মালয় বনের আতঙ্ক – ৭

বেশ অনেকটা সময়ই অন্ধকারে ডুবে থাকল সবাই। তারপর চাঁদ ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে ধীরে-ধীরে দৃশ্যমান হতে লাগল সবকিছু। জামা ছিঁড়ে দড়ি বানানোর কাজ শেষ। বন্দুকে বাঁধা হল সেটা। দেওয়ালে ভর দিয়ে হেরম্যানের কাঁধে ফিলিপ, আর ফিলিপের কাঁধে দড়ি বাঁধা বন্দুকটা নিয়ে উঠল সুদীপ্ত। তারপর বন্দুকটা ছুড়ে দিল মাথার ওপরে গহ্বরের বাইরে। সেটা বাইরে গেল ঠিকই, কিন্তু কিছুতেই আটকাল না। সুদীপ্ত দড়ি ধরে টান দিতেই সেটা আবার গহ্বরের ভিতরে এসে পড়ল। বার কয়েক এমন ব্যর্থ চেষ্টা চালাল তারা। ছুড়ে দেওয়া বন্দুকটা গহ্বরের বাইরে পৌঁছলেও দড়িতে টান দিতেই সেটা ঠিকরে পড়তে লাগল গর্তের ভিতরে। সুদীপ্তরা অবশেষে বুঝতে পারল যে তাদের এ-পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। কুয়োর মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা ভাবতে লাগল কীভাবে উদ্ধার পাওয়া যায় সে জায়গা থেকে। শেষে কি এখানেই খিদে-তেষ্টায় শুকিয়ে মরতে হবে তাদের? চাঁদ মাথার ওপর উঠতে লাগল। বড় সোনার থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ। তার একফালি আলো এসে পড়ল গহ্বরের মধ্যেও। সময় কাটতে লাগল।

নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়েছিল সুদীপ্তরা। হঠাৎ মাথার ওপরের চাঁদটা যেন কীসের আড়ালে ঢাকা পড়ল। সুদীপ্তরা দেখতে পেল কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে মাথার ওপরে। ঝুঁকে পড়ে সে দেখার চেষ্টা করছে সুদীপ্তদের। মুহূর্তখানেকের মধ্যে তার অবয়ব দেখে সুদীপ্তরা তাকে চিনে ফেলল। লোকটা কুলি সর্দার রাবণ। সে দাঁত বের করে হাসছে সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে। তাহলে সে-ই কি এ ঘটনার জন্য দায়ী? ফিলিপ হয়তো এমন কিছু ধারণা করে নিয়ে বললেন, ‘রাবণ, তুমি এখানে কীভাবে এলে? তুমি হাসছ কেন?’

রাবণ হেসে জবাব দিল, ‘হাসছি সাহেবদের দুরবস্থা দেখে। কীভাবে পাঁকের মধ্যে পড়ে রয়েছ তোমরা। আমাকে শায়েস্তা করতে এসে তোমরা নিজেরাই ফাঁদে পড়লে। সবই তো নিজের চোখেই দেখলাম। কীভাবে ওরাংওটাংগুলো তোমাদের ফাঁদে ফেলল।’ ফিলিপ এবার আর ধৈর্য রাখতে না পেরে বললেন, আমাদের এখান থেকে তোলার ব্যবস্থা কর। না করলে ফল ভালো হবে না।’ কথাটা শুনে রাবণ পালটা ধমকের সুরে বলল, ‘বেশি তেজ দেখিও না। কীভাবে মজা দেখাবে? ওপরে উঠবে কীভাবে? এখানেই পচে মরতে হবে।

রাবণের কথা শুনে ফিলিপ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে হেরম্যান বললেন, ‘শোন রাবণ। আমরা কেউ তোমার শত্রু নই। আমরা এখানে পচে মরলে তোমার কোনো লাভ হবে না। হয়তো বা রবার বাগানটা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতি উভয়পক্ষেরই হবে। তার চেয়ে আমাদের ওপরে উঠিয়ে নাও। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান নিশ্চয়ই হবে।’

হেরম্যানের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল রাবণ। তারপর ধীরে-ধীরে কুয়োর মুখটা থেকে সরে গেল। বেশ কয়েক মিনিট নিস্তব্ধভাবে কেটে গেল। ফিলিপ বললেন ‘লোকটা কোথায় গেল আমাদের ফেলে রেখে?’

