ডাকাউ ক্যাম্পের বন্দি – ৩

মুলারের সঙ্গে দীপাঞ্জনদের কথা হয়েছিল, তার গাড়িতেই ডাকাউ আসবে তারা। আর ফিরে যাবে রাইখের আনা গাড়িতে। মিউনিখের হোটেল থেকে পরদিন ঠিক সাতটা নাগাদ দীপাঞ্জনদের নিজের গাড়িতে তুলে নিলেন মুলার। নিজেই ড্রাইভ করছেন তিনি। এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে ডাকাউতে। মিউনিখ ছেড়ে অ্যাকাউ-এর রাস্তা ধরল মুলারের মার্সিডিজ গাড়িটা। ঝকঝকে, মাখনের মতো মসৃণ চার-পাঁচ লেনের রাস্তা। পথের দু-পাশে কখনও ফুল বা শস্য খেত, আবার কখনও বা ছবির মতো সুন্দর ছোট ছোট গ্রাম। চারপাশের রাস্তা-ঘাট-গ্রাম সর্বত্রই যেন একটা সচ্ছলতার ছোঁয়া। মাঠেও যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করছে কৃষকরা। দীপাঞ্জন সে সব দেখে মুলারের উদ্দেশে মন্তব্য করল, ‘আপনাদের দেশটা বেশ উন্নত।’ দীপাঞ্জনদের কথা শুনে মুলার হেসে বললেন, ‘আপনার দেশও তো অনেক উন্নত দেশ। আমাদের মতোই পরমাণুশক্তিধর দেশ। আর মিস্টার জুয়ানের দেশ জাপান তো টেকনোলজিতে সারা পৃথিবীর কাছেই বিস্ময়। অথচ দেখুন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে দুটো দেশকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছিল তারা হল জাপান আর জার্মানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তো তারা একই দিকে ছিল।’ জুয়ান বললেন, ‘আমাদের দেশে হিরোসিমার ঘটনার পর দেশটা পুনর্গঠনে গোটা জাতি এক সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে।’ গাড়ি চালাতে চালাতে মুলার বললেন, ‘আমাদের ক্ষেত্রেও তাই। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জার্মানিকে প্রথম ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিলেন হিটলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সব দিক থেকেই বিধ্বস্ত জার্মানিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর দেশে পরিণত করেছিলেন। বিশেষত জার্মানির অর্থনীতিকে তিনি খাদের কিনারা থেকে উঠিয়ে এনেছিলেন। —এ কথা বলার পর তিনি দীপাঞ্জনের উদ্দেশে বললেন, ‘শুনেছি আপনাদের দেশকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। আর্য রক্তের জাত্যাভিমানের প্রতীক ওই যে স্বস্তিক-চিহ্ন সেটাও নাকি আপনাদের দেশেও ধর্মীয় প্রতীক হিসাবে ব্যবহার হয়। বেশ কিছু প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথিও নাকি তিনি ওদের থেকে এদেশে আনিয়েছিলেন। ব্রিটিশ-বিরোধী দু-একজন বিপ্লবীকে তিনি এ-দেশে আশ্রয়ও দিয়েছিলেন।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘এ সব আমিও শুনেছি। কিন্তু তার ইহুদি নিধন-যজ্ঞ কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। কাল ডাকাউ ক্যাম্পে যা দেখলাম, সেই নারকীয় ব্যাপার স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না।’

মুলার বললেন, ‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানও হিরোসিমা- নাগাসাকিতে বোমা ফেলে কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেন। তার পক্ষ যুদ্ধে জিতল বলে তিনি নায়ক হলেন। হিটলার জিতলে তিনি নায়ক হতেন।

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, দুটোই ঘৃণ্য কাজ।’

নানা কথা বলতে বলতে মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে এগিয়ে চলল দীপাঞ্জনদের গাড়ি। আটটা নাগাদ তারা পৌঁছে গেল ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সামনে। চারপাশে সকালের নরম সুন্দর সূর্যের আলো। কিন্তু সে আলো যেন দূর করতে পারছে না ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বিবর্ণতাকে। ভয়ঙ্কর-বীভৎস এক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে বিষণ্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পটা। তার দিকে তাকিয়ে এই সুন্দর সকালেও দীপাঞ্জনের মনটাও বিষণ্ণ হয়ে গেল।

ডায়না দাঁড়িয়েছিল ঠিক ক্যাম্পের গেটেই। সকলকে সুপ্রভাত জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসল সে। মুলার জানতে চাইলেন, ‘কত সময় লাগবে যেতে?’

