ডাকাউ ক্যাম্পের বন্দি – ১

গাড়ি থেকে নেমেই দীপাঞ্জনদের চোখ গেল সামনের জায়গাটার দিকে। কাঁটাতারের ফেনসিং ঘেরা বিশাল জায়গাটার ভিতর দাঁড়িয়ে আছে সারসার ব্যারাক। সামনের ব্যারাক-বাড়িটা বেশ বড়। সাদা রঙের বাড়ি, ধূসর রঙের ঢালু ছাদে সাদা বরফের ছিটে লেগে আছে। সাদা, কালো আর ধূসরতা মেশানো জায়গাটা যেন ঠিক বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাদা-কালো ফোটোগ্রাফের মতোই দেখতে লাগছে। বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় যে, এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা যেন জেগে আছে ভিতরের চত্বরটা জুড়ে, ওই সারসার ব্যারাক-বাড়িগুলোর আনাচেকানাচে। শীত পড়তে শুরু করেছে, সম্ভবত সে কারণে ট্যুরিস্টদের ভিড় খুব একটা নেই। জায়গাটাতে প্রবেশ করার প্রধান তোরণের পাশে টিকিট কাউন্টারের সামনে শুধু দু-চারজন ট্যুরিস্টদের ভিড়। তবে তাদের আচরণে, চোখে-মুখে কোনো উচ্ছলতার ভাব নেই। আর সেটা হয়তো এ জায়গার স্থান-মাহাত্ম্যর জন্যই। হতে পারে এ জায়গাটা আজ ট্যুরিস্ট স্পট, কিন্তু একদিন তো এটা ছিল …

দীপাঞ্জন আর জুয়ানকে প্রবেশ-পথের লোহার গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে পাশের কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতে গেল রাইখ নামের গাইড ছেলেটা। প্রবেশ তোরণের গায়েই একটা সাইনবোর্ড। তাতে জার্মান ভাষায় কী সব লেখা। দীপাঞ্জন শুধু তার মধ্যে ইংরেজিতে লেখাই পড়তে পারল—‘ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প মেমোরিয়াল সাইট।’

প্রফেসর জুয়ান বললেন, ‘ডি-এ-সি-এইচ-ইউ’-এই শব্দটার মধ্যে ‘এইচ’ উহ্য যাকে। জার্মান ভাষায় এর শব্দটা উচ্চারণ করে ‘ডাকাউ’ বলে।’

টিকিট নিয়ে দীপাঞ্জনদের কাছে ফিরে এল রাইখ। ভিতরে প্রবেশ করার আগে সে একবার তাকাল দীপাঞ্জনদের দিকে। তারপর গাইডের পেশাদারি ঢঙে তাদের উদ্দেশে বলল, ‘পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বড় বিচিত্র। প্রত্যেক দেশের ইতিহাসে, প্রত্যেক জাতির ইতিহাসের শুধু গৌরবোজ্জ্বল দিনই থাকে না, তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে কিছু অন্ধকারতম হিংস্র কালো দিনও। যা মানবজাতির হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে। ইতিহাসের পাতা থেকে সেই কলঙ্কিত দিনগুলোকে যদি মুছে ফেলা যেত তবে হয়তো ভালো হত। কিন্তু তাদের মোছা যায় না, কারণ তারাও ইতিহাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা এখন প্রবেশ করতে চলেছি এ দেশ শুধু নয়, সম্ভবত সারা পৃথিবীর কলঙ্কতম ইতিহাসের সাক্ষী হতে। হ্যাঁ, এটাই ফুয়োরার হিটলারের ‘ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’। যেখানে গণহত্যা করা হয়েছিল চল্লিশ হাজার মানুষকে…’