হেরম্যান বললেন, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’

আর এরপরই ওপর থেকে একটা সড়-সড় শব্দ কানে এল। সম্ভবত সেই শুকনো গাছের কোনো ডাল ভেঙে পড়ল। একটা ঘসটানো শব্দও এগিয়ে আসতে লাগল গর্তর মুখের দিকে। গর্তের মুখে আবার আবির্ভূত হল রাবণ। খুঁটির মতো একটা বিরাট শুকনো ডাল নামিয়ে দিতে লাগল নিচের দিকে। ডালটা কিছুটা নামার পরই সেটা ধরে ফেলল সুদীপ্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডালটার ছুঁচলো মাথাটা চাপ দিয়ে গাঁথা হল গর্তের দেওয়ালের মধ্যে। একটা ঢালু পোলের মতো সৃষ্টি হল। একটু কসরত করে সেই খুঁটিটা বেয়ে গর্তের মুখের কাছে পৌঁছতেই হাত বাড়িয়ে হ্যাঁচকা টানে সুদীপ্তকে বাইরে বের করে আনল রাবণ। আর তারপর একইভাবে ফিলিপ আর হেরম্যানও বাইরে বেরিয়ে এলেন। সত্যি আসুরিক শক্তি ধরে বটে রাবণ! নইলে অতবড় ডালটা ভাঙা আর ভারী ডালটা টেনে আনা অন্য কোনো একা মানুষের পক্ষে সম্ভব হত না।

সবাই উঠে আসার পর রাবণ বলল, ‘একবার ভেবেছিলাম তোমাদের ওখানে ফেলে রেখে চলে যাই। তোমরা বাঁচো-মরো আমার তাতে কী? কিন্তু পরে ভাবলাম তাহলে আসল ব্যাপারটা তোমাদের দেখানো যাবে না। যদিও সেটা না দেখালেও আমার কিছু যায় আসে না। তবু…’

হেরম্যান প্রশ্ন করলেন, ‘আসল ব্যাপারটা কী?’

সুদীপ্ত-হেরম্যানকে চমকে দিয়ে রাবণ জবাব দিল, ‘ওই লোমশ মানুষের ব্যাপারটা।’

‘লোমশ মানুষের ব্যাপার মানে?’ বিস্মিতভাবে বলে উঠলেন হেরম্যান।

রাবণ কুয়োর পাশে পড়ে থাকা তার বন্দুকটা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এত কথা এখন বলা যাবে না। তাড়াতাড়ি ফেরার জন্য এখন আমাদের রওনা হতে হবে। তারপর সব বুঝতে পারবে।’ এরপর আর কথা না বলে সে ফেরার পথ ধরল। সুদীপ্তরাও তাকে অনুসরণ করল।

একটু অন্য পথে চলতে লাগল তারা। চাঁদের আলোতে আধো-অন্ধকার রবার বন। দিনেরবেলায় এ-বনে পথ চলার সময় কোনো শব্দ পায়নি সুদীপ্তরা। কিন্তু রাতের বেলায় বনচারীরা যেন জেগে উঠেছে। নানারকম অস্পষ্ট বা স্পষ্ট খচমচ শব্দ কানে আসছে। নিজেদের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে লুকিয়ে থাকা প্রাণীরা। কেউ বা শিকার ধরতে আবার হয়তো বা কেউ শিকার হতে। রবার গাছের আড়ালে কখনও জ্বলে উঠছে উজ্জ্বল চোখ আবার কখনও বা স্যাঁত করে সরে যাচ্ছে কোনো ছায়া। চলতে চলতে রাবণ শুধু একবার বলল, ‘ওরাংওটাং-এর দলটাও এ-পথেই গেছে। এ পথে অনেক দ্রুত জঙ্গলের বাইরে যাওয়া যায়। আর কোনো কথা বলল না সে।

একেবারের জন্যও না থেমে দ্রুত এগিয়ে চলল রাবণ, আর তার পিছন পিছন সুদীপ্তরা। সময় এগিয়ে চলল, চাঁদও এগোতে লাগল। সুদীপ্তরা যখন পথ চলা শেষ করল তখন চাঁদ ফিকে হতে শুরু করেছে। আকাশের বুকে শুকতারা ফুটে উঠেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই উদিত হবেন সূর্যদেব।

