কালোটিয়ার দ্বীপে – ১৩

১৩

সকালের আলোতে ঝলমল করছে দ্বীপ। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছে তাদের নানা রঙের ডানাতে। দ্বীপে অধিকাংশ গাছেই হল নারকেল আর প্রসলিন গাছ। প্রসলিন হল এক ধরনের পাম গাছ। এ ছাড়া নানা ধরনের অর্কিডও আছে। উঁচু-নিচু জমি। মাঝে মাঝেই গ্রানাইট পাথরের দেওয়াল। সমুদ্রের জল আছড়ে পড়ছে তার গায়ে। কোথাও আবার লাফ দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া যায় এমন ছোট নালা গ্রানাইটের ফাটল ভেদ করে অন্য দিকে হারিয়ে গেছে। দ্বীপটাকে লম্বালম্বি ভাবে চিরে অন্য পাশে যাবার জন্য এগোতে থাকল তারা। কিডের মুখে বেশ খুশি খুশি ভাব। হাতে একটা লাঠি নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সে হাঁটছে। মার্লিনের কাঁধে বসা পাখিটা অবিশ্রান্ত ভাবে বকবক করে চলেছে। কখনও সে বলছে—

‘ডি ডং ডিং ডং ডিং ডং বেল
পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল।’

আবার কখনো সে বলছে, ‘কাট, কাট, ক্যাপ্টেনের মুন্ডু কাট।’

মার্লিন একসময় তার চিৎকারে অতিষ্ঠ হয়ে পাখিটাকে ধমকে উঠে বলল, ‘এবার চুপ না হলে তোরই মুন্ডু কাটব।’

পাখিটা তার কথায় সাময়িক চুপ করল ঠিকই, কিন্তু একটু পরই আবার শুরু করল, ‘ডিং ডং ডিং ডং ডিং ডং বেল….’ মার্লিনের মুখ দেখে ধ্রুবর মনে হল সে গভীরভাবে কী যেন ভাবছে। সম্ভবত গুপ্তধনের আশা এখনও সে ছাড়তে পারেনি। চলতে চলতে মার্লিন একসময় বলল, ‘বিয়ার্ডের শেষ কথাগুলো মনে হয় মিথ্যা নয়। হয়তো এ দ্বীপেই সেই গুপ্তধন আছে।’

ধ্রুব হেসে বলল, ‘তা থাকলেও সঠিক জায়গা না জানলে এত বড় দ্বীপে তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।’

মার্লিন হতাশা জড়ানো গলায় বলল, ‘এত কাছে এসে শুধু হাতে ফিরে যেতে হবে এটাই দুঃখের।

ধ্রুব তাকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘আমাদের প্রাণটা যে রক্ষা পেল এই ঢের! তাছাড়া কিডকে ফিরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কারটা তুমিই নিও। তার অঙ্ক কিন্তু কম নয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তুমিই তো উদ্ধার করলে ওকে।

মার্লিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘পুরস্কারের লোভে আমি কাজটা করিনি। করেছি একটা শিশুকে বাঁচাবার জন্য। গুপ্তধনের লোভ আমার আছে, সে ব্যাপারটা অন্য। আমি গরিব-ভবঘুরে নাবিকও হতে পারি, কিন্তু কিডকে ফিরিয়ে দিয়ে তার পরিবর্তে টাকা নিলে নিজের কাছে আমি ছোট হয়ে যাব। পুরস্কার আমি নেব না।’

তার কথা শুনে তার পিঠ চাপড়ে ধ্রুব বলল, ‘তোমাকে আজ আবার নতুন করে চিনলাম।’

নানা কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলল তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাথার ওপর সূর্যও এগোতে লাগল তাদের সঙ্গে।

