১১. হ্যামার অ্যান্ড ডান্স
চিন-ভারত। মে-জুলাই, 2020
বেজিং। ২ মে, 2020।
হাইকমান্ডের মিটিংয়ে সে দিন খুব বাছাই করা লোকই উপস্থিত ছিল। চিনের প্রেসিডেন্ট, প্রিমিয়ার, আর্মির দু’জন জেনারেল, মিনিস্টার অব স্টেট সিকিউরিটি এবং এমএসএস-এর প্রধান।
প্রথমে কথা বললেন প্রেসিডেন্ট।
‘কোভিড নিয়ে আমাদের দেশের এই মুহূর্তের পরিস্থিতিটা কী রকম?’
‘সব কিছু নিয়ন্ত্রণে,’ জবাব দিলেন প্রিমিয়ার, ‘আমরা যে হ্যামার পলিসি নিয়েছি, তা কাজে দিয়েছে।’
কোভিডকে সামলানোর জন্য বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন উপায় কাজে লাগিয়েছে। কোথাও পুরোপুরি লকডাউন ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিনের জন্য। স্কুল-কলেজ-অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে ঘরে। এই নীতির নাম ‘হ্যামার পলিসি’। আবার কোনও কোনও দেশে সে ভাবে লকডাউন হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছে, মাস্ক পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নীতিকে বলা হচ্ছে ‘ডান্স পলিসি’।
কোভিডের কালো ছায়া নেমে আসার পরে ফেব্রুয়ারিতে চিনে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু চিনের হ্যামার পলিসি সেই সংক্রমণকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। এপ্রিল-মে মাস নাগাদ সংক্রমণের মাত্রা নেমে এসেছিল একশোরও কমে।
প্রেসিডেন্ট একটু ভাবলেন। তার পরে জানতে চাইলেন, ‘ভারতের পরিস্থিতিটা কী?’
‘ওদের অবস্থা খারাপ। সংক্রমণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। লকডাউন করেও সামলাতে পারছে না,’ দ্রুত জবাব দিলেন এমএসএস-এর দায়িত্বে থাকা মিনিস্টার।
‘আমি কি একটা কথা বলতে পারি?’ প্রশ্নটা শোনা গেল ঘরে উপস্থিত সিনিয়র জেনারেলের মুখে।
প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিতে অনুমতি দিলেন। বলা শুরু করলেন জেনারেল-
‘ভারত কিন্তু এই মুহূর্তে খুব বেকায়দায় আছে। ঘরের সমস্যা সামলাতে জেরবার হয়ে যাচ্ছে। এটাই উপযুক্ত সময় ওদের ধাক্কা দেওয়ার। বিশ্বকে বুঝিয়ে দিতে হবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পরবর্তী সময় বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ চিনের হাতেই থাকবে। ভারত এই খেলায় নগণ্য একটা বোড়ে মাত্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষমতার সমীকরণে ভারত যে কত ক্ষুদ্র একটা দেশ, তা বিশ্বকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।
জেনারেলের কথা শেষ হওয়ার পরে সবাই তাকালেন প্রেসিডেন্টের দিকে। জেনারেলের প্রস্তাবটা সবারই মনে ধরেছে।
কোভিড অতিমারি শুরু হওয়ার আগে চিনের প্রেসিডেন্ট এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েক বার নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু তাতে দু’পক্ষের মধ্যে বরফ গলেনি। না গলার কারণ চিনের প্রস্তাবিত বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিসিয়েটিভ) প্রজেক্ট। যে প্রজেক্টের জন্ম ২০১৩ সালে। যে প্রজেক্টের মাধ্যমে চিন তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায় এশিয়ার দেশগুলিতে। এই প্রজেক্টের একটা অঙ্গ হল পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে দিয়ে রাস্তা বানিয়ে চিন-পাকিস্তানের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও মজবুত করা। যা ভারত মানতে চায়নি।
