ডাকাউ ক্যাম্পের বন্দি – ২

ডাকাউ ক্যাম্পের শেষ দর্শনীয় স্থানে রাইখের সঙ্গে এসে হাজির হল দীপাঞ্জনরা। বেশ বড়, ইটের তৈরি একটা বাড়ি। তার চারপাশে আজও দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের খুঁটিগুলো দেখে মনে হল এক সময় কাঁটাতারের বেশ কয়েকটা নিরাপত্তাবলয় দিয়ে ঘেরা ছিল বাড়িটা। তার ভিতর প্রবেশ করতে-করতে রাইখ বলল, ‘একসময় এস. এস. গার্ডরা সবসময় এ বাড়ির চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকত। ব্যারাক এক্স-এর থেকে বন্দিদের এখানে আনা হত আমরা যে পথে ঢুকছি ঠিক সে পথেই। এ পথে এক সময় আমাদেরই মতো তিরিশ হাজার মানুষ ঢুকেছিল, যারা কোনো দিন আর বাইরে বেরোয়নি।’

.

বাড়ির ভিতরে ঢুকে দীপাঞ্জনদের নিয়ে রাইখ এসে দাঁড়াল একটা লম্বা টানেলের মতো জায়গাতে। সেখানে একটা হ্যাঙ্গারে সারসার জীর্ণ পোশাক ঝুলছে। সে আমলের বন্দিদের পোশাক। কয়েকটা তোয়ালেও আছে। উলটোদিকে একটা ঘর। তার লোহার দরজাটা খোলা। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এস. এস. গার্ডের মতো পোশাকে একজন মিউজিয়াম কর্মী। রাইখ বলল, ‘এই পোশাকগুলো কিন্তু সত্যি সেই মানুষদের, যাদের এই পোশাক একবার খোলার পর দ্বিতীয়বার আর কোনো পোশাক পরার দরকার হয়নি। বন্দিদের প্রথমে এখানে এনে দাঁড় করিয়ে তার পোশাক খোলানো হত। তারপর তার হাতে সাবান আর তোয়ালে দিয়ে তাকে স্নান করে আসতে বলা হত পাশের এই স্নানঘর বা শাওয়ার রুম থেকে। যে ঘরের দরজা খোলা দেখছেন আপনারা…

দীপাঞ্জন বলল, ‘শুনেছি ফাঁসির আসামিদের নাকি ফাঁসির আগে স্নান করানো হয়। নতুন পোশাক পরানো হয়।’

মৃদু হেসে রাইখ বলল, ‘না, এ ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। চলুন শাওয়ার রুমের ভিতরে যাই।’

দীপাঞ্জনরা প্রবেশ করল সেই স্নানঘরটাতে। সঙ্গে-সঙ্গে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

বেশ বড় একটা স্নানঘর। টাইলস বসানো মেঝে। দেওয়ালের গায়ে সাবান রাখার কেস, জামা-কাপড়, তোয়ালে ইত্যাদি ঝোলাবার জন্য হ্যাঙ্গার, একটা স্নান ঘরে যা-যা থাকার দরকার সবই আছে সেখানে। আর এক জায়গাতে মাথার ওপরে আছে বেশ বড় একটা শাওয়ার বা ঝাঁঝরি। ঘরে ঢুকলে প্রথমেই চোখ যায় সেদিকে।

শাওয়ারের নিচে দীপাঞ্জন আর জুয়ানকে নিয়ে দাঁড় করাল রাইখ। শাওয়ারের জল ওঠার পাইপের গায়ের চাবিটা প্রথমে ঘোরাল রাইখ। তারপর বলল, ‘শাওয়ারের তো আর এখন জল নেই, তাই চাবি খুললেও জল পড়ল না। এবার আপনারা চাবিটা উলটো দিকে ঘুরিয়ে বন্ধ করুন।

