কালোটিয়ার দ্বীপে – ৫

পরদিন ভোরবেলা রোজকার মতো রেডিও রুমে হাজির হল ধ্রুব। বেশ কুয়াশা পড়েছে আজ। ডেকে তিন হাত দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। ঘণ্টাতিনেক অন্তত সময় লাগবে এ কুয়াশা কাটতে। বুঝতে পারল ধ্রুব। সে রেডিওর সামনে বসতে না বসতেই রেডিও থেকে একটা যান্ত্রিক খসখস শব্দ কানে এল। তার মানে কেউ কল করেছে! এত ভোরে আবার কে? ইয়ার ফোনটা কানে দিতেই ও পাশ থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত ফ্যাসফ্যাসে গলা, ‘ক্যাপ্টেনকে এখুনি একবার ডেকে দিন। তাড়াতাড়ি খবরটা দিন।’

লাইনটা ধরতে বলে ধ্রুব ক্যাপ্টেনের কেবিনে ছুটল। খবরটা পেয়েই বিয়ার্ড ব্যস্ত হয়ে রেডিও রুমে গিয়ে ঢুকল। ধ্রুব দাঁড়িয়ে রইল দরজার বাইরে কিছুটা তফাতে কুয়াশার মধ্যে। ভিতর থেকে অস্পষ্ট ভাবে শোনা যাচ্ছে ক্যাপ্টেনের গলা। তার কথা বুঝতে না পারলেও দুটো শব্দ তার কানে এল, ‘হাইজ্যাক’ আর ‘ডেস্ট্রয়ার’।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাপ্টেন অবশ্য বেরিয়ে এসে নিজের কেবিনের দিকে হাঁটা দিলেন। ধ্রুবকে যেন তিনি খেয়ালই করলেন না। তিনি যেন চিত্তামগ্ন। রেডিওরুমে ঢুকে ধ্রুব আবার নিজের জায়গাতে বসল।

কুয়াশা কিন্তু কাটল না। একটু ফিকে হল মাত্র। সমুদ্রে অনেক সময় নাকি দু-তিনদিন ও টানা কুয়াশা থাকে। ধ্রুব শুনেছে এ কথা। ঘড়ির কাঁটা কিন্তু নিজের নিয়মে এগিয়ে চলল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোলিং হতে শুরু করল জাহাজ। প্রচণ্ড দুলুনি। একেই বলে রোলিং। সমুদ্রের যেখানে বিপরীতমুখী স্রোত এসে মেশে সেখান দিয়ে যাবার সময় এ রকম রোলিং হয়। ধ্রুব শক্ত হয়ে চেয়ারে বসে রইল। ঘণ্টাখানেক পর ব্যাপারটা সবেমাত্র একটু কমেছে। ঠিক এই সময় ইয়ার ফোনে ভেসে এল, ‘রয়াল মেরিন নেভি ভিক্টোরিয়া বলছি। তোমরা কোথায় যাচ্ছ?’

ক্যাপ্টেনের কথামতো ধ্রুব বলল, ‘আমি যাচ্ছি মোগাদিসুর ড্রাই ডকে জাহাজ মেরামতের জন্য।’

‘তোমাদের জাহাজ, আর ক্যাপ্টেনের নাম কী? কোন্ দেশের জাহাজ?’

‘ফ্রান্সিস ড্রেক। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড। ব্রিটিশ জাহাজ।’ ধ্রুব জবাব দিল।

‘ব্রিটিশ জাহাজ! মেম্বার কত?’