ডায়না জবাব দিল, ‘মিনিট পাঁচ-সাতেক। কাছেই বাড়িটা।’

জুয়ান বললেন, ‘এত সকালে গেলে তিনি বিরক্ত হবেন নাতো।’

ডায়না হেসে বলল, ‘তিনি ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। আমি গতকাল রাতেই কথা বলে রেখেছি আপনাদের ব্যাপারে। বিশেষত আপনাদের মধ্যে একজন ইন্ডিয়ান আছে জেনে তিনি খুব আগ্রহী। তিনি ওদেশের নাম বহুদিন ধরে শুনেছেন।’

দীপাঞ্জন বেশ গর্ববোধ করল কথাটা শুনে।

জুয়ান তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘মিস্টার লুবেনেস্কির সঙ্গে কি আপনাদের বরাবর যোগাযোগ ছিল?’

ডায়না বলল, না। সত্যি কথা বলতে কী উনি যে বেঁচে আছেন সে ব্যাপারটা মাস ছয়েক আগেও আমাদের জানা ছিল না। পোল্যান্ডের এক রিপোর্টার এসেছিলেন এই ডাকাউ ক্যাম্প দেখতে। দেশে ফিরে তিনি সংবাদপত্রে একটা নিবন্ধ লেখেন ডাকাউ ক্যাম্প নিয়ে। সেও কিন্তু জানত না আমার ঠাকুরদার জীবিত থাকার কথা। তবে ক্যাম্পের মিউজিয়ামের বেশ কিছু ছবি ছাপা হয়েছিল সেই লেখার সঙ্গে। তার মধ্যে ছিল মেডিকেল হাউসের সামনে দাঁড়ানো বন্দিদের সেই ছবিটা। আমার বাবা সেই ছবি দেখে ওদের দুজনকে শনাক্ত করেন। বাবা তাদের চোখে না দেখলেও তাদের কয়েকটা ফোটোগ্রাফ আছে আমাদের বাড়িতে। তবুও সন্দেহ নিরসনের জন্য আমরা ই-মেল মারফত যোগাযোগ করি ডাকাউ মিউজিয়ামের কর্ণধারের সঙ্গে। জানতে চেয়েছিলাম সেখানে জেকব লুবেনেস্কি ও হুইট লেবনেস্কি বলে কেউ বন্দি হিসাবে ছিলেন কিনা?’

অধিকর্তা জানালেন যে, হুইটের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। কিন্তু মার্কিন সেনাদল যাদের মুক্ত করেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিলেন জেকব লেবনেস্কি। এবং তিনি এখনও ডাকাউ পল্লিগ্রামেই আছেন। আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমরা ঠাকুরদাদের খোঁজ নিয়েছিলাম তাঁরা জীবিত আছেন ভেবে নয়, ঠিক তাদের অন্তিম পরিণতি কোথায় ঘটেছিল তা বোঝার জন্য। ক্যাম্প অধিকর্তার বক্তব্য শুনে আমাদের মনে আশার সঞ্চার হল। যদিও আমরা তখনও নিশ্চিত ছিলাম না ব্যাপারটা নিয়ে। আমরা তাঁকে জেকবের ছবি তুলে পাঠাতে বললাম। বিশেষত তাঁর বাম হাতের কড়ে আঙুলের ছবি। সহায়তা করলেন অধিকর্তা ভদ্রলোক…।’

ডায়নার কথার মাঝেই দীপাঞ্জন জানতে চাইলেন, ‘বাম হাতের কড়ে আঙুলের ছবি কেন?’

