৬
বেলা একটা নাগাদ তারা থামল। গাছের ডালপালা ছাঁটতে ছাঁটতে, ঝোপঝাড় ভাঙতে ভাঙতে ক্লান্ত লাগছে শরীর। ক্ষিদেও পেয়েছে। এবার বিশ্রামের, ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রয়োজন। এ-জায়গাটা একটু ফাঁকা ফাঁকা। ঘনসন্নিবিষ্ট রবার গাছের পরিবর্তে কিছুটা তফাতে তফাতে মোটা মোটা শুঁড়িওয়ালা বড় বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে। সে-জায়গাটা পছন্দ হওয়ায় একটা মোটা গাছের গুঁড়ির গায়ে হেলান দিয়ে বসল তিনজন। ফিলিপ তার বন্দুকটা পাশে নামিয়ে রাখলেন। ব্যাগ থেকে শুকনো খাবার বের করে খাওয়া শুরু হল। ফিলিপের অবস্থা বেশ কাহিল মনে হচ্ছে। ঘামে সারা শরীর ভিজে উঠেছে। আসলে এ-ভাবে পথ চলার অভ্যেস তার নেই। হেরম্যান তার অবস্থা অনুমান করে বললেন, ‘খাওয়া সেরে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা শুরু হবে।’ সেইমতো খাওয়া সেরে গাছের গুঁড়ির গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল সকলে। গাছটার মাথা ঘন পাতায় ছাওয়া বলে গাছের নিচটা বেশ ঠান্ডা আর আরামদায়ক।
আধঘণ্টা মতো সময় কেটেছে। গাছের নিচটা বেশ আরামদায়ক বলে আর পথশ্রমের ক্লান্তিতে মৃদু তন্দ্রাভাব নেমে এসেছিল সবার চোখে। হঠাৎ একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে সুদীপ্ত একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। কোথা থেকে যেন তাদের কাছাকাছি হাজির হয়েছে একটা ওরাংওটাং! সুদীপ্ত কিছু বোঝার আগেই সে আরও কাছে এগিয়ে এসে ফিলিপের পাশে রাখা বন্দুকটা তুলে নিল। তারপর লাফ দিয়ে এগোল সামনের অন্য একটা গাছের দিকে। সুদীপ্ত সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘ওরাংওটাং! ওরাংওটাং। বন্দুক নিয়ে পালাচ্ছে!’ চিৎকার করেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। মুহূর্তের মধ্যে স্প্রিং-এর মতো উঠে দাঁড়ালেন হেরম্যান আর ফিলিপও। ওরাংওটাংটা তখন বন্দুকটা নিয়ে গাছের গুঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। সুদীপ্তরা তিনজন সঙ্গে সঙ্গে ছুটল গাছটার দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে আন্দোলিত হতে লাগল আশেপাশের গাছগুলো। কখন যেন সেখানে হাজির হয়েছে ওরাংওটাং-এর বেশ বড় একটা দল! অথবা তারা সেখানে গাছগুলোর মাথায় আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল। ওরাংওটাংটা