একজন গেটম্যান বিষণ্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে গেটে। তাকে টিকিট দেখিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল দীপাঞ্জনরা। সামনে পাথরের ব্লক বসানো বিরাট এক চত্বর। সেখানে প্রবেশ করে বড় ব্যারাকটার দিকে এগোতে এগোতে গাইড রাইখ আবার বলতে শুরু করল তার কথা—হিটলারের হত্যাশালা এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর কথা আপনারা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। শুনেছেন কুখ্যাত অসউইজ ক্যাম্পের কথাও। ছয় মিলিয়ন মানুষকে সে সময় হত্যা করেছিল হিটলারের নাৎসি এস. এস. বাহিনী। এই ডাকাউ ক্যাম্প হল হিটলারের তৈরি প্রথম কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। হিটলার তখন মিউনিখের পুলিশ প্রেসিডেন্ট। তারই নির্দেশে একটা পরিত্যক্ত কারখানার এই জমিতে ২২ মার্চ ১৯৩৩ খোলা হয় এই ক্যাম্প। পরবর্তীকালে এই ক্যাম্পকেই মডেল হিসাবে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয় অসউইজ-সহ আরও নানা ক্যাম্প। সেদিন থেকে ২৯ এপ্রিল ১৯৪৫ পর্যন্ত চলেছিল এই ক্যাম্প। অর্থাৎ যেদিন পর্যন্ত না আমেরিকান সেনাবাহিনী এসে মুক্ত করে বন্দিদের। প্রথম বছর এখানে আনা হয় প্রায় পাঁচ হাজার বন্দিকে। ক্রমে ক্রমে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দু-লক্ষে। যাদের একটা বড় অংশ আর কোনোদিন জীবিত অবস্থায় ক্যাম্পের বাইরে বেরোতে পারেনি। গ্যাস চেম্বারে, এস. এস. গার্ডদের গুলিতে, ফাঁসিতে দড়িতে, অনাহারে, পরিশ্রমে মৃত্যু হয় তাদের। বিভিন্ন জায়গা থেকে রেলওয়াগানে গবাদি পশুর মতো গাদাগাদি করে এখানে আনা হত বন্দিদের। পথেই দমবন্ধ হয়ে বা তৃষ্ণার জ্বালায় মৃত্যু হত বেশ কিছু বন্দির। অবশ্য তারা এক অর্থে সৌভাগ্যবান ছিল। কারণ তাদের এই ডাকাউ ক্যাম্প দেখতে হয়নি। এটা শুধু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পই ছিল না, এখানেই ছিল কুখ্যাত এস. এস. গার্ডদের ট্রেনিং সেন্টারও। এখানে তাদের মানুষ খুনে রপ্ত করিয়ে আরও মানুষ খুনের জন্য অন্য ক্যাম্পে পাঠাতেন হিটলার।

কথা বলতে-বলতে চত্বর পেরিয়ে প্রথম সামনের ব্যারাকটাতে সুদীপ্তদের নিয়ে হাজির হল রাইখ। ব্যারাকটা এখন মিউজিয়াম। একটা বিরাট বড় লম্বাটে ঘরে সে সময়ের স্মৃতিচিত্র রাখা আছে। আর দেওয়ালে ঝুলছে সে সময়ের তোলা অসংখ্য সাদা কালো ফোটোগ্রাফ। রাইখ বলল, ‘এ ঘরটা থেকেই এক সময় এই ক্যাম্পটা পরিচালিত হত। হিটলার এখানে এলে এ ঘরেই এস. এস. গার্ডদের সঙ্গে মিলিত হতেন। ওই দেখুন ঘরের কোণে শোকেসে লাল, কালো, সাদা—তিনটে কোট রাখা আছে কাঁধ আর হাতের পটিতে স্বস্তিকচিহ্ন আঁকা। পদমর্যাদা অনুসারে এস. এস. গার্ডরা ওই পোশাক ব্যবহার করত।’

কথা বলতে বলতে সে দীপাঞ্জনদের এনে দাঁড় করাল একটা দেয়ালের সামনে। সেখানে ঝুলছে কালো ডোরাকাটা একটা বুশ শার্ট আর বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নানা রঙের ত্রিভুজাকৃতির ব্যাজ।

