২. মৃত্যুদূত
হাবেই মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, শিজিজুয়েং, হাবেই প্রভিন্স, উত্তর চিন, ফেব্রুয়ারি ২০১৮
ইঁদুরের মতো প্রাণীগুলো খাঁচার মধ্যে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। সব মিলিয়ে দশটা প্রাণী। পাঁচটা ছেলে, পাঁচটা মেয়ে। ইঁদুরের মতো দেখতে হলেও প্রাণীগুলোর আসল নাম সিরিয়ান হ্যামস্টার।
বাইরে থেকে প্রাণীগুলোর উপরে নজর রাখছিল যে তিন জন লোক, তারা জানে এর পরের পরিণতি কী! আর অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু হবে প্রাণীগুলোর। শুধু মৃত্যু নয়, ভয়াবহ মৃত্যু। মৃত্যুর আগে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা পাবে ওরা। শরীরের প্রতিটা অর্গ্যান পচে যাওয়ার যন্ত্রণা।
দশ মিনিটের মধ্যে দশটি খুদে শরীর নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল কাচের কন্টেনারের ভিতরে। স্থির দৃষ্টিতে শরীরগুলোর দিকে কয়েক মিনিট তাকিয়ে রইলেন প্রফেসর ওয়াং লি। এই বিশেষ প্রজেক্টের হেড। তার পরে সঙ্গীদের দিকে ফিরে নির্দেশ দিলেন, ‘হ্যামস্টারগুলোকে চেম্বারে নিয়ে যাও। যা করার এখন ওখানেই করতে হবে।’
কী করতে হবে, সেটা প্রফেসর লি-র সঙ্গীরা খুব ভাল করেই জানে। প্রতিটা শরীরকে কাটাছেঁড়া করতে হবে। দেখতে হবে, শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর অবস্থা কী রকম। তার পরে সেই রিপোর্ট যাবে হাই কমান্ডের কাছে।
মঙ্গোলিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই হাবেই প্রভিন্স চিনের ষষ্ঠ বৃহৎ প্রভিন্স। আর তার রাজধানী হল শিজিজুয়েং। এখানেই রয়েছে হাবেই মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি। প্রায় ১২০ বছরের পুরনো এই ইউনিভার্সিটির নাম বারবার বদলেছে। এই সুবিশাল ইউনিভার্সিটি চত্বরে রয়েছে দু’টো ক্যাম্পাস, পাঁচটা হসপিটাল, চোদ্দটি কলেজ।
এ ছাড়াও রয়েছে বিশাল এক রিসার্চ সেন্টার। হাবেই ইউনিভার্সিটির আর একটি বিশেষত্ব হল ইউরোপ-এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে পড়তে আসে ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের জন্য রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ।
এই ক্যাম্পাসে যে রিসার্চ সেন্টারটি রয়েছে, সেটা বিএসএল-২ স্ট্যান্ডার্ডের। বিএসএল-৪ নয়। বিএসএল অর্থাৎ বায়ো সেফটি লেভেল। যত নম্বর বাড়বে, তত বাড়বে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। স্বাভাবিক ভাবেই বিএসএল-৪ স্ট্যান্ডার্ডের ল্যাবরেটরিতে যে সব মারাত্মক ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা চলে, সেটা বিএসএল-২ স্ট্যান্ডার্ডে চলবে না। যেমন ইবোলা ভাইরাস। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস এতটাই বিপজ্জনক যে নিরাপত্তার চূড়ান্ত বেষ্টনী ছাড়া বৈজ্ঞানিকরা এই ভাইরাসটি নিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন না। তাঁদের অনুমতি দেওয়া হয় না। কিন্তু সমস্যা হল, গোটা পৃথিবীতে বিএসএল-৪ স্ট্যান্ডার্ডের ল্যাব এত কম যে গবেষণার কাজ অনেক জায়গায় থমকে আছে।
