১১
জাহাজে উঠে নিজের কেবিনে চলে গেছিল ধ্রুব। বিকেল নাগাদ মার্লিন ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বলল, ওপরের ডেকে সাজো সাজো রব। সেই অস্ত্রভর্তি বাক্সগুলো বিয়ার্ডের ঘরের বাইরে বার করা হয়েছে। ম্যাঙ্গকির অনুচরেরা সে সব অস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে। ভয়ঙ্কর সব জিনিস। পিস্তল, অটোমেটিক রাইফেল, রকেট লঞ্চার আরও কত কী আর কোনো গোপনীয়তার ব্যাপার নেই বিয়ার্ড-ম্যাঙ্গকিদের। সব কাজই খোলাখুলি হচ্ছে। ভয়ঙ্কর একটা কাণ্ড হবে আজ রাতে। আরও একটা কথা আছে। সেই বাচ্চা ছেলেটাকে আজ কিছুক্ষণের জন্য নিচের সিন্দুক ঘর থেকে বার করে ওপরে তোমার রেডিও রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনেকগুলো চোখের সামনেই রেডিও মারফত অ্যাডমিরাল উইলিয়ামসের সঙ্গে কথা বলানো হল বাচ্চাটার। তারপর বিয়ার্ডের নির্দেশে ফক্স অ্যাডমিরালের কাছে দশলক্ষ পাউন্ড মুক্তিপণ দাবি করল। একমাসের মধ্যে সেসেজের কোনো একটা দ্বীপে তাদের নির্দেশমতো টাকাটা তুলে দিতে হবে। ঠিক কী ভাবে, কখন, কোন্ জায়গাতে টাকাটা বিয়ার্ডরা নেবে সেটা পরে অ্যাডমিরালকে জানিয়ে দেওয়া হবে। বিয়ার্ডরা ঠিক করেছে এ দ্বীপের দখল নিয়ে গুপ্তধন উদ্ধারের পর তারা দ্বীপেই কিছুদিন থাকবে। ছেলেটাকে লুকিয়ে রাখার পক্ষে এসব আদর্শ জায়গা। মুক্তিপণ হাতে পেলে তারপর তারা পালাবে অন্যদিকে।’—একটানা অনেকগুলো কথা বলে মার্লিন থামল।
ধ্রুব বলল, ‘আমরা কী করব এখন। যা দেখছি রক্তপাত ঘটবেই। ওদিকে শুনলে তো রাজা তার সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত রাখতে বলেছিলেন। সংঘর্ষ নিশ্চিত।’
মার্লিন বলল, ‘বিয়ার্ডের নির্দেশ, সবাইকে দ্বীপে নামতে হবে আজ রাতে।’
‘তাহলে, আমরাও কি দ্বীপবাসীদের হত্যালীলায় শামিল হব নাকি। দ্বীপবাসীরা জলদস্যুর বংশধর হলেও তাদের সৎ বলেই মনে হয়েছে আমার।’
মার্লিন বলল, আমার একবার মনে হয়েছিল, কচ্ছপের খোলটা বিয়ার্ডের হাতে তুলে দিলে হয়তো যুদ্ধ আটকানো যাবে। কিন্তু বিয়ার্ড সেটা হাতে পেলে আমার জীবন বিপন্ন হতে পারে। কচ্ছপের খোলটা আমার কাছে কেন—সে সন্দেহে ওরা আমাকে খুন করতে পারে। তাছাড়া বাচ্চাটার কথাও ভাবতে হবে। মুক্তিপণ পেলেও ওরা তাকে মেরে ফেলবে।
‘তাহলে?’
মার্লিন বলল, ‘আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। জাহাজ থেকে আমরা সবার সঙ্গে নামব ঠিকই, কিন্তু জঙ্গলের অন্ধকারে সরে পড়ব আমরা। তারপর জাহাজে ফিরে এসে বাচ্চা ছেলেটাকে মুক্ত করে সমুদ্রে নৌকা ভাসিয়ে দেব।’
কিন্তু নৌকা ভাসিয়ে কোথায় যাবে? আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড তো এখান থেকে দেড় হাজার মাইল হবে।’
মার্লিন বলল, ‘চেষ্টা করব দক্ষিণে মাদাগাস্কারের দিকে যাবার। অথবা ভাগ্য যেখানে নিয়ে যাবার সেদিকে যাব।’
কিন্তু তোমার গুপ্তধনের ব্যাপারটা কী হবে?’