দুপুর নাগাদ ধ্রুবরা তখন দ্বীপের মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে, এমন সময় তাদের গতি রুদ্ধ হল। তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে গ্রানাইট পাথরের বিরাট এক দেওয়াল। উচ্চতায় তা অন্তত একশো ফুট হবে। মসৃণ দেওয়াল, ওপরে বেয়ে ওঠার জন্য একটুও খাঁজ নেই কোথাও। নারকেল গাছগুলোর মাথা ছাড়িয়ে সে দেওয়াল ওপরে উঠেছে। তার বিস্তৃতি দেখে মার্লিন বলল, ‘আমার অনুমান, এই প্রাকৃতিক দেওয়ালটাই দ্বীপটাকে পূর্ব-পশ্চিমে দুটো ভাগে ভাগ করেছে। দেওয়ালের একটা প্রান্ত সমুদ্রের ভিতর কিছুটা এগিয়ে গেছে। দেওয়ালে সেখানে সমুদ্রের জল আছড়ে পড়ে গুম গুম শব্দ করছে।

জায়গাটা ভালো করে পরিদর্শনের পর মার্লিন মন্তব্য করল, ‘এ দেওয়াল অতিক্রম করতে না পারলে আমরা দ্বীপের ওপাশটা দেখতে পাব না। ওপাশে যাবার অন্য উপায় ভাবতে হবে।’

ধ্রুব বলল, ‘ফিরে গিয়ে নৌকা নিয়ে এসে পাড় ঘেঁষে দ্বীপের অন্য প্রান্তে পৌঁছনো যায় না?’

দেওয়ালের যে দিকটা সমুদ্রের ভিতর ঢুকে গেছে, সে দিকে আঙুল তুলে মার্লিন বলল, ‘দেখেছ, ওখানে সমুদ্রের জল কেমন ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি খাচ্ছে! ওখানে হাল বা দাঁড় কিছুই কাজ করবে না। ও জায়গা অতিক্রম করতে গেলে সমুদ্রস্রোতে আমাদের নৌকাসুদ্ধ তুলে দেওয়ালে আছড়ে মারবে। কেউ বাঁচব না।’

ধ্রুব বলল, ‘তবে কী করবে?’

মার্লিন জবাব দিল, ‘আজ বরং এখানেই থাকি। দেখি কী উপায় বার হয়?’

দেওয়ালের গায়েই নিচের দিকে এক জায়গাতে আশ্রয় নিল তারা। বিকেল হল একসময়। ধ্রুব, কিডের পাশে বসে বিকেলে রেডিও সেটটা আবার খুলল। যদি কোনো জাহাজকে পাঠানো যায় তাদের বার্তা। আগের দিনের মতোই বলতে শুরু করল, ‘আমি ভারতীয় জাহাজ ‘শ্রীগণেশে’র রেডিও অপারেটর ধ্রুব…।’ ইথার তরঙ্গে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রে ছড়িয়ে যেতে লাগল সেই বার্তা। মার্লিন বেরোল আশপাশে একবার ঘুরে আসার জন্য। কিছুক্ষণ পর মার্লিন ফিরে এল একরাশ কচ্ছপের ডিম নিয়ে। সে বলল, ‘একটা নালার পাশে বালির গর্তে ডিমগুলো ছিল। একদম টাটকা ডিম। হয়তো কচ্ছপগুলোর প্রতি অবিচার

হল। কিন্তু প্রাণরক্ষার জন্য কাজটা করতেই হল।’

ধ্রুব বলল, ‘কিন্তু এত ডিম দিয়ে কী হবে?’

মার্লিন বলল, ‘কিছুটা খেয়ে বাকিগুলো ওই সামনের জমিতে পুঁতে রাখব কালকের প্রাতরাশের জন্য?’

মার্লিনের কথামতোই কাজ হল। কিছু ডিম বালিতে পুঁতে রাখা হল, বাকি ডিম সেদ্ধ করে ভরপেট খেয়ে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে ধ্রুব আর মার্লিন দেওয়াল অতিক্রম করে ওপাশে যাওয়ার উপায় খুঁজতে বসল। আর কিড কিছুটা তফাতে বসল মার্লিনের পাখিটাকে নিয়ে। ইতিমধ্যেই পাখিটার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেছে কিডের। পাখিটাও কিডের নাম ধরে ডাকতে শুরু করেছে।

কথা বলছিল ধ্রুব আর মার্লিন। নীল সমুদ্রে আবির গুলে সূর্যাস্ত হতে শুরু করেছে। হঠাৎ কিড মার্লিনের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠল, ‘আরে দ্যাখো দ্যাখো, তোমাদের ডিম নিয়ে যাচ্ছে।’

