১২
ভোর হল। তখন ধ্রুবদের নৌকোর গতিও অনেকটা কমে এসেছে। ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে এগোচ্ছে নৌকো। সারা রাত জেগে বসেছিল ধ্রুব আর মার্লিন ছোট্ট ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। সমুদ্রস্রোত তাদের কোন দিকে নিয়ে এসেছে তা তাদের জানা নেই। কুয়াশা কেটে ভালো করে সূর্য উঠতেই মার্লিনের পাখিটা ডাক ছেড়ে আকাশে উঠে নৌকোর মাথার উপর চক্কর কাটতে শুরু করল। তার ডাক শুনে বাচ্চা ছেলেটাও ঘুম ভেঙে উঠে বসল। তার চোখে বিস্ময়। সূর্যের আলোতে খুব সুন্দর দেখতে লাগছে তাকে। যদিও তার মুখে ভয়ের ছাপ পুরোপুরি কাটেনি। বেশ কিছুক্ষণ বিস্মিত দৃষ্টিতে চারপাশের জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে প্রথম মুখ খুলল। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’
ধ্রুব তার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘আমরা তোমাকে তোমার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি। আর ক’দিন পরই তার সঙ্গে দেখা হবে তোমার।’
ধ্রুব বাচ্চাটাকে বিস্কুট আর জল খেতে দিল। খেয়ে নিল ছেলেটা। তারপর বলল, ‘সেই দুষ্টু লোকটা আবার আমাকে ধরে নিয়ে বাক্সের মধ্যে আটকে রাখবে না তো? কী ভীষণ অন্ধকার সেখানে। আমার দম আটকে যায়। ভয় করে।’
মার্লিন বলল, ‘না, সে আর তোমাকে ধরতে পারবে না। আমরা তোমাকে অনেকদূর নিয়ে এসেছি। আচ্ছা, ওই দুষ্টু লোকটা তোমাকে ধরল কীভাবে?’
কিড বলল, ‘ও আমার বাবার জাহাজে ছিল। আমাকে গল্প শোনাত। একদিন ও বলল ওর নাকি পোষা বিরাট একটা কচ্ছপ আছে। তার পিঠে চড়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় ও। কত সুন্দর সুন্দর জায়গাতে কচ্ছপটা বেড়াতে নিয়ে যায় তাকে। ভারি মজা হয়। শুনে আমি বললাম আমিও কচ্ছপের পিঠে চড়ব। সে বলল, সে চড়াতে পারে যদি আমি ব্যাপারটা বাবা, বা অন্য কাউকে না বলি। সবাই চড়তে চাইলে ভারি মুশকিল হবে। তারপর একদিন সে বলল, রাতে যখন সবাই ঘুমাবে তখন খোলের একটা ঘরে আসতে। সেখানে পোর্টহোল দিয়ে লোকটা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে দড়ি খুলে নৌকোতে নামল। ও বলল, কচ্ছপটা একটু দূরে আছে…।’
‘ও বুঝেছি। তারপর তোমাকে একটা জাহাজে নিয়ে গেল। তাই তো?’ মার্লিনের কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল ছেলেটা!
ভেসে চলেছে নৌকো। মার্লিনের পাখিটা মাঝে মাঝে চক্কর কেটে আকাশে উড়ছে। তারপর আবার নৌকোতে ফিরে আসছে। হঠাৎ একবার সে দক্ষিণে অনেকটা উড়ে গেল। তারপর নৌকোর মাথার ওপর অনেকটা উঁচু থেকে কী যেন বলে আবার একই দিকে উড়ে গেল। বারকয়েক ঘটল ব্যাপারটা। প্রতিবারই সে ক্রমশ দূরে থেকে আরও দূরে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে…। ম্যাকাওটা এরকম অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? মার্লিন পাখিটাকে ডাকল, কিন্তু সে নামল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দূরের কুয়াশা কেটে যেতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। ধ্রুব পাখিটার গন্তব্যের দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল, ‘দ্বীপ! দ্বীপ..!’
