ঈগলের পালকে রক্তের দাগ – ১

সে অঞ্চলে একটা ছোট এয়ারপোর্ট আছে। কিন্তু চার্টার্ড প্লেন ছাড়া অন্য কোনো প্লেন নামে না। অগত্যা গাড়িতেই বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে কাকভোরেই যাত্রা শুরু করেছিল প্রফেসর জুয়ান আর দীপাঞ্জন। সঙ্গী আরও সাতজন লোক। এঁরা সবাই জুয়ানের মতো অধ্যাপক-ইতিহাস গবেষক অথবা মানবাধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাসিন্দা এঁরা—ইউক্রেন থেকে আসা ডক্টর তুর্গিনেভ, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের টোগো, হাঙ্গেরির সাংবাদিক পাউল, আমেরিকার কারস্টেন, সুদানের আল মামুন, ফরাসি সাঁপলিও, আর এ দেশের অর্থাৎ বেলজিয়ামের মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম নেতা প্রফেসর মার্টিন। যার আমন্ত্রণে গতকালের মানবাধিকার বিষয়ক এক সেমিনারে যোগ দিতে এদেশে এসেছিলেন প্রফেসর জুয়ান আর তার সঙ্গী হিসাবে দীপাঞ্জন। গত পরশু এ দেশে এসে পৌঁছেছেন সবাই। গতকাল সারা দিন ধরে কনফারেন্স চলেছে। আর এদিন ভোরবেলাতেই প্রফেসর মার্টিনের নেতৃত্বে একটা রিজার্ভ বাসে চেপে নির্দিষ্ট একটা জায়গা দেখতে বেরিয়ে পড়েছে সবাই। মার্টিন অবশ্য তার অতিথিদের কাউকেই বলেননি যে তাদের গন্তব্য কোথায়। তিনি শুধু বলেছেন, ‘বেলজিয়ামে বাইরের দেশের মানুষ যাঁরা আসেন তাঁরা সবাই দেখেন ব্রাসলেস-এর হীরের বাজার, চোখধাঁধানো শহর। কিন্তু আমি আপনাদের যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সে জায়গা-ইতিহাস-গবেষক বা মানবাধিকার কর্মীদের দেখা প্রয়োজন। আজকের পৃথিবীর অনেকেই সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে জানে না, অথবা জানলেও ভুলে গেছে ও ব্যাপারে। অথচ আমরা যে জায়গাতে যাব, সে জায়গা ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ তাঁর এই বক্তব্য আগ্রহ সঞ্চার ঘটিয়েছে সকলের মনেই। মার্টিনের নেতৃত্বে হোটেল ছেড়ে বাসে সওয়ার হয়েছিল সকলে। ঘণ্টা পাঁচেক বাস যাত্রার পর যখন তারা গন্তব্যে পৌঁছল তখন কুয়াশা কেটে গেছে। তারা এসে উপস্থিত হয়েছে শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে বেলজিয়ামের পর্বতমালার পাদদেশের এক অঞ্চলে।

একে-একে বাস থেকে নামল সবাই। পাথরের ব্লক বসানো রাস্তা কিছুটা এগিয়ে শেষ হয়েছে কাঠের প্রাচীর আর তার মাথায় কাঁটাতারের বেড়া বসানো একটা বিশাল জায়গার লোহার ফটকের সামনে। বেশ নির্জন জায়গা। আশপাশে কোনো বাড়ি ঘর নেই। বাস থেকে নামার কিছুক্ষণ আগেই মার্টিন জানিয়েছে এ-জায়গা হল শেল্ট নদীর উপত্যকার ফ্লান্ডার সমতল ভূমি। লোকবসতি খুব একটা ঘন নয় এ অঞ্চলে। বনভূমি ও তৃণভূমি ঘেরা অঞ্চল। যা এ অঞ্চলে প্রবেশ করার পর তাদের যাত্রাপথে প্রত্যক্ষ করেছে দীপাঞ্জনরা। বাস থেকে নেমে অতিথিদের দলটাকে নিয়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে প্রবেশ তোরণের সামনে এসে দাঁড়ালেন মার্টিন। জায়গাটা যে বেশ প্রাচীন তাতে সন্দেহ নেই। বন্ধ প্রবেশ তোরণের দুপাশে পাথুরে স্তম্ভের মাথায় বসানো কাঠের ফলকের গায়ের লেখাগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে, ছোট হরফে লেখাগুলো প্রায় মুছে গেছে। তবু তারই মাঝে যে লেখাটা পাঠ করা যাচ্ছে বড়বড় হরফের জন্য তা হল—‘হিউম্যান জ্যু’।

