৫
পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে তৈরি হতে সাড়ে আটটা মতো সময় লাগল দীপাঞ্জনদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। দীপাঞ্জন দরজা খুলতেই দেখল ডায়না দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্রভাত বিনিময়ের পর ডায়না মিষ্টি হেসে বলল, ‘আমাদের সবাইকে এখন একবার কিউরেটর অফিসে যেতে হবে। গ্র্যান্ড-পা তো কাল ফিরে যাচ্ছেন তাই কিউরেটর সাহেব ওর জন্য একটা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করেছেন। উনি আমাদের সবাইকে নিয়ে যেতে লোক পাঠিয়েছেন।
দীপাঞ্জন দেখল সত্যি দুজন মিউজিয়াম কর্মী কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছেন লুবেনেস্কিকে নিয়ে।
দীপাঞ্জনরা তৈরি হয়েই ছিল, সঙ্গে-সঙ্গে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। লুবেনেস্কিকে মধ্যমণি করে ব্যারাকের অলি-গলি বেয়ে এগোল কিউরেটরের অফিসের দিকে।
সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশের ব্যারাকের ছাদে। সূর্যালোকে রাতের সেই থমথমে ভাবটা কেটে গেলেও চারপাশের পরিবেশের বিষণ্ণতা কিন্তু মুছে যায়নি। কালের নিয়মে এ ব্যারাকগুলো যতদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে ততদিন এই বিষণ্ণতা ঘিরে থাকবে ডাকাউ ক্যাম্পকে।
চলতে-চলতে জুয়ান হঠাৎ লুবেনেস্কিকে প্রশ্ন করলেন, ‘কাল রাতে ঘরের বাইরে দেখলাম আপনাকে?’
মুহূর্তের জন্য একবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন লুবেনেস্কি। তারপর জবাব দিলেন, ‘চলেই তো যাব। তাই রাতে উঠে ঘুরে দেখছিলাম চারপাশটা। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে।’
ডায়না বলে উঠল, ‘তাই নাকি? আমি টের পাইনি তো! কত রাতে?
জুয়ান মৃদু হেসে বললেন, ‘মাঝ রাতে।’
ডায়না সঙ্গে-সঙ্গে মৃদু ভর্ৎসনার ঢঙে বলল, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি গ্র্যান্ড-পা। অন্য কিছুর ভয় না থাক সাপখোপ তো থাকতে পারে।’
তার কথা শুনে মৃদু হাসলেন বৃদ্ধ লুবেনেস্কি।
দীপাঞ্জন আর জুয়ান দুজনেরই মনে পড়ে গেল গত রাতে সেই এস.এস গার্ডদের কথা। কিন্তু সে প্রসঙ্গ উত্থাপন করা সমীচীন মনে হল না তাদের। হয়তো ডায়না কথাটা জেনে ভয় পেতে পারে। জুয়ান শুধু মিউজিয়ামের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্যাম্পের ভিতরে কি রাতে পাহারার বন্দোবস্ত আছে?’
