৪
দীপাঞ্জন আর জুয়ান বাইরে বেরিয়ে এল। চারপাশ নিঝুম। বাইরে চাঁদের আলো যেমন আছে তেমন কুয়াশাও আছে। একটা স্যাঁতসেঁতে ভাব আর কুয়াশা এ দেশের বৈশিষ্ট্য। শেষ বিকাল থেকেই কুয়াশা নামতে শুরু করে এখানে। হাঁটতে শুরু করল দীপাঞ্জনরা। চাঁদের আলো আর কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মতো অন্ধকার খাঁচাগুলো, পরিখা অথবা ফেনসিং দিয়ে ঘেরা উন্মুক্ত জমিগুলো। কেমন যেন এক নিস্তব্ধ-অপার্থিব-অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ খেলা করছে চারদিকে। মাঝে-মাঝে খাঁচাঘরগুলোর অন্ধকারের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে অস্পষ্ট খসখস শব্দ। পরিত্যক্ত খাঁচাগুলোর মধ্যে সম্ভবত ইঁদুর-বাদুড় ধরনের প্রাণী বাসা বেঁধেছে। ওসব তাদেরই শব্দ। হাঁটতে-হাঁটতে জুয়ান বললেন, ‘আমাদের চারপাশে কুয়াশা আর অন্ধকার মাখানো ঘরগুলোতে কত কান্না আর হাহাকার জমা হয়ে আছে কে জানে? তুমি একবার লোকগুলোর কথা ভাব তো, হয়তো কেউ বরফঘেরা হ্রদে মাছ ধরার সন্ধানে ঘুরে বেড়াত, কেউ বা ছিল গভীর অরণ্যের স্বাধীন মানুষ, আবার কেউ হয়তো ঘোড়ায় চেপে ঘুরে বেড়াত দিগন্তহীন প্রান্তরে। সেইসব স্বাধীন মানুষগুলোকে ধরে এনে নিজেদের পরিবার-পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পোরা হয়েছিল এই কয়েদখানায়। যে দুর্ধর্ষ মাসাইরা কেবলমাত্র বর্শা হাতে সিংহশিকার করত বা যে রেডইন্ডিয়ানদের তিরের সামনে বন্দুকধারীরও মাথা নত করতে হত সেই লোকগুলোকেই এখানে মুখ বুজে দর্শকদের লাঠির খোঁচা সহ্য করতে হত। একবার লোকগুলোর মানসিক অবস্থার কথা ভাব।’
চাপা স্বরে কথা বলতে-বলতে এগোতে থাকল তারা।
ঘুরতে-ঘুরতে দীপাঞ্জন আর জুয়ান এক সময় পৌঁছে গেল চিড়িয়াখানার শেষ প্রান্তে সেই কবরখানার কাছে। সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা খেলা করছে জমিটাতে। তার মাঝে ভূতুড়ে অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। সেদিকে তাকিয়ে দীপাঞ্জনদের মনে হল কুয়াশার আড়ালে আবছা কিছু ছায়ামূর্তি যেন ঘোরাফেরা করছে সেই কবরের জমিটাতে জুয়ান বললেন, ‘মনে হচ্ছে মাঠটার ভিতর কেউ আছে।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলুন একবার এগিয়ে দেখবেন নাকি?’
জুয়ান বললেন, ‘চলো। হয়তো ওরা বার্কের লোকজন। কাল ভোরে তো শুটিং শুরু হবে। হয়তো বা তার প্রস্তুতিতে কোনো কাজ করছে।’
দীপাঞ্জনরা এগোল জমিটার দিকে। কুয়াশার চাদর মুড়ে রেখেছে জমিটাকে। তার ভিতর দিয়ে এগোতে-এগোতে দীপাঞ্জনের খালি মনে হতে লাগল অন্ধকার গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে কেউ বা কারা যেন তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। কারা তারা? সেইসব হতভাগ্য মানুষের প্রেতাত্মা নাকি? যাদের কবর দেওয়া হয়েছিল এই জমিটাতে? দূর থেকে ঠিক যে জায়গাতে লোকজন চলাফেরা করছিল বলে দীপাঞ্জনদের মনে হয়েছিল ঠিক সে জায়গাতে পৌঁছে গেল দুজনে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। হয়তো বা সেটা তাদের চোখের ভুল ছিল। দীপাঞ্জনরা আবার ফেরার পথ ধরল। এবার যেন দীপাঞ্জনের খুব বেশি-বেশি করে মনে হতে লাগল যে আশপাশের গাছের আড়াল থেকে, আর কুয়াশার চাদরের আড়াল থেকে কারা যেন লক্ষ করছে তাদের। রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ঠান্ডা আর কুয়াশা যেন আরও বেশি গাঢ় হতে শুরু করেছে। দীপাঞ্জনরা তখন জমিটা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে প্রায়, ঠিক তখনই একটা বেশ বড় পেঁচা কুয়াশা মাখানো চাঁদের আলোতে উড়ে এসে বসল জমিটার প্রবেশমুখে মাটিতে বসানো ক্রশটার ওপর। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল সে। তাকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল তারা। তারপর আবার পা বাড়াল ঘরে ফেরার জন্য। দীপাঞ্জন খেয়াল করল যে পেঁচাটা হঠাৎ কাছেই একটা গাছের গুঁড়ির দিকে তাকাল। আর তারপরই যেন ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে উড়ে গেল চাঁদের দিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অবশ্য পেঁচাটার এভাবে উড়ে যাবার কারণ বুঝতে পারল দীপাঞ্জনরা। গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে একটা লোক। তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপাঞ্জনরা। লোকটা এসে দাঁড়াল দীপাঞ্জনদের সামনে। স্যামসন!
তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন দীপাঞ্জনদের দিকে, তারপর কুয়াশা মাখানো জমিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা দেখতে পেলে তাদের?’
জুয়ান বললেন, ‘কাদের কথা বলছেন আপনি?’
বৃদ্ধ জবাব দিলেন, ‘রেড ইন্ডিয়ান-ইরিগেট-মাসাইদের দলটাকে। মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা…।’
বৃদ্ধের মাথাটা সত্যিই গোলমাল করছে বলে মনে হল দীপাঞ্জনদের। জুয়ান বললেন, ‘না, মাঠে কোনো লোক নেই। আমরা দেখে এসেছি।’
বৃদ্ধ বললেন, ‘আছে, আছে। আমি ক-দিন ধরে প্রতি রাতে দেখতে পাই তাদের। আশেপাশেই আছে তারা।’
দীপাঞ্জন এবার বলল, ‘সম্ভবত কুয়াশা-মাখানো মাঠে চাঁদের আলো আর গাছগুলোর আলো-ছায়ার খেলায় মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে মনে হয়। আমাদের তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু কেউ ওখানে নেই।’
বৃদ্ধ স্যামসন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন দীপাঞ্জনদের দিকে। তারপর বললেন, ‘তোমরা বিশ্বাস করছ না আমার কথা? তবে এটা কী?’—এই বলে তিনি তার জামার ভিতর থেকে একটা জিনিস বার করে সেটা তুলে ধরলেন।
জিনিসটা আট-দশ ইঞ্চি লম্বা বেশ বড় একটা পালক। পালকের মুখটাতে একটা সুতো বাঁধা আছে। সাদা-কালো ডোরাওলা বিরাট পালকটা তিনি চাঁদের দিকে তুলে ধরে বললেন, ‘এটা কীসের পালক জান? ঈগলের পালক। এ পালক রেড ইন্ডিয়ানরা তাদের মাথার সাজে বাঁধত আবার ইরিগেট উপজাতিরাও তাদের মাথার ফেট্টিতে এমন পালক বাঁধত। আমি কত দেখেছি তাদের…।’
জুয়ান প্রশ্ন করলেন, ‘এ পালক আপনি কোথায় পেলেন? যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন এতদিন?’
বৃদ্ধ স্যামসন বললেন, ‘না, ওটা আমার কাছে ছিল না। ইরিগেটদের যেখানে রাখা হত সে জায়গার পরিখার প্রাচীরের গায়ে যে গরাদ ঘরগুলো আছে সেখানে কদিন আগে এ পালকটা কুড়িয়ে পেয়েছি। এ চিড়িয়াখানায় যখন রেড ইন্ডিয়ান, ইরিগেট বা মাসাইদের মতো শক্তপোক্ত বন্দিদের আনা হত তখন তাদের প্রথমে কয়েকদিন ওই গরাদ ঘরগুলোতে আটকে রেখে বশ্যতা স্বীকার করিয়ে তাদের পরিখাঘেরা বা জালঘেরা উন্মুক্ত জায়গাতে ছাড়া হত। ওরা যে এখনও এখানে আছে এই তার প্রমাণ।’
কুয়াশা আরও বাড়ছে। বৃদ্ধ স্যামসনের কথায় কী বলে উঠবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না দীপাঞ্জনরা। বৃদ্ধ এরপর বললেন, ‘ভালো করে দেখো, পালকটার গায়ে রক্তের ছিটে লেগে আছে। কালো হয়ে থাকা জমাট বাঁধা রক্ত। এটা কার মাথার পালক আমি জানি। সেই রেড ইন্ডিয়ান দলপতির মাথার সাজের পালক। যাকে গুলি করে মারল শ্বেতাঙ্গ গার্ডরা?’—একথা বলার পর একটা অদ্ভুত কথা বললেন বৃদ্ধ, ‘ওরা কেন এত বছর পর আবার জেগে উঠেছে আমি জানি। ওরা টিকুটিকুর কবর খুঁজছে।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘টিকুটিকু আবার কে?’
