৭
দীপাঞ্জনের ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। তার মধ্যেই জুয়ান, লুবেনেস্কি আর মুলার এসে দাঁড়িয়েছেন দীপাঞ্জনের পাশে। মুলার বললেন, ‘আমার আঘাত তেমন গুরুতর নয়। ভান করে পড়েছিলাম সুযোগের অপেক্ষায়। ছুরিটা খুলে নিয়ে মেয়েটাকে ছুঁড়তে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেল।’
কয়েক হাত তফাতেই পড়েছিল সেই ছোট খাতাটা। দীপাঞ্জন সেটা কুড়োতে যাচ্ছিল। কিন্তু লুবেনেস্কি বলে উঠলেন, ‘ওটা খালি হাতে ছোঁবেন না।’
থমকে গেল দীপাঞ্জন।
মুলার ইতিমধ্যে হাতকড়া বের করে ফেলেছেন মাটিতে পড়ে থাকা রেনেটকে পরাবার জন্য। সেটা দেখে পুরোনেসি এরপর বললেন, ‘ওটার আর প্রয়োজন নেই। ওর ঘুম আর কোনোদিন ভাঙবে না। সায়ানাইড লেগেছিল খাতাটায়, সায়ানাইডের কৌটোতে ওটা থাকার জন্য। আমি খুব সাবধানে গ্লাভস পরে নাড়াচাড়া করতাম খাতাটা। আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম মেয়েটার স্বভাব হল থুতু দিয়ে খাতার পাতা ওল্টানো। সে জন্য শেষ মুহূর্তে এই কৌশলটা নিলাম। খাতাটা নিয়ে যাবার আগে ও আমাদের সবাইকে খুন করত। আমার মাঝে মাঝে একটা সন্দেহ উঁকি দিত। এতদিন পর এত দূর থেকে সে হঠাৎ আমাকে নিতে এল কেন? সঙ্গের কাগজপত্রগুলো সে নিশ্চয়ই জাল করেছিল। এই রেনেট ওরফে ডায়নার আসল পরিচয়টা কী? এই বলে তিনি তাকালেন মুলারের দিকে। মুলার জবাব দিলেন, ‘তার আগে আমার আসল পরিচয়টা দেই। আমার নাম সত্যিই মুলার। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করলেও আমি চাকরি করি মিউনিখের পুলিশ বিভাগে। গোয়েন্দা দফতরের অফিসার আমি। আপনি এদেশের মানুষের কাছে সম্মানীয় ব্যক্তি। আমাদের কাছে খবর এসেছিল যে একজন মেয়ে আপনাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। ব্যাপারটার সত্যতা যাচাই করতে এসেছিলাম আমি।’
এরপর একটু থেমে মুলার বললেন, ‘আমাদের সামনে যে পড়ে আছে তার নাম ডায়না নয়, রেনেট। একটা সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত ন্যাৎসি সংগঠনের নেত্রীস্থানীয়া সদস্য ছিল ও। খবরটা অবশ্য আমি আজ সন্ধ্যাতেই পাই। আমি গোপনে ওর ছবি তুলে মিউনিখের সদর দপ্তরে পাঠিয়ে ছিলাম। তারাই ওকে চিহ্নিত করল। ওকে আমি প্রথমে কোনো সন্দেহ করিনি, যদিও কাল রাতে এস.এস গার্ডের পোশাক পরে সে আপনাকে অনুসরণ করেছিল। সে সময় আমিও এস.এস গার্ড সেজেই দাঁড়িয়েছিলাম ক্রিমেশন হাউসের ওখানে। সন্দেহটা হল আজ দুপুরের একটা ঘটনায়।
‘কী ঘটনা?’ জানতে চাইলেন জুয়ান।
মুলার বললেন, ‘দুপুর বেলা রেনেট প্রথমে ক্যামেরা ঝুলিয়ে এল ক্রিমেশন রুমে। সে আমার থেকে জানতে চাইল এখনও কীভাবে কাজ করে শাওয়ার রুমটা। আমি তাকে বিদ্যুতের সুইচ টিপে হাতেকলমে দেখালাম ব্যাপারটা। তারপর আমরা এক সঙ্গেই ও জায়গা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে দু-জনে দুদিকে চলে গেলাম। মেয়েটা গিয়ে ঢুকল নিজের ব্যারাক বাড়িতে। আর আমি কিছুটা তফাতে আর একটা বাড়ির