তরতর করে গাছের মাথায় একটা বড় গাছের ডালে চড়ে বসল। মানুষ যেভাবে বন্দুক ঝোলায় অনেকটা ঠিক সেভাবেই বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়েছে প্রাণীটা। গাছের মাথা থেকে সে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল সুদীপ্তদের উদ্দেশে, আর অন্য ওরাংওটাংগুলোও গাছের ডাল ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নানা কসরত দেখাতে লাগল। যে পুরুষ ওরাংওটাংটা বন্দুক নিয়েছে সে আকারে বেশ বড় অন্য প্রাণীগুলোর থেকে। সম্ভবত সেই পালের গোদা বা দলপতি হবে। পালের গোদাটা এরপর সে-গাছ থেকে অন্য একটা গাছে লাফ দিল। আর তার সঙ্গে একে একে তার সঙ্গীরাও। বন্দুকটা হাতছাড়া করা যাবে না, কাজেই সুদীপ্তরা দৌড়াল সে গাছের দিকে। বন্দুকটা উলটো করে কাঁধে ঝুলিয়েছে প্রাণীটা। অর্থাৎ নলটা নিচের দিকে। কোনোভাবে গুলি ছুটে গেলেই সর্বনাশ। সুদীপ্তদের দিকে ছুটে আসতে পারে গুলি।
সুদীপ্তরা সে-গাছটার কাছে পৌঁছতেই বন্দুক সমেত প্রাণীগুলো ঝাঁপ দিল অন্য গাছে। আর এরপর যেন মানুষগুলোকে নিয়ে খেলা শুরু করল ওরাংওটাং-এর দল। একটার পর একটা গাছ পেরিয়ে সুদীপ্তদের ছুটিয়ে নিয়ে যেতে থাকল তারা। যতক্ষণ না সুদীপ্তরা তাদের গাছের কাছে পৌঁছচ্ছে ততক্ষণ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। গাছের ডালে বসে মুখ ভ্যাঙাচ্ছে, হাত-পা নেড়ে, দোল খেয়ে অদ্ভুত শব্দ করে যেন ডাকছে সুদীপ্তদের। আর কাছাকাছি গেলেই হয় একটা গাছ থেকে আর একটা গাছে লাফ দিয়ে অথবা দুটো গাছের মধ্যে দূরত্ব বেশি হলে গাছ থেকে নেমে লাফিয়ে দ্রুত জমি পেরিয়ে উঠে যাচ্ছে অন্য গাছে। বেশ অনেকটা পথ এভাবে তাদের অনুসরণ করতে করতে এক সময় সুদীপ্তরা হাঁপিয়ে উঠল। কথায় বলে বাঁদরের বাঁদরামি। বাঁদর-শিম্পাঞ্জি-ওরাংওটাং তো সব একই গোত্রের প্রাণী। কিন্তু কিছু করার নেই। সুদীপ্তরাও ছুটে চলল তাদের সঙ্গে।
একসময় সত্যিই বেশ হতোদ্যম হয়ে পড়ল তারা তিনজন। তখন তারা এসে উপস্থিত হয়েছে জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে একখণ্ড ফাঁকা জমির মুখে, আর ওরাংওটাং-এর দল জমির একপাশ দিয়ে জায়গাটা অতিক্রম করে চড়ে বসেছে একটা বিরাট নেড়া গাছের মাথায়। সেই গাছটার ওপাশ থেকে আবার শুরু হয়েছে ঘন রবার বন। ফাঁকা জায়গাটার প্রবেশমুখে . দাঁড়িয়ে ফিলিপ বললেন, ‘দাঁড়ান একটু জিরিয়ে নিই। আমরা যতক্ষণ কাছে না যাব ততক্ষণ ওরা নড়বে না।’