শুধু ভারতীয় পলিটিক্যাল অ্যানালিস্টরা নন, যে কোনও দেশের অ্যানালিস্টই সহজে বুঝে নিতে পারবেন, চিন কী খেলা খেলছে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোয় আধিপত্য কায়েম করে কোণঠাসা করে ফেলছে ভারতকে। এশিয়ার বাজারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে চাইছে। দখল নিতে চাইছে সি-রুটগুলোর। সবার আগে টার্গেট করছে বিভিন্ন দেশের বন্দরগুলোকে। যাতে সমুদ্রপথে ব্যবসা করতে কোনও সমস্যা না হয়।
বিআরআই প্রজেক্টের অন্তর্গত চারটে প্রকল্প ছিল।
এক, চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর।
দুই, বাংলাদেশ-চিন-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার ইকনমিক করিডর।
তিন, মেরিটাইম সিল্ক রোড। যা প্রভাব বিস্তার করবে ভারত মহাসাগরের উপরে।
চার, ট্রান্স হিমালয়ান ইকনমিক করিডর।
এই চারটে করিডরের ম্যাপ যদি আঁকা যায়, তা হলে দেখা যাবে ভারতকে কেন্দ্ৰে রেখে চলে গিয়েছে রুটগুলো। অর্থাৎ, স্রেফ ঘিরে ফেলা হচ্ছে ভারতকে। এই করিডর অনুযায়ী চিনের প্রভাব শুধু ভূখণ্ডেই নয়, বিস্তৃত হতে চলেছে মেরিটাইম রুটেও।
পশ্চিম দুনিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বুঝে গিয়েছিলেন, চিনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়বে ভারত। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দু’টো রাস্তা খোলা ছিল ভারতের সামনে।
এক, চিনের আধিপত্য মেনে নেওয়া। দুই, চিনের চোখে চোখ রেখে পাল্টা জবাব দেওয়া।
ভারত দ্বিতীয় রাস্তাটাই বেছে নিয়েছিল।
‘কী বলতে চান আপনি?’ প্রশ্নটা করলেন প্রেসিডেন্ট।
‘ভারতকে সরাসরি ধাক্কা দেওয়া। ওদের সীমান্তে আক্রমণ করে। আমাদের আরও একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু বড্ড বেশি ভারত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বোধহয় ভাবছে, চিনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে ভারত। ট্রাম্পের ভুলটা ভেঙে দেওয়ার সময় হয়েছে।’ টানা কথা বলে থামলেন জেনারেল। উত্তেজনায় তাঁর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে।
মিনিট খানেকের নীরবতার মধ্যেও বোঝা গেল, জেনারেলকে সমর্থনই করছেন বাকিরা।
প্রেসিডেন্ট তাকালেন এমএসএস চিফের দিকে, ‘আপনারা কী বলছেন?’
‘সাঁড়াশি আক্রমণ করা হোক। বাইরে থেকে এবং ভিতর থেকে। ভিতরের অপারেশনটা আমরা দেখছি। বাইরেটা যদি আর্মি দেখে…।’ কথাটা শেষ করলেন না এমএসএস চিফ। উঠে পড়লেন প্রেসিডেন্ট। তার পরে চিনা ভাষায় যা বললেন, তার খুব কাছাকাছির ইংরেজি তর্জমা হল-
‘হ্যামার ইন্ডিয়া।’
.
৫ মে, ২০২০। ভারত-চিন সীমান্ত।
লাদাখের প্যাংগং লেক, তিব্বত-সিকিমের সীমান্ত এলাকা এবং ভারত-চিন লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) জুড়ে হঠাৎ করে হামলা চালাল চিনা সৈনিকেরা। জবাব দিল ভারতীয় ফৌজ। গোলাগুলি না চললেও হাতাহাতি লড়াই বেধে গেল দু’তরফে।
মে মাসের শেষ দিকে গালওয়ান উপত্যকায় ভারতের রাস্তা বানানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিল চিন সরকার।
এর পরে ১৫-১৬ জুন দু’তরফের হাতাহাতি লড়াইয়ে মৃত্যু হল জনা কুড়ি ভারতীয় সৈন্যের। চিনের হতাহতের সংখ্যাটা জানা গেল না।
৭ সেপ্টেম্বর এলএসি বরাবর গুলি চলল দু’তরফে। ৪৫ বছরের মধ্যে প্রথম বার। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল ভারত-চিন সম্পর্ক। এক দিকে কোভিড, অন্য দিকে, চিনের সঙ্গে যুদ্ধের দামামা। অশনি সঙ্কেত দেখতে লাগলেন সাধারণ মানুষ।
.
