মালয় বনের আতঙ্ক – ৫

ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সুদীপ্তরা। সদ্য সূর্যোদয় হয়েছে। হেরম্যান বললেন, ‘ফিলিপের বাইরে বেরোতে সম্ভবত আরও কিছুটা সময় লাগবে। চল, একবার বাড়ির চৌহদ্দিটা ঘুরে দেখি।’

বাড়িটাকে বেড় দিয়ে প্রথমে গোডাউনটার সামনে পৌঁছল তারা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদিন সেটা খোলা হয়নি। তালাটায় মরচে পড়ে গেছে। তার চারপাশে আগাছার জঙ্গল। আর তার থেকে বুনো লতাগুল্ম দেওয়ালের গা বেয়ে উঠে গেছে অন্তত কুড়ি ফুট উঁচু ছাদের দিকে। সে জায়গাটা দেখে নিয়ে তারা আবার বাড়িটার সামনের অংশের দিকে চলে এল। যে অংশের একপাশে সুদীপ্তদের ঘরের জানলার কিছুটা তফাতে ডাঁই করে রাখা আছে ল্যাটেক্স রাখার বড় বড় টিনের ড্রাম, পিপে ইত্যাদি নানা জিনিসপত্র। সুদীপ্তরা প্রথমে গিয়ে উপস্থিত হল তাদের ঘরের জানলার বাইরে। না, সেখানে তারা তেমন কিছু সন্দেহজনক জিনিস দেখতে পেল না যাতে মনে হয় সেখানে কেউ উপস্থিত হয়েছিল। হঠাৎ সুদীপ্তর খেয়াল হল, আবছা দেখা সেই দৃশ্যটা। একটা ড্রাম যেন হঠাৎ নড়ে উঠতে দেখেছিল সে। হেরম্যানকে নিয়ে ড্রামগুলোর কাছে গেল সে। বেশ বড় কোমর সমান উঁচু ড্রামগুলো। মুখগুলো খোলা। ভিতরে বর্তমানে কিছু নেই। গায়ের ভিতরে জমাট বাঁধা ল্যাটেক্সের আস্তরণ লেগে আছে। হঠাৎ একটা ড্রামের ভিতর তাকিয়ে ভ্রূ-কুঁচকোলেন হেরম্যান। তারপর হাত বাড়িয়ে সেই ড্রামটার ভিতর থেকে একটা জিনিস তুলে সুদীপ্তর সামনে মেলে ধরলেন। কালচে-লাল একগোছা লোম! হেরম্যান বললেন, ‘এটা এর ভিতর এল কীভাবে? তবে কি তুমি ঠিক দেখছিলে? সে এসে লুকিয়ে পড়েছিল এর ভিতরে? কিন্তু কে সে? মানুষ নাকি ওরাংওটাং?

সুদীপ্ত বলল, ‘আপনার কী মনে হচ্ছে?’

হেরম্যান বললেন, ‘এই লোমগুলোর ডি এন এ পরীক্ষা না করলে সাদা চোখে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে লোমশ মানুষ হোক বা ওরাংওটাং–কেউ একটা এই ড্রামের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল।’ কথাগুলো বলে হেরম্যান পকেট থেকে রুমাল বের করে তার ভাঁজের মধ্যে লোমগুলো সযত্নে রেখে সেটাকে আবার পকেটে পুরলেন। আর এরপরই একটু দূর থেকে গুরুমূর্তির গলা শোনা গেল—‘গুডমর্নিং।’

গুরুমূর্তি সুদীপ্তদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ভোরবেলাই একদম তৈরি হয়ে গেছেন দেখছি। তা এখানে কী করছেন?’ সুদীপ্ত বলতে যাচ্ছিল কথাটা, কিন্তু হেরম্যান তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, একটু আগেই উঠেছি। বেরোতে হবে তো। ফিলিপ এখনও ঘর ছাড়েননি, তাই ঘুরে ঘুরে বাড়ির চারপাশটা একটু দেখছি।’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘আমি কিন্তু ঠিক করে নিয়েছি যে আপনারা ফিরে আসার পর আমি শহরে ফিরে যাব। কাল সারারাত ভেবে দেখলাম এখানে থাকাটা আমার পক্ষে আর ঠিক হবে না। ঝগড়া-ঝামেলার মধ্যে আর আমি থাকতে চাই না। শেষে হয়তো প্রাণটাই যাবে।’

সুদীপ্ত বলল, ‘আপনি তবে ভয় পেয়ে পিছু হটবেন?’

গুরুমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটাই স্বাভাবিক। আপনারা তো চলে যাবেন। তারপর একদিকে আমি একা মানুষ আর অন্যদিকে রাবণ আর তার দলবল। গোঁয়ার্তুমি করে লাভ নেই।’

হেরম্যান বললেন, ‘এটা একেবারেই আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আমাদের কিছু বলার নেই। আমরা একবার বনের ভিতরটা খুঁজে দেখি যদি লোমশ মানুষের কোনো সন্ধান পাই?’

গুরুমূর্তি তার ঠোটের কোণে আবছা একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘দেখুন যদি পান। বেস্ট অব লাক।’

এরপর সামান্য কিছু কথা হল তার সঙ্গে হেরম্যান আর সুদীপ্তর। তারা গুরুমূর্তির কাছে জেনে নেবার চেষ্টা করল বনের মধ্যে কোনদিকে কী আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিলিপও বনে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলেন। গুরুমূর্তির থেকে একটা বন্দুক আর গাছ কেটে পথ করার জন্য সংগ্রহ করা হল একটা বড় ‘দা’, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বোলো’। তারপর সুদীপ্তরা এগোল বনের দিকে। বনে ঢোকার মুখে বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে ফিলিপ বললেন, ‘আমরা সেই লোমশ মানুষকে খুঁজতে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে না। যাচ্ছি যাতে ফিরে এসে ওই রাবণ আর তার লোকজনদের বলতে পারি যে আমরা খুঁজে দেখেছি যে অমন কোনো প্রাণী নেই। আসলে যারা তাকে দেখেছে সেটা তাদের চোখের ভুল। আসলে তা ওরাংওটাং।’

হেরম্যান বললেন, ‘দেখা যাক। আমি কিন্তু আশাবাদী।’

রবার বনে প্রবেশ করল সুদীপ্তরা। চারপাশে যতটা সম্ভব সতর্ক দৃষ্টি রেখে তারা এগিয়ে চলল। যদিও সকালের সূর্য পৃথিবীর বুকে আলো ছড়াতে শুরু করেছে তবুও রবার গাছগুলো যেখানে ঘন-সন্নিবিষ্টভাবে দাঁড়িয়ে সে-সব জায়গাতে বড় বড় পাতার আড়ালে আলো প্রবেশ করতে পারছে না এখনও। আজ গাড়িতে না এলেও প্রথমে চেনা গাড়ি-রাস্তার পথ ধরেই তারা এগোল। তারপর গতকালের সেই সঁড়িপথটাই ধরল। সুদীপ্তদের পথ চিনতে এখানে ও খুব একটা অসুবিধা হল না। গতকাল দু’বার এ পথে আসা-যাওয়া করছে তারা। তার চিহ্ন রয়ে গেছে। কোথাও পায়ের তলায় ঘাস মাড়ানোর চিহ্ন, কোথাও বা পাতা ভাঙা। বেশ কয়েকবার নানা অভিযানে যেতে হয়েছে সুদীপ্তদের। চিহ্ন অনুসরণ করে বনে চলার কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে তাদের। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই আগের দিনের চিহ্ন অনুসরণ করে তারা চলতে লাগল। এক সময় একটা বড় গাছ দেখিয়ে হেরম্যান বললেন, ‘গতকাল ওই গাছ পর্যন্ত আমাদের অনুসরণ করে এসেছিল ওরাংওটাং-এর সেই দলটা।’ তবে সে-গাছে বা সে-পথে একটা ওরাংওটাংকেও দেখতে পেল না সুদীপ্তরা। হয়তো দলটা আবার বনের আরও গভীরে চলে গেছে।

