মালয় বনের আতঙ্ক – ৪

কিছুক্ষণের মধ্যেই রবার বনে প্রবেশ করল তারা। গাড়ি চলার মতো সংকীর্ণ একটা পথ। এ-পথেই বাগানের কর্মীরা ভিতরে প্রবেশ করে। সোজা এগোতে থাকল গাড়ি। পথের দু’পাশের গাছগুলো এত ঘন-সন্নিবিষ্ট যে তাদের বড় বড় পাতাগুলো হুডখোলা গাড়িতে বসা সুদীপ্তদের গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি ট্যাপ করা। চ্যানেল দিয়ে ল্যাটেক্স এসে উপচে পড়ে জমাট বেঁধে গেছে গুঁড়ির গায়ে ঝুলতে থাকা বাটিতে। দীর্ঘদিন হয়ে গেল তাদের আর সংগ্রহ করা হয়নি। রবার বনের মধ্যে বেশকিছু বড় বড় অন্য গাছও আছে। শাখা-প্রশাখা সমেত মাথার ওপরে উঠে গিয়ে চাঁদোয়ার মতো আবরণ সৃষ্টি করেছে তারা। মাঝে মাঝে শুধু একটা কটকট শব্দ কানে আসছে। গুরুমূর্তি জানালেন যে রবার বনে নাকি এক ধরনের গেছো ব্যাং থাকে। ও তাদেরই ডাক। বেশ কিছুটা পথ এগোবার পর এক সময় গাড়ি থেমে গেল। গুরুমূর্তি বললেন, ‘নেমে পড়ুন। গাড়ি আর যাবে না।’

নামল সবাই। সত্যি, গাড়ি চলার পথ সেখানে শেষ। বেশ কয়েকটা সুঁড়িপথ এগিয়েছে বনের মধ্যে। দলবেঁধে তারই একটা ধরল সুদীপ্তরা। দু’পাশ থেকে রবার বন যেন চেপে ধরতে লাগল তাদের। তারই মাঝে বেশ কিছু গাছ ট্যাপ করা, তা দেখতে পেল তারা। চারপাশে তাকাতে তাকাতে গভীর থেকে গভীরতর অরণ্যে প্রবেশ করে চলল সবাই। বিশাল বিশাল কালচে রবার পাতাগুলো এত ঘন যে কয়েক হাত দূরে এখানে দৃষ্টি চলে না। গাছগুলোর গুঁড়ির নিচে জমাট বেঁধে আছে চাপ চাপ অন্ধকার। গুরুমূর্তি বললেন, ‘এভাবেই মাইলের পর মাইল চলে গেছে এ অরণ্য। কোথায় যাবেন, কীভাবে সন্ধান চালাবেন তাদের? বেশি এগোলে কিন্তু পথ হারাবার সম্ভাবনা আছে।’

তবুও বেশ কিছুটা পথ আরও এগোল তারা। কিন্তু এক সময়, থামতেই হল তাদের। গাছের দঙ্গল এত ঘন যে গাছের ডালপালা না কেটে আর সামনে এগোনো যাবে না।

.

ঘণ্টা দুই সময় পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ফিলিপ বললেন, ‘আজ এ-পর্যন্তই থাক। কাল ভোরবেলা আমরা আবার বনে ঢুকে ভালোভাবে তল্লাশি করব। গাছের ডালপালা ছেঁটে পথ করে এগোব।’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘যা ভালো মনে হয় তা করবেন। আমরা যে পর্যন্ত এলাম এর গভীরে কিন্তু ট্যাপাররা আসে না। এখান থেকেই বলতে গেলে আসল জঙ্গল শুরু হচ্ছে। লোমশ মানুষ বলে হয়তো কিছু নেই, কিন্তু লেপার্ড আছে, চিতা আছে।’

