কালোটিয়ার দ্বীপে – ৩

পরদিন ‘শ্রীগণেশের’ থেকে বিদায় নিয়ে ধ্রুব যখন জেটিতে নামল তখন অন্ধকার কাটেনি। কিন্তু এ সময়তেই সবচেয়ে কর্মব্যস্ততা থাকে। মাছ ধরার ট্রলারগুলো এ সময় সমুদ্রে যাবার জন্য তৈরি হয়। তাদের ‘ভো’ শোনা যাচ্ছে। কুয়াশামাখা অন্ধকার ভেদ করে অস্পষ্ট ভাবে ভেসে আসছে তাদের সার্চলাইটের হলদেটে আলো। জেটি ধরে নির্দিষ্ট জায়গা দিকে হাঁটতে লাগল ধ্রুব। যেখান থেকে সে আগের দিন নৌকা ধরেছিল। জেটির রাস্তায় বেশ ভিড়। তবে এরা ঠিক জাহাজি নয়, ধীবর শ্রেণির লোক। ট্রলার বা নৌকা নিয়ে মাছ ধরে সমুদ্রে, আবার ফিরে আসে এ বন্দরে। রাস্তার পাশে কফিপাবগুলোর সামনে তাদের জটলা। সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার আগে আগুনের মতো গরম কফি গলায় ঢেলে নিচ্ছে তারা। কোথাও কোথাও পাবের সামনে রাখা আছে কাঠের পিপে। তার ভিতর থেকে মগে করে অনেকটা আলকাতরার মতো দেখতে তরল পদার্থও পান করছে কেউ কেউ। ওটা কী বস্তু তা জানে ধ্রুব। হাঙরের তেল। ও খেলে সর্দি-কাশি এসব হয় न মান্নাদের। ওর জন্য পয়সা দিতে হয় না। নিখরচায় অমৃত। তবে প্রচণ্ড বিস্বাদ আর গন্ধ! ম্যাসকট বন্দরে সে ও জিনিস একবার খেয়ে দেখেছে। মুখে দিতেই গা তার গুলিয়ে উঠেছিল। এ সব দেখতে দেখতে ধ্রুব পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট জায়গাতে। বোট নিয়ে অপেক্ষা করছিল আগের দিনের লোকটাই। সঙ্গে একটা ঘষা কাচের লণ্ঠন। তার আলোতে কেমন যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে লোকটার মুখ। ধ্রুব বোটে উঠতেই সে লণ্ঠনটা ধ্রুবর হাতে ধরিয়ে দাঁড় টানতে লাগল। ধ্রুব তার পিঠের ব্যাগটা বোটে নামিয়ে রেখে লণ্ঠনটা উঁচুতে তুলে গুল। পাড় থেকে যত তারা দূরে সরে যাচ্ছে তত ঘন হয়ে উঠছে কুয়াশা। তিনহাত দূরের জিনিস কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর আবার চারদিকে ছোটবড় জাহাজের দেওয়াল, অগুনতি কাছি, আর দড়িদড়া। তাতে আটকে গিয়ে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ধ্রুব বোট চালককে বলল, ‘সাবধানে। নইলে বোট উল্টে যেতে পারে। কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না!’

লোকটা নির্লিপ্ত ভাবে শুধু বলল, ‘সাঁতার জানেন নিশ্চয়ই? তবে আর ভয় কী? দাঁড় চালাতে লাগল লোকটা।

সেরকম কিছু ঘটল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোট এসে লাগল ‘ফ্রান্সিস ড্রেকের’ গায়ে। অন্ধকারে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজটা। যেন আসলে জাহাজ নয়, তার একটা প্রতিচ্ছবি মাত্র। জাহাজের মাস্তুলে শুধু একটা লাল আলো জ্বলছে। আর কোথাও কোনো আলো নেই। জাহাজের গায়ে ঝোলানো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল ধ্রুব। ডেকের কাছাকাছি পৌঁছতেই ধ্রুবকে ওপরে উঠিয়ে নেবার জন্য কুয়াশার আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে এল একটা হাত। সে হাত ধরে উঠে ডেকে পা রাখল ধ্রুব। সে হাতটা মার্লিনের। সে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল তাকে। ডেকে কয়েকটা তেলের আলো জ্বলছে। তবে তার আলো এত কম যে নিচ থেকে তার অস্তিত্ব বোঝা অসম্ভব ছিল ধ্রুবর পক্ষে। ডেকের অন্ধকারও তাতে দূর হয়নি। কুয়াশামাখা আধো অন্ধকারে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে কিছু ছায়ামূর্তি। ধ্রুবর মনে হল জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তারা। মার্লিন ধ্রুবকে নিয়ে এগোল ক্যাপ্টেনের ঘরের দিকে।

