২
সুদীপ্তরা তাদের মালপত্র নিয়ে প্লেন থেকে মাটিতে পা রাখল। জায়গাটার চারপাশে এমনি কোনো ঘেরা নেই। জঙ্গলই প্রাচীর রচনা করেছে এই ছোট এয়ারপোর্টের চারপাশে। জমিটার এক কোণে পিচের ড্রামের মতো প্রচুর বড় বড় ড্রাম রাখা আছে। তা দেখিয়ে ফিলিপ বলল, ‘ওগুলোর মধ্যে জমাট বাঁধা কাঁচা রবার আছে। কার্গো বিমানে এখন যাবে প্রথমে কুয়ালালামপুর তারপর সেখান থেকে জাহাজে ইউরোপ।’
জঙ্গলের গা-ঘেঁষেই একটা গাড়ি আর কয়েকজন লোক অপেক্ষা করছিল। সুদীপ্তরা প্লেন থেকে নামতেই হুডখোলা জিপের মতো গাড়িটা রানওয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাদের কাছে এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল তিনজন লোক। তাদের মধ্যে একজনের চেহারা বেশ সপ্রতিভ। বছর ষাটেক বয়সি লোকটার পরনে ধবধবে সাদা জামা-প্যান্ট, পায়ে পালিশ করা চকচকে শ্য। সোনার রিমলেশ চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ। তবে তার চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তুটি হল তার মসৃণ বিরাট টাক। সকালের রোদ যেন তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। তার সঙ্গী দু’জনের পোশাক অবশ্য খুব সাধারণ। তাদের প্যান্টগুলো গোড়ালির ওপর গোটানো। একজনের পায়ে ছেঁড়া চপ্পল আছে, অন্যজনের তা-ও নেই। সম্ভবত তারা মজুর বা কুলি শ্রেণির লোক হবে।
গাড়ি থেকে নেমে প্রথমজন ফিলিপের দিকে করমর্দনের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্বাগতম, আমি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
ফিলিপ তার সঙ্গে করমর্দন করে সুদীপ্তদের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিল। এই ভদ্রলোকই সেই গুরুমূর্তি। হেরম্যানের পর সুদীপ্তর সঙ্গে করমর্দন করার সময় তিনি বললেন, ‘আপনি ভারতীয়। আমার জন্মভূমিও ভারত। মাদ্রাজের এক গ্রাম। তবে আমি এখন পুরোপুরি এদেশের লোক। এই রবার বাগিচায় বেশ কিছু ভারতীয় শ্রমিক কাজ করে।’
ফিলিপ বললেন, ‘আমার এই দুই বন্ধু কিন্তু অনেক দূর থেকে ছুটে এসেছেন সংবাদপত্রে রবার বনের লোমশ মানুষের গল্প পড়ে তাদের সন্ধানে। আপনার এ-দিকের খবর কী? সেই লোমশ মানুষের ব্যাপারটা?’
গুরুমূর্তি বললেন, ‘লোমশ মানুষের ব্যাপারটা আমি এখনও বিশ্বাস করি না। এখন বাগানের অফিসে চলুন। সেখানে কথা হবে।’ ভদ্রলোকের সঙ্গী দু’জন সুদীপ্তদের মালপত্র উঠিয়ে নিল গাড়িতে। সুদীপ্তরাও চড়ে বসল তাতে। রানওয়ে ছেড়ে গাড়ি প্রবেশ করল জঙ্গলের মধ্যে। দু’পাশে গাছেদের নিবিড় জটলা। শুধু বড় বড় ঘন সবুজ পাতাওয়ালা রবার গাছই নয়, তার সাথে সেগুন, চন্দন, কর্পূর, পামগাছও আছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। কোথাও কোনও শব্দ নেই।
সুদীপ্ত জানতে চাইল, ‘এ-সব বনে কোনো হিংস্র প্রাণী আছে?’
