কূর্মদেবতার কামড় – ৫

ঘরে ফিরে এল সুদীপ্তরা। খোলা জানলা দিয়ে বিশাল হ্রদটা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে সুদীপ্ত একসময় বলল, ‘ওই ওয়াং নামের বাচ্চা ছেলেটা বড় অদ্ভুত তাই না? সারাদিন জলে থাকে! হাত দিয়ে দেখলাম লেকের জল বরফের মতো ঠান্ডা। এত ঠান্ডায় ও জলে থাকে কীভাবে কে জানে!’

হেরম্যান বললেন, ‘সবই অভ্যাসের ব্যাপার। তাছাড়া হ্রদ বা নদীর জলের উপরি-ভাগ যত ঠান্ডা থাকে, নীচের অংশ অনেক অনেক সময় অত ঠান্ডা থাকে না।’

কথা বলতে বলতে মঙ-এর জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল সুদীপ্তরা।

মঙ এসে হাজির হল মাঝ দুপুরে। দরজায় টোকা পড়তেই ডেং-ফু দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকল মঙ। তারপর নিজেই দরজা বন্ধ করে দরজায় পিঠ দিয়ে সুদীপ্তদের মুখোমুখি দাঁড়াল। ভালো করে দেখে নিতে লাগল সুদীপ্তদের।

হেরম্যান প্রথমে তার উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি তো শহরে থাকো তাই না?’

‘হ্যাঁ, হ্যানয়ে থাকি।’—জবাব দিল মঙ। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘তোমাদের কাছে আমি একটা জিনিস বিক্রি করতে চাই।’

হেরম্যান প্রশ্ন করলেন, ‘কী জিনিস?’

তার জামাটা তুলল মঙ। তারপর তার কোমরে গোঁজা জিনিসটা বার করে সেটা এগিয়ে দিল হেরম্যানের দিকে। একটা ছুরি। ফুটখানেক লম্বা ছুরিটা বেশ প্রাচীন। রুপোর হাতল, কাঠের খাপের অলঙ্করণগুলো খুব প্রাচীন হলেও বোঝা যাচ্ছে যে তার গায়ে একসময় সরু সোনার পাত বসানো ছিল। তার কয়েকটা এখনও লেগে আছে তার গায়ে। হেরম্যান আর সুদীপ্ত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল জিনিসটা।

মঙ এবার বলল, ‘আপনারা দেবতা কিম কুঈ আর সম্রাট লি-লোই-এর গল্প নিশ্চয়ই শুনেছেন। এই সেই ছুরি বা তরবারি যা কিম কুঈ সম্রাটকে দিয়েছিলেন। পাঁচশো বছরের প্রাচীন অ্যান্টিক। এটা আমি আপনাদের বিক্রি করতে চাই। মাত্র দশ হাজার ভিয়েতনামি টাকা অর্থাৎ দশ হাজার ডং দিলেই এটা আমি আপনাদের দিয়ে দেব।’

ছুরিটা গল্পে কথিত সেই কিম কুঈয়ের ছুরি হোক বা না হোক জিনিসটা যে প্রাচীন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুদীপ্ত জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বলল, ‘এই ছুরিটাই কচ্ছপ দেবতার মন্দিরে তাঁর পায়ের কাছে দেখেছিলাম বলে মনে হয়?’ মঙ, মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এটাই।’

হেরম্যান বললেন, ‘এই ধর্মীয় জিনিসটা তুমি আমাদের কাছে বেচে দিতে চাচ্ছ? মন্দিরের পুরোহিত জানেন ব্যাপারটা?’

