ঈগলের পালকে রক্তের দাগ – ২

দীপাঞ্জনদের দলটা প্রবেশ তোরণের কাছে পৌঁছতেই দেখতে পেল বেশ কয়েকটা গাড়ি ঢুকেছে চত্বরটাতে। লোকজন গাড়িগুলো থেকে বড় বড় কাঠের বাক্স, ট্রলি ইত্যাদি নামাতে শুরু করেছে। সেই শুটিং পার্টি। দীপাঞ্জনরা আর একটু এগোতেই ভিড়ের মধ্যে থেকে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। সোনালি চুলের লোকটার বয়স বেশি নয়। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হবে। লোকটা বলল ‘আপনারাই তো এখানে, মানবাধিকার আন্দোলনে যোগ দিতে এসেছিলেন তাই না? এখানকার একটা সান্ধ্য দৈনিকে গতকাল আপনাদের একটা গ্রুপ ছবি বেরিয়েছিল দেখেছি।’

মার্টিন বললেন, হ্যাঁ। আমি ব্রাসেলস-এ থাকি। আর এঁরা এসেছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। আপনার পরিচয়টা?’ লোকটা বলল, আমার নাম বার্ক। মার্কিন নাগরিক। বেশ কিছুদিন হলিউডে এক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারের কাছে কাজ শিখেছি। এখন নিজেই ছোটখাটো তথ্যচিত্র বানাই। এর আগে বসনিয়াতে দুর্ভিক্ষের ওপর একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছি।

মার্টিন বললেন, ‘বাঃ বেশ ভালো ব্যাপার। হিউম্যান জ্যু নিয়ে দু-একটা হলিউড মুভি হলেও তথ্যমূলক কাজ খুব একটা হয়নি। যেমন হয়েছে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলো নিয়ে।’

বার্ক বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। সত্যি কথা বলতে কী গতকাল খবরের কাগজে আপনাদের গ্রুপ ছবিটা দেখার পর থেকে আমি আপনাদের খুঁজছিলাম। আমার সৌভাগ্য এখানে এসে কাকতালীয়ভাবে আপনাদের সাথে দেখা হয়ে গেল।

মার্টিন বললেন, ‘কেন খুঁজছিলেন?’

বার্ক এরপর যা বললেন তাতে অবাক হয়ে গেল সবাই। তিনি বললেন, আপনারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন। সেখানকার সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত। আপনারা যদি আমাকে এই তথ্যচিত্র নির্মাণে সাহায্য করেন তবে কৃতজ্ঞ থাকি। দু-ধরনের সাহায্য। প্রথমত পরামর্শ দান। ধরুন আপনাদের মধ্যে যারা এশীয় আছেন তাঁরা সে মহাদেশের মানুষ সম্পর্কে আমার থেকে বেশি জানেন। পণ্ডিত-মানুষ আপনারা। আমি বই পড়ে আর কতটুকু জেনেছি। আর দ্বিতীয় সাহায্য হল তথ্যচিত্রের কিছু চরিত্রে অভিনয়। এখানে তো পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ থাকত, আপনারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে ব্যাপারটা আরও ন্যাচারাল হবে।

মার্টিন, বার্কের কথা শুনে হেসে বললেন, ‘প্রথম ব্যাপারটা তো না হয় বুঝলাম। এখানে প্রফেসর জুয়ান, ডক্টর তুর্গিনেভের মতো মানুষরা রয়েছেন যাঁরা অনেক কিছু জানেন, অন্যরাও জানেন, হয়তো তাঁরা আপনাকে সাহায্য করলে আপনার সুবিধা হতে পারে ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাপারটা? এখানে তো কেউ অভিনেতা নন? আপনি আগে থেকে অ্যাক্টর নির্বাচন করেননি?

বার্ক বললেন, ‘করেছিলাম তো। স্থানীয় কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রী। মেকাপ দিয়ে তাদেরই কাউকে আফ্রিকান, এশিয়ান বা রেড ইন্ডিয়ান বানাতাম। তাদের সাথে আমার কথাবার্তাও হয়েছিল আমেরিকায় বসে। কিন্তু এখানে আসার পর স্ক্রিপ্ট শুনে অভিনেতাদলের মধ্যে যিনি সিনিয়ার তিনি রাজি হলেন না। আর তার দেখাদেখি অন্য অভিনেতারাও বেঁকে বসলেন। একজন অভিনেতা তো আমার মুখের ওপরই বলে দিলেন ‘দেখুন মিস্টার, পয়সা আর খ্যাতির জন্য শ্বেতাঙ্গদের, নিজের জাতির কলঙ্ক বিক্রি করতে পারব না।’ আমি অনেক চেষ্টা করেও ব্যাপারটা তাদের বোঝাতে পারলাম না। আর হলিউড থেকে অভিনেতা আনা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কারণেও আমি আপনাদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছি। অভিনয় না-জানলেও চলবে। কস্টিউমটাই আসল। প্রত্যেকের মাত্র কয়েকটা করে শট আর ডায়লগ। ওটুকু আমি আপনাদের শিখিয়ে দিতে পারব।’