ঘরের দরজা জানলা বন্ধ থাকলেও ভিতরে আলো জ্বলছিল। একটা টেবিলে বসে একটা চার্ট নিয়ে কী যেন দেখছিলেন ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড। তারা ঘরে ঢুকতেই চার্ট ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে ধ্রুবর সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, ‘আপনি এসে গেছেন। ‘ফ্রান্সিস ড্রেকে’ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।’ এরপর তিনি মার্লিনকে বললেন, এঁকে তাহলে রেডিও রুমে নিয়ে যাওয়া যাক। কাজ ভালো করে পরে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। এখন আপাতত হারবার মাস্টারকে জানিয়ে জাহাজ ছাড়ব আমরা। কাগজপত্র তো কালই সব জমা দেওয়া হয়ে গেছে। সব প্রস্তুতি সারা। ধ্রুবকে নিয়ে যাওয়া হল রেডিও রুমে। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ধ্রুবকে বললেন, ‘আমার ঘর আর এ ঘর, এ দুটো ঘরেই শুধু বৈদ্যুতিক আলো আছে।’ কাঠের দেওয়াল আর নিচু ছাদওলা মামুলি রেডিও রুম। শ্রীগণেশের’ রেডিও রুমের মতো ইলেকট্রনিক্স প্যানেল, ইত্যাদি কিছুই নেই এ ঘরে। খবর আদান-প্রদানের যন্ত্রপাতি বেশ মামুলি ধরনের। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের নির্দেশে ধ্রুব বসে গেল তার নির্দিষ্ট আসনে। এরপর ক্যাপ্টেনের বক্তব্য মতো হারবার মাস্টারকে ধ্রুব প্রথম খবর পাঠাল — ব্রিটিশ জাহাজ, আর.এম ফ্রান্সিস ড্রেক, বন্দর ছাড়ার অনুমতি চাইছে। গন্তব্য, পোর্ট মোগাদিসু সোমালিয়া। ক্যাপ্টেন-টমাস বিয়ার্ড, চিফ মেট—অ্যান্ড্রু ফক্স, রেডিও অপারেটর ধ্রুব মিত্র…।’ সামান্য কিছু জিজ্ঞাসার পর অনুমতি চলে এল হারবার মাস্টারের অফিস থেকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেকে রাখা নোঙরের কাছি বাঁধা ক্যাপস্টেন ঘোরাতে শুরু করল কয়েকজন লোক। নোঙর উঠে এল। এঞ্জিনের ধকধক শব্দও শুরু হল। সার্চলাইট জ্বালিয়ে কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করল ফ্রান্সিস ড্রেক।

কুয়াশা কেটে একসময় সমুদ্রের জলে লাল আবির গুলে সূর্যদেব উদিত হলেন। সুন্দর ঝলমলে সকাল। মাথার ওপর নীল আকাশ। ডাঙা আর দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে অসীম সমুদ্র। মাঝে মাঝে দু-একটা মাছ ধরার ট্রলার বা পালতোলা জেলে ডিঙি ভেসে যাচ্ছে। একসময় সেগুলোও হারিয়ে গেল। গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করল জাহাজ। রেডিও ঘরেই ছিল ধ্রুব। সামনের খোলা জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। প্রাতরাশের পর ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড তাকে নিজের কেবিনে ডেকে পাঠালেন। ফক্সও রয়েছে তার ঘরে। ফক্স তাকে বললেন, ‘দেখুন আপনি তো একা, চব্বিশ ঘণ্টা আপনার পক্ষে তো রেডিও রুমে ডিউটি দেওয়া সম্ভব নয়, ভোর পাঁচটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত আপনি কাজ করবেন। রাতে আপনার কাজটা করে দেব আমি আর ফক্স। আর একটা কথা, আমার এক বিশেষ বন্ধু মাঝে মাঝেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার নাম মিস্টার ম্যাঙ্গকি। তার কোনো কল এলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে খবর দেবেন।’