দ্বিতীয় প্রশ্নর জবাব না দিয়ে মঙ বলল, ‘তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না এতে। এটা এখন আমি আবার মন্দিরে নিয়ে রাখব। কাল ভোরে যখন তোমরা গ্রাম ছেড়ে নীচে নামবে তখন আমি তোমাদের গাড়ির কাছে যাব। সেখানেই লেনদেন হবে। জিনিসটা নিয়ে তোমরা অনায়াসে শহরে চলে যাবে।’

মঙ-এর কথা শুনে সুদীপ্তদের বুঝতে অসুবিধা হল না যে মঙ জিনিসটা চুরি করেই বিক্রি করতে চাচ্ছে তাদের। সুদীপ্ত বা হেরম্যান অ্যান্টিক হান্টার নয়। তার ওপর চোরাই মাল কেনার তো কোনো প্রশ্নই নেই তাদের। তাই সুদীপ্ত ছুরিটা মঙ-এর হাতে ফেরত দিয়ে বলল, ‘না, এ ছুরি আমরা নেব না।’

মঙ বলল, ‘ভেবে দেখো। এই ছুরিটা তোমরা হ্যানয়ের কোনো কিউরিও শপে বিক্রি করলে তিনগুণ দাম পাবে।’

হেরম্যান হেসে বললেন, ‘না, আমাদের টাকার দরকার নেই।’

তবুও নাছোড়বান্দা মঙ বলল, ‘ঠিক আছে দশ হাজার ডং নয়, দাম অর্ধেক করে দিলাম। আমার খুব টাকার দরকার। পাঁচ হাজার ডং দিলেই হবে।’

সুদীপ্ত হেসে বলল, ‘এ জিনিস বিনা পয়সায় দিলেও আমরা নেব না।’

মঙ-এর চোয়ালটা এবার যেন হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। ছুরিটা আবার জামার তলায় গুঁজে নিয়ে সে বলল, ‘নেবে না তোমাদের ইচ্ছা। তবে কথাটা যেন বাইরে না যায়। গেলে বিপদ হবে।’—এ কথা বলে সে দরজা খুলে বাইরে বেরোতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় হেরম্যান তার উদ্দেশে বললেন, ‘ওই পাঁচ হাজার ডং আমি তোমাকে দিতে পারি, যদি তুমি আমাদের একটু সাহায্য করো।’

কথাটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মঙ। হেরম্যানের দিকে তাকিয়ে সে জানতে চাইল ‘সাহায্য? কী সাহায্য?’

হেরম্যান বললেন, ‘কালকের রাতটাও আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আমরা তোমাদের দেবতাকে দেখতে চাই।’

কথাটা শুনেই যেন চমকে উঠল মঙ। তারপর বিস্মিতভাবে কিছুক্ষণ সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমি এমনই কিছু তোমাদের ব্যাপারে আন্দাজ করেছিলাম। নইলে কেউ এতদূরে লেক দেখতে ছুটে আসে? এখানে রাত কাটাতে চায়?’

হেরম্যান এবার স্পষ্টভাবে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, কচ্ছপ দেবতা কিম কুঈকে দেখার জন্যই আমরা এসেছি।’

মঙ বলল, ‘তা সম্ভব নয়। নিয়ম নেই।’

ডেং-ফু এবার বলল, ‘নিয়ম নেই তা আমরা জানি। কিন্তু তোমার বাবার কথায় এই গ্রাম চলে। তুমি যদি তাকে রাজি করাতে পারো তবে অন্যরা তা মেনে নেবে।’

এ কথা শুনে মঙ চুপচাপ কী যেন ভাবতে লাগল।

হেরম্যান এবার তাঁর ব্যাগ থেকে একগোছা টাকা বার করলেন। তারপর নোটের তাড়াটা তুলে ধরে বললেন, ‘কাজটা শক্ত জানি। কিন্তু তুমি হয়তো চেষ্টা করলে বাবাকে রাজি করাতে পারবে। পাঁচ হাজার নয়, আমার হাতে দশ হাজার ডং আছে। পুরো টাকাটাই আমি তোমাকে দেব।’

হেরম্যানের হাতের টাকাগুলো দেখে আর তাঁর কথা শুনে এবার লোভে চকচক করে উঠল মঙ-এর চোখ। টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, ঠিক আছে আমি চেষ্টা করছি তাকে রাজি করাবার। আমাকে তবে পাঁচ হাজার ডং অগ্রিম দাও।’

