ঈগলের পালকে রক্তের দাগ – ১০

১০

দীপাঞ্জন পৌঁছে গেল প্রবেশ তোরণের কাছাকাছি। কেউ কোথাও নেই। যে গাড়িটাতে বাক্স এসেছিল সে গাড়িটা উন্মুক্ত প্রবেশ তোরণের দিকে মুখ করা। গাড়ির ইঞ্জিন চালু হয়েছে। মৃদু ধকধক শব্দ আসছে গাড়িটা থেকে। অর্থাৎ ড্রাইভার কেবিনে হয়তো সে লোকটা আছে। সম্ভবত গাড়িটা এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবার প্রস্তুতি শুরু করেছে। কিন্তু চারপাশে অন্য কোনো লোকজন নেই। দীপাঞ্জন গাড়িটার দিকে এগোতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ সে কিছু দূরে ঘরের মধ্যে থেকে ভেসে আসা একটা আলোক রেখা দেখতে পেল। সেটা দেখে দীপাঞ্জন গাড়ির দিকে না এগিয়ে সেই ঘরটার দিকে এগোল। ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ দীপাঞ্জনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন কাজ করল। সে সন্তর্পণে দরজার কাছে গিয়ে সাবধানে উঁকি দিল ঘরের ভিতরে। এ ঘরের ভিতরেও দেওয়ালের গায়ে একটা মশাল গাঁথা। দীপাঞ্জন দেখতে পেল সেই বেঁটে লোকটাকে মাটির নীচের ঘরে যার নির্দেশ পালন করছিল রেড ইন্ডিয়ান আর ইরিগেট সাজা লোকদুটো। ঘরের মধ্যে রাখা আছে গাড়ি থেকে নামানো বাক্সগুলো। লোকটা দরজার দিকে পিছন ফিরে এগোচ্ছে একটা ডালা খোলা বাক্সের দিকে। দীপাঞ্জন একবার ভাবল যে সে ছুটে গিয়ে পিছন থেকে জাপটে ধরে লোকটাকে। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল এ কাজটা করা বিপজ্জনক হবে। কোনোভাবে লোকটা যদি তার পায়ের শব্দ পায় তবে নির্ঘাত সঙ্গে-সঙ্গে পিছনে ফিরে গুলি চালাবে দীপাঞ্জনকে লক্ষ্য করে। আর মাটিতে পড়ে থাকা মার্টিনকেও দেখতে পেল সে। মার্টিন যেখানে পড়ে আছেন সেখানে রক্তের ধারা বইছে। মার্টিনকে হয়তো গুলি করে মেরেছে ওই নিষ্ঠুর বামনাকৃতি লোকটা। কাজেই দীপাঞ্জন আর ঘরের মধ্যে না-ঢুকে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল লোকটাকে। পিগমি আকৃতির লোকটা ডালা খোলা বাক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাক্সের ডালাটা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াল। একবার ঘড়ি দেখল লোকটা, তারপর কারো যেন প্রতীক্ষায় তাকাল দরজার দিকে। দীপাঞ্জন মাথাটা সরিয়ে নিল, তারপর দরজার ফ্রেম আর পাল্লার মধ্যে যে সরু ছিদ্র আছে তার মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ভিতরে। লোকটা সোজা তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। কিন্তু হঠাৎই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লোকটা বলে উঠল, ‘কে? দরজার আড়ালে কে দাঁড়িয়ে?’

আসলে দীপাঞ্জন দরজার একপাশে দাঁড়ালেও চাঁদের আলোতে তার ছায়াটা এসে পড়েছে দরজার আর একটা পাল্লার গায়ে। আর সেটা পিগমি আকৃতির লোকটার সতর্ক চোখে ধরা পড়ে গেছে।

লোকটা দরজার দিকে বন্দুক উঁচিয়ে আবারও বলে উঠল, ‘কে? কে ওখানে?’

