৮. প্রত্যাঘাত
শান স্টেট, মিয়ানমার, ১ জুন, ২০১৫
জঙ্গলটা কিছু কিছু জায়গায় এতটাই গভীর যে গাছের ডালপালা কেটে এগোতে হচ্ছিল লোকগুলোকে।
পাঁচটা লোক। সামনে দু’জন, পিছনে দু’জন। মাঝে এক জন।
মাঝের লোকটাকে দেখলেই বোঝা যায়, সে স্থানীয় নয়। এমনকি, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড বা চিনেরও নয়। লোকটা ভারতীয়, পাকিস্তানি বা বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ হবে। লোকটা রীতিমতো হাঁপাচ্ছিল এতটা পথ আসতে। তার উপরে একটা ব্যাগ ঝোলানো কাঁধে। দেখে মনে হচ্ছিল, বেশ ভারি ব্যাগ। কয়েক বার সে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বাকি চারজন প্রায় তাড়িয়েই নিয়ে এসেছে লোকটাকে। আর পাশাপাশি চলেছে নিজেদের ভাষায় ঠাট্টা বিদ্রূপ। ভাষাটা লোকটা বুঝতে না পারলেও তাকে নিয়েই যে এরা বিদ্রূপ করছে, সেটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল না।
জঙ্গল সাফ করতে করতে লোকগুলো এসে পৌঁছল একটা পাহাড়ঘেরা নদীর পাশে। সালইউন নদী। দু’হাজার মাইলের বেশি দীর্ঘ এই নদী তিব্বতি উপত্যকা থেকে নেমে গিয়ে পড়েছে আন্দামান সাগরে। যুক্ত করেছে দক্ষিণ চিন এবং পূর্ব মিয়ানমারকে। এই নদীর একটা অংশ আবার কাজ করছে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সীমান্ত হিসেবেও। এক এক দেশে এক এক নাম এই নদীর।
প্রকৃতি যেন ঢেলে সাজিয়েছে জায়গাটাকে। এক পাশে নীল পাহাড়ের সারি, অন্য পাশে গভীর সবুজ জঙ্গল। বয়ে যাওয়া নদীর কালো জলে সোনা রোদের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ছে। কাঠখোট্টা লোকের মনেও আবেগের সঞ্চার করতে পারে এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য।
কিন্তু পাঁচটি লোকের মনে এই সৌন্দর্য একটুও রেখাপাত করল বলে মনে হয় না। গ্রুপটা এগিয়ে চলল সামনের দিকে। একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে গোটা কয়েক কুঁড়ে ঘর। লোকগুলোর গন্তব্যস্থল।
জায়গাটা পড়ছে মিয়ানমারের শান স্টেটের মধ্যে। এই অঞ্চলটার উত্তরে রয়েছে চিন, পূর্বে লাওস, দক্ষিণে থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই, চিয়াং মাই। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের খুব কাছে। যে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল কুখ্যাত হয়ে আছে ড্রাগ প্রোডাকশনের জন্য।
আফগানিস্তানের পরেই সবচেয়ে বেশি আফিম এবং কোকেন তৈরি হয় যে দেশটায়, যার নাম মিয়ানমার। ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৬০ হাজার হেক্টর জায়গা জুড়ে আফিম চাষ হয়েছে মিয়ানমারে। তৈরি হয়েছে ৬০০ টনের বেশি আফিম। আর এই আফিম উৎপাদনের আশি শতাংশই হয় এই শান স্টেট থেকে।
পাঁচটা লোক এসে দাঁড়াল একটা বিশেষ ঘরের সামনে। তার পরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা লোক বিজাতীয় ভাষায় কিছু বলে উঠল।
বিদেশি লোকটার পক্ষে কিছু বোঝা সম্ভব ছিল না। লোকটা কথা বলছিল শান ভাষায়। বিদেশি লোকটা অবশ্য শোনার চেষ্টাও করেনি। সে রীতিমতো হাঁপাচ্ছিল। শক্তপোক্ত চেহারা হলে কী হবে, লোকটার যে জঙ্গলে ঘোরার বিশেষ অভ্যাস নেই, তা তাকে দেখেই বোঝা যায়। ব্যাগটা নামিয়ে রেখে মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে ভাল করে মুখ মুছে নিল সে।
ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা লোকটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল বিদেশিকে। তার পরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে একটু ঠাট্টার সুরে বলল, ‘এইটুকু রাস্তা আসতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। তুমি কারবার সামলাবে কী করে?’
