৭. পোপ বনাম চার্চ
রোম, মে, ২০১৯
পৃথিবীর বুকে কোভিডের করাল ছায়া নেমে আসতে তখনও বেশ কয়েক মাস বাকি। কিন্তু ঝড় উঠতে শুরু করেছিল অন্য একটা দেশে। যে ঝড়ের কেন্দ্রে ছিলেন স্বয়ং পোপ। সেই ঝড় অবশ্য কোনও ভাইরাস নিয়ে নয়, ধর্ম আর ক্ষমতা নিয়ে।
৮ এপ্রিল, ২০১৬। এই দিনে পোপ হঠাৎ করে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন তাঁর ‘অ্যাপোস্টলিক এক্সহর্টেশন’– অ্যামোরেস লেহটিশিয়া। তারপরে তোলপাড় পড়ে যায় ভ্যাটিকান সিটি, রোম এবং আরও কিছু কিছু শহরে। ঝড় উঠে যায় ক্রিশ্চানদের একটা অংশে। বর্তমান পোপের বিরোধী গোষ্ঠী কম শক্তিশালী ছিল না। সেই গোষ্ঠীর জোর যেন আরও বাড়িয়ে দেয় এই ‘অ্যামোরেস লেহটিশিয়া’।
খুব সহজ কথায় ‘অ্যাপোস্টলিক এক্সহর্টেশন’ হল পোপের লেখা কিছু ডকুমেন্ট। যা পোপ না চাইলে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে আসে না। কিন্তু বর্তমান পোপ এই ডকুমেন্ট সবার কাছে প্রকাশ করে দেবেন ঠিক করলেন। যে ডকুমেন্টের নাম ছিল ‘অ্যামোরেস লেহটিশিয়া’। পোপের লেখা সবচেয়ে বিতর্কিত ডকুমেন্ট।
কী ছিল এই ‘অ্যামোরেস লেহটিশিয়া’-তে?
সহজ কথায়, পোপ চেয়েছিলেন যাজকরা যেন তাদের পরিবারের প্রতি আরও যত্নশীল হন। পাশাপাশি চার্চকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। মানুষের কথা ভাবতে হবে। সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় ছিল অষ্টম অধ্যায়। যেখানে পোপ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ডিভোর্সি বা দ্বিতীয় বার বিবাহ করা ক্রিশ্চানদেরও চার্চের তরফে আশীর্বাদ করতে হবে। সে ‘পাপমুক্ত’ না হলেও সমস্যা নেই।
পোপের এই লেখনী প্রকাশ্যে আসার পরে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল চার্চ। এক দলের মুখে পোপের প্রশংসা। তারা মনে করেছিল, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মানসিকতার পরিবর্তন করতেই হবে। কিন্তু অন্য দলের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই পোপের হাতে দায়িত্ব থাকলে মানুষের ওপর থেকে চার্চের নিয়ন্ত্রণ কমতে থাকবে। চার্চের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যাবে।
যত সময় যাচ্ছিল, তত জোট বাঁধছিল এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী।
রোমে ঘুরতে আসা টুরিস্টদের তালিকায় খুব উপরের দিকে যে ব্যাসিলিকা বা চার্চটির নাম থাকে, সেটি হল— সেন্ট মেরি অব দ্য এঞ্জেলস অ্যান্ড অব দ্য মার্টারস। স্থাপত্যবিদ্যার অসাধারণ এক নমুনা এই চার্চ বা ব্যাসিলিকা। অমরশিল্পী মিকেলাঞ্জেলোর হাতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে স্থাপত্যের কারুকার্যগুলো। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে এই চার্চকে ব্যাসিলিকাও বলা হয়ে থাকে।
রোমের প্রধান ট্রেন স্টেশন— রোম টার্মিনি থেকে হাঁটা পথের দূরত্ব এই ব্যাসিলিকা। সেই পথে হেঁটে এলে প্রথমে চোখে পড়বে গ্রেট রোমান বাথ। যা সাক্ষ্য বহন করে চলেছে কোনও এক সময়ের রোমান ইতিহাসের। এই গ্রেট বাথের সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছে এই সুবিশাল ব্যাসিলিকাটি। শোনা যায়, গ্রেট বাথের একটা অংশকেই ব্যাসিলিকায় বদলে দেওয়া হয়। মিকেলাঞ্জেলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, এই বাথকে চার্চে বদলে দেওয়ার জন্য। তাঁর প্রতিভার প্রতি সুবিচার করে রোমান বাথের কাঠামোটাকে ধরে রেখেই মিকেলাঞ্জেলোর হাত ধরে সৃষ্টি হয় এই ঐতিহ্যপূর্ণ ব্যাসিলিকার।
যে চার্চ ছুটির দিন বাদে সাধারণের জন্য খুলে যায় সকাল আটটা থেকে। খোলা থাকে দুপুর একটা পর্যন্ত। আবার চারটে থেকে সন্ধ্যা সাতটা।
.