ধ্রুব উত্তর দিল, ‘ক্যাপ্টেন আর আমাকে ধরে পনেরো।’

এবার ওপাশের লোকটা বলল, ‘অ্যাডমিরাল জোনাথনের পক্ষ থেকে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি জাহাজ থামাও। আমরা তল্লাশি নেব। জাহাজ থামাও। তোমাদের অবস্থান রেডারে ধরা পড়েছে। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছচ্ছি।’

ধ্রুব কী বলবে বুঝতে না পেরে আবার ছুটল ক্যাপ্টেনের কেবিনে। সেখানে বসে উত্তেজিত ভাবে কী যেন আলোচনা করছিলেন বিয়ার্ড আর ফক্স। ধ্রুব ঘরে ঢুকতেই কথা বন্ধ করে দিল তারা। সে তাদের কথাটা বলতেই একটা দুরবিন নিয়ে তারা বাইরে বেরিয়ে এল। ডেকের রেলিং এর ধারে দাঁড়িয়ে তারা দেখার চেষ্টা করতে লাগল যে জাহাজটাকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু কুয়াশার চাদর চারপাশে বিস্তৃত। ব্যর্থ চেষ্টার পর ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ধ্রুবকে বললেন, ‘ওদের ডাকে আর সাড়া দেবার দরকার নেই। জাহাজ থামবে না। ওদের সত্যিকারের পরিচয় আমাদের জানা নেই।’

তারপর মেটের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘এক্ষুনি সবাইকে ডেকে উঠে আসতে বলো, জাহাজের মুখ পশ্চিমে ঘোরাতে হবে। সোমালিয়া সীমায় ঢুকতে হবে।’

মেট ফক্স ছুটল নিচে সবাইকে খবর দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিন ঘরের দু-তিনজন ছাড়া ওপরে উঠে এল সবাই। ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল ডেকে। পালের দড়িদড়াগুলো টেনে ডেক সারেঙের নির্দেশে পাল খাটানো শুরু হল। যদিও বাতাস তেমন নেই তবুও জাহাজের গতি যদি কিছুটা বাড়ানো যায় একথা ভেবেই পাল খাটাচ্ছে তারা। মেট ফক্স আর ডেক সারেঙ চিৎকার করে নির্দেশ দিতে থাকল। সবার মুখেই চাপা উত্তেজনা। ধ্রুব যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার মাথার ওপর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই গর্ধভ, মোটা কাছিটা টান! উজবুকের দল, হাল শক্ত করে ধর। কামানের মুখ ঘোরা!’

এ কার গলা? ধ্রুব ওপরে তাকিয়ে দেখতে পেল মার্লিনের পাখিটাকে। একটা লোহার দণ্ডর মাথায় বসে সে চেঁচাচ্ছে। আগে হয়তো কোনো জাহাজে এরকম কোনো ঘটনার সাক্ষী ছিল প্রাচীন পাখিটা। সেই কথাগুলোই এখন সে আউড়াচ্ছে। ডেকে লোকজনের ছোটাছুটি দেখে যেন খুব মজা পাচ্ছে ম্যাকাওটা। ঘাড় নাড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, ‘গর্ধভ, মোটা কাছিটা টান…উজবুকের দল, হাল শক্ত করে ধর…!’

এত উত্তেজনার মধ্যেও ওর কাণ্ড দেখে ধ্রুব না হেসে পারল না। ঠিক এই সময় মার্লিন এসে পিছনে দাঁড়িয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল, ‘ডেকে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়, তুমি রেডিও রুমে যাও। তেমন কিছু হলে আমি আছি। যাও…যাও…।’ কথাগুলো বলে ডেকের ভিড়ে মিশে গেল মার্লিন।

ক্যাপ্টেন নিজে গিয়ে ডেকের মাঝে হালের বিরাট চাকাটা ধরেছেন। ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করেছে জাহাজের মুখ। চারপাশে ব্যস্ততা। মুখ ঘুরিয়ে জাহাজ তিরবেগে অন্যদিকে চলতে শুরু করল। ধ্রুবর দিকে কারো খেয়াল নেই। মার্লিনের কথা শুনে ডেক ছেড়ে রেডিও রুমে গিয়ে ঢুকে কানে ইয়ারফোন লাগাল ধ্রুব। নিশ্চুপভাবে শুনতে লাগল, ও পাশের রেডিও অফিসারের কণ্ঠস্বর, —‘হ্যালো, হ্যালো? শুনতে পাচ্ছ? তোমরা পালাচ্ছ কেন? এখুনি দাঁড়াও। নইলে…নইলে।’ লাইনটা একটা খসখস শব্দ তুলে পরমুহূর্তে কেটে গেল।