চিনেও সেই একই সমস্যা। আর সেই সমস্যার সমাধান বার করতে হাই কমান্ডের কাছে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রফেসর ওয়াং লি। ইবোলারই নতুন ধরনের একটা ভাইরাস তৈরি করতে হবে। মানুষের শরীরে ইবোলা যে ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে, এই ভাইরাসটাও সে রকম করবে। কিন্তু এটা ইবোলা হবে না। এই ভাইরাসকে নিয়ে বিএসএল-২ ল্যাবেই কাজ করা চলবে। তাতে আন্তর্জাতিক প্রটোকলে আটকাবে না। এই ভাইরাস কী ভাবে কাজ করে, সেটা বুঝে প্রতিষেধক তৈরি করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে ইবে।লা মহামারী হলে সেটা থামানো সম্ভব হয়।
হাইকমান্ডের মনে ধরে যায় প্রস্তাবটা। তারা অবশ্য আরও একটা ব্যাপার দেখতে চেয়েছিল, নতুন কী ভাইরাস তৈরি করতে পারেন প্রফেসর লি। অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করেন দেন প্রফেসর। নিজের এই হাবেই ইউনিভার্সিটির ল্যাবে।
সেই গবেষণার প্রথম ধাপ হিসেবে ভেসিকুলার স্টোমাটাইটিস ভাইরাস (ভিএসভি) নামের একটি ভাইরাসকে নিয়ে কাজ শুরু করেন চিনের বৈজ্ঞানিকরা। ল্যাবে নতুন ভাবে সৃষ্টি করেন এই ভাইরাস। চরিত্রটা একটু বদলে দিয়ে। এই নতুন ধরনের ভিএসভি তখন ইবোলা ভাইরাসের গ্লাইকোপ্রোটিন (জিপি)-কে শরীরের মধ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ইবোলা ভাইরাসের খুব বড় একটা অস্ত্র হল এই জিপি। মানুষের শরীরে ইবোলা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পরে এই জিপি বেছে বেছে শরীরের দুর্বল, অরক্ষিত কোষগুলোকে খুঁজে বার করে। আর তার পরে ইবোলা ভাইরাস এসে ঘাঁটি বাঁধে ওই সব কোষে। নষ্ট হয়ে যায় আক্রান্ত কোষগুলো।
দু’য়ের সংমিশ্রণ এবং আরও কিছু রদবদল করেই প্রফেসর লি তৈরি করেছেন তাঁর নতুন ভাইরাস। যা তিন দিন আগে প্রয়োগ করা হয় ওই হ্যামস্টারগুলোর শরীরে।
ছিন্নভিন্ন হ্যামস্টারের শরীরের মধ্যে থেকে বার করে আনা হয়েছিল প্রাণীগুলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গগুলোকে। দেখা যাচ্ছে, হার্ট, লিভার, কিডনি, স্প্লিন, লাংসের মতো অঙ্গগুলোয় থাবা বসিয়েছে ভাইরাস। নষ্ট করে দিয়েছে শরীরের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রাণীগুলোর চোখের কোণেও ময়লা জমেছে। পচে গিয়েছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
তাঁর সৃষ্টি মৃত্যুদূত কতটা ভয়াল হতে পারে, সেটা বুঝে গিয়েছেন প্রফেসর লি। এবার রিপোর্টটা তৈরি করতে হবে হাইকমান্ডের জন্য।
সিসিপি (চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি)-র খুব উচ্চপদস্থ সদস্যদের মধ্যে থেকে জনা কয়েকই মাত্র আছেন হাইকমান্ডে। এ ছাড়া রয়েছেন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান, পিপলস রিপাবলিক আর্মির গ্রাউন্ড ফোর্স-এর কমান্ডার, কয়েক জন জেনারেল, পলিটবুরোর সদস্য এবং মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি বা এমএসএস-এর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও সেই এমএসএস-এর চিফ।
এমএসএস! খুব সহজ করে বললে চিনের সিক্রেট পুলিশ বা সিক্রেট সার্ভিস। পশ্চিম দুনিয়ার কাছে এই এমএসএস নিয়ে খুব বেশি খবর থাকে না। কেউ কেউ মনে করেন, আমেরিকার এফবিআই এবং সিআইএ-র মিলিত রূপ হল এই এমএসএস। অর্থাৎ, দেশে এবং বিদেশে— দু’জায়গাতেই জাল বিছানো থাকে এমএসএসের। দু’জায়গাতেই অপারেশন করে তারা।