লোকটা আর এক বার কপালটা মুছে নিয়ে বলল, ‘আমাকে এখানে পাঠানোর একটাই কারণ। ভাইজান আমাকে বিশ্বাস করে। জানে, কাজটা ঠিকমতো করতে পারব।’
নেতা লোকটা কোনও কথা না বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। পিছনে বাকিরা।
আলি নামের এই লোকটা যে তাদের সঙ্গে কারবার করতে আসছে, তার খবর খুব ভাল সোর্স মারফত আগেই এই ডেরায় এসে পৌঁছেছিল। না হলে আলিকে এই জায়গায় পৌঁছতে হত না। তার কাছে খবর চলে এসেছে, পাকিস্তানে আস্তানা গেড়ে থাকা ইন্ডিয়ান মাফিয়া ডনের প্রতিনিধি হয়ে লোকটা এসেছে এখানে। তার মানে আইএসআইয়েরও হাত আছে।
চেয়ার টেনে বসে লোকটা তাকাল আলির দিকে, ‘কিন্তু তোমার ভাইজান হঠাৎ আমাদের এখান থেকে মাল নিতে চাইছে কেন? ওর তো নিজেরই এলাকা আছে। আফগানিস্তান আছে।’
আলি এক বার ঘরের চারদিকটা দেখে নিল। যদি বসার কোনও জায়গা থাকে। একটা চেয়ারও নেই দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পরে কাঁধের ব্যাগটা নীচে নামিয়ে চোখে বলল, ‘ভাইয়ের মাল বেশিটাই চলে যায় বলকান রুট ধরে ইউরোপে। ভারতে খুব বেশি আসে না। আমরা চাই এই মালটা যেন ভারতে ঢোকে। বলতে পারো, এই মালটা আমাদের তরফে মিয়ানমারের ভারত বিরোধী সংগঠনকে উপহার।’
ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত জুড়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে তখন প্রায় রাজত্ব করছে নাগা জঙ্গি সংগঠন এনএসসিএন। পাশাপাশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে উলফাও।
লোকটির এই সব কথা ভালই জানা আছে। সে সরাসরি ওই সব জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। তার ড্রাগ কার্টেল কাজ করে আফিম আর কোকেন পাচারের ব্যবসাটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এই অঞ্চলটা পুরোপুরি তাদের দখলে। দেশের সেনাবাহিনীও ঢুকতে পারে না এখানে।
‘মাল হয়ে যাবে,’ লোকটা একটা চুরুট ধরিয়ে বলল, ‘পেমেন্টটা কী ভাবে করবে?’