সন্ধ্যা ছ’টা বাজে। তখনও টুরিস্ট ঢুকছে ব্যাসিলিকায়। একটা কোণে দাঁড়িয়ে যে দুই মধ্যবয়স্ক মানুষ নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, তাদের চেনা সম্ভব ছিল না সাধারণ টুরিস্টদের পক্ষে।
দু’জনের এক জন আর্চবিশপ, অন্য জন কার্ডিনাল। এঁদের মধ্যে কার্ডিনাল আলেসান্দ্রো ভ্যাটিকান সিটিরই বাসিন্দা। আর্চবিশপকে আবার চার্চ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। তাঁর পোপ বিরোধী কার্যকলাপ মাত্রা ছাড়া হয়ে যাচ্ছিল বলে।
কার্ডিনালের দিকে তাকিয়ে আর্চবিশপ বলে উঠলেন, ‘আর কত দিন এই সব সহ্য করা যাবে? চার্চের নিয়ন্ত্রণ তো এবার উঠতে চলেছে। সাধারণ ক্রিশ্চানরা কেন মানবে চার্চকে? পোপ নিজেই তো লিখিত ভাবে বলছে, আরও উদার হও। বেশি উদার হতে গেলে একদিন আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব, দেখে নিয়ো তুমি।’
কার্ডিনাল একটু সময় চুপ করে রইলেন। তারপরে বললেন, ‘এই পোপকে নিয়ে কিন্তু ক্ষোভ বেড়েই চলেছে। ডিভোর্সের প্রতি, সমকামিতার প্রতি এই পোপের যা উদার দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে চার্চের কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে। ধর্মের শিকলে মানুষকে বেঁধে রাখতে গেলে এত উদারপন্থী হলে চলে না। কঠোর হতে হবে, নির্মম হতে হবে।’
‘আমিও তো ঠিক এটাই বলছি। কিন্তু সেটা এই পোপকে বোঝাবে কে? আমাকে তো বহিষ্কারই করে দিয়েছে।’
দু’জনেই সামান্য সময় চুপ করে রইলেন। তার পরে কার্ডিনাল বললেন, ‘উপায় একটা বার করতেই হবে। এই পোপের অভিষেকটাও তো কম বিতর্কিত ছিল না।’
কার্ডিনাল ঠিকই বলেছিলেন। ২০১৩ সালে তৎকালীন পোপ সরে দাঁড়ানোর পরে বর্তমান পোপ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু আগের পোপ কেন সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তা নিয়ে অনেক জল্পনা চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মত হল, জোর করে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল আগের পোপকে।
দু’জনেই জানতেন ব্যাপারটা। মুখ খুললেন আর্চবিশপ, ‘কিন্তু এই পোপকে জোর করে সরানো যাবে কী করে? এর ক্ষমতা অনেক বেশি। এর ভক্তসংখ্যাও কম নয়।’
‘শত্রুসংখ্যাও কম নয়,’ একটু হেসে বললেন কার্ডিনাল। ‘পোপ তো শুধু ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বীদের খেপিয়ে দিচ্ছে না। আরও অনেক শক্তিশালী শত্রুও বানাচ্ছে।’
আর্চবিশপ ভ্রুটা কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কারা সেই শক্তিশালী শত্রু?’