তার কথা শুনে দীপাঞ্জন চাবিটা বন্ধ করতে গেল। কিন্তু সেই লোহার চাবির প্যাঁচ যেন উঠে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর সে বলল, ‘চাবিটা ঘুরছে না। আটকে গেছে।’

রাইখ বলল, ‘না, চাবিটা আর কোনো অবস্থাতেই এখন পিছনে ঘুরবে না, যতক্ষণ না ঘরের বাইরের অন্য একটা চাবি দিয়ে এই শাওয়ারের চাবিটা ঘোরানো হয়। আসলে মাথার ওপরের এই শাওয়ার দিয়ে কোনোদিনই জল বেরোবে না। স্নানের জন্য হতভাগ্য লোকগুলো যখন শাওয়ার রুমে যেত তখন এই শাওয়ার দিয়ে বেরিয়ে আসত মারাত্মক গ্যাস—হাইড্রোজেন সায়ানাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। ঠিক একইভাবে মেঝেতে যে সব জল বেরোবার ছিদ্র দেখছেন সেখান থেকে গ্যাস বেরোত। হ্যাঁ, এই শাওয়ার রুমটাই হল হিটলারের সেই কুখ্যাত গ্যাস চেম্বার। এখানে অন্তত হাজার পঁচিশেক মানুষকে মারা হয়েছিল সে সময়।’

দীপাঞ্জন আর জুয়ান স্তম্ভিতভাবে তাকিয়ে রইল সেই শাওয়ারটার দিকে। মানুষ খুন করার জন্য সত্যিই কী অদ্ভুত-নৃশংস পরিকল্পনা। রাইখ প্রথমে বলল, ‘এমনিতেই কিন্তু এ ঘরের দরজা বন্ধ করলে বাইরের বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়…।’

তার কথাটা সম্ভবত সত্যি, কারণ দরজাটা বন্ধ হবার পর থেকেই একটা দমবন্ধভাব লাগছে দীপাঞ্জনের।

রাইখ এবার বলতে লাগল, ‘দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তখন এ ঘরে। শাওয়ারের নবটা খুলে দেওয়া হয়েছে! ভাবুন সেই পরিস্থিতির কথা! মাথার ওপর শাওয়ার থেকে, ঘরের মেঝে থেকে গ্যাস বেরোতে শুরু করেছে! দমবন্ধ হয়ে আসছে আপনার…’

কথাগুলো বলতে-বলতে কেমন যেন বিকৃত হয়ে যেতে লাগল রাইখের মুখ।

সে বলে যেতে লাগল, ‘ক্রমশ বিষাক্ত গ্যাস গ্রাস করে নিচ্ছে ঘরটা। দমবন্ধ হয়ে আসছে আপনার। এক টুকরো বাতাসের জন্য আপনি ছোটাছুটি করছেন, লোহার দরজাটা খোলার চেষ্টা করছেন! আপনার পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে বন্ধ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে হাসছে নৃশংস এস. এস. গার্ডরা। আপনি আর পারছেন না, পারছেন না, দম বন্ধ হয়ে আসছে আপনার! সালফাইডের প্রভাবে আপনার ফুসফুস ফেটে রক্ত বেরোতে শুরু করেছে আপনার নাক-মুখ দিয়ে! একটু বাতাস, একটু বাতাস….

কথাগুলো বলতে বলতে একই রকম বিকৃত হয়ে গেল রাইখের মুখটা। চমকে উঠল দীপাঞ্জন আর জুয়ান। রাইখের ঠোটের কোণ বেয়ে যেন কী একটা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, লাল রক্ত! তবে কি এত বছর পর সত্যিই কোনো গ্যাস বেরোতে শুরু করেছে এই ঘর থেকে! মুহূর্তের জন্য দীপাঞ্জন আর জুয়ানের মনে হল সত্যিই যেন তাদের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! দীপাঞ্জন চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় শব্দ করে পিছনের দরজাটা খুলে গেল। আর রাইখের মুখটাও ফিরে এল স্বাভাবিক অবস্থায়।