গুরুমূর্তি বললেন, ‘আমরা এখন যেখানে যাব তার ওপাশ থেকে আসল জঙ্গল শুরু হয়েছে। মাইলের পর মাইল গভীর জঙ্গল। সেখানে বাঘ, লেপার্ড, ভাল্লুক আছে। মাঝে মাঝে তারা ছিটকে আমাদের কাছাকাছি চলে আসে। এক সময় রবার বাগিচার শ্বেতাঙ্গরা প্রচুর শিকার করেছেন এখানে।’
‘আর বানর ধরনের প্রাণী?’ জানতে চাইলেন হেরম্যান।
গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। ওরাংওটাং আছে, গিবন আছে।’
মিনিট-পাঁচেক চলার পরই জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেল তারা। এ-জায়গাটা কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। আর ঠিক তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ইট আর কাঠ দিয়ে তৈরি বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। দেখেই বোঝা যায় বাড়িটা অনেক পুরানো। আরও একটা বিরাট কাঠামো অবশ্য রয়েছে জঙ্গলের গা-ঘেঁষে। মাথায় টিনের উঁচু ছাদওয়ালা। টিনের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা জায়গাটা সম্ভবত কোনো গোডাউন ধরনের কিছু হবে। জংলা গাছে ঘেরা সে-জায়গা। বাংলো ধরনের বাড়িটার একপাশে কাঁটাতারের গা-ঘেঁষে রাখা আছে শয়ে শয়ে বিরাট বড় বড় টিনের ড্রাম, কাঠের পিপে। আর এক অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে আছে সারা জায়গা জুড়ে। কাঁচা রবারের গন্ধ
গাড়ি থেকে বাড়িটার সামনে নামার সময় গুরুমূর্তি সুদীপ্তদের উদ্দেশে বললেন, ‘এ-বাড়িটা প্রায় দুশো বছরের পুরনো। ব্রিটিশরা বানিয়েছিল বন থেকে রবার সংগ্রহের জন্য। আমি এখানেই থাকি। অফিসও এখানেই। শ্রমিক মহল্লাটাও একটু উত্তরে। এ-বাড়ি থেকেই বাগানের কাজকর্ম দেখাশোনা হয়।’
সেই বাড়িটার সামনে আরও দু-তিন জন দাঁড়িয়েছিল। সম্ভবত তারা মালয়ী। পরনের পোশাক মোটামুটি ভদ্র-সভ্য। পকেটে কলমও আছে। সম্ভবত তারা করণিক ধরনের কোনো কর্মী হবে। সুদীপ্তদের সবাইকে নিয়ে বাড়িটাতে ঢুকে গুরুমূর্তি তার অফিস ঘরে পৌঁছলেন। সে-ঘরের দেওয়ালের গায়ে মাথাসমান উঁচু সেলফগুলো নতুন-পুরনো কাগজপত্রে ঠাসা। বেশ কয়েকটা আলমারি আর একটা লোহার সিন্দুকও আছে সে ঘরে। ঘরটার ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট কাঠের টেবিলের চারপাশে চেয়ারগুলোতে বসল সুদীপ্তরা। ফাইলের স্তূপ, পেনস্ট্যান্ড সবই আছে টেবিলে। গুরুমূর্তির কাজের জায়গা। সুদীপ্ত ভালো করে তাকাল চারপাশে। বেশ কয়েকটা পুরনো ফোটোগ্রাফ বাঁধানো আছে দেওয়ালে। রবার বনে শ্রমিকদের রস সংগ্রহ করার ছবি, দু-একজন সাহেবের ছবি শ্রমিকদের সঙ্গে—এ ধরনের সব ছবি। আর গুরুমূর্তির চেয়ারের ঠিক পিছনের দেওয়ালের গায়ে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে দুটো বন্দুক, আর ঠিক তার মাথার ওপর টাঙানো একটা বাঘের মাথা। তার চোখ দুটো যেন জ্বলছে! হিংস্র শ্বদন্তগুলো এখনও ঝকঝক করছে।
সুদীপ্তকে সে-দিকে তাকাতে দেখে গুরুমূর্তি বললেন, ‘পঞ্চাশ বছর আগে এক শ্বেতাঙ্গ এই মানুষখেকো বাঘটাকে মেরেছিলেন কুলি বস্তির কাছে। তারপর ইংল্যান্ড থেকে মাথাটা স্টাফ করিয়ে আবার এখানে আনান। সে-সময় হামেশাই বাঘ-ভাল্লুক হানা দিত এ-তল্লাটে…।’
গুরুমূর্তি এরপর এ-প্রসঙ্গে হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁকে ফিলিপ বললেন, ‘এবার কাজের কথায় আসা যাক। বাগানের খবর বলুন?’
গুরুমূর্তি সোজা হয়ে বসে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘খবর একই রকম। বনে কেউ ট্যাপ করতে যেতে চাইছে না। উপরন্তু টাকা দাবি করছে। অনেক বুঝিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। কেমন যেন একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিন-চারজন এই অফিস কর্মচারী বাদে কেউ কাজ করছে না।’
ফিলিপ বললেন, ‘ প্রতিদিন বেশ কয়েক হাজার পাউন্ড ক্ষতি হচ্ছে কোম্পানির। রবার ক্যান কুয়ালালামপুরে যাবার পর যারা রবারগুলোকে প্রসেস করে চাদর বানায়, যারা সেগুলোকে জাহাজে তোলে তাদেরও বসিয়ে বসিয়ে টাকা দিতে হচ্ছে। রাবণ নামের সেই সিংহলী কুলি সর্দারের খবর কী?’