তার কথা শুনে চমকে উঠে ধ্রুবরা দেখতে পেল, কিছুদূরে যেখানে ডিমগুলো পোঁতা আছে, সেখানে বালি খুঁড়তে শুরু করেছে অনেকটা শেয়ালের মতো দেখতে একটা অচেনা প্রাণী! সবার অলক্ষে কখন যেন জায়গাটিতে পৌঁছে গেছে সে। এ দ্বীপে অনেক পাখি দেখতে পেলেও এই প্রথম অন্য কোনো প্রাণী দেখতে পেল তারা। মার্লিন উঠে সঙ্গে সঙ্গে তাড়া করল তাকে। প্রাণীটা সোজা ছুটল দেওয়ালের গায়ে কিছুদুরে একটা ঝোপের দিকে। তারপরই সেখানে মিলিয়ে গেল। মার্লিন তার পিছু পিছু পৌঁছে গেছিল সে জায়গাতে। ঝোপঝাড় একটু নাড়াতেই হঠাৎ সেখানে বেরিয়ে পড়ল একটা ফাটল। অনায়াসে একজন মানুষ প্রবেশ করতে পারে সেখানে। ধ্রুব আর কিডও গিয়ে দাঁড়াল সেখানে। ফাটলটা দেখার জন্য মার্লিন একটা মশাল জ্বালাল। ফাটলের ভিতর দিয়ে একটা অন্ধকার গুহাপথ এগিয়েছে ওদিকে। তা দেখে মার্লিনের চোখে আশার ঝিলিক খেলে গেল। সে বলে উঠল, ‘হয়তো এই গুহাটাই আমাদের ওপাশে পৌঁছে দিতে পারে। কাল ভোরেই এখানে ঢুকব আমরা।’

প্রচণ্ড উত্তেজনায় রাতে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল ধ্রুবদের। পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই মালপত্র নিয়ে গুহায় প্রবেশ করল তারা। মার্লিন বেশ কয়েকটা মশাল বানিয়ে নিয়েছে। তার আলোতেই এগিয়ে চলল তারা। গুহাটা সোজা এগিয়ে চলেছে। মাথার ওপর নিচু ছাদ। সঙ্কীর্ণ পরিসর হলেও পায়ের নিচের পথ মসৃণ বলে চলতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। আর একটা ব্যাপার বাঁচোয়া যে গুহার অন্ধকার পরিবেশে মার্লিনের বুড়ো পাখিটা চুপচাপই রয়েছে। অন্য সময় হলে সে বকবক করে মাথা খারাপ করে দিত।

মার্লিন বলল, ‘আমার ধারণা গ্রানাইটের পাহাড় ভেদ করে গুহা এগিয়েছে। এ ধরনের গুহাতেই একসময় জলদস্যুরা গুপ্তধনের সিন্দুক লুকিয়ে রাখত। এবং তা রক্ষা করার জন্য পাহারাদার নিযুক্ত করত। এই পাহারাদার নিয়োগের পদ্ধতি ছিল বড় অদ্ভুত। নিজেদের মধ্যে লটারি করে প্রথমে একজনকে নির্বাচিত করত তারা। সেই লোককে বলা হত দলের মধ্যে থেকে তার পছন্দ মতো কাউকে বেছে নিয়ে তার সঙ্গে পারকাসন বা তলোয়ারের ডুয়েল লড়তে। এ লড়াইতে পরাজিত ব্যক্তিই হত সিন্দুকের পাহারাদার। তাকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় বন্ধ সিন্দুকের ডালার ওপর বসিয়ে লোহার ভারী শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হত সিন্দুকের সঙ্গে। এরপর তার কোলে রাখা হত জলি রজার দিয়ে মোড়া একটা তলোয়ার। ক্যাপ্টেন অর্থাৎ জলদস্যু সর্দার তার মাথায় নিজের টুপি খুলে পরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘আজ থেকে তুমিই হলে ক্যাপ্টেন। তোমার অনুমতি ছাড়া কেউ যেন এ সম্পদ স্পর্শ না করতে পারে।’ এই বলে তার উদ্দেশে এক পিপে পানীয় উৎসর্গ করে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে দিত তারা। সেই ক্যাপ্টেন পাহারাদার ই নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্ষা করত জলদস্যুদের সিন্দুক।’

ধ্রুব হেসে বলল, ‘তা তুমি এ গুহায় সে রকম কোনো পাহারাদারের সাক্ষাৎ পাবে ভাবছ নাকি?’