মার্লিন শুনে হেসে বলল, ‘যা দেখছি, সেটা পাবার সম্ভাবনা আমার নেই। এখন কোনোরকমে নিজেদের প্রাণরক্ষার চেষ্টা করাটাই আসল কাজ।’
ধ্রুব বলল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। এদের সঙ্গে থাকলে হয় এদের হাতে মরতে হবে। নইলে কোনো দেশের পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফাঁসি যেতে হবে। এতকিছু জেনে যাবার পর বিয়ার্ড আর আমাদের ছাড়বে না।’
অন্য পথ আর খোলা নেই। এ জাহাজ ত্যাগ করে সমুদ্রেই ভেসে যেতে হবে। তাতে যা হবার তাই হবে। কাজেই কিছুক্ষণের মধ্যে তারা এ পরিকল্পনাই ঠিক করে নিল। মার্লিন এরপর এগোল ডেকে যাবার জন্য। সেখানে না গেলে আসল খবর পাওয়া যাবে না।
একটু পরই অবশ্য ধ্রুবর ওপরে ডেকে ক্যাপ্টেনের ঘরে ডাক এল। সে ঘরে বিয়ার্ড, ম্যাঙ্গকি, ফক্স সবাই উপস্থিত। বিয়ার্ড ধ্রুবর হাতে একটা রিভলভার তুলে দিয়ে বলল, ‘আজ রাতে দ্বীপে নামব আমরা। তখন এটা কাজে লাগবে। কাজ মিটলে ফেরত নেব।’
ম্যাঙ্গকি দাঁত বার করে হেসে বলল, ‘দেশে তো একটা মানুষ খুন করেইছেন। আজ রাতে দেখি কটা করতে পারেন? একজনকে মাটিতে ফেললে তার জন্য আমি আপনাকে একশো পাউন্ড পুরস্কার দেব কথা দিচ্ছি। অবশ্য আমার সোমালি সঙ্গীরা যদি আপনার জন্য কাউকে অবশিষ্ট রাখে তবেই আপনার সুযোগ আসবে। মানুষ না মারলে টাকা রোজগার করা যায় না।’
ম্যাঙ্গকির এ রসিকতায় ক্রুর হাসি ফুটে উঠল বিয়ার্ড আর ফক্সের মুখে। ধ্রুবর মনে হচ্ছিল তাদের দিকে গুলি চালিয়ে দিতে পারলেই ভালো হয়। কিন্তু সে মনের ভাব গোপন করে তাদের আস্থা অর্জনের জন্য ম্যাঙ্গকিকে বলল, ‘আপনি তা হলে আমার জন্য পাঁচশো পাউন্ড রেডি রাখুন।’ কথাগুলো বলে সে বেরিয়ে গেল।
বিকেল হল একসময়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যাও নামল। চারপাশ ঢেকে গেল অন্ধকারে। তারপর দ্বীপের মাথায় যখন চাঁদ উঁকি দিল তখন ঘণ্টি বাজিয়ে সবাইকে ডেকে উঠে আসার সংকেত দিল বিয়ার্ড। তৈরিই ছিল ধ্রুব। সে ডেকে উঠে এল। রেলিং-এর গায়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। ম্যাঙ্গকির সঙ্গীদের গলায় ঝুলছে চওড়া কার্তুজের বেল্ট। হাতে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। কারও কাঁধে রকেট লঞ্চার। তাদের চোখগুলো হিংস্র পশুর মতো জ্বলছে। অন্যরাও নানা অস্ত্রে সজ্জিত। অন্তত একটা তরোয়াল আছেই। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ম্যাঙ্গকি আর ফক্সকে নিয়ে উপস্থিত। কিছুক্ষণ পর বিয়ার্ড সবাইকে লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে বলল। লাইন হলে সবার নাম ধরে ডেকে গুনতি শুরু করল। ধ্রুবও ডাকে সাড়া দিল। কিন্তু মার্লিনের নাম ধরে তিনবার ডাকার পরও সাড়া মিলল না। সে ডেকে নেই। বিয়ার্ড বেশ রুষ্ট স্বরে ফক্সকে বলল, ‘দেখো গর্দভটা কোথায়? ওকে খুঁজে আনো।’
মেট ফক্স তাকে খুঁজতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মার্লিন পা-জামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে ওপরে উঠে এল। বিয়ার্ড তাকে ধমকে বলল, ‘এতক্ষণ নিচে কী করছিলে?’