ফিলিপের কথা শুনে সুদীপ্ত আর হেরম্যানও থমকে দাঁড়িয়ে গেল। জমির ওপাশের বিশাল গাছটা নেড়া বলে পুরো দলটাকেই এবার দেখতে পাচ্ছে সুদীপ্তরা। নারী-পুরুষ মিলিয়ে জনা তিরিশ প্রাণী আছে দলটাতে। স্ত্রী ওরাংওটাংদের কয়েকটার কোলে ছোট বাচ্চাও আছে। পালের গোদা ওরাংওটাংটা এবার বন্দুকটা লাঠির মতো ধরে নাচাতে শুরু করেছে, আর অন্য প্রাণীগুলো চিৎকার চেঁচামেচি আর নানা ভঙ্গি করে সুদীপ্তদের যেন কাছে ডাকছে।
সুদীপ্তরা একই জায়গায় দঁড়িয়ে রইল আর প্রাণীগুলোও একইভাবে গাছের ডালে তাদের কাজ করে চলল, হেরম্যান সেদিকে তাকিয়ে এক সময় বললেন, ‘প্রাণীগুলো আমাদের নিয়ে খেলা করছে। আমরা কাছে গেলেই ওরা আবার দূরে চলে যাবে। বন্দুকটা নেবার জন্য অন্য কোনো ভাবনা ভাবতে হবে।’
ফিলিপ বললেন, ‘আমাদের খাবারগুলো ওদের দিয়ে একবার দেখা যেতে পারে যে বন্দুকটা ওরা ফেলে দেয় কিনা? বেশ কিছু ফলও তো খাবারের ব্যাগে আছে।’
সুদীপ্ত বলল, ‘এ পরিকল্পনাটা একেবারে মন্দ ছিল না, কিন্তু খাবারের ব্যাগ, মালপত্র সব আমরা সেই গাছের নিচে ফেলে এসেছি।’
ফিলিপ হতাশভাবে বললেন, ‘তাহলে কী করা যায়? এভাবে আর কতক্ষণ ওদের পিছনে ধাওয়া করা যাবে?’ ফাঁকা জমিটার এ-পাশে দাঁড়িয়ে ও-পাশের গাছটার মাথায় লম্ফঝম্ফ করা ওরাংওটাংগুলোর দিকে তাকিয়ে তাদের বন্দুকটা হতাশ চোখে দেখতে থাকল সুদীপ্তরা।
কিন্তু এরপর হঠাৎ পালের গোদা ওরাংওটাংটা নামতে শুরু করল গাছের গুঁড়ি বেয়ে। কিছুটা নিচে নেমে সে ওপর থেকেই বন্দুকটা ছুড়ে ফেলল কিছুটা তফাতে জমির উপর। ভাগ্য ভালো যে মাটিতে পড়ে গুলি ছিটকাল না তার থেকে। বন্দুকটা ফাঁকা জমির যেখানে পড়ল সে জায়গাটা শুকনো ডালপালা আর পাতায় ছাওয়া। হয়তো বা নেড়া গাছ থেকে খসে পড়া ডালপাতা হবে। সে জন্যই মাটিতে পড়লেও তেমন আঘাত লাগল না বন্দুকটার। নইলে গুলি ছিটকাত। বন্দুক নিচে ফেলেই আবার গাছ বেয়ে ওপরে উঠে গেল প্রাণীটা। পালের গোদাসহ অন্য ওরাংওটাংগুলো এরপর চিৎকার- লাফালাফি থামিয়ে গাছের মাথা থেকে তাকিয়ে দেখতে লাগল সুদীপ্তদের।
ব্যাপারটা দেখে একটু অবাক হল সবাই। হেরম্যান বললেন, ‘আমরা কাছে যাচ্ছি না দেখে ওরা এবার হয়তো অন্য একটা খেলা খেলার চেষ্টা করছে। খুব বুদ্ধিমান প্রাণী ওরা। আমরা বন্দুকটা নেবার জন্য কাছে গেলেই ওরা হয়তো দ্রুত নেমে বন্দুকটা তুলে আবার গাছের মাথায় উঠে যাবে।’
ফিলিপ বললেন, ‘তবে কী করা যায়?’
