতো বেড়ে উঠেছে। প্ল্যান্টেড ফরেস্টগুলোতে নির্দিষ্ট ব্যবধানে গাছের চারা রোপণ করা হয়। সে-সব বন এত ঘন হয় না।’

হেরম্যান জানতে চাইলেন, ‘বনের সর্বত্র কি গাড়ি চলাচলের রাস্তা আছে?’

গুরুমূর্তি জবাব দিলেন, ‘প্ল্যান্টেড ফরেস্ট না হবার কারণই নেই। অধিকাংশ জায়গাতেই পায়ে হেঁটে ট্যাপ করতে যেতে হয়। সাধারণত সন্ধেবেলা ট্যাপ করে চ্যানেল আর পাত্র ঝুলিয়ে আসা হয়। আর পরদিন দুপুরে গিয়ে ল্যাটেক্স বা তরল রবার সংগ্রহ করা হয়। তারপর ল্যাটেক্সে অ্যামোনিয়া সলিউশান মিশিয়ে ড্রামে পোরা হয় যাতে তা জমে না যায় তার জন্য।

সুদীপ্ত জানতে চাইল, ‘একটা গাছ থেকে কতদিন ল্যাটেক্স পাওয়া যায়?’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘পদ্ধতিটা হল, হাফ-স্পাইরালভাবে গুঁড়ির ওপরের আস্তরণ প্রথমে কেটে ফেলতে হয়। তারপর ওই ছালের নিচে ল্যাটেক্সবাহী যে নালি আছে তাতে সরু চ্যানেল বসাতে হয়। তা গাছের এপাশ-ওপাশ মিলিয়ে গুঁড়ি যদি বেশ প্রমাণ মাপের হয় তবে একটা গাছ থেকে পাঁচ বছরও ল্যাটেক্স সংগ্রহ করা যায়। তারপর আবার বেশ কয়েক বছরের জন্য বিশ্রাম দিতে হয় সে-গাছকে।’

হেরম্যান বললেন, ‘তার মানে তো অন্ধকার নেমে গেলেও বনে থাকতে হয় অনেক সময়?’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটাই তো সমস্যা। এক সময় তো বাতি নিয়ে সারা রাতও ট্যাপ করত শ্রমিকরা। তারা যত কাজ করবে ততই তো পয়সা। কিন্তু এখন দিনেরবেলাও কেউ বনে ঢুকতে চাইছে না।’

সুদীপ্তদের গাড়ি কিন্তু বনের গভীরে প্রবেশ করল না। বনের একপাশ ঘেঁষে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎই বন শেষ হয়ে গেল। সামনে একটা ফাঁকা অঞ্চল। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সারসার টিনের চালওয়ালা ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, রবার বাগিচার কুলি বা শ্রমিক মহল্লা। বেশ ঘিঞ্জি পরিবেশ চারপাশে। নানা জায়গাতে মানুষের জটলা। মালয়ী, চিনা, সিংহলী, ভারতীয়—নানা জাতের মানুষ থাকে সেখানে। সুদীপ্তদের গাড়ি ঢুকে পড়ল শ্রমিক বস্তিতে। তারপর গিয়ে দাঁড়াল বাগানের ছোট্ট অফিসটা যেখানে আছে সে-জায়গাতে। ইতিমধ্যেই সুদীপ্তদের আগমনবার্তা পেয়ে বাড়িটার সামনে জড়ো হয়েছে বেশ কিছু মানুষ। গাড়ি থেকে নেমে তাদের ভিড় ঠেলে বাড়িটায় ঢুকে অফিস ঘরে সুদীপ্তদের নিয়ে গিয়ে বসালেন গুরুমূর্তি। একজন লোক ছিল সে-ঘরে। সুদীপ্তদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে গুরুমূর্তি তার উদ্দেশে বললেন, ‘ওদের তিনজনকে এক-এক করে ঘরে পাঠাও। ওরা ঘরে ঢুকলে দরজা বন্ধ করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। একজন না বেরোলে অন্য কাউকে ঢুকতে দেবে না।’

