কূর্মদেবতার কামড় – ২

হোয়ান কিম হ্রদ থেকে ফিরে এসে বাকি দিনটা বিশ্রাম নিয়েই কাটিয়ে দিল সুদীপ্তরা। কোনো অভিযানের আগে সুযোগ থাকলে বিশ্রাম আর ঘুমিয়ে নেওয়াটা জরুরি—এ কথা হেরম্যান বারবার বলেন। কারণ, ভবিষ্যতে কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা আগাম জানা থাকে না। হয়তো বা তখন ঘুম বা বিশ্রামের সুযোগই পাওয়া যায় না। সেই সময় নার্ভ ঠিক রাখতে এই আগাম ঘুম বা বিশ্রামটা কাজে লাগে। তাই সারা দিন-রাত লম্বা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে বেশ চনমনে হয়ে যাত্রা শুরু করল তারা।

শহর ছেড়ে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রথমে গ্রামের পথ ধরল গাড়ি। দু-পাশে সবুজ ধানক্ষেত। দীর্ঘ ঝুলের কামিজ পরে, মাথায় বাঁশের টোকো বা টুপি দিয়ে ক্ষেতে কাজ করছে কৃষকরা। সুদীপ্তর দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন বাংলাদেশেরই কোনো গ্রামে আছে। গ্রাম্য মানুষজনও কাজে বেরিয়েছে পথে। সদাহাস্যময় ছোটখাটো চেহারার লোকগুলো সুদীপ্তদের গাড়িটার উদ্দেশে মাঝে মাঝে হাত নাড়ছে।

হেরম্যান সুদীপ্তর উদ্দেশে বললেন, ‘এই মানুষগুলোর মধ্যে অদম্য প্রাণশক্তি আর লড়াকু মানসিকতা লুকিয়ে আছে। আর আছে প্রবল জাতীয়তাবোধ। যে কারণে অতবড় শক্তিধর দেশ আমেরিকাও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। বোমা-গুলি-রাসায়নিক গ্যাস কোনো কিছুই এই ছোটখাটো চেহারার মানুষগুলোকে পরাস্ত করতে পারেনি। বহু ভিয়েতনামি তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সেই স্বাধীনতা যুদ্ধে।’

গাড়ি চালাতে চালাতে ডেং-ফু বলল, ‘ঠিক তাই। যুদ্ধের সময় এমন কোনো ভিয়েতনামি পরিবার ছিল না যাদের অন্তত একজন জীবন উৎসর্গ করেনি সেই স্বাধীনতা যুদ্ধে। এমনকী এখনও অনেক সময় অনেকের প্রাণ যায় সেই যুদ্ধের ফলশ্রুতি হিসাবে।’

সুদীপ্ত জানতে চাইল, ‘তার মানে?’

ডেং-ফু বলল, ‘মাইন। যুদ্ধের সময় অনেক মাইন পোঁতা হয়েছিল ভিয়েতনামের নানা অঞ্চলে। আমরাও পুঁতেছিলাম। আমেরিকানরাও পুঁতেছিল। যুদ্ধ থামার পর সে সব মাইন সব জায়গা থেকে খুঁজে বার করে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। বিশেষত আমরা যে পার্বত্য এলাকার দিকে যাচ্ছি সেসব জায়গার জঙ্গলে এখনও নানা জায়গায় মাইন পোঁতা আছে। এত বছর পরও তাদের কিছু জীবন্ত আছে। ভুলক্রমে তার ওপর পা পড়লেই বিস্ফোরণ ঘটে। এই তো কিছুদিন আগেই সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল যে দুজন কৃষক ক্ষেতে চাষ করতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে মারা গেছেন। টিফিন বক্সের মতো গোলাকার দেখতে মাইনগুলো এখনও মাঝে মাঝে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।’

হেরম্যান স্বগতোক্তি করলেন, ‘হ্যাঁ, আর্থারের লেখাটাতে ব্যাপারটা পড়েছি।’ সুদীপ্ত প্রশ্ন করল, ‘আর্থার কে?’