নইলে কী, তা অবশ্য এক মিনিটের মধ্যে বুঝতে পারল সবাই। হঠাৎ আকাশে যেন একটা শোঁ শোঁ শব্দ শোনা গেল। আর তারপরই কুয়াশার আবরণ ভেদ করে একটা বিরাট জ্বলন্ত হাউই যেন জাহাজের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল কিছু দূরে সমুদ্রে। আর তারপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। সমুদ্রের জল লাফিয়ে উঠল আকাশের দিকে। জলের ধাক্কায় কেঁপে উঠল জাহাজ। ডেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হল, ‘মিসাইল চার্জ হচ্ছে…মিসাইল চার্জ হচ্ছে…।’ ধ্রুব আর উত্তেজনা চাপতে না পেরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে ডেকে এসে দাঁড়াল। নাবিকদের চোখেমুখে প্রচণ্ড আতঙ্ক। বিয়ার্ড কিন্তু অবিচল। জাহাজ থামবার নির্দেশ না দিয়ে শক্ত হাতে জাহাজের হালের ঢাকা ধরে রেখেছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে ফক্স। কোথা থেকে যেন একটা রাইফেল নিয়ে এসেছে সে। সেটা ধরেই সে দাঁড়িয়ে। আবার আকাশে একটা শব্দ। শব্দটা শুনেই নাবিকদের কেউ কেউ বাঁচার জন্য এদিকে ওদিকে দৌড়ল। কেউ আবার ডেকের রেলিং-এ উঠে দাঁড়াল জলে ঝাঁপ দেবার জন্য।

কিন্তু এবার শব্দটা যেন কিছুটা অন্যরকম মনে হল ধ্রুবর। এটা হাউইয়ের শব্দ নয়। চপারের শব্দ। আর তারপরই জাহাজের মাথার ওপর দেখা গেল দুটো বিরাট হেলিকপ্টার। তাতে সাদা পোশাক পরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে বসে থাকা লোকগুলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কপ্টার থেকে লাউড স্পিকারে নির্দেশ এল, ‘জাহাজ থামাও। যাদের হাতে অস্ত্র আছে ফেলে দিয়ে হাত মাথার ওপর তোল। নইলে গুলি চালাব।’

আর পালাবার উপায় নেই। ক্যাপ্টেন নির্দেশ দিলেন জাহাজ থামাতে। মেট রাইফেল ফেলে এগোল ক্যাপ্টেনের দিকে। তার চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। নোঙর নেমে গেল। আর হ্যাঁচকা টানে জাহাজটা একবার টাল খেয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে গেল। মাথার ওপর কপ্টার দুটো থেকে দড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হল ডেকে। আর ওপর থেকে তা বেয়ে ডেকে নেমে এল অস্ত্রধারী জনা পনেরো লোক। মেরিন কমান্ডো! মুহূর্তের মধ্যে তারা দখল নিল জাহাজের। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যে কুয়াশার আবরণ ভেদ করে দেখা গেল সাদা রঙের বিশাল এক জাহাজ, ডেস্ট্রয়ার, রণতরী। তার মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। ধীরেধীরে সে এগিয়ে আসছে ফ্রান্সিস ড্রেকের কাছে।

