ডাকাউ ক্যাম্পের বন্দি – ৪

মুলারকে এগিয়ে দিয়ে আবার নিজের চেয়ারে বসল ডায়না। কথা শুরু হল আবার। জুয়ান, লুবেনেস্কিকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার সঙ্গে অন্য যারা মুক্তি পেয়েছিলেন তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ আছে আপনার?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘আমার সঙ্গে যারা ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল ভিনদেশি। মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে যায় তারা। তাদের সঙ্গে আর কোনোদিন যোগাযোগ হয়নি। তবে জার্মানিতে মিউনিখে যারা ছিলেন দশ-পনেরো বছর আগে পর্যন্ত মিউনিখ গেলে নানা অনুষ্ঠানে দেখা হত তাঁদের সঙ্গে। কিন্তু একে একে তাঁরা সবাই ওপরে চলে গেছেন আমিই একা বেঁচে আছি। অবশ্য জার্মানির অন্য জায়গাতেও হয়তো কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ফেরত অন্য কেউ থেকে থাকতে পারেন। এত বড় দেশ। তাঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।

এ কথা বলার পর একটু হেসে তিনি বললেন, জানেন তো হিটলারের নির্দেশে নানা অদ্ভুত গবেষণা করতেন তার অনুগত বৈজ্ঞানিকরা। এমন কী তিনি নাকি মৃত মানুষকে বাঁচানো, সোনা তৈরি, এসব চেষ্টাও করেছিলেন। মেডিকেল হাউসে থাকার সময় ডাক্তার-গবেষকরা প্রতি সপ্তাহে আমাকে একটা অজানা ইঞ্জেকশন দিতেন। কীসের ইঞ্জেকশন তা আমার জানা নেই। হয়তো হিটলার মানুষের অমরত্ব বা দীর্ঘ জীবন নিয়ে কোনো পরীক্ষা করছিলেন আমার ওপর। সেজন্যই আমি এতদিন যে বেঁচে আছি, সেই ইঞ্জেকশনগুলোর প্রভাবে আজও বেঁচে আছি।’ —এই বলে নিজের রসিকতায় মৃদু হাসলেন তিনি। জুয়ানও হেসে বললেন, ‘যে কারণেই হোক এভাবেই যেন আমাদের মাঝে আরও দীর্ঘ দিন কাটান আপনি!’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘এমনিতে শরীরটা বয়স অনুযায়ী সুস্থই আছে। চশমাও লাগে না আমার। শুধু মাঝে-মাঝে বাতের ব্যথায় কষ্ট পাই। সেটা তেমন কিছু নয়।’

দীপাঞ্জন এবার জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, সে সময়ের কোনো সুভ্যেনির আছে আপনার কাছে? যা আপনারা বা ন্যাৎসি গার্ডরা ব্যবহার করত ক্যাম্পে।’ লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা জিনিস আছে। হয়তো জিনিসটা আপনারা দেখেছেন মিউজিয়ামে। সেটা দেখতে আপনাদের ভালো লাগবে কিনা জানি না। তবু দেখাচ্ছি।’ –এই বলে তিনি জিনিসটা আনার জন্য ইঙ্গিত করলেন ডায়নাকে। সে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে জিনিসটা এনে রাখল টেবিলে। ছোট দুধের কৌটোর মতো দেখতে সিল করা ধাতুর তৈরি একটা কৌটো। তার গায়ে কী লেখা আছে সেটা আর এখন পড়া যাচ্ছে না। তবে এমন একটা কৌটো যেন ডাকাউ মিউজিয়ামের কোনো একটা গ্যালরিতে দেখেছিল বলে মনে হল দীপাঞ্জনের।

জুয়ান কৌটো হাতে নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কীসের কৌটো এটা?’

লুবেনেস্কির জবাব শুনে চমকে উঠল জুয়ান আর দীপাঞ্জন। লুবেনেস্কি বললেন, ‘সায়ানাইডের। ওর ভিতর সায়ানাইড পাউডারের পাউচ আছে। ওর থেকে গ্যাস উৎপন্ন করা হত। গ্যাস চেম্বারের দেওয়ালের বাইরে বেশ কিছু ট্যাঙ্ক আছে। সেখানে ঢেলে দেওয়া হত এই পাউচ। সেখান থেকে কয়েকটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সায়ানাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়ে নলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত চেম্বারে। এই পাউচ যদি জলে মেশানো যায় তবে অনায়াসে হাজার পাঁচেক মানুষের মৃত্যু হতে পারে।’

দীপাঞ্জন কাঁপা কাঁপা হাতে সেই মারণ কৌটোটা নিয়ে দেখার পর প্রশ্ন করল, ‘এর ভিতরের পাউডারটা কি এখনও কর্মক্ষম আছে?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ। আসলে মারণাস্ত্র মনে হয় দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকে। বিশেষত বিষ আর মাইন। আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে আজও ফরাসি আর ব্রিটিশদের যাট-সত্তর বছর আগে পেতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে অনেকের মৃত্যু হয়। এই সায়ানাইড আর সালফাইড গ্যাস দিয়ে হিটলার যে কত মানুষকে খুন করে ছিলেন তার হিসাব নেই। অনেকে বলেন যে, হিটলারের মানুষ খুনের সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া যায় তার সংখ্যাটা আসলে দ্বিগুণ।’