বার্কের কথা শুনে হাঙ্গেরি থেকে আগত মানবাধিকার কর্মী পাউল বললেন, ‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু আমরা সবাই খুব ব্যস্ত মানুষ। নিজেদের দেশে নানা কাজ ফেলে এই কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলাম। আমাদের কি এখানে এভাবে থাকা সম্ভব?’

‘হ্যাঁ, জানি, আপনারা প্রত্যেকেই ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু তার পাশাপাশি এটাও জানি যে আপনাদের বিচার-বুদ্ধি, বিবেক, ভাবনা-দর্শন-দায়িত্ববোধ সাধারণ মানুষের থেকে অনেক উন্নতস্তরের। আপনাদের বিবেকের ওপর আমার কিন্তু আস্থা আছে।’ —হঠাৎ একটা অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সেদিকে তাকাল জুয়ান-দীপাঞ্জনদের পুরো দলটা। আর যাকে তারা দেখতে পেল, বেশ অবাকই হয়ে গেল তাকে দেখে। কোটপ্যান্ট পরা একটা লোক কিন্তু তার চেহারাটা বড় অদ্ভুত। মোটাসোটা লোকটার উচ্চতা খুব বেশি হলে মাত্র পৌনে চার ফুট হবে। যেন বামন অবতার আবির্ভূত হয়েছেন তাদের সামনে।

তাঁকে দেখেই বার্ক বললেন, ইনি আমাদের প্রোডিউসার মিস্টার কোম্বাটু। এর আমন্ত্রণেই আমি ফিল্ম করতে এসেছি এখানে।’

‘কোম্বাটু? আপনি কি ব্রাসেলস-এর সেই বিখ্যাত হীরে ব্যবসায়ী?’ মৃদু বিস্মিতভাবে বলে উঠলেন মার্টিন।

ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার মতো লোকের কানে আমার নামটা পৌঁছেছে সে জন্য আমি গর্বিত। হ্যাঁ, আমি সেই লোক।’ মার্টিন বলে উঠলেন, ‘আরে আপনার নাম তো ব্রাসেলস-এর সব লোকই জানে। তবে এই প্রথম আপনাকে চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য আমার হল। আমি জানি ব্রাসেলস-এর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকটা অনাথ আশ্রম চালান আপনি। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি মৃদু সংযোজন করছি আপনার বক্তব্যে। শুধু আফ্রিকান নয়, আমি আরও বেশ কয়েকটা অনাথ আশ্রমের পৃষ্ঠপোষক সেখানে সব জাতের অনাথ শ্বেতাঙ্গ শিশুরাও থাকে।’

এ কথাগুলো বলার পর একটু হেসে কোম্বাটু বললেন, ‘দেখুন আমি আফ্রিকার পিগমি জনগোষ্ঠীর মানুষ। আমাদের এই খর্বাকৃতির জন্য ইউরোপের মানুষরা এক সময় আমাদের জন্তু ভাবত। আমাদের প্রদর্শনের জন্য খাঁচায় ভরে রাখত। আমার ঠাকুর্দাকে এই হিউম্যান জ্যু তে রাখা হয়েছিল। নারী-পুরুষ মিলিয়ে জনা দশেকের একটা দলকে ধরা হয়েছিল গ্রাম থেকে। এখানে এক হীরে ব্যবসায়ী আমার ঠাকুমাসহ বেশ কয়েকজনকে কিনে নেয়। ঠাকুমা তখন সন্তানসম্ভবা। আমার বাবা সেই হীরে ব্যবসায়ীর বাড়িতেই জন্মান। নিঃসন্তান সেই হীরে ব্যবসায়ীর একবার প্রাণ বাঁচান বাবা। তাই মৃত্যুর আগে বাবাকে তিনি সব সম্পত্তি দান করেন। আর বাবার মৃত্যুর পর সে সম্পত্তি আমার হাতে আসে। যাই হোক দীর্ঘদিন ব্যবসা চালাবার পর সে সম্পত্তি বেচে আমি পিতৃভূমিতে ফিরে যাচ্ছি। সেখানে ‘আমি অনাথ আশ্রম স্কুল খুলব। চলে যাবার আগে আমি এই ফিল্মটা করতে চাইছি সেইসব হতভাগ্য মানুষকে আমার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্য। শ্বেতাঙ্গ বা কোনো জাতিকে ছোট করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। হিউম্যান জ্যুতে এস্কিমো বা রেড ইন্ডিয়ান যাঁরা থাকতেন তাঁরাও কিন্তু শ্বেতাঙ্গ। সামান্য দুটো দিনের মাত্র ব্যাপার। আর সে দুদিনে আপনাদের প্রত্যেককে আমি দশহাজার ইউরো দেব। টাকার জন্য আপনারা থাকবেন না জানি। বলতে পারেন আমি আপনাদের যে সময় নষ্ট করব এটা তার ক্ষতিপূরণ। আপনারা কি চান না যে ওই হতভাগ্য মানুষদের প্রতি ক্ষুদ্র শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হোক?’—দীর্ঘ কথা শেষ করে উত্তরের প্রত্যাশায় দীপাঞ্জনদের দিকে চেয়ে রইলেন কোম্বাটু।