মার্লিন জবাব দিল, ‘আমার একটু ইয়ে পেয়েছিল।’
তার কথা শুনে মৃদু একটা হাসির রোল উঠল লাইনে। যাই হোক সে লাইনে দাঁড়াবার পর আবার গোনা শুরু হল। সে কাজ শেষ হবার পর ক্যাপ্টেন বোটডেক থেকে নৌকো নামাবার নির্দেশ দিলেন। মার্লিনসহ নাবিকরা লেগে গেল সেই কাজে। ডেকে দাঁড়িয়ে ধ্রুব তাকাল সেই দ্বীপের দিকে। গোল থালার মতো বড় চাঁদ উঠেছে দ্বীপের আকাশে। তার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে জঙ্গলের মাথায়, বেলাভূমিতে। যেন একবুক রহস্য নিয়ে দাঁড়িয়ে সেই দ্বীপ! নৌকো নেমে গেল। বিয়ার্ডের নেতৃত্বে জাহাজ থেকে নেমে সবাই চড়ে বসল তাতে। ধ্রুব দেখল, দুজন লোক শুধু নামল না। মেট ফক্স আর মাস্তুল সারেঙ। সার বেঁধে দাঁড় টানতে টানতে সন্তর্পণে নৌকাগুলো এগোল চন্দ্রালোকিত বেলাভূমির দিকে।
দ্বীপের মাটিতে পা রাখল সকলে। কেমন যেন ছমছমে ভাব সামনের জঙ্গলে। যেন অশুভ কিছুর প্রতীক্ষায় আছে এ দ্বীপ। বিয়ার্ড-ম্যাঙ্গকি প্রথমে ম্যাঙ্গকির অনুচরদের নিয়ে জঙ্গলে ঢুকল। তারপর তাদের অনুসরণ করল অন্যরা। শেষের দলে ধ্রুব আর মার্লিন। চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না জঙ্গলে। কয়েকটা টর্চ জ্বালিয়ে নিয়েছে বিয়ার্ডরা। তবে আলোর মুখ মাটির দিকে। সেই আবছা আলোর রেশ অনুসরণ করে সামনে এগোচ্ছে ভূতের মতো অন্ধকারে ডুবে থাকা অন্যরা। জঙ্গলের মাঝামাঝি এসে মার্লিন ধ্রুবর হাতে চাপ দিল। ধ্রুব সঙ্গে সঙ্গে পাশের একটা গাছের গুড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে গেল। মার্লিন ও দাঁড়িয়ে গেল। এত অন্ধকারে তাদের কারও লক্ষ করার কোনো প্রশ্ন নেই। সমস্যা শুধু একটাই। মার্লিনের কাঁধের পাখিটা যদি ডেকে ওঠে। তবে শেষপর্যন্ত তেমন কিছু ঘটল না। বিয়ার্ডের টর্চের আলো আর লোকজনের পদশব্দ একসময় হারিয়ে গেল। ধ্রুবরা ফেরার পথ ধরল। যত দ্রুত সম্ভব এগোল তারা।
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ধ্রুবরা একসময় সমুদ্রের তীরে পৌঁছে গেল। তারপর উঠে বসল কিছুক্ষণ আগে রেখে যাওয়া নৌকোগুলোর একটাতে। জাহাজের দিকে তাকিয়ে ধ্রুব বলল, ‘কিন্তু ওখানে তো দুজন আছে। ডেকে উঠলেই তো ধরা পড়ে যাব।’ মার্লিন দাঁড় টানতে টানতে হেসে বলল, ‘সে ব্যবস্থা আমি করেছি। ডেকে উঠব না। নিচের তলার একটা পোর্টহোল আমি খুলে এসেছি। সে পথেই ভিতরে ডুকে ম্যাঙ্গকি যেভাবে বাচ্চাটাকে চুরি করেছিল সেভাবেই বাচ্চাটাকে বার করব। পোর্টহোলটা খুলতে গিয়েই তো লাইনে দাঁড়াতে দেরি হল। সবাই এখন আমার ইয়ে পাওয়ার কথা শুনে হাসছিল তখন মনে মনে আমিও খুব হাসছিলাম।
উত্তেজনার মধ্যেও মার্লিনের কথায় ধ্রুব এবার হেসে ফেলল। সন্তর্পণে দাঁড় টেনে এগোল জাহাজের দিকে।