তাঁর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে রইল দীপাঞ্জনরা।

লুবেনেস্কি এরপর দীপাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে যে কথাটা বললেন তাতে অবাক হয়ে গেল দীপাঞ্জন। তিনি বললেন, ‘ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে একজন ইন্ডিয়ানও ছিল। সে বেঙ্গলি। তার কাছ থেকে ইন্ডিয়ার অনেক গল্প শুনেছি আমি। ও দেশটা নাকি রাজা, পণ্ডিত আর সন্ন্যাসীদের দেশ। আর ওই সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকে নাকি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন।’

দীপাঞ্জন বিস্মিতভাবে বলে উঠল, ‘ইন্ডিয়ান! বেঙ্গলি! আমিও তো বেঙ্গলি।’

বৃদ্ধ লুবেনস্কি যেন তার কথা শুনে বেশ উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘তার নাম গুন্ডর চকরবটি।’ আমরা মুক্তি পাবার মাসখানেক আগে সে ক্যাম্পে এসেছিল। সে ছিল ব্রিটিশ বাহিনীর সৈনিক। জার্মানরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ধরে এনেছিল তাকে। মার্কিন সেনারা আমাদের মুক্ত করার মাসখানেক আগে সে ডাকাউ ক্যাম্পে এসেছিল। তার সঙ্গে আমার একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল। তার কাছ থেকেই আমি ইন্ডিয়ার খবর শুনেছি।’ ‘গুন্ডর চকরবর্টি!’ তাঁর মানে, ‘গুণধর চক্রবর্তী!’ নামটা বুঝতে পারল দীপাঞ্জন। গুণধর চক্রবর্তী নামটা দীপাঞ্জন সঠিকভাবে উচ্চারণ করতেই লুবেনেস্কি বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই নাম। আসলে ভারতীয় নামটা আমি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারি না। আমি তাঁকে ডাকতাম গুন্ডর বলেই।’

দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘তারও কি মুক্তি হয়েছিল?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘না, সে উধাও হয়েছিল ক্যাম্প ছেড়ে। তারপর তাঁর কী হয়েছিল আমার জানা নেই। লোকটা সংস্কৃত ভাষা জানত। শুনেছি ওটা আপনাদের দেশের প্রাচীন ভাষা। শাস্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শন—সবই নাকি এক সময় লেখা হত ওই ভাষাতে। স্বয়ং ফুয়োরার হিটলারও নাকি ওই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আপনি সংস্কৃত ভাষা জানেন?’ —এই বলে লুবেনেস্কি তাকালেন দীপাঞ্জনের দিকে। তাঁর কথা শুনে হঠাৎই একজনের কথা কাকতালীয়ভাবে মনে পড়ে গেল দীপাঞ্জনের। সে যে ইস্কুলে পড়েছে সেখানকার সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলেন তিনি। কাঞ্জিলালস্যার। এখনও বেঁচে আছেন তিনি। বয়স প্রায় আশি হবে। দীপাঞ্জনদের পাড়াতেই তিনি থাকেন। মাধ্যমিকে দীপাঞ্জনের অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট ছিল সংস্কৃত। নম্বর তোলার জন্যই পদার্থবিদ্যা, রসায়নের মতো বিষয় না-নিয়ে সংস্কৃত বেছে নিয়েছিল সে। কাঞ্জিলালস্যারই তাকে পড়াতেন। জার্মানি আসার আগে এই সেদিনও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল দীপাঞ্জনের। তিনি বেতো রুগি। বাইরে বেরোতে পারেন না। বারান্দায় বসেছিলেন। দীপাঞ্জন তাঁকে জার্মানি আসছে জানাতেই তিনি বলেছিলেন, ‘বাঃ বেশ ভালো খবর। কিন্তু তোমরা তো আর সংস্কৃত পড়লে না। বিজ্ঞান শিখতে চলে গেলে। তবে যে দেশে তুমি যাচ্ছ সে দেশে এক সময় হিটলার থেকে ম্যাক্সমুলার এ ভাষাটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, দীপাঞ্জনের মনে পড়ে গেল কথাটা। যদিও সংস্কৃততে লেখা বা পড়ার কোনো ক্ষমতাই আজ আর দীপাঞ্জনের নেই। যেমন হয়, পরীক্ষার জন্য পড়া বিষয়টা ভবিষ্যতে অনেকেই ভুলে যায়। দীপাঞ্জন শুধু জবাব দিল, ‘সংস্কৃত আমার পড়ার বিষয় ছিল।’

তার জবাব শুনে লুবেনেস্কি বললেন, ‘বাঃ, বেশ! শুনেছি প্রাচীন ঐতিহ্য-শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যাপারে ভারতীয়রা বেশ যত্নশীল।’ দীপাঞ্জন আর কোনো কথা বাড়াল না এ ব্যাপারে। লুবেনেস্কি যদি সংস্কৃত ভাষার ব্যাপারে এরপর কিছু জানতে চান তবে বিপদ হবে। জুয়ান, লুবেনেস্কিকে এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘সবাই তো দেশে ফিরে গেছিল, তবে আপনি ফিরলেন না কেন?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আমি আমার দেশের কথা ভুলে গেছিলাম। ঠিকানাও ভুলে গেছিলাম। তাছাড়া এ জায়গাতে থাকতে-থাকতে জায়গাটার ওপর মায়া জন্মে গেছিল। বিশেষত ওই ক্যাম্পটার ওপর। আমি প্রতিদিন বিকালে ট্যুরিস্টরা যখন ফিরে যেত তখন ওই ক্যাম্পে গিয়ে বসে থাকতাম। কত স্মৃতি জমা হয়ে আছে ওখানে। যাদের সঙ্গে সেখানে ছিলাম আমি, যাদের আর ঘরে ফেরা হল না তাদের মুখগুলো ভেসে উঠত চোখের সামনে। বিশেষত আমার দাদার মুখ। সেতো ওখানেই রয়ে গেছে।’…

দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘এ বাড়িতে তবে একাই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন আপনি?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, একাই। এমনি কোনো অসুবিধা হয়নি আমার। এখানকার মানুষ আমাকে শ্রদ্ধা করে। সুবিধা-অসুবিধায় পাশে থাকে।’ —একথা বলার পর লুবেনেস্কি হেসে বললেন, ‘এমন কী এখানকার চোরেরাও আমার ওপর সদয় আচরণ করে।

দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘সেটা কেমন ব্যাপার?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘আগে এদিকে চোরের উপদ্রব ছিল না। তবে ইদানীং হয়েছে। গত ছ-মাসে অন্তত আমার ল্যাবরেটরি রুমের দরজা ভেঙে তিনবার চোর ঢুকেছিল বাড়িতে। তবে তারা যাবার সময় কিছু নিয়ে যায়নি। হয়তো বা অভ্যাসবশত ঢুকেছিল বাড়িটাতে। তারপর এটা আমার বাড়ি বুঝতে পেরে শুধু জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেই চলে গেছে।’

ডায়না বলল, ‘আমি-তুমি হলে কিছুতেই থাকতে পারতাম না একলা। এই চোর-ডাকাতের নাম শুনলেই ভয় লাগে। ওরা তো খুনটুনও করে।’ বৃদ্ধ লুবেনেস্কি হেসে বললেন, ‘আমি ডাকাউ ক্যাম্পে যে সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি তাতে মৃত্যু ভয় আমার অনেকদিন চলে গেছে। আমার তো অনেকদিন আগেই মৃত্যু হবার কথা। আজ মনে হয় নিজের দেশে ফেরার পর আমার মৃত্যুর বন্দোবস্ত করে রেখেছেন ঈশ্বর। জুয়ান জানতে চাইলেন, ‘কবে পোল্যান্ড ফিরে যাচ্ছেন আপনারা?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘দু-দিন পর। তবে আমি ঠিক করেছি আজ আর কালকের দিনটা আমি ডাকাউ ক্যাম্পেই কাটাব শেষবারের মতো। তারপর এ জায়গা ছেড়ে ডায়নার সঙ্গে দেশে ফিরব।’

দীপাঞ্জন বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, ‘ওরা ওখানে আপনাকে থাকতে দেবে?

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, দেবে। কারণ আমিই এখন ডাকাউ ক্যাম্পের একমাত্র জীবন্ত ইতিহাস। মিউজিয়ামের কিউরেটার, অন্য কর্মী—সবাই শ্রদ্ধা করে আমাকে। শেষবারের জন্য আমি থাকব ওখানে।’

এ কথাগুলো বলার পর লুবেনেস্কি এমন এক অদ্ভুত আকর্ষণীয় কথা বললেন যে হতবাক হয়ে গেল জুয়ান আর দীপাঞ্জন। তিনি বললেন, ‘আপনারাও রাত কাটাবেন নাকি

আমার সঙ্গে? এ সুযোগ আর কোনোদিন পাবেন না।’

কাটানোর প্রস্তাব। ব্যাপারটা ভাবাই যায় না। বিস্মিতভাবে জুয়ান বললেন, ‘ওরা আমাদের একজন জীবন্ত ইতিহাসের সঙ্গে ডাকাউ ক্যাম্পের মতো ঐতিহাসিক স্থানে রাত ওখানে থাকতে দেবে?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, দেবে। আপনি তো ইতিহাসের অধ্যাপক। তার প্রমাণস্বরূপ কোনো কাগজ নিশ্চয়ই আছে?’

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতিপত্র আছে। তাছাড়া এই ইন্টারনেটের যুগে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে কাগজ আনানো কয়েক মিনিটের ব্যাপার।

লুবেনেস্কি বললেন, ‘পরিচয়পত্রটাই যথেষ্ট। আমি বলব যে, আপনারা ইতিহাস গবেষক আমার অতিথি। এ দু-দিন আপনারা আমার সঙ্গী হবেন।’

জুয়ান শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই রাজি। এ দুটো দিন দুর্লভ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে আমাদের জীবনে। আপনারা কখন যাবেন ওখানে? আমাদের যেতে হবে কখন?’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘এ বাড়ি ছেড়ে আজকেই বেরিয়ে যাব আমরা। সঙ্গে জিনিসপত্র তেমন তো কিছু নেই নিয়ে যাবার মতো। শুধু গোটা চারেক সুটকেস। ক্যাম্প থেকে সোজা পোল্যান্ডের দিকে রওনা হব। এ বাড়িতে আর ফিরব না। বিশেষত এ বাড়ির গবেষণাগারটার প্রতি আমার খুব মায়া, যদি আবার মায়ার টানে আটকে যাই? ডায়না কত দূর থেকে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। ও ভীষণ কষ্ট পাবে। বিকাল পাঁচটার মধ্যে আমরা ক্যাম্পের গেটে পৌঁছে যাব। আপনারা ওই সময় তৈরি হয়ে চলে আসুন।’

জুয়ান বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে তাই হবে। আমরা তবে এবার চলি। মিউনিখ ফিরে গিয়ে হোটেল থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আবার আমাদের ফিরে আসতে হবে।’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, আসুন, আমি আপনাদের জন্য প্রতীক্ষা করব।’

ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল দীপাঞ্জনরা। ডায়নাও তাদের বাড়ির বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। দীপাঞ্জনদের সে বিদায় জানাবার আগে বলল, ‘আপনাদের গ্র্যান্ড-পা আমাদের সঙ্গে ডাকাউ ক্যাম্পে থাকার প্রস্তাব দিলেন ঠিকই তবে আপনাদের যদি থাকার ইচ্ছা না-হয়, তবে দরকার নেই। আপনারা ট্যুরিস্ট। এ দেশের নানা জায়গা ঘুরবেন বলে এসেছেন। হয়তো তাঁর প্রস্তাব ফেলতে না-পেরে তার কথায় রাজি হলেন। তেমন হলে আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলে দেব।’

জুয়ান বললেন, ‘না, না, আপনি এ-সব ব্যাপার নিয়ে মোটেও ভাববেন না। তিনি আমাদের এ সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।’

ডায়না মৃদু হেসে বলল, ‘আপনাদের ধন্যবাদ। বিকালে আবার দেখা হবে।’

ডায়না চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে রাইখ হাজির হল গাড়ি নিয়ে। গাড়িতে উঠে জুয়ান রাইখকে বললেন, ‘বিকালেই আবার আমাদের ডাকাউ ক্যাম্পে পৌঁছে দিতে হবে। লুবেনেস্কির সঙ্গে তার অতিথি হয়ে ক্যাম্পে রাত কাটাব আমরা।’

রাইখ একটু বিস্মিতভাবে বলল, ‘ওই ক্যাম্পে রাত কাটাবেন আপনারা! আমরা এতবার এখানে যাওয়া-আসা করি তবু রাত নামলে ও জায়গাটা কেমন হয়ে যায়! প্রবেশ তোরণের সামনে দু-একজন গার্ড থাকে ঠিকই কিন্তু মিউজিয়ামের কর্মীরা সবাই ফিরে যায়। বাইরে থেকে জায়গাটার দিকে তাকালেই কেমন যেন গা-ছমছম করে। তাছাড়া…’

‘তাছাড়া কী?’ জানতে চাইল, দীপাঞ্জন।

রাইখ বলল, ‘বহু মানুষ মারা গেছে ওখানে। রাত নামলেই নানারকম শব্দ শোনা যায়। বন্দিদের শব্দ। এস.এস গার্ডদের শব্দ! একবার এক চোর, চুরি করতে ঢুকেছিল ওখানে। পরদিন তার মৃতদেহ মেলে শাওয়ার রুমের ভিতরে। এস.এস গার্ডরা নাকি তাকে ওখানে টেনে নিয়ে গেছিল।’

জুয়ান হেসে বললেন, তেমন কোনো এস.এস গার্ডের সন্ধান পেলে তো ভালোই হয়। তাকেও দেখা হয়ে যাবে।’

মিউনিখের হোটেল থেকে ডাকাউ ক্যাম্পের গেটে বিকাল সাড়ে চারটে নাগাদ পৌঁছে গেল দীপাঞ্জনরা। টিকিট কাউন্টার চারটেতে বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো দর্শকও নেই ভিতরে। খাঁ খাঁ করছে সামনের চত্বরটা। প্রবেশ তোরণের মুখে শুধু গেটম্যান দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক পাঁচটা নাগাদই একটা গাড়িতে করে গেটের বাইরে উপস্থিত হলেন লুবেনেস্কি আর ডায়না। লুবেনেস্কি দীপাঞ্জনদের উদ্দেশে বললেন, ‘নিন, আমাদের গাড়িতে উঠে পড়ুন।

মালপত্র দীপাঞ্জনদের বিশেষ কিছু নেই। শুধু দুটো ব্যাগ। তা নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল তারা। লুবেনেস্কি বললেন ‘কিউরেটরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়ে গেছে। আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তবে আমাদের সবাইকেও কিন্তু থাকতে হবে ব্যারাকের মধ্যেই। যেখানে বন্দিরা থাকত সে জায়গাতেই। আমিই ওই ব্যবস্থা করতে বলেছি। যাতে শেষ দুটো দিন আমি ফেলে আসা সময়কে অনুভব করতে পারি, স্মৃতি তর্পণ করতে পারি হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর উদ্দেশে।’

ড্রাইভারের পাশের আসনেই বসে ছিলেন লুবেনেস্কি। তাকে দেখে সসম্ভ্রমে গেটম্যান গেট খুলে দিল। গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল সামনের বাড়িটার সামনে। বাড়িটার যে অংশে মিউজিয়াম তার একপাশেই কিউরেটরের অফিস। সে অফিসের দরজার বাইরেই কিউরেটার ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন লুবেনেস্কিকে ফুলের স্তবক দিয়ে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। তার সঙ্গে কয়েকজন মিউজিয়াম কর্মী। লুবেনেস্কিসহ দীপাঞ্জনরা গাড়ি থেকে নামতেই কিউরেটর ভদ্রলোক তার সঙ্গীদের নিয়ে এগিয়ে এসে লুবেনেস্কির হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিলেন। লুবেনেস্কি তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন দীপাঞ্জনদের। কিউরেটর ভদ্রলোকের নাম ম্যাথুজ। তিনি দীপাঞ্জনদের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনাদের কিছু করতে হবে না। শুধু পরিচয়পত্রটা জমা রাখুন। যাবার সময় সেটা ফেরত নিয়ে যাবেন।’ তাঁর কথামতো দীপাঞ্জনরা সেটা তুলে দিল তার হাতে। মিস্টার ম্যাথুজ এরপর লুবেনেস্কির উদ্দেশে বললেন, ‘আপনার কথামতো মেডিকেল হাউসের কাছাকাছি ব্যারাক সেভেনেই মুখোমুখি দুটো বাড়িতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি। ওখানে ইউনেস্কোর একটা পরিদর্শক দল এসেছিল। দুটো বাড়িতেই তাই স্নানঘরের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আলোর ব্যবস্থা কিন্তু নামমাত্র। চলুন, আপনাদের সে জায়গাতে পৌঁছে দিই।’