মার্লিন জবাব দিল, ‘আমার অনুমান ব্ল্যাক প্যারোটের গুপ্তধন অন্য কোনো কৌশলে লুকিয়ে রেখে গেছিল। তার সিন্দুক তো শূন্য অবস্থায় তার ভাঙা জাহাজেই পাওয়া গেছিল।’

ধ্রুব বলল, ‘আচ্ছা, যা শুনেছি ব্ল্যাক প্যারোটের দেহ তো সে জাহাজে পাওয়া যায়নি। এমনও তো হতে পারে যে ব্ল্যাক প্যারোট পরবর্তীকালে এ গুপ্তধন নিজেই নিয়ে যায়।

মার্লিন জবাব দিল, ‘তা সম্ভবত নয়। তাহলে বিয়ার্ড এ অভিযানে শামিল হত না।’

এরকম নানা কথা বলতে বলতে এগোতে থাকল তারা। বাইরে আলোর তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুহার ভিতরের অন্ধকারও যেন অনেকটা হালকা হয়ে এল। মাঝে মাঝে ছাদের ফাটল বেয়ে বাইরের আলো ঢুকছে ভিতরে। কিন্তু চলার যেন বিরাম নেই। একসময় ধ্রুবর যেন মনে হতে লাগল এ গুহা কোনোদিন শেষ হবে না। ধ্রুব হিসাব করে দেখল ইতিমধ্যে ঘণ্টা পাঁচেক কেটে গেছে। সে অধৈর্য হয়ে বলল, ‘এ গুহা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমার তো মনে হয় পিছনে ফেরা ভালো।’

মার্লিন বলল, ‘আরও কিছুটা দেখা যাক। খেয়াল করে দেখো, অতি সামান্য হলেও মেঝেটা কিন্তু ক্রমশ ঢালু হয়ে চলেছে। এ সব দ্বীপ সাধারণত একদিক উঁচু অন্য দিক নিচু হয়, এসবও হতে পারে এ গুহাপথ সরাসরি দ্বীপের অপর প্রান্তে পৌঁছেছে।’

আরও কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ পাশের নিচে পুরু সাদা কিছুর আস্তরণ দেখা যেতে লাগল। মার্লিন জিনিসটা পরীক্ষা করে বলল, ‘লবণ। তার মানে সমুদ্রের জল আসে বা আসত ওখানে।’

আর এর অল্পক্ষণের মধ্যেই গুহাপথ হঠাৎ প্রশস্ত হতে শুরু করল। শেষপর্যন্ত তারা পৌঁছে গেল বিরাট হলঘরের মতো জায়গাতে। কোথা থেকে যেন আলো ঢুকছে সেখানে। আর পাথুরে দেওয়ালের বাইরে থেকে কীসের যেন অস্পষ্ট একটা শব্দ ভেসে আসছে। বিশালাকৃতির প্রাকৃতিক পাথুরে ঘরটার মেঝেটা যেন একটা চৌবাচ্চার মতো। হাঁটু সমান জল সেখানে। আলো যেখান থেকে আসছে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে জায়গাটা আবিষ্কার করে ফেলল তারা। সেই চৌবাচ্চা উলটো দিকে যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে দরজার মতো একটা ফাটল। লোহার গরাদ বসিয়ে তার মুখ বন্ধ করা। মার্লিন বিস্মিতভাবে বলল, ‘ওখানে লোহার দরজা কেন? এখানে মানুষের আসা-যাওয়া আছে নাকি?’ একটা গোলাকার পাথরের খণ্ড জলের ভিতর থেকে জেগে আছে সেই গরাদের সামনে। কিডকে পিঠে তুলে নিয়ে মার্লিনের সঙ্গে জলে নেমে গরাদের দিকে এগোল ধ্রুব। তার কাছাকাছি পৌঁছতেই তারা দেখতে পেল বাইরের রৌদ্রস্নাত বালুতট। সেই শব্দটা আরও তীব্র হচ্ছে। সমুদ্রর গর্জন।

