৬. দোটানায়
হাবেই মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, উত্তর চিন। ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
হাবেই মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে প্রফেসর ওয়াং লি হেঁটে ফিরছিলেন তাঁর বাড়িতে।
ক্যাম্পাস থেকে খুব দূরে নয় প্রফেসর লিয়ের অ্যাপার্টমেন্ট। যে কারণে হেঁটেই যাতায়াত করেন তিনি। হাঁটতে তাঁর ভালই লাগে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ উপভোগ করতে পারেন।
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে সোজা এগোলে পড়বে চাংচেং নর্থ অ্যাভেনিউ। চাংচেং কথাটার অর্থ— গ্রেট ওয়াল অব চায়না। এই রাস্তা দিয়ে পুব দিকে খানিকটা এগোলেই প্রফেসরের বাসস্থান চিংউয়াং অ্যাপার্টমেন্ট।
রাস্তা দিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রফেসর। ক’দিন হল তিনি প্রচণ্ড দোটানার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে এক বছর আগে এমএসএস হেডকোয়ার্টার্সের সেই মিটিংটার কথা।
যে দিন তাঁর সৃষ্টি করা ভাইরাসটির নামকরণ হয়েছিল— চিয়াং ভাইরাস।
সে দিনই ওই লোকগুলোর মুখ দেখে মনের ভিতরটা ধক করে উঠেছিল প্রফেসরের। লোকগুলো ঠিক কী চায়? তিনি গবেষণাটা শুরু করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস বা তার মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী কোনও ভাইরাসকে ঠেকানোর রাস্তা খুঁজে পেতে। সেই রাস্তায় এগোচ্ছিলেনও তিনি। তার পরে ওই মিটিংটা।
লোকগুলো বারবার তাঁকে একটা ব্যাপার নিয়ে খোঁচাচ্ছিল। একটা জিনিস জানতে চাইছিল। কতটা মারাত্মক হতে পারে ভাইরাসটি? কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে?
প্রফেসর লি বাচ্চা ছেলে নন যে বুঝতে পারবেন না, প্রশ্নগুলো কোনদিকে ইঙ্গিত করছে। লোকগুলো জানতে চায়, এই ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা কতটা।
একটা বোঝা নিয়ে সে দিন বেজিং ছেড়েছিলেন তিনি। তার পরে হাবেই ফিরে এসে আবার ডুবে যান গবেষণায়। পরীক্ষানিরীক্ষা চলতে থাকে অবিরাম। যে পরীক্ষার ফসল হিসেবে তৈরি হয়ে গিয়েছে তাঁর ভাইরাস। যে ভাইরাসকে দেখে সৃষ্টিকর্তা নিজেই ভীত হয়ে পড়ছেন। এই ভাইরাসকে থামানোর প্রতিষেধকটা এখনও তাঁর হাতে নেই।
এই ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা ভয়ঙ্কর। তার চেয়েও বেশি হল সংক্রমণ ক্ষমতা। খুব দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা। দিন তিনেক সময় লাগবে রোগের লক্ষণগুলো ফুটে উঠতে। আর যখন সেগুলো বোঝা যাবে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ভাইরাসের আক্রমণে বিকল হতে শুরু করেছে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো। মৃত্যু নিশ্চিত। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হল, কেউ জানবে না, আরও কত লোককে সংক্রমিত করেছে ওই কেরিয়ার!
আনমনে হাঁটছিলেন বলে প্রফেসর খেয়াল করেননি, পিছন থেকে কেউ ডাকছে। ছেলেটা একেবারে ঘাড়ের কাছে এসে যখন ডাক দিল, তখন হুঁশ ফিরল প্রফেসরের। তার পরে অল্প হেসে বললেন, ‘আরে মূর্তি, কী ব্যাপার?’
