৮
পরদিনও কিন্তু খোঁজ পাওয়া গেল না মার্লিনের। বিশ্রী একটা দিন। তারপাশে ঘন কুয়াশায় মোড়া। মার্লিনের খোঁজে বার চারেক ডেকে উঠেছিল ধ্রুব। কিন্তু ঘন কুয়াশায় তিন হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্যে দিয়েই ঘড়ঘড় শব্দে এগিয়ে চলছে জাহাজ। কুয়াশার স্তর এত ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত যে সূর্যের আলোও আসছে না। হাতে ঘড়ি না থাকলে সময়ের তফাত ধরা যাবে না। সারা জাহাজে ‘কোথাও কোনে লোকজনের শব্দ নেই। সবাই নিজের কেবিনে অথবা ফোকসালে শুয়ে বসে এই স্যাঁতসেতে দিনটা কাটিয়ে দিল। রাতে বিছানায় শুয়ে ধ্রুব ভাবতে ভাবতে ঠিক করল পরদিন যে ভাবেই হোক খুঁজে বার করতে হবে মার্লিনকে। সে বেচারা হয়তো মোগাদিসুতে জাহাজ না ভেড়ার কারণে তার পরিকল্পনা বানচাল হওয়ায় মুষড়ে পড়েছে। তাই আর ধ্রুবর সঙ্গে দেখা করতে আসছে না।
কিন্তু পরদিন আর খুঁজতে বেরোতে হল না মার্লিনকে। শেষরাতে দরজায় টোকা দেবার শব্দ শুনে দরজা খুলে ধ্রুব দেখল কম্বল মুড়ি দিয়ে মার্লিন এসে হাজির হয়েছে। মার্লিন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এখন সারা জাহাজ ঘুমোচ্ছে তাই এলাম। জাহাজ কুয়াশায় একাকার। ডেকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।’
ধ্রুব মার্লিনকে দেখে বুঝল, তার চোখে মুখে স্পষ্ট উত্তেজনার ছাপ। সে বলল, ‘কিন্তু কাল সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে?’
মার্লিন জবাব দিল, ‘ডেকেই ছিলাম। তুমি একবার আমার তিনহাত দূর দিয়ে হেঁটে গেছ। কুয়াশায় বুঝতে পারোনি। আমিও ইচ্ছা করে ডাকিনি তোমাকে। দু-রাতে আমি যা খবর সংগ্রহ করেছি, তা শুনে চমকে যাবে তুমি। তবে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। ভয় পেলে বা উত্তেজিত হলে আমরা বাঁচব না।’
এরপর একটু থেমে সে বলল, ‘আজ জাহাজে যারা উঠল তারা হল সত্যি জলদস্যু। আর এদের নেতা হল ম্যাঙ্গকি আর বিয়ার্ড। ম্যাঙ্গকি যখন ওই মোবাইল রিমোট দিয়ে জাহাজটা ডুবিয়ে দিল তখন আমি বড় মাস্তুলের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ডুবন্ত জাহাজটা ছিল ‘ফ্যান্টম জাহাজ।’ ও জন্যই মাঝদরিয়ায় ছিল।’
‘ফ্যান্টম জাহাজ কী?’
মার্লিন বলল, ‘জলদস্যুরা জাহাজ ছিনতাই করে জাহাজের লোকজনকে মেরে, নামিয়ে দিয়ে সে জাহাজের রং, নাম পাল্টে তা নিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। ওই সব ভূতুড়ে জাহাজকে বলে, ‘ফ্যান্টম শিপ।’ দু-বছর অন্তর প্রত্যেক জাহাজকে একবার ড্রাই ডকে নিয়ে যেতে হয় খোল মেরামতির জন্য। কিন্তু ফ্যান্টম শিপের ক্ষেত্রে তা করা যায় না ধরা পড়ার ভয়ে।’
‘কিন্তু ওরা যে সত্যিই জলদস্যু তা তুমি নিশ্চিত হলে কীভাবে?’