হেরম্যান বললেন, ‘চেষ্টা একটা করতেই হবে। ওপাশে ঘন জঙ্গল শুরু হয়েছে। ওরা যদি বন্দুকটা নিয়ে তার গভীরে ঢুকে যায় তবে আর তাদের পিছু ধাওয়া করা যাবে না। দেখি হঠাৎ একসঙ্গে চিৎকার করে যদি ওদের একটু ঘাবড়ে দেওয়া যায়। আমি তিন গুনব। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই একসঙ্গে চিৎকার করতে করতে ছুটব বন্দুকটা কুড়িয়ে নেবার জন্য।’
হেরম্যানের কথা মতো সুদীপ্তরা প্রস্তুত হল। ওরাংওটাং-এর দল নিশ্চুপভাবে লক্ষ করছে তাদের। হেরম্যান গুনতে শুরু করলেন, ‘এক… দুই… তিন…’
হেরম্যান তিন গোনার সঙ্গে সঙ্গেই বীভৎস চিৎকার করতে করতে জ্যা-মুক্ত তিরের মতো তিনজন ছুটল ফাঁকা জমির ভিতর গাছের কাছে শুকনো ডালপালার ওপর পড়ে থাকা বন্দুকটার দিকে। আর তাদের সেই সম্মিলিত চিৎকারে ওরাংওটাংগুলো নিচে না নেমে উঠতে লাগল গাছের আরও ওপর দিকে। চিৎকার করতে করতে প্রায় একইসঙ্গে তারা পৌঁছে গেল জায়গাটাতে। সুদীপ্ত নিচু হয়ে বন্দুকটা কুড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সুদীপ্তদের সবার পায়ের নিচ থেকে হঠাৎই মাটি সরে যেতে লাগল। মড়মড় শব্দে সুদীপ্ত- হেরম্যান-ফিলিপ বন্দুকসমেত তলিয়ে গেল মাটির গভীরে।
ব্যাপারটা বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগল তাদের। তারপর ধীরে ধীরে একে একে উঠে দাঁড়াল। অন্তত পনেরো ফুট গভীর একটা কুয়ো বা গহ্বরের মতো জায়গাতে পড়ে গেছে তারা। নিচে কাদামাটি থাকায় আর শুকনো ডাল-পাতাসমেত পড়ায় ভাগ্যক্রমে তাদের তেমন আঘাত লাগেনি। সুদীপ্তরা উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল জায়গাটা। এটা একটা প্রাকৃতিক গর্ত। সম্ভবত বর্ষার সময় জল জমা হয় এখানে। কূপের বৃত্তাকার দেওয়ালগুলোও ভেজা ভেজা কাদাকাদা। তার মাথার ব্যাস আট-দশ ফুট হবে। ওপরটা শুকনো ডালপালা ছাওয়া হওয়ায় গর্তটার উপস্থিতি বুঝতে পারেনি সুদীপ্তরা। হেরম্যান তার দেওয়ালগুলি পরখ করে দেখলেন। দেওয়ালের গায়ে আঙুল বসালেই হয় হাত পিছলে যাচ্ছে অথবা কাদামাটি খসে পড়ছে। দেওয়াল বেয়ে ওপরে ওঠা অসম্ভব।
সুদীপ্ত বলল, ‘ব্যাপারটা কি কাকতালীয়? নাকি ওরা ইচ্ছা করেই এ-কাণ্ড করল? আমাদের ফাঁদে ফেলল? ওরাংওটাং-এর কি এত বুদ্ধি হয়?’
হেরম্যান বললেন, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কিন্তু যেভাবেই হোক আমাদের ওপরে উঠতে হবে। এখানে তো কেউ উদ্ধার করতে আসবে না আমাদের।’
ওরাংওটাংগুলো কিন্তু চলে যায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথার ওপর গহ্বরের মুখে এসে উপস্থিত হল পালের গোদা ওরাংওটাংটা। তারপর একে একে উপস্থিত হল দলের অন্য সদস্যরা। কূপের বৃত্তাকার মুখটা ঘিরে দাঁড়িয়ে তারা গর্তর মধ্যে ঝুঁকে দেখতে লাগল সুদীপ্তদের। তারপর এক সময় সকলে মিলে যেন উদ্ভট স্বরে হাসতে লাগল মানুষ তিনটের দুরবস্থা দেখে।
ফিলিপের মাথায় তাই দেখে হঠাৎ রক্ত চড়ে গেল। তিনি গর্তে পড়ে থাকা বন্দুকটা কুড়িয়ে নিলেন। তারপর সুদীপ্তরা তাকে বাধা দেবার আগেই ওপর দিকে বন্দুকের নল ত্যাগ করে সেই পালের গোদা ওরাংওটাংটাকে লক্ষ্য করে ট্রিগার টেনে দিলেন।
কিন্তু আশ্চর্য! ট্রিগার টানার ‘খট্’ শব্দ হল মাত্র। গুলি বেরোল না বন্দুক থেকে! ওরাংওটাংগুলো বন্দুকটা নিয়ে নাচানাচি করায় কলকব্জা বিগড়ে গেল নাকি? ফিলিপ সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেললেন বন্দুকের ব্যারেলে যেখানে গুলি ভরা হয় সে জায়গাটা। তারপর বিস্মিতভাবে বললেন, ‘আরে! বন্দুকে যে কার্তুজই নেই! আর একটা উদ্ধারের জন্য আমরা এত বিপদে পড়লাম!’
