৬
ডাক আসতে একটু দেরিই হল। দীপাঞ্জনরা তখন লুবেনেস্কি আর হয়তো ডাকবেন না ভেবে শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছিল। রাত ন-টা নাগাদ দরজায় টোকা দেবার শব্দ শুনে দীপাঞ্জনরা দরজা খুলে দেখল ডায়না এসে দাঁড়িয়েছে। সে দীপাঞ্জনকে বলল, ‘গ্র্যান্ড-পা আপনাদের ডাকছেন। উনি কী যেন আলোচনা করতে চান আপনাদের সঙ্গে।’
দীপাঞ্জন বলল, ঠিক আছে যাচ্ছি আমরা।’
ডায়না বলল, ‘তবে আমাদের ব্যারাক-বাড়িতে নয়। উনি শাওয়ার রুমে আছেন।’
শাওয়ার রুম! মানে ওই গ্যাস চেম্বারে?’
ডায়না হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, শেষবারের মতো ডাকাউ ক্যাম্পের কয়েকটা জায়গা দেখতে বেরিয়েছেন তিনি। ওখানেই গ্র্যান্ড-পা আছেন। আপনাদের ডাকছেন। আপনারা যান ওখানে, আমি ওঁর স্যুটকেস থেকে ওঁর কম্ফোর্টারটা নিয়ে একটু পরই যাচ্ছি। একটু তাড়াতাড়ি যান। বৃদ্ধ মানুষ একলা রয়েছেন ওখানে। নেহাত তিনি আপনাদের ডাকতে বললেন আর জিনিসটা আনতে বললেন তাই তাকে একা ছেড়ে এসেছি।’ – এই বলে ডায়না ব্যস্তভাবে পা বাড়াল তাদের থাকার জায়গার দিকে।
ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল দীপাঞ্জনরা। মাথার ওপর বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। ক্রিমেশন হাউসটার দিকে এগোতে-এগোতে আশেপাশের ব্যারাক-বাড়িগুলির ভিতর থেকে কেমন যেন অস্পষ্ট আওয়াজ এসে লাগতে লাগল দীপাঞ্জনদের কানে। তবে কি এক সময় যারা সেখানে থাকত তারা আবার জেগে উঠেছে!
জুয়ান বললেন, ‘অন্ধকার নামার পরই সম্ভবত ইঁদুরগুলো তাদের আস্তানা থেকে বেরিয়ে দাপাদাপি শুরু করেছে ব্যারাকগুলোর মধ্যে। ও তারই শব্দ। ওদের আকার দেখেছ তো? এক-একটা প্রায় খরগোশের মতো! এক সঙ্গে অনেক ইঁদুর মিলে এমন শব্দ তুলছে। যেন মনে হচ্ছে যে, কেউ বা কারা হেঁটে বেড়াচ্ছে পরিত্যক্ত ব্যারাকগুলোর মধ্যে।’
সেই অদ্ভূত শব্দ শুনতে-শুনতে ক্রিমেশন হাউসের কাছে পৌঁছে গেল দীপাঞ্জনরা। চাদের আলোতে একলা দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। এক সময় এই বাড়িটাতেই হাজারে-হাজারে মানুষকে খুন করা হয়েছে গ্যাস চেম্বারে ফেলে! কথাটা ভাবতেই দীপাঞ্জনের মনের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল। না, ঠিক ভয় নয়, একটা প্রগাঢ় অস্বস্তিভাব। কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে দীপাঞ্জনরা উপস্থিত হল দরজার মুখে। দরজাটা খোলাই। তবে বাড়িটার ভিতরে জমাটবাঁধা অন্ধকার। দীপাঞ্জনরা প্রবেশ করল বাড়িটার ভিতর। তারপর অন্ধকার হাতড়ে অলিন্দ বেয়ে এগোতে লাগল শাওয়ার রুমের দিকে। এক সময় তারা পৌঁছে গেল জায়গাটার কাছে। শাওয়ার রুমের দরজাটা খোলা। একটা হালকা আলো ভেসে আসছে ঘরের ভিতর থেকে। দীপাঞ্জন আর জুয়ান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে তাকিয়ে দেখতে পেল ঘরের মেঝেতে একটা ছোট ব্যাটারি-ল্যাম্প নামিয়ে রাখা। লুবেনেস্কি শাওয়ারটার নিচে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন সেদিকে। দীপাঞ্জন আর জুয়ান সে ঘরে ঢুকতেই লুবেনেস্কি মৃদু চমকে উঠে তাকালেন তাদের দিকে। তারপর দীপাঞ্জনের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা এখানে এসেছেন! আমি ভাবলাম ডায়না এল। ভালোই হল, আপনার সঙ্গে আমার কিছু গোপনীয় কথা আছে।’
দীপাঞ্জন আর জুয়ান এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। দীপাঞ্জন বলল, হ্যাঁ, ডায়না বলল আপনি এখানে আমাদের ডাকছেন তাই এলাম।’
দীপাঞ্জনের কথার প্রত্যুত্তরে বৃদ্ধ লুবেনেস্কি কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় হঠাৎ দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল ঘরের ধাতব দরজাটা! কী হল? কে এমনভাবে বন্ধ করল দরজা?
