মালয় বনের আতঙ্ক – ১

সাদা রঙের ছোট্ট এরোপ্লেনটা রাজহংসের মতো কুয়ালালামপুরের আকাশে ডানা মেলতেই জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিলিপ বললেন, ‘টাওয়ার দুটোকে দেখছেন? যেন হাত বাড়ালেই আমাদের প্লেনটাকে ধরে ফেলবে। বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম বাড়ি কুয়ালালামপুরের এই ‘পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার্স।’ বিজ্ঞান-শিল্প-প্রযুক্তি কত এগিয়ে গেছে! সেখানে ওই বনমানুষের গালগল্প বিশ্বাস করতে হবে? আমাকে তো নয় কোম্পানির স্বার্থে ওখানে যেতে হচ্ছে, কিন্তু আপনারা যে এই অদ্ভুত গল্পে বিশ্বাস করে অতদূর থেকে ছুটে এসেছেন এতে বেশ আশ্চর্য লাগছে! আপনারা যেতে চাইছেন তাই নিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য আপনার সঙ্গী হওয়াতে আমার একটা সুবিধা হল। ওখানে তো একজন বাদে কথা বলার লোক নেই। বাকিরা সব রবার বনের শ্রমিক। অধিকাংশই স্থানীয় ভাষা ছাড়া ইংরেজি জানে না। আপনাদের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটানো যাবে।’ বিখ্যাত ব্রিটিশ টায়ার কোম্পানি ‘গুডলাক’-এর উচ্চপদস্থ কর্মী ফিলিপের কথা শুনে হেরম্যান বললেন, ‘আসলে এ-সব প্রাণীর সন্ধান করা আমাদের দু’জনের নেশা বলতে পারেন। এদের খোঁজে আমরা সারা পৃথিবী চষে বেড়াই। অনেকে আমাদের মতো ক্রিপ্টোজুলজিস্টদের পরিহাস করেন ঠিকই। কিন্তু ক্রিপ্টোজুলজিস্টরা পৃথিবী, থেকে হারিয়ে যাওয়া বা নতুন বেশ কিছু প্রাণীর সন্ধান দিয়েছেন মানুষকে। যেমন কোমাডো ড্রাগন, সিলাকাস্থ মাছ, জায়েন্ট স্কুইড, হোয়ান কিম টার্টল—এইসব। এই প্রাণীগুলোর কথা কিন্তু স্থানীয় মানুষরা বহুদিন ধরে বললেও সভ্য পৃথিবী বিশ্বাস করত না এ-সব প্রাণীর অস্তিত্বের কথা। কে বলতে পারে আমরা হয়তো সত্যিই খোঁজ পেলাম সেই লোমে-ঢাকা মানুষ বা বনমানুষদের?’

ফিলিপ বললেন, ‘আমার কিন্তু রবার বনের এই লোমশ মানুষের গল্পর পিছনে অন্য ব্যাপার কাজ করছে বলে মনে হয়। তাই এটা রটানো হচ্ছে।’

‘কী ব্যাপার?’ জানতে চাইল সুদীপ্ত।

ফিলিপ বললেন, ‘দেখুন আমি দু-মাস হল ইউকে থেকে মালয়েশিয়া এসেছি। এখানে আমাকে কোম্পানি থেকে পাঠানো হয়েছে মূলত কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার কাজে। আরও একমাস আমার এখানে থাকার কথা। এর আগে আমি একবার ভিজিট করেছি আমরা যেখানে যাচ্ছি সে-জায়গাতে। রবার বনটা বিশাল। প্রাকৃতিক বন। মাইলের পর মাইল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত সেই অরণ্য এ-দেশের সরকারের থেকে দীর্ঘদিন ধরে ইজারা নিয়ে এসেছে আমাদের কোম্পানি। কোম্পানির এক ছোট পার্টনারও অবশ্য আছে। মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট শেয়ার তার। সেই মূলত দেখাশোনা করে বন বা বাগানটা। আর লোক বলতে সেখানে আছে কয়েকশো শ্রমিক। মালয়ী, চিনা, ভারতীয়, সিংহলী নানা-জাতের মানুষ। ওরা বনে ‘ট্যাপ’ করে। অর্থাৎ রবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ করে। বেশ কিছুদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির দাবি করেছে ওরা। কিন্তু কোম্পানি এতদিন ধরে সে-দাবি মানতে নারাজ ছিল। আমার ধারণা ওই লোমশ মানুষের গল্প প্রচার করে তার অছিলায় মজুরি বৃদ্ধির জন্যই কাজ বন্ধ করেছে তারা। কোম্পানি যদি কিছু টাকা-পয়সা দেয় তবে সঙ্গে সঙ্গে আবার ওরা কাজে ফিরবে। ওখানে গেলেই সব ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। আর যারা সেই লোমশ মানুষদের দেখেছে বলে দাবি করছে তাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা কতটা সত্যি।’