ডায়না বলল, ‘বাবা, ঠাকুরমার মুখে শুনেছিলেন যে ফসল কাটতে গিয়ে জেকবের কড়ে আঙুলটা যেন কী ভাবে কাস্তের কোপে উড়ে গেছিল। যাই হোক, সহায়তা করলেন মিউজিয়ামের প্রধান। জেকবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে। এই ক্যাম্পের সঙ্গে জেকবের জীবন জড়িয়ে আছে বলে অধিকর্তা তাকে সম্মান করেন। যাই হোক, তিনি জেকবের ছবি তুলে পাঠালেন। আমরা বিস্মিতভাবে দেখলাম এই জেকব লুবেনেস্কিরও বাম হাতের কড়ে আঙুল নেই। ব্যস, আমরা নিশ্চিত হয়ে গেলাম তার পরিচয় সম্পর্কে। ইতিমধ্যে আমার বাবা মারা গেলেন মাস চারেক আগে। কাজেই আমিই তাঁর টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ করে নিজের পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করলাম ছোট ঠাকুরদার সঙ্গে। তারপর আমি চলে এসেছি এখানে তাঁকে নিয়ে যেতে। আর কদিনই বা বাঁচবেন তিনি। আমরা, অর্থাৎ আমাদের পরিবার চায় যে ক-টা দিন তিনি বাঁচেন সেটা যেন স্বদেশে আমাদের পরিবারের সঙ্গেই কাটান।’

মুলার জানতে চাইলেন, ‘ডাকাউ ক্যাম্পে অন্য যে সব ভিনদেশি বন্দি ছিলেন, রুশ ব্রিটিশ, পোলিশ—তাঁরা তো সব মুক্ত হবার পর স্বদেশে ফিরে গেছিলেন। লুবেনেস্কি ফিরে যাননি কেন?’

ডায়না বলল, ‘ঠাকুরদা বলেছেন প্রথম অবস্থায় তার ওপর এত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হয়েছিল যে তিনি তাঁর নিজের নামটুকু বাদে অন্য সবকিছু, নিজের দেশ, ঠিকানা সব ভুলে গেছিলেন। বহু বছর পর নিজের দেশের কথা মনে হয়েছিল তাঁর। কিন্তু সেখানে তার নিজের কোনো লোক আছে কিনা জানতেন না। আমার বাবার যখন জন্ম হয় তার মাস সাত-আটেক আগেই জার্মান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন তাঁরা দুই ভাই। তাছাড়া এই ডাকাউ ক্যাম্পটার ওপরও অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করেন তিনি। ভয়ঙ্কর-দুঃসহ হলেও তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ক্যাম্পের সঙ্গে। এখানেই তিনি এসেছিলেন তাঁর দাদার সঙ্গে। দাদাকে তিনি এখানেই হারিয়েছেন। তাঁর স্মৃতি এ ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া এ দেশের সরকার, স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে এ দেশে অনেকটা স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা দেয়, সম্মান করে। যে বাড়িটাতে তিনি থাকেন সে বাড়িটা সরকারি। বিনা ভাড়ায় সরকার তাঁকে সেখানে থাকতে দেয়, জীবন নির্বাহের জন্য অর্থ সাহায্যও করে। এ সব ব্যাপারও তাঁর এ দেশে থাকার পিছনে অন্যতম কারণ। তবে একবার তিনি নাকি মনস্থ করেছিলেন যে, অন্তত একবার পোল্যান্ড ঘুরে আসবেন। পাশপোর্টও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বদেশে আর তার যাওয়া হয়নি।’ –এ সব কথা বলতে-বলতেই ডায়না দীপাঞ্জনদের নিয়ে পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট জায়গায়।

চারপাশে গাছ ঘেরা ছোট্ট ছিমছাম একটা বাড়ি। তবে লম্বাটে ধরনের এ বাড়িটাও অনেকটা ব্যারাকের মতোই দেখতে। কাঠের তৈরি বাড়িটার ঢালু ছাদে বরফ জমে আছে। দীপাঞ্জনরা গাড়ি থেকে নামার পর ডায়না বলল, ‘এ বাড়িটা এক সময় বানানো হয়েছিল মিউনিখ থেকে হিটলারের যে সব অনুচর ডাকাউ ক্যাম্প পরিদর্শনে আসবেন তাদের রাত্রিবাসের জন্য। তখন আশেপাশে অন্য কোনো ঘরবাড়ি ছিল না, ঠাকুরদাই আমাকে বলেছেন এ কথা। তবে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে আপনাদের একটা কথা জানিয়ে দিই যে, বয়সের ভারে মাঝে মাঝে মৃদু অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন তিনি। আশা করি, এ ব্যাপারটা নিয়ে আপনারা কিছু মনে করবেন না।’