গুরুমূর্তির কথা শুনে ঘাড় নেড়ে লোকটা চলে গেল তার আদেশ পালন করতে। মিনিট খানেকের মধ্যেই সুদীপ্তদের ঘরে প্রথমে এসে হাজির হল বছর পনেরো-ষোলোর একটা চিনা মেয়ে। তার মুখভর্তি বসন্তের দাগ। ভীত চাহনি। পোশাক-পরিচ্ছদে বিবর্ণতার

স্পষ্ট ছাপ। গুরুমূর্তি জানালেন মেয়েটার নাম ‘ফাও’।

ফিলিপ, গুরুমূর্তির উদ্দেশে বললেন, ‘ওকে ঘটনাটা বলতে বলুন আর আপনি সেটা অনুবাদ করে দিন।’

সুদীপ্ত প্রস্তুত হল ‘ফাও’ নামে মেয়েটার জবানবন্দি হেরম্যানের ইচ্ছানুসারে মোবাইল ফোনে রেকর্ড করার জন্য।

একটু ভীতভাবে ফাও বলতে শুরু করল, ‘মাস দুই আগের ঘটনা। তখনও ঠিকমতো ভোর হয়নি। অন্ধকারে ল্যাম্প নিয়ে আমি আর আমার এক সঙ্গী জঙ্গলে গেছিলাম রস সংগ্রহ করতে। জঙ্গলের ভিতর যেখানে সরু একটা নালামতো আছে ঠিক তার পাড়ে। একটার পর একটা গাছে ঝোলানো বাটি থেকে রস সংগ্রহ করতে করতে আমরা দু’জনের থেকে দু’জন যে কখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলাম তা খেয়াল করিনি। আমার বালতি ভরে ওঠার পর আমি সঙ্গীর খোঁজ করতে করতে হাঁটতে লাগলাম। হঠাৎ কয়েকটা বড় গাছের আড়ালে অস্পষ্ট শব্দ শুনে আমার সঙ্গী সেখানে আছে ভেবে জায়গাটাতে যেতেই একদম মুখোমুখি হয়ে গেলাম তাদের!’ এ-পর্যন্ত বলে সম্ভবত সে-দৃশ্যের কথা চিন্তা করেই ভয়ে মৃদু কেঁপে উঠল মেয়েটা।

ফিলিপ প্রশ্ন করলেন, ‘ঠিক কী রকম দেখতে তাদের? ক’জন ছিল তারা?’

মেয়েটা বলল, ‘দু’জন। আকারে মানুষের মতোই। কিন্তু মাথার চুল, গোঁফ-দাড়ি সব লম্বা লম্বা। আর সারা দেহও লম্বা লম্বা কালো লোমে ঢাকা। তারা তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।’

ফিলিপ বললেন, ‘এমনও তো হতে পারে যে ওরা ওরাংওটাং বা ওই ধরনের প্রাণী? ওরাংওটাং তো এ-জঙ্গলে আছে।’

মেয়েটা বলল, ‘না। ওরাংওটাং অমনভাবে মানুষের মতো সোজা দাঁড়াতে পারে না, ঝুঁকে দাঁড়ায়। আমি অনেকবার ওরাংওটাং দেখেছি। তাছাড়া তাদের কোমরে ছোট কাপড়ের ফালি জড়ানো ছিল।’

হেরম্যান বললেন, ‘তুমি ঠিক দেখেছ যে ওদের কোমরে কাপড়ের ফালি ছিল?’

ফাও বলল, ‘হ্যাঁ, ছিল। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’

হেরম্যান বিড় বিড় করে বললেন, ‘তবে কি তারা সেই প্রথম আদিম মানুষ যারা প্রথম লজ্জা নিবারণ করতে শিখেছিল?’

