৩. আবির্ভাব
মালে। মলদীপের রাজধানী। জুলাই, ২০১৮
বাইরে থেকে মুকাই হোটেলটা দেখলে টুরিস্টরা বিশেষ উৎফুল্ল হবে না। চেহারাটা জৌলুশহীন। সমস্যা হল হোটেলের ঘরগুলোও বাইরের চেহারাটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই রকম ম্যাড়ম্যাড়ে। এই হোটেলের একটাই প্লাস পয়েন্ট। মালে ফেরি টার্মিনালটা খুবই কাছে। ফেরি করে চলে যাওয়া যায় কাছের দ্বীপগুলোয়।
এইরকমই একটা দ্বীপ, হুমহুমালে থেকে সন্ধ্যার দিকে ফিরছিল ফেরিটা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে গাদাগুচ্ছের টুরিস্ট নিয়ে। এত টুরিস্টের ভিড়ে কেউ আলাদা করে নজর দেয়নি ডেকের কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনের দিকে। নজর দিলে কেউ কেউ হয়তো বুঝতে পারত, দু’জনের মধ্যে এক জন চিনা। তাতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। চিনের বহু মানুষই মলদ্বীপ বেড়াতে আসেন। তাঁদের কাছে মলদ্বীপ খুব জনপ্রিয় একটি টুরিস্ট স্পট।
দ্বিতীয় জন মলদীপেরই বাসিন্দা। কিন্তু তার আসল পরিচয়টা খুব কম লোকই জানে। মলদ্বীপের ন্যাশনাল সিকিউরিটি সার্ভিসের এক জন হাই র্যাঙ্কিং অফিসার।
দু’জনের বয়সই পঁয়ত্রিশের আশেপাশে। কথাবার্তা চলছিল ডিভেহি ভাষায়, যা মলদ্বীপবাসীর নিজস্ব ভাষা।
চিনা লোকটি প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি নিশ্চিত? ইন্টেল ঠিক আছে?’
‘একশো শতাংশ না হলেও ধরতে পারেন মোটামুটি নব্বই শতাংশ নিশ্চিত। আবদুল্লা ইয়ামিনের এবার আর নির্বাচনে জেতা হবে না। মলদ্বীপের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে চলেছে ইব্রাহিম মহম্মদ সোলহি।’
গম্ভীর হয়ে গেল চিনা লোকটির মুখ। এই রকম খবর তাদের কাছেও আছে। শুধু একটু যাচাই করে নেওয়ার দরকার ছিল। যাচাই করার ফলটা মোটেও ভাল হল না। ইয়ামিন ক্ষমতাচ্যুত হলে সেটা খুবই খারাপ হবে চিনের পক্ষে। আরও খারাপ হবে এই সোলহি লোকটা ক্ষমতায় এলে। এই সোলহির ভারতপ্রীতি বড্ড বেশি।
দেশ ছাড়ার আগে তাকে যে ব্রিফিংটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা মনে পড়ে যাচ্ছিল চিনা অফিসারের।
এমএসএস-এর হেডকোয়ার্টার্সের একটা ঘরে তাকে ডেকে পাঠিয়ে বস বলেছিলেন, ‘লিং, তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে মলদ্বীপ যেতে হবে।’
লিং কোনও জবাব দেয়নি। পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল।
‘আমাদের কাছে খবর আছে, ইয়ামিন আসন্ন নির্বাচনে হেরে যেতে পারে। ক্ষমতায় আসতে পারে সোলহি। সেটা হতে দেওয়া যাবে না।’
কেন হতে দেওয়া যাবে না, সেটা ভাল করেই জানত লিং।
সোলহি যেমন ভারতপ্রেমী, ইয়ামিন সে রকমই চিনপ্রেমী। ইয়ামিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গত পাঁচ বছরে মলদ্বীপ আর চিনের সম্পর্কটা বেশ দৃঢ় হয়েছে। ২০১৪ সালে চিনের মহাবিতর্কিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মলদ্বীপ। এই বিআরআই প্রজেক্টটা চিনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই চিন সংযোগ স্থাপন করতে চাইছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে। লক্ষ্য দু’টো। এক, নিজেদের ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়ার রাস্তা আরও পরিষ্কার করা। দুই, আরও বেশি দেশে আধিপত্য বিস্তার করা।