আড়াল থেকে লক্ষ রাখতে লাগলাম আপনাদের ব্যারাক-বাড়ি দুটোর ওপর। কিছুক্ষণ পর দেখলাম ডায়না আবার আপনাদের ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে এগোচ্ছে ক্রিমেশন হাউসের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে অনুসরণ করলাম আমি। সে ক্রিমেশন হাউসে ঢুকল। আমিও ঢুকলাম। সে সোজা চলে গেল শাওয়ার হাউসের পিছনে সেই জায়গাতে যেখানে দেওয়ালের গায়ে সেই সিলিন্ডারগুলো লাগানো আছে। যার মধ্যে গ্যাস উৎপন্ন করার জন্য সায়ানাইড বা সালফারের পাউডার ফেলা হত। আমি দেখলাম, একটা কৌটো থেকে সে সিলিন্ডারের মধ্যে পাউডার ঢালল। তারপর কৌটোটা অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। কৌটোটা কুড়িয়ে নিয়ে আমি দেখলাম ওটা সায়ানাইডের কৌটো! এমন কৌটো আমি মিউজিয়ামে দেখেছি!’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘তবে ওটা আমার কৌটোটাই হবে। অমন একটা কৌটো আমার একটা সুটকেসে ছিল।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘যেটা আপনি আমাদের দেখিয়েছিলেন?’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ।’
জুয়ান বললেন, ‘ভয়ঙ্কর ব্যাপার। অর্থাৎ সে গ্যাস চেম্বারে আমাদের মারতে চেয়েছিল!’
মুলার বললেন, ‘তবে সম্ভবত ওই পাউডারটা সায়ানাইড ছিল না। থাকলে তিরিশ সেকেন্ডের বেশি আপনারা বাঁচতে পারতেন না। ওতে কী ছিল তা সম্ভবত লুবেনেস্কি বলতে পারবেন।’
লুবেনেস্কি এবার ইতস্তত করে দীপাঞ্জনদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের বলেছিলাম বটে ওর মধ্যে সায়ানাইড পাউডার আছে। সবাইকে তাই বলতাম। কিন্তু আসলে ওর মধ্যে ছিল বোরিক পাউডার। কেটে-ছড়ে গেলে যে পাউডার ক্ষতস্থানে লাগানো হয়। সায়ানাইড পাউডার বাড়িতে কেউ রাখার সাহস পায় নাকি। দেখলেন তো তার প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যে কেমনভাবে শেষ হয়ে গেল একটা মানুষ! ওটা আমি লোকজনের কাছে গুরুত্ব বাড়াবার জন্য বলতাম। ডায়নাকেও একই কথা বলেছিলাম। বোরিক পাউডার ভরে আগের মতো সিল করে দিয়েছিলাম কৌটোটা।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘কিন্তু আমরা যে সাদা ধোঁয়া বেরোতে দেখেছিলাম মেঝের ছিদ্র থেকে?’
মুলার বললেন, ‘আসলে বাতাসের মাধ্যমেই গ্যাস পাঠানো যেত ঘরের ভিতর। আপনারা যেটা দেখেছেন সেটা সম্ভবত ওই বোরিক পাউডারের গুঁড়ো বাতাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসছিল মেঝের ছিদ্র থেকে। উত্তেজনার মুহূর্তে অল্প আলোতে কিছুটা দৃষ্টি বিভ্ৰম হয়েছিল আপনাদের। তবে দীর্ঘক্ষণ ও ঘরে থাকলে সায়ানাইড না হলেও অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ হতে পারতেন আপনারা। এমনকী মৃত্যুও ঘটতে পারত।’
লুবেনেস্কি এবার পকেট থেকে এক জোড়া গ্লাভস বার করে হাতে পরে মাটি থেকে ছোট ডায়েরির মতো খাতাটা কুড়িয়ে নিলেন।
মুলার বললেন, ‘এ খাতাটায় কী আছে? যার জন্য রেনেট খুন করতে যাচ্ছিল এতগুলো মানুষকে?’
