১০. পেশেন্ট জিরো
হুবেই জিনহুয়া হসপিটাল। হুবেই প্রভিন্স, সেন্ট্রাল চিন। নভেম্বর ২০১৯- জানুয়ারি ২০২০
১৭ নভেম্বর, ২০১৯।
ভদ্রলোকের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না হাসপাতালে আসার। কিন্তু বাধ্য হয়েছেন স্ত্রীর জোরাজুরিতে। জ্বর হয়েছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে সঙ্গে। আর দু’একটা অদ্ভুত উপসর্গ। স্বাদ পাচ্ছেন না, কোনও গন্ধও নাকে আসছে না। সেগুলো বড় কোনও সমস্যা নয়। তবে শ্বাসকষ্টটা একটু বেশিই হচ্ছিল ৫৫ বছর বয়সি এই ভদ্রলোকের। যে কারণে আর ঝুঁকি নেননি স্ত্রী। স্বামীকে প্রায় বগলদাবা করে চলে এসেছেন হাসপাতালে।
ডাক্তার পরীক্ষা-টরীক্ষা করে রায় দিলেন, ভাইরাল ইনফেকশন। চিন্তার কিছু নেই। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কয়েকটা ওষুধ লিখে পেশেন্টকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন ডাক্তার।
.
২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯।
ব্যাপারটা প্রথম নজরে পড়ে জিনহুয়া হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিনের ডিরেক্টর জাং জিশেনের। বেশ কয়েক জন রোগী শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। সবার লক্ষণই প্রায় একই রকম। শ্বাসকষ্টটা খুব বেশি মাত্রায় হচ্ছে। সঙ্গে আরও উপসর্গ। নিউমোনিয়া সন্দেহ হচ্ছে, কিন্তু ঠিক ধরা যাচ্ছে না। আরও একটা ব্যাপার দেখেছিলেন, ভদ্রমহিলা। রোগীদের প্রায় সবারই হুনান সিফুড মার্কেটের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। দেরি না করে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দিলেন। জানিয়ে দিলেন স্থানীয় প্রশাসনকেও। প্রত্যেক রুগির থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করা হল। আর তা চলে গেল ল্যাবরেটরিতে।
এক দিনের মধ্যে চলে এল রিপোর্ট। প্রত্যেক রুগির শরীরে একটি নতুন ভাইরাস পাওয়া গিয়েছে যার যোগসূত্র রয়েছে সারস (SARS)-এর সঙ্গে। ৩১ ডিসেম্বর রিপোর্ট গেল ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগাইজেশনের কাছে। নতুন ধরনের এক ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যা প্রচণ্ড সংক্রামক। এখনই সতর্ক হতে হবে।
হু-এর কাছে যাওয়ার আগেই অবশ্য সেই রিপোর্ট চলে এসেছিল পলিটব্যুরোর কাছে। খুব দ্রুত ব্লু প্রিন্টটা তৈরি করে ফেলা হয় ভাইরাস প্রতিরোধের। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছেন, এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হুনান সিফুড মার্কেট। এবং, এই রোগকে জুনোটিক ডিজিজ-এর আওতায় ফেলা যেতে পারে। অর্থাৎ, যেখানে জন্তু-জানোয়ারের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হয়। তবে আরও একটা আশঙ্কার কথা শুনিয়ে রেখেছিলেন চিকিৎসকরা। তাঁরা সন্দেহ করছেন, শুধু প্রাণী থেকে নয়, এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে।
সমস্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছিলেন চিনের প্রিমিয়ার। যেখানে ছিলেন চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি) এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন (সিএমসি)-এর উচ্চপদস্থ নেতারা। আর অবশ্যই এমএসএস-র শীর্ষকর্তা।
সবার উদ্দেশে একটা প্রশ্ন করেছিলেন প্রিমিয়ার– ‘এই ভাইরাস কি কোনও ল্যাবে তৈরি? এমন কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে যার ফলে এই ভাইরাস সৃষ্টি হয়েছে?’