বেলা দশটা নাগাদ তারা পৌঁছল গতকাল তারা যে পর্যন্ত এসেছিল ঠিক সে জায়গাতে। যেখানে ওরাংওটাংগুলোর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। প্রাণীগুলো সেখানেও নেই। সামনে একদম অচেনা পথ। পথ মানে দা-দিয়ে গাছ কেটে পথ করে নিতে হবে। সে কাজে তারা নেমে পড়ল। ঝোপঝাড়, ডাল কেটে এগিয়ে চলল সামনে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে লাগল চারপাশে। যদি কোথাও তার সন্ধান মেলে অথবা কোথাও কোনো চিহ্ন মেলে তার উপস্থিতির সে জন্য। ক্রমশ ঘন আরও ঘন হয়ে চলেছে জঙ্গল। আর এদিকটাতে রবার গাছগুলোর মাঝে অন্যান্য বড় বড় গাছের সংখ্যাও বেশি। পাতার চাঁদোয়ার আড়ালে তারা ঢেকে রেখেছে মাথার ওপরের সূর্যকে। যেখানে রবার গাছের গুঁড়ির নিচে একদমই আলো প্রবেশ করছে না সে-সব জায়গাতে মাঝে মাঝে টর্চের আলো ফেলছিল সুদীপ্তরা। তেমনই এক জায়গায় আলো ফেলে হঠাৎ তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। পথের পাশে বড় বড় পাতা ঢাকা রবার গাছের গুঁড়ির অন্ধকারে সুদীপ্তর টর্চের আলোতে জ্বলজ্বল করছে একজোড়া সবুজ চোখ।

সুদীপ্তরা অনুমান করল সেটা লেপার্ড ধরনের কোনো প্রাণী হবে। প্রাণীটা ছুটে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করতে পারে এই আশঙ্কায় কাঁধ থেকে রাইফেল খুলে হাতে নিলেন ফিলিপ। কিন্তু প্রাণীটা সুদীপ্তদের আক্রমণ করল না। কিছুটা পিছু হটে হারিয়ে গেল রবার গাছের আড়ালে।

হেরম্যান মন্তব্য করলেন, ‘সাধারণত বন্য প্রাণীরা মানুষকে এড়িয়ে চলে। মানুষের দিক থেকে আঘাতের সম্ভাবনা না থাকলে সাধারণত তারা মানুষকে চট করে আক্রমণ করে না। এমনকী মানুষের রক্তের স্বাদ পাওয়া শ্বাপদরাও পেট ভরা থাকলে মানুষ মারে না।’ ফিলিপ হেসে বললেন, ‘তবে কার পেট ভরা আছে আর কার খালি আছে তা তো আমাদের জানা নেই। কাজেই আরও সাবধানে চলতে হবে আমাদের।’

হেরম্যান বললেন, ‘সেই ওরাংওটাং-এর দল যদি এখন আমাদের সাথে সাথে চলত, সুবিধা হত। বানর শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং—এ-ধরনের প্রাণীরা আশেপাশে কোথাও শ্বাপদের উপস্থিতি বুঝতে পারলেই ওমনি গাছের মাথায় উঠে বসে চিল-চিৎকার করতে থাকে দলের অন্য সবাইকে সতর্ক করে দেবার জন্য। এই কারণে অনেক সময় জঙ্গলে শিকার বা জরিপের কাজে যাঁরা ঘুরে বেড়ান, অথবা অভিযাত্রীরা বানর ধরনের প্রাণীকে খাবার দেন। আর সেই প্রাণীরাও খাবারের লোভে যাত্রাপথে তাদেরকে অনুসরণ করতে থাকে গাছের মাথা দিয়ে আর হিংস্র কোনো প্রাণী দেখলেই চিৎকার করে সতর্ক করে দেয় মানুষকে।

ফিলিপ বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি ব্যাপারটা বেশ চার্মিং লাগছে আমার কাছে। বনপথে চলার রোমাঞ্চ তো পাওয়া যায় না। আমি বেশ উপভোগ করছি এই পথ চলা। কিন্তু আপনাদের কতদূর পর্যন্ত যাবার ইচ্ছে?’