লোহার ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মার্টিন বেশ কয়েকবার হাঁক দিলেন ‘স্যামসন? স্যামসন?’ বলে। ক্যাচক্যাচ শব্দে দরজাটা দু-পাশে ফাঁক হয়ে গেল। ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ। যদিও লোকটার মাথার চুল, ভ্রূও সব সাদা হয়ে গেছে তবুও সেই বৃদ্ধ যে আফ্রিকান কোনো জনগোষ্ঠীর লোক তা তাকে দেখেই বোঝা যায়। মার্টিনকে দেখে বৃদ্ধ বললেন, ‘ও তুমি? আমি ভাবলাম সেই সিনেমাওলার দলটা এল বোধ হয়। এখানে ছবি তুলতে আসার কথা একটা সিনেমাদলের।’ মার্টিন হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি। আর আমার সঙ্গের লোকেরা সব বিদেশি অতিথি। এই পুরানো চিড়িয়াখানা দেখাতে আনলাম এঁদের এ জায়গা তো কেউ আর দেখতে আসে না।’

কথাটা শুনে বৃদ্ধ স্যামসন একবার তাকালেন সবার দিকে। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানিয়ে গেটটা আরও একটু উন্মুক্ত করে দিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।

প্রবেশ তোরণ দিয়ে প্রবেশ করার আগে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর সাইনবোর্ডটা দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘একটা লেখা নিশ্চয়ই আপনারা পড়তে পারছেন? হ্যাঁ ‘হিউম্যান জ্যু’। আমরা যে জায়গাতে এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছি সে জায়গা বেলজিয়াম তথা ইউরোপের ইতিহাসে যে লজ্জাজনক ঘটনাগুলো সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম। আসুন ভিতরে ঢুকলেই আপনারা ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।’

সবাইকে নিয়ে কম্পাউন্ডের ভিতরে প্রবেশ করলেন মার্টিন। প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করলেই দুপাশে প্রাচীর ঘেঁষে সার সার ঘর। পাথরের দেওয়াল, পাথরের টালির ছাদ। সামনের একটা ঘরের জানালার গঠন দেখে সেটা একটা টিকিট কাউন্টার ছিল বলে মনে হয়। ঘরটার সামনে প্রমাণ সাইজের দুটো পাথরের মূর্তি রাখা আছে। একটা মূর্তি উলঙ্গ এক আফ্রিকানের, আর অন্য মূর্তিটা মাথায় পালকগোঁজা কোনো রেড ইন্ডিয়ানের। জুয়ান- দীপাঞ্জনের প্রাচীরের ভিতরে প্রবেশ করার পর জায়গাটা উন্মুক্ত হল তাদের চোখে। প্রাচীরের আড়ালে লুকিয়ে আছে বেশ কয়েক একর জায়গা নিয়ে একটা অঞ্চল। তার মধ্যে গাছপালা যেমন আছে তেমনই দেখা যাচ্ছে লোহার জালে ঘেরা নানা এনক্লেভ, পরিখা দিয়ে ঘেরা নানা উন্মুক্ত জায়গা, আবার কোথাও দূরে দূরে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছে লোহার গরাদ দিয়ে ঘেরা বিরাট বিরাট সব খাঁচা। তবে কোথাও কোনো পশুপাখির চিহ্ন নেই, কোনো লোকজনও কোথাও নেই। চারপাশে তাকিয়ে ডক্টর তুর্গিনেভ বললেন, ‘এ তো কোনো পরিত্যক্ত চিড়িয়াখানা বলে মনে হচ্ছে!’