মার্লিন উত্তর দিল, ‘ডেকে তো খুব কুয়াশা। আমি আড়ি পেতে বিয়ার্ডের সঙ্গে ওদের কথাবার্তা শুনেছি। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে ঘরের ভিতর ওদের কাণ্ড দেখেছি। যে চারটে বাক্স জাহাজে রাখা হয়েছে, তার মধ্যে তিনটে আছে বিয়ার্ডের ঘরে। কাল রাতে বাক্স খুলে ম্যাঙ্গকি তার ভিতরের জিনিসগুলো ক্যাপ্টেনকে দেখাচ্ছিল। বাক্সগুলো সব স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, আর কার্তুজের বেল্টে ঠাসা। একটাতে আছে রকেট লঞ্চার। ম্যাঙ্গকি সেগুলো দেখিয়ে বিয়ার্ডকে বলছিল, তুমি এগুলো দিয়ে পুরো একটা আর্মি টুপ উড়িয়ে দিতে পারবে। আর ওরা তো সেই পারকাসনের যুগে আজও রয়ে গেছে। মার্লিনকে কথা শেষ না করতে দিয়ে ধ্রুব উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘বিয়ার্ড কি এ জাহাজ নিয়ে কোথাও যুদ্ধ করতে যাচ্ছে নাকি? আমাদের তো এডেনের দিকে যাবার কথা। সেখানে আমার জাহাজ…।’
মার্লিন বলল, ‘আমার এখনো অনেক কথা বলা বাকি। আগে পুরো ব্যাপারটা তোমাকে শোনাই। তৃতীয় সেই সিন্দুকের মতো বাক্সটার কথা তোমাকে বলি। বাক্সটা অন্য বাক্সর থেকে আলাদা করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে ঘরে ব্ল্যাক প্যারোটের ছবি আর সিন্দুক রাখা হয়েছিল, সে ঘরে। তারপর বাক্সর জিনিস সে ঘরে রেখে ঘর তালাবন্ধ করে বাক্সটা বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছিল। বাক্সর ভিতরে খড়ের মধ্যে আমি কী পেয়েছি এই দ্যাখো—‘ এই বলে মার্লিন তার পোশাকের ভিতর থেকে বার করল ছোট্ট এক পাটি জুতো। ‘পরে অবশ্য বাক্সটা আবার আগের জায়গাতেই রাখা হয়েছে।’
‘জুতো!’ অবাক হয়ে গেল ধ্রুব।
মার্লিন বলল, ‘ঘণ্টা চারেক আগে ক্যাপ্টেনের ঘরের বাইরে আড়ি পেতে আমি শুনলাম, বিয়ার্ড বলছিল, ‘এত খরচ করে জাহাজটাকে এমনভাবে সাজিয়েছি, যা দেখিয়ে আমি ওদের বলতে পারি যে এই সেই জাহাজ, এই সেই সিন্দুক, এ সবই হল ব্ল্যাক প্যারোটের বংশধর হিসাবে আমার প্রমাণ। তাছাড়া তোমার পূর্বপুরুষের সিন্দুকে এখন যে ঘুমোচ্ছে তার দাম ওই এক সিন্দুক টাকার চেয়ে কম হবে না। অ্যাডমিরালটা খুব জ্বালিয়েছে এ ক বছর, আমার তিনটে ফ্যান্টম শিপ লোকসুদ্ধু ডুবিয়ে দিয়েছে। আগে মুক্তিপণের টাকাটা পেয়েনি, তারপর সিন্দুকসুদ্ধ ওকে মাঝসমুদ্রে ভাসিয়ে দেব।’