দীপাঞ্জনের মধ্যে হঠাৎ যেন একটা তৃতীয় নয়ন কাজ করে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে সে দরজার কাছে ছুটে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘দরজা কে বন্ধ করলেন? খুলুন খুলুন।’
দরজা খুলল না। বাইরে থেকে কোনো জবাবও এল না। দীপাঞ্জন দরজা ধাক্কাতে শুরু করল। প্রফেসর জুয়ান আর লুবেনেস্কি হতভম্ব হয়ে গেলেন ব্যাপারটাতে। এত রাতে কে এমন মশকরা করছে তাদের সঙ্গে?
দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতেই যেন বাইরে একটা ধাতব ক্যাচ ক্যাচ শব্দ কানে এল দীপাঞ্জনের। আর তারপরই ঘরের মেঝে থেকে একটা শোঁ-শোঁ শব্দ উঠল। ধুলোর ঝড় উঠল মেঝেতে। ফুটোগুলো দিয়ে বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে শাওয়ার রুমে। আর তারপরই যেন সরু সাদা ধোঁয়া বেরোতে লাগল মেঝের ছিদ্র থেকে। বাতাস নয় গ্যাস। মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপারটা ধরে ফেলল সকলে। মুলার বলেছিলেন এখনও কর্মক্ষম আছে এই গ্যাস চেম্বার। তবে কি কেউ…
দীপাঞ্জন খেয়াল করল মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে লুবেনেস্কির মুখ। দুর্বোধ্য ভাষায় আতঙ্কিতভাবে চিৎকার করে কী যেন বলে উঠলেন। তারপর ছুটে এসে দীপাঞ্জনের সঙ্গে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন। ক্রমেই দমবন্ধ হয়ে আসছে দীপাঞ্জনের। অন্যদেরও একই অবস্থা। লুবেনেস্কি প্রচণ্ড কাশতে শুরু করলেন, জুয়ান বুক চেপে ধরেছেন নিজের। পাগলের মতো দরজা ধাক্কিয়ে চলেছে দীপাঞ্জন। এক-একটা মুহূর্ত যেন এক-একটা ঘণ্টা বলে মনে হচ্ছে। এক সময় দীপাঞ্জনের মনে হল যে, সে আর পারছে না। দমবন্ধ হয়ে অবসন্ন হয়ে আসছে তার শরীর। কাশতে কাশতে লুবেনেস্কি মাটিতে পড়ে গেলেন। এবার সেও পড়ে যাবে। এই মৃত্যু-ঘর এত বছর পর আবার জেগে উঠে গ্রাস করে নিল তাদের সবাইকে। লুবেনেস্কির আর ফেরা হল না এই মৃত্যু ক্যাম্প থেকে। ঠিক এমন মুহূর্তে হঠাৎ দরজাটা আবার খুলে গেল। ঘরে ঢুকল এস.এস গার্ডের পোশাক পরা একজন লোক তাকে দেখে চিনতে পারল সবাই। তিনি মুলার। জুয়ান বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘আপনি? এ পোশাকে কেন? দরজা কে বন্ধ করেছিল?’