বৃদ্ধ স্যামসন জবাব দিলেন, ‘পিগমি টিকুটিকু।’
দীপাঞ্জনরা হয়তো এ কথা শুনে আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধ স্যামসন তাদের দিকে পিছন ফিরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন কুয়াশা মাখানো কবরের জমিটার দিকে।
কুয়াশার মধ্যে স্যামসনের ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়ে যাবার পর আবার ফেরার পথ ধরল দীপাঞ্জনরা। জুয়ান বললেন, ‘বয়সের ভারেই সম্ভবত মাথা গন্ডগোল করছে ভদ্রলোকের। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। তিনি তাঁর স্মৃতিতে জেগে থাকা চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে দেখছেন।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘কিন্তু ওই ঈগলের পালকটা?’
জুয়ান বললেন, ‘এখানে ঈগল আছে কিনা আমার জানা নেই। হয়তো কাকতালীয়ভাবেই জিনিসটা তার হাতে এসেছে। তারপর মিশে গেছে তার কল্পনার সঙ্গে।’
দীপাঞ্জন আর জুয়ান আলো-আঁধারি মাখা খাঁচাগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে এক সময় পৌঁছে গেল তাদের থাকার জায়গার কাছে। সার-সার বেশ কয়েকটা ঘর। তারা নিজেদের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় ক্যাচ-ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল পাশের ঘরের দরজা। আল মামুন বেরিয়ে এলেন সে ঘর থেকে। চাঁদের আলোতে কেমন যেন ভয়ার্ত দেখাচ্ছে তার মুখ। দীপাঞ্জনদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘ভূত। ভূত! ভূত আছে এখানে! স্যামসন বলে লোকটা ঠিকই বলেছিল।’
আল মামুনের কথা শুনে জুয়ান বিস্মিতভাবে বললেন, ‘তার মানে?’
আল মামুন বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙে গেছিল আমার। নতুন জায়গাতে ঘুমের সমস্যা হয় আমার। একবার ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসতে চায় না। ভাবলাম দরজা খুলে একটু বাইরে দাঁড়াই। দরজাটা খোলার জন্য সবে পাল্লা ফাঁক করেছি ঠিক তখনই ওই যে ওখানে হাত কুড়ি দূরে দেখতে পেলাম তাকে। লম্বা শক্তপোক্ত চেহারা, পরনে ল্যাংগোটের মতো সামান্য একটা বস্ত্র, মাথায় রিবন বাঁধা, আর তার হাতে তলোয়ারের মতো অস্ত্র। তবে সে শ্বেতাঙ্গ নয়—ইরিগেট।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘আপনি ঠিক দেখেছেন?’
আল মামুন বললেন, ‘একদম ঠিক। বেশ ভয় লাগছে আমার।’
হেরম্যান বললেন, ‘আপনার ভয়ের কিছু নেই। সারা দিন আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করেছি তো, হয়তো অন্য কোনো লোককে দেখে দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছে। স্যামসন ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাকে দেখেও হতে পারে। তবে আমরা এখনই চারদিকে ঘুরে এলাম। স্যামসন ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনি। আপনি দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন। কোনো ভয় নেই। পাশের ঘরে তো আমরা রয়েছি। হাঁক দিলেই বেরিয়ে আসব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। জুয়ানদের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলেন ভদ্রলোক। ঘরে ঢুকে তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন। দীপাঞ্জনরাও নিজেদের ঘরে ঢুকে দরজা দিল। প্রফেসর জুয়ান বললেন, ‘এবার যেন ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে মনে হচ্ছে! তুমি দেখলে একজন রেড ইন্ডিয়ানকে, আল মামুন দেখলেন ইরিগেটকে। কবরখানার জমিটাতে দূর থেকে আমারও যেন মনে হচ্ছিল যে কুয়াশার মধ্যে কারা যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে।’
এ কথা বলার পর জুয়ান বললেন, ‘আপাতত শুয়ে পড়া যাক। রাত একটা বেজে গেছে। ভোর পাঁচটাতে উঠতে হবে আবার।’
দীপাঞ্জনরা বিছানায় শুয়ে পড়ল। এবার কিন্তু সত্যিই তাদের চোখে ঘুম নেমে এল।