মার্লিনের কথা শুনে চমকে উঠে ধ্রুব বলল, ‘তার মানে সেই অ্যাডমিরালের ছেলে এ জাহাজে সিন্দুকের মধ্যে আছে। পুরো ব্যাপারটা যতটুকু যা জেনেছ গুছিয়ে বলো আমাকে।’
মার্লিন বলল, ‘ব্যাপারটা যতটুকু আমি বুঝতে পেরেছি তা হল এই যে, ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গিক দুই জলদস্যুর বংশধর মিলে তাদের পূর্বপুরুষের গুপ্তধন উদ্ধার করতে যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের পেশা এখনও তারা ছাড়তে পারেনি। সোমালিয়া দরিয়ায় জলদস্যুতা চালায় তারা। ওদের কথাবার্তায় জেনেছি যে অ্যাডমিরাল উইলিয়ামের সঙ্গে ইতিপুর্বে একবার সংঘর্ষ হয়েছিল বিয়ার্ডের। কোনোমতে কুয়াশার সুযোগ নিয়ে সেবার পালিয়েছিল সে। এবার নতুন ভেক ধরে বছর তিন পর ফিরে এসেছে সে দুটো কারণে। গুপ্তধন উদ্ধার ও উইলিয়ামকে শিক্ষা দেবার জন্য। মনে ভয় থাকার জন্যই ডেস্ট্রয়ার দেখে গালাচ্ছিল সে। তার সৌভাগ্য, আগেরবার তার দাড়ি থাকা অবস্থায় তাকে দূর থেকে দেখেছিলেন উইলিয়াম। এবার তিনি তাকে চিনতে পারেননি। বিয়ার্ডের পরামর্শ মতোই অ্যাডমিরালের ছেলেকে হাইজ্যাক করেছে ম্যাঙ্গকি। তবে ঠিক কি কৌশলে তা জানতে পারিনি।’
‘তাহলে আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’ জানতে চাইল ধ্রুব।
মার্লিন জবাব দিল, ‘আমরা এখন সোজা দক্ষিণে যাচ্ছি। সূর্য উঠলে তুমি বুঝতে পারতে আগের মতোই সূর্য আমাদের যাত্রাপথের বাঁদিক থেকে উঠছে, আর ডুবছে যেদিকে ডাঙা, সেদিকে। আমরা ফেরার পথ ধরলে ব্যাপারটা উল্টো হত। সম্ভবত আমাদের গন্তব্য সেসেজের কোনো দ্বীপ।’ কথাগুলো বলে মার্লিন মৃদু হাসল।
ধ্রুব একটু তিরস্কারের ঢঙে বলল, ‘এরকম ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে তুমি হাসছ?’ মার্লিন বলল, ‘হাসছি, ভাগ্য আমাদের কীভাবে চালিত করছে তাই দেখে। যেখানে যাবার জন্য জাহাজ থেকে পালাব ভাবছিলাম এ জাহাজ সেখানেই যাচ্ছে। আর তোমার তো এ জাহাজে আসার কোনো কথাই ছিল না। এও এক অদৃষ্টের ব্যাপার! তবে শেষ পর্যন্ত আরও কী ঘটবে কে জানে? ওরা আলোচনা করছিল সে রকম বুঝলে আমাদের দুজনকে সমুদ্রে ফেলে দেবে।’
‘তাহলে এখন আমরা কী করব?’
‘মাথা ঠান্ডা রেখে ওই দ্বীপে নামা পর্যন্ত ওদের কথামতো কাজ বা কাজ করার অভিনয় করে যেতে হবে। আর চেষ্টা করতে হবে বাচ্চা ছেলেটাকে বাঁচাবার। দ্বীপে নামার পর দেখা যাক কী হয়?’