মুলার দ্রুত লুবেনেস্কিকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘সব প্রশ্নের জবাব পরে দেব। আগে এই মরণকূপ ছেড়ে বাইরে বেরোন। এমনই কিছু ঘটবে বলে আমার মনে হচ্ছিল।’
ঘরের বাইরে অন্ধকার বারান্দায় বেরিয়ে এল সবাই। মিনিট খানেক সময় লাগল সবার ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধাতস্থ হতে। লুবেনেস্কি এরপর বললেন, ‘আমারও যেন কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছিল….
মুলার বললেন, ‘আর সময় নষ্ট করা যাবে না। চলুন এবার তাকে ধরতে হবে। —এরপর জার্মান ভাষায় দু-একটা কী কথোপকথন হল লুবেনেস্কি আর মুলারের মধ্যে। তারপর সে জায়গা ছেড়ে বাইরে বেরোবার জন্য এগোলেন তারা। বিস্মিত দীপাঞ্জন আর জুয়ানকে তাদের অনুসরণ করতে বললেন মুলার।
বাইরে চাঁদের আলোতে বেরিয়ে এসে মুলার বললেন, ‘ও সম্ভবত সেই জায়গাতেই গেছে। তবে পালাতে পারবে না। ক্যাম্পটা পুলিশ ঘিরে রেখেছে। তবে সবাই একটু সাবধানে থাকবেন। আজও ওদের হিংস্রতার কোনো সীমা নেই।’
পুরো দলটা এবার সন্তর্পণে এগোতে থাকল মেডিকেল হাউসের দিকে। কাঁটাতারের বেড়াটাকে বেড় দিয়ে তারা পৌঁছে গেল মেডিকেল হাউসের পিছনে সেই দরজাটার ওখানে। ধীরে ধীরে গুড়ি মেরে কাঁটাতারের ফাঁক গলে দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারা। মুলার তার পকেট থেকে প্রথমে একটা ছোট পেন্সিল টর্চ বের করলেন। তারপর কোমর থেকে বের করলেন আরও একটা জিনিস। চাঁদের আলোতে মুহূর্তের জন্য ঝিলিক দিয়ে উঠল সেটা। প্রথমে মুলার আর লুবেনেস্কি, তারপর একে-একে দীপাঞ্জন আর জুয়ান প্রবেশ করল অন্ধকার একটা প্যাসেজের মধ্যে। মাটিতে টর্চের আলো ফেললেন মুলার। পুরু ধুলোর আস্তরণের ওপর নানা পায়ের ছাপ জেগে আছে। মুলার শুধু একবার চাপা স্বরে বললেন, ‘গতকাল আপনাকে অনুসরণ করে সে এখানে ঢুকে ছিল আপনার পিছন-পিছন। আপনি বুঝতে পারেননি। তারপর ঢুকেছিলাম আমি। আপনাদের এই পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আমি পৌঁছে গেছিলাম সে জায়গাতে।’
লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, সম্ভবত সে এই জায়গাতেই আছে।’
অন্ধকারের মধ্যে এগোতে থাকল তারা। প্যাসেজ পেরিয়ে তারা প্রথমে প্রবেশ করল বড় হলঘরের মতো জায়গাতে। মুলার এক ঝলক তার সরু টর্চের আলো ফেললেন ঘরটার চারপাশে। আজও সেখানে সারসার লোহার খাট পাতা আছে। যেমন পাতা থাকে হাসপাতালে। দেওয়াল থেকে খাটগুলোর গায়ে ঝুলছে মরচেপরা লোহার শিকল। লুবেনেস্কি ফিস ফিস করে বললেন, ‘যাদের ওপর মেডিক্যাল হাউসে বীভৎস সব পরীক্ষা চালানো হত তাদের এই খাটগুলোতে রাখা হত। দেওয়ালের শিকলগুলো দিয়ে তাদের অনেকের পা বাঁধা থাকত। আমিও এ ঘরে একদিন ছিলাম।’
একই রকম বেশ কয়েকটা ঘর এরপর ধীরে-ধীরে পেরিয়ে হঠাৎ এক জায়গায় থেমে গেল তারা। সামনে একটা দরজা। তারপর একটা সরু প্যাসেজ। আর তার ঠিক ওপাশের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে যেন একটা আবছা আলো বাইরে আসছে। মুলার বললেন, ‘হ্যাঁ, সে ও ঘরেই আছে। হঠাৎ সবাই মিলে একসঙ্গে ঢুকে পড়ব ঘরে। যাতে সে পালাতে না পারে।’
