ঈগলের পালকে রক্তের দাগ – ৩

প্রবেশ তোরণ দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর একসময় ওই হিউম্যান জ্যু-এর কর্মচারীদের থাকার জন্য দুপাশে যে সার সার ঘর আছে সেখানেই থাকার ব্যবস্থা হল সবার। জুয়া আর দীপাঞ্জনের জন্যও বরাদ্দ হল একটা ঘর। সে ঘরে শোবার জন্য দুটো ক্যাম্পখাটেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। দুপুরে খাওয়া সেরে বিশ্রাম নেবার পর বিকাল বেলা জুয়ান বললেন, ‘চলো এবার বাইরে বেরোনো যাক। দেখি ওই স্যামসন ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করি। প্রবেশ তোরণের গায়েই ওর ঘর। ওঁর জীবনে নিশ্চয়ই অনেক অভিজ্ঞতা আছে। সেগুলো শুনব। বই পড়ে আর কতটুকু জানা যায়?’

দীপাঞ্জন বলল, ‘ঠিক তাই। আর অভিনয় করার ব্যাপারটা খুব থ্রিলিং লাগছে। হয়তো লোকটার সঙ্গে কথা বললে সে ব্যাপারেও আমাদের সুবিধা হবে।’

জুয়ান হেসে বললেন, ‘শুনেছি বড় বড় অভিনেতা নাকি কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয় করার আগে তা নিয়ে রিসার্চ করেন যাতে সে চরিত্রটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। দেখো তুমি হয়তো ‘অস্কার’ পেয়ে গেলে।’

এ কথার পর জুয়ান আর দীপাঞ্জন হাসল কিছুক্ষণ।

তারা যখন ঘরের বাইরে বেরোল তখন পাহাড়ের আড়ালে ধীরে ধীরে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। বাইরে বেরিয়ে দীপাঞ্জনরা দেখতে পেল, তাদের দলের মোটামুটি সবাই তাদের আগেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে মত্ত। তাদের সঙ্গে চিত্রপরিচালক বার্কও আছেন। দীপাঞ্জনরা প্রথমে গিয়ে সেই দলটার সঙ্গে মিলিত হল। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর প্রফেসর জুয়ান বললেন, ‘আমার একটু স্যামসন বলে ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের এ জায়গা সম্বন্ধে নানা তথ্য দিতে পারবেন।’

তার কথা বলতেই মার্টিন বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’ স্যামসনকে অবশ্য খুঁজতে তার ঘর পর্যন্ত যেতে হল না। কিছুটা এগিয়েই একটা কাঠের বেঞ্চে বসেছিলেন বৃদ্ধ। দীপাঞ্জনরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মার্টিন তাকে বলল, ‘এই অতিথিরা আপনারা সঙ্গে কিছু কথা বলতে চায়।’

স্যামসন বললেন, ‘কী বলবেন, বলুন?’

জুয়ান বললেন, ‘আপনি কীভাবে এখানে এলেন?’

প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন দূরে পাহাড়ের সূর্যাস্তের দিকে। তারপর বললেন, ‘সে বহুবছর আগের কথা। তার সন-তারিখ বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার তখন বছর দশেক বয়স। আমাদের গ্রামে হানা দিয়েছিল দস্যুরা। প্রথমে একটা লড়াই হল ঠিকই। কিন্তু আমরা হেরে গেলাম। বর্শা দিয়ে আর কতক্ষণ লড়াই করা যায় বন্দুকের সঙ্গে? গ্রামের অর্ধেক লোক মারা পড়ল। বাকিদের বন্দি করে নিয়ে চলল দস্যুরা। দীর্ঘ সে যাত্রা বনজঙ্গল আর মরুভূমির মধ্যে দিয়ে। সে পথে চলতে চলতে মারা পড়ল আরও অর্ধেক। বাকি যারা বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে আসা হল ট্রাঙ্গানিকার তীরে এক দাসের হাটে। সেখানে আমাদের দস্যুরা বেচে দিল এক মিশরীয়র কাছে। স্টিমারে তোলা হল আমাদের। জলপথে স্থলপথে নানা জায়গা ঘুরে আমরা পৌঁছলাম আলেকজান্দ্রিয়ার আর এক দাসবাজারে। সেখানে এক ইউরোপীয় কিনে নিল আমাদের। গলায় চামড়ার বেল্ট বেঁধে জাহাজের অন্ধকার খোলে পোরা হল আমাদের। তারপর সমুদ্রে এ জাহাজ থেকে সে জাহাজে বেশ ক’বার হাত বদল হল আমাদের। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সঙ্গীদের আরও অনেকে মারা গেল, এদিক-ওদিক ছিটকে গেল। অবশেষে একদিন এদেশে পৌঁছলাম আমি। আমাকে এনে ভরা হল এই চিড়িয়াখানায়।’

তুর্গিনেভ প্রশ্ন করলেন, ‘তারপর?’