লোকটা জবাব দিল, ‘ক্যাম্পের ভিতরে থাকে না, তবে বাইরের মেইন গেটে থাকে। ক্যাম্পের ভিতরে পাহারার বিশেষ দরকার হয় না। কারণ স্থানীয় লোকেরা এড়িয়ে চলে এ জায়গাটা। বুঝতেই পারছেন এক সময় এখানে হাজারে হাজারে লোকের মৃত্যু হয়েছে, কাজেই…’
দীপাঞ্জন আর জুয়ানের মধ্যে মৃদু দৃষ্টি বিনিময় হল লোকটার জবাব শুনে। তবে এ প্রসঙ্গে তারা আর কোনো কথা বাড়াল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল কিউরেটরের অফিসে। কিউরেটর তাদের সবাইকে আপ্যায়ন করে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে।
মিউজিয়ামের জনা কুড়ি কর্মী আগে থেকেই উপস্থিত ছিল সেখানে। ঘরোয়া সংবর্ধনা-অনুষ্ঠান। শুরুতে কিউরেটর বেশ কিছু কথা বললেন লুবেনেস্কির সম্বন্ধে। তারপর লুবেনেস্কিও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন তার বিভীষিকাময় ক্যাম্প-জীবন সম্পর্কে। মিউজিয়ামের তরফে বেশ কিছু স্মারক তুলে দেওয়া হল ডাকাউ ক্যাম্পের জীবন্ত-ইতিহাস লুবেনেস্কির হাতে।
বক্তৃতা, সংবর্ধনা-পর্ব মিটে যাবার পর লুবেনেস্কির সম্মানে একটা ছোট ‘টি-পার্টির’ আয়োজন করেছিলেন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। একটা সোফাতে বসল দীপাঞ্জন আর ডায়না। অন্য একটা সোফায় লুবেনেস্কি আর প্রফেসর জুয়ান। চায়ের কাপ নিয়ে তাতে চুমুক দিচ্ছিল দীপাঞ্জন। পাশেই একটা টেবিলে লুবেনেস্কির পাওয়া উপহারগুলো রাখা। হঠাৎ তার মধ্যে থেকে একটা জিনিস তুলে নিল ডায়না। একটা অ্যালবাম। যদিও সেটাকে খাতা বলাই ভালো। তার পাতায় আঠা দিয়ে সাঁটা আছে ডাকাউ ক্যাম্প সম্পর্কে বিভিন্ন খবরের কাগজের কাটিং আর বিভিন্ন ছবির ফোটোকপি। ডায়না খাতাটা খুলল। দীপাঞ্জন ঝুঁকে পড়ল ডায়নার হাতের খাতাটার ওপর। তবে ডায়নার একটা ব্যাপার দেখে বেশ অস্বস্তি হল দীপাঞ্জনের। ঠোটে আঙুল ছুঁইয়ে থুতু দিয়ে খাতার পাতা ওল্টাচ্ছে ডায়না। এই বদভ্যাস অনেকের থাকে। ডায়না এসে থামল খাতার সেই পাতাটায়, যেখানে মেডিকেল হাউসের সামনে লুবেনেস্কি আর দাদার সেই ছবিটার ফোটোকপি আছে। ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে। হঠাৎ কিউরেটর ম্যাথুজের গলা শোনা গেল, ভদ্রমহোদয়গণ, এবার আমরা একটা ছবি তুলব জীবন্ত ইতিহাস মিস্টার লুবেনেস্কির সঙ্গে। এ ছবিও মিউজিয়ামে টাঙানো থাকবে।’
কথাটা শুনে কর্মীরা উৎসাহিত হয়ে ঘরের মাঝখানে জড়ো হল ঠিকই, লুবেনেস্কিও উপস্থিত হলেন দীপাঞ্জনদের সঙ্গে নিয়ে তাদের মাঝখানে। কিন্তু কে তুলবে ছবিটা? সবাই তো এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী থাকতে চায়। ম্যাথুজ বললেন, ‘কিন্তু ছবিটা কে তুলে দেবেন?’
জনতা নিরুত্তর। ক্যামেরা হাতে একটু বিব্রতভাবে ঘরের চারপাশে তাকালেন তিনি তার অবস্থা বুঝতে পেরেই সম্ভবত ডায়না বলল, ‘ক্যামেরাটা দিন আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।’
ডায়নাই ছবিটা তুলল। লুবেনেস্কি, মিউজিয়ামকর্মীদের সঙ্গে একই ফ্রেমে বন্দি হল জুয়ান আর দীপাঞ্জনও। জুয়ান বললেন, ‘ব্যাপারটা বেশ গর্বের হল। কেউ যদি মিউনিখ আসে তবে আমরা বলতে পারব যে জীবন্ত ইতিহাস লুবেনেস্কির সঙ্গে আমাদেরও ছবি রয়েছে ডাকাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মিউজিয়ামে।’
ফোটো শ্যুট হবার পরই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। লুবেনেস্কিসহ দীপাঞ্জনদের দরজার বাইরে এগিয়ে দেবার সময় কিউরেটর বললেন, ‘নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ান ক্যাম্পের যেখানে খুশি। সপ্তাহের আজকের দিনটাতে মিউজিয়াম বন্ধ থাকে। আজ ট্যুরিস্টদের ঝামেলা নেই। আপনাদের কেউ বিরক্ত করবে না।’