ধ্রুব মাথার ওপর হাত তুলে তাকিয়ে রইল জাহাজটার দিকে। এতবড় জাহাজ এর আগে কোনো দিন সে দেখেনি। যতই জাহাজটা এগিয়ে আসতে লাগল ততই বিস্মিত হতে লাগল ধ্রুব। সে জাহাজের ডেকটা যেন একটা ফুটবল মাঠ! আরও কয়েকটা কপ্টার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ডেকের গায়ে সার বেঁধে সাজিয়ে রাখা সূচিমুখ ক্ষেপণাস্ত্র, যার যে কোনো একটা মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে আস্ত একটা জাহাজকে। এছাড়া দূরপাল্লার আধুনিক কামান, ইত্যাদি তো আছেই। অন্তত দুশজন নৌ-সেনা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কাঁধে ডেকে দাঁড়িয়ে। টাওয়ারের মাথায় ঘুরছে বিরাট রেডার। যাতে ধরা দিচ্ছে সমুদ্রের সব খবর। জাহাজ না বলে একে ভাসমান দুর্গ বলাই ভালো।

কিছুটা তফাতে এসে দাঁড়াল ডেস্ট্রয়ার। তার ডেক ধ্রুবদের জাহাজের অনেক উঁচুতে। ব্রিজ নামিয়ে দেওয়া হলো। তা বেয়ে আরও জনা কুড়ি লোক সে জাহাজ থেকে নেমে এল ধ্রুবদের জাহাজে। সবার প্রথমে মধ্যবয়সি একজন ঋজু ব্যক্তি। ধবধবে সাদা পোশাক, টুপি। তার কাঁধের পটিগুলো বলে দিচ্ছে তিনি অ্যাডিমিরাল পদমর্যাদার কেউ হবেন। তবে শর মুখটা কেমন যেন চিন্তাক্লিষ্ট, মনে হয় বেশ কয়েক রাত তিনি ঘুমোননি।

তিনি চারপাশে ডেকটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন কে? সমস্ত ক্রুদের ডেকে হাজির করো। অদ্ভুত জাহাজ!

কয়েকজন কমান্ডো নেমে গেল খোলের ভিতর। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড লোকটার সামনে হাজির হয়ে বললেন, ‘আমি ক্যাপ্টেন

লোকটা এবার নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমি অ্যাডিমিরাল উইলিয়াম। জাহাজ থামাননি কেন?’

বিয়ার্ড জবাব দিলেন, ‘কুয়াশার জন্য আমরা আপনাদের দেখতে পাইনি। আমার ধারণা হয়েছিল কোনো পাইরেট শিপ আমাদের ফাঁদে ফেলার জন্য থামতে বলছে যা এ মুলুকে হামেশাই ঘটে।’

অ্যাডমিরাল বললেন, ‘আপনার লোকেদের এরকম অদ্ভুত পোশাক কেন? মাথায় আবার দেখছি জলি রজার। এ সবের মানে কী?’

ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড বললেন, ‘এ জাহাজ আসলে একটা ভাসমান মিউজিয়াম। পাইরেটস মিউজিয়াম। তাই জাহাজটাকে এভাবে সাজিয়েছি। আমি এ জাহাজের মালিকও বটে।’ ‘পাইরেটস মিউজিয়াম! এ তল্লাটে তো জ্যান্ত জলদস্যুর কোনো অভাব নেই। তার ওপর আবার মিউজিয়াম।’ রুক্ষভাবে বললেন অ্যাডমিরাল।

বিয়ার্ড শান্তভাবে জবাব দিলেন, ‘মিউজিয়াম এ জায়গার জন্য কিন্তু নয়। ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে নানা বন্দর ঘুরে গেছিলাম এডেনে। এখন ফিরছি। সব জায়গাতে তো আর জলদস্যু নেই। বহু লোক এ মিউজিয়াম দেখে আনন্দ পেয়েছে, সমুদ্রের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেছে। আপনারাও ইচ্ছা হলে দেখতে পারেন।