আলি কোনও জবাব না দিয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিল লোকটার দিকে। ধীরে সুস্থে চেনটা খুলে লোকটা বার করে আনল তিনটে বড় সোনার বার।
‘খাঁটি সোনা। পরীক্ষা করে নিতে পার। পেমেন্ট হবে সোনাতে।’
লোকটার কাছে এই খবরটাও আগে এসে গিয়েছিল। সে সোনার বার তিনটে ব্যাগে ভরে তাকাল আলির দিকে।
‘ডেলিভারি কোথায় নেবে? থাইল্যান্ডে? ‘
‘না। মাল তোমাকে পৌঁছে দিতে হবে এনএসসিএন-এর ঘাঁটিতে। ওরা সেগুলো পাচার করবে ভারতে। সেটাই আমাদের টার্গেট। যত বেশি সম্ভব ড্রাগ ভারতে ঢোকানো আর এ জন্য আমরা মিয়ানমার বর্ডারটা কাজে লাগাতে চাই। ওর চেয়ে ভাল জায়গা আর হয় না।’
লোকটা সেটা জানত। ভারতে ড্রাগ পাচার করার জন্য ওই রুটটাই সেরা। হাজার মাইলের উপরে জঙ্গলে ঘেরা এই সীমান্ত রেখা চিন থেকে শুরু হয়ে চলে গিয়েছে বাংলাদেশে। ভারতীয় সীমান্তের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা হল মণিপুর, নাগাল্যান্ড অঞ্চল। ওই জায়গা থেকেই অস্ত্র, ড্রাগ, জঙ্গি ঢুকে আসে ভারতে। জঙ্গুলে সীমান্তে আর কত পাহারা দেবে ভারতীয় সেনাবাহিনী!
লোকটা আবার ভাবল। তার পরে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এখান থেকে দূরত্বটা অনেক। অত দূরে মাল পৌঁছে দেওয়ার ঝক্কি আছে।’
জবাবটা দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল আলি। ‘সোনার তিনটে বার তোমার ঝামেলার দাম হিসেবে রেখে দাও। মালের দামটা আলাদা করে দেওয়া হবে ওদের ক্যাম্পে। পেমেন্ট নিয়ে আমি পৌঁছে যাব ওখানে। তুমি এখান থেকে মাল পাঠানোর ব্যবস্থা করো।’
‘কবে চাও ডেলিভারি?’
আলি একটু ভাবল। তার পরে চশমাটা এক বার ঠিক করে নিয়ে বলল, ‘তোমাকে জানিয়ে দেব। সোনার বারগুলো পেতে কয়েকটা দিন সময় লাগবে।’
‘ঠিক আছে, জানিয়ে দিয়ো।’ বলে উঠে দাঁড়াল লোকটা।
আলি বুঝল, মিটিং শেষ। তাকে আবার অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফিরতে হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাইড চারজনের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ডি গ্যাংয়ের সদস্য আলি!
.
৪ জুন। বিকেল চারটে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। সাউথ ব্লক।
ঘরে যে ক’জন বসে, প্রত্যেকের মুখ প্রচণ্ড গম্ভীর। আর গম্ভীর হবে নাই বা কেন। খবরটা যে কাউকে নড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কার্গিলের পরে এই রকম হামলা আর হয়নি ভারতীয় সেনার উপরে।
মণিপুরের চ্যান্ডল জেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কনভয়ের উপরে হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। ১৮ জন সেনা মারা গিয়েছে ওই চোরাগোপ্তা আক্রমণে। আহত হয়েছে ১৫ জনেরও বেশি। এই ঘটনার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব ওয়েস্টার্ন সাউথ ইস্ট এশিয়া।
‘এই আক্রমণের জবাব আমাদের দিতেই হবে,’ কঠোর স্বরে বলে উঠলেন মন্ত্রী, ‘এই রকম বর্বরোচিত আক্রমণ মেনে নেওয়া যায় না।’