বৃদ্ধ বললেন, ‘তারপর আর কী? এখানে অন্য যে মানুষগুলো বন্দি ছিল তাদের মতো আমাকেও দেখতে আসত মানুষরা। ঠিক যেমন চিড়িয়াখানাতে পশু দেখতে আসে তেমনই। কত দেশের কত জাতের মানুষ ছিল এখানে। প্রথম প্রথম আমার খুব ভয় লাগত। তবে আমি ছোট বলে আমার পালাবার আশঙ্কা কম থাকায় আমাকে দিনের বেলা ছেড়ে রাখা তে। লোকে আধ-খাওয়া রুটির টুকরো ছুড়ে দিত আমার দিকে। আমি সেগুলো কুড়িয়ে খেতাম। কেউ-কেউ আমার সঙ্গে ছবিও তুলত। হয়তো কোনো ইউরোপীয় বাড়িতে আজও

শোভা পাচ্ছে আমার ছবি। তবে আমার সৌভাগ্য যে আমি আসার বছরখানেকের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় এই চিড়িয়াখানা।’—এই বলে হাসলেন বৃদ্ধ।

সাংবাদিক গাউল পকেট থেকে নোটবই আর কলম বার করে জানতে চাইলেন, ‘সে সময়ে এখানে ঘটা কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা আপনার স্মৃতিতে আছে?’

স্যামসন একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ওই যে বাঁদিকে গরাদঘেরা জায়গাটা দেখছেন ওখানে জনাসাতেকের একটা রেড ইন্ডিয়ানদের দল থাকত। মাথায় ঈগলের পালক, গায়ে উত্তি, শক্তপোক্ত চেহারার লোক সব। তারা খুব একরোখা প্রকৃতির লোক। দর্শকদের খুশি করার জন্য হাসত না, খাবার ছুড়ে দিলে খেত না। একদিন কী ভাবে যেন গরাদ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। লোকগুলো জানত পালাতে পারবে না তারা। সে ইচ্ছাও তাদের ছিল না। শুধু তাদের বুকে জেগেছিল প্রতিহিংসা। তাদের দলপতির নাম ছিল ‘ওয়াক’। দানবের মতো চেহারা। সে তো বাইরে বেরিয়ে শুধু গলা টিপেই মেরে ফেলল তিনজন শ্বেতাঙ্গ গার্ডকে। অন্যদের হাতেও মরল আরও জনাপাঁচেক শ্বেতাঙ্গ। সে এক হুলুস্থুলু কাণ্ড। তারপর বাইরে থেকে আরও গার্ড, বন্দুকধারী এল। গুলি করে মারা হল রেডইন্ডিয়ানদের। তারা এখন ঘুমিয়ে আছে চিড়িয়াখানার পিছনে যে ফাঁকা জমিটা আছে সেখানে। পরপর সাতজন রেড ইন্ডিয়ান।’

এরপর একটু থেমে বৃদ্ধ স্যামসন বললেন, ‘আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল এখানে। তবে সেটা রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে নয়, একজন আফ্রিকানকে নিয়ে। সে ছিল একজন পিগমি।’—এই বলে থেমে গেলেন স্যামসন।

‘কী সেই ঘটনা?’ প্রশ্ন করলেন কারস্টেন।

কিন্তু এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিলেন না স্যামসন। শূন্য দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে রইলেন খাঁচাগুলোর দিকে।

সাপলিও বললেন, ‘এখানে একা-একা থাকতে অসুবিধা হয় না আপনার? চারপাশ কত নির্জন! কেউ কোথাও নেই!’

বৃদ্ধ বললেন, ‘একা কোথায়? আরও তো সবাই আছে।’

জুয়ান মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘কে আছে?’

স্যামসন বললেন, ‘যারা একদিন ছিল এখানে, রাতে তারা জেগে ওঠে। ওই ঘেরা জায়গা থেকে শোনা যায় রেড ইন্ডিয়ানদের ঢাকের মৃদু দ্রিমিদ্রিমি শব্দ, জ্যোৎস্না রাতে ভেসে আসে পরিখাঘেরা জায়গাটার ভিতর থেকে ইরোগেটদের সম্মিলিত বন্য বিলাপ, মাসাইদের বৃন্দগান, গরাদগুলোর ভিতর থেকে কখনও চাপা কান্নার শব্দ অথবা গরাদ ঝাঁকাবার ঝনঝন আওয়াজ। কখনও কখনও তাদের দেখতেও পাই আমি। খর্বাকৃতি পিগমি, ঢ্যাঙা মাসাই, মাথায় পালক গোঁজা রেড ইন্ডিয়ানের ছায়ামূর্তি…।’ কথাগুলো বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ। তারপর ধীর পায়ে এগোলেন নিজের ঘরের দিকে…

তিনি চলে যাবার পর মার্টিন মন্তব্য করলেন, ‘দীর্ঘদিন এখানে একা-একা থাকতে-থাকতে আর বয়সের কারণে ওর মাথাটা মাঝে মাঝে একটু গন্ডগোল করে। তখন এসব একটু ভুলভাল বকেন।’