ফক্স এরপর বলল, ‘আমিও আপনাকে একটা কথা বলি। জাহাজে আমরা দু-তিন জন ছাড়া বাকি নাবিকরা কিন্তু বলতে গেলে অশিক্ষিত। মাল্লা শ্রেণির লোকরা সাধারণত যেমন হয়। ওদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন না। আপনার কোনো কথা বলার থাকলে তা আমাকে বা ক্যাপ্টেন সাহেবকে বলবেন।’

আর কোনো কথা বললেন না তারা। ক্যাপ্টেনের অনুমতি নিয়ে কেবিন থেকে ডেকে বেরিয়ে এল ধ্রুব। রোদ বাড়তে শুরু করেছে। সমুদ্রে তার প্রতিবিম্ব ঝলকাচ্ছে। বেশিক্ষণ জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। দুজন মাত্র লোক ডেকের ডিউটিতে। একজন ধ্রুবর দিকে পিছন ফিরে হালের চাকা ধরে বসে, অন্যজন ফুট তিরিশ ওপরে প্রধান মাস্তুলের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের দুজনের পরনেই কিন্তু সেই প্রাচীন নাবিকদের পোশাক। ঢিলা পা-জামার ওপর চওড়া কোমরবন্ধ। তার ওপর ডোরাকাটা হাতকাটা জ্যাকেট। মাথায় সেই তিনকোনা টুপি। আরও একজনকে দেখতে পেল ধ্রুব। মার্লিনের সেই ম্যাকাওটা। বেশ ওপরে একটা গোটানো পালের ওপর গম্ভীরভাবে সে পায়চারি করছে। তার মালিক অবশ্য ধারে কাছে নেই। সে হয়তো খোলে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত। ধ্রুব আবার তার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। অপারেটরের কাজটা একঘেঁয়ে। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে চুপচাপ বসে থাকা। সারাদিনে তেমন কোনো বার্তা এল না। একটা ফরাসি জাহাজ শুধু জানতে চাইল এডেন বন্দরের দিকে কুয়াশা কেটেছে কি? আর এডেন হারবার একবার রুটিন খবর নিল জাহাজের অবস্থান কোথায়? দুপুরে খাবার দিয়ে গেল একজন। খাবার খেয়ে একটু ঝিমিয়ে নিল ধ্রুব। সে যখন ওয়ারলেস রুম থেকে ডেকে বেরিয়ে এল তখন বিকাল পাঁচটা বেজে গেছে।

.

ডেকে রেলিং-এর পাশে একটা চেয়ারে বসল ধ্রুব। সূর্যের তাপ অনেকটা কমে এসেছে। গুমট ভাব কেটে গিয়ে বাতাস বইতে শুরু করেছে। বড় পালটা খাটানো হয়ে গেছে। এঞ্জিন এখন বন্ধ। পালটাই টেনে নিয়ে চলেছে জাহাজটাকে। সারা দিনের মধ্যে এই সময়টাই বেশ আরামের। খোলের ভিতর থেকে একজন দুজন করে উঠে এসে ডেকে দাঁড়াচ্ছে। ধ্রুবর মনে হল তার প্রতি তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। তারা দেখেও যেন দেখছে না। তাকে মার্লিনের পাখিটাকে সে দেখতে পেল জাহাজের ব্রিজের ওপর বসে পালক পরিষ্কার করছে। কিন্ত মার্লিন কোথায়? বেশ কথা বলে ছেলেটা। তার কথা ভাবতে ভাবতেই মার্লিন এসে হাজির হল। সে একটা চেয়ার টেনে ধ্রুবর পাশে বসে জানতে চাইল, ‘জাহাজ কেমন লাগছে?’