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পরে আইবি চিফ মন্তব্য করলেন, ‘সীমান্ত পার হয়ে জঙ্গিরা চলে গিয়েছে মিয়ানমারের ঘাঁটিতে।’ এই ব্যাপারটাও ঘরে উপস্থিত সবার জানা ছিল। ভারতের বুকে অপারেশন করে মণিপুর-নাগাল্যান্ড সীমান্ত পার হয়ে জঙ্গিরা ঢুকে যায় মিয়ানমারে। ওখানে গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে জঙ্গি শিবির। যেখানে ভারতীয় বাহিনীর পক্ষেও আক্রমণ চালানো কঠিন। অপারেশনে নামতে গেলে অন্য দেশে যেতে হবে! আন্তর্জাতিক নিয়মের বেড়াজালে যে অপারেশন আটকে যায়। যার সুযোগটা এই সব জঙ্গিগোষ্ঠী নেয়।
‘ওদের ঘরে ঢুকেই এবার মারতে হবে ওদের,’ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন মন্ত্রী।
সবার চোখ গিয়ে পড়ল বৈঠকে হাজির থাকা আর্মি জেনারেলের উপরে। তিনি তৈরিই ছিলেন। জবাব দিলেন, ‘আমার কয়েকটা দিন সময় লাগবে স্ট্রাইক ফোর্স তৈরি করতে। তবে…।’
সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন জেনারেলের দিকে। ‘অন স্পট কিছু ইন্টেল পেলে ভাল হত। আমাদের কোনও এজেন্ট যদি কিছু খবর দিতে পারে, তা হলে অপারেশন আরও ফুলপ্রুফ হবে।’
সবার দৃষ্টি এবার ঘুরে গেল নতুন এক জনের দিকে। র-এর চিফ। নিশান্ত অরোরা একবার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘উই আর ইন লাক। আমাদের ভাগ্য ভাল। একটা অপারেশনের জন্য আমাদের এক এজেন্ট এখন মিয়ানমারেই আছে। আশা করছি, দ্রুত আপনাদের কিছু ইন্টেল দিতে পারব।’
.
চার দিন পরে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট জেনারেলের কাছে পৌঁছে গেল র চিফের মেসেজটা মণিপুর-নাগাল্যান্ড সীমান্তে, মিয়ানমারের ভিতরে দু’টো জঙ্গি ক্যাম্পের লোকেশন। মণিপুরের উখরুলের কাছে। সঙ্গে একটা ফুটনোট:
‘আমাদের এজেন্ট থাকবে একটা ক্যাম্পে। জিপিএস ট্র্যাকার অন থাকবে। নিখুঁত লোকেশন পেতে সমস্যা হবে না। ‘
তবে জেনারেল জানতেন, তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ফাঁকের চামড়ার ভিতরে ঢোকানো ওই মাইক্রোচিপ ট্র্যাকারের শক্তি খুব বেশি হয় না। ক্যাম্পের খুব কাছে না এলে সিগনাল পাওয়া যাবে না। তার আগে পর্যন্ত লঙ্গিটিউড-ল্যাটিটিউডের হিসেব করে এগোতে হবে স্ট্রাইক টিমকে।
মেসেজটা পাওয়ার পরে আর দেরি করলেন না জেনারেল। শুরু হয়ে গেল অপারেশন ‘হট পারসুট’-এর পরিকল্পনা।
যে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৭২ জন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোকে হেলিকপ্টার করে নামিয়ে দেওয়া হবে সীমান্তের কাছে। কমান্ডোদের পরনে থাকবে টুয়েলথ বিহার ব্যাটেলিয়নের ইউনিফর্ম। সীমান্তের ওই অঞ্চলটা পাহারা দেয় বিহার ব্যাটেলিয়ন। ফলে কেউ দেখলেও সন্দেহ করবে না। তার পরে বিকেলের দিকে, পড়ন্ত আলোয় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে কমান্ডোরা পৌঁছে যাবে র এজেন্টের দেওয়া লোকেশনে।
অপারেশনের তারিখ ঠিক হল: ৯ জুন।
র চিফের কাছে পুরো পরিকল্পনাটা খোলাখুলি জানিয়ে জেনারেল একটা কথাই শুধু বললেন, ‘আশা করছি, আপনার এজেন্ট ঠিক লোকেশনটাই দিয়েছে। না হলে আমরা সমস্যায় পড়ে যাব।’