প্রশ্নটা সবাইকে করা হলেও মূল লক্ষ্য যে এক জন, তা বুঝতে কারও সমস্যা হয়নি। সেই ব্যক্তি হলেন সরকারি ভাবে এমএসএস-এর দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী। মিনিস্টার অব স্টেট সিকিউরিটি। তিনি ঘরের মধ্যে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দ্রুত বলে উঠলেন, ‘এই রকম কোনও ভাইরাস নিয়ে আমাদের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন না। আর চিকিৎসকরা যা জানিয়েছেন, তাতে এই ভাইরাসটা ছড়িয়েছে হুনানের সিফুড মার্কেট থেকে। মানে জীব-জন্তুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে এসেছে।’
নিজের বক্তব্য পেশ করে একটু থামলেন মন্ত্রী। কিন্তু এত সাফাই দেওয়ার পরেও তাঁর নিজের মনেই একটা কাঁটা খচখচ করছে।
সব মিলিয়ে এমএসএস-এর ১২টা ব্যুরো। এক একটা ব্যুরোর কাজ এক এক রকমের। আছে নিজস্ব পুলিশ বাহিনী এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। যেখানে বন্দি করে রাখা হয় বিদেশি গুপ্তচরদের। সব খবর তাঁর পক্ষে নখদর্পণে রাখা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ব্যুরোর দায়িত্বে থাকে বিভিন্ন অফিসার। আর সবার মাথার উপরে একজন। বেসরকারি ভাবে যাকে এমএসএস-এর প্রধান বা চিফ বলা হয়। মিনিস্টার জানেন, তাঁকে কথা বলতে হবে এই লোকটার সঙ্গেই।
প্রিমিয়ারের বৈঠক শেষে মিনিস্টার সোজা রওনা দিলেন হাইদিয়ান ডিস্ট্রিক্টের শিউয়ানের ওই বিশেষ বাড়িটার দিকে। যেখানে রয়েছে এমএসএস-এর হেডকোয়ার্টার্স।
মন্ত্রী আর এমএসএস চিফের বৈঠকটা বেশি দূর গড়াল না। এমএসএস চিফ মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, তাঁদের তরফ থেকে কোনও গাফিলতি হয়নি। এই বিশেষ ভাইরাসের জন্ম হয়েছে প্রাকৃতিক কারণে, কোনও ল্যাবরেটরিতে নয়।
মন্ত্রী কতটা ভরসা পেলেন এই কথায়, সেটা বোঝা গেল না। কিন্তু তিনি এই নিয়ে বেশি কথা বাড়ালেন না। দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দিয়ে বিল্ডিং ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
মন্ত্রী চলে যাওয়ার পরে নিজের কেবিনে বসে আর একটা রিপোর্ট দেখতে শুরু করলেন চিফ। এই রিপোর্ট এখনও পলিটব্যুরোর কাছে যায়নি। মন্ত্রীও জানেন না। সবার আগে এসেছে তাঁর কাছে। তৈরি করেছেন তাঁর অধীনে থাকা বিজ্ঞানীরা।
রিপোর্টের দু’টো কথা চিফের মনে দাগ কেটেছে। ভয়ঙ্কর এক মহামারীর আবির্ভাব উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই নতুন ভাইরাসটা এতটাই বিপজ্জনক যে একে থামানো কঠিন। খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে। তার একটা বড় কারণ, চিন থেকে কত লক্ষ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। এর মধ্যে প্রচুর লোক ওই ভাইরাসের কেরিয়ার হতে পারে। সিম্পটম বোঝা যাচ্ছে না এখনও। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই যাবে। তার উপরে চিন থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের উদ্দেশ্যে। জাহাজ করে মাল যাচ্ছে নানা দেশে। সবই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আদর্শ রুট। যে কেউ কেরিয়ার হতে পারে। আর একবার এই ভাইরাস শরীরে ঢুকে পড়লে তাকে থামানো প্রায় অসম্ভব। এই বিশেষ ভাইরাসের কোনও প্রতিষেধক ওষুধ এখনও নেই। আর ওষুধ প্রয়োগ করে ভাইরাসকে থামানো কঠিন। দ্রুত চারিত্রিক গঠন বদলে নিতে পারে মারণ ভাইরাস।
তা হলে এই সংক্রমণ থামানোর উপায় কী? এখানেই আসছে দ্বিতীয় পয়েন্ট। থামানোর রাস্তা একমাত্র ভ্যাকসিন।
ভ্যাকসিনের পয়েন্টটা দেখার পরে কয়েক জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেন এমএসএস চিফ। ভ্যাকসিন তৈরি করতে অনেক সময় লাগে। ১০-১৫ বছর লেগে যায়। কখনও বা কোনও ভাইরাসের ভ্যাকসিন পাওয়াই যায় না। তা হলে এ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনকে কী ভাবে অস্ত্র বানানো যাবে?
ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিকরা। ভ্যাকসিন একটা লাগবেই। সেটা কতটা কাজের হবে, এখনই বলা সম্ভব নয়। সেই ভ্যাকসিনের সাইড এফেক্ট কী হবে, তাও জানা যাবে না এত কম সময়ে। কিন্তু ভ্যাকসিন ছাড়া এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়।
এর পরে সেই বৈজ্ঞানিক বলেছিলেন, ‘আমাদের উচিত ভ্যাকসিন তৈরির কাজ এই মুহূর্তে শুরু করে দেওয়া। কে জানে, আমেরিকা ইতিমধ্যে এই কাজে নেমে পড়েছে কি না!’
বিজ্ঞানীদের বিদায় দিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে যান এমএসএস চিফ। বছর চারেক আগে ভ্যানকুভারের এক কনফারেন্সে বিল গেটসের একটা মন্তব্য তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছিল।
মার্কিন ধনকুবের বলেছিলেন, ‘আগামী দশ বছরের মধ্যে কোনও এক সময় যদি এককোটি লোক মারা যায়, তবে যুদ্ধের কারণে মারা যাবে না। মারা যাবে কোনও ভয়ানক সংক্রামক ভাইরাসের আক্রমণে।’
সেই ভাইরাস তা হলে জন্ম নিয়েই নিল? আমেরিকা কি আগে থেকেই জানত, এই ভাইরাস আসছে? যদি জানে, তা হলে ওরা ভ্যাকসিন তৈরির কাজে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে। বিল গেটস বসে থাকার মানুষ নয়। বিশ্বজুড়ে ফার্মা বিজনেসের একটা বিশাল অংশ এই ধনকুবের নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সব কোম্পানি হয়তো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে নেমে পড়েছে।
চিনকেও বসে থাকলে হবে না।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন এমএসএস চিফ। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই রিপোর্ট আর তাঁর নিজের সন্দেহের কথা মন্ত্রীকে জানাবেন। এবং, তার পরে পলিটব্যুরোয়।
কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে। ভারতে একটা খবর পাঠাতে হবে দ্রুত। কে জানে, কবে দুম করে দিল্লির দূতাবাস বন্ধ করে দিতে হয়।
মনে হচ্ছে, ভারতকে আঘাত করার সময় আসছে।
.
জানুয়ারি, ২০২০।
স্পাই থ্রিলার সিনেমার দৌলতে এখন সাধারণ মানুষও একটা কথা খুব ভাল করে জানে, প্রায় প্রতিটা বিদেশি দূতাবাসে সেই দেশের গুপ্তচর থাকে। তারা কখনও দূতাবাসের কর্মচারী হয়, কখনও উচ্চপদস্থ আমলা। আবার এমনও হয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে জানিয়েও দেওয়া হয়, দূতাবাসের কোন কর্মী আসলে সেই দেশের সিক্রেট সার্ভিসের অঙ্গ। সাধারণত, দুটো দেশের সম্পর্ক খুব ভাল হলে একে অপরের কাছে এই গোপন তথ্য জানিয়ে রাখতে দ্বিধা বোধ করে না সেই সব দেশের সরকার।
ভারত-চিন সম্পর্কটা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তাতে এই সব সৌজন্য আশাই করা যায় না। বরং, দু’দেশই শ্যেন দৃষ্টিতে নজর রেখে যায় একে অন্যের দূতাবাসের উপরে। কে ভুলতে পারে ১৯৬৭ সালের ওই ঘটনাকে। যখন বেজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের দুই বিদেশ সচিবকে গুপ্তচর তকমা দিয়ে প্রায় ঘাড় ধরে বার করে দেওয়া হয়েছিল চিন থেকে। যার পরে ভারতও চিনের বিদেশ সচিবকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। নয়াদিল্লিতে চিনের দূতাবাসে হামলা হয়। আগুন জ্বলতে জ্বলতে এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যা নেভানো সম্ভব হয়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেধে যায় ১৯৬৭ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ।