‘তারপর কী হল?’ শেষ প্রশ্ন করলেন ফিলিপ।

মেয়েটা জবাব দিল, ‘ওরা দাঁত বার করে হাসছিল আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। অন্যরা আমাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে আনে।’

মেয়েটা তার বয়ান দিয়ে চলে যাবার পর যে ঘরে ঢুকল সে একজন মাঝবয়সি শক্তপোক্ত চেহারার মালয়ী। তার নাম ইসমাইল। গুরুমূর্তির প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘ঘটনাটা তো তোমাকে আগেও বলেছি সাহেব। সূর্য ডোবার কিছু আগে আমি বনে ঢুকেছিলাম গাছে ট্যাপ করার জন্য। বেশ ক’টা গাছ ট্যাপ করতে করতে চাঁদ উঠল এক সময়। হঠাৎ একটা গাছ ট্যাপ করতে গিয়ে আমার বাটালিটা গেল ভেঙে। সঙ্গে আমার একটা বাটালি ছিল কাজেই বাটালিটা আমি ছুড়ে ফেললাম একটা গাছের আড়ালে। সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা মৃদু চিৎকারের শব্দ হল, আর গাছের আড়াল থেকে চাঁদের আলোতে বাইরে বেরিয়ে এল সেই ভয়ংকর মানুষটা। বাটালিটা সম্ভবত তার গায়ে গিয়ে পড়েছিল। কী বীভৎস তাকে দেখতে! সারা গায়ে বড় বড় লোম! চোখদুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে…।’

ফিলিপ লোকটার উদ্দেশে বললেন, ‘তুমি কি কোনো নেশা করো?’

ইসমাইল দৃঢ়ভাবে বলল, ‘না, আমি কোনো নেশা করি না। আর ভুল-ও দেখিনি। মাত্ৰ দশ হাত দূর থেকে আমি তাকে স্পষ্ট দেখেছি।’

হেরম্যান জানতে চাইলেন, ‘তারপর কী হল?’

মালয়ী জবাব দিল, ‘সেই ভয়ংকর প্রাণীটা এরপর এক পা এক পা করে আমার দিকে এগোতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তারপর পিছু ফিরে ছুটতে শুরু করলাম।’

তৃতীয় জন যে সেই লোমশ মানুষের দর্শন পেয়েছে সে একজন অতিবৃদ্ধ বার্মিজ। নাম ওলাং। সে জানাল, ‘বয়স হওয়ার কারণে আমি আর এখন গাছ ট্যাপ করতে পারি না। অন্যের ট্যাপ করা গাছ থেকে ল্যাটেক্স সংগ্রহ করি। তার বিনিময়ে তারা কিছু পয়সা দেয় আমাকে। ল্যাটেক্স সংগ্রহ করার টিনের ড্রাম আর বাঁকটা, যা নিয়ে আমি বনে যাই। সে-দুটো বাগানের অফিসের চৌহদ্দির মধ্যেই রাখা থাকে। মাসখানেক আগে আমি ভোরের আলো ফোটার আগে রোজকার মতো বাগানের অফিসে গেলাম সেগুলো সংগ্রহ করার জন্য। ড্রামের বাঁকটা কাঁধে নিয়ে সবে বনে ঢুকতে যাব, ঠিক সেই সময় হঠাৎই দেখতে পেলাম তাদের। পুরনো গোডাউনের পিছনে যে জায়গা থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়েছিল তারা। লোমওয়ালা দুটো মানুষ। তাদের দেখে থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তারাও তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। আমার আর বনে ঢোকার সাহস হয়নি। ভোরের আলো ফোটার পর অন্যেরা যখন একে একে সেখানে আসতে শুরু করল তখন আমি তাদের ব্যাপারটা জানাই।’

হেরম্যান লোকটার কথা শুনে মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘তার মানে একদম আমাদের বর্তমান বাসস্থানের হাতার মধ্যে তাদের দেখা গেছে!’

