ঈগলের পালকে রক্তের দাগ – ৭

জুয়ান ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙতে তিনি দেখতে পেলেন দীপাঞ্জন ঘরে নেই। বাইরে সম্ভবত বিকাল হয়ে গেছে। লোকজনের হাঁকডাকও আবার কানে আসছে। বিকালের শুটিং-এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। হয়তো দীপাঞ্জন সেখানেই আছে। দীপাঞ্জন কোথায় আছে তা জানার জন্য মোবাইলটা নিয়ে তাকে ফোন করতে যেতেই জুয়ান দেখলেন দীপাঞ্জনের দুটো মিসকল হয়ে আছে কিছুক্ষণ আগে। জুয়ান কল করলেন দীপাঞ্জনকে। কিন্তু বার তিনেক রিং হয়েই লাইনটা কেটে গেল। দ্বিতীয় বার জুয়ান আবার যখন দীপাঞ্জনকে ফোন করলেন তখন শুনলেন—‘সুইচড অফ।’ এরপর বার কয়েক তিনি ফোন করলেন কিন্তু প্রতিবারই দীপাঞ্জনের ফোন বন্ধ। কী হল ব্যাপারটা? সেলফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেল নাকি? নাকি সে একেবারে শুটিং স্পটে দাঁড়িয়ে আছে বলে মোবাইল অফ করে দিল!’

কিছুক্ষণের মধ্যে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন জুয়ান। বেলা পড়ে এসেছে। পাহাড়ের মাথার ফাঁক গলে দিনের শেষ আলো এসে পড়েছে চারপাশে। যে জায়গাতে শুটিং-এর কাজ চলছে সে জায়গা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না জুয়ানের। ইউনিটের সবাই সে জায়গাতেই ভিড় করেছেন। জুয়ানের সফর সঙ্গীরাও সেখানে উপস্থিত। শট নেবার মুহূর্ত উপস্থিত। একটা ফেনসিং-ঘেরা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এস্কিমোর পোশাক পরা তুর্গিনেভ। শেষ বিকালের বিদায়ী সূর্যের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। তুৰ্গিনেভ তার মুখে ফুটিয়ে তুলেছেন বিষণ্ণতার অসহায় ভাব। দুটো ক্যামেরা একটা তার এক পাশ থেকে আর অন্যটা মাথার ওপর থেকে সেই বিষণ্ণতার অভিব্যক্তি ধরে রাখার জন্য প্রস্তুত। জুয়ান ভিড়ের মধ্যে চারপাশে তাকিয়ে দীপাঞ্জনকে কিন্তু দেখতে পেলেন না। শুটিং শুরু হল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে শেষও হল। বার্ক বলে উঠলেন, ‘প্যাক আপ।

ফেনসিং থেকে বেরোবার সময় তুর্গিনেভ, জুয়ানকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘পোশাকটা এত গরম যে গায়ে রাখতে পারছি না। শীতের দেশের মানুষ এক্সিমোদের এ পোশাক পরিয়ে কত কষ্ট দেওয়া হত একবার ভাবুন।’ কথাগুলো বলে তুর্গিনেভ তাড়াতাড়ি চলে গেলেন পোশাক পরিবর্তনের জন্য।

কিছু সময়ের মধ্যেই ভিড়টা একটু ফাঁকা হয়ে গেল। পরিচালক বার্ক, কোম্বাটু আর মার্টিন দাঁড়িয়েছিলেন এক জায়গাতে। জুয়ান তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বার্ক হেসে বললেন, ‘যাক, আজকের মতো কাজ শেষ। এ দিনের মতো নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।’

জুয়ান জানতে চাইলেন, ‘আমার সঙ্গী দীপাঞ্জনকে কেউ দেখেছেন?’

মার্টিন বললেন, ‘ঘণ্টাখানেক আগেই প্রবেশ তোরণের কাছে তার সঙ্গে আমাদের তিনজনেরই দেখা হয়েছিল। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।’

জুয়ান কথাটা শুনে বললেন, ‘যাই দেখি সেখানে তাকে পাওয়া যায় নাকি!’

কথাটা শুনে মার্টিন বার্ক আর কোম্বাটুর উদ্দেশে বললেন, ‘আমাদেরও কিন্তু এবার বুড়ো স্যামসনের খোঁজ নেওয়া দরকার। চলুন একবার গিয়ে দেখে আসি তিনি ফিরেছেন কিনা?’

এরপর চারজন মিলে এগোলেন প্রবেশ তোরণের দিকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে চারপাশে কোথাও দীপাঞ্জনকে দেখতে পেলেন না জুয়ান। মার্টিনও প্রবেশ তোরণের লাগোয়া স্যামসনের ঘরে ঢুকে বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘না, স্যামসন নেই। লোকটা কোথায় গেল বলুন তো? আমার বেশ চিন্তা হচ্ছে।’

ঠিক এই সময় প্রবেশ তোরণ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল একটা বড়-বড় কাঠের বাক্স ভর্তি গাড়ি। সেটা থামল জুয়ানদের সামনে। গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল একজন লোক। তারপর জুয়ানদের উদ্দেশে প্রশ্ন করলে, ‘এখানে স্যামসন বলে কেউ আছেন?’

মার্টিন বললেন, ‘হ্যাঁ, সে নামে একজন এখানে থাকেন। কিন্তু তিনি এখন কাছাকাছি নেই। হয়তো বা একটু পরে ফিরে আসবেন। কিন্তু কেন বলুন তো?’