প্রথমে মুখ খুললেন মার্টিন। তিনি বললেন, ‘আমি স্থানীয় মানুষ। আমার আপনার সঙ্গে থাকতে কোনো আপত্তি নেই।’

তার কথা শোনার পর টোগো বললেন, ‘উদ্যোগটা ভালো। বিশেষত আমাদের আফ্রিকা মহাদেশের ব্যাপারটা যখন বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে ব্যাপারটার সঙ্গে তখন আমার কাজটা করাই উচিত।’

জুয়ান তাকালেন দীপাঞ্জনের দিকে। দীপাঞ্জন মৃদু হেসে বলল, ‘থেকে গেলে মন্দ হয় না। নতুন অভিজ্ঞতা হবে একটা।’ তার কথা শুনে জুয়ান বললেন, ঠিক আছে আমরা তিনজনও নয় থাকছি।’ তা শুনে আল মামুন বললেন, ‘আমার থাকতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কাল ভোরে যে প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

কোম্বাটু বললেন, ‘সেসব নিয়ে আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। কাজ শেষে দেশে ফেরার সব দায়িত্ব আমার।’

এবার বাকি রইলেন তিন শ্বেতাঙ্গ—সাংবাদিক পাউল, ডক্টর তুর্গিনেভ আর মার্কিনি কারস্টেন। কোম্বাটু তাকালেন তাদের দিকে। পাউল বললেন, ‘আমার আপত্তি নেই, তবে একটা ছোট শর্ত আছে। আমি বিবিসি-র সঙ্গেও যুক্ত। সেখানে এই ছবি সম্পর্কে আমি তথ্য দেবার আগে অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমকে তা দেওয়া যাবে না।’

তা শুনে কোম্বাটু বললেন, ‘ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং-এর মতো চ্যানেল যদি এ খবর সম্প্রচারিত করে তবে গুরুত্ব আরও বাড়বে। আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই তাতে।’

তুর্গিনেভ কিন্তু বললেন, ‘আমার থাকা সম্ভব নয়। দেশে ফিরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বক্তৃতা আছে।’ আর কারস্টেনও বললেন, তারও জরুরি কাজ পড়ে আছে দেশে। কোম্বাটু তুর্গিনেভের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি মহান দেশের মানুষ। আপনাদের রেড আর্মি একদিন হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বার্লিনে প্রবেশ করে ইউরোপ আর সারা পৃথিবীকে মুক্ত করেছিল হিটলারের হাত থেকে। পৃথিবীতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন আপনারা। এখানে থাকলে শ্রোতারা আপনার বক্তৃতা থেকে বঞ্চিত হবেন ঠিকই, কিন্তু এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে মানবাধিকারের সপক্ষে আপনার আবেদন। প্লিজ এ ব্যাপারটা একটু ভাবুন।’

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর হয়তো বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন তুর্গিনেভ আর কারস্টেন। কোম্বাটু সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘শুটিং কাল সকাল থেকে শুরু হবে। আজ সন্ধ্যায় বার্ক আপনাদের সব বুঝিয়ে দেবেন। কাছাকাছি ভালো হোটেল না-থাকায় আপনাদের থাকার ব্যবস্থা এখানেই করছি। আপনাদের মালপত্রও হোটেল থেকে আনিয়ে নিচ্ছি।’ আরও কিছু কথাবার্তার পর দীপাঞ্জনদের জটলাটা ভেঙে গেল। নানা দিকে ছড়িয়ে পড়লেন দলের সবাই। বার্ক আর কোম্বাটু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজেদের কাজে। দীপাঞ্জন আর জুয়ান একটা বেঞ্চে বসল। জুয়ান বললেন, ‘স্যামসন নামের ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই নানা তথ্য দিতে পারবেন এ জায়গা সম্বন্ধে।’