ধ্রুব হেসে জবাব দিল, ‘সবে তো কাজে ঢুকলাম, এখনই কীভাবে বলব? তবে মন্দ লাগছে না।’

মার্লিন এরপর প্রথমে একটু কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘ভেবেছিলাম, আপনার ঘরে এসে একবার দেখা করে যাব, কিন্তু খোলে কাজ ছিল, ফুরসত হল না।’

তারপর সে বলল, ‘আচ্ছা শ্রীগণেশ কি আপনার প্রথম জাহাজ?’

ধ্রুব বলল, ‘হ্যাঁ, চাকরি বলতে যা বোঝায় সে অর্থে ‘শ্রীগণেশই’ প্রথম। তা আপনি অনুমান করলেন কী ভাবে?’

মার্লিন হেসে বলল, ‘আসলে আপনাকে দেখে ঠিক জাহাজি বলে এখনও মনে হয় না। সে ছাপ এখনও আপনার মুখে পড়েনি এই যে ডেকে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাল্লা থেকে ক্যাপ্টেন, সবার চেহারাতে দেখবেন একটা রুক্ষতার ছাপ আছে। সমুদ্রের প্রখর সূর্য আর নোনা বাতাস গায়ের চামড়া খসখসে করে দেয়। সমুদ্রের দিকে দিনের পর দিন তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রতিফলিত সূর্যের আলোতে চোখের মণি ধূসর হয়ে যায়, দড়িদড়া টানতে না হলেও রেলিং বেয়ে ওঠানামা করতে করতে হাতের শিরা ফুলে ওঠে। এসব কোনো চিহ্নই নেই আপনার। আপনাকে বরং স্কুল মাস্টারের মতো দেখতে। তা এরকম জাহাজের চাকরিতে এলেন কেন? বাড়িতে কেউ জাহাজি ছিলেন নাকি?’

ধ্রুব বলল, ‘না, তেমন কেউ ছিলেন না। আসলে কলেজে পড়াশোনার পর অন্য কিছু না হওয়ায় পরিচিত একজন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন একটা মেরিন ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়ে কিছুদিন শিক্ষানবিশ থাকলাম ইনার শিপে। তারপর মাসখানেক আগে চাকরি জুটল শ্রীগণেশে’। চাকরির বাজার বেশ খারাপ। বাড়িতে বাবা নেই, মারা গেছেন। ছোট ছোট ভাইবোনেরা এখনও পড়াশোনা করছে। উপার্জনক্ষম কেউ নেই, কাজেই…।’

ধ্রুবর কথা শেষ করার আগেই মার্লিন বলল, ‘ও, বুঝতে পেরেছি। অধিকাংশ লোকই যে কারণে জাহাজে আসে, আপনারও সে ব্যাপার। আমার অবশ্য পরিবার বলে কিছু নেই। মা ছেলেবেলায় মারা গেছিলেন, তারপর বাবাও গেলেন। জাহাজঘাটায় ঘুরে ঘুরে দিন কাটছিল। আয় বলতে ডকে মাল তোলার ঠিকা কাজ। সে কাজ না থাকলে ডক লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতাম। জাহাজঘাটাতেই একদিন এ জাহাজের খবর মিলল। চাকরির জন্য নয়, মিউজিয়ামটাই দেখতে গেছিলাম। ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের সঙ্গে পরিচয় হল। চাকরিটা মিলে গেল। সুবিধা উভয়পক্ষেরই, মিউজিয়ামের জন্য তার গাইড দরকার, আর আমারও একটা ইচ্ছা ছিল সমুদ্রে ভাসার। এ ইচ্ছাটা মনে হয় আমার রক্তের মধ্যেই ছিল। ভেসে পড়লাম। যদি কোনো দিন ভাগ্য ফেরে এই আশাতেও’ নিজে থেকেই কথাগুলো জানাল মার্লিন। ধ্রুব বলল, ‘তার মানে, আপনারও এটা প্রথম জাহাজ। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার বাড়িতে কেউ জাহাজি ছিলেন?’