দু’বার না ভেবেই চিনের সঙ্গে চুক্তিতে সই করেছেন ইয়ামিন। চিনের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলার ধার নিয়েছেন। তৈরি হয়েছে চিনা-মলদ্বীপ ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ। পাশাপাশি মলদ্বীপে অনেক বড় বড় পরিকাঠামোগত প্রকল্পে টাকা ঢেলেছে চিন। ইয়ামিন ওই সময় চিনের প্রায় হাতের পুতুল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও পাত্তা দেননি মলদ্বীপ প্রেসিডেন্ট।
মলদ্বীপকে হাতের মুঠোয় নেওয়া চিনের কাছে তখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল। মলদ্বীপকে সামনে রেখে ভারত মহাসাগরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে উঠে পড়ে লেগেছিল চিন। সেনাবাহিনীর সাহায্যে নয়, সাম্রাজ্য বিস্তার করার জন্য অন্য একটা রাস্তা নিয়ে থাকে চিনের সরকার। ঋণের ফাঁদে একটার পর একটা দেশকে জড়িয়ে ফেলা, যাতে তারা চিনের হাতের পুতুল হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্য বিস্তার করার ক্ষেত্রে সবার আগে চিনের নিশানায় থাকে বিদেশি বন্দরগুলো। সেই সব বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা মানে বাণিজ্য বিস্তারেও সমস্যা থাকে না। ব্যবসা করার ক্ষেত্রে সি রুটের মতো রুট আর কিছু নেই! সমুদ্র পথেই তো আসল ব্যবসা চলে। যে কারণে মলদ্বীপকে হাতছাড়া হতে দিতে রাজি ছিল না চিন সরকার।
মলদ্বীপকে মুঠোয় রাখতে চিন যে কতটা মরিয়া, তা আরও এক বার বোঝা গিয়েছিল এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। যখন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ইমার্জেন্সি জারি করেন দেশজুড়ে। ওই সময় চিনের কাছে খবর এসেছিল, মলদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে ভারত। খবর পাওয়া মাত্রই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ভারত মহাসাগরের পূর্বপ্রান্তে ১১টি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে দেয় চিন। লক্ষ্য একটাই। ভারতকে বুঝিয়ে দেওয়া, একটু বেচাল দেখলেই কড়া জবাব দেওয়া হবে!
ভারত কিছু করেনি। ভারত অপেক্ষা করেছিল।
নির্বাচনী প্রচারে দু’টো তাস খেলেছিলেন ইয়ামিন। জনগণকে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর আমলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কতটা ভাল হয়েছে। দুই, ধর্মীয় তাস। যেখানে ইয়ামিন বলেছিলেন, তাঁর আমলে ইসলাম বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে দেশে। ইয়ামিনের অভিযোগ ছিল, বিরোধী দলকে সাহায্য করছে ক্রিশ্চান যাজকরা।
ইয়ামিনের বিরুদ্ধেও কম অভিযোগ ছিল না। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, চিনের হাতের পুতুল হয়ে পড়েছেন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার পরে কমনওয়েলথ থেকেও সরে আসতে হয়েছিল মলদ্বীপকে। কিন্তু তাতেও হুঁশ ফেরেনি ইয়ামিনের। হুঁশ ফিরতে দেয়নি চিন।
‘সমস্যাটা বেশ জটিল,’ বলছিলেন লিংয়ের বস, ‘যে করে হোক ইয়ামিনকে ক্ষমতায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে যাতে নির্বাচন না হয়, সেটাও দেখতে হবে।’
সামান্য সময় চুপ করে রইল লিং। তার কম্পিউটারের মতো মাথায় তখন একটার পর একটা সমীকরণ খেলা করে চলেছে। তার পরে সে বলল, ‘দরকার পড়লে কি বিরোধী প্রার্থীকে সরিয়েও দেব?’