শিজিজুয়েং, হাবেই, অক্টোবর, ২০২০।
ভয়ঙ্কর একটা ঝড় যেন বয়ে চলেছে পৃথিবীর বুকে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে একটা প্রজন্ম। ভয়ঙ্কর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ইউনিভার্সিটি এখন বন্ধ। ছাত্র-ছাত্রীরা ফিরে গিয়েছে নিজেদের বাড়িতে। বিদেশি ছাত্রদের চিন থেকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পরে এখন অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে আসার অনুমতি পেয়েছেন প্রফেসর ওয়াং লি। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের একটু দূরে একটা পার্ক। সেখানে এখনও ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ভিড় করে পায়রার দল।
বিকেলের দিকে সেই পার্কে এসে বসেন প্রফেসর ওয়াং লি। পায়রাগুলোকে বাদামের দানা খাওয়ান। আরও কেউ কেউ আসেন পার্কে ঘুরতে। তাদের মধ্যে কয়েক জন প্রফেসরকে চেনেন। টুকটাক কথাবার্তা চলে দু’পক্ষের। কিন্তু প্রফেসর কিছুতেই ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যতের ছবি মাথা থেকে মুছে ফেলতে পারেন না।
এই নোভেল করোনাভাইরাস তাঁকে ভীষণ ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে। তিনি নিশ্চিত করে জানেন না, এই ভাইরাসের জন্ম কোথায় হয়েছে। হয়তো প্রকৃতিরই রোষ। মানুষের উপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। হয়তো বা তাঁর মতো কোনও বিজ্ঞানীর হাত থেকে জন্ম নিয়েছে এই মারণ ভাইরাস। প্রফেসর লি জানেন না। কিন্তু এই মারণ ভাইরাসের প্রকোপ কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, সেটা তিনি দেখছেন।
আরও একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন ইদানীং দেখছেন তিনি— পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে আরও একটা মারণ ভাইরাস। মৃত্যু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। যে ভাইরাসকে থামানোর ক্ষমতা নেই মানুষের। যে ভাইরাস ইবোলার থেকেও ভয়ঙ্কর, নোভেল করোনাভাইরাসের থেকেও বেশি প্রাণঘাতী।
চিয়াং ভাইরাস!
প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠেন প্রফেসর। আর বাকি রাতটা কেটে যায় নির্ঘুম অবস্থায় কোভিড আসার পরে তাঁর গবেষণা আপাতত বন্ধ। কিন্তু তিনি জানেন, ওই ভাইরাস পুরোপুরি তৈরি হয়ে গিয়েছে। কাজ চলছে প্রতিষেধক তৈরির। জানেন বলেই ওই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছেন তিনি।
রোজ বিকেলে পার্কে এসে যখন তিনি এই পায়রাগুলোকে খাওয়ান, শান্তি পান তখনই। আজও খাওয়াচ্ছিলেন আর অপেক্ষা করেছিলেন ওই মেয়েটির জন্য।
.
মাস দেড়েক আগে প্রথম আলাপ হয় মেয়েটির সঙ্গে। নাম বলেছিল চিং। কাছেই বাড়ি। চিংও বিকেলে এই পার্কে এসে পায়রাদের খাওয়ায়। একটু একটু করে আলাপ জমে উঠেছিল দু’জনের। তার পরে চিং বলেছিল তার দুঃখের কাহিনি। কী ভাবে কোভিড এসে কেড়ে নিয়েছে তার বাবাকে। তাদের জীবন প্রায় ছারখার করে দিয়েছে এই মারণ ভাইরাস। শুনেছেন আর মনে মনে রক্তাক্ত হয়েছেন প্রফেসর।
একটু পরেই দেখা গেল চিংকে। প্রফেসরকে দেখে হাত নেড়ে এসে বসল বেঞ্চে। কত আর বয়স হবে মেয়েটার। বছর পঁচিশ হয়তো। প্রফেসরের পাশে বসে চিং বলে উঠল, ‘আর কত দিন এই ভয়ঙ্কর অবস্থা চলবে বলতে পারেন? আমরা কি কোনও দিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব?’