পরিকল্পনা মতো এরপর সবাই প্যাসেজটা দ্রুত পেরিয়ে একসঙ্গে ঢুকে পড়ল সেই ঘরটাতে। লম্বাটে একটা ঘর। তার দেওয়ালের গায়ের তাকগুলো জুড়ে অসংখ্য বড় বড় কাচের জার রাখা আছে। মাটিতেও রাখা আছে বেশ কিছু বড়-বড় জালার মতো কাচের জার। ঘরের শেষপ্রান্তে একটা ডেস্ক। তার ওপর একটা বড় মোম রাখা আছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের কিছু অংশে। জারগুলোর দিকে ভালো করে তাকাতেই চমকে গেল দীপাঞ্জন আর জুয়ান। তাতে ফর্মালিনের দ্রবণে চোবানো আছে মানুষের মাথা, হাত-পা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। নিশ্চয়ই সেগুলো সেই হতভাগ্য বন্দিদেরই হবে। যাদের এই মেডিকেল ক্যাম্পে এনে পরীক্ষা চালানো হত। কিন্তু যার খোঁজে এ ঘরে আসা হল সে কই?
মুলার কয়েক-পা এগিয়ে চারপাশে তাকিয়ে বললেন, ‘রেনেট, তুমি কোথায়? বেরিয়ে এসো। তুমি ধরা দিলে কোনো ক্ষতি হবে না।’
কয়েক মুহূর্ত কোনো জবাব মিলল না। তারপর ডেস্কের আড়াল থেকে একটা মাথা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর সে জায়গা ছেড়ে ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল ডায়না!
মুলারের উদ্দেশে সে বলল, ‘জার্মান হয়ে এই নোংরা পোলিশ আর কালো চামড়ার লোকগুলোকে সঙ্গ দিতে তোমার লজ্জা হচ্ছে না?’ মুলার তার কথার জবাব না-দিয়ে বললেন, ‘নিষিদ্ধ ন্যাৎসি সংগঠনে যুক্ত থাকার জন্য, আর খুনের চেষ্টার অভিযোগে আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করছি। সারেন্ডার করো।’
এ কথা শুনে এবার যেন একটু ভয় পেয়ে গেল রেনেট ওরফে ডায়না। সে লুবেনেস্কিকে প্রলোভন দেখাবার চেষ্টা করে বলল, ‘তুমিও জার্মান, আমিও জার্মান। তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দাও। সামান্য পুলিশের চাকরি তোমাকে আর করতে হবে না। তোমাকে আমি রাজা করে দেব। এ ঘর থেকে একটা জিনিস নিয়ে আমরা দুজন চলে যাব। আমরা সত্যিই রাজা হয়ে যাব। আর যাবার আগে এই তিনটে কুকুরকে মেরে ফর্মালিনের জারে চুবিয়ে দেব। কেউ জানতেও পারবে না।’
রেনেট এ কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই মুলার ধমকে উঠে বললেন, ‘আর একটা কথা বাড়ালে এখনই গুলি চালাব তোমার পায়ে। রাজা-রানি হবার স্বপ্ন তো পরের কথা। জীবনে আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না। আমি ঠিক পাঁচ পর্যন্ত গুনব। তারপর গুলি চালাব। এবার সত্যি ফ্যাকাশে হয়ে গেল রেনেটের মুখ। মুলার গুনতে শুরু করলেন—‘এক-দুই…।’
তিনি তিন পর্যন্ত গুনতেই রেনেট বলল, ঠিক আছে। গুলি চালিও না। আমি ধরা দিলাম। এই যে মাটিতে শুয়ে পড়ছি।’ কথাগুলো বলে ধীরে-ধীরে মাটিতে বসে পড়তে লাগল রেনেট। দীপাঞ্জন আর জুয়ান বিস্মিতভাবে দেখতে লাগল সব কিছু। পুরো ব্যাপারটা এখনও তাদের মাথায় ঢুকছে না।