গুরুমূর্তি বললেন, ‘আমার ধারণা ওই এ-সবকিছুর মূলে রয়েছে। লোমশ মানুষের আতঙ্ক ছড়ানো, কুলি শ্রমিকদের ক্ষেপানো সবকিছুর পেছনে ওই লোকটাই। আপনি জানেন কিনা জানি না, আপনাদের কোম্পানি এই রবার বাগান ইজারা নেবার আগে একবার এখানে শ্রমিক অসন্তোষ হয়। সে-সময় বাগানের যে ম্যানেজার ছিল সেই চিনা ভদ্রলোককে রবার বনে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটা বন্যপ্রাণীর আক্রমণ বলে চালানো হলেও আসলে কাণ্ডটা নাকি ওই রাবণই ঘটিয়েছিল। আমি ভাবছি কোম্পানির অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিয়ে কুয়ালালামপুর ফিরে যাব।’
ফিলিপ বিস্মিতভাবে বললেন, ‘চলে যাবেন? তাহলে কি বাগান বন্ধ হয়ে যাবে?’ গুরুমূর্তি বললেন, ‘তেমনই তো হতে চলেছে মনে হয়!’
ফিলিপ বললেন, ‘আমার মনে হয় ওই রাবণ নামের লোকটাকে জব্দ করতে পারলেই সমস্যাটা অনেকটা মিটে যাবে।’
গুরুমূর্তি বললেন, ‘দেখুন চেষ্টা করে। তবে আমার আর এখানে থাকতে মন চাইছে না।’
হেরম্যান বললেন, ‘আচ্ছা, কুলি বস্তিতে গিয়ে যারা ওই লোমশ মানুষকে দেখেছে বলে দাবি করেছে তাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে তো?’
ফিলিপও বললেন, ‘হ্যাঁ, আগে তাদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। কোনো খবর বেরিয়ে আসতে পারে তাদের মুখ থেকে। আর ওই কুলি সর্দার রাবণের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করা দরকার।’ গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে ব্যবস্থা আমি করছি। বাগানটাও ঘুরিয়ে দেখাব আপনাদের তার আগে আপনারা ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন কিছুক্ষণ। এ-বাড়িতেই আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আধঘণ্টা পর ঠিক বেলা দশটা নাগাদ আমরা বেরোব।’
অফিসের রুমের দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সুদীপ্তরা এরপর তার সঙ্গে মালপত্র নিয়ে চলল যে ঘরে তাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে সে-দিকে। দুটো পাশাপাশি ঘরে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার একটাতে সুদীপ্ত আর হেরম্যান ঢুকল আর অন্যটাতে ফিলিপ। কাঠের দেওয়াল আর কাঠের মেঝেওয়ালা সুদীপ্তদের ঘরটা মন্দ নয়। দুটো জানলা আছে ঘরে। জানলা দুটো খুলল সুদীপ্ত। একটা জানলা দিয়ে পরিত্যক্ত সেই গোডাউন আর সে-দিকের জঙ্গলের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। আর অন্যদিকের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাড়ির সামনের কিছু অংশ। যেখানে রবার রাখা পিপে-ড্রাম ইত্যাদি আছে।
হেরম্যানের যেন আর বাইরে বেরোবার জন্য তর সইছে না। তিনি ঘরে ঢুকে পায়চারি করতে শুরু করলেন। সুদীপ্তকে তিনি বললেন, ‘ওই রোমশ মানুষদের যারা দেখেছে বলে দাবি করছে, যখন তাদের সাথে কথা হবে তখন ওই কথোপকথন তোমার মোবাইল ফোনের ক্যামেরাবন্দি করো। কে বলতে পারে, হয়তো এই ইন্টারভিউগুলো নিয়ে একদিন ডকুমেন্টরি ফিল্ম হবে।’
সুদীপ্ত হেসে বলল, আমরা যে এবার মালয়ের লোমশ মানুষের দেখা পাচ্ছি সে ব্যাপারে কি আপনি নিশ্চিত?’
হেরম্যানও হেসে জবাব দিলেন, ‘এ-সব ব্যাপারে নিশ্চিত বলে যে কিছু হয় না তা তুমিও জানো, আমিও জানি। তবে আশা নিয়েই তো মানুষকে এগোতে হয়। হয়তো সত্যিই আমরা তাদের দেখা পেলাম। তাই আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো।’
সুদীপ্ত বলল, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক।’