দুরে একটা কালো রেখা অস্পষ্ট ভাবে ভেসে উঠেছে! জাহাজ এত লম্বা হয় না। হ্যাঁ ওটা দ্বীপই। ধ্রুবদের নৌকোও সেদিকেই ভেসে যাচ্ছে। ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার পর মার্লিন ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এ যাত্রা সম্ভবত আমরা বেঁচে গেলাম। দ্বীপে নামতে পারলে এ নৌকোর দাঁড়-পাল বানিয়ে আবার ভাসা যাবে। আর ওখানে মানুষ থাকলে তো কোনো কথাই নেই। তাদের সাহায্যেই ফেরার ব্যাপারটা হয়ে যাবে। পাখিটা এতক্ষণ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। উঁচু থেকে, দ্বীপটা আগেই দেখতে পেয়েছিল।’
ধ্রুব বলল, ‘এ কোন্ দ্বীপ হবে?’
মার্লিন জবাব দিল, ‘সেসেজেরই কোনো দ্বীপ হবে। আমার ধারণা একশো নটের মতো ভেসে এসেছি আমরা।’
ধ্রুব বলল, ‘তাহলে তো বিয়ার্ডরা এখানেও আমাদের পিছু ধাওয়া করতে পারে?’
মার্লিন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, তা পারে। কিন্তু আমরা স্রোতে ভাসতে ভাসতে কোন্দিকে এসেছি তা ওরা জানবে কী করে? আগে ওসব ভেবে লাভ নেই। দ্বীপে নেমে তারপর ভাবা যাবে।’
ধ্রুবরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল সেদিকে। ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল নৌকো। তবে তার গতি খুব মন্থর। বেলা নটা নাগাদ দ্বীপটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল তাদের কাছে। তারা আন্দাজ করল, দ্বীপটার পরিধি মাইল দশেক মতো হবে। উঁচু নিচু টিলা আর নারকেল গাছে ঘেরা দ্বীপ। আরও কিছুদুর এগিয়ে তারা বুঝতে পারলে দ্বীপের একটা বড় অংশ গ্রানাইট পাথরে গড়া। অসংখ্য খাঁড়ি বেরিয়েছে দ্বীপ থেকে। সমুদ্রের জল এসব খাঁড়ি বেয়ে দ্বীপের একটা বড় অংশ সমুদ্রে মেশে। অবশেষে আরও ঘণ্টাখানেক পর এরকমই একটা খাঁড়ির বালুতটে ধ্রুবদের নৌকা এসে ভিড়ল। কিছুদূর দ্বীপের মাটিতে নামল তিনজন। নৌকোটাকেও টেনে ওপরে উঠানো হল। ইতিমধ্যে মার্লিনের পাখিটা আবার তার কাঁধে এসে বসেছে। দ্বীপটা দেখে সেও যেন বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। নানা অবান্তর বকবক করতে করতে তার মাঝে আবার সে আউড়ে উঠল সেই ছড়াটা—
‘ডিং ডং ডিং ডং ডিং ডং বেল
পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল।’
কিড বেশ মজা পেল কথাটা শুনে। তার আতঙ্ক ভাবটা যেন অনেকটা কেটে গেল। সেও ছড়াটা বলতে থাকল। তারপর মার্লিনের থেকে পাখিটা নিজের কাঁধে নিল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মার্লিন। পাখিটা কানের কাছে চেঁচিয়ে তার মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল।
সমুদ্র খাঁড়ি তটে এদিক-ওদিক দ্বীপের বাইরের অংশে ঘুরে ধ্রুবদের যতটুকু মনে হল, তাতে এ দ্বীপে মানুষের বসতি নেই। তবে রং-বেরঙের নানা পাখি আছে। তার অধিকাংশই মার্লিনের পাখির সমগোত্রীয়। নারকোল গাছের মাথায় উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। গাছের কোটরে তাদের বাসা। মার্লিনের পাখিটাকে দেখে তারা নিজেদের ভাষায় কী যেন হাঁক-ডাক করতে লাগল। আর কিডের কাঁধে বসা পাখিটাও