প্রফেসর কী উত্তর দেবেন, ভেবে পেলেন না। তারপরে বললেন, ‘নিশ্চয়ই ফিরব। অনেকটাই তো নিয়ন্ত্রণে এসেছে কোভিড।’
চিং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পায়রাদের খাওয়াতে লাগল। মিনিট দু’য়েক পরে খাওয়ানো থামিয়ে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলে উঠল, ‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় এই ভাইরাস মানুষ তৈরি করেছে?’
প্রফেসর ম্লান হেসে জবাব দিলেন, ‘আমার সত্যিই জানা নেই।’
আবার ক্ষণিকের নীরবতা। তার পরে চিং বলল, ‘ভাল হবে না। যে মানুষটা এই ভাইরাস সৃষ্টি করেছে, ঈশ্বর তাকে কোনওদিন ক্ষমা করবেন না। এত মানুষের মৃত্যুর জন্য যে দায়ী, সে এই জীবনেই নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে।’
চিংয়ের কথা শুনতে শুনতে কেঁপে উঠলেন প্রফেসর। রক্তশূন্য হয়ে গেল তাঁর মুখটা। কোনওমতে উঠে পড়লেন প্রফেসর লি। তারপরে কোনও কথা না বলে দ্রুত হাঁটা দিলেন নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। গোটা শরীর জুড়ে ভয়ঙ্কর একটা কাঁপুনি উঠছে তাঁর।
একদৃষ্টে প্রফেসরের চলে যাওয়াটা দেখতে লাগল চিং।
সেই রাতে ঘুম প্রায় হলই না প্রফেসরের। চোখ দু’টো বন্ধ হলেই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন এসে হানা দিতে লাগল। আর কানে বাজতে লাগল চিংয়ের কথাগুলো—
‘এই জীবনেই নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে লোকটা।’
মানসিক ভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলেন প্রফেসর ওয়াং লি।
.
নয়াদিল্লি। জয়সলমির হাউস, বেসরকারি ‘র’ হেডকোয়ার্টার্স। অক্টোবর, ২০২০।
সরকারি ভাবে নয়াদিল্লিতে কোথাও ‘র’-এর হেডকোয়ার্টার্স নেই। লোধী রোডের সিজি ও কমপ্লেক্সে সিবিআই বিল্ডিংয়ের পিছনের সাদা বাড়িটাকে অনেকে ‘র’-এর হেডকোয়ার্টার্স বলে চিহ্নিত করে থাকে। কিন্তু সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়। সেক্রেটারি এখানে বসেন না।
র চিফ-এর সরকারি তকমা হল সেক্রেটারি (রিসার্চ)। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং আবার ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়াটের অন্তর্গত। যার শীর্ষে রয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়াটের বিভিন্ন অফিস আছে রাজধানীতে। র চিফ বা সেক্রেটারিকে নিয়মিত রিপোর্ট করতে হয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসারকে। আর সেই রিপোর্ট চলে যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
জয়সলমির হাউসে একটা কেবিনে অরোরা তখন বসেছিলেন দু’জন সঙ্গীর সঙ্গে। একজন, তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড। অন্যজনের নাম অভিমন্যু সিং রানা!
বসকে প্রশ্নটা করলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড, ‘তা হলে চিয়াং ভাইরাসটাই কি এই নোভেল করোনাভাইরাস? যার কথা লিং বলেছিল?’
একটু চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন নিশান্ত অরোরা। ‘ঠিক পরিষ্কার হচ্ছে না ব্যাপারটা। ‘ তারপরে অভিমন্যুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী মনে হয়?’
একটু ভাবল অভিমন্যু। তারপরে জবাব দিল, ‘খুব সম্ভবত নয়। চিন এমন কিছু ভাইরাস ইচ্ছাকৃত ভাবে ছড়িয়ে দেবে না, যাতে ওদের দেশটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
সামান্য সময়ের নীরবতা। নীরবতা ভাঙলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড, ‘চিন কিন্তু এই অবস্থার সুযোগটা পুরোপুরি নিচ্ছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমার বদলে বেড়েই চলেছে। এই মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু হলে…।’
সবাই চুপ করে রইলেন। তার পরে অভিমন্যু বলল, ‘ম্যান্ডারিন ডেস্কের কাছে কী খবর আছে? ওই প্রফেসর লি-র কী অবস্থা?’