বস একটু হাসলেন। লিং যা বোঝার বুঝে গেল। ‘তুমি তৈরি থাকো। অর্ডার এলেই মলদ্বীপ উড়ে যাবে। আর তার পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’ বসের কথা শেষ হওয়া মাত্র ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এমএসএস-এর অ্যাসাসিন।
লিং বেরিয়ে যাওয়ার পরে সোলহির ফাইলটা টেনে বার করলেন বস। এই লোকটা মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট হলে চিনের সমস্যা হয়ে যাবে। লোকটা এখন থেকেই ‘ভারত ফেরাও’ নীতি নিয়ে ফেলেছে। মলদ্বীপে কিছুতেই ভারতকে জায়গা দেওয়া চলবে না।
তবে একটা ব্যাপারে স্বস্তি পাচ্ছিলেন বস। লিংকে পাঠানো হচ্ছে এই অপারেশনে। চিনা মিলিটারির অন্যতম সেরা অফিসার। তার খুবই ঘনিষ্ঠ। চিয়াং ভাইরাসের মতো স্পর্শকাতর ব্যাপার নিয়েও এই এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে থাকেন এমএসএস চিফ।
পাশাপাশি কোভার্ট অপারেশনে পারদর্শী। স্টোন কোলড কিলার। এমএসএস-এর অন্যতম সেরা এজেন্ট। এই ছেলেটা ভুল করবে না।
বস হাসলেন। মনে হচ্ছে, সোলহির ডেথ ওয়ারেন্টে সইটা তিনি করেই ফেলেছেন!
কিন্তু বস, ইয়ামিন বা লিং, কেউ একটা ব্যাপার জানত না। সোলহির পিছনে শুধু ক্রিশ্চান যাজকদের নয়, অন্য কারও হাতও ছিল!
রাতে মুকাই হোটেলের দোতলার ঘর থেকে বসকে ফোনটা করল লিং। কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
‘ইন্টেল ঠিক। আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে।’
‘তা হলে প্ল্যানটা কাজে লাগাও। সময় নষ্ট করে লাভ নেই।’
ফোনটা নামিয়ে রেখে লিং তার অ্যাটাচি কেস থেকে বার করে আনল একটা ফাইল। তার পরে মালের একটা বড় ম্যাপ বার করে বিছিয়ে দিল টেবিলে। চাইনিজ এজেন্টের চোখ আটকে গিয়েছে ম্যাপের একটা বিশেষ অংশে।
জায়গাটার নাম সোসুঙ্গে। মালেরই একটা অঞ্চল। ম্যাপে যে বাড়িটার গায়ে গোল করে একটা দাগ কাটা আছে, তার নাম ডিভেহি ল্যাঙ্গোয়েজ অ্যাকাডেমি। যে বাড়িটার আগের নাম ছিল মলদ্বীপ ন্যাশনাল সেন্টার ফর লিঙ্গুইস্টিক অ্যান্ড হিস্টোরিক রিসার্চ। সরকারি উদ্যোগে গঠিত এই সংস্থা কাজ করে ডিভেহি ভাষার প্রসারে।
ফাইল থেকে আর একটা ছবি বার করে আনল লিং। এটা বাড়িটার একটা ক্লোজ-আপ শট। সুসজ্জিত বাড়িটার চেহারায় একটা মন্দির মন্দির ভাব আছে। সেই মন্দিরের মতো জায়গাটার ডানপ্রান্তে তিন তলা বিল্ডিং। লিংয়ের নজর গিয়ে পড়ল এই বিল্ডিংটার উপরে।
তবে ছবিটা দেখার প্রয়োজন ছিল না তার। লিংয়ের কম্পিউটার মস্তিষ্কে তত দিনে এই বাড়িটার পুরো প্ল্যানটা উঠে গিয়েছে। যার জন্য বেশি দিন সময় দিতে হয়নি তাকে। স্পটটা বার তিনেক রেকি করার পরেই জায়গা আর প্ল্যানটা চূড়ান্ত করে ফেলে লিং। মলদ্বীপ আসার আগেই সে জানত, তার সামনে একটা রাস্তাই খোলা থাকবে। সোলহিকে সরিয়ে দেওয়া।
গত এক সপ্তাহ এবং আগামী এক সপ্তাহে সোলহির দৈনন্দিন রুটিনটাও তার আগে থেকে জানা ছিল। প্রচার সেরে পার্টি অফিসে ঢুকে যাচ্ছেন তিনি। বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটায় উঠে পড়েন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সোলহি। বিল্ডিংয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে মোটামুটি ৪৫ সেকেন্ড মতো সময় নেন সোলহি। কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে এলে আরও বেশি। কিন্তু ৪৫ সেকেন্ডই যথেষ্ট লি-র কাছে। এর চেয়ে অনেক কম সময়ের মধ্যেই সে কাজ শেষ করে দিতে পারে। এখানেও হয়ে যাবে। যে জায়গাটা