প্রফেসর লি-র রিপোর্টটা যে দিন হাইকমান্ডের সামনে এল, সে দিন হাতে গোনা কয়েক জনই উপস্থিত ছিলেন মিটিংয়ে। ঘটনা হল, এই হাতে গোনা কয়েক জনের উপরেই নির্ভর করে আছে গোটা চিনের ভাগ্য। এবং, হয়তো বা বাকি বিশ্বেরও। রিপোর্টটা খতিয়ে দেখার পরে নির্দেশ গেল—
ডেকে আনো প্রফেসর ওয়াং লি-কে।
হাইকমান্ডের সামনে যে তাঁকে এক বার না এক বার যেতে হবেই, সেটা ভালই জানতেন প্রফেসর লি। কিন্তু বেজিংয়ের হাইদিয়ান ডিস্ট্রিক্টের শিউয়ানের ওই বাড়িটায় ঢুকতে গিয়ে তাঁর হাঁটু কেঁপে গেল।
বেজিং পাবলিক বাসে উঠে কেউ যদি রুট ৩৩২ ধরে সামার প্যালেসের স্টপে নামে, তা হলে তাকে দক্ষিণ দিকে ৫০০ মিটার মতো হাঁটতে হবে। তার পরে একটা মোড় আসবে। যে মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে পুব দিকে তাকালে দেখা যাবে বেজিং চাইনিজ মেডিক্যাল হসপিটাল। আর পশ্চিম দিকে এমএসএস-এর হেডকোয়ার্টার্স।
প্রফেসর লি অবশ্য বাসে আসেননি। বেজিং বিমানবন্দর থেকে তাঁকে নিয়ে আসার জন্য গিয়েছিল বিশেষ সরকারি গাড়ি। ওই সরকারি গাড়ি ছাড়া এমএসএস কম্পাউন্ডে ঢোকার কোনও উপায় নেই। ২৪ ঘণ্টা মিলিটারি পুলিশের বেষ্টনী ঘিরে রেখেছে এই কম্পাউন্ডকে। সাধারণ মানুষ ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারে না।
চিনের সব থেকে ক্ষমতাশালী মানুষটি সে দিনের মিটিংয়ে ছিলেন না। কিন্তু যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সামনে দাঁড়াতে গেলেও বুকের পাটা থাকা দরকার। প্রফেসর লি-র কাজকারবার এমন সব বস্তু নিয়ে যাদের খুব শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব নয়। সেই দুনিয়া থেকে বেরিয়ে যাদের সামনে তিনি এখন এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা যে ওই ভাইরাসগুলোর চেয়ে কম বিপজ্জনক নয়, সেটা জানেন প্রফেসর। বরং জানেন, এরা অনেক বেশি বিপজ্জনক।
‘আপনি যে ভাইরাসটা তৈরি করেছেন, সেটা মিউটান্ট একটা ভাইরাস, তাই তো?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন এমএসএস চিফ।
‘ঠিক সিয়ানশাং,’ কোনওমতে বলতে পারলেন প্রফেসর লি। তিনি ঠিকই করে নিয়েছিলেন, ঘরে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের প্রত্যেককে সিয়ানশাং বা স্যার বলেই সম্বোধন করবেন।
‘কতটা বিপজ্জনক এই ভাইরাস?’ প্রশ্নটা করলেন আর্মি কমান্ডার
‘খুবই। এক বার শরীরে সংক্রমিত হয়ে গেলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে একটা মানুষকে মেরে ফেলবে। এই ভাইরাসের প্রতিষেধক বা ওষুধ এখনও পর্যন্ত জানা নেই। তাই শরীরে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। ভয়ঙ্কর মৃত্যু। শরীরের অর্গ্যানগুলো খুব দ্রুত পচে যাবে।’ কথা শেষ করে দর্শকদের মুখের দিকে এক বার তাকিয়ে নিলেন প্রফেসর লি। প্রতিটা মুখই পাথরের মতো ভাবলেশহীন। তার পরে সাহস সঞ্চয় করে দ্রুত বলতে লাগলেন, ‘ভাইরাসটা ইবোলার চেয়েও ভয়ঙ্কর। তবে সময় দিলে আমি প্রতিষেধক আর অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগ বার করে ফেলতে পারব। তাতে ইবোলাকেও থামানো যেতে পারে।
কথা শেষ করে উৎসুক দৃষ্টিতে ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে নিলেন প্রফেসর। কিন্তু কারও চোখেমুখে তারিফ করার কোনও চিহ্নই দেখতে পেলেন না তিনি।