হেরম্যান বললেন, ‘বন্দুকটা নেবার সময় আপনি পরীক্ষা করে দেখেননি যে ওর মধ্যে টোটা ভরা আছে কিনা?’
ফিলিপ জবাব দিলেন, ‘না পরীক্ষা করিনি, গুরুমূর্তি বন্দুকটা আমার হাতে দিলেন, আমি নিয়ে নিলাম। সম্ভবত গুরুমূর্তি নিজেও খেয়াল করেননি ব্যাপারটা।’ কথাগুলো বলে তিনি দাঁত বের করে হাসতে লাগল সুদীপ্তদের দুরবস্থা দেখে। সুদীপ্ত আর হেরম্যান আগেও বিভিন্ন আশাহতভাবে বন্দুকটা ছুড়ে ফেললেন একপাশে। ওরাংওটাং-এর দল এবার যেন আরও অভিযানে এ-ধরনের নানা বিপদের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। তাই তারা কিছুটা উত্তেজিত হলেও তাদের স্নায়ু ফিলিপের থেকে কিছুটা শান্ত। কিন্তু ফিলিপের এসব অভিজ্ঞতা নেই, গলি ছোঁড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর গহ্বর থেকে মুক্তিলাভের আশায় তিনি বারকয়েক কাদামাখা দেওয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একফুটও ওপরে উঠতে পারলেন না তিনি। প্রতিবারই হড়কে যেতে লাগলেন। তারপর হতোদ্যম হয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। এভাবে কর্দমাক্ত মাটি বেয়ে ওপরে ওঠা অসম্ভব ব্যাপার। সুদীপ্ত আর হেরম্যানও এক সময় গহ্বরের মধ্যে বসে পড়লেন। হেরম্যান আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমার ব্যাগের মধ্যে স্টিলের কে আর দড়ি ছিল। সেগুলো যদি সঙ্গে থাকত তবে তার সাহায্যে ওপরে ওঠার একটা চেষ্টা করা যেত।’
সুদীপ্ত বলল, ‘হ্যাঁ, খুব ভুল হয়ে গেল আমাদের। ওরাংওটাংগুলোর পিছু ধাওয়া করার সময় ব্যাগগুলো ফেলে আসা উচিত হয়নি। শেষে না এই কুয়োর ভিতরেই আমাদের পচে মরতে হয়। সঙ্গে তো জলের বোতল পর্যন্ত নেই!’