সে বেছে নিয়েছে, তার চেয়ে ভাল ভ্যান্টেজ পয়েন্ট আর হয় না। অন্তত ১২ মিটার ওপর থেকে টার্গেটকে দেখতে পাবে লিং। সামনেটা পুরো ফাঁকা। টার্গেট হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসবে গেট থেকে। গাড়ির দরজার সামনে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াবে। তার পরে উঠে পড়বে গাড়িতে। লিং এক বার হিসেব করে নিল। এই ধরনের অপারেশন তার কাছে বাগানে বেড়ানোর মতোই ব্যাপার। ওই ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে সে অন্তত তিন বার সোলহির মাথায় বুলেট ঢুকিয়ে দিতে পারবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সে যেখানে থাকবে, সেই বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাবে দুপুর থেকে। থাকবে কয়েক জন মাত্র সিকিউরিটি গার্ড। কিন্তু তারা কেউ বাধা দেবে না তাকে। ওই সময় কেউ থাকবে না পাহারায়। কয়েকটা নির্দিষ্ট সিসিটিভি খারাপ থাকবে। আর মূল দরজাটা খোলা। সরকারের হয়ে কাজ করার এটাই সুবিধে। সব রকম সাহায্যই পাওয়া যায়।
শুধু দুপুর দু’টোর পরে যেতে হবে। কারণ, দু’টোর আগে পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে ডিভেহি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকাডেমি। যার ঠিক উল্টো দিকেই রয়েছে সোলহির মলদ্বীপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অফিস!
ঠিক তিনটের সময় বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল লিং। অ্যাকাডেমি ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সামনেটা ফাঁকা। রাস্তায় কয়েকটা বাইক এবং স্কুটার পার্ক করা। পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টেই এসেছে লিং। তার হাত ফাঁকা। লিং জানে, তিন তলার একটা বিশেষ ঘরে একটা ব্যাগের মধ্যে রাখা থাকবে তার প্রয়োজনীয় জিনিস।
ঠিক সাড়ে তিনটের সময় দু’জন সিকিউরিটি গার্ড বেরিয়ে এল বাইরে। দু’-একবার এ দিক-ও দিক তাকিয়ে তারা হাঁটা দিল অন্য দিকে। নির্দেশ মতো কুড়ি মিনিট তারা বাইরে থাকবে। তার পরে ফিরে আসবে। আরও একটা নির্দেশ দেওয়া আছে তাদের। এর পরে যাই হোক না কেন, তারা চোখ বন্ধ করে থাকবে। কাউকে যদি বাড়ি থেকে বেরোতেও দেখে, তা হলেও নীরব থাকতে হবে।
লিং অবশ্য জানত, তাকে ঢুকতেও যেমন কেউ দেখবে না, বেরোতেও না। রেকি করার সময় সে বিল্ডিংয়ের পিছনের এসকেপ রুটটা ভাল করে দেখে নিয়েছে।
ধীরে সুস্থে ছায়ার মতো লিংয়ের শরীরটা মিলিয়ে গেল ডিভেহি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকাডেমির তিন তলা বাড়ির ভিতরে।
তিনতলার নির্দিষ্ট ঘরেই ছিল ব্যাগটা। আর তার ভিতরের জিনিসগুলো।
এম ২৪ স্নাইপার ওয়েপন সিস্টেম। মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহার করা রেমিংটন মডেল ৭০০-এরই একটা চেহারা। যা এখন ব্যবহার করছে মলদ্বীপ সেনাবাহিনী।
এম ২৪-কে ঠিক ডিটাচেবল রাইফেল বলা চলে না। কারণ, মূল রাইফেলটা আলাদা করা যায় না। আলাদা থাকে টেলিস্কোপ, ম্যাগাজিন এবং বাইপডটা। এখানেও যেমন ছিল। গ্লাভস পরা হাতে দ্রুত রাইফেলটা অ্যাসম্বল করে ফেলল লিং। তার পরে হাতে নিয়ে একবার মেপে নিল ওজনটা।
স্নাইপার রাইফেল হিসেবে লিংয়ের সবচেয়ে প্রিয় চিনেরই তৈরি কিউবিইউ-৮৮। বলা হয়ে থাকে, এই রাইফেলের নিশানা এতটাই নিঁখুত যে একশো মিটার দূর থেকে গুলি ছুড়লে তা একটা কয়েনে গিয়ে লাগবে। ব্যাপারটা যে মোটেই অতিরঞ্জিত নয়, তা লিংয়ের থেকে আর কে ভাল জানবে!