আদ্যিকালের পুরানো জং ধরা লোহার গরাদ। তার নিচের অংশটা অনেকটা জল খেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। একটা বড়ফাঁক তৈরি হয়েছে সেখানে। গরাদের একদম কাছাকাছি পৌঁছতেই তাদের চমকে দিয়ে গরাদের সামনের সেই জলে ডোবা পাথরটা হঠাৎ নড়ে উঠল। পাথরটা ভালো করে খেয়াল করতেই তারা বুঝতে পারল, ওটা আসলে পাথর নয়, দানবাকৃতির এক সামুদ্রিক কচ্ছপের পিঠ। এতবড় কচ্ছপ এর আগে কোনোদিন দেখেনি। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মার্লিন বলল, ‘গরাদের ওই নিচের ফাঁকা অংশ দিয়ে ভিতরে ঢুকে বেচারা সম্ভবত ভিতরে আটকে গেছে।’ বাইরে বেরোবার জন্য ধ্রুবরা গরাদ ধরে ঝাঁকাতেই জং ধরে পচে যাওয়া বহু প্রাচীন লোহার দরজা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে আসতেই ধ্রুবরা দেখতে পেল কিছুদূরেই বালুতটে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। আর মাথার ওপর রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশ। আরও একটা অদ্ভুত জিনিস তারা দেখতে পেল। বিস্তীর্ণ সমুদ্র তটে যতদূর চোখ যায় বালিতে শুয়ে আছে অগুনতি সামুদ্রিক কচ্ছপ। হয়তো তাদের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে। তাদের মধ্যে কেউ আবার নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে, কেউ আবার বালি খুঁড়ে তাতে ডিম দিচ্ছে। কিড মহানন্দে ছোটাছুটি শুরু করল কচ্ছপের ঝাঁকের মধ্যে। মার্লিনের বুড়ো পাখিটা এতক্ষণ পর আলো দেখে উৎকুন্ন হয়ে মাথার ওপর উড়তে উড়তে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাঁকডাক শুরু করল। মার্লিন বলল, ‘ধ্রুব তোমার মনে আছে সেসেজের কাছাকাছি কচ্ছপেরা বিয়ার্ডের জাহাজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল? এরা মনে হয় তারাই। এ দ্বীপেই তখন তারা আসছিল।’

ধ্রুব বলল, ‘এদের দেখে আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখানে ডিম দিতে এসেছে ওরা।’

বালুতটে মালপত্র নামিয়ে সেখানে থাকার ব্যবস্থা শুরু করল তারা।

.

বিকেলবেলা বালুতটে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে গল্প করছিল ধ্রুব আর মার্লিন। মার্লিন বলল, ‘এখানে কতদিন বসে জাহাজের প্রতীক্ষা করতে হবে কে জানে? তবে জায়গাটা মন্দ নয়। নারকেল আছে, কচ্ছপের ডিম আছে, না খেয়ে অন্তত মরতে হবে না। তাছাড়া এ দ্বীপে কোনো হিংস্র প্রাণী আছে বলে মনে হয় না। সেদিক থেকে বিপদের আশঙ্কা নেই।’

ধ্রুব রেডিও যন্ত্রটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ‘এ দ্বীপে জাহাজের স্বাভাবিক যাত্রাপথে পড়ে না। এক যদি আমাদের রেডিও বার্তা কোনো জাহাজ শুনতে পেয়ে আমাদের উদ্ধার করতে আসে।’

কথা বলছিল তারা। এমন সময় কিড বলল, ‘ওই দেখো বড় কচ্ছপটা গুহার বাইরে বেরিয়ে এসেছে।’

ধ্রুব তাকিয়ে দেখল সত্যি প্রাণীটা বেরিয়ে এসে গুটি গুটি পায় ঘোরাফেরা করছে বালিতে। প্রকাণ্ড কচ্ছপ। বালুতটে যারা শুয়ে আছে তারাও বিরাটাকৃতি হলেও আকারে এ কচ্ছপটা তাদের প্রায় তিনগুণ। সে এতই বিশাল যে ওর পিঠে চড়ে বসতে পারে কোনো লোক।

ধ্রুব মন্তব্য করল, ‘অদ্ভুত প্রাণী।’