মার্টিন বললেন, ‘হ্যাঁ। এটা একটা চিড়িয়াখানাই ছিল ষাট-সত্তর বছর আগে। চলুন সামনে এগোনো যাক তবেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। পিছনে হাঁটতে শুরু করল সবাই। খাঁচাগুলোর গায়ে এক সময় সাইনবোর্ড লাগানো ছিল খাঁচা, এনক্লোজারগুলোর পাশ দিয়ে মোরামের রাস্তা চলে গেছে নানা দিকে। মার্টিনের যেমন চিড়িয়াখানায় থাকে। কয়েকটা খাঁচার গায়ে এখনও সেগুলো আছে। দু-একটা সাইনবোর্ড পড়াও যাচ্ছে। কোথাও লেখা আছে ‘পিগমি’, কোথাও লেখা আছে ‘মঙ্গোলয়েড’, এমনকী একটা এনক্লোজারের গায়ে ‘ইন্ডিয়ান’ শব্দটাও দেখতে দীপাঞ্জন। মার্টিন তাদের নিয়ে এসে দাঁড় করাল একটা জায়গাতে। অনুচ্চ প্রাচীর ঘেরা একটা অঞ্চল। তারপর জলপূর্ণ একটা গভীর পরিখা আর তার ওপাশে ছোট একটা ফাঁকা জমি। সে জমির ভিতর কয়েকটা কুঁড়েঘর যেন মাটির সাথে মিশে যেতে যেতেও কোনোক্রমে তার কাঠামোটাকে মাটির ওপর ধরে রেখেছে। প্রাচীরটার গায়ে হেলান দিয়ে দীপাঞ্জনদের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন মার্টিন। তারপর সবার উদ্দেশে বলতে শুরু করলেন, ‘এতক্ষণে ব্যাপারটা মনে হয় অনেকেই অনুমান করতে পেরেছেন। হ্যাঁ, এটা একটা চিড়িয়াখানাই ছিল। তবে সাধারণ চিড়িয়াখানা নয়। এসব খাঁচা, ঘেরা জায়গার মধ্যে পশু নয় মানুষ রাখা হত। অবশ্য যাদেরকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে এই চিড়িয়াখানায় এনে রাখা হত তাদের চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ বা দর্শকরা মানুষ বলে মনে করত না, পশু বা জন্তু বলেই ভারত। কারণ যাদের এখানে এনে রাখা হত তাদের কারোর চেহারা, পোশাক বা খাদ্যাভ্যাস তথাকথিত সভ্য ইউরোপীয়দের মতো ছিল না। কাজেই খাঁচাবন্দি লোকগুলো আমার-আপনার মতো মানুষ হলেও সে সময়ের বহু ইউরোপবাসীর চোখে তারা ছিল বানরজাতীয় জীব বিশেষ।’

দীপাঞ্জন মানুষের চিড়িয়াখানার ব্যাপারটা প্রথম শুনলেও জুয়ান বললেন, এ জায়গা আমি প্রথম চাক্ষুষ করলাম, এ ঘটনা আমি শুনেছি। ইতিহাসের এক কলঙ্কময় ব্যাপার।’

টোগো বললেন, ‘আমিও শুনেছিলাম যে আফ্রিকা থেকে আমাদের মতো কালো চামড়ার মানুষদের শুধু ক্রীতদাস বানাবার জন্যই ইউরোপে আনা হত না। বিভিন্ন উৎসবে, মেলাতে খাঁচাবন্দি জন্তুর মতো তাদের দেখানোও হত।’

মার্টিন বললেন, ‘ঠিক কথা। এবং প্রচুর মানুষ তাদের দেখতও। ১৯৩১ সালে প্যারিসে যে ‘হিউম্যান জ্যু’র প্রদর্শনী হয়েছিল সেই প্রদর্শনীতে ছয় মাসে দর্শক সংখ্যা হয়েছিল প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ। অবিশ্বাস্য মনে হলেও ব্যাপারটা সত্যি।