সময় এগিয়ে চলল। নিচে বসে রইল সুদীপ্তরা আর ওরাংওটাংগুলো বসল ওপরে গহ্বরের মুখটা ঘিরে। নিজেদের মধ্যে তারা কিচকিচ করে কথা বলতে লাগল, আর মাঝে মাঝে নিচের দিকে তাকিয়ে ফাঁদে আটকে পড়া মানুষদের দেখতে লাগল। নিচ থেকে মাথার ওপরের ফাক দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। সূর্যদেব পশ্চিমে এগোতে শুরু করলেন। কিন্তু ওরাংওটাংগুলো একইভাবে বসে রইল গর্তর মুখটাতে। যেন তারা পাহারা দিতে লাগল নিচে পড়ে থাকা সুদীপ্তদের।
বিকাল হল একসময়। ফিলিপ, হেরম্যানকে বললেন, ‘এখান থেকে মুক্তি পাবার অন্য কোনো উপায় মাথায় এল? কাদামাটির দেওয়াল বেয়ে যে ওপরে ওঠা যাবে না তা তো বুঝতেই পারলাম।’
হেরম্যান বললেন, ‘হ্যাঁ দেওয়াল বেয়ে ওপরে ওঠা যাবে না। আর একজনের কাঁধে একজন উঠেও কূপের মুখে পৌঁছনো যাবে না। তবে অন্য একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। যদিও সেটা ভাগ্যের ওপরই নির্ভরশীল। আমাদের জামাগুলো ছিঁড়ে পাকিয়ে দড়ি বানিয়ে বন্দুকের সঙ্গে বাঁধব। তারপর একজনের পিঠে একজন উঠে দড়ি সমেত সেটা ছুড়ে দেব মাথার ওপরে গহ্বরের বাইরে। দৈবাৎ যদি বন্দুকটা ওপরে কোনো কিছুর সঙ্গে আটকে যায় তবে হয়তো দড়ি ধরে ঝুলে একজন প্রথমে ওপরে উঠতে পারবে। তারপর সে মুক্ত করার চেষ্টা করতে পারবে বাকিদের। কিন্তু তার আগে ওরাংওটাংগুলোর সরে যাওয়া প্রয়োজন। দেখা যাক, সূর্যাস্তের সময় তারা ফিরে যায় কিনা!’
ওরাংওটাংগুলোর চলে যাবার প্রতীক্ষা করতে লাগল সুদীপ্তরা। সূর্য ক্রমশ চলছে ঢলছে… শেষ বিকেলে হঠাৎই ওরাংওটাংগুলোর মধ্যে কেমন যেন চাঞ্চল্য লক্ষ করল তারা। গহ্বরের মুখে বসে থাকা প্রাণীগুলো যেন নিচে সুদীপ্তদের দিকে না তাকিয়ে উত্তেজিতভাবে আকাশের দিকে তাকাতে লাগল। আর এর পরই সুদীপ্ত হেরম্যানের কানে এল একটা শব্দ! তারা দেখতে পেল মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে একটা হেলিকপ্টার! বেশ নিচ দিয়েই সেটা উড়ে চলেছে যেদিক থেকে তারা এসেছে সেদিকে। সঙ্গে সঙ্গে তারা গহ্বরের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে হাত নাড়তে শুরু করল আকাশের দিকে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হল না। হয়তো বা চালকের পক্ষে আকাশ থেকে গহ্বরের মধ্যে থাকা সুদীপ্তদের দেখা সম্ভবও ছিল না। কপ্টারটা সুদীপ্তদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল তার নির্দিষ্ট যাত্রাপথে। এরপর ধীরে-ধীরে শান্ত হল ওরাংওটাং এর দল।
কপ্টারটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর হেরম্যান, ফিলিপকে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা কি আপনাদের রবার কোম্পানির কপ্টার?’
ফিলিপ হতাশভাবে বললেন, ‘না, আমাদের কয়েকটা ছোট এরোপ্লেন আছে। যেটা আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তেমন। এই কপ্টারটা হয়তো অন্য কোথাও যাচ্ছে।’
কপ্টারটা চলে যাবার পর যেন সূর্য অতি দ্রুত চলতে লাগল। হঠাৎ সুদীপ্তদের কানে গর্তর ওপর থেকে যেন একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। মানুষের কণ্ঠস্বর? আর তারপরই যেন ওরাংওটাং-এর দল ধীরে-ধীরে চলে গেল সেই কুয়ো বা গহ্বরের মাথাটা ছেড়ে। তাই দেখে সুদীপ্তরা তিনজন নিজেদের জামা খুলে ছিঁড়ে দড়ি বানাতে শুরু করল গহ্বর থেকে মুক্তি পাবার শেষ চেষ্টা করার জন্য। সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল বাইরের পৃথিবীতে আর আরও দ্রুত সেই গহ্বরের মধ্যে।