লোকটা বলল, ‘তিনি গাড়িতে রাখা এই বাক্সগুলো আমাকে এখানে আনতে বলেছিলেন। তিনি এগুলো কিনবেন। তাই নিয়ে এসেছি।’

মার্টিন লোকটাকে প্রশ্ন করলেন, ‘বাক্সগুলোতে কী আছে?’

লোকটা জবাব দিল, ‘কিছু না ফাঁকা বাক্স।’

জুয়ানরা একটু অবাক হয়ে গেলেন। বৃদ্ধ স্যামসন এই ফাঁকা বাক্সগুলো দিয়ে কী করবেন?’

সে লোকটা এরপর জানতে চাইল, ‘স্যামসন কখন ফিরবেন এখানে?’

মার্টিন একটু ইতস্তত করে বললেন, ঠিক বলতে পারছি না।’

মার্টিনের কথা শুনে লোকটা বলল, ‘আমি বরং বাক্সগুলো এখানে নামিয়ে রাখি। তারপর অপেক্ষা করি লোকটার জন্য।’

মার্টিন বললেন, ‘স্যামসন যখন বাক্স আনতে বলেছেন তবে তাই করুন।’

লোকটা মার্টিনের এ কথার পর বাক্সগুলো নামাতে শুরু করল। বেশ মজবুত ঢাকনাঅলা কাঠের বিরাট-বিরাট বাক্স। তার গা থেকে চাবিসমেত তালা ঝুলছে। কয়েকটা বাক্স নামানোর পর মার্টিন বললেন, ‘লোকটা তার মতো বাক্স নামানোর কাজ করুক। আমরা বরং স্যামসনের খোঁজ করি। জুয়ান আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন। হয়তো বা আপনি আপনার সঙ্গীকে পেয়ে যাবেন। নিশ্চয়ই কাছেই কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন।’

সূর্যদেব অস্তাচলের দিকে চলেছেন। জুয়ান অন্যদের সঙ্গে এগোলেন যদি দীপাঞ্জনের দেখা পাওয়া যায় সে জন্য। এগোতে এগোতে মাঝে-মাঝেই দীপাঞ্জনের মোবাইলে কল করতে লাগলেন জুয়ান। কিন্তু প্রতিবারই সুইচড অফ। পুরো কম্পাউন্ডটা একবার চক্কর দিয়ে আগের জায়গাতে ফিরে এলেন জুয়ানরা। কিন্তু বৃদ্ধ স্যামসন বা দীপাঞ্জন কাউকে চোখে পড়ল না তাদের। কেমন যেন একটু আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করল জুয়ানের মনে। আর কিছু ‘সময়ের মধ্যেই অন্ধকার নামবে। আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই আবরণে মুড়ে যাবে চারদিক। ইউনিটের অন্য লোকরা গাড়িতে উঠতে শুরু করেছে। এ জায়গা ছেড়ে তারা আজ রাতের মতো চলে যাবে তাদের আস্তানাতে। বার্ক তাদের সঙ্গে একটু কথা বলে নিলেন। পর-পর তিনটে গাড়ি বেরিয়ে গেল লোকজন নিয়ে। রয়ে গেল শুধু কোম্বাটু, বার্ক আর মার্টিনসহ এখানে আসা দলটা।

গাড়িগুলো চলে যাবার পর মার্টিন বললেন, ‘আমার ধারণা প্রফেসর জুয়ানের সঙ্গী সম্ভবত বাইরে ঘুরতে গেছেন। তিনি ফিরে আসবেন, কিন্তু স্যামসনের নিরুদ্দেশ হবার ব্যাপারটা আমাকে ভাবাচ্ছে। পুলিশকে ঘটনাটা জানানো ভালো।’

বার্ক বললেন, ‘আপনার কথাটা ঠিক। কিন্তু পুলিশ এলে আবার শুটিং-এর কাজ পণ্ড না-হয়।’

কোম্বাটু বললেন, ‘আপাতত আমি এখানে থেকে যাচ্ছি না। আরও ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে দেখি। তারপরও যদি তাদের খোঁজ না পাই তখন পুলিশকে খবর দেব

হঠাৎ মার্টিন বললেন, ‘লোকটা যে বাক্সগুলো আনল সেগুলো কই?’

‘বাক্সগুলো দামি ওক কাঠের তৈরি। কুয়াশাতে ভিজে বাক্সগুলোর পালিশ নষ্ট হতে পারে। কাছেই ওই যে ওখানে একটা ফাঁকা ঘর দেখতে পেয়ে সে ঘরে ঢুকিয়ে দিলাম।’—কথাটা ভেসে এল জুয়ানদের পিছন থেকে। কখন যেন তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে বাক্স-আনা লোকটা।’

সবাই তাকাল লোকটার দিকে। সে লোকটা এরপর বলল, ‘আমাকে তো স্যামসনের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। কারণ আমার মালিক বলে দিয়েছে যে স্যামসনের থেকে বাক্সবাবদ টাকা বুঝে নিয়ে ফিরতে। ওঁর সঙ্গে মালিকের তেমনই কথা হয়েছে।’

স্যামসনকে যে পাওয়া যাচ্ছে না সে কথা লোকটার কাছে ভাঙল না কেউ। মার্টিন বললেন, ‘ঠিক আছে আপনি তবে অপেক্ষা করুন।’ আর ওই যে ওদিকের শেষ ঘরটা দেখছেন সেখানে আমরা আছি।’

দ্রুত অন্ধকার আর কুয়াশা নামতে শুরু করেছে চারপাশে। বার্ক বললেন, ‘চলুন তবে। আপত্তি না-থাকলে আমার ঘরে গিয়ে বসতে পারেন সবাই।’