সে জবাব দিল, ‘ঠাকুরদা এবং বাবা দুজনেই। ডাঙার থেকে সমুদ্রেই তাদের জীবন কেটেছে বেশি। ঠাকুরদাকে অবশ্য আমি চোখে দেখিনি, বাবার মুখে তার কথা শুনেছি। এই ভারত মহাসাগরে বহু ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁরা। কিন্তু ঘুরে বেড়ানোই সার। ভাগ্য তাঁদের ফেরেনি। ঠাকুরদা ছিলেন ডেক সারেঙ, বাবা ছিলেন টিন্ডাল। তবে চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর তাদের সাথী হননি, দেখি আমার ভাগ্যে কী আছে?’

ঠিক এই সময় মার্লিনের পাখিটা হঠাৎ এসে বসল তার কাঁধে। তারপর দুবার ডেকে উঠল ‘মার্লিন-মার্লিন’ বলে। মার্লিন পকেট থেকে একমুঠো বাদাম বের করে পাখিটাকে খেতে দিতে দিতে বলল, ‘এ জাহাজে আমার চাকরির পিছনে ওরও কিন্তু একটা বড় ভূমিকা আছে। ওকে তো আমি সব সময় নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। মিউজিয়াম দেখতে আসার দিনও আমার সঙ্গে ছিল। বিয়ার্ড ওকে দেখে বললেন, ‘এরকম একটা পাখি আমিও খুঁজছিলাম। পাইরেট শিপে এ পাখি ভালো মানাবে। বলতে গেলে ওর জন্যই চাকরিটা আরও হল।’ মার্লিনের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাখিটা হঠাৎ একটা ছড়া কেটে উঠল। প্রথমবার তার কথা ঠিক ধরতে না পারলেও, দ্বিতীয়বার বলার পর পাখিটার কথা বুঝতে পারল ধ্রুব। সে বলছে-

‘ডিং ডং-ডিং ডং-ডিং ডং বেল,
পাইরেটস চেস্ট ইন টারটেল শেল।’

অদ্ভুত ছড়া তো! ধ্রুব আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘জলদস্যুর সিন্দুক কচ্ছপের খোলে রাখা আছে, বেশ মজার ব্যাপার তো। এর অর্থ কী? এ ছড়া আপনি শিখিয়েছেন।?’

মার্লিন বলল, ‘না, এ ছড়া আমি শেখাইনি। আমার ঠাকুরদা-বাবা সবাই শুনেছে এ ছড়া। অর্থ আমার জানা নেই। আমার দাদু এ পাখিটা পেয়েছিলেন এডেন বন্দরের এক বুড়ো জাহাজির কাছ থেকে। সম্ভবত সেই শিখিয়েছিল এই অদ্ভুত ছড়া।’

এরপর মার্লিন বলল, ‘জানেন ও আরও নানা কথা বলে। যেমন, ‘ঝড় আসছে পাল নামাও। সারেং হাল ধরো’ ইত্যাদি। বাপ-ঠাকুরদার সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এসব জাহাজি কথা শিখে ফেলেছে ও। তবে ওর একটা কথার জন্য বিয়ার্ড ওর ওপর খাপ্পা। আগে সে কথা কানে গেলে ক্যাপ্টেন ওকে জাহাজে তুলত না।’

‘কী কথা?’ জানতে চাইল ধ্রুব।

মার্লিন একবার ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে কৌতুকমিশ্রিত চাপা স্বরে বলল, ‘ও বলে, ‘ক্যাপ্টেনের মুন্ডু কাট, দাড়ি ছেঁড়।’ এ নিয়ে মাল্লারা হাসাহাসি করে। ক্যাপ্টেন তাই আজকাল ক্ষেপে যান ওকে দেখলে।’

ধ্রুব হাসি চেপে বলল, ‘এটা শেখাল কে?’