ধ্রুব জানতে চাইল, ‘আমরা যে দ্বীপে যাচ্ছি সে দ্বীপে কি লোকজন পাওয়া যাবে? তাহলে নয় তাদের সাহায্য নিয়ে কিছু করা যেতে পারে।’
সে বলল, ‘যতটুকু শুনেছি তাতে প্রসেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া, মাহে, আরা, প্রসলিন সংলগ্ন দ্বীপগুলো ছাড়া অধিকাংশ দ্বীপে কোনো জনবসতি নেই। যারা এসব দ্বীপে থাকে তারা অধিকাংশই আফ্রিকান বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তাদের পূর্বপুরুষদের ক্রীতদাস হিসাবে ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে আমি একটা বইতে পড়েছি যে ওই দ্বীপপুঞ্জে কয়েকটা এমন দ্বীপ আছে যেখানে জলদস্যুদের বংশধররাই শুধু থাকে। তাদের জীবনযাত্রা এখনো নাকি তিনশো বছর আগের যুগেই রয়ে গেছে। পোশাক, ভাষা সবকিছুই সে যুগের তারা অন্য দ্বীপের আধুনিক মানুষদের সঙ্গে মেশে না। তবে তাদের সম্বন্ধে কোনো পক্ষের অভিযোগ নেই। পূর্বপুরুষদের পেশা ছেড়ে দিয়ে তারা চাষবাস নিয়ে থাকে। উপকুল সংলগ্ন অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরে বেড়ায়। ওদের কথাবার্তা শুনে আমার ধারণা, সে রকমই কোনো দ্বীপে যাচ্ছে বিয়ার্ডরা।’
ধ্রুব আর মার্লিন এরপরও আরও কিছুক্ষণ পরামর্শ করে নিল। তারপর আলো ফোটার আগেই মার্লিন ফিরে গেল ডেকে।
কুয়াশা কাটতে আরও একদিন সময় নিল। তার পরদিন সকালে ঝলমলে রোদ উঠল। ধ্রুব ডেকে উঠে দেখল তিনদিন দমবন্ধ করা কুয়াশার পর সবাই ডেকে হাজির। ম্যাঙ্গকির সঙ্গীরা সাধারণত কেবিন ছেড়ে বেরোয় না, তারাও উপস্থিত। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকি জাহাজের ব্রিজে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে চোখ রেখে কথা বলছিল। মার্লিন হালের বড় চাকাটার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ধ্রুবকে দেখে, বিয়ার্ডদের দেখিয়ে ইশারা করল সে। মার্লিনের সঙ্গে একটা পরামর্শ আগেই করা, সেই মতো ধ্রুব এগোল বিয়ার্ডদের দিকে। কাছে যেতেই ‘একটা কথা কানে এল তার। বিয়ার্ড বলছে, ‘আসলে ওই কচ্ছপের খোলটা যদি সঙ্গে থাকত তবে আর চিন্তা ছিল না। কারণ কচ্ছপের খোলটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাণ চিহ্ন।’
আর তারপরেই ধ্রুবর পায়ের শব্দে ফিরে দাঁড়াল দুজন।
ধ্রুব বিয়ার্ডকে বলল, ‘আপনার সঙ্গে বিশেষ কথা ছিল।’
‘কী কথা?’
ধ্রুব বলল, ‘এতদিন কুয়াশা ছিল বলে বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ সূর্য ওঠার পর দেখছি, জাহাজ তো দক্ষিণ দিকেই যাচ্ছে। এটা তো মোগাদিসুর রাস্তা নয়।
বিয়ার্ড প্রথমে গম্ভীর হয়ে গেল, ‘তারপর বলল, হ্যাঁ, অন্য দিকেই যাচ্ছি। আমার বিশেষ কাজ আছে অন্যত্র। কেন আপত্তি আছে আপনার?
ধ্রুব প্রথমে গম্ভীরভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, তা থাকার কথা। আপনি আমাকে আমার জাহাজে তুলে দেবেন বলেছিলেন? তবে পারিশ্রমিক যদি পাই, তবে এ জাহাজে থাকতেও আমার আপত্তি নেই। আসল ব্যাপারটা স্যার হল গিয়ে টাকা। যে জাহাজেই যাই না কেন মশাই সবই তো টাকার কথা। টাকা দিলে আমার আপত্তি নেই। তার ওপর দেশে এই মুহূর্তে ফেরা সমস্যাও আছে। ওখানে একটা গন্ডগোল…।’
টাকা পেলে ধ্রুব থাকতে রাজি শুনে বিয়ার্ডের গম্ভীর ভাবটা কেটে গেল। ঠোটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, ‘সমস্যা কেন? কী গন্ডগোল?’