ফিলিপ ব্যাপারটাতে আমল না দিয়ে বললেন, হতে পারে তারা বাগানেরই কোনো লোক। বুড়োটা আধো অন্ধকারে ভুল দেখেছে।’

এ-কথা বলে ফিলিপ সে-লোককে কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দুম করে দরজায় একটা শব্দ হল। লাথি মেরে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল একজন লোক। মাঝবয়সি। লোকটার দানবের মতো চেহারা। গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, চোখ দুটো লাল। পরনে একটা ধুতি হাঁটুর ওপর গুটিয়ে পরা, গায়ে নেটের গেঞ্জি। পিঠে একটা বন্দুক। রাবণের মতো চেহারার এ-লোকের পরিচয় বুঝতে অসুবিধা হল না সুদীপ্তদের। কুলি সর্দার রাবণ!

লোকটা সোজা এসে দাঁড়াল সুদীপ্তদের সামনে। তারপর উদ্ধতভাবে বলল, ‘তোমরা কি লোকজনকে বনে পাঠাবার জন্য এসেছ? বাগানে আর কেউ কাজে যাবে না।

ফিলিপ বললেন, ‘হ্যাঁ বাগানটা আমরা চালু করতেই এসেছি। এখানে ব্যাপারটা কী ঘটছে তা জানার চেষ্টা করছি লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। তোমার কোনো বক্তব্য থাকলে, দাবি থাকলে আমাদের বল?’

রাবণ বলল, ‘একটাই বক্তব্য বাগানে কেউ কাজে যাবে না।’

‘কেন যাবে না?’ জানতে চাইলেন ফিলিপ।

রাবণ জবাব দিল, ‘বাগানে গিয়ে ওই লোমশ মানুষের হাতে যদি কারও প্রাণ যায় তখন?’

ফিলিপ বললেন, ‘ওই লোমশ মানুষ বা বনমানুষ তো কাউকে আক্রমণ করেনি? যদিও ওদের অস্তিত্ব আমি বিশ্বাস করি না।’

রাবণ এবার বেশ রুক্ষস্বরে বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না সাহেব। শুধু এটুকু তোমাদের জানাতে চাই যে রবার বনে কেউ কাজে যাবে না।’

ফিলিপ এবার তার মোক্ষম চালটা চাললেন। তিনি বললেন, ‘কোম্পানি আর ক্ষতি স্বীকার করবে না। বসিয়ে বসিয়ে এই কুলি লাইনের লোকজনকে খাওয়াবে না। এখানকার ব্যবসা গুটিয়ে নেব আমরা। তবে বাগানটার ইজারার টাকা অগ্রিম সরকারকে দেওয়া আছে। সে ইজারা আমরা অন্য কোনও রবার কোম্পানিকে হস্তান্তর করব না। শ্রমিকরা যখন খেতে পাবে না তখন কিন্তু তারা তোমাকেই দুষবে।’

এ কথাটা শুনে কেমন যেন থমকে গেল রাবণ। তারপর গুরুমূর্তির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওর জন্যই তো বাগানের এই অবস্থা। ওকে বলতাম বাগানের অফিসে আর যে দুটো বন্দুক আর টোটার বাক্স আছে তা আমাকে দিতে। একদল লোক নিয়ে জঙ্গল তল্লাশি চালাব আমরা। কিন্তু এই মালিক রাজি নয়।’

গুরুমূর্তি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘বাকি বন্দুক দুটো তোমাকে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং তোমার কাছে যে বন্দুকটা আছে তা এখন আমাদেরকে জমা দাও। তোমার মতলব সম্বন্ধে আমার সন্দেহ আছে।’

রাবণ সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘না এ বন্দুক আমি ফেরত দেব না।’ গুরুমূর্তিও উত্তেজিতভাবে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমার স্পর্ধা দিন-দিন সীমা ছাড়াচ্ছে। মালিকদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় তুমি জানো না দেখছি। কাঁধ থেকে বন্দুক খুলে রাখ। নইলে….।’