হেরম্যান আর কথা বাড়ালেন না। কড়কড়ে পাঁচ হাজার ডং গুনে গুনে তুলে দিলেন মঙ-এর হাতে। টাকাগুলো নিয়ে আর কালবিলম্ব না করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল মঙ।

হেরম্যান বললেন, ‘দেখা যাক কী হয়। টাকার প্রতি মঙ-এর লোভ আছে। হয়তো বা সে রাজি করিয়ে ফেলতে পারবে কচ্ছপ দেবতার পুরোহিতকে।’

মঙ চলে যাবার পর চাপা উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে দুপুরটা কেটে গেল সুদীপ্তদের। লেকের জলের রঙ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। বিকাল হয়ে গেল। শান্ত লেকের জলে বিদায়ী সূর্যের ছায়া। মঙ ফিরে আসেনি। হেরম্যান একসময় বললেন, ‘চলো বাইরে বেরোনো যাক। লেকের পাড় থেকে একবার ঘুরে আসি তারপর মঙ-এর খোঁজে মন্দিরের দিকে যাব।’

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সুদীপ্তরা। তারপর গতদিনের মতো হ্রদের পাড় ধরে জঙ্গলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে সুদীপ্ত হেরম্যানকে বলল, ‘আচ্ছা, যদি ধরুন আমরা কচ্ছপ দেবতার দেখা পেলাম। তাঁর ছবিও তুললাম। তারপর কী করবেন আপনি?’

হেরম্যান বললেন, ‘আমি শুধু তাঁকে একবার দেখতে চাই। ছবি তুলতে পারলে সেটা আমি নিজের কাছেই রাখব। সংবাদ মাধ্যমকে দেব না। তাতে শান্তি নষ্ট হতে পারে এ অঞ্চলের। খবরটা সংবাদ মাধ্যমে চাউর হলে ঝাঁকে ঝাঁকে পর্যটক এখানে ছুটে আসবে। হয়তো বা কিম কুঈকে দেখার জন্য লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা হবে। তাতে প্রাণ সংশয় হতে পারে প্রাণীটার। হয়তো ঠিক এই কারণেই বাইরে লোককে দেবতার দর্শন করাতে রাজি হয় না কচ্ছপ দেবতার উপাসকরা। আসল সত্যটা না হয় আমরা জানব। কিন্তু ব্যাপারটা যেমন ‘মিথ’ আছে তেমন ‘মিথ’ থাকাই ভালো।’

কথা বলতে বলতে একসময় নদীর ধারের সেই বাঁক পেরিয়ে জঙ্গলের কাছে পৌঁছে গেল তারা। সূর্য ডুবতে চলেছে। গতকালের মতোই দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে নদীর জলে। এবার ফিরে মন্দিরে যেতে হবে তাদের। ফিরতে যাচ্ছিল তারা। কিন্তু হঠাৎই লেকের জলে চোখ আটকে গেল তাদের। জলের ওপর দিয়ে অদ্ভুতভাবে ভাসতে ভাসতে পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে ছেলেটা। যেন সে জলতলের ওপর বুক দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে আর জল তাকে ঠেলতে ঠেলতে পাড়ের দিকে নিয়ে আসছে। এ দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হেরম্যান-সুদীপ্ত। সত্যি ছেলেটা জলের পোকা। নইলে ও ভাবে কেউ জলে ভাসতে পারে! পাড়ের কাছে চলে এল ছেলেটা। তারপর জল ছেড়ে ছোট লাফ দিয়ে পাড়ে উঠে সুদীপ্তদের কয়েক হাত তফাতে এসে দাঁড়াল। তার মুখে আবছা হাসি।

সুদীপ্তরাও হাসল তার দিকে তাকিয়ে। হেরম্যান তাকে ডেং-ফুর মাধ্যমে প্রশ্ন করলেন, সারাদিন জলে থাকতে তোমার ভালো লাগে?’