হেরম্যান বললেন, ‘যিনি সেই কিম-কুঈ বা সোনার কচ্ছপ দেবতাকে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। আর্থার একজন ব্রিটিশ। ইতিহাস গবেষক। আরও নির্দিষ্ট ভাবে বলতে হলে তিনি একজন ‘যুদ্ধ গবেষক’। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তিনি গবেষণা করতে গত বছর ভিয়েতনামে এসেছিলেন। বেশ কিছুদিন এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেও বেড়িয়েছেন। আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানেও ক-দিন ছিলেন এবং কিম কুঈকে দেখার সৌভাগ্য হয় তাঁর। এমনই তিনি লিখেছেন তাঁর বইতে। বলতে গেলে তাঁর লেখাটাই আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওই জায়গাতে।’

এক সময় ধানক্ষেতে মোড়া সমতলের পথ শেষ হয়ে গেল। সুদীপ্তদের চোখে পড়ল তাদের সামনে সবুজ বনানী ঘেরা পাহাড়-শ্রেণি ধাপে ধাপে উঠে গেছে আকাশের দিকে। পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল গাড়ি। দু-পাশের জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে উঠতে লাগল। তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল সুদীপ্তরা। এক সময় সুদীপ্ত জানতে চাইল, ‘কিম কুঈয়ের কেমন বর্ণনা দিয়েছেন আর্থার?’

হেরম্যান বললেন, ‘আর্থার লিখেছেন যে, তাঁকে কুরু হ্রদের পাড়ে যেতে দেওয়া হয়নি। দেবতাকে আহ্বান করে হ্রদের পাড়ে নাকি সারাদিন নানা ধর্মীয় পূজাপাঠ করে সেখানকার লোকেরা। তারপর এক সময় সূর্যাস্ত হয়। অন্ধকার নেমে চাঁদ উঠতে শুরু করে। চন্দ্রদেবতা যখন ঠিক মাথার ওপরে ওঠেন, চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে হ্রদের জলে ঠিক তখন আবির্ভূত হন কুর্ম দেবতা। আর্থারের বিবরণ অনুযায়ী প্রথমে একটা বিরাট কলেবর জেনে উঠেছিল হ্রদের মাঝখানে। তারপর সেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল পাড়ের দিকে। পুরোহিত কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন হ্রদের জলে। তাঁর কাছাকাছি এসে থামল সেই বিশাল পিঠটা। তারপর আবার সে কিছুক্ষণের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল জলতলে। পুরোহিত নাকি কচ্ছপ দেবতাকে খাবারের মণ্ড দেন। সেটা গ্রহণ করার পরই দেবতা আবার ফিরে যান। আর্থারের অনুমান প্রাণীটা দৈর্ঘ্যে অন্তত বারো ফুট হবে। অর্থাৎ আমরা কাচের বাক্সে — যাকে দেখলাম তার চেয়ে ওই সোনার দেবতা আকারে প্রায় দ্বিগুণ।

সুদীপ্ত বলল, ‘প্রাণীটাকে ‘সোনার কচ্ছপ দেবতা’ বলা হয় কেন? ওর পিঠ কি সোনা মোড়া?’

হেরম্যান বললেন, ‘আর্থারের বিবরণ অনুসারে কূর্ম দেবতার ভেসে ওঠা পিঠ থেকে একটা সোনালি আভা ছড়াচ্ছিল। তবে সেটা চাঁদের আলোর কারণেও ওরকম মনে হতে পারে এও তিনি লিখেছেন। গোল্ডেন টার্টেল নামের একধরনের ছোট টাৰ্টেল কিন্তু আছে। চায়নাতে পাওয়া যায়। তাকে ‘বক্স টার্টেলও বলা হয়। প্রাণীটার খোলটা অনেকটা বক্সের মতো দেখতে। ওই টার্টেলের মাথা বা মুখের ওপর সোনালি-হলুদ ছোপ আছে। তাই ওর নাম ‘গোল্ডেন টার্টেল’। প্রাণীটাকে যদি আমরা সত্যিই চাক্ষুষ করি তবে আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারব।’

সুদীপ্ত বলল, ‘আমরা ওখানে গিয়ে নিজেদের কী পরিচয় দেব?’

হেরম্যান বললেন, ‘ট্যুরিস্ট। বলব আমরা কুরু হ্রদ দেখতে এসেছি। ভিয়েতনামের পাহাড়ি অঞ্চলে লোকজনের জীবনযাত্রা দেখতে এসেছি। তারপর ওদের রাজি করাবার চেষ্টা করব যাতে তারা ‘কিম কুঈ’-এর আবাহন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেয় সে জন্য। নিশ্চয়ই গ্রামে মোড়ল বা পুরোহিত ধরনের কোনো লোক আছে, যে গ্রামের লোকদের মাথা। তাকেই ধরতে হবে কার্যোদ্ধার করার জন্য।’