বসে পড়ে উপুড় হয়ে শোবার জন্য ঝুঁকল রেনেট। মুলারও তার পোশাকের মধ্যে থেকে হ্যান্ডকাপটা বের করতে গেলেন। তার কোমরের বেল্টের সঙ্গে হঠাৎ হ্যান্ডকাপের চেনটা কীভাবে যেন আটকে গেল। মুলার প্রায় ছাড়িয়েও ফেলেছিলেন সেটা। সামান্য দু-তিন মুহূর্তের জন্য রেনেটের ওপর থেকে হ্যান্ডকাপের ওপর দৃষ্টি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অসতর্ক মুহূর্তগুলোকেই কাজে লাগাল রেনেট। হঠাৎই শুয়ে পড়ার বদলে স্প্রিং-এর মতো মাটি ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। মোমের মৃদু আলোতেও তার এক হাতে ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা তীক্ষ্ণ লম্বা ছুরি। তার হাই-হিল বুটে সেটা গোঁজা ছিল। দীপাঞ্জন চিৎকার করে উঠল মুলারকে সতর্ক করার জন্য ঠিকই কিন্তু মুলার গুলি চালাবার আগেই রেনেটের হাতের ছুরিটা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে বিদ্ধ হল মুলারের কাঁধে। তার হাত থেকে রিভলবারটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। টাল সামলাতে না-পেরে মুলার নিজেও ছিটকে পড়লেন দেওয়ালের গায়ে। আর সেই ধাক্কায় দেওয়ালের র্যাক থেকে একটা কাচের বয়াম মেঝেতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। আর তার মধ্যে থেকে একটা কাটামুন্ডু বেরিয়ে এসে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। মুলার মাটিতে পড়ে একটু নড়াচড়া করে স্থির হয়ে গেলেন। তার পোশাক লাল হয়ে উঠেছে। ততক্ষণে রেনেটের হাতে উঠে এসেছে একটা রিভলবারও। সেটা দীপাঞ্জনদের দিকে তাক করে মেয়েটা একটু এগিয়ে এসে প্রথমে মুলারের রিভলবারটা কুড়িয়ে নিজের কোমরে গুঁজল। তার পায়ের কাছেই পড়ে ছিল সেই কাটা মুন্ডুটা। প্রচণ্ড ঘৃণা ভরে সে মাথাটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নোংরা ইহুদি কুকুরের মাথা।’ তারপর ফুটবলের মতো মাথাটাকে লাথি মেরে ঘরের এক কোণে পাঠিয়ে বলল, ‘তোমরা হাত তুলে ঘরের ওই কোণে গিয়ে দাঁড়াও। চালাকি করলে তোমাদের মুন্ডুও এইভাবে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে।’
এই হিংস্র মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ হবে না, বুঝতে পেরে তার নির্দেশ পালন করল সবাই। ঘরের কোণে কাটা মুন্ডুটা যেখানে পড়েছিল সেখানে গিয়ে মাথার ওপর হাত উঁচু করে দাঁড়াল সবাই।
হায়নার মতো জ্বলছে রেনেটের হিংস্র চোখ দুটো। লুবেনেস্কির উদ্দেশে সে এবার বলল, ‘ওই জিনিসটা কোথায় আছে বল্?’ লুবেনেস্কি চুপ করে রইলেন।
রেনেট হিংস্র স্বরে বলে উঠল, ‘কোথায় জিনিসটা রেখেছিস বল? আমার ঠাকুরদা তোর মতো পঞ্চাশটা পোলিশকে একাই গুলি করে মেরেছিলেন এই ক্যাম্পে। তোদের তিনজনকে মারতে আমার কোনো অসুবিধা হবে না।’
লুবেনেস্কি এবার বাধ্য হয়েই জবাব দিলেন, ওই ডেস্কের দেরাজেই একটা কৌটোর মধ্যে রাখা আছে।’