হেরম্যান বললেন, ‘সংবাদপত্রে যে খবর বেরিয়েছিল তাতে অন্তত তিনজন মানুষ তাদের দেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।’ হেরম্যানের কথা শুনে ফিলিপ বললেন, ‘খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলো তাদের বিক্রি বাড়াবার জন্য এমন নানা উদ্ভট খবর হামেশাই প্রচার করে।’ স্পষ্ট অবিশ্বাস ঝরে পড়ল ফিলিপের কথায়।

হেরম্যান আর সুদীপ্ত অবশ্য এরপর আর কোনো তর্কে গেল না ফিলিপের কথা নিয়ে। সেই তো তাদের জায়গাটাতে নিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে তর্ক করা সমীচীন নয়। ফিলিপ ও আর কোনো কথা বললেন না। টাইয়ের নটটা একটু ঢিলে করে বুকে চিবুক ছুঁইয়ে চোখ বুজলেন।

কুয়ালালামপুরের আকাশ-সীমা অতিক্রম করে চিন সমুদ্র অতিক্রম করতে শুরু করে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে উড়ে চলেছে প্লেন। বেশ নিচু দিয়েই উড়ছে প্লেনটা। নিচের জলরাশির দিকে তাকিয়ে হেরম্যান বললেন, ‘এই দক্ষিণ চিন সমুদ্রই দেশটাকে পশ্চিম আর পূর্বে বিভক্ত করেছে। মালয় উপদ্বীপে অবস্থিত দেশের পশ্চিম ভূখণ্ডতেই এ-দেশের অধিকাংশ লোক বাস করে। আর আমরা যে-দিকে যাচ্ছি অর্থাৎ বোর্নিও সংলগ্ন পূর্ব ভূখণ্ডের অধিকাংশ জায়গাতেই কিন্তু জনশূন্য গভীর জঙ্গল। উষ্ণ ও আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ু ওখানে অরণ্য বিস্তারে সাহায্য করেছে। পাঁচ ভাগের তিন ভাগ অংশই অরণ্য আচ্ছাদিত। বহু প্রাণীর আবাসস্থল ওই বোর্নিও সংলগ্ন অরণ্য। শুধু লোমশ মানুষ নয়, নতুন কোনো প্রাণীর সন্ধান পাওয়াও আশ্চর্য নয় ওখানে।’ সুদীপ্ত বলল, ‘শুনেছি, মালয়ের জঙ্গলে এক প্রজাতির পাখি পাওয়া যায় যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বিশেষত প্যারট জাতীয় কথা-বলা পাখি। জলদস্যুরা নাকি পাখি সংগ্রহ করত মালয়ের জঙ্গল থেকে। সার্কাসের জীবজন্তু সংগ্রহ করা হত এখান থেকেই।’