প্রফেসার জুয়ান বললেন, ‘এটা নিশ্চয়ই বন্দিদের পোশাক? আমি ছবিতে দেখেছি।’ রাইখ বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার, এই ত্রিভুজ আকৃতির ব্যাজগুলোও বন্দিদের। শুধু ইহুদি নয়, বন্দি হিসাবে এখানে আনা হত কমিউনিস্ট, জিহ্বা উইটনেস, সাধারণ অপরাধী, রোমানি অর্থাৎ জিপসিদের। পোলিস, সার্বিয়ান, রুশিরাও এখানে বন্দি ছিল। তাদের শনাক্তকরণ চিহ্ন ছিল এই ব্যাজ। লাল ব্যাজ কমিউনিস্টদের, হলুদ রং ইহুদি, বেগুনি-জিহ্বা, বাদামি-জিপসি আর সবুজ রঙের ব্যাজ ছিল সাধারণ অপরাধীদের জন্য।’ এরপর হলটাতে ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো দেখতে লাগল দীপাঞ্জনরা। কোনো ছবিতে মার্চপাস্ট করছে ফুয়োরারের ঘাতক বাহিনী, কোথাও ওয়াগান ভর্তি করে ক্যাম্পে আনা হচ্ছে বন্দিদের। কোথাও আবার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে আসার আগে গ্যাস চেম্বার, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে হাড্ডিসার চেহারার উলঙ্গ বন্দির দল। একটা ছবিতে আবার দেখা যাচ্ছে গাদা করে রাখা আছে মৃতদেহের স্তূপ। তার সামনে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে বন্দুকধারী এস. এস. গার্ড। শিকারি যেমন মৃতপশুর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে তেমনই তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি। ইতিহাসের কুখ্যাততম অধ্যায়ের সাক্ষী এই ছবিগুলো। দীপাঞ্জন-জুয়ান ছাড়া হলটার মধ্যে আর যে ক-জন ট্যুরিস্ট আছে তারা নির্বাকভাবে দেখছে ছবিগুলো। এক মহিলাকে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতেও দেখল দীপাঞ্জন। ওভারকোট আর পায়ে হাই-হিল বুট পরা সেই তরুণীর কোনো পূর্বপুরুষ হয়তো কোনো দিন বন্দি ছিলেন এখানে।

মিউজিয়াম দেখা শেষ হলে রাইখ বাইরে বেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে দীপাঞ্জনদের নিয়ে প্রবেশ করল ক্যাম্পের গোলক ধাঁধার মধ্যে। পথের দু-পাশে সারসার ব্যারাক দাঁড়িয়ে আছে। তার বন্ধ দরজা-জানলার ভিতরে কত আর্তনাদ, হাহাকার যে লুকিয়ে আছে কে জানে? রাইখ বলল, ‘এ সব ক্যাম্পে যারা থাকত তাদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে হত। পরিশ্রম আর শীতের প্রকোপে, অনাহারে অনেকের মৃত্যু হত। অত্যাচার সহ্য করতে না-পেরে পাগলও হয়ে যেত কেউ-কেউ। ১৯৪২ সালের জানুয়ারির এক শীতের রাতে পাগল অজুহাতে এখানে এক সঙ্গে তিন হাজার বন্দিকে বিষ প্রয়োগ করে মারা হয়।’

একটা ব্যারাকের ভিতর প্রবেশ করল দীপাঞ্জনরা। লম্বা ঘরটার চারপাশে মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত পায়রার খোপের মতো সারসার খোপ। কোনোরকমে মানুষ হাত-পা দুমড়ে-মুচড়ে সেখানে থাকতে পারে। সেই খোপগুলোই নাকি ছিল বন্দিদের সর্বোত্তম থাকার ব্যবস্থা! বাকিদের মাটিতেই থাকতে হত। এমন পঞ্চাশ ফুট বাই পনেরো ফুট ঘরে এক-এক সময় পাঁচশো বন্দিকেও রাখা হত। রাইখ বলল, ‘এখান থেকে রোজ এক বা একাধিক বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হত ‘ব্যারাক-এক্স’-এ। কার কবে সেখানে যাবার জন্য ডাক আসবে কেউ জানত না।’

জুয়ান জানতে চাইলেন, ‘ব্যারাক এক্সটা কী?