লুবেনেস্কি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘তাহলে আপনাদের একটা পুরোনো গল্প বলি। গল্প নয়; সত্যি ঘটনা। আমি আপনাদের এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ‘গুণধর চক্রবর্তী’ নামে এক বাঙালি বন্দির কথা বলেছিলাম তাই তো?’ – প্রশ্নটা করে দীপাঞ্জনের দিকে তাকালেন তিনি।
দীপাঞ্জন বললেন, ‘হ্যাঁ, বলেছিলেন। সে পালিয়ে গেছিল ক্যাম্প ছেড়ে।’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা তারই খাতা। সংস্কৃত ভাষায় লেখা। পালাবার আগে তিনি এটা দিয়ে গেছিলেন আমাকে। বলেছিলেন, সাবধানে রাখবে এটা। এটাই তোমার রক্ষাকবচ হবে, যেমন আমার ছিল।’
জুয়ান বললেন, ‘খাতাটা কীসের রক্ষাকবচ?
লুবেনেস্কি বললেন, ‘গুণধর চক্রবর্তীর ব্যাপারটা তবে বলি আপনাদের। তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। হিটলারের সেনাদলের হাতে একটা পরাজিত ব্রিটিশ সেনাদলের সঙ্গে ধরা পড়ে গুণধর। সে দলে আরও বেশ কিছু ভারতীর ছিল। পুরো দলটাকে ‘হিমলার বাহিনী বন্দি করে এনেছিল মিউনিখে। তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাবার আগে সে এস. এস. কমান্ডান্টকে জানাল যে, সে একবার বাহিনীর অধিকর্তা হিমলারের সঙ্গে দেখা করতে চায়। শুধু মাত্র হিমলারকেই সে খবরটা বলবে। একটা গোপন খবর। হিমলারের সঙ্গে দেখা না-করিয়ে তাকে মেরে ফেললে নাকি পরে আফশোস করতে হবে সবাইকে। সেই কমান্ডান্ট ভাবলেন, ব্রিটিশ বাহিনীর কোনো খবর জানা আছে লোকটার। মেরে ফেলার আগে তাকে একবার হিমলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো যাক। কমান্ডান্ট তাকে হিমলারের ঘরে নিয়ে গেল। লোকটা হিমলারকে যা বললেন তাতে অবাক হয়ে গেলেন তিনি। না, যুদ্ধ বা ব্রিটিশ-সংক্রান্ত কোনো খবর নয়। গুণধর তাকে বলল যে, সে একটা বিশেষ জিনিস বানাতে পারে, যা বানাবার পদ্ধতি এই খাতাটায় সংস্কৃত ভাষায় লেখা আছে। যদি তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো না-হয়, তবে সে-দু-মাসের মধ্যে জিনিসটা বানিয়ে তার বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে দেবে। এটা যে সময়ের কথা তখন পৃথিবীটা এত ছোট হয়ে যায়নি। তার ওপর যুদ্ধের সময়। বার্লিন বা মিউনিখে চট করে সংস্কৃত জানা লোক কোথায় পাওয়া যাবে? তবে হিমলার জানতেন যে, এই ভারতীয় যে জিনিসটা বানাবার কথা বলছেন তা স্বয়ং ফুয়োরারও দীর্ঘদিন ধরে বানাবার চেষ্টা করছেন। হিমলারের নানা বিচিত্র খেয়ালের মধ্যে ওই জিনিসটা বানানোর পরিকল্পনাও ছিল। হিমলার টেলিফোনে খবরটা জানালেন ফুয়োরারকে। হিমলারও চমকে উঠলেন ব্যাপারটা শুনে। তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারলেন না ব্যাপারটা। কারণ ভারতবর্ষ নিয়ে তখনও নানা আশ্চর্য কথা প্রচলিত ছিল আমাদের ইউরোপে। ভারতবর্ষটা নাকি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধু- সন্ন্যাসীদের দেশ, বাজিকরদের দেশ। অনেক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ভারতীয়দের। হয়তো লোকটা যা দাবি করছে তা সত্যি। ফুয়োরার এরপর একটা নির্দেশ দিলেন হিমলারকে। তিনি বললেন, ‘লোকটাকে ছ-মাস সময় দিয়ে দেখো। তারপর না-হয় গ্যাস চেম্বারে ফেলে দিও। নির্দেশ পেয়ে হিমলার গুণধরকে পাঠিয়ে দিলেন ডাকাউ ক্যাম্পে। কারণ, ডাকাউ ক্যাম্পে এই মেডিকেল হাউসে একটা গবেষণাগার আছে, আবার গ্যাস চেম্বারও আছে। আমি তখন এই মেডিকেল হাউসেই আছ। দাদা মারা গেছে, আমিও মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি। তখন সে এল এখানে। বন্দি হিসাবে সে এখানে এলেও হিমলারের নির্দেশে এস.