জাহাজের কাছে পৌঁছে ডেকের রেলিং-এ কাউকে তারা দেখতে পেল না। জাহাজের গায়ে নির্দিষ্ট জায়গাতে নৌকা ভিড়িয়ে পোর্টহোল দিয়ে একে একে ভিতরে ঢুকল দুজন। নিচের তলাতেই সেই সিন্দুক ঘর। লোক দুজনের কেউ আশপাশে আছে নাকি দেখে নিয়ে তারা এগোল সে ঘরের দিকে। প্রথমে মার্লিন, পিছনে ধ্রুব। ঘরের কাছে পৌঁছে তারা দেখতে পেল দরজার পাল্লা বন্ধ থাকলেও সে ঘরে তালা দেওয়া নেই। হয়তো আজ ছেলেটাকে নিচে নামিয়ে আনার পর তালা দিতে ভুলে গেছে তারা। কাজটা তাহলে তাদের পক্ষে আরও সহজ। তালা ভাঙতে হল না। এই ভেবে মার্লিন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল। ঘরের ভিতর একটা মোম জ্বলছিল। সেই আলোতে ব্ল্যাক প্যারোটের বন্ধ সিন্দুকের ওপরে বসেছিল একজন। মার্লিন ঘরে ঢুকতেই সে লাফিয়ে উঠে মুখোমুখি দাঁড়াল। মেট ফক্স। পাহারা দিচ্ছে সিন্দুক।
ফক্স মার্লিনকে দেখে বলল, ‘তুমি এখন এ ঘরে!’ তারপর বলল, ‘ও বুঝতে পেরেছি। এই বলে সে সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার খুলে ছুটে এল মার্লিনকে আঘাত করতে। ফক্সকে হঠাৎ দেখে মনে হয় সামান্য ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছিল মার্লিন। সে তাকে প্রতিরোধ করার আগেই ফক্স সজোরে তলোয়ারের কোপ বসিয়ে দিল মার্লিনের মাথায়। তার টুপিটা সঙ্গে সঙ্গে দু টুকরো হয়ে মেঝেতে খসে পড়ল। মার্লিনও ছিটকে পড়ল মাটিতে। তার পাখিটাও ছিটকে পড়ল ঘরের কোণে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুবকে তখনো খেয়াল করেনি ফক্স। মার্লিন স্থির হয়ে পড়ে আছে। মাথায় ওরকম কোপ খেলে কেউ বাঁচে না। ফক্স আবার তলোয়ার হাতে এগোতে থাকল মার্লিনের দিকে। মোমের আলোতে আলো আঁধারি ঘরে ফক্সের মুখটা ঠিক পিশাচের মতো লাগছে। সে এবার ছিন্নভিন্ন করবে মার্লিনের শবদেহটা। কিন্তু, ওর পরমুহূর্তেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠে পিস্তল বার করে ফক্সকে লক্ষ্য করে মার্লিন গুলি চালিয়ে দিল। গুলির শব্দ আর ফক্সের ভয়ঙ্কর আর্তনাদে কেঁপে উঠল ঘর। সিন্দুকের ভিতর থেকে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল বাচ্চাটা। কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল ফক্স। আর সে নড়ল না। মাৰ্লিন ধ্রুবকে বলল, ‘আমার মাথার এই শক্ত কচ্ছপের খোলটাই শেষপর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে দিল। নইলে…।’ মার্লিনের কথা শেষ হবার আগেই তারা ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে কার যেন নেমে আসার ধুপধাপ শব্দ শুনতে পেল। নিচে বন্দুক আর চিৎকারের শব্দ শুনে ছুটে আসছে ডেক সারেঙ। তারা দুজনে সঙ্গে সঙ্গে দরজার দুপাশে পাল্লার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়াল। এ লোকটাকে কাবু করতে অবশ্য বেশি বেগ পেতে হল না। সারেঙের হাতে পিস্তল থাকলেও সে ঘরে ঢুকতেই পিছন থেকে তরোয়ালের ভোঁতা দিক দিয়ে তার মাথায় বাড়ি মারল ধ্রুব। এক বাড়িতেই অজ্ঞান হয়ে গেল সারেঙ। ধ্রুব মার্লিনকে বলল, তুমি মেটকে মেরে ফেললে নাকি?’