হেরম্যান বললেন, ‘হিমালয়ের তুষার মানব, আমেরিকার বিগ ফুটের মতো মালয়ের জঙ্গলের এই লোমশ মানুষের ব্যাপারটাও কিন্তু গত একশো বছরে অনেকবার শোনা গেছে। আমি বিভিন্ন নথি ঘেঁটে যা পেয়েছি তাতে নিক্সন নামে এক শ্বেতাঙ্গ মালয়ের জঙ্গলের লোমশ মানুষের খবর সর্বপ্রথম বাইরের পৃথিবীকে দেন। ঘাসের বনে তিনি কিছু নড়তে দেখে হিংস্র জন্তু ভেবে গুলি চালান। সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠে দাঁড়ায় এক লোমশ মানুষ। তার হাতে গুলি লেগেছিল। আর্তনাদ করতে করতে সে অদৃশ্য হয়ে যায় বনের গভীরে। এরপর বহুবার মালয়ের জঙ্গলে এই লোমশ মানুষ দেখার খবর মিলেছে। যারা দেখেছে তারা কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ চিনা, মালয়ী, ভারতীয় বা সিংহলী। বছর তিরিশ আগে নাকি একদল জেলে মালয়ের বোর্নিও অংশের জঙ্গলের খাড়িতে মাছ ধরতে গিয়ে গাছের ওপর দেখতে পায় এক লোমশ মানুষকে। জাল দিয়ে তাকে তারা ধরেও ফেলে। কিন্তু ধরা পড়ার পর নাকি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয় সেই লোমশ মানুষ। ফলশ্রুতি হিসাবে তাঁর মৃত্যু হয় কিছুদিনের মধ্যে। সভ্য জগতে তাকে জ্যান্ত নিয়ে আসতে পারেনি জেলের দল উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে। সেই জঙ্গলেই পুঁতে ফেলা হয় লোমশ মানুষের দেহ। বছর দুই আগে এক রাতে কুয়ালালামপুরের রাস্তাতেও নাকি দেখা গেছিল এক জোড়া লোমশ নর-নারীকে। এক বাস-ড্রাইভার নাকি তাদের দেখেছিল। কাগজে বেরিয়েছিল খবরটা। অবশ্য সেটা অতিরঞ্জিত হতে পারে।’

সুদীপ্ত বলল, ‘হতে পারে এই লোমশ মানুষরা পিথেক্যানথ্রোপাস ধরনের প্রথম মানব ও আজকের মানুষের মধ্যবর্তী কোনো মানবগোষ্ঠী।’

হেরম্যান বললেন, ‘হতেই পারে। নৃতত্ত্ববিদরা বলেন বেশ কয়েকটি আদিম মানবগোষ্ঠীর জন্ম কিন্তু এসব অঞ্চলেই। মালয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে গুহাবাসী এক ক্ষুদ্রাকৃতি বানরের কথা শোনা যায়। লালরঙের সেই বানররা নাকি আগুন জ্বালাতে পারে এবং পাথর ঘসে ধারালো অস্ত্র বানাতে পারে ঠিক আদিম গুহাবাসী মানুষের মতোই।’

এ-কথা বলে একটু হেসে হেরম্যান বললেন, ‘আরও একটা অদ্ভুত ক্রিপটিডের গল্প কিন্তু শোনা যায় মালয় দেশে। সে প্রাণীর নাম—‘বেবিলাউট’। এই বেবিলাউট প্রাণীটা হল শূকর। কিন্তু তার পায়ের পাতাগুলো হল হাঁসের পায়ের মতো। হাজার হাজার হংসীপদ শূকর নাকি একদিন আমাদের এই নিচের সমুদ্র সাঁতরে বোর্নিও থেকে মালয় দেশে এসেছিল। মালয়ের বহু গল্প-লোককথায় এই বেবিলাউট-এর উল্লেখ আছে।

সুদীপ্ত প্রশ্ন করল, ‘তারা এখন কোথায়?’