দীপাঞ্জনরা বাকরুদ্ধভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। রাইখ পকেট থেকে রুমাল বার করে ঠোটের কোণটা মুছে নিয়ে বলল, ‘রক্ত নয়, লজেন্স। মাফ করবেন, সেই ভয়াবহ মুহূর্তটা বোঝাবার জন্য এটা করলাম। চলুন এবার বাইরে যাওয়া যাক।’ বাইরে এল দীপাঞ্জনরা। রাইখ তাদের দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই চাকাটা দেখাল, যা ঘুরিয়ে গ্যাস প্রবেশ করানো হত ঘরের ভিতর। ঘরটার পিছন দিকে বড় বড় গ্যাসের পাইপগুলো দেখিয়ে সে বলল, ‘প্রথম অবস্থায় যখন একজন-দুজনকে মারা হত তখন তাদের স্নান করতে যেতে বলা হত। কিন্তু শেষের দিকে যখন গণহত্যা শুরু হল তখন দলে দলে লোককে হাত-পা বেঁধে ও-ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শাওয়ারের চাবি ঘোরাবার দরকার হত না। মেঝের ছিদ্র দিয়ে ঘরে গ্যাস ঢোকানো হত।’ শাওয়ার রুমের থেকে একটু এগিয়েই ‘ওভান রুম। বিরাট ঘরটার এক পাশের দেওয়ালে মাটি থেকে কিছুটা ওপরে দুটো বিরাট চুল্লি আজও হাঁ করে আছে। চুল্লি গহ্বরের ভিতর জমাট বাঁধা অন্ধকার। ঘরের এক কোণে রাখা আছে কয়েকটা ট্রলি, বেলচা এসব। রাইখ বলল, ‘গ্যাস চেম্বারে, ফাঁসির দড়ি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে যাদের মারা হত তাদের দেহ ওই ট্রলিগুলোতে চাপিয়ে এনে এই ওভান দুটোতে পুড়িয়ে ফেলা হত। হতভাগ্য লোকটার পরিবার পরিজন বলে যদি কেউ থেকে থাকত তবে সে জানতেও পারত না লোকটার কী হল।’ এ কথা বলে রাইখ বলল, ‘পাশেই একটা ঘরে ছোট সংগ্রহশালাতে হতভাগ্য সেই মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার ব্যবস্থা আছে। যাবেন সে ঘরে? এছাড়া আর কিছু দেখাবার নেই এখানে।’

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, যাব।’

পাশেই সেই ঘরটা। দরজার বাইরে একজন মহিলা গোলাপের পাপড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের পাত্র থেকে পাপড়ি নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করল দীপাঞ্জনরা। ঘরের ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের একটা পাত্র রাখা আছে। জলপূর্ণ সেই পাত্রে গোলাপের পাপড়ি ভাসিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করছে কয়েকজন ট্যুরিস্ট। আর ঘরটায় চারপাশের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে অসংখ্য বাঁধানো ফোটোগ্রাফ। যাদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে সেই অসহায় মানুষদের ছবি। দীপাঞ্জনরা পাত্রে লাল গোলাপের পাপড়ি ভাসিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করার পর ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো দেখতে লাগল। ছবির মানুষগুলোর সকলের চোখেই জেগে আছে এক অদ্ভুত বিষণ্ন ভয়ার্তভাব। মৃত্যু নিশ্চিত জানলে কোনো মানুষের চোখে-মুখে যে ভাব ফুটে ওঠে তেমনই। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীপাঞ্জন প্রশ্ন করল, ‘এ মানুষগুলোর মধ্যে একজনও কি বাঁচেনি?’

