কূর্মদেবতার কামড় – ৮

ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেল। চন্দ্রালোকিত হ্রদের জলে উজানের দিকে ধীর গতিতে ভেসে চলেছে সুদীপ্তরা। অনেক পিছনে পড়ে আছে সেই গ্রাম, কচ্ছপ দেবতার মন্দির। ওয়াং আসবে বললেও আর তার দেখা মেলেনি। সুদীপ্তরা ধরেই নিয়েছে এতটা পথ যখন সে দেখা দিল না তবে সে আর আসবে না। হেরম্যান একসময় মন্তব্য করলেন, ‘ছেলেটা বড় অদ্ভুত! তবে এতক্ষণ ওর সঙ্গে থাকলাম কিন্তু একবারও ওকে জিগ্যেস করা হল না যে ও দেবতা কিম কুঈকে দেখেছে কিনা।’

সুদীপ্ত বলল, ‘হ্যাঁ। আমরা কচ্ছপ দেবতাকে দেখি বা না দেখি তবে একশো শতাংশ নিশ্চিত হতাম যে তিনি আছেন। যদি ওয়াং বলত যে সে তাঁকে দেখেছে। ব্যাপারটা মিথই রয়ে গেল।’

ঠিক এর একটু পর ডেং-ফু হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে বলল, ‘কী যেন একটা আসছে না?’

সুদীপ্তরা পিছনে তাকিয়ে দেখল, ‘হ্যাঁ, দূর থেকে কী যেন একটা ভেসে আসছে তাদের দিকে! গ্রামের লোকরা এ পর্যন্ত তাদের পিছু ধাওয়া করেনি তো? সতর্ক হয়ে গেল সুদীপ্তরা। কালো বিন্দুটা দ্রুত এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল সবার কাছে। সুদীপ্ত বলে উঠল, ‘ওয়াং। ওয়াং। সে এসে গেছে!’

নৌকার কাছাকাছি চলে এল ওয়াং। যেন অদ্ভুতভাবে জলের মধ্যে বসে বসে সাঁতার কাটছে সে! নৌকার হাত দশেক তফাতে এসে থামল সে। সুদীপ্তরাও নৌকা থামাল। আর এরপরই সুদীপ্তরা যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল তার জন্য তারা তৈরি ছিল না। ওয়াং-এর ছোট্ট দেহটা জলের ওপর ধীরে ধীরে উঠতে লাগল। জলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বিশাল আকারের এক কচ্ছপের পিঠ। আর তার পিঠের ওপর দু’পাশে পা ছড়িয়ে বসে আছে ওয়াং।

কুরু হ্রদের কচ্ছপ দেবতা কিম কুঈ-এর পিঠে সওয়ার বাচ্চা ছেলেটা। ইতিহাস, গল্পকথার দানব কচ্ছপ! পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া কচ্ছপ—‘রেফেক্টস লেলই’।

পিঠে আর গলায় ঝলমল করছে সোনার রং। সোনার কচ্ছপ। সুদীপ্তরা বিস্মিতভাবে চেয়ে রইল তার দিকে। জল থেকে এরপর মাথাও তুলল প্রাণীটা। ড্যাবড্যাবে চোখে সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে যেন বলল, ‘কী শেষ পর্যন্ত আমার দেখা পেলে তো তোমরা?’ তারপর বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে ধীরে ধীরে পাক খেতে শুরু করল নৌকার চারপাশে। মাথার ওপর থেকে চাঁদের আলো ঝরে পড়ছে। সেই আলো গায়ে মেখে কিম কুঈ-এর পিঠে বসে আছে ওয়াং। সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। বেশ কয়েকবার সুদীপ্তদের চারপাশে ঘোরার পর কচ্ছপটা একটু দূরে সরে গেল নৌকা থেকে। ওয়াং সুদীপ্তদের দিকে হাত নেড়ে যেন বলল, ‘বিদায় বন্ধুরা। ভালো থেকো।’ আর এরপরই দেবতা কিম কুঈ হঠাৎই ওয়াংকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন জলের গভীরে।

প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সুদীপ্ত একসময় বলে উঠল, ‘ইশ! একটা ছবি তোলা হল না!’