এই গবেষণা যখন প্রফেসর লি শুরু করেন, তখন উদ্দেশ্যটা খুব সোজা সরল ছিল। ঠিক ছিল, ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করার রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। কিন্তু ইবোলা নিয়ে বেশির ভাগ ল্যাবরেটরিতে গবেষণা চালানো সম্ভব নয়। বিএসএল-৪ স্ট্যান্ডার্ডে পড়ে না তারা। তাই এমন একটা ভাইরাস তৈরি করতে হবে যেটা ইবোলার মতো কাজ করবে, কিন্তু ইবোলা হবে না। বিএসএল ২ স্ট্যান্ডার্ডের ল্যাবরেটরিতে সেই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে অসুবিধে হবে না। তার পরেই প্রফেসর লি তৈরি করে ফেলেন এই মিউটান্ট ভাইরাস।
প্রফেসরের এখন মনে হচ্ছে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা ইবোলার চেয়েও ভয়ঙ্কর চেহারা নিতে পারে। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক ভাইরাস। আরও দুশ্চিন্তার কথা, এই ভাইরাস রয়েছে বিএসএল-২ স্ট্যান্ডার্ড ল্যাবে। যেখান থেকে ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি।
প্রফেসর চুপ করে চোখটা নামিয়ে নিলেন। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করা যে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, সেটা তিনি ভালই বুঝে গিয়েছেন।
প্রশ্নটা এল। করলেন পিপলস লিবারেশন আর্মির এক জেনারেল।
‘কী ভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস? খুবই সংক্রমক কি?’
একটু ইতস্তত করে জবাব দিলেন প্রফেসর, ‘খুবই। অনেকটা ইবোলার মতো। বডি ফ্লুইড থেকে ছড়ায়। যেমন থুতু, ঘাম, প্রস্রাব, বীর্য, রক্ত, বমি। এমনকী মায়ের দুধ থেকেও ছড়িয়ে যায়। উল্টো দিকের লোকের শরীরে যদি এক বার সংক্রমিত লোকের বডি ফ্লুইড লাগে, তা হলেই সংক্রমিত হয়ে যাবে সেই ব্যক্তি।’
‘বডি ফ্লুইড ছড়ানোর উপায়টা কী?’ পরের প্রশ্নটা করলেন জেনারেল। বাকি সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন প্রফেসরের দিকে।
প্রশ্নের ধরনগুলো একেবারেই ভাল লাগছিল না প্রফেসর লি-র। একটা অশুভ ইঙ্গিত যেন বহন করে আনছিল প্রশ্নগুলো।
কিন্তু উত্তর তো দিতেই হবে। প্রফেসর বলে চললেন, ‘খুব সাধারণ সব উপায়ে। অনেকটা ইবোলার মতোই। সংক্রমিত ব্যক্তি যদি কোনও বস্তু ছোঁয়, যদি কোনও বিছানায় শোয়, তার থেকে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরা পোশাক থেকেও ছড়িয়ে যেতে পারে এই ভাইরাস। কোনও বস্তুর উপরে বডি ফ্লুইড ছড়িয়ে গেলে, বেশ কয়েকদিন ওই অবস্থায় টিকে যাবে ভাইরাস।’
একটু দম নিয়ে নিলেন প্রফেসর। তার পরে বলে চললেন, ‘এ ছাড়া মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টসের মারফত ছড়াতে পারে। যৌন সংসর্গেও ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সংক্রমিত জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে থেকেও ছড়াতে পারে। চামড়ার মধ্যে দিয়ে সংক্রমিত হয়ে যাবে শরীরে।’ একটু থামলেন প্রফেসর। তার পরে বললেন, ‘আরও পরীক্ষা করার পরে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।’ একটা বড় শ্বাস নিয়ে চেষ্টা করলেন নিজেকে ধাতস্থ করার।
শ্রোতারাও চুপ করে রইলেন। কেউ কোনও কথা বললেন না কয়েক মিনিট। অস্বস্তিকর একটা নীরবতা নেমে এল ঘরে।
তার পরে প্রশ্ন করলেন পলিটবুরোর এক সদস্য।
‘কী নাম রেখেছেন এই ভাইরাসের?’