নারায়ণ মূর্তি তাঁর অতি প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন। এই ইউনিভার্সিটিতে প্রায় তিন হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করে। যাদের মধ্যে এক জন এই মূর্তি। ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট। এই ছেলেটিকে খুবই পছন্দ করেন প্রফেসর।
‘স্যার, আপনি কি কোনও ব্যাপারে চিন্তিত? মানে, অনেক বার করে ডাকছিলাম, কিন্তু আপনি শুনতেই পাননি!’ একটু হেসে বলল মূর্তি। অবশ্য পণ্ডিত মানুষরা একটু আপনভোলা হয়, সেটা জানত সে। সে একটু হালকা সুরেই কথাগুলো বলেছিল। কিন্তু প্রফেসরের মুখে বিষাদের ছায়া খেলে গেল।
‘আচ্ছা মূর্তি, আমরা কি সমাজের ভাল করছি না খারাপ? বিজ্ঞান কি সত্যিই মানুষের উপকার করছে?’ প্রফেসেরর মুখে প্রশ্নটা শুনে হকচকিয়ে গেল মূর্তি। কী বলছেন প্রফেসর লি! মূর্তি জানে, চিনের অত্যন্ত খ্যাতনামা একজন বিজ্ঞানী এই ওয়াং লি। তাদের ভাগ্য ভাল যে, এই রকম এক জন প্রফেসরের কাছে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রফেসরের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মূর্তি জবাব দিল, ‘এটা কী বলছেন স্যার? বিজ্ঞানের অগ্রগতি না ঘটলে মানুষ তো সেই প্রস্তরযুগে পড়ে থাকত। আপনারাই তো মনুষ্য সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনারাই তো ঈশ্বরের বরপুত্র, দেবদূত। সাধারণ মানুষের কাছে আশীর্বাদ।’
ছাত্রের কথাটা শুনতে শুনতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রফেসর। চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মূর্তি বুঝতে পারছিল না, কিছু বলবে কিনা। মনে হচ্ছে, প্রফেসরের মনটা কোনও কারণে খুব ভারাক্রান্ত। খুবই হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ এই প্রফেসরটি। বিদেশি ছাত্রদের কাছে খুবই প্রিয় এক জন মানুষ। কিন্তু আজ কিছু একটা হয়েছে।
প্রফেসরই আবার মুখ খুললেন, ‘কিন্তু বিজ্ঞান তো সব সময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না। বৈজ্ঞানিকরাও সব সময় দেবদূত হন না, কখনও কখনও শয়তানের রূপটাও তাদের মধ্যে দেখা যায়।’ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রফেসর।
মূর্তি সামান্য সময় চুপ করে থাকল। তার পরে বলল, ‘স্যার, সে তো আমরা জানিই। বিজ্ঞানকে যে ভাবে আপনি ব্যবহার করবেন, বিজ্ঞান সে রকম ফলই দেবে। তাই তো বিজ্ঞান একদিকে আশীর্বাদ, আবার অন্যদিকে অভিশাপ।’ তারপরে একটু থেমে বলল, ‘কিন্তু আপনাদের মতো মানুষ আছে বলেই তো বিজ্ঞান এখনও আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় মানুষের কাছে।’
‘তাই কী!’ আনমনে বললেন প্রফেসর।
‘স্যার, কিছু হয়েছে? আপনাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে,’ করব না করব না করেও প্রশ্নটা করে ফেলল মূর্তি।
প্রফেসর আবার সামান্য সময় চুপ করে রইলেন। তিনি জানেন, তাঁর গবেষণাটা খুবই স্পর্শকাতর এবং গোপনীয়। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না এই ভাইরাসটা সম্পর্কে। কিন্তু প্রফেসরের বুকে যে পাথরটা চেপে বসেছে, তার ভার যে কিছুতেই তিনি একা বহন করতে পারছেন না। কাউকে কিছু বলতে না পারলে তাঁর দমবন্ধ হয়ে যাবে। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বেন।
