১
এডেন বন্দরের জেটিতে দুপুরবেলা একলা দাঁড়িয়েছিল ধ্রুব। সমুদ্রের দিকে যতদূর চোখ যায়, পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সার সার জাহাজের মাস্তুল। তাদের মাথায় পতপত করে উড়ছে নানা দেশের পতাকা। আর জেটির সামনে সমুদ্রের পাড় বরাবর চলে যাওয়া বাস্তায় নিরবিচ্ছিন্ন জনস্রোত। বন্দর এলাকা বড় অদ্ভুত হয়। নানা দেশের মানুষ পরিযায়ী পাখির মতো সাময়িক আশ্রয় নেয় এখানে। তারপর আবার ফিরে যায় দেশ-দেশান্তরে। বিচিত্র তাদের সাজপোশাক, বিচিত্র তাদের আচার-ব্যবহার, ভাষা। আর এসব মিলেমিশে তৈরি হয় এক বর্ণময় পরিবেশ। যা দেখা যায় একমাত্র বন্দর অঞ্চলেই। ধ্রুব তাকিয়েছিল সেই বর্ণময় জনস্রোতের দিকেই। লাল দাড়ির ইংরেজ, মোমঘসা ছুঁচলো গোঁফের ফরাসি, তেরছা চোখের চীনা, মাথায় সাদা ফেট্টি বাঁধা আরব, নীল জোব্বা পরা দীর্ঘদেহী আফ্রিকান, কতরকম কত দেশের মানুষ হাঁকডাক করতে করতে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে আসা যাওয়া করছে। ধ্রুব অবাক হয়ে দেখছিল সব। এডেন ব্যস্ত বন্দর। ধ্রুব তার জাহাজের ক্যাপ্টেনের থেকে শুনেছে এ বন্দরে নাকি আড়াই হাজার বছর আগেও বাণিজ্যতরী নোঙর ফেলত। জলপথে মশলা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই এডেন এমনকী ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘বুক অব ইজেকিয়েল’-এ এর উল্লেখ আছে। আধুনিক পৃথিবীতে সুয়েজখালের ব্যবহার চালু হবার সাথে সাথেই এডেন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসাবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৩৭ সালে এডেন বন্দর পরিণত হয় ব্রিটিশ উপনিবেশে। তারপর শেষপর্যন্ত হয় ইয়েমেনের অংশবিশেষ।
ধ্রুবর এই প্রথম এডেনে আসা। আসলে জাহাজের সহকারী ওয়ারলেস রেডিও অপারেটরের কাজ নিয়ে এই প্রথম তার সত্যিকারের সমুদ্রযাত্রা। তার আগে সে শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ করেছে মুম্বাই-কলকাতা-চেন্নাই বন্দর পথে। সে সবই ছিল দেশীয় সমুদ্রপথ। আন্তর্জাতিক জলপথে সে এই প্রথম। মাসখানেক আগে মুম্বাই বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ধ্রুবদের বড় পণ্যবাহী জাহাজ ‘শ্রীগণেশ’। প্রথমে ওমানের ম্যাসকট বন্দরে পৌঁছে সেখানে কিছুদিন কাটিয়েছে তারা। তারপর সেখান থেকে রওনা হয়ে গতকালই রাতে এখানে এসেছে। সপ্তাহতিনেক এখানে তারা থাকবে মালখালাস-মালতোলার জন্য। তারপর যাত্রা করবে সোমালিয়ার মোগাদিসু বন্দরের দিকে। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর ফিরতি পথে ঘরে ফেরার পালা।
জাহাজঘাটায় যে ক’দিন জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকে, সে ক’দিন তেমন কোনো কাজ থাকে না ধ্রুবর। জাহাজ থেকে নেমে বন্দর এলাকায় ইতি-উতি ঘুরে বেড়ায় সে, নানা জিনিস দেখে, তারপর সন্ধ্যা নামার আগে আবার জাহাজে ফিরে যায়। তবে যা কিছু ঘোরাফেরা তা সবই বন্দর এলাকায় সীমাবদ্ধ। বন্দরের সীমানা অতিক্রম করে অন্যত্র যাবার অনুমতি থাকে না ভিনদেশি নাবিকদের।