‘প্রফেসর লি-র উপরে আমাদের নজর আছে। কোভিডের পরে ইউনিভার্সিটি বন্ধ। ভদ্রলোক নিজের অ্যাপার্টমেন্টেই থাকছেন আর পায়রাদের খাওয়াচ্ছেন। তবে একটা ভাল খবর আছে।’
ঘরের দু’জন কৌতূহলের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন বসের দিকে। অরোরা বলে চললেন, ‘আমাদের এজেন্টের খবর অনুযায়ী ভদ্রলোক ভীষণই অনুশোচনায় ভুগছেন। এমনকি, বলেছেন দুঃস্বপ্ন দেখে নাকি রাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।’
‘চিয়াংয়ের কথাটা কি ওকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল?’
‘না, এখনও নয়। আরও একটু খেলাতে হবে। ধীরে ধীরে ওর মুখ খোলাতে হবে। তাড়াহুড়ো করলে শিকার জাল কেটে বেরিয়ে যেতে পারে।’ কথাটা শেষ করে নিজের প্রিয় সিগারটা ধরালেন অরোরা। তার পরে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নায়ার যে স্থানীয় এজেন্টকে কাজে লাগিয়েছে, সে খুব শার্প। বয়স কম হলে কী হবে, আসল খবর ঠিক বার করে আনবে।’
‘ওকে। তা হলে আমাদের এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। দেখা যাক, চিন কতটা বাড়তে পারে।’ বললেন সেকেন্ড ইন কমান্ড।
অভিমন্যু চুপ করে দু’জনের কথা শুনছিল। এবার প্রশ্ন করল, ‘আর ওই মৈত্রী বসুর খবর কী? এখনও কি চিনে আটকে আছে মেয়েটা?’
‘না। গত মাসে আরও এক লট স্টুডেন্ট চিন থেকে দেশে ফিরেছে। ওর মধ্যে মৈত্রীও ছিল।’
‘চিন কোনও সন্দেহ করেনি তো?’
অভিমন্যুর প্রশ্নে একটু ভেবে অরোরা জবাব দিলেন, ‘সম্ভবত নয়। নায়ার আমাদের দূতাবাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। নায়ার এখনও চিনের নজরে পড়েনি। তাই মৈত্রীরও পড়ার কথা নয়। আর মৈত্রী মেয়েটি এমন কিছুর সঙ্গে জড়ায়নি যে চিন সন্দেহ করবে। ভাগ্যক্রমে চিয়াংয়ের খবরটা পেয়ে গিয়েছিল।’
মাথা নাড়ল অভিমন্যু। তাদের অপারেশনে ভাগ্যও একটা বড় ভূমিকা নিয়ে থাকে।
হাবেইয়ে তখন আরও একটা যন্ত্রণার প্রহর কাটাতে হচ্ছে প্রফেসর লি-কে। ইউনিভার্সিটি খুলে গিয়েছে। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। তাঁর কাছে নির্দেশ এসেছে, ভাইরাস নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ফাইনাল রিপোর্ট দিতে। আরও একটা প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হয়েছে প্রফেসর লি-র কাছে—
এই ভাইরাসের কোনও প্রতিষেধক তৈরি করা গেল কি না?
প্রফেসর জানিয়ে দিয়েছেন, এখনও প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেননি। কিন্তু মনে মনে তিনি জানেন, পুরো সত্যি কথা হাই কমান্ডকে জানাননি তিনি। প্রতিষেধক এখনও তৈরি হয়নি ঠিকই, কিন্তু হতে সময় লাগবে না।
এই ভাইরাস নিয়ে কাজ করতে তাঁর বিবেক আর কিছুতেই সায় দিচ্ছে না।
.