‘আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। আমাদের সেরা এজেন্টই ওখানে আছে।’
আর একটা কথা ভাবছিলেন জেনারেল। একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললেন, ‘আপনার এজেন্ট ক্যাম্পে থাকবে। জিপিএস ট্র্যাকার অন থাকবে। যদি জঙ্গিদের হাতে ধরা পড়ে যায়, তা হলে তো কেলেঙ্কারি হবে। জঙ্গিরা তৈরি থাকবে স্ট্রাইক টিমের জন্য।
এবারও হাসলেন চিফ, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। ওর কিছু হবে না। আর ধরা পড়লেও ওর মুখ থেকে কেউ একটা কথাও বার করতে পারবে না।’ তারপরে জেনারেলকে আশ্বস্ত করতে বললেন, ‘প্ল্যানটা যে ভাবে করা হয়েছে, তাতে অপারেশনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওই ক্যাম্পে পৌঁছবে আমাদের এজেন্ট। খবর পেয়েছি, মাইক্রোচিপ খুঁজে পাওয়ার মতো কোনও অত্যাধুনিক স্ক্যানার জঙ্গিদের হাতে নেই।’ একটু থেমে জেনারেলের মনের ভাবটা যাচাই করে নিলেন অরোরা। তার পরে বললেন, ‘ওই সময়টুকু ও সামলে দিতে পারবে। জঙ্গিদের হাতে ধরা পড়লেও কিছু এসে যাবে না। জঙ্গিরা তৈরি হওয়ার আগেই আপনার স্ট্রাইক টিম ক্যাম্পে পৌঁছে যাবে।’
জেনারেল হাতটা বাড়িয়ে দিলেন অরোরার দিকে, ‘লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট।’
.
৯ জুন। সকাল দশটা। মিয়ানমার।
রাস্তা অনেকটা শান স্টেটে যাওয়ার মতোই। কিছুটা রাস্তা গাড়িতে যাওয়ার পরে শুরু হয়ে গেল গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে ট্রেকিং।
ঘণ্টা দু’য়েক চলার পরে যখন জঙ্গিদের শিবিরে এসে পৌঁছল আলি, তখন তার দম পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়েছে। পৌঁছনোর পরে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্যাম্পের সামনে একটা খোলা জায়গাতে বসেই পড়ল সে। তার পরে কোনওমতে ইশারায় বোঝাল, এক গ্লাস জল!
তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে বিতৃষ্ণার চোখে বসে থাকা আলির দিকে একবার তাকিয়ে জঙ্গি নেতা তার সহকারীর দিকে ফিরে বলল, ‘এটা কাকে পাঠিয়েছে ওরা? আর কাউকে পেল না! এই লোকটা না এখানেই মরে যায়।’
জবাবে সঙ্গী ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল, ‘ওকে নাকি মাফিয়া ডন খুব বিশ্বাস করে। তাই এই কাজের জন্য পাঠিয়েছে।’
আলি ততক্ষণে চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে ভাল করে মুছে নিল সেটা। তারপরে চোখে লাগিয়ে তাকাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জঙ্গি নেতার দিকে।
লোকটা আরও এক বার অবজ্ঞার চোখে আলির দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘আবার কিন্তু এই জঙ্গল ট্রেক করে ফিরতে হবে। টিকতে পারবে তো?’
দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে গেল আলির মুখ। কয়েক মুহূর্ত ভেবে সে বলল, ‘দেখা যাক, ভাগ্যে কী আছে।’ তার পরে কী মনে পড়তেই বলল, ‘মাল কী এসে গিয়েছে?’
‘এসে যাবে জলদি। ওই নিয়ে চিন্তা কোরো না। পেমেন্টের কী হবে?’