জুয়ান বললেন, ‘কখনই নয়। বরং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারব বলে আমরা কৃতজ্ঞ।’

ডায়নার পিছু পিছু বাড়িটার ভিতর প্রবেশ করল দীপাঞ্জনরা। বাড়ির প্রথমে একটা বৈঠকখানা মতো ঘর। একটা সোফাসেট আছে যেখানে। ঘরের কোণে একটা ফায়ারপ্লেস আছে। তাছাড়া কিছু ফোটোগ্রাফ ঝুলছে ঘরের দেওয়ালে। সে ঘরে ঢুকে ডায়না দিল—‘গ্র্যান্ড পাঁ গ্র্যান্ড পা?’ কোনো জবাব মিলল না তার ডাকে।

ডায়না বলল, ‘তবে নিশ্চয়ই তিনি তাঁর ল্যাবরেটরিতে আছেন। তিনি সেখানেই অনেকটা সময় কাটান।’

দীপাঞ্জন বিস্মিতভাবে বললেন, ‘কীসের ল্যাবরেটরি?’

ডায়না বললেন, ‘হ্যাঁ, তাঁর একটা ল্যাবরেটরিও আছে। তিনি ডাকার্ড ক্যাম্পে দেখেছিলেন ‘শাওয়ার রুম’ আর মেডিকেল হাউসে কেমনভাবে বিষাক্ত গ্যাস আর বিব প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল মানুষদের। ব্যাপারটা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল ঠাকুরদার কমনে। তাই তিনি তাঁর এই ল্যাবরেটরিতে নাকি এমন রাসায়নিক আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন, যা নাকি অন্য বিষাক্ত রাসায়নিক থেকে মুক্ত করতে পারবে মানুষকে। যেমন ধরুন, আর্সেনিকের প্রয়োগে অথবা সালফাইড গ্যাসে কোনো মানুষ হয়তো মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গেছে। তখন এমন কোনো রাসায়নিক যদি সেই মুমূর্ষুর ওপর প্রয়োগ করা যায় যাতে সে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাব মুক্ত হয়ে উঠতে পারে, তেমনই কোনো রাসায়নিক আবিষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।’

ডায়নার কথা শুনে জুয়ান বললেন, বাঃ, খুব মহৎ উদ্দেশ্য। পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা যদি মারণাস্ত্র না-বানিয়ে শুধু এ কাজে নিয়োজিত থাকতেন তবে হয়তো শান্তি নেমে আসত পৃথিবীতে। আচ্ছা উনি কি রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন?’

দীপাঞ্জনদের নিয়ে একটার পর একটা ঘর অতিক্রম করতে করতে ডায়না বলল, ঠাকুরদা বলেছেন যে, এ বিষয়ে প্রথাগত শিক্ষা বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তাঁর নেই। তবে তিনি বই সংগ্রহ করে এ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। হয়তো মনের একাকিত্ব কাটাবার জন্যই তিনি এ কাজে ব্যস্ত থাকেন।’

ডায়নার কথা শুনতে শুনতে দীপাঞ্জনরা প্রবেশ করল একটা ঘরে। ল্যাবরেটরি রুম। লম্বা লম্বা টেবিলে রয়েছে নানা ধরনের কাচের পাত্র, গবেষণার নানা যন্ত্রপাতি। ঘরের দেওয়াল জুড়ে সারসার আলমারিগুলোতে রয়েছে ঠাসা বইপত্তর। একটা টেবিলে বুনসেন বার্নারের ওপর একটা পাত্রে কী যেন একটা তরল ফুটছে। সেদিকে তাকিয়ে ঈষৎ লুব্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ভদ্রলোক। ডায়না দীপাঞ্জনদের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন উনিই সেই জেকব লুবেনেস্কি।

ডায়না তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘ওঁরা এসে গেছেন গ্র্যান্ড পা।’

মৃদু চমকে উঠে দীপাঞ্জনদের দিকে মুখ ফেরালেন সেই জীবন্ত ইতিহাস। সাদা চুল, সাদা ভ্রূ, অসংখ্য বলিরেখাময় মুখ। তার চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ থাকলেও এখনও কেমন যেন বিষণ্ণতা জেগে আছে। দীপাঞ্জনদের প্রতি তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে বললেন, ‘আপনারা এসে গেছেন, চলুন তবে আপনাদের সঙ্গে কথা বলি।’

কথাটা তিনি বললেন বটে কিন্তু তারপরই আবার ঘাড় ফিরিয়ে চেয়ে রইলেন টেবিলের সেই ফুটন্ত পাত্রটার দিকে। পাত্রের নীচের দিকে ঈষৎ হলুদবর্ণের কীসের যেন আস্তরণ ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে।

মুলার জানতে চাইলেন, ‘ওটা কী বানাচ্ছেন আপনি?’