সময় সময় তার উত্তর দিতে লাগল তার স্বজাতীয় ভাষাতে। আর দ্বীপের সরু সরু নালাতে অনেক ছোট ছোট কচ্ছপও আছে। তবে জন্তু জানোয়ার বলতে যা বোঝায় তা তারা দেখতে পেল না। ধ্রুবরা হিসাব করে দেখল, প্রায় দুপুর হতে চলেছে তখন। পুরো দ্বীপটা ঘুরে দেখতে হলে ভোরে না বেরোলে অন্ধকার হয়ে যাবে। অন্ধকারে দ্বীপের ভিতর কোনো অজানা বিপদ ওৎ পেতে থাকতে পারে। কাজেই তারা শেষমেশ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল, দ্বীপের ভিতর তারা এ দিন না ঢুকে তটেই রাত কাটাবে। পরদিন ভোরে দ্বীপের ভিতর তারা ঢুকবে তার আগে বাইরে থেকে দ্বীপের ওপর তারা নজর রাখবে। কাছেই রাত্রিবাসের জন্য একটা জায়গা পছদ হল তাদের, খাঁড়ির কাছেই গ্রানাইট পাথরের দেওয়ালে একটা গুহা মতো জায়গা। তার ভিতর থেকে বাইরের খাঁড়ি তটের বেশ অনেকটা জায়গা নজরে আসে। দ্বীপের একটা অংশও আসে। অথচ গুহার সামনে নারকেল গাছের সারি এমনভাবে দাঁড়িয়ে যে চট করে তা নজরে আসে না।
নৌকোতে যা সামান্য মালপত্র ছিল তা তারা গুহায় এনে তুলল। মালপত্র আনার পর রেডিও সেটটা দেখিয়ে মার্লিন ধ্রুবকে বলল, ‘তুমি চেষ্টা করে দেখো যে এটার সাহায্যে কিডের বাবার জাহাজ বা অন্য কোনো জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় কিনা? তাহলেই কেল্লাফতে!’
রেডিও সেটটা নিয়ে ধ্রুবরা বসল গুহার সামনে। ধ্রুবর পকেটেই ছিল কিডের বাবার জাহাজের ওয়ারলেস কোড লেখা কাগজটা। কিন্তু সেটটা চালু করার পরই একটা ব্যাপার ধরা পড়ল। তাড়াহুড়োতে ওয়ারলেস সেটের ইয়ারফোনটা আনেনি মার্লিন। অর্থাৎ ধ্রুবদের কথা কেউ শুনতে পেলেও তাদের কোনো কথা ধ্রুবরা শুনতে পাবে না।
তবুও তাদের সংবাদ যদি কোনো জাহাজ পায় এই ভেবে ধ্রুব বলে যেতে লাগল, ‘রয়াল মেরিন নেভি ভিক্টোরিয়ার অ্যাডমিরাল উইলিয়াম বা অন্য কোনো জাহাজের উদ্দেশে বলছি—‘আমি ধ্রুব মিত্র ‘শ্রীগণেশ’ নামের ভারতীয় জাহাজের রেডিও অপারেটর, ও মার্লিন নামের এক ব্রিটিশ নাগরিক, এই মুহূর্তে সেসেজের কোনো অজানা দ্বীপে অবস্থান করছি। আমাদের সঙ্গে আছে অ্যাডমিরাল উইলিয়ামের শিশুপুত্র কিড। যাকে সোমালি দস্যুরা ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার থেকে অপহরণ করে। যে দ্বীপে আমরা আছি তা সেসেজের সম্ভবত দক্ষিণে। পরিধি আনুমানিক দশ মাইল। সমুদ্রস্রোত যে দ্বীপের গা বেয়ে প্রবাহিত হয়, দ্বীপটি গ্রানাইট পাথরের। সমুদ্র খাঁড়িতে অবস্থিত…।’
যতদূর সম্ভব দ্বীপের বিবরণ দিয়ে অজানা শ্রোতার কাছে তাদের উদ্ধারের জন্য কিছুক্ষণ পরপর বার্তা পাঠিয়ে যেতে লাগল ধ্রুব। কিডকে দিয়েও বারকয়েক আবেদন জানানো হল।
সময় এগিয়ে চলল। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল একসময়। মার্লিন খাঁড়ি থেকে একটা ছোট কচ্ছপ আনল। সেটা পুড়িয়ে ভোজন সাঙ্গ করল ধ্রুবরা। মার্লিন বলল, ‘এখানে একটা ব্যাপার অন্তত ভালো যে খাদ্যাভাবে আমাদের মরতে হবে না। কচ্ছপ আর নারকেল, এ দুটোই প্রচুর আছে এ দ্বীপে।’
সমুদ্রের জলে লাল আবির গুলে সূর্য ডুবল একসময়। অন্ধকার নামতেই ধ্রুবরা গুহার ভিতর আশ্রয় নিল।
.