দীপাঞ্জন জবাব দিল না, জবাব দেবার কোনো প্রশ্নই নেই। আগ্নেয়াস্ত্র এগিয়ে লোকটা দরজার দিকে দ্রুত এগোতে যাচ্ছিল। আর দীপাঞ্জনও পাল্লা আর ফ্রেমের আড়াল থেকে চোখ সরিয়ে ছুটতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময় ঘরের মধ্যে এক কাণ্ড ঘটল। বামনটা মাটিতে পড়ে থাকা মার্টিনের দেহটার পাশ দিয়ে দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মার্টিনের দেহটা যেন নড়ে উঠল আর তার পরই মার্টিনের জোড়া পা আঘাত করল লোকটাকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল লোকটা। হয়তো-বা আগ্নেয়াস্ত্রটার ট্রিগারে হাত পড়ে যাওয়াতেই জীবন্ত হয়ে উঠল সেটা। স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র থেকে র‍্যাটরাট শব্দ করে গুলি বর্ষিত হতে লাগল দেওয়ালের গায়ে। ধোঁয়ায় আর বারুদের কটু গন্ধে ভরে উঠল ঘর। আর ধোঁয়ার আড়াল থেকে ভেসে আসতে নাগল ঝটাপটির শব্দ। আগ্নেয়াস্ত্রের অগ্নিবর্ষণ শেষ হল এক সময়। দীপাঞ্জন ধোঁয়ার মধ্যে আবছা দেখতে পেল মাটিতে ঝটাপটি করছে মার্টিন আর সেই শয়তান লোকটা। দীপাঞ্জন আর দেরি করল না। ঘরের ভিতর প্রবেশ করে দ্রুত পৌঁছে গেল তাদের কাছে। দুজনের ঝটাপটিতে বামন লোকটার গলা থেকে খসে পড়েছিল স্ট্র্যাপে ঝোলানো মারণাস্ত্রটা। দীপাঞ্জন কুড়িয়ে নিল সেটা। তারপর তার বাঁট দিয়ে মোক্ষম আঘাত হানল বামন লোকটার মাথায়। আকস্মিক সেই আঘাতে অস্ফুট চিৎকার করে স্থির হয়ে গেল বামন। তার দেহ ছেড়ে এরপর উঠে বসল রক্তাক্ত মার্টিন। দীপাঞ্জন বলে উঠল, ‘কোথায় গুলি লেগেছে আপনার?’

মার্টিন বললেন, ‘কাঁধে। কয়েক মিনিটের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু তারপরই হুঁশ ফিরেছিল। মরার মতো ভান করে পড়েছিলাম। আপনি তাড়াতাড়ি ওই বাক্সগুলো খুলুন। বাক্সগুলোর মধ্যে সবাই আছেন।’

কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল দীপাঞ্জন। সে বাক্সগুলোর কাছে গিয়ে ডালা ওঠাতে শুরু করল। প্রথম বাক্স থেকে লাফিয়ে উঠলেন বার্ক, দ্বিতীয় বাক্স থেকে কোম্বাটু আর তৃতীয় বাক্স থেকে জুয়ান। জুয়ান বাইরে বেরিয়ে এসেই বললেন, ‘আমাদের শুধু জ্ঞান আছে, অন্যদের ক্লোরোফর্ম করে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে বাক্সগুলোর মধ্যে।

দীপাঞ্জন বলে উঠল, ‘আপনাদের বাক্সে পোরা হল কেন?’