এ বন্দরে কিছুদিন কাটাতে হবে তাকে জায়গাটা মোটামুটি চিনে নিতে হবে। তাই জাহাজ থেকে নেমে বেশ কিছুক্ষণ এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে সামনের লোক চলাচল দেখার পর সেই জনস্রোতের সঙ্গে মিশে জাহাজঘাটার পাড় ধরে চারপাশ দেখতে দেখতে ধ্রুব হাঁটতে লাগল। পথের পাশে মাঝে মাঝে ছোট ছোট গোলাকৃতি ভিড়। তার মাঝে কোথাও দেখানো হচ্ছে হাতসাফাইয়ের খেল, কোথাও বন্দুকবাজি, কোথাও তাসের খেলা বা একঘেঁয়েমি কাটাবার জন্য এসব ছোটখাটো ব্যবস্থা থাকে। গোল করে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে জিপসিদের নাচ। পশু প্রাণীদের খেলাও কোথাও কোথাও হচ্ছে। বন্দর অঞ্চলের নাবিকদের থাকা লোকগুলোর পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা কোনো না কোনো জাহাজের নাবিক, অথবা জাহাজঘাটায় ঘুরে বেড়ানো প্রাক্তন জাহাজি, কপর্দকহীন ভবঘুরের দল। যাদের কমবেশি দেখা যায় সব বন্দরে। এসব কিছুকে পাশ কাটিয়ে এগোচ্ছিল ধ্রুব, কিন্তু হঠাৎই একটা জটলার মাঝে চোখ পড়তে কৌতূহলবশত দাঁড়াল সে। ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুতদর্শন এক লোক। পরনে রঙিন ঢোলা পা-জামা আর হাতকাটা ওয়েস্টকোটের মতো পোশাক। চওড়া চামড়ার কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে বিরাট তলোয়ার, মাথায় প্রথম এলিজাবেথের যুগের চামড়ার তৈরি তিনকোনা, নাবিক টুপি, ডানচোখ একটা কালো ফেট্টি দিয়ে ঢাকা। ঠিক যেন ছবির বাইরের পাতা থেকে উঠে আসা পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীর কোনো লোক দাঁড়িয়ে আছে সামনে। লোকটার হাতে একগোছা কীসের যেন টিকিট। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটার কথাবার্তা শুনে পরিষ্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা। লোকটা ‘পাইরেটস মিউজিয়ামের’ টিকিট বিক্রি করছে। ‘পাইরেট’ অর্থাৎ ‘জলদস্যুদের মিউজিয়াম! সেটা আবার কী? আসলে সেটা একটা জাহাজ। ভ্রাম্যমাণ মিউজিয়াম। কিছুদিন হল নোঙর করেছে এডেন বন্দরে। প্রাচীন জলদস্যুদের ইতিহাস, তাদের ব্যবহৃত নানা ‘জিনিস নাকি রাখা আছে ‘ফ্রান্সিস ড্রেক’ নামের সেই জাহাজে। কিছুদূরে বড় বড় জাহাজগুলোর আড়ালে নাকি দাঁড়িয়ে আছে সে জাহাজ। টিকিট কাটলে ছোট নৌকা পৌঁছে দেবে সে মিউজিয়ামে আবার দেখা শেষে জেটিতে ফিরিয়ে আনবে।
ব্যাপারটাতে বেশ আগ্রহ হল ধ্রুবর। একটা টিকিট কিনল সে। তাকে টিকিট দেবার পর লোকটা বলল, ‘দু-ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে এই একটা টিকিট বিক্রি হল। আর এখন হবে না। বিকালের দিকে আবার আসব। আসলে, দশদিন হল, আমরা এখানে আছি। অনেকেরই মিউজিয়াম দেখা হয়ে গেছে। চলুন, আমিই আপনাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি।’
ভিড়টা ভেঙে গেল। ধ্রুবকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল লোকটা। যেতে যেতে লোকটা ধ্রুবকে বলল, ‘আপনি কি জাহাজি? কোন দেশের লোক?’