রাইখ বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘এটা এই ক্যাম্পের সব চেয়ে কুখ্যাত ব্যারক। ক্রিমেশন গ্রাউন্ডের পাশে। চলুন আমরা সে জায়গাতেই যাব।’

বিষণ্ণ ব্যারাকগুলোর গলি-ঘুঁজির মধ্যে দিয়ে ব্যারাক-এক্স-এর দিকে এগোতে এগোতে হঠাৎ একটা বেশ বড় বাড়ির সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রাইখ। বাড়িটা ঠিক ব্যারাকের মতো দেখতে নয়। বেশ বড়সড় বাড়ির মতোই দেখতে সেটা। তার গঠনগত স্বতন্ত্রতার জন্যই সেটা ব্যারাকগুলোর ভিড়ের মধ্যেও চোখে পড়ে। কাচের জানলাঅলা বাড়িটার রং এক সময় সম্ভবত ধবধবে সাদা ছিল, এখন বয়সের ভারে মলিন হয়ে গেছে। জার্মান ভাষায় লেখা একটা সাইনবোর্ডও সেখানে টাঙানো আছে। বাড়িটা দেখিয়ে রাইখ বলল, ‘হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর মধ্যে একমাত্র এখানেই এ বাড়িটা ছিল। এটা এ ক্যাম্পের একটা বিশেষত্বও বলা যেতে পারে।’

জুয়ান বললেন, ‘এ বাড়িটা কী ছিল? তোমার কথা ঠিক বুঝলাম না!’

রাইখ জবাব দিল, ‘মেডিকেল হাউস।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘বন্দিদের চিকিৎসা করা হত এখানে?’

রাইখ বলল, ‘না, বন্দিদের প্রাণের কানাকড়ি দাম ছিল না এখানে, তারা অসুস্থ হলে একটা ট্যাবলেটের বদলে একটা বুলেটই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।

‘তবে?’

‘ক্যাম্প-এক্স’-এর দিকে এগোতে এগোতে রাইখ বলল, ‘পরীক্ষাগারে গিনিপিগ, ইঁদুর . এসবের ওপর নানা জিনিস ওষুধ, বিষ ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয় জানেন তো? এখানে বন্দিদের ওই গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহার করে তাদের ওপর মেডিকেল এক্সপেরিমেন্ট করা হত। কারো দেহে প্রয়োগ করা হত আর্সেনিক, কারো দেহে হয়তো প্রয়োগ করা হত সায়ানাইড অথবা তেজস্ক্রিয় কোনো পদার্থ। এস.এস.-দের ডাক্তাররা সুস্থ মানুষের কিডনি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে অস্ত্রোপচারে হাত পাকাত এখানে। কারো ডান হাতের বুড়ো আঙুল কেটে হয়তো জোড়া দেবার চেষ্টা করা হত বাম হাতের তর্জনীর জায়গাতে। অথবা হয়তো কোনো সুস্থ-সবল বন্দির একটা পা হাঁটু থেকে বাদ দিয়ে দেখা হত যে, রক্তক্ষরণে কত সময় লাগে লোকটার মৃত্যু হতে? অথবা এখানে কোনো বন্দির নাক বা কানে গনগনে টকটকে লাল সাইকেলের স্পোক ঢুকিয়ে দেখা হত এ অত্যাচার একটা মানুষ কতক্ষণ সহ্য করে জীবিত থাকতে পারে! তারপর এই মেডিকেল সায়েন্সের জ্ঞান প্রয়োগ করা হত অন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা যুদ্ধক্ষেত্রে। এমনই নানা নারকীয় পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল এই মেডিকেল ক্যাম্প।’

দীপাঞ্জন আর জুয়ান দু-জনেই চমকে উঠল রাইখের মুখে এই নারকীয় বীভৎসতার কথা শুনে।

হাঁটতে-হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যেই দীপাঞ্জনরা পৌঁছে গেল ‘ব্যারাক-এক্স’-এ। ধূসর রঙের ছাদঅলা বিরাট একটা ব্যারাক বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার গা ঘেঁষে চারপাশে আরও একটা কাঁটাতারের বেড়া। কাঁটাতার ঘেরা ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মধ্যে আরও একপ্রস্থ নিরাপত্তাবলয় ঘেরা একটা জায়গা। ব্যারাকটার জানলাগুলো ছাদের কাছাকাছি। হয়তো বা বন্দিরা যাতে জানলা বেয়ে পালিয়ে না-যেতে পারে তাই জানলাগুলো ছাদের কাছাকাছি করা হয়েছিল। অসীম এক নিঃসঙ্গ শূন্যতা বিরাজ করছে ক্যাম্পটার চারপাশে। লোকজন সেখানে বিশেষ একটা নেই। দীপাঞ্জন শুধু সেখানে সেই শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে দেখতে পেল, যাকে সে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে

দেখেছিল মিউজিয়ামের ভিতরে। ব্যারাকের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে সেই যুবতী। রাইখের সঙ্গে সে জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবার পর রাইখ ক্যাম্পটা দেখিয়ে বলল—‘এই হল ‘এক্স ব্যারাক’ বা ব্যারাক এক্স’। যে সব বন্দিকে হত্যা করা হবে তাদের অন্য ব্যারাকে থেকে এই ‘এক্স ব্যারাক’-এ আনা হত। শোনা যায়, মাত্র একজন আঠারো বছরের তরুণ শুধুমাত্র বেঁচে ফিরতে পেরেছিল এই ব্যারাক থেকে। এই ‘এক্স ব্যারাকে’র নাম শুনলেই হাড় হিম হয়ে যেত বন্দিদের। এস. এস. গার্ডদের কথা না শুনলেই তারা ক্যাম্পে। তার মধ্যে এই ‘এক্স ব্যারাক’ আর চারপাশের জায়গাটাকে বলে ‘ক্রিমেটেরিয়া বন্দিদের পাঠিয়ে দিত এই ‘এক্স ব্যারাকে’। সর্বমোট ৩২টা ব্যারাক আছে এই ডাকাউ গ্রাউন্ড।’

‘ক্রিমেটেরিয়া গ্রাউন্ড’ অর্থাৎ ‘শ্মশান ভূমি!’ দীপাঞ্জন আর জুয়ান তাকিয়ে দেখল সত্যিই যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা, বিষণ্ণতা বিরাজ করছে চারপাশে। সত্তর বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে সে সময়ের পর। কিন্তু আজও যেন মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, সেদিনের অসহায় মৃত্যুপথযাত্রী অদেখা-অচেনা মানুষদের অদৃশ্য হাহাকার বিরাজ করছে যে জায়গা জুড়ে। দীপাঞ্জন আর জুয়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেয়ে রইল ‘এক্স ক্যাম্পের’ দিকে। একদল ট্যুরিস্ট এসে হাজির হল সেখানে। সবার মুখেই বেদনার্ত-বিষণ্ণ ভাব। তাদের সঙ্গের গাইড ভদ্রলোক তাদের উদ্দেশে বলতে শুরু করলেন ‘ক্যাম্প এক্স’ সম্বন্ধে। দীপাঞ্জনদের গাইড রাইখ বলল, ‘এক সময় ট্যুরিস্টদের এই ‘ক্যাম্প এক্স’-এর ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হত। কিন্তু সে সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এখন।’

প্রফেসর জুয়ান প্রশ্ন করলেন, ‘কেন?’

রাইখ বলল, ‘এক্স ব্যারাকের অন্ধকার ঘরে ঢুকে গাইডদের মুখে এস. এস. গার্ডদের নারকীয় বীভৎসতার কথা শুনে অনেকেই অসুস্থতাবোধ করেন। বেশ কয়েকবার কয়েকজন ট্যুরিস্ট অজ্ঞানও হয়ে গেছিলেন। তাই আর আজকাল এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।’—এ কথাগুলো বলে রাইখ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এবার আমরা যাব এই শ্মশানভূমির সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম জায়গাতে। সাধারণত আমরা ট্যুরিস্টদের সেখানে নিয়ে যাই না। বিশেষত ট্যুরিস্টদলের মধ্যে কোনো দুর্বলচিত্তের মানুষ থাকলে বা কোনো শিশু থাকলে তো কখনই নয়। শুধু আমরা তাদেরকে কিছুটা তফাত থেকে জায়গাটা দেখিয়ে দিই। যিনি টিকিট কাউন্টারে আমাদের টিকিট দিলেন তিনি সে জায়গাতে আপনাদের দেখানোর অনুমতি দেবার আগে একবার উঁকি মেরে দেখে নিয়েছিলেন আপনাদের দু-জনকে

দীপাঞ্জন প্রশ্ন করল, ‘সে কোন জায়গা?’

রাইখ বলল, ‘গেলেই দেখতে পাবেন।’ —এই বলে হাঁটতে শুরু করল সে। দীপাঞ্জন আর জুয়ান অনুসরণ করল তাকে।