এবার ফেরার পথ ধরল সুদীপ্তরা। কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ একটা জায়গাতে চোখ আটকে গেল হেরম্যানের। একটু তফাতে এক জায়গাতে কিছুটা ছাই পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যে ঘাসপাতা জড়ো করে সেখানে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে হেরম্যান, গুরুমূর্তির উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি যে বললেন এখানে মানুষ আসে না? তবে আগুন জ্বালিয়েছিল কে?’ গুরুমূর্তি সেদিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, এ-পর্যন্ত ট্যাপাররা আসে না। আশেপাশের কোনো গাছে ট্যাপিং-এর চিহ্ন পাবেন না। হতে পারে গরমে শুকনো ঘাসে ঘষা লেগে আগুন জ্বলেছিল। বনে যেভাবে দাবানল সৃষ্টি হয় তেমনই।’ এই বলে তিনি সামনে পা বাড়ালেন। গুরুমূর্তি আর ফিলিপের পিছনে হাঁটতে হাঁটতে হেরম্যান চাপা স্বরে সুদীপ্তকে বললেন, ‘এমন নয়তো যে ওই লোমশ মানুষরাই আগুনটা জ্বালিয়েছিল? চিনা মেয়েটা কিন্তু বলল যে, সে লোমশ মানুষদের পরনে কাপড় দেখেছিল। হয়তো তারা লজ্জা নিবারণ করে, আগুন জ্বালাতে পারে। তাছাড়া মালয়ের দুর্গম প্রদেশে সেই বাঁদরদের আগুন জ্বালাবার গল্প তো তোমাকে বলেইছি…।’

হেরম্যানের কথার জবাবে সুদীপ্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সুদীপ্তদের পাশের একটা ঝোপ হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে দুলে উঠল। আর তারপর তার আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াল মানুষের মতো একটা কেউ। সারা মুখ, দেহ তার কালচে লাল লোমে আবৃত। সে লাল চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখছে সুদীপ্তদের! আর এরপরই সেই লোমশ প্রাণীটার পাশে দেখা গেল একই রকম দেখতে আরও একটা মাথা। বিস্মিত সুদীপ্তরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে-দৃশ্য দেখে। লম্বা দাড়ি-গোঁফওয়ালা মুখগুলো যেন মানুষের মতোই! মালয়ের লোমশ মানুষ?

আর এরপরই প্রবলভাবে আন্দোলিত হতে লাগল আশপাশের রবার গাছগুলো। এদিক-ওদিক দেখা দিতে লাগল আরও অনেক তেমনই মুখ! সুদীপ্তদের ব্যাপারটা বুঝতে আরও কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। ওরাংওটাং! তবে এ এক বিশেষ প্রজাতির ওরাংওটাং। ওদের মুখটা অবিকল মানুষের মুখের মতো দেখতে!

প্রাণীগুলি এরপর ঝোপঝাড় ছেড়ে কাছেই একটা বড় গাছে উঠতে শুরু করল। বেশ বড় দল। অন্তত জনা বিশেক সদস্য হবে সে-দলে। ফিলিপ বললেন, ‘আমার ধারণা এদের দেখেই লোমশ মানুষ ভেবে ভুল করে থাকতে পারে শ্রমিকরা।’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, এমনটাও হতে পারে।’

হেরম্যান বললেন, ‘মেয়েটা কিন্তু বলেছিল যে সেই লোমশ মানুষদের পরনে লজ্জা নিবারণের কাপড় দেখেছে? ওরাংওটাং কি কাপড় পরে? তাছাড়া ওরা দীর্ঘদিন ধরে এ-বনে ওরাংওটাং দেখে আসছে। আমরা হঠাৎ ওরাংওটাং দেখে লোমশ মানুষ ভেবে ভুল করতে পারি, কিন্তু তারাও একই ভুল করবে?’

হেরম্যানের কথা শুনে ফিলিপ ঈষৎ ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘কাল তো আমরা আবার বনে ঢুকব। হয়তো আপনি কাল দেখা পেয়ে যাবেন সেই লোমশ মানুষদের।’

হেরম্যান কথাটা গায়ে মাখলেন না। আবার চলতে শুরু করল সবাই। কিন্তু কিছুটা এগোবার পর একটা ব্যাপার খেয়াল করল তারা। ওরাংওটাং-এর দল কিন্তু তাদের পিছু ছাড়েনি। এক গাছের মাথা থেকে আর এক গাছের মাথায় লাফ দিয়ে, কখনও বা ঝোপের আড়াল বেয়ে সুদীপ্তদের অনুসরণ করছে দলটা। ব্যাপারটা দেখে ফিলিপ এবার যেন একটু উদ্বিগ্নভাবে বললেন, ‘ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে কেন? আক্রমণ করবে নাকি?’