একটু থতমত খেয়ে গেলেন প্রফেসর। ‘মানে, নাম তো কিছু ভাবিনি।’
আবার কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তার পরে মুখ খুললেন সেই জেনারেল।
‘চিয়াং ভাইরাস নামটা কী রকম?’
ঘরের সবাই জানত, চিয়াং (Qiang) শব্দের কয়েকটা অর্থ আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত অর্থ হল বল্লম, বর্শা। শাওলিন মঙ্কদের একটি প্রিয় অস্ত্র। শত্রুকে শেষ করতে যা চিনের যোদ্ধারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহার করে এসেছে। চিয়াং বা চিয়াংশুকে বলা হয়ে থাকে—সব অস্ত্রের রাজা! এখানে জেনারেল কোন অর্থটার কথা বলছেন, তা বুঝতে সমস্যা হল না কারও।
পাথরের মতো মুখগুলোয় হালকা হাসির ছোঁয়া দেখা গেল বলে মনে হল প্রফেসরের।
পলিটবুরোর সদস্যটি বলে উঠলেন, ‘খুব ভাল। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন। এই নামটা যেন ঘরের বাইরে না যায়। বিদেশি কেউ যেন এই ভাইরাসকে চিয়াং ভাইরাস হিসেবে না চেনে। ভবিষ্যতে কোনও ভাবেই যেন চিনকে এই চিয়াং ভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব না হয়।’
সবাই একবার তাকালেন প্রফেসরের দিকে। তাঁর হৃৎপিণ্ডটা লাফাতে লাগল। তার পরে ঘরের মধ্যে থাকা সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিটি বলে উঠলেন, ‘আপনি এখন যেতে পারেন প্রফেসর। আশা করি, এই প্রজেক্টের গুরুত্বটা বুঝতে পারছেন। আপনি নিঃশব্দে কাজ করে যান। চিয়াং ভাইরাসটার প্রতিষেধক বানানোর উপরেও নজর দিন। নতুন যা কিছু জানতে পারবেন, দেরি না করে আমাদের রিপোর্ট করবেন।’
উঠে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে মাথাটা প্রায় কোমর পর্যন্ত ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন প্রফেসর। চিনা ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘কে-তো’। সম্মান প্রদর্শনের থেকেও এই অভিব্যক্তি অনেকটা পদলেহনের ইঙ্গিত দেয়। প্রফেসরের মাথায় সম্মান প্রদর্শনের এটাই সবচেয়ে বড় উপায় বলে মনে হচ্ছিল তখন।
ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময় প্রফেসরের কানে বাজছিল কথাগুলো— নিঃশব্দে কাজ করে যান আর যা জানতে পারবেন রিপোর্ট করবেন।
প্রফেসর জানতেন, এর কোনওটারই প্রয়োজন হবে না। তিনি যা জানবেন, তার খবর সবার আগে হাইকমান্ডের কাছে পৌঁছে যাবে। আর কোথাও মুখ খুললে?
প্রফেসরের শরীরটা নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠল এক বার।
গাড়িটা যখন বেজিং বিমানবন্দরের প্রায় কাছে এসে পড়েছে, তখন প্রফেসর ওয়াং লি-র মনে আর একটা ভাবনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল—
তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন ইবোলা বা তার থেকেও ভয়ঙ্কর কোনও ভাইরাসকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। যাতে ভয়াল কোনও মহামারীর কবলে না পড়ে মানবজাতি।
কিন্তু হাইকমান্ডের ভাবসাব তাঁর একটুও ভাল ঠেকছে না। চিয়াং ভাইরাস? কেন একটি অস্ত্রের নামে এই নামকরণ?
গাড়ির দরজা খুলে নামার সময় একটা প্রশ্ন প্রফেসর লি-কে রক্তাক্ত করতে লাগল— ভবিষ্যতের পৃথিবী তাঁকে কী ভাবে চিনবে
এক মহামানব? নাকি এক ভয়ঙ্কর দানব?