এস গার্ডরা কিন্তু তার ওপর কোনো অত্যাচার করত না। ক্যাম্পের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারত গুণধর। এই মেডিক্যাল ক্যাম্পে গবেষণার প্রস্তুতি শুরু করল সে। গবেষকের একজন সহকর্মীর প্রয়োজন হয়। হয়তো আমার বয়স কম বলে গুণধর সে কাজে আমাকে নির্বাচন করল। শাওয়ার রুমে যাবার থেকে বেঁচে গেলাম আমিও। ল্যাবরেটরিতে তাঁর সঙ্গে কাজে নিযুক্ত হলাম আমি। সময় এগিয়ে চলল, লোকটাও ভালোবেসে ফেলল আমাকে। এদিকে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিও বদলাতে শুরু করল। খবর আসতে লাগল যে একের পর এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হচ্ছেন হিমলার। এস.এস গার্ডদের মধ্যেও একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছিল শেষের দিকে। আতঙ্কজনিত একটা শৈথিল্য এসেছিল তাদের মধ্যে। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগাল গুণধর। একদিন রাতে সে বলল, ‘আমি আজ পালাব ক্যাম্প ছেড়ে। আমি কী জিনিস বানাবার চেষ্টা করছি তা বলেছি কয়েকজন এস.এস গার্ডকে। তারা তোমাকে সাহায্য করবে। জিনিসটা বানানো হলে তার ভাগ দিলেই তারা তোমাকে পালাতে সাহায্য করবে। এই খাতাটা তোমার রক্ষাকবচ। এতেই লেখা আছে সে জিনিস বানাবার পদ্ধতি। তবে তুমি তো সংস্কৃত জানো না। তাই আমি মুখে বলে যাচ্ছি জিনিসটা বানাবার পদ্ধতি। সেই মতো কাজ করে যাও তুমি।’
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বানাচ্ছিলে তুমি?’
সে যা বলল তাতে আমিও চমকে গেলাম। তার আগে সেটা আমার জানা ছিল না। সে রাতেই গুণধর পালাল ক্যাম্প ছেড়ে। পরদিন থেকে আমি তার পরামর্শমতো কাজ শুরু করেছিলাম। কিছু এস.এস গার্ড সাহায্য করতে লাগল আমাকে। এর কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দ্রুত পাল্টে গেল। পরাজিত হলেন হিমলার। মার্কিন সেনাবাহিনী মুক্ত করল আমাদের। এখানেই রয়ে গেলাম আমি। তারপর থেকে জিনিসটা বানাবার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমি। কিন্তু কিছুতেই সেটা বানানো যাচ্ছে না। সায়ানাইডের কৌটো ভরা খাতাটা এক সময় আমার বাড়িতেই ছিল। কিন্তু হঠাৎই চোর আসতে শুরু করল বাড়িতে। তারা জিনিসপত্র কিছুই নেয় না। শুধু আমার কাগজপত্র আর ল্যাবরেটরি ঘাঁটাঘাঁটি করে। আমার কেন জানি মনে হল তারা এই খাতাটার জন্যই আসে। কাজেই একদিন এসে খাতাটা লুকিয়ে রেখে গেলাম এখানে। আমি এখানে রাত কাটাতে এসেছিলাম খাতাটা আবার সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্যই। রেনেট নিশ্চয়ই অনুমান করেছিল খাতাটা আমি ফেরার সময় অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার ধারণা সে সময় যে সব এস.এস গার্ডরা গুণধরের মাধ্যমে জেনেছিল যে সে কী বানাবার জন্য চেষ্টা করেছিল, তাঁদেরই কোনো উত্তরসূরি হবে ওই মেয়েটা অথবা তাদের ন্যাৎসি গুপ্ত সংগঠনের কোনো সদস্য। বংশ পরম্পরায় আমার এই খাতার খবর সংগ্রহ করেছিল তারা। আমার বাড়িতে হানা দিয়ে খাতা খুঁজে না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই মেয়েটা আমার নাতনি সেজে এসেছিল এখানে। আমাকে পোল্যান্ড নিয়ে যাবার নাম করে সে হয়তো আমাকে তাদের গুপ্ত ঘাঁটিতে নিয়ে যেত। তারপর আমাকে চাপ দিয়ে অত্যাচার করে খাতাটা হস্তগত করত।’
