৫. হিন্দি-চিনি ভাই ভাই
ক্যাপিটাল মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পাস, ফেংতাই ডিসট্রিক্ট, বেজিং, অক্টোবর ২০১৮
বিশাল ক্যাম্পাসটা থেকে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসছিল মৈত্রী বসু। ক্যাপিটাল মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি বা সিএমইউয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী সে। পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স করতে চিনে এসেছে সে।
আপাতত আর ক্লাস নেই। মৈত্রী ঠিক করল, একবার লাইব্রেরিতে গিয়ে বসবে। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার। দিন দু’য়েক আগে যে কাজের দায়িত্বটা হঠাৎ করে পেয়েছে সে, তাতে মাথা ঠান্ডা রাখাটা খুবই জরুরি।
তাদের ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে বাসে করে মিনিট কুড়ি গেলেই পরে সানলিতুন ডিসট্রিক্ট। এই জায়গাটাকে অনেকটা বাজার এলাকা বলা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এই এলাকায় ভারতীয় আর পাকিস্তানিদের বেশ কয়েকটা দোকান আছে। ভারতীয় মশলাপাতি, শাকসবজি এমনকী তৈরি খাবারদাবারও পাওয়া যায় এই এলাকায়। ছুটি পেলে তাই মাঝে মাঝে এই সানলিতুন ডিসট্রিক্টে চলে আসে মৈত্রী। বেশির ভাগ সময়ই একা। টুকটাক জিনিস কিনে নিয়ে যায়। দেশীয় জিনিসের মধ্যে দেশের স্বাদটা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে মেয়েটা।
বছর দু’য়েক আগে এই সানলিতুন এলাকারই এক ভারতীয় দোকানে লোকটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর। নিজের পরিচয় দিয়েছিল ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মী বলে। লোকটাও মাঝে মাঝে ওই দোকানটায় আসে কেনাকাটা করতে। লোকটার সঙ্গে আলাপ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে জীবনটাই বদলে যায় মৈত্রীর!
দিন দু’য়েক আগে সেই লোকটাই এসেছিল মৈত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। এর আগে যখনই মনে হত, তখনই বাজার করতে বেরোত মৈত্রী। কিন্তু এখন আর সেই উপায় নেই। এক সপ্তাহ বাদে বাদে নির্দিষ্ট সময়ে ওই দোকানে হাজির হতে হয় মৈত্রীকে। আর সেই সময়টাও নিয়ম মেনে, রুটিন মেনে বদলে যায়। ওই রুটিনটা পুরো গেঁথে আছে মৈত্রীর মাথায়। তাকে বলে দেওয়া হয়েছে, একবার মিটিং মিস করলে আবার পরের ডেটে যেতে। সেটাই মেনে চলে মৈত্রী। লোকটা যে সব সময় আসে, তা নয়। কখনও সখনও আসে। কিন্তু মৈত্রীকে নিয়মটা মানতে হয়। অবশ্য জরুরি প্রয়োজনে অন্য সময়ে সে যেতেই পারে।
দু’দিন আগে লোকটা আবার এসেছিল। লোকটা তাঁকে নিজের নাম বলেছিল, মিস্টার নায়ার। তবে সেই নামটা সত্যি কি না, মৈত্রী জানে না। লোকটা আদৌ ভারতীয় দূতাবাসে কাজ করে কি না, তাও সে জানে না। কিন্তু এইটুকু জানে, লোকটার হাত প্রচুর লম্বা। চিনে বসে কলকাতায় মৈত্রীর বিশাল সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল এই নায়ার।
সে দিন তাকে ডেকে নায়ার একটা কথা বলেছিল—
‘চিয়াং। এই নামটা আমাদের কানে এসেছে। এই নামটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কী ভাবে, সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
বছর চারেক চিনে থাকার সুবাদে অল্পস্বল্প চিনা শব্দের সঙ্গে মৈত্রীর পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। চিয়াং মানে জানত সে। বল্লম, বর্শা।
‘ঠিক বুঝলাম না ব্যাপারটা। কানে এসেছে বলতে?’ তাদের কাছাকাছি কেউ না থাকলেও চাপা স্বরেই জিজ্ঞেস করল মৈত্রী।
খুব দ্রুত জবাব দিল নায়ার। মেয়েটার সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে চায় না সে।
‘আমরা যা খবর পেয়েছি, তাতে চিয়াং কোনও অস্ত্রের নাম হতে পারে। নিউক্লিয়ার ওয়েপন সম্ভবত নয়। তা হলে থাকল, বায়োলজিক্যাল ওয়েপন। আপনি একটু চোখকান খোলা রাখুন। বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে না। কিন্তু কখনও চিয়াং নামটা যদি কানে আসে, তা হলে যতটা সম্ভব খোঁজখবর নেবেন।’ একটু থামল লোকটা। তারপরে বলল, ‘আপনি যেখানে আছেন, সেখানে অনেক চাইনিজ প্রফেসর আছে। যারা মেডিক্যাল লাইনের। নানা গবেষণা করে। যে কারণে আপনাকে বলা। দু’টো জিনিস জানার চেষ্টা করবেন। চিয়াংটা কী। আর এই চিয়াংয়ের পিছনে কারা আছে।’
আর কোনও কথা হয়নি দু’জনের। জিনিস কিনে কাউন্টারে দাম মিটিয়ে চলে এসেছিল মৈত্রী। আর তার পর থেকেই তার মাথায় ঘোরাফেরা করছে ওই নামটা চিয়াং!