দুপুরবেলা একবার গাড়ি থামানো হল মধ্যাহ্নভোজের জন্য। তারপর আবার শুধু নির্জন পথে চলা আর চলা। পথের দু-পাশে কোনো লোকালয় নেই। শুধু গভীর জঙ্গল। এক সময় পথের পাশে জঙ্গলের ধারে একটা সাইনবোর্ডের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাল ডেং-ফু। তার গায়ে বিপদ চিহ্নের ছবি দিয়ে লেখা আছে ‘মাইন ফিল্ড’। ডেং-ফু বলল, ‘যাতে কেউ ভুল করে এই জঙ্গলে প্রবেশ না করে তাই ওই সতর্কবার্তা। আপনাদের বলেছিলাম যে এই অঞ্চলের বহু জায়গায় এখনও মাইন পোঁতা আছে।’ সুদীপ্ত তার সেলফোনের ক্যামেরায় একটা ছবি তুলল সাইনবোর্ডটার। এগিয়ে চলল গাড়ি।

এক সময় একটা বাঁকের মুখে পৌঁছল তারা। সে জায়গার জঙ্গল একটু পাতলা। নীচে তাকিয়ে সুদীপ্তরা বুঝতে পারল তারা প্রায় পাহাড়ের মাথার ওপর পৌঁছে গেছে। আর এরপরই কিছুটা এগিয়ে শেষ হয়ে গেল রাস্তা। ডেং-ফু বলল, ‘এবার বাকি পথটা আমাদের হেঁটে উঠতে হবে।’ গাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাগ নামানো হল। তারপর সেগুলো পিঠে নিয়ে দু-পাশে জঙ্গল ঘেরা পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সবাই। মিনিট পনেরোর মধ্যেই নির্দিষ্ট জায়গাতে পৌঁছে গেল তারা। ওপরে উঠে বিস্মিত হয়ে প্রথমে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল সুদীপ্তরা। বিশাল এক হ্রদ। এত বড় হ্রদ যে পাহাড়ের মাথায় থাকতে পারে তা ধারণাই ছিল না সুদীপ্তদের। সুদীপ্তরা যেদিক থেকে পাহাড়ের মাথায় উঠেছে তার উল্টোদিকে যতদূর চোখ যায় ততদূর হ্রদের বিস্তার। হেরম্যানও বললেন, ‘এ হ্রদটা যে এত বিশাল তা আমার ধারণা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম এই কুরু হ্রদ ছোটখাটো একটা জলাশয় হবে।’

হ্রদের অপর পারেও গভীর জঙ্গল। আর এদিকের জঙ্গল আর হ্রদের পাড়ের মাঝখানের জমির কিছুটা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা গ্রাম। মন্দিরের মতো একটা স্থাপত্যের চূড়াও দেখা যাচ্ছে তার মাঝে। সম্ভবত তাকে ঘিরেই কাঠের দেওয়াল আর খড়ের ছাদঅলা বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। খড়ের ছাদগুলোর একটা বিশেষত্ব আছে। তাদের মাথাগুলো ঝুঁটির মতো করে বাঁধা। বেশ কিছু লোকজনও দূর থেকে চোখে পড়ল তাদের। গ্রামের লোকরাও দেখতে পেল তাদের। সুদীপ্তরা এগোল গ্রামের দিকে। তাদের দেখতে পেয়ে গ্রামের কিছু লোকও তাদের দিকে এগোল। সুদীপ্তরা কিছুটা এগোতেই দু-দলের সাক্ষাৎ হল। লোকগুলোর পরনে সাটিনের তৈরি লম্বা সালোয়ার আর কামিজ। কোঁচকানো মুখমণ্ডল আর নরুন চেরা চোখে পার্বত্য জনজাতির স্পষ্ট ছাপ। চুলগুলো লম্বা। কারো বেণি করা, আবার কারো চুল মাথার ওপর ঝুঁটি করে বাঁধা। চৈনিক সংস্কৃতির একটা ছাপ আছে উত্তর ভিয়েতনামের এই পার্বত্য লোকগুলোর মধ্যে। বেশ কয়েকজনের চিবুকে ছুঁচালো দাড়িও আছে। লোকগুলো এসে প্রথমে একটু বিস্মিত ভাবে ভালো করে দেখল নবাগতদের। ডেং-ফু তাদের উদ্দেশে ভিয়েতনামি ভাষায় কী যেন বলল। দু-একটা কথোপকথন হল তার সঙ্গে গ্রামবাসীদের। তারপর গ্রামবাসীরা সুদীপ্তদের নিয়ে চলল গ্রামের ভিতরে। ডেং-ফু বলল, ‘ওরা আমাদের গ্রামের মন্দিরে নিয়ে যাচ্ছে পুরোহিতের কাছে। সেই এ গ্রামের মোড়ল। সে সিদ্ধান্ত নেবে যে আমাদের এ গ্রামে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে।’