মার্লিন ফক্সকে পরীক্ষা করে বলল, ‘কাঁধে লেগেছে। শয়তানের জান ও মরবে না। অজ্ঞান হয়ে গেছে। মার্লিন এরপর তার পাখিটাকে তুলে নিয়ে এগোল সিন্দুকের দিকে।
সিন্দুকের ডালা খুলতেই উঠে বসল একরত্তি সেই ছেলেটা। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার মুখ। আতঙ্কে থরথর করে সে কাঁপছে। ধ্রুব আড়াআড়ি তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘তোমার নাম যে কিড়, তা আমি জানি। ভয় পেও না। তোমাকে আমরা তোমার বাবার কাছে পৌঁছে দেব।’ কিডের আতঙ্ক কিন্তু কাটল না। কোনো কথা না বলে সে ধ্রুবর কোলে কাঁপতে লাগল। ফক্স আর সারেঙের দেহ দুটোকে টেনে এনে এরপর সিন্দুকের মধ্যে ভরে তার ডালা বন্ধ করে দিল মার্লিন। তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার পর মার্লিন ধ্রুবকে বলল, ‘তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি ওপর থেকে এখনই আসছি।’
মিনিট তিনেকের মধ্যেই ফিরে এল মার্লিন। তার সঙ্গে বাক্সর মতো ওয়ারলেস রেডিও সেটটা। মার্লিন বলল, ‘এটা কাজে আসতে পারে বলে নিয়ে এলাম।’ তাছাড়া একটা ছোট বস্তা দেখিয়ে সে বলল, ‘এর মধ্যে কয়েক বোতল জল, দেশলাই, এসব আছে।’ এরপর যে পথে তারা জাহাজে ঢুকেছিল সে পথেই জাহাজ থেকে বেরিয়ে এসে নৌকোতে উঠে বসল তারা। মার্লিন দাঁড় টানতে শুরু করল।
কিন্তু বিপদ তখনও তাদের পিছু ছাড়েনি। তারা জাহাজ থেকে সামান্য এগিয়েছে মাত্র। হঠাৎ তারা দেখতে পেল পাড়ের দিক থেকে কয়েকজন লোকসমেত একটা নৌকো তিরবেগে ধেয়ে আসছে। আর এরপরই সেই নৌকো থেকে টর্চের আলো এসে ছুঁয়ে গেল ধ্রুবদের নৌকো। সম্ভবত শেষপর্যন্ত ধ্রুবদের অনুপস্থিতি টের পেয়ে বিয়ার্ড তাদের পিছু ধাওয়া করতে পাঠিয়েছে লোকগুলোকে। জোরে জোরে দাঁড় টেনে জাহাজের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছে তাদের নৌকোটা। হঠাৎ সেই নৌকো থেকে র্যাট্ র্যাট্ একটা শব্দ ভেসে এল। মার্লিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘শুয়ে পড়ো! শুয়ে পড়ো।’
কিডকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল ধ্রুব। পরমুহূর্তেই তাদের মাথার ওপর দিয়ে সাঁ সাঁ শব্দে বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল গুলির ঝাঁক। সাব মেশিনগান চালাচ্ছে ম্যাঙ্গকির অনুচরেরা। একটা গুলি এসে লাগল দাঁড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সেটা মট করে ভেঙে গেল। আর মনে হয় রক্ষা নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত ভাগ্য সাথ দিল ধ্রুবদের। জাহাজের পাশ কাটিয়ে ধ্রুবদের তাড়া করতে গিয়ে অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে জাহাজের মোটা কাঠিতে ধাক্কা খেল সেই নৌকোটা। তারপর যাত্রীসমেত উল্টে গেল। তাদের চিৎকার কানে এল ধ্রুবদের। গুলি বন্ধ হয়ে গেল। তবুও বেশ কিছুক্ষণ তারা নৌকোতে শুয়ে রইল। ক্রমশ ঢেউয়ের দোলায় দূরে সরে যেতে লাগল ধ্রুবদের নৌকো।
ধ্রুবরা যখন উঠে বসল তখন জাহাজ থেকে সমুদ্রের দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে তারা। অস্পষ্ট হয়ে গেছে। ধ্রুব উঠে বসে বলল, দাঁড়টা তো গেল। এবার কী হবে?
মার্লিন কিছু জবাব দেবার আগেই হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে দুলে উঠল নৌকো। তারপর একবার পাক খেয়ে জোরে ছুটতে শুরু করল। ধ্রুব আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল নৌকো থেকে। কোনোমতে সে সামলে নিল নিজেকে। মার্লিন চিৎকার করে বলে উঠল, শক্ত করে ধরে থাকো। সম্ভবত আমরা কোনো উপকূলীয় চোরাস্রোতের কবলে পড়েছি। আর কিছু করার নেই। এ স্রোত যেখান দিয়ে যাবে সেখানেই যেতে হবে আমাদের।
চন্দ্রালোকিত সমুদ্রে, সমুদ্রস্রোত উল্কার গতিতে অজানা দিকে ধ্রুবদের ভাসিয়ে নিয়ে চলল।
