১০
দ্বীপের কাছে হাঁটু জলে নামল সবাই। বিয়ার্ডের নেতৃত্বে এগোল সবাই পাড়ের দিকে। বেশ কিছুটা বেলাভূমি। তারপর জঙ্গল, ম্যাঙ্গকি বিয়ার্ডকে জিজ্ঞেস করল এখানে লোকজন থাকে তো?
বিয়ার্ড শুধু আঙুল তুলে একটা জায়গা দেখাল। সেখানে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে কয়েকটা ডিঙি নৌকা রাখা আছে। দ্বীপের প্রান্তসীমা দেখে ধ্রুবর অনুমান হল এর পরিধি মাইল পাঁচ হবে। সেসেজে এরকম অগুনতি ছোট ছোট দ্বীপ আছে।
ধ্রুব বিয়ার্ডকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ দ্বীপের নাম কী?’
বিয়ার্ড হেসে বলল, ‘ইংল্যান্ড?’
ধ্রুব বলল, ‘এর মানে?’
বিয়ার্ড বলল, ‘সেসেজ সরকারের দেওয়া একটা নাম নিশ্চয়ই আছে। তবে জলদস্যুরা তাকে এ নামেই ডাকত।’
এরপর বিয়ার্ড বলল, ‘আপনাকে আর মার্লিনকে একটা কথা বলি। এ দ্বীপে পূর্বপুরুষের নাম অনুযায়ী নিজের পরিচয় দানের রীতি। কেউ আপনার পরিচয় জানতে চাইলে আপনি বলবেন, আপনার পূর্বপুরুষ ছিল, সি-উলফ, আর মার্লিনের ছিল, হোয়াইট শার্ক। আমি যেমন বলব, আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন ব্ল্যাক প্যারোট আর ম্যাঙ্গকির পারকাসন। ব্যাপারটা খেয়াল রাখবেন।
নামগুলো চিনতে অসুবিধা হল না ধ্রুবদের। মার্লিনের কচ্ছপের খোলে লেখা নাম। বিয়ার্ডের কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি প্রকাশের পর ধ্রুবর সঙ্গে মার্লিনের একবার চোখাচোখি হল। সে ইশারায় চুপ থাকতে বলল তাকে।
সকলে ভেজা বালি ছেড়ে সবে শক্ত জমিতে পা রেখেছে ঠিক এমন সময় হঠাৎই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাদের ঘিরে ধরল, জনা পঞ্চাশ লোক। তাদের পরনে প্রাচীন যুগের পোশাক। হাতে উদ্যত আদ্যিকালের গাদা বন্দুক। তবে তাদের পোশাকে কোনো জৌলুস নেই। তারা বন্দুক হাতে ঘিরে ধরেছে দেখে বিয়ার্ডের সঙ্গীরা উত্তেজিত হয়ে উঠে নিজেদের কোমরের অস্ত্রের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল। কিন্তু বিয়ার্ড হাত তুলে তার সঙ্গীদের শান্ত থাকতে বললেন।
ধ্রুবদের বেশ কিছুক্ষণ নজর করার পরে সেই লোকগুলোর মধ্যে একজন লোক এগিয়ে এসে বলল, ‘তোমরা কারা? এ দ্বীপে নেমেছ কেন?’
বিয়ার্ড জবাব দিল, ‘আমি ব্ল্যাক প্যারোটের বংশধর, ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড। ওই জাহাজের মালিক। দ্বীপে নেমেছি রাজার সঙ্গে দেখা করতে।’
লোকটা বলল, ‘প্রমাণ?’