‘আমাকে বলা আছে, মাল চেক করে নেওয়ার পরে খবর পাঠাতে। গাড়ি তৈরি আছে। আমার কাছ থেকে গ্রিন সিগনাল পেলেই সোনা পৌঁছে যাবে তোমাদের দেওয়া লোকেশনে।’
সীমান্তের এই ঘন জঙ্গুলে এলাকায় মোবাইল সিগনাল আসার কোনও সম্ভাবনাই নেই। আলিকে যা বার্তা আদানপ্রদান করতে হবে, তা করতে হবে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে। আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে স্যাটেলাইট ফোনও চলে এসেছে জঙ্গিদের হাতে। এক দিকে চিন, অন্য দিকে পাকিস্তানের মদতে।
এত তাড়াতাড়ি এই ক্যাম্পটায় এই ভাবে আসার কথা ছিল না আলির। তার পরিকল্পনাটা ছিল অন্য। কিন্তু দিন কয়েক আগে সেই পরিকল্পনা বদলাতে হয়।
কপালের ঘাম মুছে কোনওমতে শরীরটা টেনে তুলল আলি। এখন অপেক্ষার পালা। যে তাঁবুটার মধ্যে আলি বসে ছিল, তার বাইরে দু’টো লোক পাহারায়।
তাঁবুর ভিতরে খাটের সামনে রাখা টেবিল থেকে জলের বোতলটা তুলে ঢকঢক করে মুখে ঢেলে দিল আলি। তখনই ঘরে এসে ঢুকল জঙ্গি লিডার।
‘আরও কিছু সময় এখানে অপেক্ষা করতে হবে তোমাকে। মাল পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে।’
আলি একটু চিন্তায় পড়ে গেল। ‘তা হলে তো মুস্কিল হয়ে যাবে।’
‘কেন, আমাদের পছন্দ হচ্ছে না?’
‘সেটা নয়, আসলে নতুন জায়গায় আমার ঠিক ঘুম হয় না!’
আলির কথা শুনে প্রথমে একটু হতভম্ব হয়ে গেল জঙ্গি নেতা। তার পরে অট্টহাস্য করে বলে উঠল, ‘বেশি ঘুমনো ভাল নয়। এই লাইনে সতর্ক না থাকলে কে কখন প্রাণটা নিয়ে চলে যাবে, টেরও পাবে না। ‘
চশমাটা খুলে নিয়ে আরও একবার মুছে নিল আলি। তার মুখে আষাঢ়ের মেঘ। সেই মুখের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টি হেনে বেরিয়ে গেল জঙ্গি নেতা।
আলি ঘড়িটা দেখে নিল। চারটে বেজে গিয়েছে। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিকটা। আকাশে মেঘও জমেছে।
নিজের মনেই একবার হাসল আলি। তার পরে চশমাটা খুলে রাখল টেবিলে। সময় হয়ে এসেছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু চাপ দিয়ে চশমার মোটা ডাঁটিটা ভেঙে ফেলল আলি। পাওয়ার না থাকলে কী হবে, এই চশমাটা বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল তার। ডাঁটিটা ফাঁপা। সেই ফাঁপা ডাঁটিটার মধ্যে থেকে একটা সরু কিন্তু বেশ শক্ত তামার তার বার করে আনল আলি নামের লোকটা। একবার তারের ডগাটা পরীক্ষা করে নিল সে। নাহ, যথেষ্ট মজবুত আর ধারালো। তার হাতে এই তারটাই হয়ে উঠবে ভয়ঙ্কর এক মারণাস্ত্র। তারটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বিছানায় বসে রইল আলি। সে একটা শব্দের প্রতীক্ষা করছে।
শব্দটা এল মিনিট পাঁচেক পরে। একটা শব্দ নয়, শব্দমালা। অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে টানা গুলি চালানোর আওয়াজ। আর তার সঙ্গে আর্তনাদ।
ধীর পায়ে তাঁবুর বাইরে চলে এলো আলি। ক্যাম্পটা ততক্ষণে প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। তিন দিক থেকে মুষলধারে বৃষ্টির মতো গুলি ছুটে আসছে। এক মুহূর্ত পরিস্থিতিটা জরিপ করে নিল আলি।