মার্লিন বলল, ‘আমি বইতে পড়েছি, সেসেজ দ্বীপপুঞ্জের কোনো কোনো দ্বীপে নাকি জায়েন্ট টারটেল পাওয়া যায়। এটা মনে হয় সেই প্রজাতিরই হবে। বহু বছর বাঁচে এরা।

ধ্রুব বলল, ‘আমাদের কলকাতার চিড়িয়াখানায় এরই এক জ্ঞাতি ভাই ছিল। তার নাম ছিল ‘অদ্বৈত’। সেটা দুশো পঞ্চান্ন বছর বেঁচেছিল।’

কিড তাদের কথা শুনে বলল, ‘সেই দুষ্টু লোকটাও আমাকে এরকম প্রকাণ্ড কচ্ছপের পিঠে চড়াবে বলেছিল।’

মার্লিন হেসে তাকে বলল, ‘দেখো, এ কচ্ছপটা হয়তো সেটাই হতে পারে। ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে খুঁজতে এখানে চলে এসেছে।’

কিড বলল, ‘আমি ওর পিঠে চড়ব?’

ধ্রুব হেসে বলল, ‘যাও।’

কিড সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে তার পিঠে চেপে বসল। দৈত্যাকৃতির কচ্ছপটার যেন কোনো মালুমই হল না তাতে। কিডকে পিঠে নিয়ে মন্থরগতিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল সে। ধ্রুবরা আবার নিজেদের আলোচনায় মন দিল।

.

কচ্ছপের পিঠে চেপে মহানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কিড। আর মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে নানারকম শব্দ করছিল। কিডের কাঁধে এসে বসেছে মার্লিনের পাখিটা। সেও মাঝে মাঝে ধমক দিচ্ছে কচ্ছপটার উদ্দেশে। বেশ মজার দৃশ্য। ধ্রুব মার্লিনকে বলল, ‘একটা ক্যামেরা থাকলে ছবি তুলে রাখতাম।’

ঠিক এই সময় কিড হঠাৎ বলল, ‘আরে, কচ্ছপটার পিঠে কী যেন লেখা আছে!’

কচ্ছপের পিঠে লেখা! কথাটা ধ্রুবদের কানে যেতেই কৌতূহলী হয়ে কিডের কাছে উপস্থিত হল তারা। কিড কচ্ছপটার পিঠ থেকে নেমে খোলের ওপর একটা জায়গা দেখিয়ে বলল, ‘এই দেখো—’  

কিডের জুতোর ঘষায় কচ্ছপটার পিঠে জমে থাকা শ্যাওলার স্তর এক জায়গাতে কিছুটা উঠে গেছে। আর তার ভিতর থেকে সত্যিই যেন উঁকি দিচ্ছে কয়েকটা ইংরেজি হরফ! অদ্ভুত ব্যাপার!

মার্লিন তাড়াতাড়ি একমুঠো বালি তুলে নিয়ে সে জায়গাতে ঘসতেই সে জায়গা পরিষ্কার হয়ে গেল। তার ভিতর অস্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠল কয়েকটা অক্ষর। একটা নাম—ওশান হার্ট!’

মার্লিন সঙ্গে সঙ্গে বেশ উত্তেজিত হয়ে তার মাথার ছোট কচ্ছপের খোলটা খুলে সেটা ধ্রুবর হাতে দিয়ে বলল, ‘কচ্ছপের পিঠে লেখা নামটা তো আমার খোলে প্রথমেই লেখা আছে। এই দেখো—‘ক্যাপ্টেন প্যারোট—ওশান হার্ট!’

ধ্রুব বলে উঠল—আশ্চর্য ব্যাপার!’