এখন তাই দু’দেশই অত্যন্ত সতর্ক থাকে যাতে অনভিপ্রেত কোনও ঘটনা আবার আগুন জ্বালাতে না পারে। কিন্তু তা বলে নজরদারি ঢিলে হয়নি। বেজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের উপরে যে রকম নজর রাখা হয়, সে রকম নয়াদিল্লিতে চিনের দূতাবাসেও সর্বক্ষণ নজর থাকে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের।
কিন্তু তা বলে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার কখনও আটকে থাকে না। মাঝে মাঝেই দু’দেশের উচ্চপদস্থ আমলা, মন্ত্রীরা একে অন্যের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেন। আলাপ আলোচনা চলে। দু’পক্ষই চেষ্টা চালায় একে অন্যকে বাজিয়ে নেওয়ার। ওঁত পেতে থাকে, যদি অন্য পক্ষের কেউ বেফাঁস কিছু বলে দেয়। তাই এই ধরনের সৌজন্য সাক্ষাৎকার মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। তা পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন।
চাণক্যপুরীর চিনা দূতাবাস থেকে দিল্লি গল্ফ ক্লাবে আসতে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। এই ক্লাবে মাঝে মাঝেই দেখা যায় চিনের অতিথিদের। এই ক্লাবে আসেন ছুঁদে ভারতীয় রাজনীতিকরা, মন্ত্রী-আমলারা। এবং, বিজনেস টাইকুনরাও।
দু’পক্ষের এই মিটিং নিয়ে বিশেষ কেউ মাথা ঘামায় না। শুধু তো রাজনীতি নয়, এই সব মিটিংয়ে অনেক ব্যবসায়িক ডিলও চূড়ান্ত হয়। যার শুরুটা হয় দূতাবাসের কোনও অফিসারের মাধ্যমে।
নতুন বছরের দ্বিতীয় দিনে তাই চিনের সেকেন্ড সেক্রেটারিকে দিল্লি গল্ফ ক্লাবে ঢুকতে দেখে কারও ভ্রু কুঁচকে উঠল না। আর তিনিও নিজেকে গোপন করার চেষ্টা করেননি। তাঁর মিটিংটা ছিল এমন এক ভারতীয়র সঙ্গে, যার অঙ্গুলিহেলনে এই দেশে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে যায়। দু’জনের মধ্যে আগেও কয়েক বার এই রকম মিটিং হয়েছে। দু’জনেই জানে, তাদের এই মিটিংয়ের কথা ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টে উল্লেখ করা থাকবে। আর সেকেন্ড সেক্রেটারি তো শুধু এই একটা লোকের সঙ্গে দেখা করতেই এখানে আসেন না। তিনি অন্যান্য ভারতীয় কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গেও দেখা করেন। ফলে এই মিটিংটা নিয়ে আলাদা করে মাথা ঘামানোর কারণ নেই। ঘামালেও অবশ্য মিটিংয়ের বিষয়বস্তু বাইরের কেউ জানতে পারত না। এতটাই নিরাপত্তার জালে নিজেকে মুড়ে রাখেন ভারতীয় ভদ্রলোক। তাঁকে ঘাঁটানোর সাহস কেউ দেখায় না।
মাঝে মাঝে অবশ্য সাধারণ বিজনেস ডিল নিয়েও কথা হয় দু’জনের মধ্যে। যেটা স্রেফ একটা পর্দা মাত্র। আর কখনও কখনও হয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। যেমন আজ হচ্ছে।
আজ অপ্রত্যাশিত খবর নিয়ে এসেছে চিনের সেকেন্ড সেক্রেটারি।
গত বছরের অক্টোবর মাস নাগাদ এই রকমই একটা মিটিংয়ে এমএসএস চিফের বিশেষ বার্তাটা নিয়ে এসেছিলেন সেকেন্ড সেক্রেটারি—
এই ভারত সরকার বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। কিছু একটা করতে হবে। রাস্তা খোঁজা শুরু করো।