গাড়ি থেকে মালপত্র নামানো হল। তারপর কিউরেটরের সঙ্গে লুবেনেস্কিকে নিয়ে দীপাঞ্জনরা এগোল ব্যারাক সেভেনের দিকে। সারসার নিস্তব্ধ ব্যারাক বাড়িগুলোর মাঝে রাস্তা ধরে দীপাঞ্জনরা পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট জায়গাতে। ব্যারাক-এক্স, মেডিকেল হাউস আর যে বাড়িটার মধ্যে গ্যাসচেম্বার আছে তার মধ্যবর্তী স্থানে ব্যারাক সেভেন। সেখানে পৌঁছে লুবেনেস্কি আর ডায়নাকে সঙ্গে করে কিউরেটর ঢুকলেন একটা বাড়িতে আর তার দুজন কর্মী দীপাঞ্জনদের নিয়ে এসে দাঁড়াল তার উলটোদিকের চালু ছাদঅলা একইরকম একটা বাড়ির সামনে। বাড়িটার দরজা খুলতেই ভিতর থেকে একটা পুরোনো গন্ধ এসে লাগল দীপাঞ্জনদের নাকে। ভিতরটা অন্ধকার। সুইচ হাতড়ে আলো জ্বালাল এক কর্মী। মাথার ওপর থেকে ঝুলতে থাকা একটা বাল্বের ম্যাটম্যাটে আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। লম্বাটে একটা ঘর। পাথুরে মেঝে। দেওয়ালের একপাশ জুড়ে প্রায় ছাদ পর্যন্ত সারসার কাঠের বাঙ্ক। এক সময় যা বন্দিদের শোবার জায়গা ছিল। ঘরে লোহার মোটা মোটা গরাদালা একটাই জানলা। তার ওপর কাচের শার্শি। সেটা সম্ভবত অনেক পরে বসানো হয়েছে। ঘরে ঢোকার পর মিউজিয়ামের এক কর্মী বললেন, ‘চলুন স্নানঘরটা একবার দেখে নিন।

দীপাঞ্জন এগোল তার সঙ্গে। ঘরের শেষ প্রান্তে একটা দরজা। সেটা খুললেই একটা ছোট স্নানঘর। সেটা বাড়ির পশ্চিম অংশে বলে সে ঘরের গরাদ বসানো জানলা দিয়ে তখনও কিছুটা আলো ঢুকছে ঘরে। কিন্তু স্নানঘরের শাওয়ারটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল দীপাঞ্জন। এই শাওয়ারটাও গ্যাস চেম্বারের সেই শাওয়ারটার মতো। তাছাড়া ঘরের মেঝেতে বেশ কিছু ফুটোও চোখে পড়ল তার। ঠিক যেমন ছিল গ্যাস চেম্বারের মেঝেতেও দীপাঞ্জনের মনের ভাব পাঠ করতে পেরেই বোধহয় মিউজিয়ামকর্মী এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল শাওয়ারের কাছে। তার নব ঘোরাতেই ঝরঝর করে জল বেরোল শাওয়ার থেকে। তারপর সে নবটা বন্ধ করে মৃদু হেসে বলল, ‘আপনার মনে কী ভাবনা হচ্ছিল তা বুঝতে পেরেছি। এটা সত্যিকারের শাওয়ার। আর মেঝেতে যে ছিদ্রগুলো দেখছেন, সেগুলো ইঁদুরের গর্ত। বছর পাঁচেক আগে যখন ইউনেস্কোর প্রতিনিধিদল এখানে এসেছিল, তখন এই স্নানঘরটা বানানো হয়েছিল।’

দীপাঞ্জন এবার হেসে ফেলল তার কথা শুনে।

স্নানঘর থেকে ঘরের মাঝখানে আবার ফিরে এল তারা। মিউজিয়ামের সেই কর্মী ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবার আগে বলল, ‘প্রয়োজন না হলে রাতে বাইরে বেরোবেন না। আশেপাশের ব্যারাক-বাড়িগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত; ইঁদুর আছে। তাদের লোভে মাঝে-মাঝে সাপও আসে। অন্ধকারে তাদের গায়ে পা পড়লেই সর্বনাশ।’

চলে গেল লোকটা। জুয়ান তন্ময়ভাবে ঘুরে ঘুরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলেন কাঠের বাঙ্কগুলো। তিনি এক সময় দীপাঞ্জনের উদ্দেশে বললেন, ‘শোনো, আমরা একসঙ্গে অনেক ঐতিহাসিক জায়গাতে রাত কাটিয়েছি। রোমের প্রাচীন অ্যাম্পিথিয়েটারে থেকেছি, ইংল্যান্ডে পাঁচশো বছরের প্রাচীন শেরউড জমিদারবাড়িতে থেকেছি, কিন্তু এমন অদ্ভুত জায়গাতে কোনোদিন রাত কাটাইনি তাই না? ভাবতে পারছ এই বাঙ্কগুলোতে, এ ঘরের মেঝেতে এক সময় অসহায়ভাবে শুয়ে বসে কেবলমাত্র মৃত্যুর জন্যই প্রতীক্ষা করে থাকত মানুষরা!