.
বছর চারেক আগে মৈত্রী যখন চিনে পা রেখেছিল, তখন কল্পনাও করতে পারেনি এক দিন এই পরিস্থিতিতে পড়বে।
ছোটবেলা থেকে একটা স্বপ্ন দেখত সে। ডাক্তার হবে আর মানুষের সেবা করবে। বাবা সরকারি কর্মী। সরকারের যে দফতরে কাজ করেছেন, সেখানে ঘুষ নেওয়ার সুযোগ কম ছিল না। কিন্তু তার বাবা অদ্ভুত আদর্শবান এক জন মানুষ। কোনও দিন নিজের মাইনের বাইরে একটা পয়সা ঘুষ নেননি। মেয়েকেও সেই আদর্শে মানুষ করেছেন তিনি।
বাবার আদর্শ মৈত্রীকে দুটো ব্যাপার শিখিয়েছে। মানুষ আর দেশের প্রতি ভালবাসা। বাবা সব সময় বলে এসেছেন, ‘যতটা সম্ভব মানুষের সেবা করো। আর মনে রাখবে, তোমার দেশ তোমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। দেশকে যথাসাধ্য ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।’
মৈত্রী শুনেছে, তারা নাকি লতায়পাতায় কোনও ভাবে স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মীয়। যদিও বাবাকে এই নিয়ে কখনও কারও কাছে গল্প বা বড়াই করতে দেখেনি মৈত্রী। সে শুধু জানে, তাদের বাড়িতে নেতাজির একটি বড় ছবি টাঙানো আছে। যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন সকালে প্রণাম করেন বাবা।
এইভাবেই বয়ে যাচ্ছিল জীবন। মৈত্রী নিজেকে তৈরি করছিল ডাক্তারি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ভাগ্য অন্যরকম ভেবেছিল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ক’দিন আগেই তার মায়ের স্ট্রোক হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা বেঁচে উঠলেও শরীরের ডান দিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে যায়। তাদের তিনজনেরই সংসার। বাবা অবসরের মুখে দাঁড়িয়ে। ভগবানের একটা বাণে তাদের সংসারটা তছনছ হয়ে গেল।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় খারাপ ফল না করলেও জয়েন্টে যা র্যাঙ্ক করল মৈত্রী, তাতে তার কোনও সরকারি কলেজে ডাক্তারি পড়ার সম্ভাবনা রইল না। আর প্রাইভেটে ডাক্তারি পড়ার যা খরচ, তা তাদের সাধ্যের অনেক বাইরে।
বাড়ির পরিস্থিতি তখন এতটাই জটিল হয়ে গিয়েছে যে মৈত্রী বুঝে গেল, পরের বছর জয়েন্ট দেওয়ার জন্য যে মনঃসংযোগ আর সময়টা দেওয়া দরকার, সেটা সে দিতে পারবে না। মেয়েটার মন থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে লাগল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।
মেয়ের মুখটা দেখে যন্ত্রণায় চুরমার হয়ে যেতে লাগলেন বাবা। এক দিকে, পক্ষাঘাত আক্রান্ত স্ত্রী। অন্য দিকে, কুড়ি বছর পেরনোর আগেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেওয়া মেয়ে। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়ে এতটাই ভেঙে পড়েছে যে পরের বছর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতেন অসহায় বাবা। আর ভাবতেন, সারা জীবন সত্যের পথে চলার এই পরিণাম! একবার মনে হত, কেন তাঁর অন্যান্য সতীর্থের মতো দু’হাতে ঘুষ নেননি। তা হলে এখন মেয়েটাকে নিশ্চিন্তে কোনও ভাল প্রাইভেট কলেজে ডাক্তারি পড়াতে পারতেন। স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারতেন কোনও নামী হাসপাতালে। কিন্তু আজ তিনি নিরুপায়। ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছেন। অসহায়, রিক্ত এক মানুষ।
.
সপ্তাহ দু’য়েক এইভাবে কাটল। তারপরে কথায় কথায় অফিসের এক সহকর্মীকে পুরো ব্যাপারটা বললেন তিনি। একদিন পরেই সেই সহকর্মী আলাপ করিয়ে দিলেন অন্য এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। আর নতুন এক রাস্তা খুলে গেল মৈত্রীর বাবার সামনে।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে সোজা হাজির হয়ে গেলেন মেয়ের ঘরে। উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘শোন মা, তোর ডাক্তারি পড়া হবে। আমি ব্যবস্থা করব।’
অবাক চোখে তাকিয়ে মৈত্রী বলে উঠল, ‘কী বলছ বাবা? তোমার মাথার ঠিক আছে তো?’