কথাটা শুনে বৃদ্ধ লুবেনেস্কি আবারও যেন একটু চমকে উঠলেন। তারপর বললেন, ‘এমন কিছু বানাবার চেষ্টা করছি যা বিষের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারে মানুষকে। চলুন এবার।’

ধীর পায়ে ল্যাবরেটরি রুমের দরজার দিকে এগোলেন ভদ্রলোক। তাঁকে অনুসরণ করে গিয়ে পাশের একটা ঘরে তাকে ঘিরে বসল সবাই। লুবেনেস্কি নিজের আসনে বসে আরও একবার তাকিয়ে নিলেন সবার মুখের দিকে। ডায়না সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর তিনি বললেন, ‘বলুন কী জানতে চান?’

জুয়ান বললেন, ‘আপনি ডাকাউয়ের জীবন্ত ইতিহাস। সে বিষয়ে কিছু শুনতে চাই আপনার কাছ থেকে?’

কথাটা শুনে বৃদ্ধ লুবেনেস্কির ঠোটের কোণে কেমন যেন একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। চোখের দৃষ্টিটাও কেমন যেন পালটে গেল। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, কী আর বলি? শস্য খেতের কাজ করছিলাম আমি আর আমার দাদা। জার্মানরা তখন আমাদের দেশটা দখল করেছে। ওদের একটা সেনা ছাউনি ছিল খেতের পাশেই। আমাদের গ্রামটা ছিল সীমান্তবর্তী গ্রাম। ওই সেনা ছাউনির ওপর নজরদারির অভিযোগে আমাকে আর দাদাকে গ্রেপ্তার করা হল। তারপর আরও কয়েকশো যুদ্ধ-বন্দির সঙ্গে ট্রেন ওয়াগানে চাপিয়ে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হল বার্লিনে। ওঃ কী ভয়ঙ্কর ছিল সেই দীর্ঘ যাত্রাপথ। অর্ধেক লোক তো বার্লিনে পৌঁছতেই পারল না। দমবন্ধ হয়ে, খিদে-তৃষ্ণাতে পথেই মারা গেল। তাদের দেহগুলো বয়লার ইঞ্জিনের চুল্লিতে কয়লার সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলা হত। দু-একজনকে তো জ্যান্তই ফেলা হয়েছিল বয়লারে। আমাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হল বার্লিনের এক বন্দি শিবিরে। সেখান থেকে কাউকে পাঠানো হল বুচেনওয়ান্ডে বা বারগেন আর আমাদের ডাকাউতে। এই তিনটে বড় ক্যাম্প ছিল জার্মানিতে আর অসউইজ্ আর বেলজেক ছিল পোল্যান্ডে। শেষ দুটো ক্যাম্পে তখন বন্দিদের স্থান সংকুলান ছিল না। আর ওই দুটো ক্যাম্প ছিল যাদের, ফুয়োবার চরম শত্রু বলে মনে করতেন, তাদের জন্য নির্ধারিত। যাই হোক ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমরা এসে উপস্থিত হলাম এই ডাকাউ ক্যাম্পে। তুষারে তখন মুড়ে আছে চারপাশ। প্রচণ্ড শীত। আর তার মধ্যেই উলঙ্গ বা অর্ধউলঙ্গভাবে থাকতে হত আমাদের। কম্বল ছাড়া রাতে ঘুমানো যায় না বলে আমরা বন্দিরা শীতের রাতে জড়াজড়ি করে সারা রাত বসে থাকতাম। প্রচণ্ড শীতে শরীর ফেটে ঘা বেরোত। কোন দিন আমাদের খাবার জুটত, কোনোদিন তাও জুটত না। খিদের জ্বালায় আমি একদল বন্দিকে অন্য এক বন্দির বরফ চাপা দেওয়া মৃতদেহও খেতে দেখেছি। মানুষ কোনো অবস্থায় থাকলে মানুষের মাংস খায়, তা অনুমান করতে পারেন? তার ওপর ছিল এস. এস. বাহিনীর অত্যাচার। কথায়-কথায় তারা রাইফেলের গুলিতে খুলি উড়িয়ে দিত বন্দিদের। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন বন্দিকে তাদের ব্যারাক থেকে নিয়ে যাওয়া হত ‘ব্যারাক-এক্স’-এ। যারা সেখানে যেত তারা আর কোনোদিন ফিরত না। গ্রীষ্মের রাতগুলোতে মাঝে-মাঝেই ব্যারাকের পিছন দিক থেকে মেশিনগানের র‍্যাট্ র‍্যাট্ শব্দ শোনা যেত। আর তার পরদিনই আমরা দেখতাম লরি ভর্তি করে মানুষের লাশ বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। দিন যত এগোতে লাগল তত বাড়তে লাগল বন্দির সংখ্যা। আর তাদের স্থান সঙ্কুলানের জন্য বিনা কারণে মারা হত পুরোনো বন্দিদের। ডাকাউ মিউজিয়ামে একটা ছবি আছে সেটা আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা জানি না। ছবিটা হল দুটো আর্মি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে পরস্পরের উলটো দিকে মুখ করে। একটা ট্রাকে গাদা করা মৃতদেহ, আর অন্য ট্রাকে সদ্য আসা বন্দির দল। তারা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে পাশের ট্রাকটার দিকে, তাদের নিশ্চিত ভবিতব্যের দিকে। ওই দুটো বছরে প্রতিদিন কত মৃত্যু যে নিজের চোখে দেখেছি তার কোনো হিসাব নেই। যুদ্ধ শেষ হবার আগে জানলার বাইরে তাকালেই দেখতাম ভসভস করে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে ওভান হাউসের মাথা থেকে। কালো ধোঁয়ায় ঢাকা থাকত ক্যাম্পের আকাশ। রোজ দলে দলে লোককে ঢোকানো হত গ্যাসচেম্বারে। তারপর তাদের মৃতদেহগুলোকে ওভানে পোড়ানো হত। মাঝে-মাঝে অবশ্য বাইরে থেকে আসা নতুন বন্দিদের মুখে খবর আসত যে, হিটলার নাকি পরাজিত হয়েছেন রুশী বাহিনীর কাছে। রুশী আর মার্কিন বাহিনী নাকি এগিয়ে আসছে জার্মানি দখল করতে। কিন্তু ব্যস, ওই পর্যন্তই। ক্যাম্পের নিয়মের কোনো পরিবর্তন হত না। শেষের দিকে অবশ্য এস, এস. গার্ডরা ভয় পেয়ে গেছিল। ক্যাম্প ছাড়তে শুরু করেছিল তারা…।’