সঙ্গে সঙ্গে তারা পরীক্ষা করতে লাগল কচ্ছপের পিঠের সে জায়গাটা। আর এরপরই তারা ধরতে পারল কচ্ছপের পিঠে সে জায়গাতে খোলের একটা ছোট প্লেট খুলে নিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে একটা ধাতব প্লেট। নামটা তার ওপরই লেখা। এত নিখুঁত ভাবে প্লেটটা বসানো হয়েছে যে পিঠের অন্য প্লেটগুলোর থেকে তাকে চট করে আলাদা করা যায় না। মার্লিন একটা ছুরি দিয়ে খুব সাবধানে সেই ধাতব প্লেটটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল। উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। ধ্রুবও বেশ উত্তেজিত। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা খুলে উঠে এল মার্লিনের হাতে। পাতটার উল্টোদিকে আটকানো ঠিক দেশলাই বাক্সর আকারের একটা ছোট ধাতব বাক্স। যেটা পাতের আড়ালে লুকানো ছিল কচ্ছপের খোলের মধ্যে। ছোট্ট বাক্সটার গায়ে খোদিত আছে জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের প্রতীক চিহ্ন-কালো টিয়ার ছবি।

কাঁপছে। বাক্সটা খুলে ফেলল ধ্রুব। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল পায়রার ডিমের মতো বাক্সসমেত প্লেটটা মার্লিন কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে দিল ধ্রুবর দিকে। ধ্রুবর হাত একটা পাথর। জল দিয়ে পাথরটা ধুয়ে হাতের চেটোয় মেলে ধরতেই শেষ বেলার সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠল সেটা। — হার্ট অব দি ওশান। জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের গুপ্তধন!

বিস্ময়ে তাদের দুজনেরই কেউ কথা বলতে পারছে না। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মার্লিন অবশেষে বলল, ‘আমার বুড়ো পাখিটার ছড়ার অর্থ এবার বুঝতে পারলাম। সরাইখানার সেই বৃদ্ধ নিজে গুপ্তধন উদ্ধার করতে না পারলেও কীভাবে সেগুলো লুকানো আছে তা জানতেন। তাই ছড়াটা শিখিয়েছিলেন। ব্যাপারটা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি আমি। জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোট শেষ গেছিল অ্যামস্টেলে। অ্যামস্টেল আমস্টারডামের প্রাচীন নাম। ধীরে বেচাকেনার প্রাচীন কেন্দ্র। সেখানে তিনি তাঁর সিন্দুকের সম্পদের বিনিময়ে সংগ্রহ করেন দুর্মূল্য কিছু রত্ন। যা লুকিয়ে রাখা সহজ। হার্ট অব দি ওশান’, ‘সি কুইন’, ‘ কিং অব মাদাগাস্কার’–এ সবই হল বিভিন্ন রত্নর নাম। এ দ্বীপে এসে তারপর ব্ল্যাক প্যারোট অদ্ভুত কৌশলে রত্নগুলো কচ্ছপের খোলে লুকিয়ে রেখে যান। এক একজন জলদস্যুর প্রাপ্য ভাগ এক একটা কচ্ছপের খোলে।’ কথাগুলো বলে মার্লিন উল্লসিত ভাবে বলে উঠল, ‘যাক মার্লিন থমসন শেষ পর্যন্ত তার সম্পদ পেল! এবার বড়লোক হয়ে যাব আমরা!’

‘থমসন! মার্লিন থমসন?’

ধ্রুব প্রশ্নটা করতেই এত আনন্দের মধ্যেও যেন হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল মার্লিনের মুখ। সে বলার চেষ্টা করল—’মানে ইয়ে…।’

ধ্রুব হেসে বলল, ‘সন্দেহটা কিন্তু আগেই আমার হয়েছিল। তারপর কাল ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড যখন কথা বলছিল তখন তোমার নামের ব্যাপারেও একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল। তুমি নিশ্চয়ই জলদস্যু ফায়ার থমসনের বংশধর? পাছে আমার সন্দেহ হয় তাই তোমার পদবি আমার কাছে গোপন করেছিলে। আমার ধারণা এডেন বন্দরের সেই বৃদ্ধও তোমার কেউ হতেন। আমার অনুমান কি ঠিক?’