হেরম্যান বললেন, ‘সম্ভবত না। এ অভিজ্ঞতা আমাদের আফ্রিকাতে হয়েছে। গাছের মাথা বেয়ে মাইলের পর মাইল শিম্পাঞ্জির দল পথ চলত আমাদের সঙ্গে। আসলে শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং এ-সব প্রাণীরা মানুষের প্রতি খুব কৌতূহলী হয়। সেভাবে দেখতে গেলে ওদের সঙ্গে তো খুব বেশি পার্থক্য নেই আমাদের। মাত্র কিছু আউন্স গ্রে ম্যাটারের পার্থক্য। কৌতূহলজনিত কারণেও ওরা অনুসরণ করছে আমাদের।’

পথ চলতে লাগল সবাই। আর মাথার ওপর ওরাংওটাংরাও। একসময় বড় গাছগুলো যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা গাছের মাথার ওপর এসে থেমে গেল ওরাংওটাং-এর দল। গাছের উপর থেকে সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে কিচিরমিচির করে কী যেন বলতে লাগল তারা। সুদীপ্তরা সেদিকে শেষ একবার তাকিয়ে নিয়ে ফেরার পথ ধরল। তারা যখন গাড়ির কাছে পৌঁছল তখন বিকেল হয়ে গেছে। বাগানের অফিস-বাড়িতে নিজেদের রাতের আস্তানায় ফিরে আসতে আরও বেশ খানিকটা সময় লাগল সুদীপ্তদের। ঘরে ঢুকে হেরম্যান মন্তব্য করলেন, ‘গুরুমূর্তি আর ফিলিপ যাই বলুন, কুলি শ্রমিকরা ওই ওরাংওটাংগুলোকেই লোমশ মানুষ ভেবে ভুল করেছে—এ ব্যাপারটা ঠিক আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’

কিছুক্ষণ ঘরে কাটাবার পর সুদীপ্তরা যখন বাইরে বেরোল ততক্ষণে সূর্য অস্ত গেছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে বাড়িটার চৌহদ্দি আর রবার বনের ভিতর। ফিলিপ মনে হয় নিজের ঘরেই আছেন। সুদীপ্তরা দেখল গুরুমূর্তি বারান্দায় কাঠের রেলিং ধরে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখে চিন্তার ছাপ। সুদীপ্তদের দেখে তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, রাতে আপনাদের একটু কষ্ট হবে। এখানে তো ইলেকট্রিসিটি নেই, তেলের বাতিতেই কাজ চালাতে হবে।’

হেরম্যান বললেন, ‘আপনি তো এক সময় কুয়ালালামপুরে থাকতেন, তাই না?’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, কুড়ি বছর ওখানে ডাক্তারি করেছি।’

‘কীসের ডাক্তার?’ প্রশ্ন করলেন হেরম্যান।

‘সার্জেন’ জবাব দিলেন গুরুমূর্তি।

সুদীপ্ত প্রশ্ন করল, ‘অমন ঝাঁ-চকচকে শহর ছেড়ে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গাতে চলে এলেন কেন?’

গুরুমূর্তি জবাব দিলেন, ‘দুটো কারণে। প্রথমত, রোগী দেখার সেই একঘেয়ে জীবন, শহরের ভিড়-হইচই আর ভালো লাগছিল না। আর দ্বিতীয়ত, একটা ব্যাপার অস্বীকার করে লাভ নেই আমার কুয়ালালামপুরে যথেষ্ট পসার থাকলেও এই রবার বাগানের অংশীদারিত্বে লাভের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি আমার ডাক্তারি পেশার থেকে।

তারপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘কাল তবে আপনারা রবার বনের গভীরে যাচ্ছেন?’