একটানা কথাগুলো বলে বেশ কিছুক্ষণ দম নিলেন বৃদ্ধ। তারপর আবার বলতে লাগলেন—‘রোজই তো প্রত্যেক ক্যাম্প থেকে কিছু লোককে এস. এস. গার্ডরা বাইরে নিয়ে যেত যারা আর ফিরত না। রোজ ভোরবেলা আমরা ভাবতাম এবার কার পালা। তেমনই একদিন ভোরবেলা আমার আর আমার দাদারও ডাক পড়ল। ব্যারাক ফাইভ থেকে বার করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল মেডিকেল হাউসে। সে এক ভয়ঙ্কর জায়গা। মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে সেখানে কত রকম বীভৎস পরীক্ষা করা হত তা কেউ না-দেখলে বিশ্বাস করবে না। অধিকাংশ মানুষেরই মৃত্যু হত তার ফলে। বিশেষত সেখানে মানুষের শরীরে নানারকম বিষ ঢুকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া দেখা হত। সেখানেই আমি আমার দাদাকে হারালাম। —এই শেষ কথাটা বলে কেমন যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বৃদ্ধ। ফ্যাল ফ্যাল করে তিনি চেয়ে রইলেন জানলার বাইরের আকাশের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে। মুলার এরপর লুবেনেস্কির উদ্দেশে বলল, ‘পর্যটকদের জন্য লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে ডাকাউ ক্যাম্পে এক’ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সামনের চত্বরটাতে দর্শকদের জন্য অন্ধকার নামার পর বসার ব্যবস্থা হবে। আলো ছুঁয়ে যাবে ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গাতে। কখনও বিভিন্ন চত্বরে, কখনও ব্যারাক-এক্স বা ওই বাড়িটার ওপর, যেখানে আছে গ্যাসচেম্বার আর ওভাল হাউস। আলো সে জায়গাগুলোতে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই শুরু হবে ধ্বনির খেলা। কখনও শোনা যাবে মার্চপাস্টরত এস. এস. গার্ডদের ভারী বুটের শব্দ, ‘হাইল হিটলার ধ্বনি’, কখনও শোনা যাবে বন্দিদের আর্তনাদ, মেশিনগানের শব্দ। আর এর সঙ্গে-সঙ্গে চলবে ধারাবিবরণী। আচ্ছা রাতের অন্ধকারে আর কী শব্দ শুনতে পেতেন আপনারা?’