জুয়ান মাটিতে পড়ে থাকা বামন লোকটাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওর নাম টিম্বাকু। সম্পর্কে মিস্টার কোম্বাটুর ভাই হন। লোকটা আমাদের বাক্স-বন্দি করে আফ্রিকা নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল হিউম্যান জ্যু-তে রাখবে বলে।’

ভাই বলে পরিচয় দিতে আমি আজ লজ্জা বোধ করি। জ্ঞান ফেরার আগে ওকে বাক্স-বন্দি মিস্টার কোম্বাটু সঙ্গে-সঙ্গে ঘৃণা ভরে বলে উঠলেন, ‘না, ও আমার কেউ হয় না। ওকে করো।’

এরপর মাটিতে বসে থাকা মার্টিন আর পড়ে থাকা টিম্বাকুর দিকে এগিয়ে গেল সবাই। সত্যিই গুলি বিধেছে তার কাঁধে। কোম্বাটু আর জুয়ান তার সামনে বসলেন। জুয়ান তার শার্ট খুলে সেটা ছিঁড়ে মার্টিনের ক্ষতস্থান বাঁধতে শুরু করলেন। অত কষ্টের মধ্যেও মার্টিন জানতে চাইলেন, ‘স্যামসনের কোনো খোঁজ মিলল? আমার খুব চিন্তা হচ্ছে বুড়ো মানুষটার জন্য।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘তিনি কোথায় আছেন আমি জানি।’ –এরপর সে সংক্ষেপে ব্যক্ত করল সব ঘটনাটা।

জুয়ান ব্যাপারটা শুনে বললেন, ‘টিম্বাকুকে বাক্সবন্দি করে তুমি আর বার্ক স্যামসনকে উদ্ধার করে আনো।’

দীপাঞ্জন আর বার্ক চ্যাংদোলা করে টিম্বাকুর দেহটা উঠিয়ে নিয়ে ভরে ফেলল একটা বাক্সর ভিতর। তারপর তার ডালাটা বন্ধ করে চাবি দিয়ে ঘর থেকে বেরোল স্যামসনকে ওপরে আনার জন্য।

তারা যখন বাইরে বেরোল ঠিক তখনই তারা দেখতে পেল কফিনের বাক্স বয়ে আনা গাড়িটা দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে চিড়িয়াখানার চৌহদ্দি ছেড়ে। তা দেখে বার্ক বলল, ‘ওর ড্রাইভারটাই আমাদের মিথ্যা কথা বলে এ ঘরে টেনে এনেছিল। এখন বিপদের আঁচ বুঝে পালাচ্ছে। তবে পালের গোদা যখন ধরা পড়েছে তখন ও লোকটাও নিশ্চয়ই ধরা পড়ে যাবে।’ দীপাঞ্জন এ কথা শুনে বার্ককে নিয়ে এগোল বুড়ো স্যামসনের খোঁজে। কিন্তু তাকে খোঁজার জন্য বেশি দূর এগোতে হল না। খাঁচাগুলোর গোলকধাঁধায় তারা প্রবেশ করতেই দেখতে পেল মাটির নীচ থেকে উপরে উঠে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছেন স্যামসন। দীপাঞ্জনদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। দীপাঞ্জন খেয়াল করল স্যামসনের হাতে ধরা আছে বেশ বড় একটা সেই ঈগলের পালকটা। বার্ক তাকে বললেন, ‘চলুন, আপনাকেই আমরা আনতে যাচ্ছিলাম।’

বৃদ্ধ ভালো করে হাঁটতে পারছিলেন না। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে দীপাঞ্জনদের সঙ্গে এগিয়ে চললেন ঘরটার দিকে। ঘরে গিয়ে ঢুকল তারা তিনজন। ইতিমধ্যে বাক্সগুলো থেকে ধরাধরি করে অন্যদের বাইরে বার করে এনে মাটিতে শুইয়েছেন জুয়ান আর কোম্বাটু। তুৰ্গিনেভ মাটিতে উঠেও বসেছেন, কারস্টেন আর মামুন একটু নড়াচড়াও করছেন। মার্টিনের ক্ষতচিহ্ন বাঁধা হয়ে গেছে। একটা দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে তিনি। দীপাঞ্জনদের ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি স্যামসনের উদ্দেশে বললেন, যাক আপনি সুস্থ আছেন, খুব চিন্তা হচ্ছিল আপনার জন্য।’