ধ্রুব জবাব দিল, ‘ইন্ডিয়ান। শ্রীগণেশ’ জাহাজের সহকারী রেডিও অপারেটর। কালই এসেছি এ বন্দরে।’
‘তার মানে তো কিছুদিন থাকবেন এখানে? এরপর কোথায় যাবেন?’ জানতে চাইল সে।
হ্যাঁ, অন্তত দিনকুড়ি তো বটেই। এরপর যাব মোগাদিসুতে। ধ্রুব উত্তর দিল।
লোকটা এবার নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমার নাম মার্লিন। ব্রিটেনের লোক। বর্তমানে ‘ফ্রান্সিস ড্রেকের’ সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছি এ বন্দর থেকে সে বন্দর। এক সময় আমারও আপনার মতো রেডিও অপারেটর হবার ইচ্ছা ছিল।’ অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বলল লোকটা।
ধ্রুব বলল, ‘তা হলেন না কেন?’
মার্লিন বলে লোকটা জবাব দিল, ‘পয়সার অভাবে ইন্সটিটিউটে ভর্তি হতে পারিনি। জলদস্যুদের ব্যাপারে বেশ কিছু পড়াশোনা নিজের আগ্রহে করেছি আমি।’ শেষ কথাগুলো তবে জানেন, সমুদ্র আমাকে ছোটবেলা থেকেই টানে। সমুদ্রের ব্যাপারে, বিশেষত বেশ উৎসাহের সাথে বলল সে।
ধ্রুব বলল, ‘বাঃ, এ তো বেশ ভালো ব্যাপার।’
মার্লিন বলে উঠল, ‘ওইটুকু করেছি বলেই তো এ জাহাজে চাকরিটা পেলাম। বলতে _গেলে জাহাজের মিউজিয়ামটা আমিই দেখাশোনা করি। মিউজিয়ামে গাইডের কাজ, টিকিট বিক্রি থেকে ঝাড়পোঁছ সব কিছুই সময় সময় করতে হয় আমাকে। অবশ্য আরও কিছু লোকও যুক্ত আছে এ কাজে।’
জাহাজি লোকেরা গল্প করতে, কথা বলতে ভালোবাসে। কথা বলতে বলতে মার্লিন ভিড় ঠেলে ধ্রুবকে নিয়ে এগিয়ে চলল সামনের জেটির দিকে।
মার্লিনকে ভালো করে দেখার পর ধ্রুবর মনে হল, তাকে লোক না বলে যুবক বলাই ভালো। বয়স তার সম্ভবত ধ্রুবর মতোই চব্বিশ-পঁচিশ হবে। লাল রং, টিকালো নাক, ঘন ভুরু নিচে ঘন নীল চোখ ডান চোখের পট্টিটা সে উঠিয়ে ফেলেছে। ওটা তার সাজ পোশাকের অংশ। এক কালে একচোখা নাবিক ও জলদস্যুরা তাদের শূন্য কোটর ঢাকার জন্য এইরকম কালো পট্টি ব্যবহার করত। লড়াইতে অনেক সময় তাদের চোখ নষ্ট বা হাত পা কাটা যেত। পট্টি লাগিয়ে সেই সময়ের নাবিক সাজার চেষ্টা করে মার্লিন।
বেশ কিছুটা এগোবার পর জাহাজে নিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষমাণ বোট পাওয়া গেল। একজন লোক তাতে। তার পোশাকও সেই আদ্যিকালের নাবিকদের মতো। দাঁড়টানা বোট। মার্লিন ধ্রুবকে নিয়ে তাতে উঠে বসতেই ছপাছপ শব্দে দাঁড় টানতে লাগল লোকটা। চারপাশে নোঙর করা আছে বড় বড় সব জাহাজ। তার ফাঁক গলে সবকিছুকেই বাঁচিয়ে লোকটা বোট নিয়ে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজের সেই চক্রব্যূহ অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। আর, তারপরই ধ্রুব দেখতে পেল ‘ফ্রান্সিস ড্রেককে’। অন্য জাহাজগুলোর কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে আদ্যিকালের পালতোলা কালোরঙের জাহাজটা। এ ধরনের জাহাজের ছবি সে বইতে দেখেছে। তিন-চারশো বছর আগে এ ধরনের জাহাজ নিয়েই পাড়ি দেওয়া হত সমুদ্রে। বিরাট বড় মাস্তুল থেকে ঝুলছে অসংখ্য পাল আর দড়িদড়া। সমুখভাগে পাল খাটানোর দড়ি বাঁধার লম্বা দণ্ড, জলের কাছাকাছি জাহাজের’ খোলের ফোকর গলে বেরিয়ে আছে সার সার দাঁড়। আর সবার ওপরে প্রধান মাস্তুলের মাথা পতপত করে উড়ছে কালো রঙের একটা পতাকা। তাতে আঁকা আছে একটা মড়ার মাথা, আর তার নিচে আড়াআড়িভাবে দুটো তলোয়ার।
বিস্মিত ধ্রুব বলল, ‘এ জাহাজ কত পুরানো?’