রেনেট, দীপাঞ্জনদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ডেস্কের কাছে গেল। তারপর ডেস্কের দেরাজ টেনে সেটা হাতড়ে একটা কৌটো বের করে মোমের আলোতে সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। সেই দুধের ছোট কৌটোর মতো, সম্ভবত সায়ানাইডের কোনো কৌটো। ঠিক যেমন একটা কৌটো রাখা ছিল লুবেনেস্কির বাড়িতে।
দীপাঞ্জনদের দিকে চোখ রেখেই এরপর রেনেট কৌটোটা নিয়ে পা ঝুলিয়ে বসল ডেস্কের ওপর। রিভলবারটা পাশে নামিয়ে রেখে কৌটোর মুখটা খুলে তার ভিতর থেকে বের করে আনল পকেট ডায়েরির মতো একটা ছোট খাতা। সেটা দেখেই রেনেটের চোখ যেন চকচক করে উঠল। একবার শুধু সে খাতাটা থেকে চোখ তুলে লুবেনেস্কির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটাইতো? চালাকি করলে ফল ভালো হবে না।’ লুবেনেস্কি বললেন, ‘হ্যাঁ। লেখাগুলো একজনকে দিয়ে আমি পাঠও করিয়েছিলাম। দেখো ওর একটা পাতায় আমি জার্মান ভাষায় আসল ফর্মুলাটা লিখেও রেখেছি।’
ধীরে ধীরে পাতা ওলটাতে শুরু করল রেনেট।
হঠাৎ জুয়ান মৃদু খোঁচা দিলেন দীপাঞ্জনকে। ইশারায় তিনি দেখালেন দীপাঞ্জনের পায়ের কাছে পড়ে থাকা সেই কাটা মাথাটা। ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না দীপাঞ্জনের। মাথাটা যদি ছুড়ে মারা যায়…
খাতাটার দিকে তাকিয়ে থুতু দিয়ে তার পাতা উলটে লুবেনেস্কির কথার সত্যতা খুঁজছিল রেনেট। দীপাঞ্জন চকিতে মাটি থেকে তুলে নিল মুন্ডুটা। তারপর সেটা সজোরে ছুড়ে মারল রেনেটকে লক্ষ্য করে। সেটা গিয়ে লাগল তার ঘাড়ে। হঠাৎ আঘাত পেয়ে রেনেট ডেস্ক থেকে মাটিতে পড়ে গেল। দীপাঞ্জন সঙ্গে-সঙ্গে ছুটল তার দিকে। কিন্তু আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা মেয়েটার। দীপাঞ্জন তাকে গিয়ে চেপে ধরার আগেই সে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে গোঁজা মুলারের রিভলবারটা বার করে বলে উঠল, ‘কালো চামড়ার কুকুর! আমাকে মারা অত সহজ নয়। এবার তোরা তিনজন মরবি।’
পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জের মধ্যে দাঁড়িয়ে দীপাঞ্জন। তার আর কিছু করার নেই। রেনেট ধীরে-ধীরে তার রিভলবার তুলছে দীপাঞ্জনের কপাল লক্ষ্য করে গুলি চালাবার জন্য। তার চোখে জমা হয়ে আছে জিঘাংসা, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে হিংস্র হাসি। কোনো মহিলার এত কদর্য মুখ এর আগে দীপাঞ্জন দেখেনি। মুখ নয়, যেন মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি। আর কয়েকটা মুহূর্ত মাত্ৰ…
কিন্তু হঠাৎই যেন রেনেটের হাতটা দীপাঞ্জনের কপাল লক্ষ্য করে উঠেও শেষ মুহূর্তে থেমে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার সেই হিংস্র হাসি মুছে গিয়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার চোখ। রিভলবারটা খসে পড়ল তার হাত থেকে। তারপরই কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গিয়ে স্থির হয়ে গেল রেনেট ওরফে ডায়না। তার বিস্ফারিত চোখ দুটো শুধু চেয়ে রইল সিলিং-এর দিকে। ঠিক যেমন আর কিছুটা তফাতে অজানা কোনো হতভাগ্য মানুষের মাথাও একইভাবে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে।