কিউরেটরের থেকে বিদায় নিয়ে ব্যারাক সেভেনের দিকে রওনা হল দীপাঞ্জনরা। বেলা দশটা বাজে। হাঁটতে হাঁটতে লুবেনেস্কি জুয়ানকে বললেন, ‘আপনারা বরং ক্যাম্পটা ভালো করে ঘুরে দেখুন। আমি ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়ব। কাল বেশি রাত অব্দি জেগেছি। শরীর ধকল নিতে পারছে না। সন্ধ্যাবেলা উঠে আমি শেষবারের জন্য একবার ক্যাম্পটা ঘুরে দেখব।’
ব্যারাক সেভেনে ফিরে আসার পর দীপাঞ্জনদের থেকে বিদায় নিয়ে লুবেনেস্কি ডায়নাকে নিয়ে ঢুকে গেলেন তার থাকার জায়গাতে। তারা চলে যাবার পর দীপাঞ্জন জুয়ানকে বলল, ‘এবার কী করবেন? সবে তো মাত্র দশটা বাজে।’
জুয়ান বললেন, ‘কী আর করব? ক্যাম্পটা নিজেদের মতো করে ভালোভাবে দেখে নেই। চল, প্রথমে ওই মেডিকেল হাউসটার দিকে যাই।’
জুয়ানের কথামতো দীপাঞ্জন তার সঙ্গে এগোল সে দিকে।
বেশ বড় বাড়িটা। দরজা-জানলা সব কত দিন ধরে বন্ধ আছে কে জানে! বাড়িটার বাইরে এখনও কাঁটাতারের বেড়া রয়ে গেছে। বাড়িটার ভিতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই। কাজেই কাঁটাতারের বেড়ার পাশ বরাবর দীপাঞ্জনরা প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল বাড়িটা। এক সময় বাড়িটার পিছন দিকে উপস্থিত হল তারা। বাড়ির পিছন দিকে কোনো জানলা নেই তবে একটা দরজা আছে। সেই দরজার দিকে তাকিয়ে দীপাঞ্জনরা একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করল। দীপাঞ্জনরা খেয়াল করে দেখেছে যে, যে সব ব্যারাকবাড়ি বা অন্য বাড়িগুলোর ভিতর টুরিস্টদের ঢোকার প্রয়োজন নেই বা মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সেই বাড়িগুলোতে ঢোকার অনুমতি দেবার প্রয়োজনবোধ করে না, সেখানে দরজা খুলে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্যে আড়াআড়িভাবে দুটো কাঠের তক্তা পেরেক ঠুকে মারা থাকে কাঠের দরজার পাল্লার গায়ে। কিন্তু সেই তক্তা দুটো খুলে মাটিতে পড়ে আছে দরজার সামনে। তার পাল্লা দুটোও যেন ঈষৎ ফাঁক করা! আর একটা লোহার রডও সামনে পড়ে আছে। যে ধরনের লোহার শিক ক্যাম্পগুলোর জানলায় বসানো থাকে। জুয়ান বললেন, ‘সম্ভবত ওই দরজা দিয়ে বাড়িটার ভিতরে প্রবেশ করেছিল কেউ। লুবেনেস্কি, নাকি সেই এস. এস. গার্ড?’
কৌতূহলী হয়ে কাঁটাতারের ফাঁক গলে একটু কসরত করে তার ভিতরে ঢুকে বাড়িটার পিছনের সেই দরজার সামনে পৌঁছে গেল দীপাঞ্জন আর জুয়ান। জুয়ান মাটিতে পড়ে থাকা লোহার শিকটাকে হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘দেখো শিকটায় একটা মরচে পড়ে ক্ষয়ে গেছে। নির্ঘাত ক্যাম্পের কোনো জানলা থেকে এটা উপড়ে এনেছে কেউ। তারপর এটা দিয়ে চাড় দিয়ে কাঠের পাটাতন সরিয়ে দরজা খুলেছে।’
দরজার পাল্লা দুটো সত্যিই খোলা। দীপাঞ্জন আর জুয়ান উঁকি দিল দরজার ওপাশে। সেখানে খেলা করছে জমাটবাঁধা অন্ধকার। দীপাঞ্জন পাল্লা টেনে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিল কিন্তু জুয়ান বললেন, ‘থাক, ভিতরে ঢোকার দরকার নেই। সঙ্গে টর্চও নেই। এতদিনের পুরোনো বাড়ি, ভিতরে সাপের বাসা থাকতে পারে।’
দীপাঞ্জন আর ভিতরে ঢুকল না। জায়গাটা থেকে সরে আবার কাঁটাতারের বাইরে এসে দাঁড়াল তারা। ঠিক তখনই বাড়িটার অন্য দিক বেয়ে যেখানে উপস্থিত হলেন একজন, মুলার। দীপাঞ্জনদের দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন তিনি। জুয়ান তাকে সুপ্রভাত জানিয়ে বললেন, ‘আপনি কখন এলেন?’