বিয়ার্ড এরপর তার ডান হাতের জামার আস্তিনটা উঠিয়ে দেখাল। ধ্রুব দেখল তার বাহুতে আঁকা আছে একটা উল্কি—‘কালো টিয়াপাখি।’
লোকটাও চিহ্ন দেখল। তারপর বলল, ‘আমি হলাম ডিউক অব বার্মিংহাম। রাজা জর্জ- এর পার্শ্বচর। ঠিক আছে চলো আমি তোমাদের বাকিংহামে নিয়ে যাচ্ছি। তবে একটা কথা, রাজার আইনই এ দ্বীপের আইন। সে আইন অমান্য করলে ফাঁসিতে লটকানো হয়।’
বিয়ার্ড আর বাক্যব্যয় না করে অনুসরণ করল ডিউককে। ডিউকের সঙ্গীরা ধ্রুবদের চারপাশ থেকে ঘিরে হাঁটতে লাগল। নিজেদের মধ্যে নানা টুকটাক কথা বলছে লোকগুলো। মাছধরা চাষবাস ইত্যাদি বিষয়ে। একে অপরকে মাঝে মাঝে নাম ধরে ডাকছে। তবে সে নামগুলো বড় অদ্ভুত। কারও নাম নাইট ল্যান্সলট, কারও নাম ব্যারন অব নিউক্যাসেল, কেউ ডিউক অব এডিনবরা, কেউবা আবার নিদেনপক্ষে ইয়র্কশায়ার বা কট্সওল্ডের জমিদার। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এই অদ্ভুত নামগুলো শুনে ধ্রুব মার্লিনের কাছে চাপাস্বরে এইসব অদ্ভুত নামকরণের কারণ জিজ্ঞাসা করল।
মার্লিন বলল, ‘যারা প্রাইভেটিয়ার পাইরেটস ছিল না, অর্থাৎ ‘ব্ল্যাক প্যারোটের’ মতো স্বাধীন বেসরকারি জলদস্যুদর পয়লা নম্বর শত্রু ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তি। সে সময় কোনো স্বাধীন জলদস্যুকে ধরতে পারলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। আবার মাঝসমুদ্রে কোনো ব্রিটিশ অভিজাতকে বাগে পেলে জলদস্যুরাও একই কাজ করত। যে সমস্ত দ্বীপে জলদস্যুদের অধিকার কায়েম হত, সেসব দ্বীপে জলদস্যুরা অনেক সময় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম-উপাধি অনুসারে নিজেদের বা জায়গার নামকরণ করত। এভাবেই তারা ব্যঙ্গ করত ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ও তার সঙ্গী অভিজাত জমিদারদের, যারা ছিল জলদস্যুদের শত্রু। এখানে এখনো এ ব্যাপারটা প্রচলিত আছে দেখছি।’ নিচু গলায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল মার্লিন। এরপরই মার্লিন হঠাৎ একটা গাছের মাথার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘আরে ওই দ্যাখো!’
ধ্রুব তাকিয়ে দেখল, একটা গাছের বেশ উঁচু ডালে সার বেঁধে বসে আছে, এক ঝাঁক বেশ বড়পাখি। কালো টিয়া। এতগুলো লোকের পদশব্দ শুনে পরমুহূর্তেই পাখিগুলো ট্যা ট্যা ডাকতে ডাকতে জঙ্গলের অন্য দিকে উড়ে গেল। পাখিগুলোকে দেখে ধ্রুব বিস্মিত হয়েছে বুঝতে পেরে তার পাশে চলা কট্সওল্ডের গভর্নর নামের এক দ্বীপবাসী বলল, ‘এ পাখি তামাম মুলুকে একমাত্র এখানেই পাওয়া যায়। এরা অনেক বছর বাঁচে আর মানুষের মতো কথা বলতে পারে। আর এরাই হল এ দ্বীপের রক্ষাকর্তা।’
ধ্রুব বলল, ‘তার মানে?’ লোকটা ধ্রুবর কথা জবাব না দিয়ে শুধু একটু হাসল।
কিছুক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলার পর হঠাৎই একটা উন্মুক্ত জায়গাতে এসে উপস্থিত হল তারা। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু বাড়ি ঘর। আরও কিছু লোকজনও আছে। তবে তাদের অধিকাংশই নারী-শিশু বা বৃদ্ধ
সেখানে উপস্থিত হতেই কৌতূহলী ভাবে তাদের দেখতে লাগল সবাই। তবে তাদের পোশাক-আশাক ঘরবাড়ি সবই প্রাচীন ধরনের। ধ্রুবরা যেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের কোনো ক্ষুদ্র গ্রামে এসে হাজির হয়েছে।