নভেম্বর, ২০২০। নানজিং, চিন।
চিনের মানুষ সম্পর্কে বাইরের পৃথিবীর লোকেদের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে। বেশির ভাগ মানুষই মনে করে, চিনারা খুব একটা লম্বা হয় না। কিন্তু চিনের গড়পরতা মানুষের উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি মতো।
ঘরের মাঝখানে যে লোকটা দাঁড়িয়েছিল, তার উচ্চতা দেখেই বলে দেওয়া যায়, লোকটা সাধারণ নয়। প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা হবে লোকটা। ছিপছিপে, মেদহীন চেহারা। দেখলে মনে হয় কোনও অ্যাথলিট।
সেটা অবশ্য ভুল নয়। লোকটি একটা সময় পর্যন্ত চিনের জিমন্যাস্টিক্স মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলে দিয়েছিল। অলিম্পিক্সের ভবিষ্যৎ পদকজয়ীদের মধ্যে ছেলেটার নাম ঘোরাফেরা করত। কিন্তু তার পরে লোকটার অন্য প্রতিভাও বিকশিত হতে থাকে। বোঝা যায়, ছেলেটার মধ্যে হিংস্রতা অন্য মাত্রায় আছে। সাধারণের মধ্যে যা সচারচর দেখা যায় না।
ফলে জিমন্যাস্টিক্স থেকে তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটি ক্ষেত্রে। যেখানে সবার পা রাখার সুযোগ ঘটে না।
.
ঘরের মধ্যে একাই দাঁড়িয়েছিল লোকটা। ঘরে আরও একজন ছিল। কিন্তু সে দাঁড়িয়ে নয়, বসে ছিল একটা চেয়ারে। বলা ভাল, বসে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। লোকটার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। পা দু’টোও চেয়ারের দু’টো পায়ের সঙ্গে দড়ির সাহায্যে শক্ত করে আটকানো। মুখে একটা কাপড় গোঁজা।
লম্বা লোকটা এসে দাঁড়াল চেয়ারের সামনে। এবার তাকে খুব পছন্দের কাজ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এই সব কাজের সময় তাকে বলা থাকে, এমন ভাবে পুরো ঘটনাটা সাজাতে হবে, যাতে মনে হয়, ভিক্টিম দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে বা আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এবারের কেসটা অন্য। যাকে মারতে হবে, তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মারতে হবে। যেন বোঝা যায়, কতটা নৃশংস ভাবে মারা হয়েছে লোকটাকে।
এই লোকটার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে হবে সবার কাছে। পার্টির বিরুদ্ধে কথা বললে কী পরিণতি হয়, চিনের বিরুদ্ধে কথা বললে কী পরিণতি হয়, তা যেন সবাই বুঝে যায়।
লম্বা লোকটা ঝুঁকে পড়ে একটু হাসল। তার লোহার পিস্টনের মতো মুঠিটা গিয়ে আছড়ে পড়ল বন্দির তলপেটে।
.
…দিন সাতেক আগে তাকে ডাকা হয়েছিল এমএসএস হেডকোয়ার্টার্সে।
এমএসএস-এর যে বারোটা ব্যুরো আছে, তার মধ্যে দু’টো খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ব্যুরোর কাজ হল, দেশের ভিতরের নিরাপত্তা রক্ষা করা। এই কাজের ব্যাপ্তিটাই বিশাল। এই কাজের জন্য এমএসএস-এর নিজস্ব পুলিশ বাহিনী আছে। নিজেদের বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প আছে। যেখানে গুপ্তচর সন্দেহে নির্বিচারে আটকে রাখা হয় মানুষকে। কথা বার করা হয়, স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেওয়া হয়।
সপ্তম বুরোর কাজ হল সার্ভেলান্স এবং স্পেশাল অপারেশনস। যেগুলো বিদেশের মাটিতেই বেশি হয়ে থাকে। প্রতিটা ব্যুরোই আছে এমএসএস চিফের নিয়ন্ত্রণে। তাই মাঝে মাঝে এক ব্যুরোর অফিসারকে তিনি অন্য ব্যুরোর কাজে লাগাতে পারেন।
যে কারণে তিনি সেদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় অফিসারকে। যে ঘরে-বাইরে, সব জায়গায় কঠিন কাজগুলো করে দেয়।
লোকটা এসে দাঁড়াতেই এমএসএস চিফ একটা ছবি এগিয়ে দিলেন তাঁর প্রিয় এজেন্টের দিকে।
‘ছবির পিছনে নাম-ঠিকানা দেওয়া আছে। লোকটা কোভিড নিয়ে পার্টি বিরোধী এবং দেশবিরোধী একের পর এক আর্টিকেল পাঠাচ্ছে বিদেশি মিডিয়ায়।’
ছবিটার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিষ্প্রাণ গলায় লোকটি প্রশ্ন করল— ‘দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা?’