মুলার বললেন, ‘এই তো একটু আগে ক্যাম্পে ঢুকলাম। আপনারা? লুবেনেস্কি কোথায়?’
দীপাঞ্জন বলল, ‘তিনি একটু আগে তার থাকার জায়গায় ঢুকেছেন বিশ্রাম নিতে। বিকালের আগে বাইরে বেরোবেন বলে মনে হয় না। আমরা ক্যাম্পটা আর একবার ঘুরে দেখতে বেরিয়েছি।’
মুলার বললেন, ‘আচ্ছা ঘুরে দেখুন।’ –এই বলে তিনি দীপাঞ্জনদের সঙ্গে আর কোনো কথা না-বলে হাঁটতে শুরু করলেন ক্রিমেশন হাউসের দিকে।
জুয়ান বললেন, ‘মুলারের আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত মনে হল। যেন তিনি অন্য কোনো কারণে এখানে এসেছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে এখান থেকে চলে গেলেন’
বাড়িটাকে বেড় দিয়ে আবার বাড়ির সামনের দিকে চলে এল তারা। জুয়ান বললেন, ‘চলো পুরো ক্যাম্পটা একবার পাক খেয়ে আসি। এগোল দীপাঞ্জনরা। কয়েক পা হাঁটতেই তারা দেখতে পেল ডায়না আসছে। তার গলায় ঝুলছে টেলিলেন্সঅলা বেশ বড় একটা ক্যামেরা। ডায়না তাদের সামনে এসে প্রশ্ন করল, ‘মেডিকেল হাউসে গেছিলেন? বাড়িটার ভিতর ঢোকার ব্যবস্থা আছে নাকি?’
দীপাঞ্জন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ওদিকে গেছিলাম। তবে ও-বাড়িটার ভিতর ঢোকা যায় না। সদর দরজায় তালা ঝুলছে।’
ডায়না এরপর বলল, ‘গ্র্যান্ড-পা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি ছবি তুলতে বেরোলাম। আর তো কোনোদিন আসব না এখানে। ছবি তুলে নিয়ে যাই। আচ্ছা মিস্টার মুলার ক্যাম্পে ফিরেছেন কিনা জানেন? সংবর্ধনা-সভায় ওঁকে তো দেখলাম না।’
জুয়ান বললেন, ‘এই তো একটু আগেই মেডিকেল হাউসের পিছনেই তার সঙ্গে আমার দেখা হল। তিনি সম্ভবত ওই ক্রিমেশন হাউসের ওদিকে গেলেন।’
ডায়না বলল, ‘তবে আমি ওদিকটাতে যাই। ওই গ্যাসচেম্বার আর ওভানগুলোর ছবি নেব। ওই বাড়িটা কেমন যেন গা ছমছমে। আজ তো আবার ট্যুরিস্টও নেই, কোনো মিউজিয়ামের লোকও নেই। মুলার থাকলে তাকে নিয়েই বাড়িটার ভিতরে ঢুকব।’ –এই বলে ডায়না এগোল সেদিকে। দীপাঞ্জনরাও আবার সামনের দিকে পা বাড়াল। নিঃস্তব্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে সারসার ব্যারাক। অধিকাংশ ব্যারাকের দরজাতেই তালা ঝুলছে অথবা দরজাটা কাঠের পাঠাতন ঠুকে বন্ধ করা। তাদের মাঝে মাঝে কোথাও এক টুকরো ফাঁকা জমি। ঘুরতে ঘুরতে দুটো নতুন জায়গা তাদের চোখে পড়ল। একটা জায়গাতে সারসার দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা ফাঁসি কাঠ। আর অন্য একটা জায়গাতে একটা শান বাঁধানো চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে ফুট দশেক উঁচু আর কুড়ি-পঁচিশ ফুট চওড়া একটা দেওয়াল। কংক্রিটের দেওয়ালটা আজও তার বুকে গুলির ক্ষত চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়ারিং স্কোয়াডের দেওয়াল। এই দেওয়ালেই দাঁড় করিয়ে হতভাগ্য বন্দিদের গুলি করে মারত এস.এস ঘাতক বাহিনী। ডাকাউ ক্যাম্পের ভিতর ঘণ্টাখানেক ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরা-ফেরা করে নিজেদের থাকার জায়গায় ফিরে এল তারা। আগের রাতে ইঁদুরের উপদ্রবে ভালো ঘুম হয়নি তাদের। ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে শুয়ে পড়ল তারা দুজন।