পরদিন ভোরে ধ্রুবর যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্যদেব সবে উঠব উঠব করছেন। সমুদ্রের দিকটা তখনো পাতলা কুয়াশায় আবৃত। কিডকে ঘুম থেকে তুলে কিছু শুকনো খাবার খাইয়ে দিল মার্লিন। আলো আর একটু স্পষ্ট হলেই বেরিয়ে পড়বে তারা। মার্লিন বলল, ‘আমরা দ্বীপের মাঝ বরাবর ওপাশে যাবার চেষ্টা করব। তাতে ওপাশে পৌঁছতে সময় কম লাগবে।’
ধ্রুবরা তৈরি হয়ে নিয়ে আলো স্পষ্ট হবার অপেক্ষায় বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের বুক থেকে সূর্যোদয়ে কুয়াশা কেটে আলো ফুটতে শুরু করল। বাইরে থেকে ভেসে আসতে লাগল অস্পষ্ট পাখির ডাক। একসময় মার্লিন বলল, ‘চলো এবার তাহলে যাওয়া যাক।’ ধ্রুব তার তলোয়ারটা কোমরে গুঁজে কিডের হাত ধরে বাইরে পা রাখতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় সময়ের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। একটা নৌকো যেন ভাসতে ভাসতে এ দিকেই আসছে! ও কার নৌকো?
ধ্রুবরা গুহার ভিতর থেকে তাকিয়ে লক্ষ করতে লাগল নৌকোটি। খুব মন্থর গতিতে সমুদ্রস্রোতে ভেসে আসছে। ঠিক যেমন ধ্রুবদের নৌকো এসেছিল। কিন্তু সে নৌকো কাছে আসার পর প্রথমে তাতে কাউকে দেখা গেল না। তাহলে কী এটা কোনো পরিত্যক্ত নৌকো?
নৌকোটা এসে ঠেকে গেল বালির চরে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল ধ্রুবদের। আলো ততক্ষণে বেশ ফুটে গেছে। পরিত্যক্ত নৌকো ভেবে আবার যখন ধ্রুবরা বেরোতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় নৌকোর ভিতর উঠে বসল একজন। এতক্ষণ সে নৌকোতে শুয়েছিল। কিছুটা যেন হাতড়ে নৌকো থেকে নেমে দাঁড়াল লোকটা। এবার তাকে চিনতে পারল তারা।
আরে এ যে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড!
তাহলে সে কি তাদের পিছু ধাওয়া করে এখানে চলে এল? কিন্তু ওর অন্য লোকজন কোথায়?
সমুদ্রতটে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দ্বীপের দিকে হাঁটতে লাগল বিয়ার্ড। অনেকটা ধ্রুবদের গুহা যেখানে সেদিকেই। তবে তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন টলোমলো। ধ্রুব বলল, ‘বিয়ার্ড ওভাবে হাঁটছে কেন?’
মার্লিন জবাব দিল, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’
বিয়ার্ড এলোমেলো পায়ে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ঠিক এমন সময় একটা কাণ্ড ঘটল। গুহার বাইরে আলোর দেখা পেয়ে মার্লিনের পাখিটা অনেকক্ষণ ধরেই ডানা ঝাপটাচ্ছিল মার্লিনের কাঁধে বসে। তারা বাইরে বেরোচ্ছে না দেখে অধৈর্য হয়ে পাখিটা হঠাৎ উড়ে গেল বাইরের দিকে। সোজা সে এগোল বিয়ার্ডের দিকে। পাখিটা বিয়ার্ডের মাথার ওপর পৌঁছতেই বিয়ার্ড গুলি ছুড়লেন। পাখিটা তখন বিয়ার্ডের মাথার ওপর দিয়ে অনেকটা দূরে চলে গেছে। গুলি ছুড়েই দাঁড়িয়ে পড়ল বিয়ার্ড। কেমন যেন হতভম্ব ভাব তার। এরপর পাখিটা যখন ঘুরে আবার ফিরে আসছে বিয়ার্ড আবার চিৎকার করে উঠল। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাত দিয়ে মাথা মুখ আড়াল করে টলোমলো পায়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু বেশিদুর সে এগোতে পারল না। বালুতটে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তার পারকাসনও হাত থেকে খসে গেল। মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করতে লাগল বিয়ার্ড। উত্তেজনায় মার্লিন তখন গুহার বাইরে পা রেখে ফেলেছে। বাতাসে চক্কর কেটে বুড়ো পাখিটা আবার ফিরে এসে বসল মার্লিনের কাঁধে। তারপর বলে উঠল, ‘ক্যাপ্টেনের মুন্ডু কাট। মুণ্ডু কাট।’