পরিচালক বার্ক বললেন, ‘তবে উনি কিন্তু আমাকে একটা ভালো আইডিয়া দিয়ে গেলেন। ওই যে রেড ইন্ডিয়ানদের ঢোলকের শব্দ, ইরিগেটদের কান্না, মাসাইদের গান। এগুলো সব নেট থেকে পেয়ে যাব আমি। রাত্রির সিকুয়েন্সে বেশ কয়েকটা শট আছে। তখন এই শব্দগুলোকে ব্যবহার করলে দারুণ হবে ব্যাপারটা! আর লড়াইয়ের ঘটনাটাও রাখব ভাবছি।’

সূর্য অস্ত গেল পাহাড়ের মাথায়। বার্ক বললেন, ‘চলুন এবার সবাই মিলে বসতে হবে। এক-এক করে সবাইকে আপনাদের পার্টগুলো বুঝিয়ে দেব।’

বার্ক সবাইকে নিয়ে উপস্থিত হলেন একটা ঘরে। আগে থেকে চেয়ার পাতা ছিল সেখানে। বার্ককে ঘিরে বসলেন সবাই। বার্ক তার হাতের ফাইলটা খুলে কাগজপত্র বার করে বললেন, ‘দুপুরবেলাই আপনাদের কাগজপত্র সব তৈরি করে রেখেছি। আপনাদের খুব একটা অসুবিধা হবে না।’

এরপর বার্ক প্রথমে চরিত্র নির্বাচনের ব্যাপারটা জানিয়ে দিলেন। কারস্টেন করবেন রেড ইন্ডিয়ানের চরিত্র, পাউল ইরিগেট, তুর্গিনেভ এস্কিমো। তাদের চামড়ার রং মিলে যাবে চরিত্রের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই একই কারণে টোগো আর আল মামুন থাকবেন আফ্রিকানের ভূমিকায়। সাপলিও ও মার্টিন হবেন শ্বেতাঙ্গ রক্ষী। আর জুয়ান ও দীপাঞ্জনকে নির্বাচিত করা হল একজন মঙ্গোলয়েড বন্দি ও একজন তাতারের ভূমিকাতে। এ কাজ মিটে যাবার পর পরিচালক বার্ক সবার হাতে কয়েক পাতার কাগজ ধরিয়ে দিল। তাতে চরিত্র ও তার ডায়ালগ লেখা আছে। তবে ডায়ালগ অতি সামান্য। দুটো বা তিনটে বাক্যমাত্র। তাও আবার আলাদা-আলাদা শটে নেওয়া হবে।

বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে শুটিং-এর ব্যাপারে নানা আলোচনা চলল। রাত আটটা নাগাদ সাঙ্গ হল। হোটেল থেকে মালপত্রও চলে এল। রাত ন’টা নাগাদ খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে পড়ল দীপাঞ্জন আর জুয়ান।

দীপাঞ্জনের এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসে না। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চুপচাপ শুয়েছিল দীপাঞ্জন। খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো সামনের দেওয়ালে এসে পড়েছে। হঠাৎ সেই দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দীপাঞ্জনের চোখে একটা অদ্ভুত জিনিস ধরা দিল। একটা মানুষের ছায়া। ঠিক যেন মাথায় পালক গোঁজা কোনো রেড ইন্ডিয়ানের মূর্তি। প্রাথমিক অবস্থায় দীপাঞ্জনের মনে হয়েছিল সেটা তার মনের ভুল, কিন্তু ছায়াটা হঠাৎ নড়তে শুরু করল। দীপাঞ্জন উঠে বসে সঙ্গে-সঙ্গে মাথার পিছনের জানালার দিকে তাকাল। দীপাঞ্জনের যেন মনে হল ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা ছায়ামূর্তি সরে গেল জানালার আড়ালে। আর ঘরের দেওয়ালের গায়ের ছায়াটাও অদৃশ্য হয়ে গেল। তবে কি সত্যিই কেউ এসে দাঁড়িয়েছিল জানালার বাইরে? ভাবতে দাগল দীপাঞ্জন। কয়েক মিনিটের মধ্যে জুয়ানও উঠে বসলেন। দীপাঞ্জনকে তিনি বললেন, ‘কি ঘুম আসছে না?’

দীপাঞ্জন জবাব দিল, ‘না আসছে না।’ তারপর একটু ইতস্তত করে ছায়ামূর্তির কথাটা বলল জুয়ানকে। জুয়ান বললেন, ‘ব্যাপারটা তোমার মনের ভুল হতে পারে আবার সত্যিও হতে পারে। কেউ হয়তো জানলার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল কোনো কারণে। তবে সে নিশ্চয়ই রেডইন্ডিয়ান বা রেড ইন্ডিয়ানের ভূত হবে না। ছায়া অনেক সময় অদ্ভুত আকার ধারণ করে। ওটা হলে কোনো সাধারণ মানুষের ছায়াই হবে। রেড ইন্ডিয়ানের গল্প শুনেছ। আজ সেই ভাবনা ওই ছায়ার সঙ্গে মিশে গেছে।’

এরপর জুয়ান তার রিস্টওয়াচটা দেখে নিয়ে বললেন, ‘রাত্রি বেশি হয়নি। সবে মাত্র বারোটা বাজে। ঘুম যখন আসছে না তখন দুজনে বাইরে একবার ঘুরে আসি।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘হ্যাঁ, সেই ভালো।’