একটু ভেবে প্রফেসর বললেন, ‘আসলে একটা ভাইরাস নিয়ে কাজ করছি। ভাইরাসটা খুবই বিপজ্জনক। ছড়িয়ে পড়লে কী হবে, ভাবতেও পারছি না। তাই…।’ প্রফেসর কথা শেষ করলেন না।
মূর্তি একটুও ঘাবড়াল না। বরং উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল, ‘এ তো খুব ভাল ব্যাপার স্যার। আপনি চিন্তা করছেন কেন? আপনি নিশ্চয়ই কোনও ওষুধ বার করার জন্য গবেষণাটা করছেন।’
প্রফেসর ইঙ্গিতে ‘হ্যাঁ’ বললেন।
‘ব্যাস, তা হলে তো হয়েই গেল। মানুষের কল্যাণের জন্যই আপনি এই গবেষণা করছেন। এই নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। গবেষণা চালিয়ে যান।’
প্রফেসর হাসলেন। প্রিয় ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মনের ভার অনেকটাই হালকা হয়েছে।
‘ভাইরাসটা কীসের?’ আবার প্রশ্ন করল মূর্তি।
‘ইবোলার একটা অন্য রূপ। চেষ্টা করছি, ভবিষ্যতের মহামারী ঠেকানোর রাস্তা বার করতে।’
‘দারুণ ব্যাপার, স্যার। আর আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছিলেন,’ বলে উঠল মূর্তি। তারপরে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইরাসটার কোনও নাম দিয়েছেন নাকি?’
প্রফেসর একটু থমকালেন। তার পরে কিছুটা আনমনেই বলে উঠলেন-
‘চিয়াং!’
প্রফেসর এবং ছাত্র, দু’জনের মুখেই হালকা হাসি খেলে গেল। তার পরে ছাত্রকে বিদায় জানিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে হাঁটা দিলেন প্রফেসর ওয়াং লি।
তিনি বিপত্নীক। সন্তানহীন। একাই থাকেন। নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটটার তালা যখন খুলছেন প্রফেসর লি, তখন তাঁর মনের ভারটা অনেকটাই লাঘব হয়ে গিয়েছে।
মূর্তি ঠিকই বলেছে। তিনি তো মনুষ্য সমাজের উপকারের জন্যই এই গবেষণাটা করছেন। তা হলে! মিথ্যে মিথ্যে চিন্তা করছিলেন!
খুশি মনেই নিজের ফ্ল্যাটে পা রাখলেন প্রফেসর লি।
.
মাস দু’য়েক পরে। এপ্রিল, ২০১৯। বেজিং।
এর মাঝে নায়ারের সঙ্গে কয়েক বার দেখা হয়েছে মৈত্রীর। কিন্তু কোনও খবর তাকে দিতে পারেনি মেয়েটি।
চিয়াং নামটা তার চেনা পরিচিত বৃত্তে কেউ শোনেনি। একটু অস্বস্তিতে পড়ে যাচ্ছিল মৈত্রী। সে জানে, নায়ার তাকে অনেক ভাবে সাহায্য করেছে। বিনিময়ে শুধু বলেছিল, চোখকান খোলা রাখতে।
মৈত্রীর মনে পড়ে যাচ্ছিল বছর দু’য়েক আগে নায়ারের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা। সেই একই সুপার মার্কেটে…
হাতে বেশ কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে একটু দিশাহারা অবস্থা হয়েছিল মৈত্রীর। একটা প্যাকেট তো পড়েই গিয়েছিল হাত থেকে। আর তখনই চশমা পরা, শ্যামলা রংয়ের মধ্যবয়স্ক মানুষটি এসে প্যাকেটটা তুলে দেন মৈত্রীর হাতে।
স্বাভাবিক ভাবেই এক ভারতীয়র সঙ্গে দেখা হলে কথাবার্তা এগোবে। আর সেটাই হল। নায়ার জানাল, সে ভারতীয় দূতাবাসে কাজ করে। মৈত্রীও নিজের পরিচয় দিয়েছিল। প্রথম দিন ওই রকম টুকটাক কথাবার্তা। যাওয়ার আগে নায়ার বলে গিয়েছিল, সে মাঝেমাঝেই এখানে আসে কেনাকাটা করতে।
ফলে স্বাভাবিক ভাবেই আরও কয়েকবার দেখা হয়ে গেল দু’জনের। আড্ডা গড়াল কফি টেবিল পর্যন্ত।
তার পরে একদিন নায়ার প্রশ্নটা করল, ‘মিস বসু, কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?’