এরপর তিনি বললেন, ‘আজকে আমাদের কাছে ব্যাপারটা অত্যন্ত ঘৃণ্য বলে মনে হলেও ইউরোপের ইতিহাসে ব্যাপারটা খুব প্রাচীন। এর উৎপত্তি খ্রিস্টজন্মের সমসাময়িক। সে সময় শারীরিক অসঙ্গতি বা অপূর্ণতা নিয়ে যেসব মানুষ জন্মাত তাদের মনে করা হত শয়তানের অনুচর অথবা জন্তু। যেমন বামন, কুঁজো, সারাদেহে আবওলা, শ্বেতীওলা মানুষ। হয় এদের পুড়িয়ে মারা হত অথবা খাঁচায় পুরে মেলায় দেখানো হত। এরপর এক সময় নৌ অভিযানে বেরিয়ে পড়ল ইউরোপীয়রা। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে নৌ অভিযাত্রীরা পৌঁছতে শুরু করল আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার নানা ভূখণ্ডে সেখানে যে মানুষগুলোকে তারা দেখল ইউরোপীয়দের সাথে গাত্রবর্ণ, দেহ সৌষ্ঠবে, পোশাকের কোনো মিল নেই। আফ্রিকা এশিয়া এমনকী আমেরিকার অনেক জনজাতি এখনও পর্যন্ত পোশাক পরে না অথবা নামমাত্র পোশাক পরে। কাজেই সভ্য ইউরোপীয়রা তাদের মানুষই মনে করল না। তাদের ইউরোপে আনতে লাগল ক্রীতদাস হিসাবে অথবা জন্তুর মতো দেখাবার জন্য। প্যারিস, হামবুর্গ, লন্ডন, মিলান, ওয়ারশ, পোল্যান্ড আর ব্রাসেলস-এ গড়ে উঠতে লাগল মানুষের চিড়িয়াখানা। সেখানে আফ্রিকার খর্বাকৃতি পিগমি বা দীর্ঘদেহী মাসাইরা যেমন স্থান পেত তেমনই থাকত তাতার, তুর্কি, ফিলিপাইনের ইরিগেটরা এমনকী এস্কিমো বা রেড ইন্ডিয়ানরাও। মানবতার ইতিহাসে এ এক কলঙ্কজনক ব্যাপার। আর যা চলেছিল মাত্র ষাট-সত্তর বছর আগে। বেলজিয়ামের সিরকা শহরে শেষ মানুষের চিড়িয়াখানা বন্ধ হয় ১৯৫৮ সালে। যে মানুষগুলোকে এসব চিড়িয়াখানায় আনা হত তারা নিজেদের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কারণে অথবা খাদ্য না পেয়ে এক-দু বছরের বেশি বাঁচত না। তাদের চিকিৎসা সাধারণ চিকিৎসকরা করতে চাইতেন না- পাছে কেউ তাদের পশুচিকিৎসক ভেবে ফেলে সেই ভয়ে। বেশ কিছু দর্শনাথী আবার খাঁচার ভিতর লাঠি ঢুকিয়ে তাদের খুঁচিয়ে আনন্দও পেত…।’

একটানা কথা বলে থামলেন মার্টিন—

সুদান থেকে আসা আল মামুন বললেন, ‘সত্যি কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার। হিটলারের বন্দি শিবিরের সাথে এসবের বিশেষ পার্থক্য নেই।’

কথাটা শুনে মাটিন বললেন, ‘হিটলারের কথাই যখন আপনি বললেন তবে এ প্রসঙ্গে একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানাই। যে লোকটা জার্মানি আর পোলান্ডের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেন সেই লোকটাই কিন্তু ইউরোপে নিষিদ্ধ করেছিলেন এই হিউম্যান জ্যু। বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার অধিকৃত ভূখণ্ডে তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন হিউম্যান জ্যু। মুক্ত করেছিলেন মানুষগুলোকে। যদিও সেই মানুষগুলো হয়তো কোনোদিন আর ঘরে ফিরতে পারেনি। তবু কাজটা তিনি করেছিলেন।’

মার্কিন কারস্টেন বললেন, ‘সত্যি ব্যাপারটা শুনে অদ্ভুত লাগল।’

মার্টিন বললেন, ‘অনেকে অবশ্য এ কাজের জন্য বাহবা দিতে অস্বীকার করেন হিটলারকে। তাঁরা বলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন কোনো এক রাষ্ট্রনায়ক নাকি বলেছিলেন যে, ‘যুদ্ধশেষে হিটলার যদি পরাজিত হন, আর তাকে যদি জ্যান্ত ধরা যায় তবে তাকে হিউম্যান ড্যুতে পোরা হবে জন্তুর মতো প্রদর্শনের জন্য।’—এ কথাটা নাকি ফুয়োরারের কানে গেছিল। আর তাই তিনি ভয় পেয়ে ইউরোপে হিউম্যান জ্যু নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।