‘একটাও না। এমন ভাবে মারতে হবে, যাতে লোকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। দেশবিরোধী কার্যকলাপ করলে তার পরিণতি কী হয়, সেটা তো সবাইকে জানতে হবে।’
লোকটা মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
‘আর একটা কথা,’ পিছন থেকে বলে উঠলেন এমএসএস চিফ, ‘এমন ভাবে মারবে যেন শেষ ক’টা মিনিট এই পৃথিবীর বুকেই নরকযন্ত্রণা ভোগ করে ওই সাংবাদিকটা।
সেই নরকযন্ত্রণাটাই এখন শিকারকে বোঝাচ্ছে লোকটা। তার এক একটা ঘুষি আছড়ে পড়ছে বন্দির শরীরে, আর ভিতরের অর্গ্যানগুলো পর্যন্ত থেতলে যাচ্ছে।
প্রথম দিকে ভয়ঙ্কর এক যন্ত্রণা লোকটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। তার মনে হচ্ছিল, শরীরের ওপর দিয়ে একটা ট্রেন যাওয়া-আসা করছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু কোনও আঘাতই তাকে পুরোপুরি বেহুঁশ করে দিচ্ছে না। এমন ভাবেই প্রতিটা ঘুসি মারা হচ্ছিল, যাতে পুরোপুরি সংজ্ঞা চলে না যায় তার।
কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরে লোকটার অনুভূতিগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিল। যন্ত্ৰণা এতটাই অসহ্য হয়ে গিয়েছিল যে শরীরের অনুভূতিগুলোও অসাড় হয়ে পড়ছিল। ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দিল তার মস্তিষ্কও।
আরও মিনিট পাঁচেক পরে মৃত্যু এসে পার্থিব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে গেল লোকটিকে। নিজের শিল্পকর্ম ভাল করে একবার জরিপ করে নিল এমএসএস এজেন্ট। নাহ, কাজটা ভালই হয়েছে। কোনও খুঁত রাখেনি সে। রাখেও না। যে কারণে তার এত ডিমান্ড।
ঘরের দরজাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটা।
.
দিন তিনেক পরে। আবার এমএসএস হেডকোয়ার্টার্স। এমএসএস চিফের সামনে এসে দাঁড়াল লম্বা লোকটা।
তার দিকে আরও একটা ছবি এগিয়ে দিলেন চিফ। লোকটা এক ঝলক দেখে নিল ছবিটা। তার পরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল বসের দিকে।
‘এর উপরে নজর রাখতে হবে। আমাদের টপ অ্যাসেট। কার সঙ্গে দেখা করে, কী ভাবে সময় কাটায়, সব জানতে হবে। আর প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে।’
ছোট্ট করে মাথা নাড়াল লোকটা। সে বুঝে গিয়েছে। এই সব কাজ বুঝতে তার ভুল হয় না। চাইনিজ এস্পিওনাজ মহলে এমনি এমনি তার নামডাক হয়নি।
তবে তার আসল নামটা প্রায় কেউ জানে না। চাইনিজ এস্পিওনাজ মহল তাকে চেনে একটা কোডনেমে— জিয়ান।
চিনা ভাষায় যে শব্দের অর্থ হল— ডাবল এড সোর্ড। দু’দিকে ধারওয়ালা খোলা তলোয়ার।
ঘর থেকে বেরিয়ে ছবিটা এক বার দেখে নিল জিয়ান। তার পরে উল্টোপিঠে চোখ রাখল নাম-ঠিকানাটা পড়ে নিতে। একবারই যথেষ্ট। জিয়ানের মাথায় চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছে ওই নাম-ঠিকানাটা।
যেখানে ঠিকানার জায়গায় লেখা আছে— চাংচেং নর্থ অ্যাভেনিউ, হাবেই। চিংউয়াং অ্যাপার্টমেন্ট। ফ্ল্যাট নম্বর ৩২।
আর নামের জায়গায় লেখা—
প্রফেসর ওয়াং লি!