দীপাঞ্জন প্রশ্ন করল, ‘ওই গুণধর চক্রবর্তী বা আপনি কী বানাবার চেষ্টা করছিলেন?’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘আপনি তো ভারতীয়। সংস্কৃত আপনাদের ভাষা। আমি একটার পর একটা পাতা উল্টাচ্ছি। আপনি পড়ে দেখলে বুঝতে পারবেন।’ –এই বলে তিনি একটার পর একটা পাতা মেলে ধরতে লাগলেন দীপাঞ্জনের সামনে। যদিও এত দিনের পুরোনো লেখা বলে খাতার লেখাগুলো একটু বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবু দীপাঞ্জন তার স্বল্প জ্ঞানে বুঝতে পারল, হ্যাঁ, ভাষাটা সংস্কৃতই।
লুবেনেস্কি কয়েকটা পাতা ওল্টাবার পর দীপাঞ্জন বলল, ‘যদিও আমি ছোটবেলায় দুটো ক্লাসে সংস্কৃত পড়েছিলাম, তবে ভাষাটা নিয়ে আমার চর্চা নেই। এটা আমাদের দেশের প্রাচীন ভাষা হলেও এ ভাষার চল প্রায় উঠে গেছে। আমি এ ভাষা পড়তে পারব না।’ —কথাগুলো বলেই দীপাঞ্জনের আবারও হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার সেই সংস্কৃত শিক্ষক কাঞ্জিলালবাবুর কথা। বারবার তিনি দীপাঞ্জনকে বলেছিলেন সংস্কৃত নিয়ে পড়বার কথা। তাঁর কথা শুনলে হয়তো এই খাতাটা পড়ে ফেলতে পারত দীপাঞ্জন।
মুলার এবার লুবেনেস্কিকে বললেন, ‘উনি তো ভাষাটা পড়তে পারছেন না বললেন। আপনিই বলুন আপনারা কী জিনিস বানাবার চেষ্টা করছিলেন?’
বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। বৃদ্ধ লুবেনেস্কি তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘সেই জিনিস। যা বহু যুগ ধরে বানাবার চেষ্টা করে আসছেন অ্যালকেমিস্টরা। স্বয়ং ফুয়োরারও যা সত্যি-সত্যি বানাবার চেষ্টা করেছিলেন – সোনা! সোনা!’
বেশ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল দীপাঞ্জনরা। এক সময় মুলার মুখ খুললেন। তিনি লুবেনেস্কিকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি ধারণা এই খাতাতে সত্যি সোনা তৈরির পদ্ধতি লেখা আছে?’
বৃদ্ধ লুবেনেস্কি বললেন, ‘তাই তো বলেছিল গুণধর।’
লুবেনেস্কি এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে, যেন মনে হল তিনি সত্যিই বিশ্বাস করেন কথাটাতে।
মুলার শুনে বললেন, ‘তবে খাতাটা কিন্তু আমাকে দিয়ে দিতে হবে। এটা এ দেশের সম্পত্তি এখন। জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন সংস্কৃত-জানা বেশ কিছু লোক আছেন। আমরা তাদের কাছে লেখাটা পাঠোদ্ধারের জন্য পাঠাব।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘এর একটা ফোটোকপি পাওয়া যাবে কি? তাহলে দেশে ফিরে আমিও লেখাগুলোর মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করাব কাউকে দিয়ে।
মুলার বললেন, ‘আমার কোনো আপত্তি নেই।’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘আমারও না। গুণধর তো আপনার দেশেরই মানুষ ছিল। এই খাতাটার ওপর আপনাদেরও একটা অধিকার আছে।’