‘চিন,’ প্রায় ফিসফিস করে জবাব দিলেন কার্ডিনাল।
‘চিন?’ অবাক হয়ে গেলেন আর্চবিশপ, ‘এর মধ্যে চিন আসছে কোথা থেকে?’
‘আসছে নয় এসেছে। ক্লাইমেট পরিবর্তন নিয়ে পোপের বিষোদগার আপনি শোনেননি? বারবার একই কথা বলে চলেছেন পোপ। যারা পরিবেশ দূষণ করছে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। আর এই পরিবেশ দূষণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে উপরে আছে কিন্তু চিনই।’
কথাটা ভুল বলেননি কার্ডিনাল। প্রতি বছর তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে চিনের। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইডের উৎপত্তি হয় চিন থেকে। বছরে ১০ বিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি। কাংহি-তিব্বত অঞ্চলের হিমবাহ গলতে শুরু করেছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে চলার পিছনে কিন্তু চিনের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
পোপ এই ক্ষেত্রে ভুল কথা কিছু বলেননি। কিন্তু সত্যি কথা অনেক ক্ষেত্রেই শত্রু তৈরি করে দেয়!
এর বাইরে আরও একটা কারণ আছে চিনের খেপে যাওয়ার। তাদের দেশে যেসব আণ্ডারগ্রাউন্ড চার্চ আছে, তার উপরে কর্তৃত্ব জারি করতে চায় চিনের সরকার। যার জন্য রোমান ক্যাথলিক চার্চকে পাশে পাওয়াটা খুবই জরুরি। চার্চের একটা অংশ চিনের প্রতি নরম মনোভাব দেখালেও পোপ কিন্তু উল্টো রাস্তায় হাঁটছেন। তাঁর মতে, চিন সরকারের উচিত এই চার্চগুলোর প্রতিও সহমর্মিতা দেখানো। তাদের কথা শোনা।
‘চিনও তা হলে ক্ষুব্ধ? কিন্তু ওরা কী করতে পারে?’ দ্বিধাভরে প্রশ্নটা করলেন আর্চবিশপ।
‘দেখা যাক কী করে। তবে সময় এলে আশা করি, আপনাকে পাশে পাব।’ আর্চবিশপের দিকে তাকিয়ে বললেন কার্ডিনাল আলেসান্দ্রো।
‘অবশ্যই পাবে,’ দ্বিধা না করে জবাব দিলেন আর্চবিশপ।
আর কথা বাড়াতে চাইলেন না কার্ডিনাল। ঘড়ির কাঁটাও তখন সাতটা ছুঁইছুঁই।
একটু পরেই ফাঁকা হতে শুরু করল সেন্ট মেরি অব দ্য এঞ্জেলস অ্যান্ড অব দ্য মার্টারস ব্যাসিলিকা। কেউ খেয়াল করল না কখন ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছেন এক জন আর্চবিশপ ও এক জন কার্ডিনাল।
বর্তমান পোপ ক্ষমতায় আসার পরে অনেক কিছুরই রদবদল ঘটেছে। তার মধ্যে একটা হল পোপের বাসস্থান। রীতি অনুযায়ী পোপেদের থাকার কথা অ্যাপোস্টলিক প্যালেসে। কিন্তু এই পোপ সব সময় সেখানে থাকেন না। কখনওসখনও থাকেন কাসা সান্তা মার্তায়। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার পাশেই এই বাড়িটা। যা তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। বানানোর উদ্দেশ্য ছিল, কনক্লেভের সময় কার্ডিনালরা এসে থাকবেন এই বাড়িতে। কিন্তু ১১০ বছর পরে প্রথা ভেঙে নিজের বাসস্থান বদলে ফেলেছেন পোপ। প্যালেসে যান রবিবার বা কোনও অতিথির সঙ্গে দেখা করতে। তবে কখনওকখনও অ্যাপোস্টোলিক প্যালেসে থাকতেও হয় তাঁকে।
পোপের সঙ্গে কাসা সান্তা মার্তায় থাকতে শুরু করেছেন আরও অনেকে। যারা পোপের ব্যক্তিগত স্টাফ এবং চার্চের কর্মী। অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাট দ্য থ্রোনস, জেন্টলমেন অফ হিজ হোলিনেস, অ্যাটাশি অব দ্য অ্যান্টি চেম্বার্স, এইড ডি কেম্প, এইড ডি চেম্বার্স। এবং আরও কেউ কেউ। তাঁরা প্রয়োজনে অ্যাপোস্টলিক প্যালেসে গিয়ে ও থাকেন।
.