সুদীপ্ত বলল, ‘হ্যাঁ, তেমনই তো কথা হল তখন।

গুরুমূর্তি বললেন, ‘তবে আমি কিন্তু যাচ্ছি না। কথাটা একটু আগে ফিলিপকে জানিয়েও দিয়েছি। কারণ, এই বাড়িটা অরক্ষিত রেখে আমার বেশি সময় বাইরে থাকা ঠিক নয়। বাড়িতে ব্যবসার টাকাপয়সা ও নানা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আছে। কাল আমরা যখন রবার বনে গেছিলাম তখন নাকি ওই রাবণ এই বাড়িটার কাছে ঘুরঘুর করছিল। একজন লোক তাকে দেখেছে। কিছুই বলা যায় না, আমাদের অবর্তমানে সে হয়তো বাড়িতে ঢুকে সবকিছু লুটে নিয়ে গেল বা নষ্ট করে দিয়ে গেল।’

অন্ধকার দ্রুত নামতে শুরু করেছে। গুরুমূর্তি এরপর বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়লেন আর সুদীপ্তরাও ঘরে ফিরে এল। রাতে তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছিল সুদীপ্তরা। গুরুমূর্তিরই একজন লোক এসে খাবার দিয়ে গেছিল। ঘুমটাও বেশ ভালোই হচ্ছিল সুদীপ্তর। হঠাৎই শেষ রাতের দিকে কীসের একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে যেন ঘুম ভেঙে গেল সুদীপ্তর। পাশ ফিরতেই তার চোখ গেল বাড়ির সামনের দিকে যে জানলাটা আছে সে-দিকে। চাঁদ ডুবে গেছে, শুকতারা উঠতে শুরু করেছে। চাঁদের বিদায়লগ্ন আর সূর্যোদয়ের মাঝামাঝি সময় একটা অদ্ভুত আলো-আঁধারি পরিবেশ বিরাজ করছে সে-সময়, সুদীপ্ত দেখতে পেল সেই জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে একজন। লোমে ঢাকা তার দেহ, লোমশ মুখ, লোমশ হাত!

সুদীপ্ত প্রাথমিক অবস্থায় ঠিক বুঝতে পারল না যে সে ঠিক দেখছে নাকি স্বপ্ন দেখছে? কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মুখ। একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে বসে সুদীপ্ত বিছানা ছেড়ে গিয়ে দাঁড়াল জানলার কাছে। না, বাইরে কাউকে দেখতে পেল না সে। শুধু তার একবার যেন মনে হল—কিছুটা তফাতে যেখানে কাঁচা রবার বা ল্যাটেক্স রাখার বড় বড় ড্রাম-পিপেগুলো রাখা আছে তার একটা যেন একটু নড়ে উঠল। সেদিকে কাউকে না দেখতে পেয়ে সুদীপ্ত এরপর গিয়ে দাঁড়াল অন্য জানলাটার সামনে। যেখান থেকে গোডাউন আর জঙ্গলের দিকটা কিছুটা দেখা যায়। আধো-অন্ধকারে কেমন যেন ভৌতিক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে টিনের শেডওয়ালা বিরাট গোডাউনটা। সেদিকে ভালো করে তাকিয়ে এবার একজনকে দেখতে পেল সুদীপ্ত। তার কাঁধে বন্দুক। গোডাউনের পিছন দিক থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আধো-অন্ধকার হলেও লোকটার অবয়ব দেখে তাকে চিনতে ভুল হল না সুদীপ্তর। লোকটা রাবণ! তাহলে কি গুরুমূর্তির বক্তব্যই সত্যি? কোনো বদ মতলব নিয়ে লোকটা ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িটার আশেপাশে! নইলে অন্ধকারে সে কী করতে এখানে এসেছিল? রাবণ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। তারপর সম্ভবত একবার একটু থমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল রবার বনের অন্ধকারে। জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে রইল সুদীপ্ত। এক সময় পুব আকাশ লাল হয়ে উঠল। হেরম্যানও ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। সুদীপ্ত তাকে জানাল ঘটনাগুলো।