যে যে দিকে পারছে, ছুটছে। তার মধ্যে লিডার লোকটা পাল্টা গুলি চালাতে চালাতে নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে সঙ্গীদের।
ধীর পায়ে নিজেকে বাঁচিয়ে আলি এগিয়ে চলল লিডারের দিকে। লোকটার তখন কিছু খেয়াল করার অবস্থা নেই। হঠাৎ করে গলার কাছে তীব্র যন্ত্রণাটা হওয়ার আগে সে টেরই পায়নি আলির উপস্থিতি।
পেল যখন, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আলির হাতের শক্ত তারটা এঁফোড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে লোকটার গলা। শেষ মুহূর্তে আততায়ীর মুখটা দেখার পরে মরণযন্ত্রণার চেয়েও বিস্ময়টা বেশি ধাক্কা দিল জঙ্গি লিডারকে। লোকটা তখন তার কানের সামনে মুখ নিয়ে এসে বলছে, ‘ভারতের তরফ থেকে তোমাদের উপহার।’
সেকেন্ড পনেরো পরে লিডারের শরীরটা মাটিতে শুইয়ে দিয়ে, গুলির আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গেল আলি।
সব মিলিয়ে ৪০ মিনিট মতো সময় লাগল অপারেশন শেষ হতে। সামনের ঘাসজমিটা রক্তে ভিজে গিয়েছে। স্ট্রাইক টিমের কমান্ডার কয়েক মিনিট পুরো পরিস্থিতিটা মেপে নিয়ে তার দলকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিল। এই অপারেশন কাউকে ধরার জন্য ছিল না। এই অপারেশনের লক্ষ্যই ছিল স্ট্রাইক টু কিল।
লিডারের নির্দেশে দ্রুত জঙ্গলের মধ্যে মিশে যেতে থাকল কমান্ডোরা। সবার শেষে ক্যাম্প ছেড়ে জঙ্গলের দিকে পা বাড়াল কমান্ডার। জঙ্গলের মধ্যে কয়েক পা এগোতেই কে যেন পিছন থেকে ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘অপারেশন তা হলে সফল?’
কেউটে সাপের গতিতে ঘুরে দাঁড়াল কমান্ডার। কয়েক সেকেন্ড বাদে ধীরে ধীরে রাইফেলের নলটা নামিয়ে নিল সে। তারপরে চাপা হেসে বলল, ‘কেন যে এই রকম করিস। গুলি চলে গেলে কী হত!’
আলি নামের লোকটাও হেসে ফেলে বলল, ‘তোকে তো আজ থেকে চিনি না। এই বিশ্বাসটা আছে যে, টার্গেট না দেখে তুই ট্রিগারে চাপ দিবি না।’
ততক্ষণে আরও কয়েক জন কমান্ডো ঘিরে ফেলেছে দু’জনকে। তাদের মধ্যে সিনিয়র একজন বলে উঠল, ‘এনি প্রবলেম, কমান্ডার মাথুর?’
‘নো প্রবলেন অ্যাট অল। এই লোকটা আমার বন্ধু। ইন্টেলটা ওই দিয়েছে। ওর জিপিএস লোকেশনটা ট্র্যাক করেই আমরা এখানে পৌঁছেছি।’
স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোটি বুঝে গেল, কমান্ডারের বন্ধুটি আসলে কে। মাথাটা একবার ঝুঁকিয়ে সে বলে উঠল, ‘আপনার দেখা পেয়ে খুব ভাল লাগল। আপনার নামটা বোধ হয় জানা যাবে না, তাই না?’
আলি জবাব দেওয়ার আগেই কমান্ডার মাথুর বলে উঠল, ‘ওর নামটা না জানাই ভাল।’ তার পরে আর সময় নষ্ট না করে নির্দেশ দিল, ‘লেটস রোল, বয়েজ। আমাদের এখন ফিরে যেতে হবে।’
অপারেশন ‘হট পারসুট’ শেষ করে মিয়ানমারের জঙ্গলে মিশে গেল ভারতীয় স্ট্রাইক টিমের কমান্ডোরা। আর সঙ্গে একজন ‘র’ এজেন্ট।
যার কোড নেম: ভৈরব!
যাকে তার খুব ঘনিষ্ঠরা সম্ভ্রমের সঙ্গে নাম দিয়েছে— কালভৈরব!