বৃদ্ধ লুবেনেস্কি মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘আপনার কথাগুলো ঠিকই আছে, তার ওই মেডিকেল হাউসের ওপর অবশ্যই আলো ফেলবেন। সারা রাত ধরে বীভৎস চিৎকার কিন্তু ভেসে আসত ওই জায়গা থেকেই। ক্রিমেশন হাউস মানে ওই গ্যাস চেম্বার যে বাড়িতে আছে, সে-বাড়ি থেকে কোনো শব্দ বাইরে বেরোত না। এছাড়া রাতে শোনা যেত ক্যাম্পে আর্মি ট্রাকগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ। সারা রাত ক্যাম্পে ঢুকত বেরোত তারা। আর শোনা যেত প্রহরারত এস.এস. গার্ডদের চিৎকার——হু ইজ দেয়ার? হল্ট।’

মুলার বললেন, ‘বাঃ বাঃ, দারুণ ব্যাপার! দারুণ শব্দ। দর্শকদের বুকে অন্ধকারের মধ্যে এ শব্দ কাঁপন ধরিয়ে দেবে!’ —এই বলে তিনি পকেট থেকে নোটবুক বার করে সম্ভবত শব্দটা নোট করে নিলেন।

লুবেনেস্কি বললেন, ‘শুধু আজকের দর্শকদেরই নয়, এই ‘হল্ট’ শব্দটা কাঁপন ধরাত আমাদের মনেও। আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম এরপর রাইফেলেরও কোনো শব্দ কানে আসে কিনা তার জন্য। অনেক সময় কোনো কোনো দুঃসাহসী বন্দি ক্যাম্প ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালাতে যেত। আর রাতে এই হল্ট শব্দটার পরই তাদের উদ্দেশ্যে ছুটে যেত রাইফেলের বুলেট, রাইফেলের বুলেট আর লোকটার শেষ আর্তনাদে বিদীর্ণ হয়ে যেত রাত্রির নিস্তব্ধতা।’

লুবেনেস্কির এই কথাগুলোও তার ডায়েরিতে নোট করে নিলেন মুলার। তারপর সম্ভবত তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার মোবাইল বেজে উঠল। ফোনটা ধরে কয়েকটা কথাবার্তা বলার পর মুলার সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আমাকে মাফ করবেন। মিউজিয়ামের কিউরেটর আমাকে জরুরি তলব করেছেন। এখনই যেতে হবে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’ —এই কথা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। লুবেনেস্কি দীপাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারাও চলে যাবেন নাকি? তাড়া না-থাকলে বসুন। আমি তো তেমন কথা বলার লোক পাই না। যদিও আমি একঘেয়ে কথা বলে যাচ্ছি। তবু কথা বলতে ভালো লাগে।’

জুয়ান বললেন, ‘না, না, আমাদের কোনো তাড়া নেই। আপনার মতো মানুষের দুর্লভ সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ কজনের ভাগ্যে হয়?’

মিস্টার মুলারের ঘরে থাকার ইচ্ছা ছিল। তার মুখ দেখে বোঝা গেল যে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজের ডাকে চলে যেতে হচ্ছে তাঁকে। ডায়নাও চেয়ার ছেড়ে উঠল তাঁকে বাড়ির বাইরে এগিয়ে দেওয়ার জন্য। দীপাঞ্জনরা বসে রইল ঘরের মধ্যে।