হেরম্যান জবাব দিলেন, হয়তো তারা এখন অবলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে অথবা টিকে আছে মালয়ের উপকূল সংলগ্ন কোনো গভীর অরণ্যে। প্ল্যাটিপাস বা হংসচঞ্চুর মতো তারা হয়তো কোনো মিসিং-লিংক। এই বিপুল পৃথিবীর বুকে কত অজানা প্রাণী হয়তো আজও লুকিয়ে আছে কে জানে? আমরা ক্রিপ্টোজুলজিস্টরাও বা ক’টা প্রাণীর খোঁজ রাখি?’ সুদীপ্ত হেসে বলল, ‘ঠিক তাই। তবে আপাতত যদি আমরা ওই লোমশ মানুষ বা বানরের খোঁজ পাই, সেটাই অনেক বড় ব্যাপার হবে। তাক লেগে যাবে সারা পৃথিবীর।’

হেরম্যান বললেন, ‘হ্যাঁ আমিও সেই আশাই করছি। সত্যিই যদি আমরা তাকে খুঁজে পাই তবে সভ্য পৃথিবীর ল্যাবরেটরি আর লাইব্রেরিতে বসে থাকা বিজ্ঞানীকুলের কাছে সেটা একটা উপযুক্ত জবাব হবে।’

‘আপনাদের সে-আশা মনে হয় পূর্ণ হবে না।’ ফিলিপের গলা শুনে তার দিকে তাকাল সুদীপ্ত আর হেরম্যান। কখন যেন সোজা হয়ে বসেছেন তিনি।

সুদীপ্তরা তার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘ওখানে শ্রমিকদের যে সর্দার তাঁর নাম রাবণ। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক সিংহলী। তার কথায় পরিচালিত হয় শ্রমিকরা। গতবার আমি তাকে দেখেছি। আমার ধারণা শ্রমিকদের রবার বনে কাজে যাওয়া বন্ধ করার পিছনে ওই লোকটাই। ও আমাকে গতবারই প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিল যে কোম্পানি যদি শ্রমিকদের মজুরি না বাড়ায় তবে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া ও ডক্টর গুরুমূর্তিকে পছন্দ করে না। এটাও এর পিছনে একটা কারণ হতে পারে।’

সুদীপ্ত সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘গুরুমূর্তি মানে কোনো ভারতীয়?’

ফিলিপ বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন দক্ষিণ ভারতীয়। তিরিশ বছর আছেন এ-দেশে। এখন এ-দেশেরই নাগরিক। কুয়ালালামপুরে ডাক্তারি করতেন এক সময়। প্রচুর পয়সা কামিয়েছেন। তারপর ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে আমাদের কোম্পানির পাঁচ শতাংশ অংশীদার হয়ে ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। এ-দেশের নিয়ম হল যে বিদেশি কোম্পানিকে এখানে বনের ইজারা নিতে হলে এদেশের কোনো নাগরকিকে অংশীদার করতে হয়। তাই তাঁকে নিয়েছি আমরা আমাদের সঙ্গে।’

পশ্চিম আর পূর্ব মালয়ের মধ্যে চিন সমুদ্রর ব্যবধান মাত্র দুশো কিলোমিটার। আকাশ পথে মাত্র ঘণ্টাখানেকের যাত্রা। এক সময় সুদীপ্তদের এরোপ্লেনটা চিন সাগর অতিক্রম করল। তটরেখা দেখা গেল। তার গা-ঘেঁষেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। গভীর জঙ্গল। প্লেনটা আরও উচ্চতা কমিয়ে আনল তার, গতিও বেশ কিছুটা কমিয়ে আনল। নিচের পৃথিবীটা স্পষ্ট দৃশ্যমান জানালা থেকে। সুদীপ্ত নিচে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে জঙ্গল এত ঘন যে সম্ভবত তার গভীরে দিনেরবেলাতেও সূর্যালোক ভালোভাবে প্রবেশ করে না। মাইলের পর মাইলব্যাপী শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। এরপর সেই জঙ্গলের ভিতর একটা ফাঁকা জায়গা যেন চোখে পড়ল। সুদীপ্তদের ছোট্ট প্লেনটা আরও নিচে নেমে এসে পাক খেতে শুরু করল সেই ফাঁকা জমির মাথায়।

ফিলিপ বললেন, ‘এটা আমাদের কোম্পানির নিজস্ব রানওয়ে। আমরা পৌঁছে গেছি।’

তার কথা শেষ হবার মিনিটখানের মধ্যেই ধীরে ধীরে সেই জঙ্গল ঘেরা রানওয়ের মাটি ছুঁল সুদীপ্তদের এরোপ্লেন।