ভ্রুটা সামান্য কুঁচকে তাকিয়েছিল মৈত্রী।
‘আগের বারও যখন দেখা হয়েছিল, তখনও দেখেছিলাম, আপনি বেশ চিন্তিত। এবারও তাই দেখছি। এনিথিং সিরিয়াস? আমাকে বলতে পারেন।
এই বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজের মনের কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল। সবাই নিজের নিজের কাজে এখানে এসেছে। একটা লক্ষ্যের পিছনে ছুটে চলেছে। সেই দৌড় থামিয়ে, অন্য এক জনের কথা শোনার সময় কোথায় কারও কাছে!
নায়ারের প্রশ্নে প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করলেও শেষ পর্যন্ত সব কিছু খুলেই বলল মৈত্রী। পুরো ঘটনা বলার পরে সে বলেছিল, ‘বাবার উপরে আর চাপ দেওয়া সম্ভব নয়। যদি কোনও পার্টটাইম জব জোগাড় করতে না পারি, তা হলে হয়তো দেশে ফিরে যেতে হতে পারে। ত
‘সে কী মিস বসু! আপনি এত পরিশ্রম, এত লড়াই করে এখানে এসেছেন। আপনার বাবা-মা আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। আর আপনি এত সহজে হার মেনে নেবেন?’
‘কী করব বলুন,’ ম্লান হেসে বলেছিল মৈত্রী, ‘আমার সামনে তো আর কোনও রাস্তা খোলা থাকছে না। বাবার উপরে আর বোঝা চাপাতে চাই না। তার চেয়ে দেশে ফিরে কিছু একটা চাকরি জুটিয়ে নেব। কিছু না হলে নার্সের একটা কাজ নিশ্চয়ই পেয়ে যাব।’
নায়ার সামান্য সময় চুপ করে রইল। তারপরে বলল, ‘আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিন। দেখি, এম্ব্যাসির সাহায্যে কিছু করা যায় কি না। পরের সপ্তাহে আমরা আবার এখানে দেখা করব।’
একটা সপ্তাহ অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করেছিল মৈত্রী। নায়ার লোকটা সত্যিই সাহায্য করবে? করতে পারবে? অবশ্য দূতাবাসের কর্মীদের অনেক যোগাযোগ থাকে। দেখা যাক। প্রহর গোনার পালা শুরু হল মৈত্রীর।
.
তারপরে এল সেই দিনটা। মৈত্রীর সঙ্গে প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক কথা বলল নায়ার। আর তখনই মৈত্রী বুঝে গিয়েছিল, নায়ার লোকটা সোজা নয়।
‘আপনার জন্য আমরা একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেব মিস বসু। তাতে আপনার এখানে পড়াশোনা, থাকা খাওয়ার যাবতীয় খরচ চলে যাবে। বাড়ি থেকে কোনও সাহায্য নিতে লাগবে না।’
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মৈত্রী। সে কি স্বপ্ন দেখছে! কোনওমতে বলতে পারল, ‘কিন্তু আমাকে স্কলারশিপ দেবে কেন? আমি তো কোনও পরীক্ষা দিইনি, কোথাও আবেদনও করিনি।’
নায়ার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘ওই সব নিয়ে আপনি ভাববেন না। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে। আমার কথা এখনও শেষ হয়নি।’
এর পরে নায়ারের কথা শুনতে শুনতে বড়ো বড়ো হয়ে গেল মৈত্রীর চোখ দু’টো। ‘আপনার মায়ের খেয়ালও রাখা হবে। আপনার মায়ের চিকিৎসার সব খরচও দিয়ে দেওয়া হবে।’
মৈত্রীর যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, কী শুনছে। তার পরেই মনে পড়ে গেল একটা কথা— দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ। এই দুনিয়ায় এমনি এমনি কিছু পাওয়া যায় না!