কিছুক্ষণ গোঙাবার পর থেমে গেল বিয়ার্ড। ধ্রুব বলল, ‘বিয়ার্ডের কী হল? কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’
‘আগে আমরা গিয়ে ওকে কাবু করে ফেলি। ও আমাদের এখনও খেয়াল করেনি। শয়তানটাকে এবার কবজা করব।’ কথাগুলো বলেই কোমর থেকে তরোয়াল খুলে নিল মার্লিন, এগোল বিয়ার্ড যে দিকে পড়ে আছে সেদিকে। ধ্রুবও কিডকে গুহার মধ্যে রেখে অনুসরণ করল মার্লিনকে। তার পাখিটা আবার কাঁধ ছেড়ে উড়ে গেল আকাশে।
নিঃশব্দে মাটিতে পড়ে থাকা বিয়ার্ডের কাছে তারা পৌঁছে গেল। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে মড়ার মতো মাটিতে শুয়ে আছে ক্যাপ্টেন। তার পোশাক ছিন্নভিন্ন দেহের উন্মুক্ত স্থানগুলোতে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। মার্লিন তার দেহের ওপর ঝুঁকে তাকে ভালো করে দেখতে যেতেই কাঁধে বসা পাখিটা হঠাৎ ডানা ঝাপটিয়ে উঠল। আর সেই শব্দ পাওয়া মাত্রই বিয়ার্ড হঠাৎ ধ্রুবদের চমকে দিয়ে আর্তনাদ করে তার হাত দুটো মুখের থেকে সরিয়ে কোনো অদৃশ্য শত্রুর উদ্দেশে হাত ছুড়তে লাগল। ধ্রুবর এবার দৃষ্টি পড়ল ক্যপ্টেনের মুখের ওপর। বীভৎস সেই মুখ! কেউ যেন ছিঁড়ে ফালা ফালা করেছে তার মুখ। আর সবচেয়ে বীভৎস ব্যাপার হল তার চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গেছে। বিয়ার্ড কেন অদ্ভুতভাবে হাঁটছিল তা এবার স্পষ্ট হয়ে গেল। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড দৃষ্টিশক্তিহীন।
বিস্মিত মার্লিন বিয়ার্ডের উদ্দেশে বলে উঠল, ‘ক্যাপ্টেন আপনার এ অবস্থা হল কীভাবে?’
তার কথা কানে যেতেই চিৎকার থামিয়ে দিল বিয়ার্ড। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ও মার্লিন। তোমার সেই পাখিটা। আমি ভেবেছিলাম বুঝি।’ কথা শেষ করল না বিয়ার্ড।
ধ্রুব বলল, ‘কী ভেবেছিলেন? আপনার লোকজন সব কোথায়?’
ধ্রুবর গলা শুনে বিয়ার্ড প্রথমে বলল, ‘ও আপনিও সঙ্গে আছেন তাহলে আমার সঙ্গে আর কেউ নেই, ম্যাঙ্গকি নেই…কেউ নেই।’ তারপর বলল, ‘দিনের বেলায় দেখে বুঝিনি রাত নামলে ওরা কেমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। শয়তানের মতো ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণ করল আমাদের। কোনো কিছুই কাজে এল না। কেউ বাঁচল না…।’
‘কিন্তু আপনি এখানে এলেন কী ভাবে?’ জানতে চাইল ধ্রুব।
একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল বিয়ার্ডের মুখে। সে বলল, ‘ভাগ্যের পরিহাস। লোকগুলো দিনের বেলায় আমাকে দেখে প্রাণে মারল না। হয়তো আমি ব্ল্যাক প্যারোটের বংশধর বলেই। একটা নৌকোতে ওরা আমাকে তুলে দিয়ে বলল, ‘এ নৌকো তোমাকে নিয়ে যাবে সে দ্বীপে, যেখানে ব্ল্যাক প্যরোটের গুপ্তধন লুকানো আছে। সমুদ্রস্রোতে ভাসতে ভাসতে আমি এখানে এসেছি। এ কোন দ্বীপ তা জানার ক্ষমতা এখন আমার নেই। তা আপনারা এখানে এলেন কী ভাবে?’