ওয়াং জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

এরপর হেরম্যান প্রশ্ন করলেন, তুমি জেলেদের জাল ছিঁড়ে দাও কেন? মন্দির থেকে পালালে কেন?’

একটু চুপ করে থেকে বাচ্চা ছেলেটা দ্বিতীয় প্রশ্নের একটা অদ্ভুত উত্তর দিল, ‘আমি না পালালে পুরোহিত দং-পেঙ আমাকে মন্দিরের কচ্ছপের চৌবাচ্চায় ফেলে দিত।’

হেরম্যান বললেন, ‘ও তুমি কচ্ছপ ভয় পাও বুঝি? এই হ্রদেও তো শুনেছি বিরাট বড় একটা কচ্ছপ আছে। তোমার তাতে ভয় লাগে না? তুমি তো সারাদিন জলে ঘুরে বেড়াও। তাকে দেখেছ তুমি?’

ওয়াং নামের ছেলেটা কী একটা জবাব দিতে গিয়েও যেন একটা জিনিস দেখে থেমে গেল। দূরে লেকের পাড় ধরে এদিকেই আসছে একজন—মঙ। আর তাকে দেখামাত্রই ছেলেটা একছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের ভিতর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মঙ আর সুদীপ্তরা মুখোমুখি হয়ে গেল। মঙ চারপাশে বিশেষত জঙ্গলের দিকে সন্দিগ্ধভাবে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে কেউ ছিল নাকি? দূর থেকে একবার যেন মনে হল চারজন ছিল এখানে?’

ডেং-ফু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘না, আর কেউ ছিল না।’

মঙ এরপর বলল, ‘শোন, শেষ পর্যন্ত বাবাকে রাজি করিয়েছি আমি। তবে তার জন্য কয়েকটা শর্ত মানতে হবে তোমাদের।’

কথাটা শুনে হেরম্যান মৃদু উৎফুল্লিত ভাবে বললেন, ‘কী শর্ত?’

মঙ বলল, ‘প্রথমত কোনো হাতিয়ার তোমরা সঙ্গে রাখতে পারবে না।’

হেরম্যান বললেন, ‘আমরা কোনো হাতিয়ার সঙ্গে আনিনি।’

‘দ্বিতীয়ত তোমরা দেবতার কোনো ছবি তুলতে পারবে না। দেবতার কাছে যেতে পারবে না। দূর থেকে দেখতে হবে তাঁকে।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হেরম্যান বললেন, ‘বেশ তাই হবে।’

মঙ বলল, ‘তৃতীয় শর্ত হল পরশু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাম ছাড়তে হবে। আর কোনোদিন তোমার কেউ এ গ্রামে আসবে না।’

হেরম্যান জবাব দিলেন, ‘এ শর্তও মানলাম।’

মঙ শুনে বলল, ‘ঠিক আছে। এবার তবে ঘরে চলো। বাকি টাকাটা আমাকে এখনই দাও। ও টাকাটা বাবাকে দিতে হবে। অনেক কষ্টে তাকে রাজি করিয়েছি।’

মঙকে সঙ্গে নিয়ে সুদীপ্তরা এরপর ঘরে ফিরে এল। টাকা বুঝে নিয়ে চলে যাবার সময় মঙ বলল, ‘ও আর একটা ব্যাপার বলতে ভুলে গেছি। কাল সারাদিন ঘরেই থাকবে তোমরা। লেকের ধারে বা মন্দিরের দিকে যাবে না। দেবতা কিম কুঈ-এর আবাহনের জন্য সারাদিন ধরে নানা প্রস্তুতি চলবে ওই দুই জায়গাতে। সেখানে তোমাদের উপস্থিতি কচ্ছপ দেবতার অন্য উপাসকদের পছন্দ না হতে পারে। কাজেই ঘরে থাকাই ভালো। সূর্য ডোবার আগে তোমাদের নিতে আসবে লোকজন।’—এই বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল মঙ। বাইরে তখন অন্ধকার নেমেছে। কালো হয়ে উঠেছে কুরু হ্রদের জল।