মুলার এবার তার পকেট থেকে একটা হুইসেল বার করে তাতে ফুঁ দিলেন। খেলা শেষের বাঁশি। ডাকাউ ক্যাম্পের জীবন্ত ইতিহাস লুবেনেস্কি সেই খাতাটা একটু বিষণ্ণভাবে তুলে দিলেন মুলারের হাতে। মুলার তার উদ্দেশে বললেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি পোল্যান্ডে আপনার কোনো আত্মীয়ের খোঁজ মেলেনি। অতএব আপনি এ দেশেই থাকবেন আগের মতো আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে। আপনি তো এদেশেরই লোক এখন।’
মাটিতে পড়ে থাকা রেনেট ওরফে ডায়নার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন লুবেনেস্কি। সে হাসি দুঃখের না আনন্দের তা ঠিক বুঝতে পারল না দীপাঞ্জন। আর এরপরই একদল পুলিশ প্রবেশ করল সে ঘরে। মুলারের বাঁশির শব্দ শুনে চলে এসেছে তারা। হিটলারের উত্তরসূরি রেনেট অথবা ডায়নার দেহটা এখন মরে কাঠ হয়ে গেছে।
পুনশ্চ : জার্মানি থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই কলকাতা ফিরে এসেছিল দীপাঞ্জন। প্রফেসর জুয়ানও তাঁর দেশে ফিরেছেন। তবে তিনিও বেশ আগ্রহী সেই খাতার লেখাটার ব্যাপারে। লেখাগুলোর ফোটোকপি লুবেনেস্কি আর মুলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এনেছে দীপাঞ্জন। যেদিন দীপাঞ্জন সকালে কলকাতায় পা রাখল সেদিন বিকালেই সে ছুটল কাঞ্জিলালস্যারের কাছে লেখাগুলোর মর্মোদ্ধারের জন্য। সে কোথা থেকে লেখাগুলো পেয়েছে তা কিছুই বলল না কাঞ্জিলাল স্যারকে। তিনিও জানতে চাইলেন না কিছু। তিনি শুধু বললেন, ‘কাগজগুলো রেখে যাও। আজতো রবিবার। আমি বেতো রুগি তাই বাড়ি থেকে বেরোতে পারি না। তুমি সামনের রবিবার এসে জেনে যেও কাগজগুলোতে কী লেখা আছে।’
রবিবার পর্যন্ত কিন্তু অপেক্ষা করতে হল না দীপাঞ্জনকে। তাকে টেলিফোন করে শুক্রবার সন্ধ্যাতেই নিজের পায়ে হেঁটে দীপাঞ্জনের বাড়িতে হাজির হলেন তিনি। তাঁর কথা শুনে দীপাঞ্জন অবাক হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘তুমি এই কাগজগুলো কোথায় পেলে? এ যে আয়ুর্বেদিক কবিরাজ গুণধর চক্রবর্তীর ‘সোনা তেল’ বানানোর পদ্ধতি।’
দীপাঞ্জন তাকে প্রশ্ন করল, ‘সোনা তেল’ মানে?’
কাঞ্জিলালস্যার বললেন, ‘গেঁটে বাতের তেল। বাতের ব্যথায় অব্যর্থ মহৌষধ। আমাদের ছোটবেলায় বিখ্যাত ছিল এই তেল। তেলের শিশিরের গায়ে লেবেলে লেখা থাকত যে গুণধর চক্রবর্তী নাকি জার্মানি গেছিলেন। স্বয়ং হিটলার নাকি তাঁকে এই তেল বানাতে বলেছিলেন। যদিও সেটা সম্ভবত বিজ্ঞাপনের প্রচার ছিল বলে আমার ধারণা। যাই হোক, তুমি লেখাগুলো দিয়ে আসার পর সেদিন রাতেই লেখাটা পড়ে পরদিন সকালেই আমি তেলটা তৈরি করে ফেলি। ও তেল এখন পাওয়া যায় না। তিনদিন মাখতেই দিব্যি কাজ হল। দেখছ তো এই বৃদ্ধ বয়সে পায়ে হেঁটেই তোমার বাড়ি চলে এলাম।’ তাঁর কথা শুনে দীপাঞ্জন মনে মনে বলল, ‘গুণধর চক্রবর্তী লোকটা সত্যিই গুণধর ছিলেন। স্বয়ং হিটলারকেও ধোঁকা দিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর তৈরি সোনা নয়, গেঁটে বাতের মহৌষধ ‘সোনা তেলের’ ব্যাপারটা জানাতে হবে প্রফেসর জুয়ানকে। জানাতে হবে ডাকাউ ক্যাম্পে একদা বন্দি, জীবন্ত-ইতিহাস লুবেনেস্কিকেও। হয়তো বৃদ্ধ লুবেনেস্কির কাজে লাগতে পারে গুণধর চক্রবর্তীর এই ‘সোনা তেল’।