ঘরটা ভালো করে দেখা শেষ হলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল দীপাঞ্জনরা। লুবেনেি আর ডায়নাও ঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। লুবেনেস্কি দীপাঞ্জনদের দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে আছেন মেডিকেল হাউসের দিকে। দিনের শেষ আলো এসে পড়েছে প্রাচীন বাড়িটার গায়ে। সেদিকেই তাকিয়ে আছেন তিনি। ডায়নার সঙ্গে দীপাঞ্জনদের চোখাচোখি হতেই সে মৃদু হাসল। দীপাঞ্জনরা হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল তাদের কাছে। লুবেনেস্কি এমন অদ্ভুত চুপচাপ হয়ে তন্ময়ভাবে মেডিকেল হাউসের দিকে চেয়ে আছেন যে পাছে তার সঙ্গে কথা বললে বিরক্তবোধ করেন সে জন্য দীপাঞ্জনরা কথা বলল না তার সঙ্গে। তারাও চুপচাপ তাকিয়ে দেখতে লাগল চারদিকে। সূর্য ডুবে গেছে প্রায়। তার শেষ আভাটুকু ছড়িয়ে পড়েছে সার সার নিঃসঙ্গ ব্যারাকগুলোর মাথায়। কেমন এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গ পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে। ঠান্ডাও এবার পড়তে শুরু করছে ধীরে ধীরে।

দীপাঞ্জনরা হঠাৎ দেখতে পেল সেই গ্যাসচেম্বার আর ওভানঅলা ক্রিমেটরি বাড়িটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন। লোকটারও তাদের দেখতে পেয়ে কিছু সময়ের মধ্যে এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। দীপাঞ্জনরাও যেমন তাকে দেখে একটু বিস্মিত হল, সে লোকটাও তেমনই মৃদু বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনারা এখানে?’

জুয়ান জবাব দিলেন, ‘মিস্টার লুবেনেস্কি দেশে ফিরে যাবার আগে দু-রাত এখানে কাটাবেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে রাত কাটাব এখানে।’

মুলার বললেন, ‘ও আচ্ছা।’

জুয়ান বললেন, ‘আপনি কী করছেন?’

মুলার জবাব দিলেন, ‘ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সবকিছু। শাওয়ার রুমের ওখানে গেছিলাম।’

লুবেনেস্কি বিষণ্ণভাবে বললেন, ‘ওখানেই তো আসলে যাবার ছিল আমারও। ওরা একটা মাত্র দশ বছরের ফুটফুটে ছেলেকে ধরে এনেছিল এখানে। তার অপরাধ ছিল খেলার ছলে ঘুড়ি বানাবার জন্য হিটলারের ছবি দেওয়া একটা প্রচারপত্র ছিঁড়েছিল দেওয়াল থেকে। ওই বাচ্চাটাকেও হিটলারের নেকড়ে বাহিনী ক্ষমা করেনি। বাচ্চাটাকেও নিয়ে গেছিল ওই শাওয়ার রুমে। আর একটা ছেলে। বয়স তার বছর বারো হবে। খেলার মাঠে সে একবার বালক-সুলভ আচরণে বলে ফেলেছিল যে, ‘এমন জোরে আমি এই ফুটবলে লাথি মারব যে মাঠ ছেড়ে বলটা উড়ে গিয়ে ফুয়োরারের খাবার টেবিলে গিয়ে পড়বে।’ লাথির জোর বোঝাবার জন্যই কথাটা বলেছিল ছেলেটা। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে একথার ফল কী মারাত্মক হবে! তার বল ফুয়োরারের টেবিলে না-পৌঁছলেও গোস্টোপোদের কানে গিয়ে সে কথা পৌঁছেছিল। আমাদের ব্যারাকে যখন তাকে আনা হল তার আগেই তার দু-পায়ের গোড়ালি মেরে ভেঙে দিয়েছে হায়নার দল। হাঁটতে পারত না সে। ব্যথায় সম্ভবত পাগল হয়ে গেছিল সে। খালি কাঁদত আর অসহায় আক্রোশে তার ভাঙা পা দুটোর দিকে তাকিয়ে বলত, ‘আমি ফুয়োরারের খাবার টেবিলে লাথি মারব।’ তার এ কথা যাতে কারো কানে না যায় সে জন্য আমরা ছুটে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরতাম তখন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। এক এস. এস. গার্ড শুনতে পেল তার কান্না। ফুয়োরের খাবার টেবিলে লাথি! পরদিনই তাকে ব্যারাক থেকে তুলে নিয়ে ফেলে দেওয়া হল ওই শাওয়ার রুমে। তারপর বাচ্চাটার মৃতদেহ থেকে পা-দুটো বিচ্ছিন্ন করে এনে ঝুলিয়ে দেওয়া হল আমাদের ব্যারাকের কাঁটাতারের গায়ে। পাভেল, পলিনেস্কি, আন্দ্রেই, বাখ, আমার কত পরিচিত-অপরিচিত মানুষ ওই বাড়িটাতে গিয়ে আর ফেরেনি। এখন বার বার মনে পড়ছে তাদের কথা…।

দীপাঞ্জন বলল, ‘সামান্য একটা কথার জন্য বাচ্চাটার এই পরিণতি হল।’

লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সে সময় জার্মানিতে একটা চালু কথা ছিল—‘হে ঈশ্বর, আমাকে তুমি বোবা-কালা করে দাও। যাতে আমাকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে না-পাঠানো হয়।’ গোস্টোপোরা ঘুরে বেড়াত সর্বত্র। তাদের চর ঘুরে বেড়াত সর্বত্র। তুমি দুধের শিশু হও বা থুরথুরে বুড়ো, একটা বেফাঁস কথা বললেই তোমাকে পাঠানো হবে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অথবা দাঁড় করানো হবে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে।’