সবাইকে এনে দাঁড় করানো হল গ্রামের একমাত্র দোতলা বাড়ির সামনে। কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি বাড়িটার মাথায় খড়ের ছাদ। অনেকদিনের পুরানো বাড়িটা একদিকে হেলে গেছে। সে বাড়ি আর আশপাশের বাড়িগুলোর ছাদে ঝাঁকে ঝাঁকে বসে আছে কালো টিয়াপাখি। তাদের বাসস্থানের জন্য পায়রার খোপের মতো কাঠের খোপও রাখা আছে ছাদে। আরও একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল ধ্রুবরা। যে চত্বর ঘিরে বাড়ি ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেই চত্বরের মাঝখানে বেশ কয়েকটা কাঠের খুঁটি পোঁতা। আর তাদের গায়ে বাঁধা আছে কাপড় আর তুলোর তৈরি প্রমাণ আকৃতির মানুষের মতো পুতুল। তবে তাদের গাগুলো ছেঁড়াখোঁড়া। অসংখ্য ছিদ্র তাদের গায়ে। পেট ফেটে ভিতরের তুলো কাপড় বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কাচের গুলির চোখগুলো অক্ষিকোটরের বাইরে সুতোতে ঝুলছে।
মার্লিন বলল, ‘সম্ভবত এই তুলোর পুতুলগুলোর ওপর অস্ত্রশিক্ষা করে এরা। তাই এমন ছেঁড়াখোঁড়া পুতুলগুলো।’
ডিউক অব বার্মিংহাম, ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডকে দোতলা বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ‘এই হল ‘বাকিংহাম প্যালেস’। আপনারা বাইরে দাঁড়ান। আমি রাজাকে খবর দিচ্ছি।’ বিয়ার্ড বললেন, ‘তাকে বলবেন আমার সঙ্গে ম্যাঙ্গকি, উলফ, আর শার্কের উত্তরাধিকারীরাও আছেন।’
সবাইকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে প্যালেসের ভিতর ঢুকল বার্মিংহামের ডিউক। মিনিট দশেক পর ফিরে এসে লোকটা বলল, ‘আপনারা চারজন এখন রাজকীয় অতিথিশালায় অপেক্ষা করুন। যথাসময়ে আপনাদের ডেকে আনবে।’ বাড়িটার দোতলায় উঠবার জন্য একটা সিঁড়ি আছে বাড়ির বাইরের দিকে। সেই সিঁড়ি দিয়ে একজন লোক এরপর ধ্রুবদের চারজনকে পৌঁছে দিয়ে গেল রাজকীয় অতিথিশালায়। বাকিরা নিচেই দাঁড়িয়ে রইল। রাজকীয় অতিথিশালা বলতে শস্যের বস্তাপূর্ণ একটা ঘর। তার মাঝখানে অপটু হাতে তৈরি একটা তক্তার টেবিল। আর তাকে ঘিরে কয়েকটা নড়বড়ে চেয়ার। টেবিল ঘিরে বসল চারজন। মার্লিন একদম চুপচাপ, বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকির মুখে চাপা উত্তেজনার রেশ। যে পৌঁছে দিতে এসেছিল সে যাবার পর চারপাশ দেখে নিয়ে বিয়ার্ড ধ্রুবদের উদ্দেশে বলল, ‘রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে আপনারা দুজন কী পরিচয় দেবেন মনে আছে তো? আর একটা কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি। সি উলফ্ আর হোয়াইট শার্ক এরা দুজনেই কিন্তু ছিলেন আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে জলদস্যু ব্ল্যাক প্যারোটের নাবিক। আপনাদের কাছে রাজা জানতে চাইলে আপনারা বলবেন, এ ব্যাপারটা আপনারা পারিবারিক সূত্রে জানেন ও ব্ল্যাক প্যারোটের উত্তরাধিকারী অর্থাৎ আমাকে নেতা বলে মানেন। আপনারা বলবেন যে আপনারা এসেছেন আপনাদের উত্তরাধিকার বুঝে নিতে।’
ধ্রুব ব্যাপারটা শুনে না বোঝার ভান করে বলল, ‘ঠিক আছে বলব। কিন্তু, কীসের উত্তরাধিকার?’