মার্লিন হেসে বলল, ‘জাহাজটা কত পুরানো তা কেউ বলতে পারে না। কেউ কেউ বলে এটা নাকি সবসময় সত্যিই পাইরেট শিপ ছিল। তবে কার্ডিফে নিয়ে গিয়ে এর খোলনলচে বদলানো হয়েছে। ইঞ্জিনও বসানো হয়েছে। তবে বাইরের চেহারা এক রাখা হয়েছে যাতে ভিজিটরদের মনে হয় যে তারা সত্যি কোনো পাইরেট শিপে আছে। জাহাজের মাথায় যে অদ্ভুত পতাকাটা উড়ছে, ওকে কী বলে জানেন? ‘জলি রজার’ অর্থাৎ জলদস্যুদের পতাকা।’ জলদস্যুরা ভয় দেখাবার জন্য এসব পতাকা ব্যবহার করত। তাতে কোথাও আঁকা থাকত মড়ার মাথার খুলি, কোথাও কঙ্কাল, কোথাও কঙ্কালের কাছ থেকে জলদস্যু সর্দার টাকার থলি নিচ্ছে এমন ছবি। সপ্তদশ শতাব্দীতে জলদস্যুরা জলি রজারের প্রচলন করে।’
বোট পৌঁছে গেল জাহাজের কাছে। ডেকে ওঠার জন্য দুটো ব্যবস্থা, দড়ির সিঁড়ি, আর কাঠের খাঁচা। খাঁচায় উঠলে তা ওপরে টেনে তোলা হয়। মার্লিনের সাথে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ডেকে উঠে এল ধ্রুব। আর সঙ্গে সঙ্গে বিরাট বড় একটা পাখি ডানা ঝটপটিয়ে কোথা থেকে যেন উড়ে এসে বসল মার্লিনের কাঁধে। তারপর খোনা গলায় বলে উঠল, ‘মার্লিন। মার্লিন।’ লাল রঙের বিরাট বড় একটা ম্যাকাও পাখি। মার্লিন পাখিটার পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলল, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তবে এই জাহাজের পরিবেশে খুব মানিয়েছে। জলদস্যুদের জাহাজে, কথাবলা পাখি, বানর, ঝালর লেজের কাঠবেড়ালি ইত্যাদি ছোটখাটো পশুপাখি রাখা হত। তবে তাদের নিছকই নাবিকদের মনোরঞ্জনের জন্য রাখা হত না। মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা ওইসব প্রাণী দুরে কিছু দেখতে পেলে সতর্ক করে দিত নাবিকদের। তাদের আচরণ দেখে আগাম আবহাওয়া পরিবর্তন সম্বন্ধেও আঁচ করা যেত।’
ধ্রুব তাকিয়ে দেখল ডেকের চারদিকে। বেশ কয়েকটা লোক দাঁড়িয়ে ডেকের নানা জায়গায়। তাদের পরনে প্রাচীন জলদস্যুদের মতো সাজ-পোশাক। শক্তপোক্ত চেহারা, কালিঝুলি মাখা মুখ। বেশ ক’টা কামান, দড়িদড়া। সমুদ্র অভিযানের নানা জিনিস রাখা আছে চারপাশে। আর ডেকের ঠিক মাঝখানে আছে জাহাজ চালানোর বিরাট বড় কাঠের হুইল বা চাকা। যার গায়ের হাতল ঘুরিয়ে জাহাজের দিক নির্দেশ করা হয়। হঠাৎ চোখ গেল, একটা মাস্তুল দণ্ডর দিকে। চমকে উঠল ধ্রুব। সেখান থেকে ঝুলছে একটা নরকঙ্কাল! তার গায়ে লেগে থাকা পোশাকের ছিন্ন টুকরো সমুদ্রের বাতাসে উড়ছে। ধ্রুব চমকে গেছে বুঝতে পেরে মার্লিন হেসে বলল, ‘ওটা একটা রেপ্লিকা। কিন্তু একসময় বিদ্রোহী নাবিক বা বন্দিদের এভাবেই জাহাজের মাস্তুলে ফাঁসিতে ঝোলাত জলদস্যু সর্দাররা। আর তারা নিজেরা ধরা পড়লেও একই অবস্থা হত। তাই ওটা রাখা আছে।’
