৯
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই দূরে একটা কালো রেখা দেখা গেল। মাস্তুলের মাথায় মাচায় বসে থাকা ওয়াচম্যান দূরবিন চোখে লাগাল। তারপর চিৎকার করে উঠল, ‘ডাঙা! ডাঙা!—’
খবরটা মুহূর্তের মধ্যে চাউর হয়ে গেল জাহাজে। সব কাজ ফেলে সবাই ছুটে এল জাহাজে। মহা উৎসাহে দেখার চেষ্টা করতে লাগল সেই কালো রেখা। দিনের পর দিন জাহাজে একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন জীবন কাটাবার পর ডাঙা দেখার সে কী যে আনন্দ তা কেবল নাবিকরাই জানে! হয়তো দেখা যায় সে মাটি শুধু বালিময়, কোনো উদ্ভিদও জন্মায় না সেখানে। হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রের ঢেউয়ে উঠে আসা বালি তৈরি করেছে সে ভূখণ্ড। অথবা তা কোনো গহীন জঙ্গল যেখানে আদিম মহাদ্রমদের পল্লব বেষ্টনী সূর্যালোককে ভূমি স্পর্শ করতে দেয় না। দিনের বেলায়ও সে মাটিতে রাতের মতো অন্ধকার। হিংস্র শ্বাপদসঙ্কুল অজানা কোনো দ্বীপ, নরখাদক বর্বর মানুষ অধ্যুষিত কোনো দেশ, মৃত্যু যেখানে পায়ে পায়ে ঘোরে। তা হোক, তবু সে ডাঙা সে মাটি; দোলে না, নড়ে না। মৃত্যুর পর যেখানে শোবার জন্য একখণ্ড জমি অন্তত পাওয়া যায়।
ধ্রুব খেয়াল করে দেখল, ম্যাঙ্গকির সঙ্গীদের ইস্পাত কঠিন মুখেও যেন একটা খুশির ছোঁয়া। মার্লিনকেও দেখতে পেল সে। তার চোখেমুখে ঔজ্জ্বল্য ফুটে উঠেছে তার সঙ্গে ধ্রুবর চোখাচোখি হওয়াতে মৃদু হাসল সে। এমনকী মার্লিনের সেই পাখিটাও যেন উৎফুল্ল। এক মাস্তুল থেকে ওড়াওড়ি করছে আর মাঝে মাঝে আউড়াচ্ছে সেই ছড়াটা—
‘ডিং ডং ডিং ডং ডিং ডং বেল।
পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল।’
অন্য কথাও বলছে সে। একবার যেমন সে প্রায় বিয়ার্ডের মাথার ওপরেই একটা পালের দড়ির ওপর বসেই বলে গেল— ‘ক্যাপ্টেনের মুন্ডু কাট! মুন্ডু কাট!’ তাই শুনে বেশ উচ্চস্বরে হেসে উঠল ম্যাঙ্গকির কয়েকজন অনুচর।
বিয়ার্ড কিন্তু সেসব কিছু ভ্রূক্ষেপ করল না। দুরবিন দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সেই কালো রেখার দিকে তাকিয়ে থেকে ম্যাঙ্গকির সঙ্গে বিয়ার্ড চাপাস্বরে কী যেন আলোচনা সেরে নিয়ে ডেকে দাঁড়ানো সকালের উদ্দেশে বলল, ‘আমরা ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই দ্বীপে নামছি। সকলে তৈরি হয়ে নাও। আর সেখানে নামার আগে একটা জিনিস সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমি জাহাজের ক্যাপ্টেন। আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে সবাইকে। যে মানবে না তাকে ওই দ্বীপেই ফেলে রেখে আসব চিরদিনের মতো।’ কথাটা বলে ধ্রুবর দিকে একবার তাকিয়ে ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ম্যাঙ্গকিকে নিয়ে এগোল তার কেবিনের দিকে। সঙ্গে গেল মেট ফক্স। ডেক ফাঁকা হয়ে গেল এরপর। সবাই এগোল তৈরি হয়ে নেবার জন্য। মার্লিন এসে ধ্রুবকে বলল, ‘তুমি ঘরে যাও। আমি তোমার পোশাক নিয়ে আসছি।’
ধ্রুব কেবিনে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই পোশাক নিয়ে হাজির হল মার্লিন। পোশাক হাতে ধরিয়ে সে বলল, ‘এগুলো আমারই। আশাকরি তোমার হয়ে যাবে। তুমি পোশাক পাল্টাও, আমি আর একটা জিনিস নিয়ে আসছি।’