হঠাৎ লোকটা এত দয়ালু হয়ে উঠছে কেন? ক’দিনের মাত্র আলাপ। কী চায় লোকটা?
মৈত্রীর মনের কথাটা যেন বুঝে গিয়েছিল নায়ার। সে অল্প হেসে বলেছিল, ‘আমার কথা হয়তো আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আজ আর কোনও কথা নয়। আবার পরের সপ্তাহে দেখা হবে। তারপরে বাকি কথা।’
তাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গিয়েছিল নায়ার।
.
এক সপ্তাহের মধ্যে কলকাতা থেকে যাবতীয় খবর পেয়ে গিয়েছিল মৈত্রী। চিনে হোয়াটসঅ্যাপ নিষিদ্ধ। অন্য আর একটি অ্যাপের মাধ্যমে মেসেজ পাঠানো যায়। সেটা আবার ভারতে তার বাবার কাছে নেই। ভিপিএন ব্যবহার করে অবশ্য হোয়াটসঅ্যাপ কল করা যায়, কিন্তু সে ঝুঁকি নেয় না মৈত্রী। সে চিনের ই-মেলের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত বাড়ির সঙ্গে। আর খুব প্রয়োজন হলে ফোন।
বাবার ই-মেলটা পেয়ে সত্যিই চমকে উঠল মৈত্রী। তার পাঠানো টাকা পেয়ে গিয়েছে বাবা। মায়ের চিকিৎসার কোনও সমস্যা আর হবে না। এর সঙ্গে সঙ্গে বাবা আরও লিখেছে— ‘কী রে, তোকে বলেছিলাম না, ওখানে গিয়ে ঠিক পার্টটাইম চাকরি পেয়ে যাবি। দেখলি তো, সেটাই হল। কিন্তু চাকরির জন্য যেন লেখাপড়ায় ক্ষতি না হয়, সেটা দেখিস।’
একটু সময় স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল মৈত্রী। তারপরে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের একটা ই-মেল পাঠিয়ে দিল বাবাকে। একদিন বাদে ফোনে বাবার সঙ্গে কথাও বলে নিল মৈত্রী। এত দূর থেকেও বুঝতে পারল, বাবা কতটা স্বস্তি পেয়েছে পুরো ঘটনায়। ফোন নামিয়ে রেখে মৈত্রী অপেক্ষায় থাকল, কবে আবার দেখা হবে নায়ারের সঙ্গে।
দিন দু’য়েক বাদেই দেখা হল দু’জনের। আর তখনই মৈত্রী চেপে ধরল নায়ারকে। ‘আপনি আমাকে খোলাখুলি বলুন, কী চলছে। কেন আপনারা আমাকে এই ভাবে সাহায্য করছেন? ‘
কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে মৈত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল নায়ার- ‘মিস বসু, আমরা অনেক দিন ধরেই আপনার উপরে নজর রেখেছিলাম। চিনে পড়তে আসা ভারতীয় স্টুডেন্টদের ব্যাকগ্রাউন্ড আমরা চেক করি। আমাদের মনে হয়েছিল, এই কাজের জন্য আপনি আদর্শ।’
আরও অবাক হয়ে গেল মৈত্রী, ‘মানে? কী কাজের জন্য আমি আদর্শ?
‘দেশের সেবা করার জন্য।