রাইখ জবাব দিল, ‘এই ক্যাম্পের বন্দিদের মধ্যে শেষের দিকে কেউ-কেউ বেঁচে গেছিল। হিটলারের পতনের পর মার্কিন সেনারা যখন এ ক্যাম্পের দখল নেয় তখন তারা কিছু বন্দিকে মুক্ত করে। তাদের নামের তালিকা আমরা প্রথম যে মিউজিয়ামে ঢুকেছিলাম সেখানে টাঙানো আছে।

জুয়ান বললেন, ‘তাদের কেউ এখনও জীবিত আছেন? যদিও তাঁদের বয়স এখন অনেক হবার কথা। তেমন কেউ থাকলে তাকে দেখতাম।’

রাইখ বলল, ‘বন্দিদের মধ্যে তখন সিংহভাগই বিদেশি ছিল। মুক্তি পাবার পর তারা সবাই নিজের দেশে ফিরে গেছিল। এ দেশের লোক অর্থাৎ জার্মানদের মধ্যে যারা দু-তিনজন জীবিত আছে তারা মিউনিখে কেউ নেই। তবে…’

রাইখের কথা শেষ হবার আগেই পাশ থেকে একজন বলে উঠল, ‘এখানে একজন আছেন। তবে তাঁর জন্ম হয়েছিল পোল্যান্ডে। হিটলার পোল্যান্ড অধিকার করার পর তিনি অন্য বন্দিদের সঙ্গে এখানে আসেন। মার্কিন সেনারা এই ক্যাম্প দখল করার পর তিনি মুক্তি পেয়েও আর দেশে ফেরেননি।’

কথাটা যে বলল তাকে চিনতে পারল দীপাঞ্জন। এই মেয়েটাকেই ঘুরতে-ঘুরতে সে চোখ মুছতে দেখেছিল। পরনে ওভারকোট, হাই-হিল বুট। রাইখ বলে উঠল, ‘আপনি জেকব লুবেনেস্কির কথা বলতে চাইছেন নিশ্চয়ই? আমি তার নামটাই বলতে যাচ্ছিলাম।’ মেয়েটা রাইখের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘হ্যাঁ।’ তারপর বলল, ‘এখানে তার ছবিও আছে, আসুন আপনাদের দেখাই।’

রাইখ এবার একটু বিব্রতভাবে বলল, ‘একবার একদল ট্যুরিস্টকে নিয়ে আমি লুবেনেস্কির সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাঁর ছবি যে এখানে আছে তা জানা ছিল না।’

মেয়েটার পিছনে এগিয়ে দেওয়ালে টাঙানো একটা বাঁধানো ছবির সামনে এসে দাঁড়াল দীপাঞ্জন। আরও একজন ভদ্রলোক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবিটার মধ্যে এস. এস. গার্ডদের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে একদল বন্দি। জনা দশেক লোক হবে তারা। লোকগুলো কেউ উলঙ্গ, কেউ অর্ধ-উলঙ্গ। তাদের সকলের চোখেই ভয়ার্ত দৃষ্টি। তারা ছবির মধ্যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাটা চিনতে পারল দীপাঞ্জন। ছবিটা তোলা হয়েছিল লোকগুলোকে সেই মেডিকেল হাউসের সামনে দাঁড় করিয়ে। বাড়িটা দেখা যাচ্ছে পিছনে।

মেয়েটা ছবি দেখিয়ে বলল, ‘সারি বাঁধা বন্দিদের মধ্যে একদম বাঁ-পাশে একটা চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে দেখুন। ওই হল জেকব লুবেনেস্কি। এখন তার পঁচাশি বছর বয়স। আর তার ঠিক গা ঘেঁষেই যে যুবক দাঁড়িয়ে আছে তার নাম ইট লুবেনেস্কি। জেকবের দাদা সে। পোল্যান্ড থেকে জার্মান বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর নানা বন্দি শিবির ঘুরে তারা দু-ভাই এখানে এসেছিল ১৯৪৩ সালে। তবে হুইটের আর এই ক্যাম্পের বাইরে বেরোনো সম্ভব হয়নি। ওই মেডিকেল হাউসে যাবার মাস খানেকের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। প্রাণে বাঁচে শুধু জেকব। অন্য যে লোকটা ছবিটার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে মেয়েটার কথা শুনে এবার হঠাৎ বলে উঠল, ‘আপনি নিশ্চিত যে ওই ছেলেটাই জেকব লুবেনেস্কি? মিউজিয়ামের কিউরেটর বলছিলেন তাঁর কথা।’