মার্লিন চলে যেতেই পোশাক পাল্টে নিল ধ্রুব। কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্লিন ফিরে এল। তার হাতে একটা আদ্যিকালের ভারী তলোয়ার। তার নিজের কোমরেও ঝুলছে সে রকমই একটা। তলোয়ারটা ধ্রুবর হাতে দিয়ে সে বলল, ‘নাও এবার এটা কোমরে গুঁজে নাও। তাহলেই কাজ সম্পূর্ণ।’
এ তলোয়ার তুমি কোথায় পেলে? ধ্রুব জানতে চাইল।
মার্লিন বলল, ‘মিউজিয়াম থেকে নিয়ে এলাম। এ তলোয়ার হাতে সত্যি কোনো জলদস্যু একসময় লড়াই করেছে।’
ধ্রুব সেই তলোয়ারটা কোমরে গুঁজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল। সত্যি যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা জলদস্যু সে! মাথায় তেকোনা টুপি, ঢোলা কুর্তার ওপর বুকে আড়াআড়ি বাঁধা পারকাসনের খাপওলা চামড়ার চওড়া বেল্ট, ঢোলা পাজামা, কোমরে তলোয়ার। নিজেকেই যেন চিনতে পারছে না।
পোশাক পরা হলে দুজনে ওপরে ডেকে উঠে এল। মার্লিন ওপরে এসে তার পাখিটাকে শিস্ দিয়ে ডাকতেই সে উড়ে এসে বসল তার কাঁধে। সেজেগুজে একে একে ডেকে এসে দাঁড়াচ্ছে সবাই। প্রত্যেকের পরনেই আদ্যিকালের সাজ। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড মেট ফক্স আর ম্যাঙ্গকিকে নিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এল। বেশ জমকালো সাজ তার। মাথায় কালো ভেলভেটের টুপি, লাল জামার বুকের কাছে বাঁধা বেল্টে গোঁজা দু-দুটো পারকাসন। তাদের সোনার কারুকাজখচিত বাঁট সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে। কোমরবন্ধে গোঁজা চওড়া তলোয়ার, নীল ঢোলা সালোয়ারারের নিচে লোহার নাল বসানো হাইহিল বুট। ঠিক যেন জলদস্যুদের সর্দার। আর ম্যাঙ্গকি মাথায় বেঁধেছে একটা কাপড়ের ফেট্টি। হাতকাটা, বুকখোলা লাল জ্যাকেটের বাইরে উঁকি দিচ্ছে তার পেশি বহুল হাত আর লোহার কপাটের মতো বুক। কোমরে ঝুলছে দামাস্কাস তলোয়ার। আরও একটা জিনিস অবশ্য তার কোমরের চওড়া কাপড়ের ফেট্টির আড়াল থেকে বেরিয়ে ছিল। সেটা একটা রিভলভারের কালো বাঁট। ধ্রুব খেয়াল করল, বিয়ার্ড সেটা দেখতে পেয়ে তাকে ইশারা করতেই ম্যাঙ্গকি কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। শুধু ম্যাঙ্গকির সঙ্গীরা সেই কালো পোশাকেই রইল। ধ্রুবরা জানতে পারল ওই লোকগুলো নাকি প্রথমে দ্বীপে নামবে না। মেট ফক্সের দায়িত্বে তারা জাহাজেই থাকবে।
ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল সেই দ্বীপ। স্পষ্ট হতে লাগল, সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা জঙ্গল বালুকাময় নির্জন সমুদ্রতট। দ্বীপ দেখে সবাই বেশ উত্তেজিত। চাপা স্বরে মাল্লারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। বিয়ার্ড দুরবিন দিয়ে দ্বীপটাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করছিল। একসময় সে নির্দেশ দিল, ‘নোঙর ফেল, নৌকো নামাও।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নির্দেশমতো কাজ হল। বালুতট তখন খুব বেশি দূরে নয়। তিনটে নৌকা নামানো হল। বিয়ার্ড-ম্যাঙ্গকি, ধ্রুব-মার্লিনসহ জনা কুড়ি লোক চেপে বসল নৌকাতে। ছপছপ শব্দে দাঁড় টেনে তারা এগোল দ্বীপের দিকে।