ঘুম থেকে উঠে বিকালবেলা যখন দীপাঞ্জনরা বাইরে এসে দাঁড়াল তখন সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। লুবেনেস্কি একটা লাল পুলওভার গায়ে দিয়ে তাঁর ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দীপাঞ্জনদের দেখে তিনি হাত নেড়ে কাছে ডাকলেন। তারা গিয়ে দাঁড়াল লুবেনেস্কির সামনে। লুবেনেস্কি কয়েক মুহূর্ত দীপাঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বললেন ‘কাল তো আমি ফিরে যাচ্ছি। আপনারাও নিশ্চয়ই ক-দিন পর নিজের দেশে ফিরে যাবেন। আর হয়তো কোনোদিন দেখা হবে না আমাদের। তবে যাবার আগে আপনি আমাকে একটা ব্যাপারে একটু সাহায্য করবেন? হয়তো বা তাতে উভয়পক্ষেরই লাভ হবে।’
লুবেনেস্কির কথা শুনে দীপাঞ্জন মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘কী সাহায্য করতে হবে বলুন। সম্ভব হলে অবশ্যই করব।’
লুবেনেস্কি বলতে গিয়েও হঠাৎ যেন থেমে গেলেন। তারপর কিছুটা তফাতে দুটো ব্যারাক বাড়ির মাঝখানে যে গলিটা আছে সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে ওখানে?’
গলিটা থেকে হাসি মুখে বেরিয়ে এলেন মুলার। লুবেনেস্কির উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘কালতো আপনি ভোরেই ফিরে যাবেন। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।’
লুবেনেস্কির মুখ দেখে দীপাঞ্জনের মনে হল যে তিনি মুলারের কথাটা ঠিক বিশ্বাস করলেন না। লুবেনেস্কি তাকিয়ে রইলেন মুলারের দিকে। মুলার তাঁর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘দেশে ফিরে যাবার পর আপনার সুস্থ জীবন কামনা করি। আমাদের দেশ মানে কিন্তু শুধু হিটলার নয়, আমরাও। যারা আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আমাদেরও মনে রাখবেন।’
লুবেনেস্কি এবার মৃদু হেসে মুলারের সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, ‘আমি জানি এদেশের মানুষরা খুব ভালো। তারাই তো সারাজীবন আমাকে ঠাই দিল এ দেশে। ঈশ্বরের কাছে আপনারও মঙ্গল কামনা করি।’
মুলার বললেন, ‘এবার আমাকে মিউনিখ ফিরতে হবে।’ –এ কথা বলে তিনি দীপাঞ্জন আর জুয়ানকেও শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেরার পথ ধরলেন।
তিনি চলে যাবার পর লুবেনেস্কি সন্দিগ্ধভাবে বললেন, ‘যদিও মুলার বললেন যে ঊনি আমার সঙ্গেই দেখা করতে আসছিলেন কিন্তু সম্ভবত উনি ওই গলির আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছিলেন। আমি অনেকক্ষণ ধরেই দেখতে পাচ্ছিলাম ওঁর জুতোটা!’
দীপাঞ্জন বলল, ‘আপনি আমাকে কী সাহায্য করতে বলছিলেন?’