বিয়ার্ড বলল, ‘অত ব্যাপার আপনার না বুঝলেও চলবে। দেশে যা ঘটিয়ে এসেছেন তাতে তো ফেরার পথ বন্ধ। আমার কাজ ঠিকমতো মিটলে আরও কিছু আয় হবে আপনার। আর মার্লিনের ভবঘুরে দশাও কাটবে। কিন্তু আমার কথা না শুনলে এ দ্বীপেই ফেলে রেখে যাব।’
তার কথা শুনে আর কিছু বলল না ধ্রুব।
আধ ঘণ্টা পর একটা লোক এসে খবর দিল, ‘রাজা তলব করেছেন। তবে দুজনের বেশি লোক যাওয়া যাবে না। অস্ত্রও রেখে যেতে হবে।’
দুজনের কথা শুনে যেন খুশিই হল বিয়ার্ড। ধ্রুব আর মার্লিনকে তাহলে নিয়ে যেতে হবে না। পারকাসন আর তলোয়ারগুলো ধ্রুবদের জিম্মায় টেবিলে রেখে বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকি বেরিয়ে গেল।
তারা যাবার পর ধ্রুব বলল, ‘রাজার সাথে ওদের আলোচনা শুনতে পারলে ভালো হত।’
মার্লিন হেসে বলল, ‘শুনবই তো। ওদের আগেই আমার রাজদর্শন সারা হয়ে গেছে।’
ধ্রুব বলল, ‘মানে?’
মার্লিন টেবিলের নিচের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাতেই ধ্রুব ধরতে পারল ব্যাপারটা। টেবিলের নিচে কাঠের তক্তা পচে গিয়ে বেশ বড় একটা ছিদ্র হয়েছে। ঘুলঘুলির মতো ছিদ্র দিয়ে নিচের ঘরে কার যেন মাথা দেখা যাচ্ছে। ছিদ্রটাকে আড়াল করার জন্যই টেবিলটাকে এখানে রাখা হয়েছে। মার্লিন বলল, ‘দেখা যাক নিচে কী হয়, এই বলে সে টেবিলের নিচে শুয়ে পড়ল। তার দেখাদেখি ধ্রুবও সেই ফোকরে চোখ রাখতেই নিচের ঘরের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘরের ভিতর একটা বড় কাঠের চেয়ারে বসে আছেন একজন অতিবৃদ্ধ লোক। তার সাদা চুল দাড়ি। গায়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সোনালি জরির পোশাক। সামনে একটা টেবিল, আর সেই টেবিল ঘিরে বসে আছে, বার্মিংহামের ডিউক, কিউক্যাসেলের ব্যারনসহ আরও কয়েকজন। সাদা চুলওলা এ লোকটাই রাজা। তার হাতে আবার ছোট কারুকাজ করা দণ্ড, রাজদণ্ড।’
দেখতে লাগল ধ্রুবরা। বিয়ার্ড ম্যাঙ্গকি নিয়ে ঘরে ঢুকে প্রথমে টুপি খুলে, মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘আমি ক্যাপ্টেন বিয়ার্ড ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক প্যারোটের উত্তরাধিকারী। আমি এসেছি আমাদের উত্তরাধিকার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।’
রাজা রিচার্ড ভালো করে দেখলেন বিয়ার্ডকে। তারপর ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘প্ৰমাণ?’