কিন্তু নিজের প্রিয় রাইফেল সে এই দেশে আনতে পারেনি। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চিনের সরাসরি যোগসূত্রটা কিছুতেই বাইরে আসা চলবে না। দায় চাপানো হবে অন্য এক বিক্ষুব্ধ মিলিটারি গোষ্ঠীর উপরে। তাই এম ২৪।
তাতে সমস্যা নেই লিংয়ের। এই রাইফেলও সে ব্যবহার করেছে। ৮০০ মিটার পর্যন্ত নিখুঁত নিশানায় গুলি ছোড়া যাবে। তার টার্গেট তো এখানে পঞ্চাশ মিটারের কম দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকবে। লিং একটু হাসল। সে একটু অপমানিতই বোধ করছিল। এই ধরনের মিশনে তাকে পাঠানো মানে তার প্রতিভার প্রতি অমর্যাদা। কী আর করা যাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৈরি হল শিকারি। এখন সন্ধ্যার অপেক্ষা। তার আগে যদি সোলহি পার্টি অফিসের ঘর থেকে বেরোয়, তা হলে লিংয়ের মোবাইলে খবর চলে আসবে। সোলহির পার্টিতেও সরকারের চর আছে। অ্যাসাসিনেশনের সময়টা তখন একটু বদলাতে হবে। সে রকম হলেও সমস্যা নেই।
সেই সমস্যায় পড়তে হল না লিংকে। সন্ধ্যা নেমে এল। সোলহি তখনও পার্টি অফিসে।
ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে বারান্দার কোণটায় এসে দাঁড়াল লিং। সে আগেই দেখে নিয়েছে, উল্টো দিকের রাস্তার আলোটা এসে পড়েছে মলদ্বীপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফিসের সামনে। টার্গেটকে দেখতে কোনও সমস্যাই হবে না তার। এত সহজ অ্যাসাইনমেন্ট অনেক দিন পায়নি সে।
ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা বারান্দার মেঝেতে শুইয়ে দিল লিং। রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সামনের রাস্তাটা। রাইফেলের নলটা রেলিং থেকে এক ইঞ্চি দূরে রাখল সে। স্নাইপার রাইফেলের নল কখনওই জানলা বা গ্রিলের রেলিংয়ের বাইরে থাকে না। তা হলে কারও চোখে পড়ে যেতে পারে। সব সময় থাকে আড়ালে।
হাওয়াটা বইছে একটু তেরচা ভাবে। লিং সামান্য হিসেব করে নিল। তার পরে চোখ রাখল টেলিস্কোপিক ভিশনে। ভিশনের দু’টো লাইন এসে মিলেছে ঠিক দরজাটার সামনে। যেখান থেকে বেরিয়ে আসবে সোলহি। কিন্তু গাড়িতে ওঠা হবে না আর।
আস্তে করে টেলিস্কোপিক ভিউফাইন্ডার থেকে চোখটা সরিয়ে নিল লিং। এবার অপেক্ষার পালা।
আর তখনই সঙ্কেত দিয়ে উঠল তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। বিপদের আঁচ পেয়ে গিয়েছে শিকারি।
লিং কোনও তাড়াহুড়ো করল না। তার রাইফেলের নলে সাউন্ড সাপ্রেসর লাগানো আছে। গুলি ছুড়লে বড়জোর চাবুক মারার মতো একটা ‘হুইপিং সাউন্ড’ হবে। কিন্তু ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগে টার্গেটটা দেখা দরকার। এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল লিংয়ের শরীর। তার পরে একটা মোচড় দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে ঘুরে গেল পিছন দিকে।
কিন্তু লিং ঘুরতে পারলেও রাইফেলের নলটা পুরো ঘুরতে পারল না। একটা লোহার মতো মুঠিতে আটকে গিয়েছে এম ২৪ স্নাইপার রাইফেলের নল।