হেরম্যান বললেন, ‘ছবি তোলা না হলেও যে দৃশ্য দেখলাম তা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মনে গাঁথা হয়ে রইল। এবার বুঝলাম ছেলেটা মাঝে মাঝে জেলেদের জাল কেটে দেয় কেন? তার বন্ধু দেবতা জালে আটকে পড়লে তাকে বাঁচানোর জন্য। দ্বিতীয় যে দিন বাচ্চাটা অদ্ভুতভাবে ভাসতে ভাসতে পাড়ে এসেছিল সে দৃশ্য মনে আছে। আসলে সে সেদিনও তার বন্ধুর পিঠে বসেই পাড়ে এসেছিল। আমরা বুঝতে পারিনি। যেখানেই থাক ভালো থাক ওরা—এই কামনা করি।’

বয়ে চলল ক্যানো নৌকা। আকাশের বুকে প্রথমে শুকতারা ফুটে উঠল। তারপর তা মিলিয়ে গেল। পুব আকাশে রং ছড়াতে শুরু করলেন সূর্যদেব। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল চারপাশের সবকিছু। সুদীপ্তরা অনেক দূর চলে এসেছে। আর ভয় নেই তাদের। শুধু সেই মহাকায় দেবতা কিম কুঈ-এর দর্শনের ঘোর তাদের কাটছে না। একসময় তারা হ্রদের পাড়ে বেশ কয়েকটা নৌকা দেখতে পেল। একটা রাস্তাও যেন দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। তার মানে নিশ্চয়ই কোনো গ্রাম আছে। হ্রদের পাড়ে যেখানে নৌকা ভেড়াল সুদীপ্তরা। হ্যাঁ, হ্রদের পাড় থেকে যখন তারা মাটিতে পা রাখল তখন সূর্যদেব সবে উদিত হয়েছেন। বনপথ ধরার আগে শেষ একবার হ্রদের দিকে তাকাল তারা। যে দিক থেকে তারা ভেসে এল সেদিকে। ওখানেই জলতলের কোথাও হয়তো খেলে বেড়াচ্ছে কচ্ছপ দেবতা কিম কুঈ আর বাচ্চা ছেলেটা। তাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না হেরম্যান-সুদীপ্তর।

জঙ্গলের পথে এরপর প্রবেশ করল সকলে। সুদীপ্তর আগে আগে হাঁটছিল ডেং-ফু। হঠাৎ তার কোমরের পিছনে অদ্ভুত একটা জিনিস চোখে পড়ল সুদীপ্তর। ছোট্ট একটা কচ্ছপ! আকারে একটা বাটির মতো হবে। সে ডেং-ফুর বেল্ট কামড়ে ধরে ঝুলছে। তার ওজন কম’ হওয়ায় আর উত্তেজনার মধ্যে থাকায় ডেং-ফু টের পায়নি ব্যাপারটা। আর বাতের অন্ধকারে সুদীপ্ত বা হেরম্যানও তাকে খেয়াল করেনি। সুদীপ্ত ডেং-ফুকে দাঁড় করাল। তারপর এক ঝটকায় কচ্ছপটাকে টান দিতেই সে কামড় ছেড়ে দিল। হেরম্যান আর ডেং-ফু অবাক হয়ে গেল ছোট্ট কচ্ছপটা দেখে। নিশ্চয়ই কিম কুঈ মন্দিরের পরিখার কচ্ছপ হবে। যে কামড়ে ধরেছিল বেল্টের পিছনটা। তারপর এতটা পথ ঝুলতে ঝুলতে এসেছে। কচ্ছপের কামড় বলে কথা! একবার ধরলে সহজে ছাড়ে না! কথাটা এবার চাক্ষুষ করল সবাই।

হেরম্যান বললেন, ‘আগে দেখলে ওকে লেকের জলে ছেড়ে দেওয়া যেত। আর পিছু ফেরার দরকার নেই। ওকে সঙ্গে নিয়ে চলো। হ্যানয় ফিরে হোয়ান কিম লেকে ছেড়ে দেব ওকে। দেবতার মন্দিরের কচ্ছপ দেবতার মন্দিরের লেকেই থাকবে।’

ডেং-ফু বলল, ‘হ্যাঁ, সেই ভালো।’

কূর্ম দেবতার ক্ষুদ্র অবতারকে পিঠের রুকস্যাকে ভরে নিল সুদীপ্ত। আবার পথ চলা শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গলের ওপাশে এক নতুন গ্রামে পৌঁছে গেল সবাই।