মার্লিন এরপর ডেক ছেড়ে ধ্রুবকে নিয়ে খোলের মধ্যে নামল। নিচে আধো-অন্ধকার পরিবেশ। বৈদ্যুতিক আলোর পরিবর্তে মোমদানিতে মোম জ্বলছে। ইচ্ছা করেই এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যাতে গা ছমছম করে। মার্লিন তাকে প্রথম যে ঘরে নিয়ে ঢুকল সেটা একটা পোর্ট্রেট গ্যালারি। ঘরে ঢুকলে প্রথমে মনে হবে দেওয়ালের গা ঘেঁষে একদল মানুষ যেন সারবেঁধে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আগন্তুকের দিকে। বিচিত্র তাদের পোশাক, অস্ত্রশস্ত্র। কারও কারও মুখভঙ্গি ভয়ঙ্কর, কারও বা একটা পা কাঠের, কারও একটা হাত বা চোখ নেই। মার্লিন, ধ্রুবকে প্রথম যাঁর ছবির সামনে এনে দাঁড় করাল তাকে কিন্তু অভিজাত মানুষ বলেই মনে হল। তাঁর পরনে ভিক্টোরীয় যুগের দামি পোশাক, কোমরে কারুকাজ করা তলোয়ার-পিস্তল। ছুঁচালো দাড়ির মানুষটা ছবির ভিতর থেকে এ জাহাজের নাম রাখা হয়েছে। এঁর জীবনকাল ছিল ১৫৪৩-১৫৯৬। জলদস্যু হিসাবে দেখছে ধ্রুবকে। মার্লিন ছবিটা দেখিয়ে বলতে শুরু করল, ‘ইনি, ফ্রান্সিস ড্রেক যাঁর নামে জীবন শুরু করে পরবর্তীকালে সবচেয়ে সফল হয়েছিলেন এ মানুষটি। যা অন্য কোনো জলদস্যু সর্দারের ভাগ্যে বিশেষ ঘটেনি। তিনি শুধু জলদস্যু সর্দার ছিলেন না, ছিলেন একজন অসীম সাহসী সমুদ্রযোদ্ধা ও একজন দুর্জয় অভিযাত্রী। তিনি বিখ্যাত স্প্যানিশ আর্মাডা’কে দুবার পরাজিত করেন। ব্রিটিশ অভিযাত্রীদের মধ্যে ইনিই প্রথম সমুদ্র পথে সারা পৃথিবী ঘুরে আসেন। যার ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। রানি প্রথম এলিজাবেথের নির্দেশে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে, আফ্রিকাসহ বেশ কিছু দুর্গম স্থানে সমুদ্র অভিযান করেন। বিপজ্জনক সফল এইসব অভিযানের শেষে দেশে ফেরার পর রানি খুশি হয়ে তাকে ‘নাইটহুড’ খেতাব প্রদান করেন।’
ধ্রুব বলল, ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি যে অনেক জলদস্যু বিভিন্ন দেশের হয়ে কাজ করত।’
মার্লিন বলল, ‘সে যুগের জলদস্যুরা ছিল দু ধরনের। একদলকে বলা হত ‘প্রাইভেটিয়ার’ যারা কোনো দেশের তত্ত্বাবধানে কাজ করত। এদের মধ্যে কয়েকজন বেশ খ্যাতিলাভ করেন। যেমন ফ্রান্সিস ড্রেক, স্যার হেনরি মরগন, স্যার জন হকিন্স। এঁদের ডাকা হত ‘বুকানির’ অর্থাৎ সম্মানীয় বলে। আর একদল ছিল স্বাধীন জলদস্যু। যে কোনো দল বা দেশ এদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারত। দ্বিতীয় এ দল ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও নৃশংস! কোনো নিয়মকানুনের ধার ধারত না এরা। এঁদের মধ্যে বিখ্যাত বা কুখ্যাত ছিল, ‘বার্বারোসা’ বা রেডবিয়ার্ড, ব্ল্যাক বিয়ার্ড, ক্যাপ্টেন ইংল্যান্ড, বার্থোলমিউ রবার্টস প্রমুখ। যাঁদের নাম বললাম। তাদের অনেকের ছবিও এ ঘরে আছে।’ মার্লিন এরপর এক একটা ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে ছবির লোকদের সাথে পরিচয় করাতে লাগল ধ্রুবর। খোলে তিনটে তলা আছে। পোট্রেট মিউজিয়ামের পর, তারা নেমে এল নিচের তলার গ্যালারিতে। সেখানে রাখা আছে জলদস্যুদের ব্যবহৃত নানা প্রাচীন জিনিস। নৌ অভিযানের চার্ট-মানচিত্র, আদ্যিকালের কম্পাস, টুপি, পোশাক-পরিচ্ছদ, তরোয়াল, বন্দুক, হাতকামান, বারুদের বাক্স আর সেই লম্বা ‘পারকাসন’ পিস্তল। যা গোঁজা থাকত জলদস্যু সর্দারদের কোমরে। মার্লিন বলল, সে ঘরের সব জিনিসই নাকি আসল। মিউজিয়ামের মালিক বিভিন্ন জায়গা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। বেশ সময় নিয়ে সে ঘর দেখার পর তারা নেমে এল খোলের সবচেয়ে নিচের অংশে।
অনেক খুপরি ঘর সেখানে। লোহার গারদ দেওয়া বন্দি রাখার ঘর, পানীয়ের পিপে রাখার ঘর, বারুদ ঘর ইত্যাদি। সেসব দেখাবার পর একটা ঘরে ধ্রুবকে নিয়ে ঢুকল মার্লিন। সে ঘরে মেঝের ওপর দেওয়াল ঘেঁষে রাখা আছে লোহার চওড়া পট্টিওলা বিরাট বড় একটা কাঠের লম্বাটে সিন্দুক। আর তার সামনে দেওয়ালের গায়ে রয়েছে মানুষের প্রমাণ মাপের তৈলচিত্র। একটা টেবিলে মোমদানিতে একটা মোম জ্বলছিল, সেটা হাতে নিয়ে মার্লিন ধ্রুবকে সঙ্গে নিয়ে সেই সিন্দুক আর সেই ছবির সামনে এসে দাঁড়াল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরনো ছবিটা। ঔজ্জ্বল্য কিছুটা ম্লান হলেও ছবিটা এখনো জীবন্তই বলে মনে হয়। ছবির লোকটার পরনে জলদস্যু সর্দারদের মতো সাজ। মাথায় বারান্দাওলা বিরাট গোল টুপি, বুকের কাছে বকলস আঁটা আড়াআড়ি নামা চামড়ার বেল্ট। কোমরবন্ধে ঝুলছে তলোয়ার আর পারকাসন। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হল তার প্রায় পেট পর্যন্ত নেমে আসা সাদা শনের মতো ধবধবে দাড়ি। তার চোখের দৃষ্টির মধ্যে ফুটে উঠেছে হিংস্রতা। সাদা দাড়ি গোঁফের জঙ্গলের মধ্যে ঠোটে ভেসে আছে ক্রুর হাসি। কব্জি থেকে কাটা ডান হাতে একটা লোহার খাপ পরানো, যার অগ্রভাগে বসানো আছে ইস্পাতের বাঁকানো হুক। যা সম্ভবত অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হত। আর লোকটার কাঁধে বাসে আছে অদ্ভুতদর্শন কালো টিয়াপাখি। লোকটা একটা সিন্দুকের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডালা খোলা সেই সিন্দুকে উপচে পড়ছে মোহর, হীরে জহরত, স্বর্ণালঙ্কার। মার্লিন বলল, ‘এটাই মিউজিয়ামের সবচেয়ে দামি জিনিস। এ হল জলদস্যু সর্দার ব্ল্যাক প্যারোটের ছবি। আজ থেকে তিনশো বছর আগে আফ্রিকা উপকূল শাসন করত এই ব্ল্যাক প্যারোট। কত লোককে যে হত্যা করে তার ইয়ত্তা নেই। হিংস্রতায় রেড বিয়ার্ডদেরও ছাপিয়ে গেছিল। এবার আপনি খেয়াল করুন ছবির সিন্দুকটা, তারপর দেখুন আপনার সামনে যেটা রাখা আছে, সে সিন্দুকটা।’
তার কথামতো দেখে ধ্রুব বুঝতে পারল, ছবি আর সামনে রাখা সিন্দুকটা হুবহু এক রকম। সে সামনের সিন্দুকটা দেখিয়ে বলল, ‘এটা কি রেপ্লিকা?’
মার্লিন মৃদু হেসে বলল, ‘না, এটাই সেই আসল সিন্দুক, ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে। ছবিটা তিনশো বছরের প্রাচীন। সত্যি সত্যি এই সিন্দুকের গায়ে দাঁড়ানো অবস্থায় ব্ল্যাক প্যারোটের ছবিটা আঁকা হয়েছিল
ধ্রুব, স্পর্শ করল সিন্দুকটা। তার গা যেন কেমন শিরশির করে উঠল। সে বলল, ‘এর ভিতরের জিনিসগুলোও আছে নাকি?’
মার্লিন ডালাটা খুলল। ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। বাক্সর ভিতর থেকে একটা পুরনো গন্ধ যেন মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল ঘরের বাতাসকে। কিন্তু, ভিতরে কিছু নেই। একদম ফাঁকা। শুধু তার ভিতর পড়ে আছে একটা কালো পালক। ধ্রুব জানতে চাইল, ‘এর ভিতরের জিনিসগুলো কোথায় গেল?’
বাক্সর ডালাটা বন্ধ করে মার্লিন জবাব দিল, ‘সেটা সঠিক কারো জানা নেই। শোনা যায় এই সিন্দুকের ধনসম্পদ তিনি কোনো অজানা দ্বীপে লুকিয়ে রেখে আসেন। সে সময় ব্রিটিশ প্রাইভেটিয়ারদের সাথে তার লড়াই চলছিল। ব্ল্যাক প্যারোটেরও শেষ খোঁজ পাওয়া যায়নি। ব্রিটিশ নৌ-সেনা তার শূন্য ভগ্নপ্রায় জাহাজের খোঁজ পায় মাদাগাস্কারের এক নির্জন উপকূলে। সামুদ্রিক ঝড় তার জাহাজটাকে আছড়ে এনে ফেলেছিল সে জায়গাতে। জাহাজে কয়েকজন জলদস্যুর মৃতদেহ পাওয়া গেলেও ব্ল্যাক প্যারোট ছিলেন না। কেউ কেউ অনুমান করেন সেই অজানা দ্বীপ থেকে ফেরার সময় সামুদ্রিক ঝড়ে জাহাজ থেকে পড়ে গিয়ে তার সলিলসমাধি ঘটে।’
ধ্রুব বলল, ‘এসব সম্পদ লুকিয়ে রাখার গল্প ছেলেবেলায় বইতে পড়েছি।’
মার্লিন জবাব দিল, ‘গল্প নয়, অনেক সত্যি ঘটনাও আছে। হোয়াইট বিয়ার্ডেরই মতো জলদস্যু উইলিয়াম কিডের স্বর্ণভাণ্ডার বা জলদস্যু ল্যাফাইটের সোনার কামানের খোঁজ কিন্তু এখনো মেলেনি।
কথাগুলো বলার পর মার্লিন বলল, ‘চলুন, আপনাকে এবার ‘পাইরেটস লাইব্রেরিতে নিয়ে যাই। সেখানে জলদস্যুদের সম্বন্ধে বেশকিছু নতুন পুরনো বইপত্তর আছে। আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন।’