অ্যাডমিরাল বললেন, ‘সে ইচ্ছা বা সময় আমার হাতে নেই। তবে আমরা তল্লাশি নেব জাহাজের। আপনার লোকদের যে যার জায়গাতে যেতে বলুন। আমরা প্রত্যেকের ঘরে যাব। আর জাহাজের কাগজপত্র দেখব আমি।’

বিয়ার্ড বললেন, ‘ঠিক আছে। তবে মিউজিয়ামে কিছু দুর্মূল্য জিনিস আছে। দেখবেন সেসব যেন নষ্ট না হয়। আপনি আমার কেবিনে চলুন, কাগজপত্র সব দেখাচ্ছি।’

অ্যাডমিরাল এরপর ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের সঙ্গে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনাদের রেডিও অফিসার কে?’

ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ধ্রুবকে দেখিয়ে বললেন, ‘উনি, মিস্টার মিত্র, ইন্ডিয়ান। এডেন থেকে জাহাজে উঠেছেন।’

অ্যাডমিরাল ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইন্ডিয়ান! আপনি রেডিও রুমে অপেক্ষা করুন। আমি সব শেষে আপনার ঘরে যাব।’ এই বলে তিনি ক্যাপ্টেনের সাথে এগোলেন জাহাজের নথিপত্র দেখতে।

.

রেডিও রুমে ফিরে অ্যাডমিরালের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল ধ্রুব। বুকটা বেশ ধুকপুক করছে। তাদের মেসেজটা তো সে-ই রিসিভ করেছিল। উত্তর না দেবার জন্য হয়তো …তাকে জবাবদিহি করতে হবে। ব্রিটিশ নৌসেনার কোনো ব্রিটিশ জাহাজের নাবিককে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতাও আছে। ধ্রুবর মনে হল মার্লিন এ সময় তার সঙ্গে থাকলে ভালো হত।

প্রায় এক ঘণ্টা বাদে অ্যাডমিরাল যখন ধ্রুবর ঘরে ঢুকলেন, ততক্ষণে জাহাজের তল্লাশি শেষ করেছে তাঁর লোকজন। একাই ঘরে ঢুকলেন তিনি। দুজন কমান্ডো রেডিও রুমের বাইরে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রইল।

অ্যাডমিরাল উইলসন প্রথমে তার কাগজপত্র দেখতে চাইলেন। সেসব দেখাল ধ্রুব। কাগজ দেখে সন্তুষ্ট হয়ে অ্যাডমিরাল বললেন, ‘এ পথে তো আপনি একদম নতুন দেখছি। বয়সও তো দেখছি একদম কম। তা আপনি ওয়ারলেসে কথা শেষ করলেন না কেন?’

ধ্রুব জবাব দিল, ‘ক্যাপ্টেনের হুকুম ছিল।’

তিনি বললেন, ‘তা, এ পথে যে যাচ্ছেন, এর হালহকিকত খোঁজ রাখেন তো?’

ধ্রুব উত্তর দিল। ‘ক্যাপ্টেন আর নাবিকদের মুখে কিছুটা কিছুটা শুনেছি।’

অ্যাডমিরাল উইলিয়াম জানলার বাইরে সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি রেখে প্রথমে যেন নিজের মনেই বললেন, ‘যা শুনেছেন পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর।’ তারপর ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি ভারতীয়। ভারতীয়দের আমি শ্রদ্ধা করি। আমার দেহে আপনাদের রক্ত কিছুটা হলেও আছে। আমার গ্রেট গ্র্যান্ড মাদার ছিলেন একজন ভারতীয় মহিলা। তাই আপনাদের প্রতি একটা টান আমার আছে। আপনাকে আমার একটা অনুরাধ, এ পথে যাবার সময় যদি ‘কিড’ নামের দশ বছরের একটা বাচ্চা ছেলের কোথাও দেখা পান, বা তার সম্বন্ধে কোনো খবর পান, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন। সোমালিয়ান জলদস্যুরা অপহরণ করেছে তাকে। তিনদিন আগে ঘটনাটা ঘটেছে। আমি, আপনাকে আমাদের ওয়ারলেস কোড নম্বর দিচ্ছি। আর এই দেখুন বাচ্চাটার ফোটো।’ এই বলে তিনি একটা ছবি ধ্রুবর দিকে এগিয়ে দিলেন। বছর দশ বয়সের সুন্দর দেখতে একটা ছেলের ছবি। মাথায় কোঁকড়া চুল, নীল চোখের ছেলেটা সম্ভবত জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবিটা ভালো করে দেখে অ্যাডমিরালের হাতে ফেরত দেবার সময় তিনি বললেন, ‘আপনি যদি ছেলেটার সন্ধান দিতে পারেন, তাহলে এক লাখ পাউন্ড পুরস্কার দেব আমি।’