স্যামসন আস্তে আস্তে জবাব দিলেন, ‘কাল রাতে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম কবরখানায়। শেষ রাতে যখন কবরখানা থেকে ঘরে ফিরছি তখন কুয়াশায় সাদা হয়ে গেছে চারপাশ। গরাদ ঘরগুলোর পাশ দিয়ে যখন আসছি তখন দেখি একজন পিগমি কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে গরাদ ঘরের সামনে। ওই গরাদ ঘরেই শেষ কদিন আটকে রাখা হয়েছিল টিকুটিকুকে। আমি লোকটাকে টিকুটিকু ভেবে কুয়াশার মধ্যে তার দিকে এগোলাম, আর তখনই কে যেন আমার মাথায় বাড়ি মারল। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমি সেই সুড়ঙ্গ ঘরে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে একজন পিগমি। তাকে দেখে বুঝলাম যে টিকুটিকু নয়, অন্য লোক। সে আমার থেকে টিকুটিকুর কবরের খোঁজ করছিল…।’—এই বলে বৃদ্ধ এগিয়ে গিয়ে একটা বাক্সের ওপর বসলেন। কোম্বাটু বললেন, ‘ইচ্ছা করছে ঘরের কোণে রাখা ক্লোরোফর্মের শিশিটা পুরোটাই টিম্বাকুর বাক্সে ঢেলে দেই। যাতে কোনোদিন আর ওর জ্ঞান না-ফেরে। কিন্তু আমরা তো আর ওর মতো খুনি নই। তাই কাজটা করতে পারব না। পুলিশকে ফোন করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তারা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আসছে এখানে।

পুলিশের হাতে তুলে দেব ওকে। আমাদের ও হিউম্যান জ্যু-তে রাখবে ভেবেছিল,

খুন করবে ভেবেছিল। এখন নিজেই বাকি জীবন কাটাবে জেলখানার গরাদের ভিতর।’

দীপাঞ্জনরা এরপর স্যামসনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জুয়ান বৃদ্ধ স্যামসনকে বললেন, ‘এই যে বারবার আপনি টিকুটিকুর নাম বলছেন, এত বছর পর সেই পিগমির কবরের খোঁজ করছিল কেন লোকগুলো? এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?’

স্যামসন জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, জানি। লোকগুলো কেন টিকুটিকুর কবর খুঁজছিল জানি।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘আপত্তি না-থাকলে আমাদের ব্যাপারটা সম্বন্ধে বলবেন?’

প্রশ্নটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ হাতে ধরা ঈগলের পালকটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ। যেন স্মৃতির অতলে ডুব দিলেন তিনি। তারপর ধীরে-ধীরে বলতে শুরু করলেন, ‘সে অনেকদিন আগের কথা। আমাকে তখন সদ্য আনা হয়েছে এখানে। আর তার কিছুদিন আগেই আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে টিকুটিকুকেও ধরে আনা হয়েছিল এই হিউম্যান জ্যু-তে। তার মুখেই আমি শুনেছিলাম তার পরিবারসহ বেশ বড় একটা দলকেই নাকি ধরা হয়েছিল। এ দেশে আনার পর হীরে ব্যবসায়ীরা কিনে নেয় দলের অন্যদের আর এই হিউম্যান জ্যু-এর মালিক টিকুটিকুকে কিনে এখানে আটক করেন। স্ত্রী-পরিবার- পরিজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় টিকুটিকু। পিগমিদের জন্য ফেনসিং-ঘেরা জায়গাটা আপনারা দেখেছেন। আমি তখন ছোট বলেই হয়তো আমাকে পিগমিদের সঙ্গে ওখানে প্রথমে রাখা হয়। পরে অবশ্য আমাকে ছেড়ে রাখা হত দিনের বেলাতে। বিভিন্ন খাঁচায় খাবার দেওয়া ইত্যাদি নানা কাজ করানো হত আমাকে দিয়ে। অন্য কারো সঙ্গে খুব বেশি কথা বলত না টিকুটিকু। তবে আমি ছোট বলেই হয়তো বা আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল তার। আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম তখন খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। তখন সে-ই সাহস জোগাত আমাকে…। কথাগুলো বলে সম্ভবত দম নেবার জন্য কিছুক্ষণ থামলেন বৃদ্ধ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন—