মার্লিনের পিছন পিছন ধ্রুব গিয়ে ঢুকল লাইব্রেরি রুমে। ঘর অন্ধকার ছিল। মার্লিন ঘরে ঢুকে একটা পোর্ট হোল খুলতেই বাইরের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। চারপাশে বেশ কয়েকটা বই ঠাসা ভিক্টোরীয় যুগের আলমারি। জানলার সামনে টেবিল চেয়ারও আছে। ধ্রুব পোর্টহোলের সামনে গিয়ে বাইরে উকি দিতেই দেখতে পেল নিচে হাতদশেক তফাতেই সমুদ্রের জল। খোলের একদম নিচে নেমে এসেছে তারা। বাইরের আলো দেখে ধ্রুব বুঝতে পারল মিউজিয়াম দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এসেছে। ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেছে সে বুঝতে পারেনি। খোলা পোর্টহোল দিয়ে মার্লিনের ম্যাকাওটা হঠাৎ ডাক ছেড়ে উড়ে গেল বাইরে আকাশের দিকে।
মার্লিন হেসে বলল, ‘অনেকক্ষণ বদ্ধ জায়গাতে ওর আর ভালো লাগছিল না। ও এখন সোজা গিয়ে বসবে জাহাজের মাস্তুলে। ও বুড়ো হয়েছে তো, আলো বাতাস ছাড়া ও এখন বেশিদিন থাকতে পারে না।’
এরপর মার্লিন বলল, ‘জানেন ওর বয়স কত? আশি বছর! ও আমাদের তিন পুরুষকে দেখেছে।
ধ্রুব অবাক হয়ে একটু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলল, ‘পাখির বয়স আশি বছর!’
মার্লিন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ঠিক ভাবে যত্ন করে রাখলে এ জাতীয় পাখি সত্তর-আশি বছর বাঁচে।’
মার্লিন এরপর মনে হয় তার পাখির ব্যাপারে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা লোক ঘরে ঢুকে মার্লিনকে বলল, ‘ক্যাপ্টেন সাহেব আপনাকে একটু তলব করেছেন।’
তার কথা শুনে মার্লিন ধ্রুবকে বলল, ‘আপনি ঘরে বসে একটু বইপত্র দেখতে থাকুন। আর একটা ঘরই শুধু বাকি আছে, ‘জলি রজার্স রুম।’ আমি এখনই ফিরে আসছি। তারপর আপনাকে সে ঘরে নিয়ে যাব।’ এই বলে ধ্রুবর অনুমতি নিয়ে সেই লোকটার সাথে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
মার্লিন চলে যাবার পর ধ্রুব আলমারির কাছে গিয়ে বইগুলো দেখতে লাগল। হঠাৎ সে পুরনো চামড়ার বইয়ের ফাঁকে গোঁজা একটা বই দেখতে পেল। রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের লেখা বিখ্যাত বই, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড।’ বইটা বার করে এনে সে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। পুরনো বইটার প্রথম পাতা খুলে আশ্চর্য হয়ে গেল সে। বইয়ের ফার্স্ট এডিশন। প্রকাশকাল ১৮৮৩। এক ঠ্যাংওয়ালা জলদস্যু ‘লং জন সিলভারের’ এ গল্প ধ্রুব ছেলেবেলায় বহুবার পড়েছে। বইটা নিয়ে সে পাতা ওল্টাতে লাগল।