মুলার এবার বললেন, ‘শাওয়ার রুম বা গ্যাসচেম্বারে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম।’

‘কী ব্যাপার?’ জানতে চাইলেন লুবেনেস্কি।

মুলার বললেন, ‘জানেন তো আমার মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রিও আছে। এই সব ধরনের কলকব্জার প্রতি আমার আগ্রহ আছে। ওই গ্যাসচেম্বারের গ্যাস পৌঁছবার কলকব্জা কিন্তু এত বছর পরও একইরকম কর্মক্ষম আছে। দেয়ালের বাইরে বিদ্যুতের সুইচ টিপে ব্যবস্থাটাকে যদি চালু করা যায় আর শেলগুলোতে যদি সায়ানাইড বা সালফাইড ঢালা যায় তবে গ্যাস উৎপন্ন হয়ে শাওয়ারের মাধ্যমে তা ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। এত বছর পরও সব অটুট আছে।’

লুবেনেস্কি বললেন, হ্যাঁ, মানুষ মারার কলকব্জা তো। সেটা ওরা শক্তপোক্তভাবেই বানাতে পারত। আসলে ওই বাড়িটা তো ছিল শয়তানের কারখানা।’

সূর্যের আলো কমে আসছে। ধীরে ধীরে আঁধার নামছে ডাকাউ ক্যাম্পে। ব্যারাকবাড়িগুলোর মাঝে যে গলিপথ আছে সেখানে অন্ধকার জমাট বাঁধার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে ডায়না বলল, ‘দেখুন অন্ধকার নামার সঙ্গে-সঙ্গেই জায়গাটা কেমন ভূতুড়ে লাগতে শুরু করেছে!’

প্রফেসর জুয়ান বললেন, ‘আমাদের স্থানীয় গাইড রাইখ বলছিল যে, রাত হলে নাকি এখানে বন্দিদের, এস.এস গার্ডদের প্রেতাত্মারা জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিশেষত ওই শাওয়ার রুমের বাড়িটাতে। তবে আমরা এ সব বিশ্বাস করি না।’

তার কথা শুনে ডায়না আতঙ্কিতভাবে বলল, ‘তবে আমি কিন্তু করি। এই বলে সে আঙুল দিয়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকল নিজের বুকে। তাই দেখে জুয়ান ঈষৎ লজ্জিতভাবে বললেন, ‘দুঃখিত ম্যাডাম। আপনাকে ভয় দেখাবার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আসলে ওই রাইখের বলা কথার কোনো সারবত্তা নেই।’

মৃদু আতঙ্কিতভাবে ডায়না বলল, আপনার কথাই যেন সত্যি হয়।’

লুবেনেস্কি সস্নেহে ডায়নার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ভয় পেও না। আর যাই হোক প্রেতাত্মারা নিশ্চয়ই সেদিনের সেই এস.এস গার্ডদের থেকে কম নিষ্ঠুর হবে। তাছাড়া আমি তো আছিই।’

মুলার বললেন, এবার আমি যাই। আমাকে মিউনিখ ফিরতে হবে। কাল সকালেই আবার আমি আসব। তখন আবার দেখা হবে।’

মুলার চলে গেলেন। আর তারপরই যেন দ্রুত অন্ধকার নামতে শুরু করল চারপাশে। আর তার সঙ্গে বাড়তে শুরু করল ঠান্ডাও। তুলোর মতো কী যেন ভাসতে ভাসতে নেমে আসতে লাগল ওপর থেকে। তুষারপাত শুরু হয়েছে। কাজেই ডায়না লুবেনেস্কিকে নিয়ে চলে এলেন তাদের ব্যারাক-বাড়িটাতে। আর দীপাঞ্জনরাও ঢুকে পড়ল নিজেদেরটাতে।

ঘরের মধ্যে বসে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল তারা দুজন। বাইরে অন্ধকার কেটে গিয়ে এক সময় চাঁদ উঠতে শুরু করল। রাত আটটা নাগাদ মাটিতেই শোবার ব্যবস্থা করে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল তারা।

ঘুমিয়ে পড়েছিল দীপাঞ্জন। মাঝরাতে হঠাৎ পাশে শোয়া জুয়ানের ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল তার। জুয়ান তাকে বললেন, ‘কিছু বুঝতে পারছ?’

পরক্ষণেই দীপাঞ্জন বুঝতে পারল ব্যাপারটা। সারা ঘরে এক অদ্ভুত খচমচ খচমচ শব্দ শুরু হয়েছে। ঘরের চারপাশের দেওয়াল থেকে ভেসে আসছে সেই শব্দ। দীপাঞ্জন পাশ ফিরে তাকাল পাশের দেওয়ালের দিকে। কাচের জানলা দিয়ে আবছা চাঁদের আলো ঢুকছে ঘরে। দেওয়ালের গায়ে যে বাঙ্কগুলো আছে তার ভিতর থেকে উকি দিচ্ছে জোড়া জোড়া অসংখ্য চোখ! হ্যাঁ, চোখ। নড়ছে সেগুলো। সে দৃশ্য দেখে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল দীপাঞ্জনের শরীর। তবে কি একদিন ওখানে যারা থাকত তারা সত্যিই জেগে উঠেছে? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? বেশ কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল দীপাঞ্জনের ধাতস্থ হতে। শুয়ে থাকা অবস্থাতেই সে সন্তর্পণে পাশে রাখা ব্যাগটা হাতড়ে টর্চটা বার করল। তারপর যা আছে কপালে বলে টর্চের আলো ফেলল দেওয়ালের গায়ের বাঙ্কের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ধুপধাপ শব্দ হতে শুরু করল। ইঁদুর! এত বড় ইঁদুর বড় একটা দেখা যায় না। তারা আকারে এক-একটা প্রায় ছোটখাটো খরগোশের মতো! আলো পড়তেই লাফিয়ে তারা লুকিয়ে পড়ল বাঙ্কগুলোর আড়ালে। পায়রার খোপের মতো বাঙ্কগুলোতে তাদের বাসা।