রাবণ বলে উঠল, ‘নইলে তুমি কী করবে শুনি? তোমার যদি ক্ষমতা থাকে তবে বন্দুকটা কেড়ে নাও। জঙ্গলে আমাকে লক্ষ্য করে কে গুলি ছুড়েছিল আমি বুঝেছি। আত্মরক্ষার জন্যেও ওটা আমার প্রয়োজন। বন্দুক আমি দেব না।’

গুরুমূর্তি বলে উঠলেন, ‘এ-সব তোমার বানানো মিথ্যা কথা। তোমাকে কে গুলি করতে যাবে? সেই লোমশ মানুষ?’

পরিস্থিতি এবার হাতের বাইরে চলে যেতে পারে দেখে ফিলিপ এবার বলে উঠল, ‘থামুন, থামুন। আপনারা দুজনেই চুপ করুন। যা বলার আমি বলব।

পরস্পরের দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টি হেনে ফিলিপ কী বলেন তা শোনার প্রত্যাশায় তার মুখের দিকে তাকালেন গুরুমূর্তি আর কুলি সর্দার রাবণ।

মুহূর্তখানেক ভেবে নিয়ে ফিলিপ বললেন, ‘দেখো রাবণ, তুমি শ্রমিক সর্দার। তোমার থেকে আমরা দায়িত্বশীল ব্যবহার আশা করি। বাগানে কাজ না হলে শ্রমিক-মালিক দু’পক্ষরই ক্ষতি। বন্দুক দুটো তোমাকে দেওয়া যাবে না এখন। ওগুলো এখন আমাদের কাজে লাগবে। তোমার বন্দুকটাও আপাত ফেরত দিতে হবে না। একটা কাজ করা যাক। আমরা সবাই মিলে একটা অনুসন্ধান চালাই রবার বনে। ক’দিন খুঁজেও যদি ওই লোমশ মানুষদের সন্ধান না পাওয়া যায় তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে ব্যাপারটা নেহাতই ভুল ধারণা। যে তিনজন তাদের দেখেছে তারা আসলে ওরাংওটাং বা অন্যকিছু দেখেছে, তল্লাশিতে তেমন কিছু না পাওয়া গেলে কুলি শ্রমিকদের ভয়ও অনেকটা কেটে যাবে। আর তারপর তোমাদের অন্য কোনো দাবি থাকলে তা নিয়ে আলোচনায় বসা যাবে।’

ফিলিপের কথা শুনে হেরম্যান এবার বলে উঠলেন, ‘একদম সঠিক সিদ্ধান্ত। ওই লোমশ মানুষের খোঁজে বাগানটা দেখা প্রয়োজন।’ গুরুমূর্তি কথাটা শুনে বললেন, ‘এই রবার বন মাইলের পর মাইল বিস্তৃত। লোমশ মানুষের খোঁজে কতদূর সন্ধান চালাবেন আপনারা?’

হেরম্যান হেসে বললেন, ‘যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। আমাদের কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে যাবার অভিজ্ঞতা আছে।’

এ-কথা শুনে গুরুমূর্তি চুপ করে গেলেন, আর রাবণ কী যেন একটা ভেবে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে তবে তাই হবে। কিন্তু তোমরা তোমাদের মতো খুঁজবে, আমি আমার মতো। এই বলে সে আরও একবার গুরুমূর্তির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাবণ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় গুরুমূর্তি মন্তব্য করলেন, ‘লোকটা পাকা শয়তান। ফিলিপ বললেন, ‘ও শয়তান হোক আর যাই হোক, আপাতত ওর সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া ঠিক হবে না। কৌশলে ব্যাপারটা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এখানকার কাজ আপাতত শেষ। চলুন এবার বাগানে যাওয়া যাক।’

ফিলিপের কথামতো সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে চেপে বসল সবাই।