মেয়েটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তার হাতব্যাগ খুলে একটা পোস্টকার্ড সাইজের ফোটোগ্রাফ বার করল। পাঁচ জন নরনারীর ছবি। সম্ভবত কোনো পারিবারিক ছবি। পুরানো ছবিটাকে আবার কম্পিউটারের মাধ্যমে নতুন করা হয়েছে। ছবিটা দেখিয়ে মেয়েটা বলল, ‘দেখুন এই ছবিতে যে দুজন পুরুষের ছবি আছে তার সঙ্গে দেওয়ালের ছবির ওই দুজনের মিল আছে কিনা?’

জুয়ান তার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেওয়ালের ছবিটার পাশে ধরতেই সবাই বুঝতে পারল মেয়েটার বক্তব্য সত্যি। দুটো ছবিরই বাচ্চা আর সেই যুবক একই লোক!

ছবিটা জুয়ানের হাত থেকে আবার ব্যাগে রাখতে রাখতে এরপর মেয়েটা বলল, ‘এই পারিবারিক ছবিটা তোলা হয়েছিল ওরা ধরাপড়ার ঠিক মাসখানেক আগে।’

জুয়ান এবার মেয়েটাকে প্রশ্ন করল, আপনি কি ট্যুরিস্ট? নাকি ইতিহাস-গবেষক?’

উত্তর দেবার আগে মেয়েটা জানতে চাইল, ‘আপনারা?’

জুয়ান উত্তর দিলেন, ‘আমি জাপানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি-প্রফেসর জুয়ান। আর আমার এই বন্ধু ‘শেন’ ভারতীয়। আমরা এ দেশে বেড়াতে এসেছি।’ দীপাঞ্জনের পদবি ‘সেন’টাকে ‘শেন’ উচ্চারণ করেন জুয়ান।

জবাব শুনে মেয়েটা বলল, ‘আসলে আমি ঠিক ট্যুরিস্টও নই, আর ইতিহাস-গবেষক ও নই। যদিও আমি এসেছি পোল্যান্ড থেকে। আমার নাম ডায়না লুবেনেস্কি। ছবির এই হুইট ছিলেন আমার নিজের গ্র্যান্ডফাদার। জেকবও তাই আমার গ্র্যান্ডফাদার। আমি তাকে নিজের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। এই ডাকাউ শহরেই তাঁর কাছে আমি দু-দিন ধরে আছি।’

দীপাঞ্জনরা অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। একটু চুপ করে থেকে জুয়ান বললেন, ‘ম্যাডাম, ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে একবার দেখা করা যায় কি? তিনি তো জীবন্ত ইতিহাস।’

দীপাঞ্জনদের পাশে দাঁড়ানো সেই অপরিচিত ভদ্রলোক এবার বললেন, ‘প্রথমে আমাকে মাফ করবেন আমি আপনাদের মধ্যে কথা বলছি বলে। আসলে আমি খুব আকর্ষণবোধ করছি আপনাদের কথায়। আমার নাম কার্ল মুলার। জার্মান। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। মেকানিকাল ও ইলেকট্রিকাল ও-দুটোতেই আমার ডিগ্রি আছে। দর্শকদের জন্য এখানে একটা ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করছেন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। সে কাজেই আমি এখানে এসেছি। মিউজিয়াম কিউরেটরকে জিজ্ঞেস করলে আপনারা আমার পরিচয় সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারবেন। আমিও ওই জীবন্ত-ইতিহাস ভদ্রলোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। তাতে আমার কাজের সুবিধা হবে। ম্যাডাম আমাকে সে সুযোগ করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।’ ডায়না তাদের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘কিন্তু এখন তো তার সঙ্গে দেখা হবে না। বেলা বারোটা বাজে, তিনি খাওয়া সেরে এখন ঘুমিয়ে পড়বেন। বৃদ্ধ মানুষ। তার ঘুম ভাঙবে রাত আটটা নাগাদ। তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার আগে তার সঙ্গে আপনাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা আমি করাতে পারি। কিন্তু তার জন্য আপনাদের কাল সকাল আটটা নাগাদ এখানে আসতে হবে। আমি সে বাড়িতে আপনাদের নিয়ে যাব।’