‘ওই একই ভাবে সমুদ্রস্রোতে ভেসে।’ জবাব দিল ধ্রুব।
‘আচ্ছা, এ দ্বীপে কি খাঁড়ি আছে? গ্রানাইট পাথরের কোন্ দ্বীপ? এখানে কি কচ্ছপ মেলে?’ জানতে চাইল বিয়ার্ড।
মার্লিন বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেন?’
বিয়ার্ড বলল, ‘ওদের রাজা আমাকে গুপ্তধনের দ্বীপের এরকমই বর্ণনা দিয়ে বলল, আমি যেন এ দ্বীপে নেমে গুপ্তধন খুঁজে নিই! তারপর সবাই মিলে খুব হেসে আমাকে নৌকোতে তুলে দিল। ওরা কথাগুলো বলল, কারণ চোখদুটো আমার নেই। তবে সম্ভবত আপনারা ঠিক জায়গাতে পৌঁছেছেন। মার্লিন তার পাখিটাকে দেখে সন্দেহটা আগেই হয়েছিল। ওর পুরো নামটাও…। ঠিক কিনা মার্লিন?’ ক্ষীণ হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর!
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বিড়বিড় করে অস্পষ্টভাবে কী যেন এরপর বলতে লাগল বিয়ার্ড। কথাগুলো ধ্রুবদের কানেই আসছে না। এমনভাবে বলছে বিয়ার্ড। তারই মাঝে হঠাৎ একটা অসম্পূর্ণ বাক্য কানে এল, ‘ওরা বলছিল গুপ্তধন যেখানে আছে সে জায়গা হল…।’
মার্লিন উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘ওরা গুপ্তধন কোথায় আছে বলেছে সে কথা?’ বিয়ার্ড ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, রাজা সব বলেছে। আমার কাছে এসো, তোমাকে বলব সে কথা। হাজার হোক তুমি…।’ বাক্যটা শেষ করল না লোকটা।
বিয়ার্ডের পুরো কথা ঠিক বোধগম্য হল না ধ্রুবর। মার্লিন বেশ উত্তেজিত হয়ে তলোয়ার রেখে মাটিতে উবু হয়ে বসে বিয়ার্ডের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘বলুন, বলুন, কোথায় সেই গুপ্তধন?’
আর এর পর মুহূর্তেই এক কাণ্ড ঘটল। কণ্ঠস্বর শুনে মার্লিনের অবয়ব আন্দাজ করে বিয়ার্ডের দুটো হাত সাপের মতো লাফিয়ে উঠে চেপে ধরল মার্লিনের গলায়। তারপর বিয়ার্ড চিৎকার করে বলে উঠল, ‘না না, কিছুতেই নয়। আমি যখন চোখে দেখতে পেলাম না। তখন তোমাকেও দেখতে দেব না সেই গুপ্তধন, তোমাকেও সাথে নিয়ে যাব আমি!’