একটু ইতস্তত ভাব দেখিয়ে বলল, কাউকে বলবেন না স্যার, বিশ্বাস করে আপনাদের বলছি। মুম্বাই বন্দরে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছি। জাহাজ বন্দর ছাড়ার আগেরদিন রাতে রাগের মাথায় এক সারেঙের মাথায় ডান্ডা দিয়ে বাড়ি মেরেছিলাম। লোকটা মরে যাবার পর তার লাশটা একটা পিপের মধ্যে লুকিয়েও ছিলাম। কিন্তু জাহাজ মাঝসমুদ্রে আসার পর আমার এক পরিচিত লোক ওয়ারলেসে জানিয়েছে যে পুলিশ নাকি লাশটা পেয়েছে, ও খুনের ব্যাপারেই আমাকে সন্দেহ করছে।’ বেশ নাটকীয়ভাবে বানানো কথাগুলো বলল ধ্রুব। খুনের কথা শুনেই নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি হল বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকির।
ম্যাঙ্গকি ধ্রুবকে বলল, ‘আপনাকে দেখে কিন্তু বোঝাই যায় না আপনি মানুষ খুন করতে পারেন। তা খুনটা করলেন কেন?’
ধ্রুব জবাব দিল, ‘টাকা পয়সা সংক্রান্ত ব্যাপার। একটা জাহাজ থেকে কিছু গোল্ড বিস্কুট তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ম্যাঙ্গকি বলল, ‘ও বুঝেছি। আপনি তো দেখছি এলেমদার . লোক। তা টাকা পয়সার জন্য দু-একটা খুন করাই যেতে পারে, কী বলো বিয়ার্ড?’
এরপর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তারা। ধ্রুবর মনে হল তার বানানো গল্প শুনে কিছুটা হলেও ধন্দে পড়েছে বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকি।
এরপর বিয়ার্ড বললেন, ‘দেখুন, আপনি কোথায় কী করেছেন সেসব ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ নেই। আপনার ক্ষতি করতে চাই না আমরা। বরং আপনি রাজি থাকলে ইংল্যান্ডের কোনো বন্দরে আপনাকে নামিয়ে দেব। নাম ভাড়িয়ে আপনি যাতে অন্য জাহাজে কাজ করতে পারেন তার ব্যবস্থাও করব। এ জাহাজে যতদিন থাকবেন তার জন্য পয়সাও পাবেন। তবে শর্ত একটাই, আশা করি আপনার জন্য আমাদের কাজের কোনো ব্যাঘাত হবে না?’
ধ্রুব বলল, ‘না, ব্যাঘাত হবে না। আর দয়া করে খুনের ব্যাপারটা জাহাজের অন্যদের কাছে গোপন রাখবেন।’
ম্যাঙ্গকি মৃদু হেসে বলল, ‘আপনার মতো খুনে জাহাজি এদিককার প্রত্যেক জাহাজেই দু-একজন করে পাওয়া যায়। ব্যাপারটা আপনি নিজে পাঁচকান না করলেই হল।’
বিয়ার্ড বলল, ‘ঠিক আছে আপনি এখন যান। কখনো প্রয়োজন হলে ডাকব আপনাকে। ধ্রুব তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে এগোল অন্যদিকে।
বেশ ক’টা দিন কেটে গেল। ইতিমধ্যে মার্লিন একদিন এসে খবর দিল ধ্রুবর বলা গল্পটা নিয়ে নাকি সত্যি ধন্দে পড়েছে বিয়ার্ডরা। ম্যাঙ্গকির ইচ্ছা ধ্রুবকে প্রলোভন দেখিয়ে দলে টানা। তবে বিয়ার্ড আরও সাবধানে এগোতে চায়। আড়াল থেকে তাদের আলোচনা শুনেছে মার্লিন। তবে এই মুহূর্তে ধ্রুবকে নিয়ে খুব একটা ভাবছে না। তারা দ্বীপে নেমে কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় সেটা