বিয়ার্ড প্রথমে আস্তিনের সেই চিহ্নটা দেখাল, তারপর তার পোশাকের ভিতর থেকে সনদের মতো লাঠির গায়ে জড়ানো একটা লম্বা প্রাচীন কাগজ তুলে দিল রাজার হাতে। রাজা সেটা খুলে পড়লেন, তারপর সেটা ঘুরতে লাগল তার অনুচরদের হাতে। কাগজটাতে কী লেখা তা ওপর থেকে ধ্রুবরা দেখতে না পেলেও, তার মধ্যে যে ব্ল্যাক প্যারোটের বেশ বড় একটা প্রতীক চিহ্ন আঁকা আছে তা দেখতে পেল তারা। কাগজটা সবার দেখা হয়ে গেলে রাজা বললেন, শর্ত পূরণ?’
বিয়ার্ড বলল, ‘আরও তিনজনের উত্তরাধিকারী আমার সঙ্গে এসেছে। সি-উলফ, আর হোয়াইট শার্কের উত্তরাধিকারীরা আপনার অতিথিশালাতে, আর এই হল পারকাসনের উত্তরাধিকারী? এই বলে সে দেখাল ম্যাঙ্গকিকে।’
‘আর প্রমাণ?’ রাজা আবার বললেন।
‘আর প্রমাণ কী? চুক্তিপত্র আর তিনজনের উপস্থিতি তো আছেই। আপনার পূর্বপুরুষের সঙ্গে ব্ল্যাক প্যারোটের চুক্তি হয়েছিল যে আপনারা তার সম্পত্তি রক্ষা করবেন, ভার বিনিময়ে এই দ্বীপে পুরুষানুক্রমে রাজত্ব করবেন। যদি ব্ল্যাক প্যারোটের কোনো উত্তরাধিকারী তাঁর সঙ্গীদের তিনজনের উত্তরাধিকারীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি ফেরত নিতে আসে তবে তার খোঁজ দেবেন আপনারা।
রাজা বললেন, ‘আরও একটা শর্ত ছিল, যা গোপনীয়তার কারণে এই চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা ছিল না। তা হল একটা বিশেষ কচ্ছপের খোল। যাতে ছিল ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক প্যারোট আর তার সঙ্গীদের বখরার হিসাব। আপনি যখন উত্তরাধিকারী তখন ব্যাপারটা জানা আছে নিশ্চয়ই?’
রাজার কথা শুনে এবার চমকে উঠল মার্লিন আর ধ্রুব।
ম্যাঙ্গকি এবার বলল, ‘ওটা আমাদের কাছে নেই। ফায়ার থমসনের বংশধর ওটা হাতিয়ে নেয়। তবে আমার কাছে আমরাই যে আসল তার আরও প্রমাণ আছে। প্রমাণ হল ব্ল্যাক প্যারোটের ব্যবহৃত আমাদের প্রাচীন জাহাজ। সেখানে রাখা তার সিন্দুক ও ছবি। যে ছবির সঙ্গে দাড়ি বাদে হুবহু মিল আছে এই ক্যাপ্টেন বিয়ার্ডের। তবুও খোলটা লাগবে?’
রাজা বললেন, ‘তাহলেও ওই কচ্ছপের খোলটা না হলে আমার চলবে না। বংশপরম্পরায় ওই জায়গা গোপন রেখেছি আমরা। এই কয়েকশো বছরের মধ্যে আমার পূর্বপুরুষদের কাছে বহু লোক এসেছে ওই জায়গার সন্ধান করতে। শেষ যে লোকটা আমার ঠাকুরদা জর্জের আমলে এসেছিল তার কাছে ছিল সেই কচ্ছপের খোলটা কিন্তু এই চুক্তিপত্র বা ব্ল্যাক প্যারোটের সঙ্গীদের বংশধর কেউ ছিল না, তাই তাকেও ফিরে যেতে বলেছিলাম আমরা।’
বিয়ার্ড বলল, ‘তার মানে আমাদেরও ফিরে যেতে বলছেন?’