হেরম্যান বললেন, ‘যতদূর যাওয়া যেতে পারে। তিনদিন, পাঁচদিন, সাতদিন পথ চলতেও আমাদের অসুবিধা বা আপত্তি নেই। কখনও জাভার জঙ্গলে উড়ুক্কু দানব ‘আহুল’-এর সন্ধানে, কখনও বা মাদাগাস্কারের জঙ্গলে ‘রাক্ষুসে গাছের’ খোঁজে, কখনও আবার আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অরণ্য-প্রদেশ বুরুণ্ডিতে সবুজ মানুষের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে দিনের পর দিন জঙ্গলে চলেছি আমরা। আর সে-সব পথে চলতে গিয়ে কত অভিজ্ঞতা যে হয়েছে, কতবার যে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছি তার হিসেব নেই। অসভ্য বনাচারী হিংস্র মানুষ, কখনও বা সিংহ বা অন্য কোনো প্রাণী আক্রমণ করেছে আমাদের…।’

হেরম্যানের কথা শুনে ফিলিপ এবার মৃদু আঁতকে উঠে বললেন, ‘আমার কিন্তু দিনের পর দিন পথ চলার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনোটাই নেই। লোকজন জানে যে আমরা লোমশ মানুষের সন্ধানে বেরিয়েছি ঠিকই কিন্তু এই মালয়ের জঙ্গলে লোমশ মানুষদের অস্তিত্বের ব্যাপারে আমার বিশ্বাস নেই। আমি কিন্তু আজকের রাতটা জঙ্গলে কাটিয়ে কাল ফেরার পথ ধরব।’

সুদীপ্ত গাছের ডাল কাটতে কাটতে এগোতে এগোতে বলল, ‘কিন্তু একশো বছর ধরে মালয়ের লোমশ মানুষের কথা বিভিন্ন সময় শোনা গেছে।’

ফিলিপ বললেন, ‘ও-সব অশিক্ষিত মানুষদের গালগল্প বলেই আমার ধারণা।’

ফিলিপের এ-কথাটা আহত করল হেরম্যানকে। তিনি বললেন, ‘একটা সময় ছিল যখন ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো ড্রাগন সিলিকাস্থ মাছ বা জায়েন্ট স্কুইডের কথা অশিক্ষিত লোকদের গল্প বলে ভাবতেন সভ্য পণ্ডিতকুল। কিন্তু পরবর্তীকালে ও-সবেরই কিন্তু অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে।’

যুক্তিতে হেরে গিয়ে ফিলিপ এরপর বললেন, ‘সে আপনারা মাসের পর মাস জঙ্গলে ঘুরে লোমশ মানুষ খুঁজুন আমার আপত্তি নেই কিন্তু আমি কাল ভোরে ফেরার পথ ধরব। এতটা পথ পর্যন্ত ট্যাপ করতে শ্রমিকরা আসে না। বনের শেষ মাথায় যদি সেই লোমশ মানুষ লুকিয়ে থাকে তো থাক। আমি ফিরে গিয়ে শ্রমিকদের বলব তাদের কাজের এলাকায় কোনো লোমশ মানুষের অস্তিত্ব নেই। আর রাবণও নিশ্চয়ই সেই লোমশ মানুষের দেখা পাবে না। সে এরপর আমার কথা মানলে ভালো, নইলে কুয়ালালামপুর ফিরে গিয়ে সরকারি দপ্তরে কথা বলে পুলিশ নিয়ে এসে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাব লোকটাকে। কাজ বন্ধ বলে সরকারেরও রাজস্বর ক্ষতি হচ্ছে। লোকটাকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ নানা কথা বলতে বলতে চারপাশ দেখতে দেখতে তিনজনে মিলে পালাক্রমে ডাল কেটে পথ করে নিয়ে এগোতে থাকল। মাথার ওপর পাতার আড়ালে সূর্যদেবও চলতে লাগলেন তাদের সাথে।