মার্লিন বলল, ‘এর উত্তরও আমার জানা নেই। অনেক বছর ধরে ও এ জাহাজ সে জাহাজে ঘুরেছে। ষাট-সত্তর বছর আগে তো হামেশাই জাহাজে বিদ্রোহ হত। আর তা দমন করতে না পারলেই প্রথমে কাটা যেত ক্যাপ্টেনের মাথা। হয়তো সে রকম কোনো ঘটনার সাক্ষী ছিল সে। কোনো বিদ্রোহীর কথাটা শুনে সেটা আজও মনে রেখেছে সে।’ ধ্রুব বলল, সময় কাটাবার সঙ্গী হিসেবে একটা কিন্তু দারুণ জিনিস পেয়েছেন।’ মার্লিন জবাব দিল, উত্তরাধিকার সূত্রে মাত্র তিনটে জিনিস পেয়েছি আমি। সমুদ্রের প্রতি টান, এই পাখিটা, আর…’ কথা শেষ করতে পারল না মার্লিন। পাখিটা চিৎকার করে ধমকে উঠল, ‘চো-ও-ও-প’।’

ঠিক এই সময় তার ঘর থেকে ডেকে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড। পাছে তিনি তাদের দিকে আসেন, এই ভয়ে মনে হয় পাখিটাও সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দিল মার্লিন। ক্যাপ্টেন অবশ্য এলেন না। খোলের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। ডেকে ক্যাপ্টেনের সাময়িক উপস্থিতিতে মার্লিনের কথার খেই হারিয়ে গেল।

মার্লিন এরপর বলল, ‘আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে খোলের দোতলায়। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাঁপাশের ঘর।

‘আর আপনার থাকার জায়গা?’

সে জবাব দিল, ‘আমি থাকি একদম নিচে ইঞ্জিন সারেঙদের সঙ্গে একটা ফোকসালে। তবে ওতে একটা সুবিধা হয় আমার। ইচ্ছা হলে কাজ না থাকলে লাইব্রেরিতে চলে যাই। অনেক বই আছে ওতে। কত রকমের জলদস্যুর কাহিনি। আপনাকে তো একা বসে থাকতে হবে। ওখান থেকে বই নিয়ে আসতে পারেন শুধু জলদস্যু নয়, সমুদ্র সম্পর্কেও অনেক তথ্য জানতে পারবেন ওর থেকে।’

ধ্রুব বলল, ‘কাল আপনার সঙ্গে গিয়ে বই নিয়ে আসব।’

ধ্রুবরা এরপর ডেকে বসে গল্প করতে লাগল। ইন্ডিয়া দেশটা কেমন, সে সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে লাগল মার্লিন। তার ঠাকুরদা নাকি একবার ইন্ডিয়া গেছিলেন। এ সব নিয়েই চলল গল্প।

একসময় সূর্য ডুবে গেল। আঁধার নেমে এল সমুদ্রে। মাস্তুলের মাথার ওপর সেই লাল আলোটা জ্বলে উঠল। বেশ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। দিনে যেমন রোদের তাপে ডেকে থাকা যায় না, তেমনই মাঝসমুদ্রের এই ঠান্ডা বাতাসও ক্ষতিকর। ডেক ফাঁকা হতে শুরু করল। মার্লিনের কথা বলা পাখিটা গিয়ে আশ্রয় নিল ডেকের ওপর একটা কেবিনের মাথায় রাখা শোয়ানো কাঠের পিপের মধ্যে। ওটাই নাকি তার থাকার জায়গা। উঠে পড়ল ধ্রুবও। মার্লিন তাকে নিয়ে চলল নিচে তার ঘরে পৌঁছে দিতে।

সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে ধ্রুব বলল, ‘ক্যাপ্টেনকে তো আর উঠতে দেখলাম না। তিনি কোথায়?

মার্লিন উত্তর দিল, ‘যে ঘরে ব্ল্যাক প্যারোটের ফাঁকা সিন্দুক আছে সে ঘরে। মাঝে মাঝে তিনি ও ঘরে সময় কাটান।’

ধ্রুব জানতে চাইল, ‘ও ঘরে কী করেন তিনি।’

মার্লিন চাপা স্বরে বলল, ‘পর্যটকদের দেখাবার সময় ছাড়া, ও ঘর সম্পর্কে এ জাহাজে আলোচনা করা নিষেধ আছে।’