মলদ্বীপ কাণ্ডের পরে যে এ রকম একটা কিছু হতে পারে, সেটা আঁচ করেছিলেন ভদ্রলোক। চিনকে ঘাঁটালে ওরা ছেড়ে দেয় না। তিনি নিজে চিনকে ঘাঁটাতেও চান না। ভারত সরকার যত না তার দেখভাল করবে, তার চেয়ে অনেক বেশি করবে চিন! করছেও। তখন থেকেই তাই চোখকান খোলা রাখতে শুরু করেছিলেন ভদ্রলোক।
কিন্তু এ দিনের মিটিংয়ে তিনি যা শুনলেন, সেটা খুবই অপ্রত্যাশিত। আবার এই অপ্রত্যাশিত খবরটা সামনে অনেক রাস্তাও খুলে দিচ্ছে।
ভয়ঙ্কর এক মহামারী আসন্ন। পুরো দুনিয়া জুড়ে এর প্রভাব পড়বে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মরবে।
‘আপনি নতুন ভাইরাসটার কথা বলছেন?’ জিজ্ঞেস করলেন ভারতীয় ভদ্রলোক। তিনি শুনেছেন এই ভাইরাসটার ব্যাপারে। কিন্তু সেটা যে এই রকম চেহারা নিতে পারে, সেটা ধারণায় ছিল না।
‘হ্যাঁ। চিন এবার লকডাউনে চলে যাবে। কাউকে দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। খুব দ্রুতই বিশ্বের বাকি দেশগুলোয় এই হাল হতে চলেছে। গোটা দুনিয়া থমকে যাবে।’ চিন্তার রেখা খেলে গেল ভদ্রলোকের মুখে, ‘তা হলে তো বিরাট সমস্যা। দুনিয়া থমকে যাওয়া মানে তো অর্থনীতি থমকে যাওয়া। শেয়ার মার্কেটে ধস। বিজনেস বিশাল ধাক্কা খাবে।’
‘তা খাবে,’ সামনে রাখা ফ্রুট জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন সেকেন্ড সেক্রেটারি, ‘শুধু একটা ব্যবসা বাদে।’
‘কোন ব্যবসা?’
‘ফার্মা। ভ্যাকসিনের ব্যবসা। আগামী দিনে কোটি কোটি ডলার মুনাফা লুটবে ফার্মা কোম্পানিগুলো। বিল গেটসের কোম্পানি। চিনের কোম্পানি। আপনারাও নেমে পড়ুন। আপনার লোকেদের আগাম খবর দিয়ে রাখুন।
ভদ্রলোক চুপ করে রইলেন। রাস্তাটা অবশ্যই ভাল। চিনের এই লোকটা যা বলছে, পরিস্থিতি সে দিকে গেলে ফার্মা কোম্পানিগুলো লাল হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ব্যাপার তিনি বুঝতে পারছেন না। তাকে এই খবরটা দিয়ে চিনের লাভটা কী হচ্ছে? ভারতীয় ফার্মা কোম্পানি বিশাল মুনাফা লুটবে, তার পকেটেও বিশাল অঙ্কের টাকা ঢুকবে কমিশন হিসেবে, সে সব ঠিক আছে। কিন্তু তাতে ওদের কী? পুরো খেলায় চিনের এন্ডগেমটা ঠিক কী, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
ভদ্রলোকের প্রশ্নটা যেন পড়ে নিলেন চাইনিজ অতিথি। তার পরে ছোট ছোট চোখ দু’টো আরও কুঁচকে বললেন, ‘টাকা জোগাড় করতে থাকুন। প্রচুর প্রচুর টাকা। নিজের জন্য যা রাখার রাখুন। আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটা বড় অপারেশনের জন্য আলাদা ফান্ড তৈরি করুন। আমরা ভিতরে এবং বাইরে থেকে ভারতকে একসঙ্গে ধাক্কা দিতে চাই।’ একটু চুপ করে থেকে সেকেন্ড সেক্রেটারি বললেন, ‘ভ্যাকসিন ছাড়াও এই সময় নানা ভাবে টাকা কামানো যাবে। সেই রাস্তাও নিতে হবে আপনাকে। আপনার নেটওয়ার্ক কাজে লাগান।’
গলাটা তার পরে আরও নামিয়ে আনলেন চিন দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি। লাঞ্চের ফাঁকে ফাঁকে আরও আধঘণ্টা কথা চলল দু’জনের
তার পরে চিনা এজেন্ট বললেন, ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন আর লস্করের অপারেটিভদের দরকারে কাজে লাগাতে হবে। বছর দেড়েকের মধ্যে আমরা এই অপারেশনটা লঞ্চ করতে চাই। অপারেশন চিয়াং।’
ভারতীয় ভদ্রলোক কোনও জবাব দিলেন না। চুপ করে চুমুক দিতে লাগলেন হুইস্কির গ্লাসে। তিনি বুঝে গিয়েছেন, একটা ভয়ঙ্কর ঝড় আসছে। যে ঝড় পুরো পৃথিবীর চেহারাই বদলে দিয়ে যাবে।
আর ভারতেরও!