মার্লিন প্রথমে লজ্জিত ভাবে বলল, ‘তিনি ছিলেন আমার ঠাকুরদার বাবা। যিনি বিয়ার্ডের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে কচ্ছপের খোলটা হাতিয়েছিলেন।’ –একথা বলেই মার্লিন আবেগ মথিত ভাবে ধ্রুবর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, ‘কিন্তু বিশ্বাস করো, নিজের সম্পর্কে বংশপরিচয় গোপন করা ছাড়া আর কোনো কথা মিথ্যা বলিনি। বংশপরিচয় জানলে পাছে তুমি আমাকে ঘৃণা বা অবিশ্বাস করো সে ভয়ে পরিচয় গোপন রেখেছিলাম। আমি কপর্দকহীন, ভবঘুরে, জলদস্যুর বংশধর। কিন্তু বিশ্বাস করো কোনোদিন আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনি।’ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এল মার্লিনের কণ্ঠ।

ধ্রুব মার্লিনের পিঠে হাত রেখে, সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘আমি সেকথা বিশ্বাস করি। তুমি যে ভালো মানুষ তা আমি কিডের ব্যাপারেই বুঝেছি।’

‘ঠিক তো?’

‘হ্যাঁ, ঠিক।’ মার্লিনের পিঠ চাপড়ে হেসে বলল, ধ্রুব।

কিছুটা ধাতস্থ হবার পর মার্লিন বলল, ‘কিন্তু, আর কচ্ছপগুলো গেল কোথায়? তারা তো গুহার ভিতরে বা বালুতটে নেই?’

ধ্রুব জবাব দিল, ‘আমার ধারণা তাদের আর পাওয়া যাবে না। ব্ল্যাক প্যারোট কচ্ছপের খোলে রত্ন পুরে তাদের গারদের ওপাশে আটকে রেখে গেছিল প্রাকৃতিক চৌবাচ্চাতে। জোয়ারের জল ওই চৌবাচ্চায় পৌঁছে দিত খাদ্য-প্ল্যাঙ্কটন ইত্যাদি। ওভাবেই কয়েকশো বছর হয়তো ছিল প্রাণীগুলো। গুহার ভিতর থেকে শত শত বছর ধরে তারা তাকিয়ে থাকত সমুদ্রের দিকে। প্রতীক্ষা করত সমুদ্রে ভেসে যাবার। তারপর একদিন জলে খেয়ে গরাদের লোহায় মরচে লেগে তার নিচের অংশ খসে গেল। মুক্তি পেল সবাই। শুধু বেরোতে পারল না এ বেচারা। হয়তো তা ওর দানবীয় কলেবরের জন্যই। ওর সঙ্গীরা সব হারিয়ে গেছে ওখানে।’ ধ্রুব আঙুল তুলে দেখাল সামনের দিকে। মার্লিনও তাকাল সেদিকে। ধ্রুবদের সামনে কিছুদূরে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি। ছোট ছোট ঢেউ ভাঙছে সমুদ্রতটে। গম্ভীর শঙ্খের গর্জন। আর সেই জলরাশির ওপর লেগেছে শেষ বিকেলের রং। ধ্রুবরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল সেদিকে।

.

তিনদিন পরের ঘটনা। ধ্রুবরা আস্তানা গেড়ে ছিল সে গুহাতেই। একদিন ভোরে কিড গুহার মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘জাহাজ আসছে। জাহাজ আসছে!’

ধ্রুব আর মার্লিন বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখতে পেল তাকে। ধবধবে এক সাদা জাহাজ রাজহংসের মতো ভেসে আসছে দ্বীপের অভিমুখে। ভিক্টোরিয়া। কিডের বাবার জাহাজ। শেষপর্যন্ত ধ্রুবদের পাঠানো খবর সে পেয়েছে। উল্লসিত ভাবে কিডকে জড়িয়ে ধরল মার্লিন। ক্রমশ এগিয়ে আসছে জাহাজটা। মার্লিনের পাখিটা মাথার উপর পাক খেয়ে বলতে লাগল সেই ছড়াটা—

‘ডিং ডং ডিং ডং ডিং ডং বেল
পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল—’

ঠিক সেই সময় ধ্রুবর চোখে পড়ল আরও একটা দৃশ্য। ধীরে ধীরে সমুদ্রের জলে নিঃশব্দে নেমে যাচ্ছে সেই বিশাল প্রাচীন কচ্ছপটা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের সম্পদ যক্ষের মতো আগলে রাখার পর অবশেষে ভারমুক্ত হয়ে সে ফিরে যাচ্ছে আপন ঠিকানায়। হয়তো তার সঙ্গীদের খোঁজে।

***