গাছের ফাঁক দিয়ে সুদীপ্তদের চোখে পড়ল আধো অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা টিনের শেডওয়ালা পরিত্যক্ত গোডাউন আর সুদীপ্তদের থাকার জায়গা বাগানের অফিস-বাড়িটা।

রাবণ জঙ্গল থেকে বাইরে বেরোবার আগে গোডাউনের দিকটা একবার ভালো করে দেখে নিল। তারপর সুদীপ্তদের ইশারা করল তাকে অনুসরণ করার জন্য। গুঁড়ি মেরে রাবণ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এগোল গোডাউনটার দিকে, আর একইভাবে তার পিছু নিল সুদীপ্তরাও। গোডাউনের কাছাকাছি পৌঁছে রাবণ ইশারায় বাড়ির দিকটা দেখাল। সেদিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখল সবাই। বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিটার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট হেলিকপ্টার! তার গায়ে একটা লাল আলো জ্বলছে-নিভছে। হয়তো-বা গর্ত থেকে ওই কপ্টারটাকেই উড়ে আসতে দেখেছিল সুদীপ্তরা। রাবণ অবশ্য সেটা দেখিয়ে থামল না। সে সুদীপ্তদের নিয়ে উপস্থিত হল গোডাউনের পিছনদিকে দেওয়ালের কাছে। সামনে একটা এক মানুষ সমান লতা-গুল্মের ঝাড়। রাবণ সেটা হাত দিয়ে সরাতেই একটা দরজা বেরিয়ে পড়ল, লতা-গুল্মর আড়ালে সেই দরজা এমনভাবে ঢাকা থাকে যে দিনের আলোতেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না। এক পাল্লার দরজাটা খোলা। ভিতরটা অন্ধকার। সেই দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার আগে রাবণ চাপা স্বরে বলল, ‘কোনো শব্দ করবেন না। সে-ও সম্ভবত এখানেই আছে। আপনারা খেয়াল না করলেও বন ছেড়ে বাইরে বেরোবার মুখে গাছের মাথায় আমি ওরাংওটাংগুলোকে অন্ধকারে বসে থাকতে দেখেছি। সে যেখানে যায়, ওরাংওটাংগুলোও সঙ্গে যায়।’

রাবণের কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারল না সুদীপ্তরা। রাবণের পিছন-পিছন গোডাউনে ঢুকে পড়ল তারা। খুব আবছা আলো চালের ফুটো দিয়ে ঢুকছে ভিতরে। চারপাশে ডাই করা আছে ল্যাটেক্স সংগ্রহের লোহার ড্রাম, কাঠের পিপে। একটার উপর একটা রাখা পিপেগুলো কোথাও-কোথাও দেওয়াল রচনা করে ছাদের দিকে উঠেছে। মাথার ওপর থেকে সেগুলো খসে পড়লেই সর্বনাশ। নানা পুরানো বাতিল জিনিসপত্রও ছড়িয়ে আছে চারপাশে। সুদীপ্তরা সে-সবের ফাঁক গলে গুঁড়ি মেরে নিঃশব্দে এগোতে লাগল। ঝুল, ধুলো আর মাকড়সার জালে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে তাদের হাত মুখ। ড্রামগুলোর গলি-ঘুঁজির মধ্যে দিয়ে এক পা এক পা করে এগোতে থাকল তারা। অন্ধকারে ড্রাম বা পিপেগুলোর সঙ্গে জোরে ঠোক্কর খেলে মুশকিল। হুড়মুড় করে মাথার ওপর থেকে ড্রামের দেওয়াল খসে পড়তে পারে।

গোডাউনটা বেশ বড়। দৈর্ঘ্যে অন্তত তিনশো ফুট হবে। তার শেষপ্রান্ত থেকে যেন একটা ক্ষীণ আলোর রেখা ভেসে আসছে। রাবণের পিছনে-পিছনে সন্তর্পণে এক সময় তারা পৌঁছে গেল সে-জায়গায়। তিনদিকে মাথার ছাদ পর্যন্ত ড্রামে ঘেরা ছোট একটা জায়গা। সেখানে একটা হ্যাজাকের মতো তেলের বাতি জ্বলছে। তবে তার আলো খুব জোরালো দিয়ে উঁকি মেরে সুদীপ্তরা দেখতে পেল সেই ফাঁকা জায়গায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন নয়। মাঝে-মাঝে দপদপ করছে। হয়তো বা তাতে তেল বেশি নেই। ড্রামের প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে সুদীপ্তর দেখতে পেল সেই ফাঁক জায়গায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন গুরুমূর্তি। তাঁর হাতে ধরা একটা ব্রিফকেস। বাতিটা জ্বালা থাকলেও তার আলো সুদীপ্তদের বিপরীত দিকে পৌঁছোচ্ছে না। সুদীপ্তদের ঠিক বিপরীতে সে জায়গার দিকে তাকিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন তিনি। সুদীপ্তরা শুনতে পেল গুরুমূর্তি বললেন, ‘সেই লোক তিনজনের খবর কী?’