উত্তেজিত ভদ্রলোক এর পরে সব কিছু খুলে বললেন মেয়েকে।
তাঁর অফিসের সহকর্মীর দৌলতে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। যাঁর এডুকেশনাল এজেন্সি আছে। এদের সংস্থার কাজই হল ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিদেশে ভাল কলেজ-ইউনিভার্সিটি খুঁজে দেওয়া
এতটুকু শুনেই বাবাকে থামিয়ে মৈত্রী বলে উঠেছিল, ‘তোমার মাথাটা সত্যি গিয়েছে বাবা। আমি যাব বিদেশে পড়তে?’ বলতে বলতে বিষণ্ণ হাসি হেসে উঠেছিল মৈত্রী।
এক ধমকে মেয়েকে থামিয়ে বাবা বাকি কথাটা বলেছিলেন। চিনের অন্যতম সেরা মেডিক্যাল কলেজ হল ক্যাপিটাল মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি। এর আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। সবচেয়ে বড় কথা, খরচ সাধ্যের মধ্যে।
সেই এজেন্ট প্রতি বছরের একটা হিসেব দিয়েছিল মৈত্রীর বাবাকে। সেই হিসেবটাই মেয়েকে দেখালেন বাবা।
চিনা মুদ্রায় হিসেবটা মোটামুটি এই রকম: টিউশন ফি ৩৮০০০, ডর্মিটরি ফি ১১০০০, মিসেলিনিয়াস ফি ১৭,৫০০। সব মিলিয়ে তখনকার সময় ভারতীয় মুদ্রায় বছরে লাখ ছয়েক টাকা।
‘তা হলে ভাব একবার!’ রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে পড়লেন বাবা, ‘তার ওপর ভদ্রলোক বললেন, ডর্মিটরিতে দু’জন বা তিন জন ঘর শেয়ার করে থাকা যায়। ওতে খরচ আরও কমবে। মেয়েদের জন্য আলাদা হোস্টেলের ব্যবস্থা আছে।’
মৈত্রী যেন আশার আলো দেখতে পেল। তারপরেই স্খলিত স্বরে বলল, ‘কিন্তু প্রতি বছর ছ’লাখ টাকা! তারপরে প্লেনের টিকিট। কোথা থেকে আসবে এত টাকা। মায়ের চিকিৎসার খরচও আছে।’
‘তুই কিছু ভাবিস না,’ মেয়ের কাঁধ চাপড়ে দিলেন বাবা, ‘আমার আরও বছর খানেক চাকরি আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে আমি দু’বছরের টাকাটা জোগাড় করে ফেলব। আর এজেন্ট ভদ্রলোক বলেছেন, এর মধ্যে তুই ওখানে স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারিস বা কোনও পার্টটাইম কাজ খুঁজে নিতেও পারবি। মোদ্দা কথা, দু’বছরের পর থেকে নিজের খরচ তুই ঠিক নিজে জোগাড় করতে পারবি।’
এরপরে মেয়ের পাশে বসে বাবা বললেন, ‘দ্যাখ, এটা তোর শুধু একার স্বপ্ন না। আমার আর তোর মায়েরও স্বপ্ন। একদিন তুই ডাক্তার হবি, দেশের সেবা করবি। তোর জন্য গর্বে আমাদের বুকটা ফুলে উঠবে। এই প্রাপ্তি থেকে আমাদের বঞ্চিত করিস না।’
মৈত্রীর চোখ দু’টো জলে ভিজে এসেছিল। সে আর কিছু বলতে পারেনি।
এরপরে সেই এজেন্ট ভদ্রলোকের অফিসে যাওয়া। তিনি কলেজ সম্পর্কে সব কিছু বুঝিয়ে বললেন। এও কথা দিলেন, মৈত্রীর সুযোগ পেতে কোনও সমস্যা হবে না। ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘চিনের ব্যবস্থা কিন্তু দারুণ। খুব কম পয়সায় ওরা ভারতীয় স্টুডেন্টদের জন্য পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। আরে মশাই, একটা কথা আছে না— হিন্দি-চিনি ভাই ভাই! কুড়ি হাজারের উপরে ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী চিনে ডাক্তারি পড়ে।’ বলে হেসে উঠেছিল লোকটা।
সমস্যা হয়ওনি। চার বছর আগে, একদিন বাবা, মা এবং কলকাতাকে বিদায় জানিয়ে প্লেনে উঠে বসেছিল মৈত্রী বসু। গন্তব্য বেজিং।
সমস্যা কিছু হয়নি। চিনের কলেজে নির্বিঘ্নে ডাক্তারি পড়া শুরু হয়ে গেল মৈত্রীর। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দিল অন্য জায়গায়। দু’বছর শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও নিজের খরচের টাকাটা নিজে জোগাড় করে উঠতে পারল না মৈত্রী। সে বুঝতে পারছিল, বাবার পক্ষে আর টানা সম্ভব হচ্ছে না। পাগল পাগল হয়ে যেতে লাগল মেয়েটা।
আর তখনই মৈত্রী বসুর জীবনে এল নায়ার নামের লোকটা!