‘এক লাখ পাউন্ড! ধ্রুব জানতে চাইল, এ কোনো রাজপরিবারের ছেলে নাকি?’

অ্যাডমিরাল উইলসন প্রথমে বললেন, ‘না, ও কোনো রাজপরিবারের নয়।’ তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘ও আমার ছেলে। এই টাকাটা আমার সারাজীবনের সঞ্চয়।’

ধ্রুব আরও চমকে উঠে বলল, আপনার ছেলে। কীভাবে অপহরণ হল? কেন করল?’ উইলিয়াম বললেন, ‘গত তিন বছর ধরে আমার জাহাজ টহল দিয়ে বেড়ায় সোমালি উপকূলের জলসীমার বাইরে। যেসব ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজ এ পথে পাওয়া আসা করে জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে তাদের রক্ষা করা আমার কাজ। বহু জলদস্যু জাহাজকে আমি ডুবিয়েছি। তাই আমার ওপর তাদের রাগ। মুক্তিপণ আর আমি যাতে এ তল্লাট ছেড়ে চলে যাই সে উদ্দেশ্য নিয়েই কাজটা করেছে ওরা। মাস ছয় হল একজন সোমালিকে রাখা হয়েছিল জাহাজে। উপকূলে গিয়ে সে জলদস্যুদের খবর এনে দিত। লোকটার ব্যবহারে ও কিছু সঠিক খবর দেওয়ায় আমরা বিশ্বাস করেছিলাম তাকে। গল্প শোনার লোভে তার সঙ্গে কিডের ভাব হয়ে গেছিল। তিনদিন আগে সে রাতে খুব কুয়াশা। কী ভাবে যেন পোর্টহোল দিয়ে ছদ্মবেশী শয়তানটা তাকে বাইরে বার করে নিয়ে গেল। জানতাম বাচ্চা ছেলেকে এ জাহাজে রাখা নিরাপদ নয়। কিন্তু মা-মরা একটা ছোট্ট ছেলে…।’ অ্যাডমিরালের গলাটা শেষ কথাগুলো বলার সময় যেন ধরে আসছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি এরপর বললেন, ‘এই যে কোড নম্বরটা আপনি রেখে দিন। আশাকরি আপনি সম্ভব হলে সাহায্য করবেন।’ এই বলে তিনি কোড নম্বর লেখা চিরকুট হাতে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। ধ্রুব পকেটে রেখে দিল সেটা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের লোকজন নিয়ে ডেস্ট্রয়ারে ফিরে গেলেন অ্যাডমিরাল। ডেস্ট্রয়ার, ফ্রান্সিস ড্রেকের থেকে বেশ কিছুটা দুরে চলে যাবার পর বিয়ার্ডের নির্দেশে জাহাজ আবার মুখ ঘুরিয়ে রওনা হল তার নির্দিষ্ট পথে। কিন্তু ডেস্ট্রয়ারের এই আকস্মিক আবির্ভাব যেন ছন্দ নষ্ট করে দিল জাহাজের। সবাই আরও কেমন যেন শুম মেরে গেল।