ও-পাশের অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘তারা এখন জঙ্গলের গভীরে গর্ত-র মধ্যে পড়ে আছে। ওরাংওটাংরা কৌশলে ওই কুয়োর মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে ওদের। ভাগ্যিস আপনি গতকাল রাতে জানালেন যে ওরা আমাকে ধরতে এসেছে।’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘ওরা তোমাকে কেউ দেখেনি তো?’

অন্ধকারের মধ্যে থেকে জবাব এল, ‘না। দেখেনি। আমি আড়াল থেকে নির্দেশ দিচ্ছিলাম ওরাংওটাংদের।’

সুদীপ্তরা বুঝতে পারল তাদের নিয়েই কথোপকথন হচ্ছে গুরুমূর্তি আর অন্ধকারের আড়ালে থাকা লোকটার মধ্যে। এরপর গুরুমূর্তি জানতে চাইলেন, ‘আর রাবণের খবর কী? সে-ও তো জঙ্গলে গেছে?’

অন্ধকার উত্তর দিল, ‘তার খবর আমি জানি না। তাকে আমি দেখিনি। আমি শুধু আড়াল থেকে তিনজন লোকেরই পিছু নিয়েছিলাম।’

উত্তর শুনে গুরুমূর্তি বললেন, ‘ওটার একটা ব্যবস্থা করলে ভালো লাগত। ও মনে হয় সন্দেহ করেছিল যে আমার-তোমার মধ্যে কোনো একটা যোগাযোগ আছে। হয়তো-বা তোমাকে এখানে কোথাও দেখেও থাকতে পারে। একবার তো জঙ্গলে গুলি চালিয়ে ওকে প্রায় সাবাড়ই করে দিচ্ছিলাম। একটুর জন্য ফসকে গেল গুলিটা। আর সে-ব্যাপারেও ও আমাকেই সন্দেহ করেছিল। তবে তার সন্দেহে এখন আর কিছু যায় আসে না। আমি এ-জায়গা ছেড়ে, কুয়ালালামপুর ছেড়ে পড়শি দেশে চলে যাচ্ছি। আমার এই ব্রিফকেসে যে টাকা আছে তাতে বাকি জীবনটা আরামে কেটে যাবে। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে চলেছে। এবার আমি রওনা হব।’

অন্ধকারের মধ্যে থেকে কণ্ঠস্বরটা বলল, ‘হ্যাঁ, ডাক্তার, নিয়ে চলুন, দেখুন আমাকে সেখানে সুস্থ করে তুলতে পারেন কিনা?’ কেমন যেন একটা আর্তি ভেসে উঠল সেই কণ্ঠস্বরে।

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, গতকাল তো তোমাকে বলেইছি যে সঙ্গে নিয়ে যাব। তুমি বেরিয়ে এসো।’

কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা তারপর অন্ধকারের মধ্যে থেকে যে ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসে গুরুমূর্তির মুখোমুখি দাঁড়াল তাকে দেখে চমকে গেল সুদীপ্তরা। অবিকল মানুষের আকৃতির হলেও লোকটার সর্বাঙ্গে, মুখ থেকে পা পর্যন্ত বড়-বড় লোমে ঢাকা। লোমশ মানুষ! শুধু কৌপিনের মতো একফালি কাপড়ের টুকরো রয়েছে তার পরনে যেমন বলেছিল সেই চিনা মেয়েটা।