বেশ অদ্ভুত লোক ছিল টিকুটিকু। সে নাকি তার গ্রামের জাদুকর পুরোহিত ছিল। নানা রকম ছোটখাটো ট্রিক বা কৌশল জানত সে। মাঝে-মাঝে সেগুলো দশর্কদের দেখিয়ে রুটির টুকরো পেত। একটা অদ্ভুত খেলাও দেখাত সে। মাটির থেকে একটা ছোট পাথরের টুকরো তুলে নিয়ে দর্শকদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে পাথরটা ওপরে ছুড়ে দিত সে। ওপর থেকে পাথরটা পড়েই অদৃশ্য হয়ে যেত কোথাও। তার অনাবৃত দেহতে পাথর লুকাবার মতো কোনো জায়গা ছিল না। হ্যাঁ, পাথরের টুকরো। আর ওরকমই একটা পাথরের টুকরোই বিপদ ডেকে আনল। তবে সেটা সাধারণ পাথরের টুকরো নয়। সাদারঙের পায়রার ডিমের আকৃতির একটা পাথরের টুকরো। ধরা পড়ার পর আফ্রিকা থেকে ইউরোপের সুদীর্ঘ যাত্রাপথে কী ভাবে যে টিকুটিকু পাথরটা তার সঙ্গে লুকিয়ে এনেছিল তা আমার জানা নেই। আর পাথরটা যে কোথায় লুকিয়ে রাখত তাও আমি জানি না। তবে আমি হাতে নিয়ে দেখেছি পাথরটা। চাঁদনি রাতে চারপাশে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত তখন টিকুটিকু পাথরটা বার করে হাতের তালুতে রেখে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকত পাথরটার দিকে। চাঁদের আলোতে দ্যুতি ছড়াত পাথরটা। কখনও-বা সে লোফালুফি খেলত পাথরটা নিয়ে। নিজের দেশের গভীর জঙ্গলের ভিতর একটা নদীখাত থেকে নাকি সে কুড়িয়ে পেয়েছিল পাথরটা। আমার সামনে ছাড়া অন্য কারো সামনে পাথরটা বার করত না সে। কোনো গুপ্তস্থানে সেটাকে সে লুকিয়ে রাখত। আমি পরে জেনেছিলাম যে পাথরটা আসলে ছিল একটা ‘আনকাট ডায়মন্ড, পল না-কাটা, পালিশ না-করা একটা হীরে।’

আবারও থামলেন স্যামসন। বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা। খোলা দরজা দিয়ে কুয়াশা ঢুকতে শুরু করেছে ঘরের ভিতর। মৌনতা ভঙ্গ করে স্যামসন আবার বলতে লাগলেন, ‘কিন্তু ওই পাথরের টুকরোটাই দুর্যোগ ডেকে আনল টিকুটিকুর জীবনে। এক রাতে টিকুটিকু যখন পাথরটা নিয়ে খেলা করছিল তখন আড়াল থেকে একজন নৈশ প্রহরী ব্যাপারটা দেখে ফেলে পরদিন সেটা জানাল চিড়িয়াখানার মালিক শ্বেতাঙ্গ প্রভুকে। হীরে নিয়েই কারবার হয় এ অঞ্চলে। সবাই অল্পবিস্তর হীরে চেনে। গার্ড জানিয়েছিল যে পাথরটা নিয়ে খেলার সময় নাকি আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছিল পাথরটার থেকে। সাধারণ পাথর কি ঝলমল করে? এই হিউম্যান জ্যু-এর মালিকেরও এক সময় হীরের কারবার ছিল। টিকুটিকুকে যে জায়গা থেকে ধরা হয়েছিল সে অঞ্চলগুলোর নদীখাতে হীরে মেলে তা জানতেন চিড়িয়াখানার মালিক। হিসাব মিলে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন টিকুটিকুর কাছে যে পাথরটা আছে তার দাম লক্ষ লক্ষ পাউন্ড হবে। কারণ, অত বড় হীরে মেলে না।