বিয়ার্ডের হাত লোহার সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে মার্লিনের কণ্ঠনালিতে। মার্লিন সে হাত ছাড়াতে পারছে না কিছুতে। সেই চাপে মার্লিনের চোখ যেন ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দেহের সব রক্ত যেন এসে জমা হচ্ছে তার মুখে। লাল হয়ে উঠেছে মার্লিনের মুখ। আর বিয়ার্ডের মুখের চেহারা আরও বীভৎস। শূন্য অক্ষিকোটরের ক্ষতবিক্ষত মুখমণ্ডলে ফুটে উঠেছে পৈশাচিক হাসি। ঠিক যেন প্রেতাত্মার মুখ। আর পারছে না মার্লিন। তার হাত-পা শিথিল হয়ে আসছে… ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেছিল ধ্রুব। হঠাৎ মার্লিনের পাখিটা কোথা থেকে উড়ে এসে ডানা ঋটপটিয়ে বসল বিয়ার্ডের ঠিক গায়ের ওপর। আবার একটু আর্তনাদ শোনা গেল ক্যাপ্টেনের গলা থেকে। ধ্রুবর বিহ্বল ভাব এবার কেটে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারের উল্টো দিক দিয়ে আঘাত করল বিয়ার্ডের মাথায়। ক্যাপ্টেনের জীবনীশক্তি বোধহয় নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। কোনো শব্দ না করেই মার্লিনের গলা ছেড়ে দিল সে। কয়েক হাত তফাতে ছিটকে পড়ল মার্লিন। পাখিটা উড়ে গেল। কয়েকবার ভীষণ মোচড় খেয়ে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের দেহটা উল্টে স্থির হয়ে গেল।
মার্লিনের ধাতস্থ হতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল। উঠে দাঁড়িয়ে গলায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘আর একটু হলেই শয়তানটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছিল। ভাগ্যিস পাখিটা ঠিক সময় এসেছিল।’
সতর্কভাবে অস্ত্র হাতে দুজনে এরপর এসে দাঁড়াল বিয়ার্ডের কাছে। না, বিয়ার্ডের দেহ একদম স্থির। প্রাণহীন সেই দেহ। সেই দেহের দিকে তাকিয়ে এবার একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল তারা বিয়ার্ডের ছিন্নভিন্ন পোশাকের পিঠে ঝুলছে একটা ধড়হীন কালো টিয়ার মাথা! সম্ভবত পাখিটা এত শক্ত করে পিঠটা কামড়ে ধরেছিল যে তার ধড়টা টেনে ছিঁড়ে ফেললেও তার ঠোঁট কামড় ছাড়েনি!
কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে মার্লিন বলল, ‘এবার সব ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। কেন ম্যাকাওটার ডানা ঝাপটাবার শব্দে ও ভয় পাচ্ছিল। আসলে সে রাতে কালো টিয়ার দল ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণ করে। ধ্রুব তোমার মনে আছে, একজন দ্বীপবাসী পাখিগুলোকে দেখিয়ে বলেছিল যে এই পাখিগুলোই হল দ্বীপের রক্ষাকর্তা?’
ধ্রুব বলল, ‘হ্যাঁ মনে আছে। এরাই হল রাজার সৈন্যবাহিনী। দ্বীপবাসীরা এজন্যই ওদের পোষে। কিন্তু ওরা আক্রমণ করে কেন?’
মার্লিন বলল, ‘এ ধরনের প্যারাকিড গ্রুপের পাখিদের কিন্তু নানা জিনিস শেখানো যায়। তুমি হয়তো সার্কাসে টিয়াপাখির কামান দাগা, বা তারের ওপর দিয়ে কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো বা ম্যাকাওয়ের খেলা দেখে থাকবে। দ্বীপবাসীর নিশ্চয়ই যুগ যুগ ধরে পাখিগুলোকে কোনো ভাবে এ কাজ শিখিয়েছে। আমার এখন ধারণা হচ্ছে সে দ্বীপে মানুষ আকৃতির যে পুতুলগুলো দেখেছিলাম তাদের সাহায্যেই পাখিগুলোকে মানুষের ওপর আক্রমণ শেখানো হয়। আমি একবার এক জায়গাতে ওরকম সাজানো পুতুলের ওপর বাজপাখির আক্রমণের ট্রেনিং দেখেছিলাম। তারা ট্রেনারের নির্দেশে যে কোনো প্রাণীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সে রকমই ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে পাখিগুলোকে। উন্মুক্ত গ্রাম চত্বরে চাঁদনিরাত পাখিগুলোর কাজের সুবিধা করেছে।’ .
ধ্রুব বলল, ‘তোমার ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা হওয়া সেই বৃদ্ধর ক্ষেত্রেও তাহলে এই একই ঘটনা ঘটেছিল।’
ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড যত শয়তানই হোক তার মৃত্যু হয়েছে এখন। মৃতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সভ্য সমাজের নিয়ম। কাজেই সমুদ্র তীরেই গর্ত করে ধ্রুবরা তার মধ্যে কবর দিল ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডকে। মার্লিন গাছের ডাল ভেঙে ক্রশ বানিয়ে পুঁতে দিল ক্যাপ্টেনের কবরের পাশে। এসব যখন মিটল তখন সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে সারা দ্বীপ। গুহা থেকে কিডকে আর কিছু জিনিসপত্র নিয়ে দ্বীপটা দেখার জন্য এরপর বেরিয়ে পড়ল তারা।