নিয়েই ভাবিত তারা। গুপ্তধন কোথায় আছে তা সঠিক জানা নেই তাদেরও। দ্বীপেরই কোনো লোকের কাছ থেকে তারা জানার চেষ্টা করবে। আরও একটা খবর বলল মার্লিন, দরজার ফুটো দিয়ে মার্লিন একদিন সিন্দুক ঘরে বাচ্চা ছেলেটাকে দেখেছে। বছর দশেকের বাচ্চা একটা ছেলে। ম্যাঙ্গকি প্রতি রাত্রে ছেলেটাকে খাবার দেবার জন্য সে ঘরে একবার ঢোকে। অন্যসময় তাকে আটকে রাখা হয় ব্ল্যাক প্যারোটের বিরাট সিন্দুকে।
অবশেষে একদিন বিয়ার্ডের ঘরে ডাক এল ধ্রুবর। ঘরে উপস্থিত বিয়ার্ড, ম্যাঙ্গকি আর ফক্স। বিয়ার্ড তাকে বলল, ‘সম্ভবত কালই আমরা গন্তব্যে পৌঁছব। তবে যেখানে যাচ্ছি, সে মাটিতে পা রাখার আগে ক’টা কথা জানিয়ে দিই। দ্বীপটা একসময় ছিল জলদস্যুদের আড্ডা। যারা সেখানে বাস করে রক্তে তাদের নৃশংসতা মিশে আছে। সেখানে যদি কোনো গন্ডগোল হয়, আশাকরি আপনার সাহায্য আমরা পাব? দ্বীপে নেমে একসঙ্গেই সবাই থাকব। আর আপনাকেও এই পোশাক পরিবর্তন করে প্রাচীন জলদস্যুদের পোশাক পরতে হবে। তারা আধুনিক পোশাক পছন্দ করে না।’
ধ্রুব বলল, ‘আপনি যেমন বলবেন তেমনই হবে। আচ্ছা কোন্ দ্বীপে যাচ্ছি আমরা?’ একটু চুপ করে থেকে বিয়ার্ড জবাব দিলেন, ‘সেসেজ দ্বীপপুঞ্জের নাম শুনেছেন? তারই একটা দ্বীপে।’
এরপর আরও কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন বিয়ার্ড কিন্তু হঠাৎই প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জাহাজের গতি কমে গেল। কী হল ব্যাপারটা? জাহাজ কোনো ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেল নাকি? কথা থামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সবাই ডেকে বেরিয়ে এল। দুজন মাল্লা, ডেক সারেঙ আর মার্লিন ডেকের রেলিঙে ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছে। ধ্রুবরাও জলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাঝসমুদ্রে সাধারণত ঢেউ থাকে না, কিন্তু তাদের জাহাজের চারপাশ ঘিরে অসংখ্য ছোট ছোট ঢেউ ভাঙছে। জলতলের ওপরে একটা হলদেটে আভা উঠে এসেই পরক্ষণেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে। অতিকায় কচ্ছপ সব! সংখ্যায় অগুনতি। ছন্দোবদ্ধভাবে পিঠ জলের উপরিভাগ ছুঁয়ে উঠছে নামছে। তাই হলদেটে আভা। এ দৃশ্য কোনো দিন ধ্রুব দেখেনি। ইতিমধ্যে জাহাজ থেমে গেছে। ডেক সারেঙ বলল, এই এপ্রিল মাস নাগাদ, হাজারে হাজারে কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে যায়। এদের মধ্যে দিয়ে ছোট জাহাজ চালাতে হলে তাদের শক্ত খোলে ধাক্কা খেতে খেতে প্রপেলার ভেঙে যাবে। তাই জাহাজ থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজকে কিছুটা কোনাকুনিভাবে অতিক্রম করছে সেই কচ্ছপের ঝাঁক। বেশ অনেকটা সময় লাগল। কচ্ছপের ঝাঁকের সে জায়গা পেরোতে। তারপর জাহাজ আবার চলতে শুরু করল।