পরদিনই তল্লাশি করা হল টিকুটিকুকে, তার থাকার জায়গাতেও তল্লাশি নেওয়া হল, কিন্তু হীরে মিলল না। হীরের সন্ধান দেওয়া তো দূরে থাক, ব্যাপারটা সে স্বীকারই করল না। সে বলল, ‘এমন কিছু জিনিস তার কাছে কোনোদিন ছিল না। কাজেই গারদে পোরা হল তাকে। বেশ ক’দিন অমানুষিক অত্যাচারের ফলে মারা গেল টিকুটিকু। আমাকে দিয়ে তার কবরের গর্ত খুঁড়ে দেহটা পুঁতে ফেলা হল।’ কথা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধ।

দীপাঞ্জন বলে উঠল, ‘তবে কি টিকুটিকু তার দেহের ভিতরেই হীরেটা লুকিয়ে ফেলেছিল। তার সঙ্গে কবরে গেছে হীরেটা? সে জন্যেই তার কবরের খোঁজ করছিল। কিন্তু সেই বা জানল কীভাবে ব্যাপারটা?’

এবার সবাইকে চমকে দিয়ে মিস্টার কোম্বাটু বলে উঠলেন, ‘টিম্বাকু আর আমি ব্যাপারটা জানি। তবে আমি কোনোদিন ওই কবর খুঁড়ে মৃত মানুষকে অসম্মানিত করতে চাইনি। অনেকদিন আগে টিম্বাকু আমাকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল। আমি তা সঙ্গে-সঙ্গে নাকচ করে দিই।’ কথাটা শুনে জুয়ান বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘কিন্তু এ ব্যাপারটা আপনারা জানলেন কী ভাবে?’

দীপাঞ্জনদের আরও চমকে দিয়ে কোম্বাটু বললেন, ‘আমরা জানলাম কারণ ওই টিকুটিকু আমার ঠাকুর্দা ছিলেন। বাবা ঠাকুমার মুখে ওই হীরের কথা শুনেছিলাম এবং মৃত্যুর আগে কথাটা আমাদের বলেছিলেন। ঠাকুমা বাবাকে বলেছিলেন যে, আমার ঠাকুর্দার এক অদ্ভুত কৌশল জানা ছিল। তিনি ছোট ছোট জিনিস গিলে ফেলে আবার সেটা উগরে বার করতে পারতেন। ওই হীরেটা ও ভাবেই তিনি পেটে লুকিয়ে রাখতেন। যে কারণে গার্ডরা হীরেটা পায়নি। আমাদের ধারণা টিকুটিকুর দেহের সঙ্গে কবরে চলে গেছে ওই অমূল্য হীরেটা। তাই কবরটা খুঁজছিল টিম্বাকু।

দীপাঞ্জন বলে উঠল, ‘তাহলে সেই হীরেটা সত্যিই এখনও কবরের মধ্যে আছে?’

বৃদ্ধ স্যামসন এবার বললেন, টিকুটিকু তার দেহের ভিতর হিরেটা লুকিয়ে রাখত এটা হয়তো সত্যি। কিন্তু কবরের ভিতর হীরেটা নেই। টিম্বাকুকে কবরের খোঁজ দিলে সঙ্গে-সঙ্গে আমাকে মেরে ফেলত। আর যাদের কাছে হীরেটা আছে তাদের কথা বললে তাদেরকে কোনো কৌশলে মারত। অনেক কষ্টে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছি আমি। কাউকে জানতে দেইনি তাদের কথা।’

জুয়ান প্রশ্ন করলেন, ‘তবে কাদের কাছে আছে হীরেটা? টিকুটিকুর পেটে হীরেটা ছিল না?’