ইঞ্জিনিয়ার কার্ল মুলার সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘আমার আসতে কোনো অসুবিধা হবে না। এখানে তো আমাকে কাজের ব্যাপারে আসতেই হবে।’ দীপাঞ্জন বলল, ‘আমরা মিউনিখের একটা হোটেলে আছি। সেখান থেকে ঠিক সময় চলে আসব।’

মুলার বললেন, ‘মিউনিখ হলে তো ভালোই। আমি তো সেখান থেকেই আসব। হোটেলের ঠিকানাটা দিলে আমি আসার সময় আপনাদের সেখান থেকে তুলে আনব।’

কথাবার্তা হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। সে ঘর ছেড়ে একসঙ্গে বেরোল সবাই। গ্যাস চেম্বারের লাগোয়া টানেলটা ধরে বাইরে বেরোতে বেরোতে দীপাঞ্জন, জুয়ানকে বলল, ‘ভাবতেও ভয় লাগে যে, হিটলারের মতো কেউ জন্মেছিলেন এ পৃথিবীতে! ভাগ্যিস আজ তিনি নেই।’

তার কথা শুনে মুলার বললেন, ‘তবে তার ভাবধারার কিছু মানুষ কিন্তু এখনও জার্মানিতে আছে। তারা দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করে হিটলারকে।

দীপাঞ্জন বলল, ‘তারা কারা?’

মুলার বললেন, ‘ওদের বলে ‘নিও নাৎসি’ বা ‘নব্য নাৎসি’। বেশ কিছু সংগঠন আছে ওদের। তার মধ্যে কয়েকটা আবার গুপ্ত সংগঠন। গোপনে নাকি অস্ত্রসংগ্রহ করে তারা। মাঝে-মাঝে লোকগুলো অন্য বর্ণ, ধর্মের মানুষদের ওপর ছোটখাটো গুপ্ত হামলাও চালায়। বিশেষত ইহুদিদের ওপর। হিটলারের আদর্শে অনুপ্রাণিত লোকগুলো স্বপ্ন দেখে যে একদিন তারা এই জার্মানির ক্ষমতা দখল করবে। তারপর পৃথিবী দখলের অভিযানে নামবে। রাশিয়া-ব্রিটেন-আমেরিকা তো বটেই সারা পৃথিবীর ওপর তারা কর্তৃত্ব করবে। তাদের স্বস্তিক-চিহ্ন আঁকা পতাকার নীচে থাকবে সারা পৃথিবী। তবে তারা এখনও পর্যন্ত ছোটখাটো দু-একটা নাশকতা ঘটানো ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেনি। জার্মান পুলিশের কড়া নজর আছে। মাঝে মাঝে ওদের দু-একজন লোক গ্রেপ্তারও হয় ওদের হাতে।’

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, কোন একটা কাগজে যেন পড়েছিলাম এই নব্য ন্যাৎসিদের ব্যাপারে।’

বাড়িটার বাইরে বেরিয়ে দীপাঞ্জনরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ডায়না চলে গেল মিউজিয়ামে অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে, মুলার বললেন, তার ক্যাম্প ছেড়ে বেরোতে বিকাল হয়ে যাবে। সব কিছু তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হচ্ছে। আর দীপাঞ্জনরা ক্যাম্পের বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াল।