এ কথা বলার পর মার্টিন পরিখা ঘেরা জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, ‘এ জায়গাতে রাখা হত ফিলিপিন্সের ইরিগেট উপজাতির কয়েকজন লোককে। এই ইরিগেটরা এক সময় নরমুণ্ড শিকার করত, কিন্তু তবু তো তারা মানুষ ছিল। তারা যাতে ও জায়গা থেকে বেরিয়ে কাউকে আক্রমণ করতে না-পারে তাই পরিখার ব্যবস্থা। আবার শক্ত চেহারার মাসাই বা রেড ইন্ডিয়ানদের রাখা হত লোহার মজবুত গরাদ দেওয়া খাঁচায়। আর ছোটখাটো চেহারার শান্ত পিগমি বা এস্কিমোদের হরিণের মতো ছেড়ে রাখা হত জালে ঘেরা খোলা জায়গাতে। ছোটখাটো প্রাণীও ছেড়ে রাখা হত তাদের সাথে। মানুষ তাদের দিকে আধ- খাওয়া রুটির টুকরো ছুঁড়ে দিত। হিউম্যান জ্যুতে ‘ওটাবেঙা’ নামের এক পিগমি কন্যা ইউরোপে খুব বিখ্যাত হয়েছিল। কোলে শিম্পাঞ্জির বাচ্চা নিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করত সে। তাকে নিয়ে পরবর্তীকাল হলিউড ফিল্মও হয়।’

মার্টিন এরপর সকলকে নিয়ে দেখাতে লাগল জায়গাটা। আর তার সাথে-সাথে বলে যেতে লাগলেন কোথায় কোন মানুষদের রাখা হত, কেমনভাবে রাখা হত সে-সব ব্যাপারে। যেমন এক সময় তিনি বললেন, ‘খেয়াল করে দেখুন খাঁচার মধ্যে যেসব থালার মতো পাত্র আছে তাতে কিন্তু খাবার দেওয়া হত না, জল দেওয়া হত। পশুরা জল চেটে খায় তাই এই ব্যবস্থা। জল চেটে খেতে হত মানুষগুলোকেও। আর দর্শকরাও ভাবত তারা মানুষ নয় পশু।’

নানা জায়গা দেখতে দেখতে অবশেষে এই অদ্ভুত চিড়িয়াখানার শেষ অংশে পৌঁছে গেল সবাই। প্রাচীরের গা ঘেঁষে বেশ অনেকটা ফাঁকা জমি সেখানে। আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে বড় বড় গাছ। একটা বিরাট বড়পাথরের তৈরি ক্রশ পোঁতা রয়েছে সেখানে। মাটিন বললেন, এই সেই জায়গা। যেখানে পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে নানা দেশের মানুষ। তাদের কেউ আফ্রিকান, কেউ রেড ইন্ডিয়ান, কেউ ফিলিপাইন — নানা জাতের নানা দেশের মানুষ। তথাকথিত সভ্য ইউরোপীয়ানরা যাদের মানবাধিকার ছিনিয়ে নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।’

কারস্টেন বললেন, ‘এখানকার কোনো মানুষই আর বেঁচে নেই তাই না?’

মার্টিন বললেন, ‘এই হিউম্যান জ্যু বন্ধ হবার পর কয়েকজন মুক্তি পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই কিছুদিনের মধ্যে মারা যায়। কে আর তাদের দেশে পাঠাবে অথবা আশ্রয় দেবে? অনাহারে পথে-পথে ঘুরে মারা পড়ে তারা। তবে তাদের একজন কিন্তু এখনও বেঁচে আছেন। ওই যে স্যামসন বলে যাকে দেখলেন তিনি। মাসাইল্যান্ড থেকে বারো বছর বয়সে ওকে আনা হয়েছিল। এক পাদ্রীর বদান্যতায় ও বেঁচে যায় আর এখানেই থেকে যায়।’

জায়গাটা ঘোরা হয়ে গেছে সবার। এবার তারা ফেরার পথ ধরল।