দীপাঞ্জন আর জুয়ান দুজনেই উঠে বসল মেঝেতে। জুয়ান হেসে বললেন, ‘ঘুম ভেঙে আমিও প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলাম শব্দটা শুনে। এভাবেই মানুষ ভূত দেখে, ভয় পায়। কোনো একা ব্যক্তি যদি এ ঘরে থাকত তবে নিশ্চয়ই সে হার্টফেল করত ব্যাপারটা না-বুঝতে পেরে।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘উঠেই যখন পড়লাম তখন জানলা দিয়ে একবার দেখা যাক বাইরেটা কেমন লাগে?’

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, চলো।’

দুজনে উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। কাচের শার্শিটা খুলে ফেলল দীপাঞ্জন। বেশ বড় চাঁদ উঠেছে আকাশে। তার আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবকিছু। তুষারপাত থেমে গেছে। তবে কেউ যেন সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে সারসার নিঝুম ব্যারাকগুলোর ছাদে। তবে মাঝে মাঝে খুটখাট-ধুপধাপ নানা বিচিত্র শব্দ ভেসে আসছে, সারসার বাড়িগুলোর মাঝে যে অন্ধকার গলিগুলো আছে সেখান থেকে।

জুয়ান হঠাৎ বললেন, ‘আরে ক্রিমেশন হাউসের সামনে ও কে?

জুয়ানের কথা শুনে দীপাঞ্জন দেখল যে বাড়িটায় গ্যাস চেম্বার, ওভান রুমটা আছে তার প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক! চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাকে। পরনের পোশাকটাও চেনা যাচ্ছে। ও পোশাক মিউজিয়ামে দীপাঞ্জনরা দেখেছে। এস. এস. গার্ডদের পোশাক। এমনকী লং কোটের কোমরের বেল্টে বাঁধা পিস্তলটাও আছে। তবে এর মাথার টুপিটা এমনভাবে মুখের কাছে নামানো যে তার মুখ বোঝা যাচ্ছে না। কাঁটাতারের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে।

জুয়ান বললেন, ‘লোকটাকে দেখে তো ঠিক মিউজিয়ামের গার্ড বলে মনে হচ্ছে না। সে এস.এস গার্ডদের পোশাক পড়বে কেন?’ দীপাঞ্জনের মনে হল, ‘তবে কি লোকটা সেই এস.এস গার্ড, যে হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে? যারা বাগে পেলে মানুষকে টেনে নিয়ে যায় শাওয়ার রুমে। যেমন টেনে নিয়ে গেছিল সেই চোরটাকে। কিন্তু তা কী করে সম্ভব?’ দীপাঞ্জনরা জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা চাঞ্চল্য দেখা গেল লোকটার মধ্যে। সে যেন একবার তাকাল মেডিকেল হাউসটার দিকে। তারপর চকিতে অদৃশ্য হয়ে গেল ক্রিমেশন হাউসটার অন্ধকারে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দীপাঞ্জনরা তাকাল মেডিকেল হাউসের দিকে। তার পিছন দিক থেকে বেরিয়ে আসছে অন্য একজন। তার পরনেও এস.এস গার্ডদের মতো পোশাক। মেডিকেল হাউসের আড়াল থেকে বেরিয়ে যে একবার তাকাল চারপাশে তারপর দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল সারসার ব্যারাকগুলোর গলির অন্ধকারে। আর এরপরই মেডিকেল হাউসেরই পিছন থেকে দীপাঞ্জনদের অবাক করে দিয়ে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং লুবেনেস্কি। তার মধ্যে অবশ্য তেমন কোনো চাঞ্চল্য নেই। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তিনি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন মেডিকেল হাউসের সামনে, তারপর ধীরে ধীরে তার নিজের ব্যারাকবাড়িতে ঢুকে গেলেন। দীপাঞ্জনরা আরও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল আর কাউকে দেখা যায় কিনা সে জন্য। কিন্তু আর কাউকে তারা দেখতে পেল না।

জুয়ান বললেন, ‘হতে পারে যে লুবেনেস্কি এ জায়গা ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে যাবার আগে একবার ক্যাম্পটা ঘুরে দেখতে বেড়িয়েছিলেন। কিন্তু ওই এস.এস গার্ডের পোশাক পরা লোক দুজন কারা?’

দীপাঞ্জন বলল, ‘আমরা যখন রাইখের সঙ্গে শাওয়ার রুমটা দেখতে গেছিলাম তখন তার দরজার সামনে এস.এস গার্ড সেজে দাঁড়িয়েছিল একজন মিউজিয়াম কর্মী। প্রথমের জন সে লোকটা নয়তো?’

জুয়ান বললেন, ‘সেটাও যদি ধরে নিই তবে দ্বিতীয় এস.এস গার্ডটা কে? ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে মনে হচ্ছে! তবে একটা ব্যাপার হতে পারে যে, হয়তো মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ গোপনে রক্ষীদের পোশাক পরিয়ে এখানে রাত পাহারার ব্যবস্থা করেন। যাতে তাদের ভূত ভেবে চোরের দল বাড়িটার কাছে না-ঘেঁষে। যাই হোক, চলো এবার শুয়ে পড়া যাক।’