কয়েক মুহূর্ত মুখোমুখি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর লোমশ মানুষটা গুরুমূর্তিকে বলল, হ্যাঁ, চলুন এবার। বাইরে মনে হয় আলো ফুটতে শুরু করছে। দেরি করলে কেউ আমাকে দেখে ফেলতে পারে। তাছাড়া ওরাংওটাংগুলোও আমাকে বাধা দিতে পারে। ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে। এ-কটা বছর তো ওদের সঙ্গেই কাটালাম। ওদের ছেড়ে যেতে আমারও কষ্ট হচ্ছে। আর হান্নাকেও চিরদিনের মতো এখানে ছেড়ে যাচ্ছি আমি।’ শেষ কথাগুলোতে স্পষ্ট বিষণ্ণতার সুর ফুটে উঠল লোমশ মানুষের গলায়।

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, যাব। কিন্তু তার আগে একটা ছোট্ট কাজ বাকি আছে।’

‘কী কাজ?’ জানতে চাইল লোমশ মানুষ।

গুরুমূর্তির মুখে এবার একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তোমাকে আর আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়, আর সুস্থ করে তোলাও সম্ভব নয়। কাজেই তুমিই তোমার সঙ্গিনীর মতো চিরদিন ঘুমিয়ে থাকবে মালয়ের এই রবার বনে। থেকে যাবে গল্পকথার লোমশ মানুষ হিসাবে।’

আড়াল থেকে সুদীপ্তরা এবার খেয়াল করল গুরুমূর্তির ডান হাতে কখন যেন উঠে এসেছে একটা পিস্তল!

লোমশ মানুষ এবার বিস্মিতভাবে বলে উঠল, ‘এ-কী বলছেন ডাক্তার? আপনার জন্যই তো আজ আমার এই অবস্থা। হান্নাকেও হারাতে হল।’

গুরুমূর্তি তার কথা শুনে রুক্ষস্বরে বললেন, ‘এটা তোমাদের কপালে লেখা ছিল আর এখন যা ঘটাব সেটাও।’

শ্বাপদের মতো একটা হিংস্রভাব ফুটে উঠল গুরুমূর্তির চোখে। পিস্তলটা তিনি লোমশ মানুষের বুক লক্ষ্য করে উঠিয়ে ট্রিগার টেনে দিলেন। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল গুদামঘরটা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ব্যাপারটা অনুমান করে ওরাংওটাং-এর মতোই লাফিয়ে একপাশে সরে গেল লোমশ মানুষ। লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিটা একটা ড্রামের গায়ে লেগে আগুনের ফুলকি তুলল।

এরপর দ্বিতীয়বার লোমশ মানুষের দিকে পিস্তল তাক করতে গেলেন গুরুমূর্তি। আর দেরি করা সম্ভব নয় সুদীপ্তদের পক্ষে। বারবার নিশ্চই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না গুরুমূর্তির পিস্তল। লোমশ মানুষকে মেরে ফেলবে সে। কাজেই ড্রামের দেওয়ালের বাইরে আত্মপ্রকাশ করল সুদীপ্তরা চারজন। তাদের দেখে গুরুমূর্তি মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হয়ে তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘তোমরা সরে যাও, নইলে আমি তোমাদেরও মারব।’

রাবণ সঙ্গে-সঙ্গে বলল, ‘তোমাকে পালাতে দেব না। পিস্তল ফেলে দাও তুমি।’ একথা বলে রাবণ কাঁধ থেকে তার বন্দুক হাতে নিতে যাচ্ছিল কিন্তু গুরুমূর্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দিলেন। রাবণের আর বন্দুক হাতে ধরা হল না, সে ছিটকে পড়ল ড্রামের প্রাচীরের গায়ে। আর সেই প্রবল সংঘর্ষে মাথার ওপর থেকে হুড়মুড় করে সুদীপ্তদের ওপর নেমে আসতে লাগল ড্রামগুলো। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নিভে গেল তেলের বাতিটা। এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল সুদীপ্ত, হেরম্যান আর ফিলিপ।

সুদীপ্তর ব্যাপারটাতে ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগল। তারপর সে হেরম্যানের গলা শুনতে পেল, ‘সুদীপ্ত, ফিলিপ, লোকটা মনে হয় বাইরে পালাচ্ছে। ওকে ধরতে হবে, তাড়াতাড়ি চলো।’

সুদীপ্ত আর ফিলিপ উঠে দাঁড়িয়ে হেরম্যানের সঙ্গে আধো-অন্ধকার হাতড়ে বাইরের দিকে এগোতে লাগল।