পরিশিষ্ট : দু-দিন পর হ্যানয় শহরে হোটেলের ঘরে সোফায় বসেছিল সুদীপ্ত আর হেরম্যান। সকালের সূর্যের আলো খোলা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। গতকাল রাতে সেই গ্রাম থেকে সুদীপ্তরা হ্যানয় ফিরেছে সে গ্রামের লোকদের সহায়তায়। আজই সুদীপ্তরা ঘরে ফেরার জন্য দুপুরের বিমান ধরবে। তার আগে অবশ্য একটা কাজ আছে। সঙ্গে আনা কচ্ছপটাকে ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে হোয়ান কিম হ্রদে। ডেং-ফু নেই। সে তার ফেলে আসা গাড়িটাকে উদ্ধারের বন্দোবস্ত করতে পুলিশের কাছে গেছে। অন্য একটা গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে আসছে সুদীপ্তদের হোয়ান কিম হ্রদে নিয়ে যাবার জন্য। সোফায় গা এলিয়ে হেরম্যান কোলে ল্যাপটপ নিয়ে সুদীপ্তর ক্যামেরা থেকে ল্যাপটপে নেওয়া কিম কুঈ মন্দিরের কচ্ছপের ছবিগুলো দেখছিলেন। আর সুদীপ্ত তাকিয়েছিল মেঝের দিকে। সেখানে গুটি গুটি মন্থর ভঙ্গিতে কার্পেটের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট্ট কচ্ছপটা। হঠাৎ হেরম্যান সোজা হয়ে বসলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল তাঁর চোখ। আর এর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হেরম্যান উত্তেজিতভাবে ল্যাপটপ নামিয়ে রেখে কার্পেটের ওপর থেকে কচ্ছপটা তুলে নিয়ে প্রথমে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর একটা পেনসিল নিয়ে কচ্ছপটার মুখে ছোঁয়াতে লাগলেন। একসময় কচ্ছপটা কামড়ে ধরল পেনসিলটা। আর এরপরই হেরম্যান আনন্দে চিৎকার করে সুদীপ্তকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘পেয়েছি! পেয়েছি! এতদিন পর পরিশ্রম সার্থক হল আমাদের। কে বলে ক্রিপ্টোজুলজি মিথ্যা! সোনার কচ্ছপ দেবতার দর্শন পেলাম, তারপর আবার পেলাম এক আশ্চর্য জিনিস।’

সুদীপ্তকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে শিশুর মতো করতে লাগলেন হেরম্যান।

সুদীপ্ত বলল ‘কী পেয়েছেন আপনি?’ হেরম্যান বললেন, ‘তোমার তোলা মন্দিরের কচ্ছপের ছবিতে একটা কচ্ছপ জল থেকে মুখ তুলে হাঁ করেছিল। ছবিটা জুম করতেই ধরা পড়ল ব্যাপারটা। এবার বুঝতে পারছি কেন আমাদের পরিখার জলে নামানো হয়েছিল, কেন কচ্ছপগুলো ধীরে ধীরে আমাদের কাছে আসছিল। ২২ কোটি বছরের আগের ট্রায়াসিক টার্টেল আজও ঘুরে বেড়ায় দেবতা কিম কুঈ মন্দিরের ওই পরিখায়! অর্থাৎ যাদের দাঁত আছে! ল্যাপটপে ছবিটা না দেখলেই তো আর কিছুক্ষণের মধ্যে কচ্ছপটাকে আমরা ছেড়ে আসতাম জলে। কোনো প্রমাণই থাকত না।’

কথাটা শুনে সুদীপ্ত চমকে উঠে তাকাল টেবিলে রাখা কচ্ছপটার দিকে। তখনও সে কামড়ে ধরে রেখেছে পেনসিলটাকে। কচ্ছপের কামড় বলে কথা! তবে মাড়ি দিয়ে নয়, সুদীপ্ত দেখল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে সে কামড়ে ধরে আছে পেনসিলটা। ট্রায়াসিক যুগে পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া হিংস্র দাঁতঅলা কচ্ছপ!

সুদীপ্ত এবার জড়িয়ে ধরল হেরম্যানকে। কিছুক্ষণ আলিঙ্গনাবদ্ধ থাকার পর হেরম্যান বললেন, ‘আমি হোটেলের রিসেপশন রুমে যাচ্ছি। একটা প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি খেয়াল রেখো এই অমূল্য প্রাণীটাকে।’

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন হেরম্যান। সুদীপ্ত তাকিয়ে রইল কূর্ম দেবতার দিকে। হ্যাঁ, সুদীপ্তদের কাছে সে এখন দেবতাই বটে। প্রাগৈতিহাসিক কচ্ছপটা এখন তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাঁত দিয়ে কামড়ে রয়েছে পেনসিলটা। কচ্ছপের কামড় বলে কথা! তার ওপর আবার এ কচ্ছপের দাঁত আছে!