দিন দু’য়েক পরে ভ্যাটিকান সিটির একটি ঘরে বসে ছিল দু’জন। যাদের মধ্যে এক জন পোপের সঙ্গেই থাকে কাসা সান্তা মার্তায়। হিজ হোলিনেসের ছায়াসঙ্গী বলা যেতে পারে তাকে। অন্য জন, কার্ডিনাল আলেসান্দ্রো। তিনি ভ্যাটিকানে থাকলেও অ্যাপোস্টলিক প্যালেস বা পোপের সঙ্গে থাকার সুযোগ হয় না তাঁর।
বিছানায় বসে থাকা কার্ডিনালের হাত ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল প্রথম জন, ‘তা হলে কী ভেবেছ? আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের?’
সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন কার্ডিনাল। ‘অধৈর্য হলে চলবে না। আমি জানি, তুমিও এই পোপকে পছন্দ করো না। চার্চের জন্য, ক্রিশ্চান ধর্মের জন্য তুমি সব কিছু করতে পারো। কিন্তু আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতেই হবে।
সঙ্গীটি হাসল। কার্ডিনাল একটু ভুল বলেছেন। পোপকে সে ঘৃণা করে। তবে শুধু এই পোপকে নয়। সব পোপকে। ঘৃণা করে এই চার্চকে, এই ভ্যাটিকান সিটিকে। এই ভ্যাটিকান সিটির বুকে চরম আঘাত হানার জন্য সে অপেক্ষা করে আছে বছরের পর বছর ধরে। ঈশ্বর জানেন, আর কত দিন অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
.
কুড়ি বছর পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ক্ষতটা শুকিয়ে যাওয়ার বদলে আরও গভীর হয়েছে। যন্ত্রণাটা আরও তীব্র হয়েছে। এরা নিজেদের ঈশ্বরের দূত বলে দাবি করে। কিন্তু আসলে এরা অতি নিকৃষ্ট প্রাণী। নিজেদের স্বার্থের জন্য কোনও প্রাণকে বলি দিতে দু’বারও ভাবে না। কমান্ডারকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি বোড়ের প্রয়োজন হয়েছিল চার্চের। কাজ হয়ে যাওয়ার পরে সেই বোড়েকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বিনা দ্বিধায়।
ঈশ্বরও এদের ক্ষমা করবেন না। সে ঈশ্বরের কাজই করবে। ভ্যাটিকানের বুকে এমন আঘাত হানবে, যা ইতিহাস কোনও দিন ভুলবে না।
ভাবনাটা ধাক্কা খেল কার্ডিনালের টানে। সঙ্গীর শরীরটা বুকে টেনে এনে, তার সোনালি চুলে হাত বোলাতে বোলাতে গভীর চুম্বনে ডুবে গেলেন কার্ডিনাল।
কার্ডিনাল আলেসান্দ্রোর ঠোঁটের নোনতা স্বাদটা টের পেতে পেতে সে বুঝে গেল, তাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
কিন্তু বোঝেনি, সেই অপেক্ষার পালাটা কত দীর্ঘ হতে পারে!
কয়েক মাস বাদে নোভেল করোনাভাইরাস এসে তছনছ করে দিয়ে গেল পুরো পৃথিবী। সঙ্গে অনেকের অনেক পরিকল্পনাও।