লিংয়ের দু’টো হাতই রাইফেলে। ডান হাতটা ট্রিগারে, বাঁ হাতটা ব্যারেলে। ওই একটা মুহূর্তে চাইনিজ এজেন্ট বুঝতে পারল, চরম ভুল করে ফেলেছে সে। বড্ড হালকা ভাবে নিয়ে ফেলেছে এই মিশনটাকে। তাও শেষ চেষ্টাটা করল লিং। বাঁ হাত দিয়ে আঘাত করতে চাইল আততায়ীকে। কিন্তু তত ক্ষণে সত্যি দেরি হয়ে গিয়েছে।
আততায়ীর বাঁ হাতটা লিংয়ের রাইফেলটাকে একটুও নড়তে দেয়নি। লিংয়ের বাঁ হাত তাকে আঘাত করার আগেই ছায়ামূর্তির ডান হাত নেমে এল লিংয়ের বুকে। পরের মুহূর্তেই হাতে ধরা ছুরিটার ফলাটা ঢুকে গেল লিংয়ের হৃদপিণ্ডে।
লিংয়ের বাঁ হাতটা এসে যখন আঘাত করল মূর্তিটার মুখে, তখন চিনা ঘাতক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার হৃপিণ্ড ফুঁটো হয়ে গিয়েছে। মুখ থেকে ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে রক্ত। ফলে ওই আঘাতটা সামলাতে কোনও সমস্যাই হল না আততায়ীর। তার ডান হাতের চাপে ছুরির ফলাটা পুরোপুরি ঢুকে গেল লিংয়ের বুকে।
কয়েক সেকেন্ড পরিস্থিতিটা দেখল আততায়ী। তার পরে আলগা করল হাতের চাপ। লিংয়ের অসাড় হাত থেকে ততক্ষণে খসে পড়েছে রাইফেলটা। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তার উপরে অন্ধকার। ছায়ামূর্তির মুখটা বুঝতে পারল না লিং। শুধু দেখল একটা লম্বা শরীর ঝুঁকে আছে তার উপরে।
তার পরে কথা বলল আততায়ী। প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি লিং, কী বলছে লোকটা। ইংরেজিতে কথা বলছিল ছায়ামূর্তিটা। ইংরেজিটা ভালই জানে লিং। কয়েক মুহূর্ত পরে লিংয়ের মস্তিষ্কে আঘাত করল শব্দগুলো—
‘ভারত যুদ্ধজাহাজ পাঠায় না। যখন প্রয়োজন হয়, আমাকে পাঠায়।’
লোকটা একটু থামল। তার পরে ধীরে ধীরে বলল—
‘আমার নাম রানা। অভিমন্যু সিং রানা!
সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল লিংয়ের সামনে। তাও সে বুঝতে পারল, আততায়ী কে। কোন দেশের। একটা অক্ষম রাগে ঝনঝন করে উঠল লিংয়ের শরীরটা। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছায়ামূর্তিটার টি-শার্টটা খিমচে ধরল লিং। তার পরে হাঁপাতে হাঁপাতে কোনওমতে বলতে পারল, ‘তোরা বাঁচবি না। ধ্বংস হয়ে যাবি। সে আসছে। চিয়াং আসছে।’
ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ল লিংয়ের শরীরটা। আলগা হয়ে গেল হাতের মুঠো। চিনা এজেন্টের নিষ্প্রাণ শরীরটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল ছায়ামূর্তি। তার পরে বারান্দার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল অভিমন্যু সিংহ রানার শরীর।
আধঘণ্টা পরে নয়াদিল্লির একটি বিশেষ জায়গায় নিজের কেবিনে বসে মেসেজটা পেলেন
রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান নিশান্ত অরোরা।
দু’টো শব্দ লেখা আছে মেসেজটায়—
মিশন অ্যাকমপ্লিশড।
মেসেজটা এসেছে তাঁর অন্যতম সেরা এজেন্টের কাছ থেকে।
যার কোডনেম: ভৈরব!