বৃদ্ধ স্যামসন ধীরে-ধীরে বললেন, ‘ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবে না-জানা থাকলেও শ্বেতাঙ্গ মালিক একটা সন্দেহ করেছিলেন যে টিকুটিকু হীরেটা গিলে থাকতে পারে। তাই মৃত্যুর পর তার গলা-পেট চিরে দেখা হয়, কিন্তু হীরে পাওয়া যায়নি। আসলে একটা ছোট ব্যাপার ঘটেছিল সবার অলক্ষ্যে। একদিন গরাদ ঘরে বাইরে থেকে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে তখন গরাদের ফাঁক দিয়ে পাথরটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এ পাথরটা আমি তোমাকে বিশ্বাস করে দিলাম। আমি এটা কোনোভাবেই ওই সাদা চামড়াদের হাতে দেব না। আমার দিন ঘনিয়ে এসেছে।’

আমি জানতে চাইলাম, ‘এ পাথরটা নিয়ে আমি কী করব?’

টিকুটিকু বলল, ‘এখানে এই চিড়িয়াখানার বাইরে তো তুমি যেতে পারবে না। তবে এখানে আমার দুই পরিজন আছে। বেঙ্গো আর টেঙ্গো। আমার দেশের নদী থেকেই ওদের ধরা হয়। তারপর আমাদেরই মতো একই সঙ্গে জাহাজে চাপিয়ে এখানে এনে পরিখার জলে ছাড়া হয়। ওরাও আমাদের কালো মানুষের দেশের কালো কুমির। ওরাও বন্দি। ওদেরকেই তুমি পাথরটা দিয়ে দাও।’

টিকুটিকুর নির্দেশ পালন করলাম আমি। কুমিরের খাবার দেবার কাজটাও আমি করতাম। মাংসের খণ্ডের মধ্যে পাথরটা পুরে ওপর থেকে ছুড়ে দিলাম সেটা। ওদের দুজনের একজন গপ্ করে গিলে নিল সেটা।’ কথা শেষ করলেন স্যামসন। বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা। স্যামসন উঠে দাঁড়িয়ে এরপর বললেন, ‘আমি এবার যাই। রেড ইন্ডিয়ানদের দেখে এমন একটা ঈগল পাখির পালক মাথায় গোঁজার শখ হয়েছিল টিকুটিকুর। আমাকে একবার সে বলেও ছিল সে কথা। আজ যদি তার সঙ্গে দেখা হয় তবে তাকে পালকটা দেব। এমন ঘন কুয়াশামাখা চাঁদনি রাতেই তো সে আসে…। এই বলে তিনি এগোলেন দরজার দিকে। তার পায়ে পায়ে এগোল দীপাঞ্জন আর জুয়ান। স্যামসন দরজা ছেড়ে বাইরে যাবার মুখে দীপাঞ্জন তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কোথায় দেখা পাবেন টিকুটিকুর?’

মুহূর্তের জন্য থামলেন বৃদ্ধ। তারপর বললেন, ‘এমন রাতেই আমি তাকে দেখতে পাই পরিখার প্রাচীরের থেকে নিচে তাকালে। নিচে পরিখার গায়ের জমিটাতে এসে বসে। তার ডাকে সাড়া দিয়ে টেঙ্গো আর বেঙ্গো পরিখা থেকে জমিতে উঠে আসে। কুমির দুটোর মাথায় হাত বোলায় টিকুটিকু। তারাই যে তার দেশের মানুষ, একমাত্র আপনজন। তাদের কাছেই যে গচ্ছিত আছে তার পাথরটা। কুমিরদুটোর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মাঝে-মাঝে সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই তাকে।’

দীপাঞ্জন আর জুয়ান এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না। ঘর ছাড়লেন বৃদ্ধ স্যামসন ঈগলের পালকটা নিয়ে তিনি ধীরে-ধীরে কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেলেন পরিখার দিকে…চাঁদনি রাতে কোনো অপার্থিব দৃশ্যর খোঁজে।