ঠিক এই সময় ব্যারাক বাড়িটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ডায়না। লুবেনেস্কি, দীপাঞ্জনকে বললেন, ‘কথাটা বলতে গিয়ে বাধা যখন পড়ল, তখন থাক। কাল সকাল পর্যন্ত তো আমরা সবাই এখানেই আছি। রাতে আপনাকে ডেকে নেব। সব কথা বলব।’
ডায়না জানতে চাইল, ‘তোমরা কী কথা নিয়ে আলোচনা করছ?’
বৃদ্ধ লুবেনেস্কি বললেন, ‘তোমাকেও যথাসময় বলব কথাটা। চল সূর্য ডোবার আগে একবার সকলে মিলে হেঁটে আসি। লুবেনেস্কির কথামতো তার সঙ্গে ক্যাম্পের গলি বেয়ে হাঁটতে শুরু করল দীপাঞ্জনরা। হাঁটতে-হাঁটতে লুবেনেস্কি মাঝে-মাঝে থামছেন, কখনও বা হাত দিয়ে স্পর্শ করছেন কোনো ব্যারাকের দেওয়াল। কখনও বা শূন্য দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে থাকছেন কোনো ব্যারাকের দিকে। তাকে দেখে দীপাঞ্জনরা বুঝতে পারল যে, এই বিদায়বেলায় বেশ আবেগমথিত হয়ে পড়েছেন তিনি। দীপাঞ্জনদের নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে একটা ব্যারাক বাড়ির সামনে উপস্থিত হলেন তিনি। জীর্ণদশা ব্যারাক-বাড়িটির। জানলা-দরজা সব খসে পড়ার উপক্রম। ভাঙা জানলার ভিতরে জমাটবাঁধা অন্ধকার। বেশ কিছুক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ। তারপর পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের পাউচ বার করে নীচু হয়ে জায়গাটা থেকে কিছুটা মাটি নিয়ে পাউচে রেখে ডায়নার উদ্দেশে বললেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমার কবরে এই মাটিটা ছড়িয়ে দিও। ডাকাউ ক্যাম্পে আসার পর এই বাড়িটাতেই সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছিলাম আমরা দুই ভাই। এখানেই আমাদের রাখা হয়েছিল অন্য বন্দিদের সঙ্গে। তারপর এখান থেকে আমাদের দু-জনকে নিয়ে যাওয়া হয় মেডিকেল হাউসে, আর আমাদের সঙ্গীদের অধিকাংশকেই পাঠানো হয় গ্যাসচেম্বারে। ভিতরে যদি ঢোকা যেত তবে দেখাতে পারতাম যে ঘরের কোনো কোণে প্রবল শীতের রাতে আমরা দুই ভাই জড়াজড়ি করে বসে থাকতাম।’
লুবেনেস্কির কথাগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিল সবার মনে। ছলছল চোখে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন লুবেনেস্কি। দীপাঞ্জনরাও নিশ্চুপ ভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। এক সময় ডায়না তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এবার ফিরে চলো। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ঠান্ডা বাতাসও গায়ে লাগছে। হয়তো বা তুষারপাত শুরু হবে।
সত্যি কখন যেন সূর্য ডুবে গিয়ে চারপাশে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ব্যারাকের গলিগুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢাকতে শুরু করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডায়নার হাত ধরে মাথা নীচু করে ফেরার পথ ধরলেন লুবেনেস্কি। দীপাঞ্জনরা অনুসরণ করল তাঁকে। ব্যারাক সেভেনে ফিরে ডায়নাকে নিয়ে তিনি ঢুকে পড়লেন নিজের ব্যারাক বাড়িতে। দীপাঞ্জনরাও ঢুকল নিজেদের জায়গাতে। ঠিক সেই সময়তেই অন্ধকারের চাদরে মুড়ে গেল ডাকাউ ক্যাম্প। নিজেদের ঘরে ঢুকে দীপাঞ্জন, জুয়ানকে বলল, ‘লুবেনেস্কি কী সাহায্যের কথা বলবেন মনে হয়?’
জুয়ান বললেন, ‘ঠিক বুঝলাম না। তবে তিনি তো তোমাকে ডাকবেন বলে মনে হয়। ব্যারাক বাড়ির লম্বাটে ঘরটায় ম্যাটম্যাটে আলোর নিচে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে-বলতে লুবেনেস্কির ডাকের প্রতীক্ষা করতে লাগল দীপাঞ্জনরা।