‘হ্যাঁ, তাই বলছি।’
বিয়ার্ড বলল, ‘এত দূর এসে ফিরে যাব! তার চেয়ে আপনাদের কী দিতে হবে বলুন?’
রাজা জর্জ বললেন, ‘লোভ আমাদের দেখাবেন না। ইচ্ছা হলে আমরা বহুদিন আগেই ওই সম্পদের মালিক হতাম। পাছে কেউ প্রলোভনে পড়ে তাই সে দ্বীপের মাটিতে আমাদের কেউ পা রাখে না। গত একশো বছরে আমি বা আমরা কেউ ওখানে যাইনি। আমিই শুধু বংশানুক্রমে জানি ওই দ্বীপে কোথায় রাখা আছে ওই গুপ্তধন। আমার এই সভাসদরা পর্যন্ত জানে না সে কথা। আমি মৃত্যুর আগে আমার ছেলেকে বলে যাব সে কথা। তারপর সে বলবে তার ছেলেকে। তার ছেলে বলবে তার ছেলেকে—এ ভাবেই ততদিন চলবে যতদিন না ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক প্যারোটের কোনো উত্তরাধিকারী সব শর্ত পূরণ করে।’ ম্যাঙ্গকি এবার বেশ উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘অত শর্ত আমরা বুঝি না। জায়গাটা আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে। নইলে আমরা নড়ব না প্রয়োজনে….।’ কথাটা শেষ করল না সে।
ধ্রুবদের মনে হল, বৃদ্ধ রাজা মনে হয় এবার হাসলেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘না যেতে চাইলে যাবেন না। আমার ঠাকুরদার আমলের সেই লোকটাও শেষ পর্যন্ত যেতে চায়নি। কিন্তু তার বিদায়টা খুব সুখকর ছিল না।’
ম্যাঙ্গকি এবার আরও উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। জানেন আমরা কী করতে পারি?’
রাজা বেশ কঠোর গলায় বললেন, ‘যা খুশি করতে পারেন। তবে সাফ কথা, ওই কচ্ছপের খোলটা না পেলে আমি আর কোনো কথা বলব না। আপনারা এবার যেতে পারেন, নইলে—।’
ধ্রুবরা দেখল মুহূর্তের মধ্যেই গাদা বন্দুকের নলগুলো রাজার সঙ্গীরা ত্যাগ করেছে বিয়ার্ড আর ম্যাঙ্গকির দিকে। ম্যাঙ্গকিও মনে হয় তার কোমরবন্ধে লুকানো পিস্তলটা বার করতে যাচ্ছিল। কিন্তু, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিয়ার্ড তার কাঁধে হাত রেখে তাকে থামিয়ে দিয়ে রাজার উদ্দেশে বলল, ‘ঠিক আছে আমরা যাচ্ছি।’ এই বলে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ধ্রুবরা শুনতে পেল তারা ঘর ছেড়ে বাইরে যেতেই রাজা তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বললেন, ‘ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। আজ রাতে ঘরের বাইরে কেউ যেন না বেরোয়। আর আমাদের সৈন্যবাহিনীকেও প্রস্তুত রাখবে…।’
এরপর তিনি আর কী বললেন তা আর শোনা হল না ধ্রুবদের। বাইরে নিচ থেকে বিয়ার্ড ধ্রুবদের নেমে আসতে বললেন।
ধ্রুবরা বিয়ার্ডদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ার্ড সবাইকে নিয়ে ফেরার পথ ধরল। এবার আর দ্বীপবাসীরা সঙ্গে এল না।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের দিকে ফেরার সময় বিয়ার্ড শুধু একবার ম্যাঙ্গকিকে বলল, ‘এখন লড়াই হলে ক্ষতি হত। অন্ধকার নামার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। দেখি গাদা বন্দুক দিয়ে ওরা কী ভাবে আমাদের ঠেকায়? বুড়োটাকে জাহাজে তুলে আনব। তারপর কী করে কথা বার করতে হবে তা আমার জানা আছে
